• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৩ | জানুয়ারি ২০২৪ | ভ্রমণকাহিনি, প্রকৃতি, বাকিসব
    Share
  • নীলনদ আর প্যাপাইরাসের দেশে : গান্ধর্বিকা ভট্টাচার্য


    পম্পেই পিলার

    ছোটবেলা থেকেই মিশর ঘুরতে যাওয়া আমার এক বিরাট স্বপ্ন ছিল। এ বছর নভেম্বরের শুরুতে অবশেষে বেড়ালের কপালে শিকে ছিঁড়লো। নিজে ঘুরে এসে সন্তুষ্টি হল না, মনে হল সবাইকে আমার ভ্রমণকাহিনী জানাই। ব্যাস, যেমন ভাবনা তেমন কাজ। শুরু হল আমার মিশর যাত্রীর ডায়েরি।

    মিশরে আমরা সাক্কারা ও মেমফিস, গিজা/কায়রো, আসওয়ান, আবু সিম্বেল, এডফু, লুক্সার, ফায়ুম আর আলেকজান্দ্রিয়া দেখেছি। এই লেখার মাধ্যমে চেষ্টা করলাম আপনাদেরও এই জায়গাগুলো ঘুরিয়ে আনতে। বেশি ঐতিহাসিক তথ্য দিয়ে লেখাকে ভারাক্রান্ত করিনি – আজকাল গুগল করলেই সব তথ্য সহজে পাওয়া যায়। মূলত নিজের অভিজ্ঞতা নিয়েই লিখলাম, তার সঙ্গে জায়গাগুলো সম্বন্ধে খানিকটা ধারণা তৈরি করার জন্য যেটুকু তথ্য দেওয়া প্রাসঙ্গিক বলে মনে হল সেটুকুই লিখলাম। যাঁরা মিশর যাবেন বলে পরিকল্পনা করছেন, আশা করি লেখাটা তাঁদেরও কিছু কাজে লাগবে।

    এবার গোড়ার কথায় আসি। আমরা একটি ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে মিশরে গেছিলাম। গোটা ট্যুর বারো দিনের ছিল। কোলকাতা থেকে মুম্বাই পৌঁছে মুম্বাই থেকে ইজিপ্ট-এয়ারের ফ্লাইটে কায়রো পৌঁছলাম। ইজিপ্ট-এয়ারের প্লেনটা খুব ছোট ছিল, সাড়ে ছ'ঘন্টা ধরে যাওয়ার তুলনায় লেগ স্পেস খুব কম। তাছাড়া এয়ার স্টুওয়ার্ডরা ইংরেজি ভাষা বলতে বা বুঝতে পারেন না, যেটা বাড়তি সমস্যার কারণ। কম্বল, বালিশ ইত্যাদিও সব সময়ে পাওয়া যায় না।

    কায়রোয় আমরা 'পিরামিডস পার্ক রেসর্ট' হোটেলে উঠেছিলাম। হোটেলটা মূল কায়রো শহর থেকে একটু দূরে, গিজার কাছে। কিন্তু বেশ ভালো। চেক ইন সেরে নিয়ে আমাদের সাক্কারা এবং মেমফিস দেখাতে নিয়ে যাওয়া হল। এই দিয়ে আমাদের মিশর যাত্রার পত্তন ঘটল। সেই সঙ্গে আমাদের লোকাল ট্যুর গাইড আহমেদের সঙ্গেও আলাপ হল।

    সাক্কারা, মেমফিস

    সাক্কারার পিরামিড প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরনো – মানুষের তৈরি (প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি নয়) পিরামিডের প্রাচীনতম নিদর্শনের একটি বলে মনে করা হয়। রাজা জোসেরের আদেশে তাঁর প্রধান পুরোহিত ইমহোটেপ এই পিরামিডের পরিকল্পনা করেছিলেন। পিরামিডটি 'মর্চুয়ারি কমপ্লেক্স'-এর মধ্যে অবস্থিত, যার প্রবেশপথের থাম নলখাগড়ার গোছার আকারে তৈরি এবং ছাদ পামগাছের স্কন্দের মতো দেখতে। এইভাবে মিশরীয়রা আশপাশের প্রকৃতিকে স্থাপত্যের মধ্যে মিশিয়ে দিতেন – যাকে ভার্নাকুলার স্টাইল বলা হয়। উল্লেখ্য, এই কমপ্লেক্সে একটি সেরদাব আছে, যেখানে জোসেরের কা-মূর্তি (মিশরীয় বিশ্বাস অনুযায়ী মৃত্যুর পর আত্মাকে ধারণ করার জন্য একটি মূর্তি থাকা প্রয়োজন। একে কা-মূর্তি বলে) রাখা আছে। সেই সময়ের ধার্মিক বিশ্বাস অনুযায়ী দেওয়ালে খোদাই করা দুটি গর্তের মধ্যে দিয়ে জোসেরের আত্মা বিভিন্ন পূজার্চনা দেখতেন, তাঁকে উৎসর্গ করা নৈবেদ্যর গন্ধ নিতেন, এবং যথেচ্ছ ঘুরে বেড়াতেন।

    সাক্কারা দেখে আমরা মেমফিসে এলাম। মিশরের প্রাচীন রাজধানীর কিছুই প্রায় এখন অবশিষ্ট নেই। একটি ওপেন মিউজিয়াম আছে, যেখানে দ্বিতীয় রামেসিসের বিশাল দুটি মূর্তি, একটি স্ফিংক্স এবং আরো কিছু মূর্তি রাখা আছে। মিশরীয় শিল্পের প্রথম স্বাদ আমরা এখানেই পেলাম, এবং তা অনবদ্য লাগল। তবে এইদিন কষ্টও খুবই হয়েছিল। প্লেন থেকে নেমে একেই ক্লান্ত ছিলাম, তার ওপর ভর দুপুরে সাহারা মরুভূমির উত্তাপ সম্বন্ধে বিশেষ ধারণা ছিল না। তাই আমরা এইদিন খাওয়ার জল সঙ্গে না নিয়ে যাওয়ার ভুল করেছিলাম। পরে জেনেছি, মিশরে দিনের বেলা জল ছাড়া এক পাও চলা যায় না, আর চলা উচিতও নয়। যাঁরা পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে স্বচ্ছন্দ নন তাঁদেরও মিশর ঘুরতে হলে প্রভূত পরিমাণে জল খেতে হবে, এবং প্রয়োজন হলে টয়লেট ব্যবহার করতে হবে। এই দিনের থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তীকালে আমরা আরো ভালোভাবে প্রস্তুত হয়ে বেরিয়েছি।


    সাক্কারা পিরামিড

    সাক্কারা এবং মেমফিস দেখে আমরা হোটেলে ফিরলাম, এবং বাকি দিনটা বিশ্রাম নিয়ে ক্লান্তি দূর করলাম।

    গিজা, কায়রো

    পরদিন সকালে হোটেলের ঘর থেকে বেরিয়ে দেখলাম মনোরম পরিবেশ। পিরামিডস পার্ক হোটেলের বাগান, গাছপালা, সুইমিং পুল ইত্যাদি সবকিছু প্রতিদিন সকালে যত্ন করে ধোওয়া মোছা হয়। প্রাতরাশের ব্যবস্থাও চমৎকার। ডিম, চিকেন, পর্ক, বীফ ছাড়াও অনেক ধরনের পাঁউরুটি, মিষ্টি ব্রেড, জুস ইত্যাদির ব্যবস্থা ছিল। একটা বিশেষ জিনিস খেলাম – জবাফুলের রস বা হিবিস্কাস জুস, যা অতি সুস্বাদু (পরে আরো অনেকবার জবাফুলের রস, চা ইত্যাদি খেয়েছি)।

    ব্রেকফাস্ট করে আমরা গিজার পিরামিডের দিকে বেরিয়ে পড়লাম। যাঁরা কায়রো গেছেন তাঁরা বুঝবেন, গাড়ি থেকে প্রথমবার পিরামিড দেখার অনুভূতি, আর কায়রো ছাড়ার আগে শেষবার পিরামিড দেখার অনুভূতি, কথায় বোঝানো যায় না। পিরামিডের শিল্পকলা নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই, সারা বিশ্বে এই নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে এবং চলছে। কিন্তু চিরকাল ছবিতে দেখা এই সপ্তম আশ্চর্যের একটি চোখের সামনে দেখে গায়ে কাঁটা দেয়। পাথরের পর পাথর নিখুঁত জ্যামিতিক আকারে সুদূর আকাশে উঠে গেছে, কোথাও কোন ভুলত্রুটি নেই। গিজার তিনটি পিরামিড খুফু, খাফরে এবং মেনকাউরের জন্য রচিত। এর সঙ্গে 'রানীদের পিরামিড' নামে কিছু ছোট পিরামিডও আছে। তার মধ্যে খুফুর পিরামিড সবচেয়ে উঁচু, এবং একমাত্র এখানেই জনসাধারণের প্রবেশের অনুমতি আছে। কিন্তু আহমেদ জানাল ভেতরের টানেলগুলি খুব সংকীর্ণ এবং অনেক জায়াগায় বেশ নীচু। সেই শুনে আমি আর ঢুকতে সাহস পেলাম না। যাঁরা অ্যাডভেঞ্চারাস প্রকৃতির, বা সরু, বদ্ধ জায়গায় অসুবিধা বোধ করেন না, তাঁরা নিশ্চয়ই এই দারুণ অভিজ্ঞতা ছাড়বেন না। পিরামিডের সামনে বিপণীর ভিড় – ছোট ছোট পিরামিডের আদল, নেফারতিতি বা তুত-আংখ-আমুনের মূর্তি, গলার মালা, স্কার্ফ – কী না পাওয়া যায়! দামও খুব বেশি নয়, কিন্তু দর করতে হয়। আমরা লোভ সামলাতে না পেরে টুকটাক কিছু কেনাকাটা করে ফেললাম। (পরে দেখলাম সব বিখ্যাত স্থাপত্যেরই সংলগ্ন বাজার আছে, এবং সেখানে নানান আকর্ষণীয় জিনিস পাওয়া যায়।)

    পিরামিড থেকে একটু দূরে আমাদের একটি পয়েন্ট দেখানো হল, যেখানে বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ির ওপারে একসঙ্গে তিনটি পিরামিডের আইকনিক ভিউ দেখা যায়। যাঁরা পশুনির্যাতন বিরোধী নন, তাঁদের জন্য এখানে উটে চড়ার ব্যবস্থাও আছে।

    এই পয়েন্টটি দেখিয়ে গাড়ি স্ফিংক্সের মন্দিরের দিকে ঘুরল। ছবি দেখে আমার ধারণা ছিল পিরামিড আর স্ফিংক্স বোধহয় একসঙ্গে অবস্থান করছে। বাস্তবে দুটি কাছাকাছি হলেও, একই চৌহদ্দির ভেতরে নয়। স্ফিংক্সের মন্দির আলাদা। এই স্ফিংক্সের মুখের সঙ্গে ফারাও খাফরের সাদৃশ্য আছে বলে মনে করা হয়। অনেকেই জানেন, স্ফিংক্স নামটি পরবর্তীকালে গ্রীক পৌরাণিক গাথা থেকে এসেছে। ফারাও চতুর্থ থুতমোসে মূর্তিটিকে 'হোর-এম-আখেত' বলে উল্লেখ করেছেন। তার আগে একে কি বলা হত তা জানা যায় না।


    গিজা পিরামিড

    সম্ভ্রম উদ্রেককারী এই বিশাল স্থাপত্যটি (মিশরের সব স্থাপত্যই বিশাল আকারের। শুনলাম, এই ধরনের স্থাপত্যকে 'সাবলাইম' বলা হয়) দেখে আমরা প্যাপাইরাস ফ্যাক্টরি দেখতে গেলাম। সেখানে প্যাপাইরাস কিভাবে তৈরি হয় তার সম্বন্ধে একটি বক্তৃতাও শুনলাম। এই দোকানের প্যাপাইরাস নাকি খাঁটি জিনিস (আমি এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নই)। তার দামও প্রচুর। কিছু প্যাপাইরাসে সোনার গুঁড়ো ছড়ানো আছে, কিছু আবার অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে। দেখতে মন্দ লাগেনি, কিন্তু এর পর আমাদের লাঞ্চ করার কথা, এবং তারপর কায়রোর মিউজিয়াম দেখা বাকি। মিউজিয়াম পাঁচটায় বন্ধ হয়ে যাবে। আমি উসখুস করতে লাগলাম, কিন্তু আহমেদের ওঠার নাম নেই। অত্যুৎসাহীর দল প্যাপাইরাস দেখেই চলেছেন। এদিকে আমার টেনশনও বেড়েই চলেছে। মনে মনে বলছি, “দিদি, প্যাপাইরাস কোলকাতার ট্রেড ফেয়ারেও পেয়ে যাবেন, কিন্তু কায়রোর মিউজিয়াম তো কোলকাতায় তুলে নিয়ে যেতে পারবেন না। বন্ধ হয়ে গেলে না দেখেই ফিরে যেতে হবে।” প্রায় এক যুগ কাটার পর অবশেষে কেনাকাটা সাঙ্গ হল। একটি রেস্তোরাঁয় বিস্বাদ কিছু একটু মুখে দিয়ে আমরা কায়রোর মিউজিয়াম দেখতে গেলাম। তখন প্রায় বিকেল চারটে।


    ফারাও হাটশেপসুটের মূর্তি (কায়রো মিউজিয়াম)

    কায়রোর মিউজিয়াম (ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম) আফ্রিকার বৃহত্তম মিউজিয়াম। দোতলা এই মিউজিয়ামে তুত-আংখ-আমুনের সোনার সার্কোফেগাস এবং বারিয়াল মাস্ক ছাড়াও প্রাচীন মিশরের অজস্র প্রদর্শনী আছে। সময়ের সঙ্গে মিশরীয় শিল্পের বিবর্তন বুঝতে গেলে একতলার ঘরগুলি ঘুরে দেখতে হয়। আর তুত-আংখ-আমুনের ঘর, কে ভি ৬২ থেকে আবিষ্কৃত আর্টিফ্যাক্টস (এর সঠিক বাংলা খুঁজে পেলাম না), অন্যান্য রাজাদের সার্কোফেগাস, প্যাপাইরাস ইত্যাদিতে বেশি উৎসাহ থাকলে আগে দোতলার ঘরগুলি দেখে নেবেন। ২০২১ সালে এই মিউজিয়াম থেকে ২২টি মমি ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ইজিপশিয়ান সিভিলাইজেশ্যনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আরো অনেক দ্রষ্টব্য গ্র‍্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়ামে স্থানান্তরিত করার কথা, যা ২০২৪-এ জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে যাঁরা মিশর যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁরা ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে এই প্রসঙ্গে কথা বলে নিতে পারেন।

    ট্যুর অপারেটরের কল্যাণে দেরি করে পৌঁছনোর কারণে আমাদের ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে ছুটে মিউজিয়ামের ঘরগুলি দেখতে হয়েছে, এবং বলাই বাহুল্য অনেক ঘর বাদও পড়ে গেছে। তবে তুত-আংখ-আমুনের ঘরটি দেখে চোখ সার্থক হয়ে গেছে। 'গোল্ডেন বয়'-এর সোনার ঝিলিক সত্যিই চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। মিউজিয়াম বন্ধ হওয়ার মুখে গার্ডের তাড়া খেয়ে দেখতে হলেও, যা দেখেছি কোনদিন ভুলব না। তবে জানি না কেন, এই ঘরটিতে ছবি তোলা বারণ।

    মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে আমরা স্টেশনে গেলাম। রাতে ট্রেন ধরে পরদিন সকালে আসওয়ান পৌঁছনোর পরিকল্পনা। মিশরের ট্রেন সম্বন্ধে যাঁরা কৌতূহলী তাঁদের জন্য বলে দিই, আমাদের ট্রেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছিল, এবং একেকটা কুপে দুটো করে বার্থ ছিল। বিছানা নরম এবং কম্বল দেওয়া হয়েছিল। ওপরে মালপত্র রাখার জায়গাও ছিল। তাছাড়া কুপে একটা বেসিন, আয়না, এবং দুটো করে তোয়ালে ও সাবান ছিল। কিন্তু কুপগুলো খুবই ছোট, আলো মিটমিটে এবং খাবার সুবিধার নয়। টয়লেটের হালত উল্লেখ করার যোগ্য নয়। তাছাড়া প্রত্যেকবার গাড়ি আস্তে বা জোরে হওয়ার আগে এমন ঝাঁকুনি দিচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। ট্যুর লিডার জানালেন এতো কিছুই না, একবার গাড়ি এমন ঝাঁকিয়েছিল তিনি নাকি বার্থ থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। আমার মতে, যদি সম্ভব হয় কায়রো থেকে আসওয়ান ফ্লাইটে যাওয়াই ভালো। এয়ার কায়রো বা ইজিপ্ট-এয়ারের ফ্লাইট ১ ঘন্টা ২০ মিনিটে পৌঁছে দেবে।

    আসওয়ান

    সারারাত ঝাঁকুনি খাওয়ার পর আমরা সকাল ৯টা নাগাদ ট্রেন থেকে নেমে ক্রুজ লাইনারে গিয়ে উঠলাম। আমাদের নাইল ক্রুজ আসওয়ান থেকে শুরু হয়ে লুক্সারে শেষ হয়েছিল। লাইনারটির নাম হাপি ৫ ওয়ালটন গ্রুপ নাইল ক্রুজ। এই লাইনারেই আমরা পরবর্তী তিন রাত ছিলাম। ব্যবস্থাপনা মন্দ নয়, তবে আরো অনেক বেশি বিলাসবহুল লাইনারও আছে। বিকেলের দিকে আমাদের আসওয়ান বাঁধ দেখতে নিয়ে যাওয়া হল। পথে দূর থেকে ফিলা-র আইসিসের মন্দির দেখতে পেলাম। এই মন্দিরটিও খুব সুন্দর বলে শুনেছি, কিন্তু আমাদের আইটিনেরারিতে ছিল না। তার পরিবর্তে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল এসেন্সের দোকান। অত্যধিক চড়া দামে আতর বিক্রি হয় এখানে। দলের কয়েকজন সদস্য সেই আতরই কিনে আমাদের সবাইকে বাঁচালেন, কারণ কিছু কেনাকাটা না হওয়া পর্যন্ত বাস সেখান থেকে নড়ত না।

    বাসে ওঠার পর আমাদের একটি নুবিয়ান গ্রাম দেখানোর প্রস্তাব দেওয়া হল। ভাড়া মাথাপিছু কুড়ি মার্কিন ডলার। ভাবলাম, মন্দ কি? এখানকার মানুষের বাড়িঘর, জীবনযাত্রা দেখাও তো একটা সুন্দর অভিজ্ঞতা। আমাদের গ্রুপের সবাই গ্রাম দেখতে রাজি হয়ে গেলেন। বাস থেকে নেমে আমরা মোটরবোটে উঠে পড়লাম। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে খুবই হতাশ হলাম। জায়গাটি আসলে একটি বিপণন কেন্দ্র – আফ্রিকার স্বর্গদ্বার বলতে পারেন। একটি রংচঙে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে চা খাওয়ানো হল, তারপর যে যেমন খুশি কেনো। সবটাই সাজানো গোছানো, বিদেশীদের মনোরঞ্জনের জন্য গড়া। এর জন্য কুড়ি ডলার খরচ করার কোন মানেই হয় না। কেনাকাটাই যদি উদ্দেশ্য হয়, কুড়ি ডলার হাতে থাকলে সারা মিশরে কেনার জায়গার অভাব হবে না। তবে পড়ন্ত সূর্যের আলোয় নীল নদের বুকে মোটরবোট রাইড মন্দ লাগেনি। পারে ফিরে ক্রুজ লাইনারে ডিনার সেরে শুয়ে পড়লাম – শেষরাতে উঠে লম্বা যাত্রা অপেক্ষা করে আছে।

    আবু সিম্বেল

    মিশরে আসার পর আমরা প্রথম যে মন্দিরটি দেখলাম তা হল আবু সিম্বেল। যাঁরা আগাথা ক্রিস্টির ডেথ অন দা নাইল পড়েছেন, তাঁরা আবু সিম্বেলের অমোঘ আকর্ষণ অগ্রাহ্য করতে পারবেন না। আমার মতে, ট্যুরে যদি আবু সিম্বেল অপশনাল থাকে, তাহলে আলাদা টাকা দিয়েও অবশ্যই দেখে আসবেন। আসওয়ান থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে, সুদান সীমান্তের কাছে মন্দিরদুটি অবস্থিত। বাস বা প্লেন দু'ভাবেই যাওয়া যায়। এক সময়ে নীল নদের তীরে এদের অবস্থান ছিল, কিন্তু আসওয়ান বাঁধ নির্মাণ করার ফলে লেক নাসের-এর সৃষ্টি হয়, যার ফলে আবু সিম্বেল সমেত নুবিয়ার ২২টি মন্দির জলে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। দেশের ঐতিহ্য বাঁচানোর তাগিদে মিশর সরকার মন্দিরগুলি স্থানান্তরিত করে। লেক নাসেরের থেকে খানিকটা উঁচুতে একটি নকল পাহাড় তৈরি করা হয়। তারপর আবু সিম্বেলের মন্দির দুটি টুকরো টুকরো করে কেটে আবার সেই পাহাড়ের গায়ে হুবহু বসিয়ে দেওয়া হয়।

    বড় মন্দিরটির দরজার দু'ধারে দ্বিতীয় রামেসিসের পর্বতপ্রমাণ চারটি মূর্তি দেখলে শিহরণ জাগে। ভেতরে আটটি ওসাইরিক পিলার এবং অনেক ছোট ছোট ঘর আছে, যার প্রত্যেকটি অপূর্ব দেওয়ালচিত্রে ঠাসা। দ্বিতীয় মুওয়াতাল্লির বিরুদ্ধে রামেসিসের কাদিশ 'বিজয়'গাথা মন্দিরের দেওয়ালের অনেকখানি অংশ জুড়ে আছে। মুল মন্দিরে বিগ্রহ চারটি – পিটাহ, আমুন রা, রা-হোরাখতি, এবং রামেসিস স্বয়ং। অক্টোবর ও ফেব্রুয়ারি মাসের দুটি বিশেষ দিনে সূর্যের আলো সরাসরি এসে পিটাহ ছাড়া (পিটাহ পাতাল সম্পর্কিত দেবতা, অন্ধকারেই থাকেন) অন্য তিন বিগ্রহের মুখের ওপর পড়ে। এই দুই দিনে তাই এই মন্দিরে দর্শনার্থীর ভিড় উপচে পড়ে।

    রামাসিসের মন্দিরের পাশেই তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী নেফারতারির (নেফারতিতি নন) মন্দির। এই মন্দিরে নেফারতারিকে দেবী হাথরের প্রতিমূর্তি হিসাবে কল্পনা করা হয়েছে। দরজার দু'ধারে রামেসিস এবং নেফারতারির বিশাল মূর্তি আছে – উল্লেখ্য হল, নেফারতারির উচ্চতা রামেসিসের সঙ্গে সমান, রামেসিসের হাঁটুর কাছে নয়। প্রাচীন মিশরের ইতিহাসে এটি বিরল দৃষ্টান্ত। এই মন্দিরটি অপেক্ষাকৃত ছোট, কিন্তু দেওয়ালচিত্রের সৌন্দর্য অন্য মন্দিরটিকে হার মানায়। ওসাইরিক পিলারের পরিবর্তে এখানে হাথরিক পিলার দেখতে পাওয়া যায়।


    আবু সিম্বেলের প্রবেশপথ

    ভোর চারটের সময় বেরিয়ে আবু সিম্বেল দেখে মাইলের পর মাইল মরুভূমি পেরিয়ে দুপুর আড়াইটে নাগাদ আমরা ক্রুজে ফিরলাম। সঙ্গে দেওয়া প্যাকড ব্রেকফাস্ট (নানান ধরনের হিমঠান্ডা পাঁউরুটি) দেখে ভক্তি হয়নি (যাঁরা খেয়েছিলেন সবার শরীর খারাপ হয়েছিল)। ভারত থেকে নিয়ে আসা ব্রেকফাস্ট বার হেঁটে হেঁটেই হজম হয়ে গেছে। সারা রাস্তা চোখের সামনে ক্যাডবেরি আর চিপসের প্যাকেট ভাসতে ভাসতে এসেছে। ক্রুজে ঢুকেই আমরা লাঞ্চে বসে গেলাম, আর ক্রুজও নীল নদের বুকে রওনা দিল। হয়তো আমাদেরই ফেরার অপেক্ষা ছিল। ধকলের ফলে আমরা ঘরে ঢুকেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, যার ফলে বিকেলে কোম ওম্বো-এ সোবেকের মন্দির দেখতে যেতে পারিনি। ছবিতে দেখলাম এই মন্দিরটিও খুবই সুন্দর, না দেখার আফসোস রয়ে গেল। রাতে ক্রুজের অখাদ্য বুফে (প্রতিদিন আমাদের প্রায় একই স্বাদের খাবার দেওয়া হত, এবং অমলেটের ভেতরের অংশ কাঁচা থাকত) খেয়ে আমরা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম, কারণ তার পরের দিন ভোর পাঁচটায় আমাদের এডফু-র হোরাসের মন্দির দেখতে যাওয়ার কথা।

    এডফু

    এডফু যাওয়ার জন্য আমাদের ট্যুর লিডার ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা করেছিলেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও চড়তে হল। পশুপ্রেমীরা গাড়ি করেও মন্দিরে যেতে পারেন। এডফুর মন্দিরের বৈশিষ্ট্য হল, এটি প্রায় অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল, তাই প্রাচীন মিশরীয় মন্দির কেমন দেখতে ছিল সে ব্যাপারে একটি স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করতে সাহায্য করে। মন্দিরে ঢোকার মুখেই ঈগলরূপী হোরাসের দুটি বিশাল মূর্তি আছে। ভেতরে আরো দুটি মূর্তি আছে। দেওয়ালের কারুকার্য দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। কথিত যে দেবতা ওসাইরিসের ভাই সেথ তাঁকে হিংসা করে চোদ্দ টুকরো করে নীলনদে ভাসিয়ে দেন। ওসাইরিসের স্ত্রী আইসিস তাঁকে পুনর্জীবিত করেন, এবং মৃত ওসাইরিস পাতালে প্রবেশ করার আগে তিনি গর্ভধারণ করেন। সেই থেকে হোরাসের জন্ম হয়। হোরাস এবং আইসিস এডফুর মন্দিরে বাস করেন, এবং যথাসময়ে হোরাস সেথকে যুদ্ধে হারিয়ে জলহস্তী বানিয়ে দেন। মন্দিরের দেওয়ালের গায়ে এইসব পৌরাণিক দৃশ্য খোদাই করা আছে বলে আমাদের গাইড দেখালেন। মন্দিরের ছাদে ওঠার আর নামার সিঁড়ি আলাদা – ওঠার সিঁড়ি আঁকাবাঁকা আর নামার সিঁড়ি সোজা। এটি নাকি ঈগলপাখির ওড়ার আদলে তৈরি করা হয়েছে। মূল মন্দিরে রাখা হোরাসের সোনার মূর্তি এবং নৌকো (প্রাচীন মিশরের দেবদেবীর শোভাযাত্রা বেরনোর সময় তাঁদের নৌকোর আদলে তৈরি বিশিষ্ট রথে নিয়ে যাওয়া হত) এখন প্যারিসের লুভ মিউজিয়ামে আছে। নৌকোর একটি প্রতিকৃতি এই মন্দিরে রাখা আছে।

    এডফু থেকে ফেরার পর শুনলাম আমাদের ক্রুজ লাইনার এসনা শহরের লক গেট পেরবে। এটি নাকি দেখার মতো দৃশ্য। আমরা সবাই তা দেখার জন্য ডেকে উঠে অনেকক্ষণ রোদ মাথায় করে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিন্তু নৌকো নড়ল না। শেষে বিরক্ত হয়ে যে যার ঘরে চলে গেলাম। পরে জানতে পারলাম লক খুলতে নাকি আট ঘন্টা দেরি হয়েছিল।


    এডফু মন্দির

    লুক্সার

    এসনা গেট পেরিয়ে অবশেষে ক্রুজ লাইনার লুক্সারে এসে নোঙর ফেলল। লুক্সার থেকে হট এয়ার বেলুনে চড়ে নীল নদ আর ভ্যালি অব কিংস দেখা যায়। 'সানরাইজ বেলুনে' চড়ে সূর্যোদয় দেখতে হলে ভোর চারটের মধ্যে অকুস্থলে চলে যেতে হয়। বেলুন চড়ার জন্য আমাদের বেলায় মাথাপিছু একশ মার্কিন ডলার লেগেছিল। বেলুন থেকে দৃশ্য সুন্দর হলেও অসাধারণ কিছু নয়। তবে অভিজ্ঞতার খাতিরে ঘুরে আসতে পারেন। বেলুন রাইড থেকে ফিরে এসে লাইনারে প্রাতরাশ সেরে নিয়ে আমরা বাসে উঠলাম। অবশেষে ভ্যালি অব কিংস দেখতে চলেছি, যা এতদিন শুধু ইতিহাসের বইয়ের পাতা, বিবিসির ডকুমেন্টারি আর গুগলের ছবিতেই দেখেছি। মনের মধ্যে যে উত্তেজনা হচ্ছিল তা ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়। যেহেতু কবরগুলির মধ্যে গাইডের প্রবেশ নিষেধ, তাই বাসের মধ্যেই আহমেদ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দেওয়ালচিত্র ও তাদের অর্থ বুঝিয়ে দিলেন। বাইরের প্রকৃতি দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। চারিদিকে সোনালী রুক্ষ পাহাড় নৈর্ব্যক্তিক গাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার মাঝে কবরে ঢোকার পথ – কিছু আসল, কিছু শুধুই ডাকাতদের পথ ভোলানোর জন্যে।

    আমাদের তুত-আংখ-আমুন সমেত চারটি কবরে ঢোকার অনুমতি ছিল। আমার পরামর্শ হল, এরকম টিকিট থাকলে অবশ্যই সবার আগে কে ভি ৬২ বা তুত-আংখ-আমুনের কবরটি দেখে নেবেন। এই কবরের প্রবেশপথ বেশ সহজ, এবং ভেতরের দেওয়ালচিত্র অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তাছাড়া তুতের মমি দেখার অভিজ্ঞতা তো আছেই। তুত ছাড়াও আমরা কে ভি ২ (চতুর্থ রামেসিসের কবর) দেখলাম। এই কবরটির দেওয়াল ও ছাদের চিত্রাবলী অত্যন্ত সুন্দর এবং গভীর অর্থবহ। কবরে ঢোকার পথও কঠিন না। তবে মেরনেপ্টাহের কবর (কে ভি ৮) অত্যন্ত গভীর। খাড়া সিঁড়ি বহুদূর নেমে গেছে। ক্লস্ট্রফোবিয়া বা হার্টের সমস্যা থাকলে না যাওয়াই ভালো। সম্ভব হলে আলাদা টিকিট কেটে সেতির কবর (কে ভি ১৭) এবং নবম রামেসিসের (কে ভি ৬) কবর দেখে আসতে পারেন। তাছাড়া ভ্যালি অব কুইনসে নেফারতারির কবরও শুনেছি খুব সুন্দর। এই কবরগুলি দেখার জন্য বাড়তি টাকা খরচ হলেও তা সম্পূর্ণ ন্যায্য।


    তুতের কবরে দেওয়ালচিত্র

    ঐতিহাসিক এই জায়গাটিতে আরো কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু ট্যুর লিডারের সমস্ত তাড়া শুধু দ্রষ্টব্য দেখার সময়ে। দোকান বাজারে ঘোরার বেলায় অফুরন্ত সময়। বিরক্তি চেপে তাই বাসে উঠে পড়তে বাধ্য হলাম।

    ভ্যালি অব কিংসের দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে আমরা রানী হাটশেপসুটের মন্দিরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। মিশরের হাতেগোনা মহিলা ফারাওদের অন্যতম রানী হাটশেপসুট মৃত্যুর পরে নিজের রাজত্বকালকে অমর করে রাখার জন্য এই মন্দিরটি নির্মাণ করিয়েছিলেন। মূল মন্দিরে সূর্যের দেবতা আমুন-রার নৌকো রাখা ছিল, তাছাড়া আলাদা করে হাথর এবং আনুবিসের মন্দিরও আছে। মন্দিরটি প্রাচীন মিশরীয় স্থাপত্যশৈলীর এক অনবদ্য নিদর্শন, এবং চাঁদিফাটা রোদে অসংখ্য সিঁড়ি বেয়ে উঠে তিনটি তলা দেখতে বেশ পরিশ্রম হলেও, তা কখনোই পণ্ডশ্রম বলে মনে হয় না। আফসোস একটাই – হাটশেপসুটের মৃত্যুর কুড়ি বছর পরে তাঁর সৎ ছেলে তৃতীয় থুতমোসে (বা তাঁর ছেলে দ্বিতীয় আমেনহোটেপ) তাঁর অনেক প্রতিকৃতি নষ্ট করে দেন। তাই রানীর সব মূর্তি দেখা গেল না। মন্দির থেকে বেরিয়ে আরেক কাণ্ড। প্রায় আধ ঘণ্টা যাবৎ বাসে বসে আছি তবু বাস আর ছাড়ে না। শেষমেশ প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে আহমেদ আর আমাদের ট্যুর লিডার এসে বাসে উঠলেন। জানা গেল আমাদের দলের এক সদস্য পরিবার একটি দোকানে অনেকক্ষণ গল্প ও দরদাম করে তারপর কিছু না কিনে চলে যান। ক্ষুব্ধ দোকানদার তাঁদের গালমন্দ শুরু করেন। আহমেদ তাঁদের হয়ে বলতে গেলে দু'জনের মধ্যে ঝগড়া থেকে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। শেষটায় পুলিশ এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়। এই ঘটনার উল্লেখ করার কারণ – মিশরীয়রা এমনিতে মিশুক এবং অতিথিবৎসল। কিন্তু কোন দোকানে যদি কিছু কেনার ইচ্ছা না থাকে বা দোনোমোনোও করেন, তাহলে বেশি কথা বাড়িয়ে দোকানদারের সময় নষ্ট করবেন না। এতে ওঁরা ক্ষুব্ধ হন।

    হাটশেপসুটের মন্দির দেখিয়ে ট্যুর লিডার আমাদের আলাবাস্টর পাথরের একটি দোকানে নিয়ে গেলেন। জয়সলমীরের 'সোনার পাথরবাটির' সঙ্গে এই দোকানের পণ্যের অনেক মিল আছে। তবে দাম যথেষ্ট। যথারীতি কিছু বিক্রিবাটা না হওয়া পর্যন্ত বাস ছাড়া হল না। তারপর পথের ধারের একটি নিম্নমানের দোকানে মধ্যাহ্নভোজ সেরে আমাদের 'ফেলুকা' নৌকো চড়ানো হল। ফেলুকা হল যাকে আমরা বলি পালতোলা নৌকো। কিন্তু এই নৌকো পালে হাওয়া লেগে চলে না, একটি মোটরবোটের সঙ্গে বাঁধা থাকে, সেটিই টেনে নিয়ে যায়।

    ফেলুকা চড়ে নদী পার করে আমাদের হাঁটিয়ে কার্নাক মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হল। তখন প্রায় বিকেল সাড়ে চারটে। সারাদিন রোদে হেঁটে শরীর অবসন্ন। তা বলে কার্নাক না দেখে তো বসে থাকা যায় না। এখানে ছোট করে বলে রাখি, কার্নাক মন্দির মোটের ওপর চারটি অংশে বিভক্ত। তার মধ্যে আমুন-রার প্রিসিংক্ট এবং দেবী মুটের প্রিসিংক্ট জনসাধারণের জন্য খোলা আছে। বাকি দুটি (মন্টুর প্রিসিংক্ট এবং আখেন-আতেনের মন্দির) বন্ধ আছে বলে শুনেছি।


    কার্নাক মন্দিরের পিলার

    ভেড়া রূপী আমুন-রার মূর্তির সারি পেরিয়ে বিশ্ববিখ্যাত হিপোস্টাইল হলের পিলারগুলির নীচ দিয়ে হাঁটার সময় মনে হয় হাজার হাজার বছর আগের কোন এক যুগে পৌঁছে গেছি। তৃতীয় রামেসিসের মন্দির, দ্বিতীয় রামেসিসের বিশাল দুটি মূর্তি, হাটশেপসুটের ওবেলিস্ক, কী ছেড়ে কী দেখব বুঝতে পারছি না। ইতিমধ্যে সাইনবোর্ডে দেখতে পেলাম কার্নাকের বিখ্যাত 'অ্যাভিনিউ অব স্ফিংক্স'। ব্যাস, সমস্ত ক্লান্তি ভুলে পড়িমরি করে সেই দিকে ছুটলাম। কিন্তু কপাল মন্দ, বিকেল পাঁচটায় সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। (পরে লুক্সার মন্দিরের অ্যাভিনিউ অব স্ফিংক্স দেখতে পেয়েছি, কিন্তু কার্নাকের দিকের স্ফিংক্স আর দেখা হয়নি)। বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে দেখি চারিদিক শুনশান। আগ্রহের আতিশয্যে কখন যেন আমি দলছুট হয়ে গেছি। সত্যি বলতে একটু টেনশনেই পড়ে গেলাম। বাস ছেড়ে দিলে আমার হোটেলে পৌঁছনোর কোন উপায় নেই – কারণ আমি হোটেলের নাম জানি না। যাই হোক, খানিক খোঁজাখুঁজি করে দলের কয়েকজন সদস্যকে দেখতে পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। বাকিরা যাঁরা ট্যুর গাইডের সঙ্গে ছিলেন তাঁরাও এসে পড়লেন, এবং জানালেন যে দেরি করে পৌঁছনোর কারণে তাঁরা তৃতীয় থুতমোসের মন্দির এবং সেক্রেড লেক দেখতে পাননি। যাই হোক, মনে মনে ট্যুর লিডারের চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করতে করতে বাসে উঠলাম এবং হোটেলে চেক ইন করলাম। হোটেলের নাম স্টাইগেনবার্গার রেসর্ট আখতি। খুবই ভালো হোটেল, কিন্তু আমরা বেশিক্ষণ থাকতে পারিনি। অনতিকাল পরেই আমাদের লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো দেখতে যাওয়ার ডাক পড়ল। পথে লুক্সার মন্দির দেখানো হল – সেও মন্দির বন্ধ হওয়ার পনের মিনিট আগে। লুক্সার মন্দির মূলত প্রাচীন মিশরে রাজতন্ত্র ফিরে আসার উপলক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছিল, এবং সম্ভবত ফারাওদের এখানে রাজ্যাভিষেক করা হত। মন্দিরের দরজায় দ্বিতীয় রামেসিসের দুটি প্রকাণ্ড মূর্তি আছে, যা মিশরে ব্যাগ, ছাতা, স্কার্ফ, রুমাল সর্বত্র ছাপা থাকে। ভেতরে তুত-আংখ-আমুন ও তাঁর স্ত্রী আংখেস-আন-আমুনের মূর্তি এবং রোমান ধাঁচের কলোনেড আছে, যা অত্যন্ত সুন্দর। ঊর্ধ্বশ্বাসে সবকিছু দেখতে দেখতেই মন্দির বন্ধ হয়ে গেল। কার্নাক মন্দিরে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো দেখে দিনটি শেষ করলাম। সেই সঙ্গে আমাদের গাইড আহমেদও বিদায় নিলেন। ফায়ুম থেকে অন্য গাইড আমাদের সঙ্গে যাবেন।


    লুক্সার মন্দিরের কলোনেড

    এখানে আমার কিছু উপলব্ধির কথা বলি। ভ্যালি অব কিংস, হাটশেপসুটের মন্দির, কার্নাক এবং লুক্সার মন্দির প্রত্যেকটি মিশরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য। সবগুলি লুক্সার থেকে দেখতে যেতে হয়। কাজেই, যদি মিশরে যাওয়ার কোন পরিকল্পনা থাকে, তাহলে অবশ্যই লুক্সারে দু'রাত থাকবেন। কোন এজেন্টের সঙ্গে গেলে তাদের জিজ্ঞাসা করে নেবেন, এই জায়গাগুলি তারা কিভাবে দেখাবে। কারণ এতগুলি জায়গা একসঙ্গে ঘোরা অমানুষিক ক্লান্তিকর শুধু নয়, মন্দির বন্ধ হওয়ার দশ-পনের মিনিট আগে ঢুকে কিছু দেখার বা বোঝারও সময় থাকে না। তাই হাতে যথেষ্ট সময় না রেখে শুধু 'আইটিনেরারি শেষ করব' বলে যারা আস্ফালন করে সেইসব ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে না যাওয়াই ভালো।

    আল ফায়ুম

    আবার আমাদের বেড়ানোর প্রসঙ্গে ফিরে আসি। রাত ন'টায় হোটেলে ঢুকে গায়ের ব্যথা মরার আগেই ভোর ছ'টায় আমরা লুক্সার এয়ারপোর্টের দিকে রওনা হলাম। এবার প্লেন ধরে কায়রো ফেরত। লুক্সার এয়ারপোর্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানের। তিনটি পর্যায়ে চেকিং হয়, যার মধ্যে একবার মোবাইল ল্যাপটপ তো বটেই, এমনকি চশমা, ঘড়ি, বেল্ট, জুতো সবই খুলে ট্রে-তে রেখে দিতে হয়। একথা মাথায় রেখে একটু সময় হাতে করে বেরলে ফ্লাইট মিস হবে না। প্লেন যথাসময়ে কায়রো এসে পৌঁছে গেল এবং আমরা বাসে উঠে আল ফায়ুমের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। ফায়ুম কায়রোর কাছাকাছি একটি মরুদ্যান। এক সময়ে এটি একটি রাজ্যের রাজধানীও ছিল। বাসে নিরাপত্তা রক্ষী আছেন দেখে বুঝলাম পথ সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।

    লুক্সার দেখার ক্লান্তি তখনো কাটেনি, নিজের অজান্তেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি। চোখ খুলে দেখি একি! কোথায় বালি আর রুক্ষ প্রান্তর? এতো প্রকাণ্ড লেক বা খাড়ির মতো কিছু! পারে ছোট ছোট ঢেউ ভাঙছে। নীলনদ বলে মনে হল না। নতুন লোকাল গাইড সারাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম এটি বির্কেট কারুন নামে একটি প্রাচীন জলাশয়। দেখে অপূর্ব লাগল। ফায়ুমে আমরা কোম এল ডিক্কা নামক একটি হোটেলে উঠেছিলাম। আফ্রিকার গ্রামীণ বাড়ির ধাঁচে তৈরি এই হোটেলের সঙ্গে 'বেদিক ভিলেজের' খানিকটা মিল আছে। সবুজ লনে বসে প্রাকৃতিক পরিবেশে গল্পগুজব করে সন্ধেটা কাটিয়ে দিলাম।

    পরদিন সকালে প্রাতরাশ সেরে আমরা 'ডেসার্ট সাফারি'তে বেরলাম। ডেসার্ট সাফারি বলতে পুলিশের গাড়ি সমেত অনেকগুলি ফোর-হুইল গাড়ি পর্যটকদের সাহারা মরুভূমির অভ্যন্তরে নিয়ে যায়। পথে বালিয়াড়ি বা স্যান্ড ডিউনের ওপর, কখনো পাশ দিয়ে খেলা দেখানোর কায়দায় গাড়ি চলে, অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে রেষারেষি করে, যা খুবই রোমাঞ্চকর। গন্তব্য হল ওয়াদি-এল-হিতান, বা 'তিমি মাছের উপত্যকা'। অতি প্রাচীনকালে যখন সাহারা মরুভূমি সমুদ্র ছিল, তখন এখানে থাকা তিমি মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর ফসিল এখনো বালির মধ্যে ছড়ানো ছিটনো আছে। একটি মিউজিয়ামও আছে, যা দেখতে চমৎকার লাগে।


    তিমি মাছের মিউজিয়াম

    রোদের মধ্যে সাহারা মরুভূমিতে হাঁটাচলা করা একটু কষ্টকর, কিন্তু ছায়ার নীচে পরিবেশ মনোরম। ওখানেরই একটি ছোট রেস্টুরেন্টে আমরা ভাত আর আলু-পটলের ঝোল দিয়ে দারুণ মধ্যাহ্নভোজ সারলাম। খাওয়দাওয়া শেষ করে আমাদের একটি জায়গায় স্যান্ড স্কেটিং করতে নিয়ে যাওয়া হল, কিন্তু সবাই আনাড়ি হওয়ায় ব্যাপারটা জমল না। সাফারি শেষ করে আল ফায়ুমে আমাদের হোটেল থেকে বাসে উঠে আবার কায়রোর দিকে রওনা হলাম। পথে কয়েকজন সদস্য লেকের ধারে বেড়ানোর বায়না করেছিলেন, কিন্তু নিরাপত্তার কারণে তা সম্ভব হল না। সে কথা জেনে তাঁরা সন্তুষ্ট হলেন না মোটেই, বাকি রাস্তা মুখ বোদা করে রইলেন। ফায়ুমের পথ শেষ করে গাড়ি কায়রোয় প্রবেশ করল প্রায় সাড়ে ছ'টায়। ট্যুর লিডার জানালেন এবার আমরা পাঁচশ বছরের পুরনো বিখ্যাত খান-এ-খালিলি বাজারে যাব। আমরা কয়েকজন মৃদু প্রতিবাদ তুললাম – সারাদিন জার্নি করে শরীর অবসন্ন, পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে। এই অবস্থায় বাজার দেখার ইচ্ছা বা দরদাম করার উৎসাহ কোনটাই থাকে না (বিশেষত খালিলি বাজারে, যেখানে সাংঘাতিক দরদাম হয়)। তাই আমরা আবেদন করলাম, আমাদের হোটেলে পৌঁছে দিয়ে বাকিদের খালিলি বাজারে নিয়ে যাওয়া যায় না? ট্যুর লিডার সে কথায় কর্ণপাতই করলেন না। বাস ছুটল খালিলি বাজারের দিকে। বাজারে পৌঁছে দেখি হা হতোস্মি! কিছু একটা উৎসব আছে তাই নিরাপত্তার খাতিরে পর্যটকবাহী বাস সেখানে দাঁড়াতে দেওয়া হচ্ছে না। ট্যুর লিডার ঘোষণা করলেন, আলেকজান্দ্রিয়া থেকে ফেরার পথে বাজার ঘোরানো হবে।

    লেকের ধারে যাঁরা হাঁটতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন এবার তাঁরা ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। “শপিং করাবেন না মানে? এতদিন ধরে শপিং করাব শপিং করাব বলে এখন পালটি খাচ্ছেন?” (যদিও তাঁরা সর্বত্র শপিং করে আমাদের অনেকবার দেরি করিয়েছেন।) ট্যুর লিডার একটু আমতা আমতা করার পর নিরাপত্তা রক্ষীর পরামর্শ অগ্রাহ্য করে তাঁদের কথায় বাস থামাতে রাজি হলেন, এবং আমরা যারা নামতে অনিচ্ছুক ছিলাম তাদেরও বাস থেকে একরকম টেনে নামালেন। নিরাপত্তার কারণে আমরা বাজারে বেশিদূর যাইনি। আশপাশের দোকানে কিছু কেনাকাটা করে একটি ক্যাফেতে ঠান্ডা পানীয় আর সুস্বাদু বেগুন ভাজা খেয়ে সময় কাটালাম। প্রায় রাত ন'টার সময়ে ক্রেতার দল প্লাস্টিকের থলি হাতে বিজয়ীর হাসি হাসতে হাসতে ফিরলেন। শপিং শেষ। এবার বাস আসার অপেক্ষা। কিন্তু বাস কোথায়? আগেই লিখেছি, উৎসবের কারণে ওই অঞ্চলে গাড়িঘোড়া দাঁড় করানোর বিশেষ অসুবিধা ছিল। আমরা সবাই প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে বাসের অপেক্ষায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। যাঁরা বয়স্ক বা ডায়বিটিক তাঁদের ততক্ষণে প্রায় ক্ষুৎপিপাসায় প্রাণ ওষ্ঠাগত। এক ভদ্রমহিলা সবাইকে বিস্কিট ভাগ করে দিলেন – নিরাপত্তা কর্মীও একটি বিস্কিট চেয়ে খেলেন। আমরা দলের সদস্যদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং স্বার্থপরতার জন্য তাঁর কাছে ক্ষমা চাইলাম। ভারতীয়দের সম্পর্কে তাঁর কী ধারণা হল ভাবলেও মাথা হেঁট হয়ে যায়। যাই হোক, অবশেষে রাত সাড়ে ন'টায় বাস এল এবং আমরা রাত দশটার পরে হোটেলে ঢুকলাম। পরদিন সকালেই আবার চেক আউট করে আলেকজান্দ্রিয়া।

    আলেকজান্দ্রিয়া

    আমাদের ট্যুর লিডারের মতে আলেকজান্দ্রিয়া শহরটার নাকি গ্রীসের সঙ্গে অনেক মিল আছে। গ্রীসে যাইনি, তাই সঠিক বলতে পারব না, কিন্তু ছবিতে যেটুকু দেখেছি তার সঙ্গে কোনই মিল পাইনি। বরং মুম্বাইয়ের সঙ্গে খানিকটা সাদৃশ্য চোখে পড়ল, তবে আরো মলিন। ভূমধ্যসাগরের জল কিন্তু খুব স্বচ্ছ, নীল-সবুজের অনেকরকম শেড দেখতে পাওয়া যায়। তবে বীচের সবটা জনসাধারণের জন্য খোলা নয়।

    এখানে এসে আমরা প্রথমেই আবু-আল-আব্বাস-আল-মুরসি মসজিদ দেখলাম। মসজিদের স্থাপত্যশৈলী প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মিশ্রণে বেশ নজর কাড়ে। ভেতরের পরিবেশ শান্ত ও সৌম্য। মসজিদ দেখা হলে আমরা বিবলিওথেকা আলেকজান্দ্রিনা, বা বর্তমান আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি দেখতে গেলাম। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম লাইব্রেরি, এবং প্রায় সমস্ত বিষয়ের ওপরেই নানা ভাষার বই আছে। ভেতরে ঢুকে দেখতে ভালো লাগে, তবে এর ফলে হয়তো শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের অসুবিধাই হয়। এই দুটি দ্রষ্টব্য দেখার পর আমরা জুয়েল সান স্টেফানো হোটেলে উঠলাম, এবং সন্ধেটা যে যার মতো কাটালাম।

    ট্যুরের শেষ দিনে আমরা আলেকজান্দ্রিয়ার ক্যাটাকম্ব (কম এল শোকাফা) আর পম্পেই পিলার দেখলাম। ক্যাটাকম্ব দেখে বেশ ভালো লাগল। যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে ইজিপশিয়ান স্থাপত্য এবং ধর্মে কিভাবে রোম ও গ্রীসের প্রভাব পড়েছিল, এই ক্যাটাকম্ব দেখলে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। এখানে এপিস বা সেরাপিস ওসাইরিসের জায়গা নিয়েছেন, এবং তিনিই আইসিসের স্বামী। দেব-দেবীদের আকার এবং চুল বাঁধার কায়দাও আলাদা। দেওয়ালে রং করা একটি কবরও আছে। কার কবর জানা যায় না, টিগ্রান বলে একটি রাস্তায় এটি পাওয়া গেছে বলে 'টিগ্রান টুম্ব' বলেই উল্লেখ করা হয়। ক্যাটাকম্বের তিনটি লেভেল আছে। যথারীতি ট্যুর লিডারের তাড়ার ফলে প্রথম লেভেলটি দেখেই আমাদের ফেরত আসতে হল। সবার শেষে আমরা গেলাম পম্পেই পিলার। জুলিয়াস সিজারের মন্ত্রী পম্পেইয়ের নামে পিলারটি খ্যাত হলেও আসলে এটি রোমের সম্রাট ডায়োক্লিটিয়ানের বিজয়স্তম্ভ, এবং এককালে তাঁর প্রকাণ্ড মূর্তিকে ধরে রেখেছিল। এই জায়গায় সেরাপিসের মন্দিরও ছিল, যা পুরাকালেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়। মন্দিরের কিছু ভাঙা থাম ও মূর্তি আজও এখানে রাখা আছে। পিলারটি আরো একটা কারণে আমার কাছে আকর্ষণীয়। সারা মিশরের মধ্যে একমাত্র এখানেই রানী ক্লিওপেট্রার কোন উল্লেখ পাওয়া যায়। জুলিয়াস সিজারের আক্রমণের ফলে আলেকজান্দ্রিয়ার প্রাচীন লাইব্রেরি পুড়ে যাওয়ায় রানী ক্লিওপেট্রা খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে মার্ক অ্যান্টনি তাঁর জন্য আরেকটি লাইব্রেরি তৈরি করে দেন। সেই লাইব্রেরি এখন পম্পেই পিলারের নীচে আছে। বলা বাহুল্য যে প্রাচীন বইপত্র কিছুই সেখানে অবশিষ্ট নেই, তবে যে তাকগুলিতে বই রাখা থাকত সেগুলি এখনো দেখতে পাওয়া যায়। বাকিটা মানসচক্ষে কল্পনা করে নিলেই হল।

    এবার বাড়ি ফেরার পালা। আলেকজান্দ্রিয়া থেকে কায়রো, কায়রো থেকে মুম্বাই, এবং মুম্বাই থেকে এই অসাধারণ দেশটির মধুর স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে আবার কোলকাতায়।

    ভ্রমণকাহিনী শেষ করার আগে যাঁরা মিশর যেতে উৎসাহী তাঁদের জন্য কিছু টিপস দিয়ে দিই।

    প্রাচীন মিশরের স্থাপত্যগুলির বৈশিষ্ট্য হল, সেখানে প্রচুর সিঁড়ি আছে, এবং যথেষ্ট পরিমাণে হাঁটতে হয়। কাজেই, “ইজিপ্ট বুড়োদের জায়গা” বলে বসে থাকবেন না। যদি দেখার ইচ্ছে থাকে, শরীর সুস্থ থাকতে থাকতে ঘুরে আসুন।

    ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যদি ঘুরতে চান, তাহলে তারা কোন কোন জায়গা দেখাবে, বিশেষত মিউজিয়াম, লুক্সার ইত্যাদি কীভাবে দেখাবে তা ভালো করে জেনে নিন। তাছাড়া, সকলের খাওয়া-থাকার একটি মান - যাকে বলে স্ট্যান্ডার্ড অব লিভিং থাকে। ট্যুর অপারেটরের মানের সঙ্গে তার অনেকটা তফাৎ হয়ে গেলে বেরানোর অভিজ্ঞতা সুখকর হয় না। এসব দেখে ট্যুর অপারেটর নির্বাচন করাই ভালো।

    দলের সঙ্গে বেড়াতে গেলে দলছুট না হওয়ার চেষ্টা করবেন, এবং অচেনা কেউ ছবি তুলে দিতে চাইলে রাজি হবেন না। সাধারণত মিশরীয়রা খুব অতিথিবৎসল, কিন্তু কয়েকজন অসৎ ব্যক্তি ছবি তোলার অছিলায় আপনার ফোন নিয়ে, ফোন ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে টাকা চাইতে পারে। এ বিষয়ে একটু সতর্ক থাকাই ভালো।

    ট্যুর অপারেটর যদি বলে মিশরে ভালো খাবার পাওয়া যায় না, জানবেন তা সর্বৈব মিথ্যা। হয়তো ট্যুর অপারেটর যে টাকা দিচ্ছে তাতে ওই খাবারই জোটে। আর্থিক সমস্যা না থাকলে ঘরের মেনু দেখে খাবার অর্ডার করে দিতে পারেন। মিশরের প্রায় সমস্ত ভালো হোটেলে সুস্বাদু ও আন্তর্জাতিক মানের আমিষ/নিরামিষ খাবার পাওয়া যায়।

    মিশরে জলের একটু সমস্যা আছে। ইউরোপের মতো এখানে কলের জল খাওয়া যায় না। জল কিনে খেতে হয়। তাছাড়া হোটেলের ঘরেও জল দেওয়া হয় (কিন্তু খাবার ঘরে জল দেওয়া হয় না – কিনতে হয়)। ট্যুর লিডার দিনে কত লিটার জল সরবরাহ করবে, এবং আপনাকে কত টাকার জল কিনতে হবে সে বিষয়ে বুকিংএর সময়েই খোলাখুলি আলোচনা করে নেবেন।

    অধিকাংশ জায়গার ভালো পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করার জন্য দশ ইজিপশিয়ান পাউন্ড ভাড়া লাগে। সারাদিনে অনেক ঘন্টার পথ যাত্রা করতে হয়, তাই পাবলিক টয়লেট ব্যবহার না করে উপায় থাকে না। কোন কোন টয়লেটে টিস্যু পেপারও থাকে না। এসব কথা, বিশেষ করে মহিলাদের, মাথায় রেখে সেই অনুযায়ী প্ল্যান করাই ভালো।

    মিশরে যাওয়ার জন্য কোভিডের টীকাকরণ জরুরি। এছাড়া টিটেনাস, টাইফয়েড, ইনফ্লুয়েঞ্জা বা অন্য কোন টীকা নেবেন কি না সে বিষয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিতে পারেন। তাছাড়া, মিশরে কি কি ওষুধ নিয়ে প্রবেশ করতে হলে ডাক্তারের সার্টিফিকেট লাগে তাও আগে থেকে জেনে নেওয়া ভালো।

    অনেকে যুদ্ধ নিয়ে আশংকিত হচ্ছেন। মিশরের বর্তমান পরিস্থিতি জানা নেই, কিন্তু আমরা যে সময়ে ঘুরছিলাম (১-১২ নভেম্বর) যুদ্ধের কোন আভাস পাইনি। সবকিছু স্বাভাবিক ছিল।



    অলংকরণ (Artwork) : লেখক
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)