• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৩ | জানুয়ারি ২০২৪ | গল্প
    Share
  • বাদলদার ঠিকানা : অনিরুদ্ধ সেন

    (১)

    দরজায় টোকা। কে? রাত ন'টা, শ্রীলা ফ্ল্যাটে একা। তবে সোসাইটির সিকিউরিটি খুব কড়া, তাই নির্ভয়ে দরজা খুলল। সামনে হাসিমুখ এক প্রৌঢ়। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর শ্রীলা অবাক বিস্ময়ে বলে উঠল, "বাদলদা!"

    "চিনেছিস তাহলে! ভেতরে আসতে বলবি না?"

    "হ্যাঁ হ্যাঁ, এস।" সলজ্জ শ্রীলা দরজা ছেড়ে দাঁড়াল।

    "আমার ঠিকানা কীভাবে পেলে?"

    "কে দিল? মনে পড়ছে না। এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম একবার –"

    "খুব ভালো করেছ। তোমার লাগেজ?"

    "লাগেজ, কেন? আমি স্রেফ একটা রাত থাকব, কাল সকালে চলে যাব।"

    "সে কী, অ্যাদ্দিন পর –"

    "না রে, উপায় নেই। তা একবার তো ঘুরে গেলাম, পরে আবার দেখা যাবে।"

    "তোমার জামাপ্যান্ট দেখছি শুকনো। গাড়িতে এলে বুঝি? একটু আগে যা ঝড়বৃষ্টি হয়ে গেল!"

    "ঐ, ঠিক সময়ে ঠিক শেলটারে ঢুকে পড়েছিলাম। তুই তো জানিস, এ ব্যাপারে আমার ইনটিউশন –"

    শ্রীলা জানে। কিন্তু কথাটা এড়িয়ে বলল, "চলো, বাথরুমে গিয়ে হাত-পা ধুয়ে নেবে, তারপর ডিনার।"

    "বাথরুমে যাচ্ছি। তবে আমি খেয়ে এসেছি। তুই –"

    "আমারও হয়ে গেছে। একা মানুষ, তাড়াতাড়ি ডিনার সেরে ফেলি।"

    "হ্যাঁ, শুনেছিলাম তুই এখন একা।" বাদলদা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, "তবে আর কী? কিছুক্ষণ গল্প করা যাক, তারপর শুয়ে পড়িস। কিন্তু এ কী, তোর চোখে জল?"

    "ওরা বলেছিল –" শ্রীলা আর থাকতে না পেরে হু-হু করে কেঁদে উঠল।

    "দূর বোকা মেয়ে, চোখ মোছ। দেখতেই তো পাচ্ছিস, আমি যমের অরুচি।"

    (২)

    আসলে শ্রীলা কাঁদছিল দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়ানো একটা মিথ্যে অপরাধবোধ থেকে রেহাই পেয়ে।

    বাদলদা ছিল শ্রীলার দাদা দীপঙ্করের বন্ধু। শ্রীলাদের বাড়িতে বরাবরই বামপন্থী আবহাওয়া। তারপর যখন দীপঙ্কর কলেজে গেল, সেখান থেকে নিয়ে এল 'প্রতিষ্ঠান বিরোধী' বাম মতাদর্শ।

    তদ্দিনে ইমার্জেন্সি-উত্তর পশ্চিমবঙ্গে বাম শাসন প্রতিষ্ঠিত। নক্সাল আন্দোলন সত্তর-বাহাত্তরের সেটব্যাকের পর বহুধাবিভক্ত। দাদা তার একটি গ্রুপের প্রভাবে পড়েছিল। তাই চাকরিজীবী বাবার সঙ্গে দাদার প্রায়ই রাজনৈতিক বাকবিতণ্ডা হত। শ্রীলা প্রথমে বাবার পক্ষে থাকলেও ক্রমে দাদার মতাদর্শের দিকে ঝুঁকেছিল।

    তার অন্যতম কারণ হয়তো এই বাদলদা। দাদা প্রায়ই তাকে নিয়ে আসত। দাদার সঙ্গে তার রাজনৈতিক আলোচনা হত আর মাঝে মাঝে সে বাবাকেও তাদের মতাদর্শ বোঝাবার চেষ্টা করত।

    আলোচনার ব্যাপারে দাদা ছিল খুব অসহিষ্ণু। নিজের মত প্রথম থেকেই প্রবলভাবে জাহির করত আর প্রতিপক্ষ না মানলে ভীষণ রেগে যেত। বাদলদা কিন্তু প্রথমে খুব কম কথা বলত। একটু বলেই অন্যদের বলার সুযোগ দিত, তাদের বক্তব্য মন দিয়ে শুনত। সেই অনুযায়ী সে তার যুক্তিজাল বিস্তার করত আর অবশেষে উদ্দীপ্ত ভঙ্গিতে পেশ করত তার 'ক্লোজিং আর্গুমেন্ট'। তার বোঝাবার দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে বাবাও স্বীকার করেছিলেন, "ছেলেটার এলেম আছে। মেইনস্ট্রিম পলিটিক্স করলে অনেক উঠতে পারত।"

    শ্রীলা উপস্থিত থাকলে বাদলদার কথা মন দিয়ে শুনত। অবাক হত তার বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসকে অনায়াসে সংক্রমিত করার পারদর্শিতায়। যেমন একদিন বাদলদা বাবাকে বলছিল, "দেশের সবাই জানে, আপনারাও জানেন যে সমাজটা অসাম্য, অনাচার আর অত্যাচারের ভারে ভেতর থেকে পচে গেছে। তবু আপনারা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে থেকে তাকে শোধরাবার চেষ্টা করে চলেছেন। পারবেন? আপনারা হয়তো দশ বছরে দু'পা এগোলেন, তদ্দিনে দেখবেন আপনাদের প্রতিপক্ষ ধর্ম, প্রাদেশিকতা বা দেশপ্রেম কিছু একটা জিগির তুলে আপনাদের হঠিয়ে দিয়েছে। আবার দশ বছর আপনারা লড়বেন ক্ষমতায় আসার জন্য। এভাবে তেলমাখা বাঁশে ওঠা বাঁদরের মতো আপনাদের বিপ্লবেরও চলতে থাকবে অনন্তকাল ওঠা আর নামা।

    “তার চেয়ে ওটার থেকে বেরিয়ে সরাসরি মানুষের কাছে আসুন, তাদের বিপ্লবের জন্য সংগঠিত করুন। গোলকধাঁধায় অন্তহীন পথ না হাতড়ে গোলকধাঁধার জালটা ছিঁড়ে মুক্তির সন্ধান করুন।"

    "একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন রাতারাতি হয় না।" বাবা বলেছিল, "তার জন্য গণসমর্থন তৈরি করতে হয়। অনেক সাংগঠনিক প্রস্তুতি, ব্লুপ্রিন্ট লাগে। সেসব তোমাদের কোথায়?"

    বাদলদা মৃদু হেসে বলেছিল, "বলুন তো মেসোমশাই, কোন বিপ্লবটা ব্লুপ্রিন্ট ধরে হয়েছে? অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল দেখে জনতা রাস্তায় নেমে ফরাসি বিপ্লব ঘটিয়েছিল। বলশেভিক বিপ্লবের পর লেনিন স্বীকার করেছিলেন, তাঁরা ভাবতে পারেননি এত সহজে ক্ষমতায় আসবেন। আর চিনে যখন মাও-জে-ডং স্রেফ প্রাণের দায়ে হাজার হাজার মাইল পিছু হঠেছিলেন, তখন কি জানতেন এই অস্তিত্বরক্ষার লড়াই 'লং মার্চ' নামে ইতিহাসপ্রসিদ্ধ হবে আর তার পনেরো বছরের মধ্যেই কমিউনিস্টরা জাপানি বাহিনি আর চিয়াং বাহিনিকে পর্যুদস্ত করে চিনের সর্বেসর্বা হবে?"

    "কিন্তু একবার তো চেষ্টা করে দেখলে, শত্রুরা রক্তের বন্যায় সব ডুবিয়ে দিল। লাভের মধ্যে কত প্রতিভাদীপ্ত ছেলে চলে গেল। তোমাদের বিপ্লব কি তাহলে এমন যৌবনের অপচয়ের চক্রেই ঘুরতে থাকবে?"

    বাদলদার মুখ বিষণ্ণ হয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, "যে বিপ্লবীরা অতীতের ভুল থেকে নিজেদের শক্তিকে বাঁচিয়ে রাখার শিক্ষা নিতে পারে, তারাই তো শেষ অবধি টিঁকে থাকে। ডারউইনের সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট তাই বলে। কিন্তু ভুলের ভয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে কি চলে? দুঃখজনক হলেও প্রতিটি সার্থক বিপ্লবের পেছনে থাকে অনেকগুলি রক্তক্ষয়ী ব্যর্থ বিদ্রোহ। নানাসাহেব, ঝাঁসির রানিরা জিততে পারেননি। পারেননি বাঘা যতীন, মাস্টারদা, এমনকি নেতাজীও। কিন্তু এমন অজস্র অসমসাহসী প্রচেষ্টার সমষ্টিতেই তো দেশ শেষ অবধি বিদেশি শাসনমুক্ত হল।"

    এভাবে কিছুক্ষণ আলোচনার পর কোণঠাসা বাবা শেষে হতাশ ভঙ্গিতে বলেছিল, "সবই বুঝলাম। কিন্তু আমাদের তো বোঝো, 'অল্প লইয়া থাকি, তাই মোর যাহা যায় তাহা যায়।' এখনও এদেশের মা-বাবারা হাসিমুখে সন্তানদের মরণপণ যুদ্ধে ঠেলে দিতে তৈরি নয়।"

    "সে দিনটা হয়তো শিগগিরই আসবে।" বাদলদা আত্মবিশ্বাসী স্বরে বলেছিল, "তবে মেসোমশাই, আমরা এখন আগের চাইতে অনেক হুঁশিয়ার। আর কথা দিচ্ছি, আমি থাকতে আপনার দীপঙ্করের গায়ে কোনো আঁচ লাগবে না।"

    বাদলদা কথা রেখেছিল। কিন্তু বিপদটা এসেছিল অন্যদিক থেকে। দীপঙ্করের বোন শ্রীলা ধীরে ধীরে আন্দোলনে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল।

    বাদলদার সান্নিধ্য শ্রীলার মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিল এক বিপ্লবী চেতনা, এগিয়ে গিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার ছটফটে ইচ্ছে। আজ অবশ্য সে নিশ্চিত নয় সেদিনের সদ্যযুবতী শ্রীলাকে বেশি টানত মানুষটা না তার রাজনীতি। সে যাই হোক, শেষ অবধি সে মরিয়া হয়ে বলে ফেলেছিল, "আমাকে তোমাদের কিছু কাজ দেবে, বাদলদা?"

    "তুই ঠিক সেই টাইপের নোস, শ্রীলু।" বাদলদা অনিশ্চিত ভঙ্গিতে বলেছিল, "তুই খুব নরম প্রকৃতির। কিন্তু আমাদের রাজনীতি তো স্রেফ বিতর্কসভা নয়। এখানে পদে পদে পুলিশ, জেল, গুণ্ডার খাঁড়া। তুই আপাতত বাড়িতেই থাক, পড়াশোনা কর। তোকে আমাদের কাজে লাগবে।"

    "কিন্তু তোমরা কি অর্ধেক আকাশকে বাদ দিয়ে সফল হতে পারবে?"

    "মাও ঝেড়ে আমাকে কাত করলি তো?" বাদলদা হেসে ফেলেছিল, "ঠিক আছে, ভেবে দেখি।"

    কিছুদিন পর বাদলদা তাকে দিয়েছিল 'কুরিয়ার'এর কাজ। দক্ষিণ কলকাতায় সম্পন্ন বুদ্ধিজীবিদের মধ্যেও তাদের কিছু সমর্থক ছিল। নানা কাজে দল তাদের বাড়ি ব্যবহার করত, যেমন 'পোস্ট বক্স' হিসেবে। অর্থাৎ কেউ একজন সেখানে চিঠি রেখে গেলে আবার অন্য একজন এসে নিয়ে যেত। আর শ্রীলা হয়েছিল সেই লেনদেনের অন্যতম পোস্ট-পার্সন।

    "খুব উগ্র সাজ করবি না আবার একেবারে সাদামাটা পোশাকও নয়। পথেঘাটে লোকজনের মুখোমুখি হলে একেবারে এড়িয়ে যাবি না আবার বোলচালও মারবি না। এক কথায়, মিডল অফ দ্য রোডার, অ্যাভারেজ পার্সনের মতো থাকবি, যাতে কারও তোকে চোখে পড়লেও মনে থাকবে না। এই বেমালুম হয়ে থাকার গুণটাই কুরিয়ারদের অ্যাসেট।

    “আর হ্যাঁ, পড়াশোনাটাও চালিয়ে যা। একদিন আমরা ছাত্রদের স্কুল-কলেজ থেকে বেরিয়ে আসার ডাক দিয়েছিলাম। পরিস্থিতি পাল্টেছে। পড়াশোনা কর, ডিগ্রিগুলি নে। আমাদের কাজে লাগবে।"

    নক্সালদের খণ্ড গ্রুপগুলির মধ্যে বাদলদাদেরটা ছিল অপেক্ষাকৃত চরমপন্থী। পশ্চিমবাংলায় বিপর্যস্ত হওয়ার পর তারা কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছিল বিহার। সেখানে তারা অন্য একটি গ্রুপের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করত। কিছুদিনের মধ্যে শ্রীলা আরও জেনেছিল, বাদলদা একজন সক্রিয় কর্মী হলেও দাদা ছিল শুধু সিমপ্যাথাইজার। তাই সে দাদাকে তার কাজকর্ম ও অ্যাসাইনমেন্ট সম্বন্ধে কিছু জানাত না।

    পশ্চিমবঙ্গে তারা শাসক দলের সঙ্গে সংঘর্ষ যথাসাধ্য এড়িয়ে গোপনে সংগঠন তৈরি করছিল। কিন্তু তবু কয়েকটি ক্ষেত্রে সংঘর্ষ এড়ানো গেল না। একটা খোঁচড় এঁটুলির মতো বাদলদার পেছনে লেগে ছিল। ঝাড়তে না পেরে বাদলদা শেষ অবধি তাকে ফেলেই দিয়েছিল। বিহার কানেকশনে বাদলদার নাম ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের খাতায় ছিল। এই ঘটনার পর সে 'হাইলি ওয়ান্টেড' হয়ে গেল। শোনা গেল, তাকে পেলে এনকাউন্টার করে দেবে। বাদলদা 'ডীপ আন্ডারগ্রাউন্ড'এ চলে গেল। শ্রীলাদের বাড়ি আসাও বন্ধ করল।

    তারপর বাদলদা আর একবারই শ্রীলার কাছে এসেছিল। সেদিনও সন্ধ্যায় একচোট ঝড়বৃষ্টি হয়ে গেছে। রাত এগারোটা। বাড়ির সবাই শুয়ে পড়েছে, শুধু শ্রীলা টেবল ল্যাম্প জ্বালিয়ে পড়ছে, এমন সময় তার পেছন দরজায় টোকা। কী করবে ভাবছে, ফিসফিস আওয়াজে শুনল, "খোল শ্রীলু, আমি।"

    বাদলদা! তাড়াতাড়ি গিয়ে শ্রীলা প্রায় নিঃশব্দে দরজা খুলল। বাদলদা ঢুকতেই সে ভেতর-বাইর দুই দরজা চটপট বন্ধ করে দিয়ে আলোটাও নিভিয়ে দিল।

    "তুমি, এত রাতে?"

    "একটা ঝামেলায় পড়ে। জানিস তো, আমি ঠিক সময়ে ঠিক শেলটারে ঢুকে পড়ি। তাই অ্যাদ্দিন টিঁকে আছি। আজ কিন্তু হচ্ছিল! রাতের ঠেকে ঢুকতে যাচ্ছি, হঠাৎ নাকে বিপদের বদগন্ধ। ইতিউতি তাকিয়ে দেখলাম, রাস্তার উল্টোদিকে ছেঁড়াখোড়া পোশাক পরা একটা পাগল আড়চোখে বাড়িটাকে ওয়াচ করছে।

    হল আমার নাইট শেলটার! এত রাতে তো গাড়িঘোড়াও পাব না। তখন মনে পড়ল, হাঁটা দূরত্বে তোদের বাড়ি। ব্যস, চলে এলাম। ক'টা তো ঘণ্টা, কাল কাকভোরেই বেরিয়ে যাব।"

    "কিন্তু ঢুকলে কীভাবে? কড়া তো নাড়োনি।"

    "তোর বাদলদা সদরে কড়া নেড়ে আসে না।" শ্রীলা অন্ধকারে শুনল মৃদু হাসির শব্দ।

    অর্থাৎ পাঁচিল টপকেছে! শ্রীলা বলল, "বেশ, তাহলে শুয়ে পড়ো। আমি দেখছি মেঝেতে –"

    "পাগল নাকি! আমি তোর ঘর ভালোই চিনি, মেঝেতে শোয়া যায় না। তুই খাটেই শুবি। আর আমারও ক'ঘণ্টা ঘুম দরকার। ঘর ছোট হলেও তোর খাটটা চওড়া, দুজন খুব হয়ে যাবে।"

    শ্রীলা শিউরে উঠল। অনেক চেষ্টায় সাহস করে বলল, "একজন মেয়ের পাশে শুয়ে রাত কাটাতে – তোমার কোনো ফিলিং হবে না?"

    "হবে তো।" বাদলদা ওর মাথায় স্নেহের চাপড় মেরে বলল, "কিন্তু আমি যে বিপ্লবী, তাই সেই ফিলিংকে সামলাতেও জানি।"

    কোনো কথা শুনল না। শ্রীলার পাশে শুয়ে লোকটা অন্যদিক ফিরে দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ল।

    "কিন্তু আমি যে অতটা বিপ্লবী নই!" শ্রীলা জ্বলতে জ্বলতে ভাবছিল, "আমার নারী-শরীর যে চাইছে ঐ সাহসী বুকটার তলায় নিষ্পেষিত হতে।" সে চোখ বুঁজে দুহাতে শক্ত করে কপালের রগ টিপে শুয়ে রইল। ঘড়ির টিকটিক আওয়াজের সঙ্গে সময় নিঃশব্দে পুড়ে চলল।

    ভোরের দিকে কখন যেন চোখ দুটো একটু লেগে এসেছিল। উঠে দেখল, বাদলদা নেই। যেমন নিঃশব্দে এসেছিল তেমন নিঃশব্দে চলে গেছে। সত্যিই এসেছিল, না স্বপ্ন? না, ঐ তো টেবিলে একটা চিরকুট, "হাওয়া খারাপ। সাবধানে থাকিস।"

    হাওয়া যে খারাপ তা শ্রীলা ক'দিন বাদেই টের পেল – সুমন ধরা পড়েছে আর চাপে পড়ে বোধহয় বিভিন্ন ডেরার সন্ধান দিয়ে দিচ্ছে।

    বার্তাবাহক শ্রীলা চটপট বিভিন্ন প্রান্তে খবর পাঠাতে লাগল, সুমনের চেনা ঠেকগুলো যেন অবিলম্বে 'স্যানিটাইজ' করা হয় আর আপাতত কমরেডরা যেন সেগুলি এড়িয়ে চলে। তার মধ্যে দুটো ঠেক সে নিজে চিনত, তাই নির্দিষ্টভাবে তাদের ঠিকানাও জানাল। কয়েকদিন পর 'সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে' খবর পেয়ে সে একটু নিশ্চিন্ত হল।

    কিন্তু সুমন যে তাদের বাড়িও চেনে? দাদাকে জানাবে কিনা ভাবছে, পুলিশ সে সময় দিল না। সেদিন রাতেই শ্রীলাদের বাড়িতে হানা দিয়ে তারা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর সবার হতবাক চোখের সামনে দাদাকে নয়, বোনকে নিয়ে চলে গেল। সুমন শ্রীলাকেই চিনত, দীপঙ্করকে নয়।

    বিপ্লবীদের পুলিশ কাস্টডির অত্যাচার সহ্য করার অনেক গল্প শোনা যায়। তার সবটা সত্যি নয়। কিছু বিপ্লবী শত অত্যাচারেও টুঁ শব্দটি করে না, মরে গেলেও নয়। কিন্তু তারা সংখ্যায় বেশি নয়। আবার কেউ কেউ পুলিশি অনুগ্রহ লাভের আশায় কার্যত তাদের ‘এজেন্ট’ হয়ে যায়। এদের সংখ্যাও অল্প।

    এর মধ্যবর্তী বিরাট সংখ্যক ধৃত মাঝামাঝি 'ট্যাকটিকাল' লাইন নেয়। অর্থাৎ অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে কিছু কিছু বলে দেয়, যাতে পার্টির ন্যূনতম ক্ষতি হয়। শ্রীলাও যখন বুঝল এই অত্যাচার একেবারে মুখ বুঁজে সহ্য করা তার পক্ষে অসম্ভব, সে ঐ 'ট্যাকটিকাল' লাইন নিল, যাতে ক্ষতি সবচেয়ে কম হয়। যে ক'টি ঠিকানা সে বলে দিয়েছিল, তার মধ্যে ছিল সুমনের জানা দুটি ঠেক। শ্রীলা ধরেই নিয়েছিল, পুলিশ ওগুলো ইতিমধ্যেই জানে আর তা 'স্যানিটাইজড'ও হয়ে গেছে।

    কপাল ভালো, এই লাইনে কাজ হল। অত্যাচার অন্তত তখনকার মতো বন্ধ হল। ইতিমধ্যে বাবাও তাদের ইউনিয়ন মারফত কোনো মান্যবরকে ধরেছিল। কিছুদিন বাদে শ্রীলাকে লালবাজারের এক বড় অফিসারের দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হল। দেখল সেখানে বাবাও বসে আছে।

    "আপনাদের পারিবারিক রেকর্ড তো স্পটলেস। তাহলে এই বাচ্চা মেয়েটার এসব রোগ ধরল কোত্থেকে? বোধহয় কলেজ থেকে। কেন যে এরা এত দেখেও শেখে না? বয়সের দোষ!"

    অফিসারটি তারপর মুচকি হেসে বললেন, "তবে ওর বয়স অল্প। আমাদের সঙ্গে কোঅপরেটও করেছে। আপনি একটা বেল বন্ড দিয়ে যান, পরশু মেয়েকে কোর্ট থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবেন। ভালো করে বোঝান, যাতে এসব ভূত মাথার থেকে নামে। তবে শুনেছি কোনো কাককে মানুষ ছুঁলে অন্য কাকেরা তাকে ঠুকরে মেরে ফেলে। ওর এখন বেশি ভয় ওর দলের থেকে। পারেন তো কিছুদিনের জন্য বাইরে পাঠিয়ে দিন।"

    শ্রীলা দুঃসাহসী ছিল না। যেটুকু সাহস ছিল, ক'দিনের পুলিশ কাস্টডি তা নিংড়ে বের করে দিয়েছে। বিধ্বস্ত দেহেমনে বাড়ি এসে সে শয্যা নিল। খুব ইচ্ছে করছিল বাদলদার সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু তা তো অসম্ভব। এক্সপোজড শ্রীলা এখন 'লাইভ ওয়্যার', যে ছোঁবে তার মৃত্যু।

    তবু একবার দাদাকে চুপিচুপি জিগ্যেস করেছিল, "বাদলদার খবর জানিস?"

    "পাগল হয়েছিস! বাড়ি ওদের নজরে পড়ে গেছে, আর কোনো কন্টাক্ট রাখা যায়?"

    ঠিক। তবে শ্রীলার মনে হল, দাদা কিছু লুকোচ্ছে।

    কী লুকোচ্ছে, জেনেছিল কিছুদিন পরে। একটু ধাতস্থ হয়ে শ্রীলা তখন আবার কলেজ যেতে শুরু করেছে। একদিন হঠাৎ রাস্তায় দেখা হয়ে গেল চেতলার দেবুর সঙ্গে।

    "কমরেডদের ফাঁসিয়ে নিজে মজাসে ঘুরে বেড়াচ্ছিস!" ঘৃণাভরে বলেছিল দেবু।

    "আমি, ফাঁসিয়েছি?" শ্রীলার বুক ঠেলে একরাশ অভিমান উথলে উঠল। কুরিয়ার শ্রীলা দক্ষিণ কলকাতায় পার্টির নাড়িনক্ষত্র জানত। চাইলে পুরো স্ট্রাকচারটায় ধস নামিয়ে দিতে পারত। কত কষ্টে যে অধিকাংশ তথ্য সে সামলে রেখেছে তা শুধু সেই জানে। সে যা বলেছে তাতে পুলিশ বড়জোর কিছু সিমপ্যাথাইজারকে হ্যারাস করবে। আর তার বদলে এই অভিযোগ?

    "কেয়াতলার ঠেকটা তুই বিলা করিসনি?"

    "আমি – না সুমন?" আমতা আমতা করে বলেছিল শ্রীলা।

    "তুই। সুমন একবারই গিয়েছিল, জায়গাটা চেনাতে পারেনি। তুই তোলতাই হওয়ার দু'দিন পর ওটা রেইড হয়।"

    তারপর যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিল, "তোর জন্য আজ বাদলদা নেই। এর ফল তোকে পেতে হবে।"

    কোনোমতে প্রায় ছুটতে ছুটতে শ্রীলা বাড়ি ফিরেছিল। দাদা বাড়ি ছিল। তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাগলের মতো কিলচড় মারতে মারতে বলেছিল, "দাদা, বল – বাদলদা?"

    শ্রীলার মাথায়, পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে দাদা যা জানত বলেছিল। সত্যিই শ্রীলা ধরা পড়ার দুদিন পর কেয়াতলার বাড়িটায় রেইড হয়েছিল। বাড়ির মালিক সৌম্যদাকে পুলিশ অ্যারেস্ট করে কোর্টে তুলেছিল। কিন্তু সৌম্যদা খবর পাঠিয়েছে, সেদিন বাদলদাও ওখানে ছিল। অথচ পুলিশ তাকে কোর্টে তোলেনি, অ্যারেস্ট করেছে বলে স্বীকারও করেনি। তাই আশঙ্কা, তারা তাকে এনকাউন্টার করে লাশ গুম করে দিয়েছে।

    "আমি, আমিই বাদলদাকে খুন করেছি।" হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো কাঁদতে কাঁদতে শ্রীলা তখন দাদাকে বলেছিল তার ফ্লপ ট্যাকটিকাল লাইনের কথা।

    "ভেঙে পড়িস না।" দাদা বলেছিল, "হয়তো বাদলকে ওরা বিহারে নিয়ে গেছে, পরে জানা যাবে। আবার কে বলছিল, টর্চারে কোন বন্দির নাকি সাময়িক মনোবিকলন হয়েছে, তাকে অ্যাসাইলামে ভর্তি করেছে। এও হতে পারে, বাদল কোনোভাবে পালিয়ে গিয়েছে।"

    শ্রীলা জানত, এসবই স্তোকবাক্য। সে খুনি। ঠিক সময়ে ঠিক শেলটারে ঢুকে পড়া বাদলদা শেষ অবধিও তার শ্রীলুর প্রতি আস্থা রেখেছিল। সেই বিশ্বাসের মূল্য তাকে প্রাণ দিয়ে চুকাতে হল।

    দেবু বলছিল, শ্রীলা এর ফল পাবে। কী করবে ওরা, তাকে মেরে ফেলবে? ফেলুক। আত্মহত্যার সাহস নেই, কেউ মেরে ফেললে এই যন্ত্রণার থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

    ডীপ ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিল শ্রীলা। বাবা, দাদা চিন্তায় পড়েছিল – সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো দরকার, কিন্তু তাকে সব খুলে বলে কীভাবে? এই সঙ্কটের মুহূর্তে এগিয়ে এসেছিল কার্যত ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকা পরিবারের চতুর্থ সদস্য মা। বিপর্যস্ত সন্তানকে পরম মমতায় সদ্যোজাত শিশুর মতো বুকে টেনে নিয়ে সে একটু একটু করে জুড়িয়ে দিয়েছিল তার মনের জ্বালা। যা একমাত্র মা'রাই পারে।

    (৩)

    সেই আবর্তের থেকে বেরিয়ে শ্রীলা তারপর সময়ের পথ বেয়ে অনেকটাই এগিয়েছে। মেধাবী ছাত্রীটি কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে তুখোড় রেজাল্ট করে ব্যাঙ্কের চাকরিতে ঢুকেছে। সাংসারিক নিয়ম মেনে একদিন তার বিয়েও হয়েছে। স্বামী মনোজিৎ এক এমএনসি'র অফিসার। মানুষ হিসেবে বা স্বামী হিসেবে সে আদর্শ না হলেও কাছাকাছি। শ্রীলা তদ্দিনে সিস্টেমকে পাল্টাবার স্বপ্ন ছেড়ে সিস্টেমের সঙ্গে মানিয়ে চলার অনিবার্যতাকে মেনেই তার কর্মজীবন ও দাম্পত্যজীবন অতিবাহিত করার চেষ্টা করছে। কয়েক বছর সুখেই কাটল। জন্ম নিল কন্যা নীলাঞ্জনা বা নীলা। কিন্তু আর ক'বছর যেতে না যেতেই তাদের দাম্পত্য সম্পর্কে এক সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দিল, যা ক্রমে চওড়া হতে লাগল।

    দোষটা শ্রীলারই। কঠিন ব্যাধি রোগীকে ছেড়ে গেলেও প্রায়ই দেহে কিছু খুঁত রেখে যায়। বিপ্লব ব্যাধি শ্রীলাকে ছাড়লেও রেখে গেছে এক বালাই – সততা। এই প্রতিবন্ধ থাকলে জীবনের ইঁদু্রদৌড়ে মানুষ পদে পদে পিছিয়ে পড়ে। কর্মক্ষেত্রে শ্রীলা একটা আপোস করে নিয়েছে। সে নিজে কখনও অসততার পথে হাঁটে না। তার ক্ষমতাধীন এলাকাকেও সাধ্যমতো দুর্নীতির ছোঁয়া থেকে মুক্ত রাখে। এর ফলে তার 'কামাই' যা হতে পারত তার চেয়ে কম হয়।

    কিন্তু যেখানে বোঝে ব্যাপারটা তার এক্তিয়ারের বাইরে, সেখানে নাক গলিয়ে সে 'অ্যাকটিভিজম' দেখায় না। ক'দিনের পুলিশ কাস্টডি তার প্রতিবাদী মেরুদণ্ডকে অনেকটাই নুইয়ে দিয়েছে।

    কিন্তু যখন সে আঁচ পেতে লাগল তার সবচেয়ে কাছের মানুষ মনোজিতও অসততার পাঁকে ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে, সে দিশেহারা হয়ে পড়ল।

    মনোজিতকে জিগ্যেস করায় সে প্রথমে অস্বীকার করল। তারপর বলল – হ্যাঁ, সে এই লাইনে টিঁকে থাকতে হলে যা যা অলিখিত নিয়ম শুধু সেটুকুই মেনে চলে। সে না করলে তার প্রতিদ্বন্দ্বী একই কাজ করে কন্ট্রাক্টটা হাতিয়ে নেবে। লাভের মধ্যে তার কোম্পানির ক্ষতি হবে, তার চাকরি টলমল হবে।

    শ্রীলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, হয়তো তাই। মনে পড়ল, চাপে পড়ে সে একদিন 'ট্যাকটিকাল লাইন' নিয়েছিল। এটাও হয়তো মনোজিতের ট্যাকটিকাল লাইন। মনোজিতের পরকীয়া দোষ নেই, বৌ ও মেয়ের প্রতি তার টানও নিখাদ। এটুকুই বা ক'জন বৌয়ের জোটে?

    কিন্তু যখনই মনে হত এই মানুষটার অপকীর্তির তালিকায় রয়েছে ক্লায়েন্টের বিছানায় কল গার্ল পাঠিয়ে কন্ট্রাক্ট ধরা, তার শরীর কেমন যেন কুঁকড়ে যেত। অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলিতে আড়ষ্টতা চলে আসত। বুঝতে পারত, বৌয়ের শীতলতা মনোজিতকে হতাশ করছে। কিন্তু সে অসহায়।

    ফাটলটা শয্যা থেকে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ছড়াতে লাগল। শ্রীলা বুঝত, বাইরের জগতের কুকুরের কামড়াকামড়ির পর মানুষটা যখন ঘরে একটু শান্তি খোঁজে, বৌয়ের কাছ থেকে তার সেটা জোটে না। হতাশার প্রান্তে উপনীত শ্রীলা একদিন মনোজিতের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলেছিল, "আমি বিষকন্যা। যে আমার খুব কাছে আসে সে ধ্বংস হয়ে যায়। আমাকে কাছে টেনে তুমি যে ভুল করেছ, এখনও তা শুধরে নাও – আমাকে বিষবৎ পরিত্যাগ করো।"

    "আমার শ্রীলা আর নীলাকে ত্যাগ করার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না।" মনোজিৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, "আর দোষ তো তোমার নয়, আমার। তবু আমি আশায় থাকব, একদিন তুমি আমায় বুঝবে। পেশাদার মানুষটার থেকে ব্যক্তিমানুষটাকে আলাদা করে দেখতে শিখবে।"

    "তুমি কি অন্য একটা চাকরি নিতে পারো না – ধরো আমার চাকরির মতো, যেখানে গায়ে কালির ছিটে না লাগিয়েও টিঁকে থাকা যায়?"

    "বড্ড দেরি হয়ে গেছে। আর আমাদের তো নীলার ভবিষ্যতের সংস্থানও করতে হবে।"

    এইভাবে শ্রীলার সংসার গড়িয়ে চলল। নীলা বড় হতে লাগল। বোঝার মতো বয়স হলে সে মাঝে মাঝে মা'কে ভর্ৎসনা করত, "তোমার বৃদ্ধা মহিলাদের মতো শুচিবাইটা একটু কমাও। বাবাকে একটু শান্তি দাও।"

    শ্রীলার মুখে কথা জোগাত না। নীরব দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলতে চাইত, "চেষ্টা তো করি, পারি না।"

    তারপর নীলা একদিন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে হস্টেলে চলে গেল। স্বামী-স্ত্রী তখন একটা অলিখিত বোঝাপড়া করে নিল। মনোজিতের সামনে প্রায়ই ভালো অফার থাকত, কিন্তু কলকাতায় থাকবে বলে সেসব সে উপেক্ষা করত। এবার তার একটা অ্যাকসেপ্ট করে সে বেঙ্গালুরু চলে গেল। এখন তাকে আর কল গার্ল পাঠিয়ে কন্ট্রাক্ট ধরতে হয় না। তবে কলমের এক খোঁচায় হাজার কর্মীর চাকরি খেতে তার বুক কাঁপে না। আফটার অল, লাভের জন্যই তো কোম্পানি তাকে মোটা মাইনে দেয়।

    শ্রীলা কলকাতাতেই থেকে গেল। মাঝে মাঝে, বিশেষত নীলা ছুটিতে বাড়ি এলে মনোজিৎ কলকাতায় আসে। স্বামী-স্ত্রী অকৃত্রিম বন্ধুর মতো ক'টা দিন কাটায়। তারপর আবার যথা পূর্বম্ তথা পরম্।

    এভাবে বছরের পিঠে বছর গড়াতে লাগল। নীলা কলেজ সেরে বিদেশে পাড়ি দিল, তার বয়ফ্রেন্ড হল। আর এদিকে দুটি ভগ্ন হৃদয় রইল শবরীর প্রতীক্ষায়, বরফ গলার অলীক আশায়।

    (৪)

    "তারপর, বল?"

    এতদিন পর, কত কথাই তো বলার থাকে। যেমন তোমার কী হয়েছিল, কোথায় ছিলে? কিন্তু সেসব প্রসঙ্গ না তুলে শ্রীলা বলল, "কেমন আছ, বাদলদা?"

    "ভালো।"

    "তোমার বিপ্লব?"

    "আছে তো!" বাদলদার চোখ আগের মতোই জ্বলজ্বল করে উঠল।

    "কিন্তু আমি যে ভালো নেই।" শ্রীলা হাহাকার করে উঠল, "চারদিকে সব তো ভেঙে পড়ল। গোটা পৃথিবীতে সমাজতন্ত্র তাসের ঘরের মতো ধূলিসাৎ হল। উগ্র ভোগবাদ নৈতিকতার শেষ সীমান্তটুকুও ঝাপসা করে দিল। আর তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে উগ্র ধর্মান্ধতা শুরু করল তাণ্ডব নৃত্য। যারা একটা সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখত, তারা কোন আশা বুকে নিয়ে বেঁচে থাকবে, বলো?"

    হাসিতে ভরসা ছড়িয়ে বাদলদা বলল, "প্রখর গ্রীষ্মে মাঠ যখন শুকিয়ে ফুটিফাটা হয়, তাতে সবুজের কোনও চিহ্ন থাকে না। অথচ তারপর যখন বর্ষার ধারাজল পড়ে, সেই মাঠেই মাথা তোলে প্রাণের অঙ্কুর। বাড়তে বাড়তে শেষে সবুজই দখল করে নেয় গোটা এলাকাটাকে।

    “এটা অলৌকিক কিছু নয়। আপাত মৃত ঐ মাটির বুকে লুকিয়ে থাকে অজস্র সৃষ্টির বীজ, যা অনুকূল আবহাওয়ায় স্পর্ধায় মাথা তোলে।

    “বিপ্লবও অমর। জীবজগতের সহজাত ধর্ম। ডারউইন মানেই তাই। বিপ্লবকে বাইরে খুঁজে না পেলে তাই যেতে হবে সমাজের গভীরে, যেখানে তার বীজ অলক্ষ্যে অঙ্কুরিত হচ্ছে।"

    শ্রীলা যেন আবার তার পুরোনো বাদলদাকে ফিরে পাচ্ছে। বলল, "তুমি দেখেছ এমন অঙ্কুর?"

    "হ্যাঁ, শত শত। এখন আমার চলাচলের পরিধি অনেক বেশি উন্মুক্ত কিনা। কিন্তু রাত বাড়ছে, তাই কয়েকটাই বলছি। যেমন ধর এক প্রেমিক যুগল, যারা 'অনার কিলিং'এর ভ্রুকুটি অগ্রাহ্য করে পালিয়ে এসে ঘর বেঁধেছে। তারা সফল, কিন্তু অনেকেই এই দুঃসাহস দেখিয়ে প্রাণ দিয়েছে। এই চেষ্টাগুলিকে তুচ্ছ ভাবিস না। বিশ্বজোড়া ঘৃণার আধিপত্যের বিরুদ্ধে এ হচ্ছে ভালোবাসার ছোট ছোট প্রতিবাদী মশাল। এই অঙ্কুরগুলিই বাড়তে বাড়তে একদিন সারা মাঠ ছেয়ে ফেলবে। ঘুচিয়ে দেবে ধর্ম, জাতি, জাতপাতের ঘৃণার পাঁচিল।

    “আবার দেখেছি এক গ্রামের দুই গৃহবধূকে, যারা রোজ স্বামীর মার মুখ বুজে সহ্য করত, ঐ 'পোড়া পেটের জ্বালায়'। তারপর একদিন তারা কার সঙ্গে যেন সলা করে গোপনে মোবাইলে নিজেদের ভিডিও আপলোড করতে লাগল।"

    "শরীর দেখিয়ে?"

    "না। কিন্তু দেখালেই বা কী – তাদের শরীর তো স্বামীদের নয়, তাদেরই সম্পত্তি। এইভাবে বছরখানেকের মধ্যে দুজনের যথেষ্ট টাকা হল। এত টাকা যে তারা অত্যাচারী স্বামীদের কাঁচকলা দেখিয়ে শহরে গিয়ে লিভ-ইন করতে লাগল। বল, এটা কি একটা বিপ্লব নয়?"

    "তারপর?"

    "এক গ্রামে এক তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষ বিয়েতে মেইন রোড দিয়ে 'বরাত' নিয়ে যাচ্ছিল দেখে আশপাশের তথাকথিত উচ্চবর্ণের লোকেরা তাকে পিটিয়ে আধমরা করে বিয়ে ভেঙে দিয়েছিল। তার ক'মাস পরে একই বর ঘোড়ায় চড়ে 'উচ্চবর্ণের' এলাকার মধ্য দিয়ে বরাত নিয়ে গেল। কিন্তু তার সঙ্গের মানুষদের সংখ্যা আর মেজাজ দেখে এলাকার মাতব্বররা স্রেফ চুপচাপ দরজা এঁটে বসেছিল।

    “সব বলতে গেলে তো ভোর হয়ে যাবে। আমার জানা একটি মেয়ের কথা বলে শেষ করি। উত্তাপ সইতে না পেরে সে একদিন হাত থেকে বিপ্লবের মশালটা ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু ভেতরে চিরকাল জ্বালিয়ে রেখেছে এক টুকরো আগুন – যে জেদটুকুর জন্য সে নিজের ব্যক্তিজীবনকে বাজি ধরতেও পিছপা হয়নি।"

    বাদলদা! শ্রীলার চোখ ছলছলিয়ে উঠল, তুমি কি শুধু এইজন্যেই আমার কাছে এলে? তারপর বলল, "তবে কি শ্রেণী সংগ্রাম মিথ্যে?"

    "তা কেন? শ্রেণী সংগ্রাম ছিল, আছে, থাকবে। কিন্তু তাকে আমরা বড্ড সঙ্কীর্ণ অর্থে দেখেছি, তাই বারবার পথ হারিয়েছি। ব্যাপকতর অর্থে, সবলের জুলুমের বিরুদ্ধে নিপীড়িতের প্রতিস্পর্ধাই বিপ্লব। আর সচেতন বিপ্লবীর কাজ অমন লক্ষ লক্ষ বিপ্লবের অঙ্কুরকে একত্র করে এক শান্তি, সাম্যের সুন্দর পৃথিবী গড়ার অভিযানে সামিল করা।"

    "বাদলদা, তুমি কি একা?"

    "পাগল! এত বড় কর্মকাণ্ড একা হয়?"

    "বাদলদা, তোমরা আমাকে নেবে? আর পারছি না।"

    "এত তাড়া কীসের? সময় হলেই বুঝতে পারবি, চলে আসিস আমার কাছে।"

    "কিন্তু তোমার ঠিকানা?" শ্রীলার আকুল জিজ্ঞাসা।

    বাদলদা হেসে একটা চিরকুট নিয়ে লিখে দিল। তারপর ওয়াল ক্লকটার দিকে তাকিয়ে বলল, "কাল তো আবার তোর অফিস, এবার শুয়ে পড়। অন্য ঘরদুটোয় দেখছি তালা, নিশ্চয়ই অগোছালো অবস্থায় আছে। ক'টা ঘণ্টার তো ব্যাপার, আমি এই কাউচে শুয়েই কাটিয়ে দিচ্ছি।"

    "আমি কি অতই খারাপ হোস্ট? চলো।" শ্রীলা বাদলদাকে হাত ধরে তার বেডরুমের দিকে টেনে নিয়ে চলল। দূরে গাছের মাথায় বাতাস শিস দিচ্ছে, বোধহয় আবার ঝড় আসবে।

    "খাটটা যথেষ্ট চওড়া, দুজনের খুব হয়ে যাবে।" শ্রীলা অপ্রস্তুত বাদলদাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আলোটা নিভিয়ে দিল।

    "সেদিন তুমি ফাঁকি দিয়েছিলে, আজ ছাড়ছি না।" শ্রীলা গভীর আলিঙ্গনে বাদলদাকে বাঁধল। বাইরে রিমঝিম বৃষ্টি শুরু হয়েছে, গায়ে এসে পড়ছে ছোট ছোট জলবিন্দু। পড়ুক, শ্রীলা আর আজ জানালা বন্ধ করতে উঠবে না।

    ঘুম ভাঙল মুখেচোখে প্রথম ঊষার আলোর ছোঁয়ায়। পাশ ফিরে দেখল, বাদলদা নেই। সত্যিই এসেছিল তো, নাকি –? ইন্টারকমে সিকিউরিটিকে ফোন করতে গিয়েও থেমে গেল শ্রীলা – মানুষটা আসার আগেও সিকিউরিটির থেকে ফোন আসেনি। বাদলদা সদরে কড়া নেড়ে আসে না।

    কিন্তু সে তো বাইরের ঘরের টেবিলে তার ঠিকানা লিখে রেখে গেছে? দ্রুতপায়ে গিয়ে চিরকুটটা তুলে নিয়ে দেখল শ্রীলা, সেটা সাদা। তার মুখে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল।

    শ্রীলার মন এখন শান্ত আর সংশয়হীন। বাদলদা তার ঠিকানা রেখে গেছে। একটু সময় লাগলেও শ্রীলা সেটা ঠিক খুঁজে বের করবে।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)