• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৩ | জানুয়ারি ২০২৪ | গল্প
    Share
  • শেষ গল্প : মুরাদুল ইসলাম

    বলতে পারেন আমি একজন লেখক। কিন্তু তেমন কিছু লেখি নাই। কোন গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধও না। কবিতা ব্যাপারটা আমার 'আসে না'। লেখক হইলেই যে সব বিষয়ে লেখা যায় এইরকম তো না। এইজন্য দেখবেন যারা গল্প উপন্যাস লেখেন তারা ঐগুলাই বেশি লেখেন। যারা কবিতা লেখেন তারা সাধারণত গল্প উপন্যাসে যান না। এখানে ঐ না আসার ব্যাপারটা ছাড়াও আরো কোন গূঢ় ব্যাপার থেকে থাকতে পারে। তার নাগাল আমি পাই নাই। যদি আমার লেখাগুলা লেখতে পারতাম তাহলে হয়ত লেখালেখির প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে একেক ফর্মের ধরন ও পার্থক্য আরো ভালোভাবে বুঝতে পারতাম।

    সেটা হয় নাই। কারণ আমি আমার বিভিন্ন নোটবুকে ছোটখাট তথ্য, প্লট, চরিত্র ইত্যাদি বিষয়ে নোট রেখেই গেছি। কিছুই শুরু করতে পারি নাই।

    রাতে আমি যে ঘুমাতে পারতাম না, এর একটা কারণ এটা। আমার মনে হতো উপন্যাসটা কাল শুরু করে ফেলব, বা ওই বড় গল্পটা, যেটার কথা মাথায় এসেছিল কিছুদিন আগে। যেখানে একটা বড় অজগর লোকটাকে খেয়ে ফেলে।

    এইরকম আপনার হয় কি না জানি না। আমার একেক রাতে একেক কিছু করার কথা মনে হতো।

    কখনো ভাবতাম কোন একটা কিছু শিখতে হবে। সবাই নানা কিছু শিখে ফেলছে এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে। তারা ভালো ভালো চাকরি করছে। যেই ছেলেটাকে কিছুদিন আগেও দেখেছি কম্পুটার কী বুঝে না, সেও দেখি এখন কোডিং শিখে চাকরি করছে। খালি আমারই কিছু হলো না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঠিক করতাম আবার লেগে পড়তে হবে। আমি যে একেবারেই প্রতিভাহীন এইরকম কথা কোন শত্রুও বলে নাই কোনদিন। পড়ালেখায় খুবই ভালো ছিলাম না কিন্তু একেবারেও খারাপ ছিলাম না। চেষ্টা করলে পারতাম, কিন্তু এই নানা কিছুতে জড়িয়ে পড়লাম, বৃথা সময়ক্ষয় করলাম, পড়ালেখা থেকে মনযোগ সরে গেল, আবার যদি চেষ্টা করি পারব নিশ্চয়ই।

    নাকি কোন ব্যবসা শুরু করব? কতো কিছু নিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ আছে, অনেকেই করছে। আমি আসলে ভাবি ব্যবসা নিয়ে, শুরু থেকেই আমার ভেতরে ব্যবসার স্পিরিট আছে। আমার একবার মনে হলো, ড্রেস শু যেগুলা বানানো হয়, ওইগুলা পরে বেশিক্ষণ থাকা যায় না, কারণ এদের ভেতরে পা ন্যাচারাল থাকতে পারে না। তাই, পায়ের ন্যাচারাল অবস্থা বিচার করে যদি কোন ড্রেস শু ব্র্যান্ড বানানো যায় তাহলে ভালো ব্যবসা করা যাবে। এই চিন্তা দুয়েকদিন আমার মাথায় ছিল। কয়েক বছর পরে দেখি পত্রিকায়, এক নতুন স্টার্টাপ এটা শুরু করেছে, বিদেশ থেকে ফান্ডও নাকি পেয়েছে। এইরকম অনেক অনেক আমার আইডিয়া আছে যেগুলা আমি পরে হইতে দেখছি, অনেকগুলা হুবহু, অনেকগুলা সামান্য ব্যতিক্রম-সহ। কিন্তু কোনটাই আমার করা হয় নাই। ভাবি, তাড়াতাড়ি কোন এক ব্যবসা শুরু করে ফেলতে হবে। এইখানে ব্যর্থ হলেও অনেক কিছু শেখা যাবে। কে আছে এমন তালেবর যে প্রথম চেষ্টাতেই সফল! ব্যবসার স্পিরিটই হচ্ছে চেষ্টা করে যাওয়া, নতুন নতুন ভাবে চেষ্টা করা।

    কখনো ভাবতাম আমার জীবনের এই অসম্পূর্ণতা ও অসুখী অবস্থার কারণ আমার কোন সঙ্গী নাই। পৃথিবীতে সঙ্গী ছাড়া কোন সুখী মানুষ সম্ভব নয়। প্রাকৃতিকভাবে মানুষ নির্ভরতা খুঁজে, তাদের হাসি আনন্দ দুঃখ এবং আরো নানা অনুভূতি, যেগুলা সে কাউকে বলতে পারে না, সেইগুলা তার সঙ্গীরে বলে। অনেক সময় বলতেও হয় না, সঙ্গী বুঝে ফেলে। তারা পরস্পর এমন বুঝাবুঝি ও পারস্পারিক নির্ভরতার ভেতর দিয়ে বাস করে। এটারে প্রেম বলে। আমার জীবনের শূন্যতার উৎস আমি প্রেমহীন। তাই আমি চিন্তা করি এখন আমার প্রধান কাজ হচ্ছে একজন ভালো সঙ্গী খুঁজে বের করা। তার সাথে নিজের জীবনকে যুক্ত করে ফেলতে পারলেই আমি দিশা পাব। সে আমার কথাগুলা শুনবে, বুঝবে, হয়ত আমাকে দুয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ ইনসাইটও দিতে পারবে। এখন তো সঙ্গী খুঁজে বের করা কঠিন না। সোশ্যাল মিডিয়া ভালো উপায় হতে পারে। সেখান থেকে নিজের পছন্দের সাথে মিলে এমন কাউকে বের করে কনভার্সেশন শুরু করতে পারলেই হয়। আস্তে আস্তে আমরা আবিষ্কার করতে পারব আমাদের মিলে কি না। না মিললে আরো অনেকে আছে।

    কিন্তু, এতে কি অনেক সময় যাবে না? আমি অনবরত এই চেষ্টা করে যেতে পারি না। তাছাড়া আমার যা বয়েস এখন, প্রেমের সময় নেই। এখন আমার বাচ্চাকাচ্চা হবার সময়। বাচ্চাকে ছোট থেকে বড় হতে দেখা, আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে, হাঁটা শিখছে, কথা শিখছে, স্কুলে যাচ্ছে, এইগুলাই তো মানুষের জীবনরে পূর্ণতা দেয়। বিবর্তনের দিক থেকে যদি বলি, এ ছাড়া আর কি কোন বড় উদ্দেশ্য আছে মানব জীবনের? সন্তান জন্ম দেয়া, ভালোভাবে মানুষ করা। এর মধ্যে সুখ আছে, পূর্ণতার অনুভব আছে। এইজন্য আমার আসলে প্রেম নয়, তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ফেলাই উচিত।

    কখনো ভাবতাম এই আধুনিক লাইফের ব্যস্ততা থেকে দূরে সরে যাব। বনের ধারে বসে থাকব, সেইখানে মানব সমাজ থেকে দূরের ওই জায়গায় বড় এক পুকুরের ধারে কাঠের ঘর বানিয়ে ওইখানেই থাকব নিজে নিজে। ওয়ালডেনের মত। একজন মানুষের কী বা প্রয়োজন, কতটুকুই বা প্রয়োজন। এই আধুনিক সমাজ মানুষের নতুন নতুন প্রয়োজন তৈরি করে। সেই প্রয়োজন মেটাতেই মানুষেরা এই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, সেখান থেকেই মানুষের মধ্যে জন্ম নিয়েছে হিংসা, ঘৃণা, অন্যরে আটকানোর-ঠকানোর চিন্তা এবং গগনস্পর্শী লোভ। আমি এইসব থেকে দূরে থাকতে চাই। দূরে একা একা, নিজের চাহিদা নিজে মিটিয়ে এক সাধারণ জীবন যাপন করতে চাই। পাখির মত, গাছের মত, প্রকৃতির মত।

    আমি এই দীর্ঘ বক্তব্যের পর থামলাম।

    সেবাদানকারী মহিলাটি বিরক্ত মুখ নিয়ে আমার পাশের টেবিলে বসে কী যেন লিখে যাচ্ছে। আমার কথা তার কাছে গুরুত্বহীন বলে সে হয়ত মনে করছে, কিন্তু আমি আমার এই নব্বই বছরের জীবনাবসানের পরে, অনাত্মীয় এই সরকারি বৃদ্ধাশ্রমে মৃতদেহ হয়ে পড়ে থেকে জেনেছি, আমার কথাগুলিই ওই মহিলাটির জীবনের জন্য, এবং অন্যদের জন্যও সবচাইতে দরকারি কথা। তারা সবাই রাতে এইভাবে অনেক কিছু ভাবে, তাদের জীবনটাকে অন্যভাবে পরিচালিত করার কথা, নতুন কিছু শুরু করার কথা। কিন্তু শুরু করে না, দেরি হয়ে যায়, আমার মত, এখন যেমন আমার মনে হচ্ছে, আসলে আমি ঘুরে বেড়াতে পারতাম নানা জায়গায়। কতো কিছু দেখার ইচ্ছা ছিল।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)