• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৩ | জানুয়ারি ২০২৪ | গল্প
    Share
  • এক অউর নারাহ্‌ ایک اور نعرہ : হাজরহ মসরুর
    translated from Urdu to Bengali by শুভময় রায়



    মূল উর্দু গল্পটি পাওয়া গেল হাজরহ মসরুরের ‘চাঁদ কে দুসরি তরফ’ শীর্ষক গল্প সংকলনে।

    আপনাদের সেবক এই খাদিম এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হতে এখানে হাজির। প্রস্তুতির কাজ সব শেষ। ময়দান তামাশা দেখার দর্শকে ভরে গেছে। তবু দেখুন লোক এখনও হুটোপুটি করতে করতে চলে আসছে। আশপাশের বস্তি থেকে, দূরদূরান্ত থেকে গরুর গাড়ি, ছ্যাকরা গাড়ি, ট্রাক আর বাস ভর্তি করে তারা এখানে পৌঁছেছে। কী তাদের উৎসাহ! কী আবেগ! দেখুন এক্ষুনি যারা এল তারা বাসের ছাদেও উঠে পড়ছে! আরও দেখুন কিছু লোক গাছেও উঠেছে – বাঃ! আশপাশের বাড়িঘরের ছাদেও রামধনুর রঙের বাহার। বাচ্চা-বুড়ো জোয়ান আওরত, লড়কি, এমনকী কোলের বাচ্চারাও – সকলেই মজুত। একদম মেলার মত পরিবেশ। এমনিতেও তো আজ ছুটির দিন। অধিকাংশই ধোপদুরস্ত জামাকাপড় পরে এসেছে। ময়দানে মহিলাদের জন্য আলাদা জায়গার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সে স্থানটিও ভরে উঠেছে। দেখুন, কোনও কোনও মাতব্বর সেদিকে ইশারা করে কিছু বলতে চাইছে। চলুন দেখি, ওরা কী বলছে! ওহ্‌, ওদের আসলে এখানে মহিলাদের থাকার ব্যাপারে আপত্তি আছে। সাহেব, এই আপত্তি ঠিক নয়। শেষমেশ মেয়েদেরও তো সতর্ক হওয়ার অধিকার আছে! আসলে এই ঝগড়াঝাঁটিতে তো এক মহিলাও যুক্ত। দেখুন, ময়দানটা ওপর ওপর দেখলেই বুঝতে পারবেন যে এই এগোতে থাকা, ছড়িয়ে পড়া মানুষের ঢেউয়ের মধ্যে লাল-নীল-হলুদ-সবুজ আর সাদা-কালো রঙ যেন ছলকে উঠছে। ওই যে বলা হয় না, ‘বিশ্বজগতকে রঙিন করেছে নারীরাই’! সেটা খুব ভুল তো বলা হয় না।

    চুড়ি ঝিনিঝিনি বাজছে। উজ্জ্বল মুখের চমক দেখা যাচ্ছে। ঠোঁটে হাসির আভাস। কিন্তু ভদ্রমহোদয়গণ, বাচ্চারা কাঁদছে। মনে হয় লাউডস্পিকারের আওয়াজে ভয় পেয়েছে। অপরাধীকে অভিযোগপত্র পড়ে শোনানো হচ্ছে যে। আহ্‌, কী লজ্জা, কী লজ্জা! ময়দানের মাঝখানে একটা কাঠের তেপায়ার সঙ্গে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে। পাজামাটা খুলে গিয়ে বেঁধে রাখা গোড়ালির ওপর এসে পড়েছে। কোমর থেকে ঊরু পর্যন্ত একটা সাদা কাপড় জড়ানো। কমবখতটার তামাটে পিঠে রোদ পড়ে জ্বলজ্বল করছে। দেখুন – দেখুন! ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ কেউ লাফিয়ে উঠে তাকে শাপশাপান্ত করছে। আবার কেউ সঙ্গে আনা পুঁটলি খুলে বাটি বার করে রুটি-পরোটা ভাগাভাগি করে খাচ্ছে। কে জানে এখানে পৌঁছোনোর জন্য এরা কত রাত থাকতে রওনা দিয়েছে। এখন একটু আরাম করে বসতে পেরেছে বলে বেচারাদের খিদে পেয়েছে। ওই যে কেউ একজন বলেছিল না যে পেট বড় বজ্জাত? সে ঠিকই বলেছিল।

    আমাকে কিছু বললেন, আম্মাজি? ওহ্‌... আচ্ছা, আচ্ছা... না, আম্মাজি না... বহিনজি। হ্যাঁ, বহিনজি আপনি কী বলছিলেন? আপনি ওই লোকটার প্রতিবেশী? আপনি জানেন যে এ বড়সড় পাপ করেছে? মহল্লার বেশ কজন মেয়েকে বিপথে নিয়ে গেছে? আপনার মনে হয় সকলের সামনে এর আরও হেনস্থা, আরও অপমান হওয়া উচিত? আরে আম্মাজি... না, না, আমার বহিনজি, এটুকু কাপড় তো ওর শরীরে থাকাই উচিত। আপনি নিজের জায়গায় বসে পড়ুন... হ্যাঁ, হ্যাঁ... আপনার এই পরামর্শ আমি ওপরে জানিয়ে দেব। বসে পড়ুন... আহ্‌ হা... আমাদের নারীরাও এই পাপীকে কতটা ঘেন্না যে করে আমাদের এই আম্মাজিই তার মোক্ষম উদাহরণ।

    হ্যাঁ, তা হলে এখন সামনে এগোনো যাক। ওহ্‌... হো... হো! এখানে তো মুজরিমের কথা তুললে লোকে রাগে ফেটে পড়ছে! অদ্ভুত পরিস্থিতি। এরা আসলে তেপায়াটার সবচেয়ে কাছাকাছি থাকা দর্শক। আমি বলতে চাইছি ভিআইপি-দের জন্য সংরক্ষিত স্থানে যারা বসে, তারাও কেমন তেলেবেগুনে জ্বলছে! লোকে এমনভাবে তাদের মুঠো করা হাত হাওয়ায় ছুঁড়ছে যে যদি মাটিতে পাথর ভরা থাকত, তা হলে এতক্ষণে তিনপায়ায় বাঁধা দুরাশয়ের শরীরটা ভুসি হয়ে ময়দানে ছড়িয়ে যেত। তবে জনাব, এই আবেগের পেছনে যুক্তি আছে। এরা সব চাননের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আর পরিবারের লোকজন। দেখলেন না পাপিষ্ঠ দুরাচারটাকে যখন তেপায়ার সঙ্গে বাঁধা হচ্ছে তার মুখে সামান্য অনুতাপের চিহ্নও নেই। এই এখন যে চাননের আত্মীয়রা তার গায়ে থুতু দিচ্ছে, তার জবাবে সেও কী খারাপ সব গালই না পাড়ছে – সে সব গালিগালাজ বিশেষ করে চাননের সম্মানীয় বৃদ্ধ স্বামীর উদ্দেশেই বর্ষিত হচ্ছে... কী অশ্লীল, কী অশ্লীল! দেখুন... অভিযুক্তকে দেখুন... কেমন ঘাড় ঘুরিয়ে ভিড়ের দিকে বিজয়ীর মত তাকাচ্ছে! দুষ্কর্মাটার মুখে হাসি!

    আরে... আরে... মাননীয় মহোদয়... দাঁড়ান। আমার মুখের কথাটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। আপনাদের যা বলার আছে আমাকে বলুন... আমি সেটা জানিয়ে দেব। হ্যাঁ... কী বললেন? ময়দানে আরেকটা তিনপায়াও রাখা উচিত? কিন্তু তা কেন সাহেবজ়াদারা? কী কারণে ভাইজান? অপরাধিনীর জন্য? আপনাদের বক্তব্য হল দুজনে মিলেই এই পাপ কাজ করেছে? দুজনেরই সাজা হওয়া উচিত যাতে মেয়েদেরও সতর্ক করে দেওয়া যায়? হা – হা – হা ... ভালো চিন্তা। কিন্তু দেখুন, নারী প্রজাতির সাজা চাদরের আড়ালে আর চার দেওয়ালের মধ্যেই হওয়া উচিত। সবাই নিজের জায়গায় বসে পড়ুন। আপনাদের দাবি আমি ওপরে জানিয়ে দেব।

    দেখুন রক্ষীরা আসছে। শান্তিভঙ্গের জন্য কিন্তু ধরে নিয়ে যাবে। ভদ্রমহোদয়গণ, আপনারা বসে পড়ুন।

    ওফ্‌...হো...! এ কেমন দাবি? একটু কল্পনা করার চেষ্টা করুন। যদি দুটো তেপায়া এখানে দাঁড় করানো হত, তা হলে কী হত? আদালতে তো ওই নির্লজ্জ মেয়েটা মাথা থেকে নাক পর্যন্ত কালো চাদরে ঢেকে আসত। তার চোখে আর অঙ্গভঙ্গিতে থাকত চাঁদের আলোর ঝলক। ওই সব প্রেমে আকুল নওজোয়ানরা বোধহয় তাকে ততটাই দেখতে পেয়েছিল যা আমিও দেখেছি। তার বাকি শরীরে আরও কত চাঁদনির ছটাই না ছিল! লা – হুল – উলা – কী নির্লজ্জ সব মানুষ! থুঃ!

    নিন, ভদ্রমহোদয়গণ, অভিযোগপত্র পড়া শেষ হয়েছে। ওহ্‌ দেখুন! জমায়েতে যেন তুফানের মত ঢেউ উঠেছে। খাবার জিনিস হাতে নিয়েই লোকে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে – কারণ এবার সেই যুবক ময়দানে পৌঁছে গেছে। উন্মুক্ত তার কালো শরীরের সঙ্গে পরনের সাদা জাঙ্গিয়াটার কী কনট্রাস্ট! লোমশ, মজবুত ছাতি আর পায়ের প্রতিটি কম্পমান মাংসল পেশী থেকে শক্তি যেন ছলকে পড়ছে। নিচের ঠোঁটটাকে দাঁত দিয়ে এমনভাবে চেপে রেখেছে যে লম্বা ঘন গোঁফজোড়া থর থর করে কাঁপছে। শরীরে তেল মাখা। তার ওপর রোদ পড়ে যেন জ্বলজ্বল করছে। কী ক্ষিপ্রতা! চলাফেরার কী ভঙ্গি সাহেব! কী শৈল্পিক অঙ্গভঙ্গি! ওহ্ হো, দেখুন, দেখুন! স্লো মোশনে কেমন ঘোড়ার মত দৌড়োচ্ছে!

    দর্শকেরা যেন সব বোবার মত দাঁড়িয়ে। ভদ্রমহোদয়গণ, শুনতে পাচ্ছেন? এই নিস্তব্ধতার মধ্যে চাবুকের মার কেমন সিটি বাজাচ্ছে? যেন আঁধি ঝড় গর্তের মধ্যে ঢুকছে! আর ... এই পড়ল প্রথম কশাঘাত... দেখুন, দেখুন, তেপায়ার সঙ্গে বাঁধা কমবখতটার গোটা শরীরটা কেঁপে উঠল আর সে চিৎকার করে বলল –

    ‘তোমার জন্য এই চাবুকের ঘা আমি সইব!'

    হ্যাঁ... হ্যাঁ? হাততালি? সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে ভাই! হাততালি দেওয়া ভুল হল। আপনারা ওই দুশ্চরিত্র অপরাধীর চিৎকারে কান দেবেন না। ভদ্রমহোদয়গণ কশাঘাতের পরে উৎসাহী দর্শকদের আনন্দধ্বনি শুনলেন? এই শাস্তিতে তারা খুশি। হাততালিও সেই কারণে। দেখুন, দেখুন... চাবুকের এক একটা ঘা পড়ছে, আর সমবেত জনতা শাপশাপান্ত করতে করতে গর্জে উঠছে। এবারে শুনতে থাকুন। অপরাধ আর শাস্তি কেমন নাচছে দেখুন! একটা সিগারেট ধরানো যাক। সাহাব, প্রচণ্ড আওয়াজে তো মানুষের স্নায়ু কাজ করে না। যাই হোক, দেখুন চাবুকের একেকটা ঘা পড়ছে আর সঙ্গে সঙ্গে চাবুকধারীর ভাগ্যে কী প্রশংসাটাই না জুটছে। বিশেষ করে তিনপায়ার আশপাশ থেকে। কেউ লাফিয়ে উঠছে। কেউ আবার নিজের শরীরেই হাত বোলাচ্ছে। কেউ হাসছে। তবে অধিকাংশ মানুষের মাথা নিচু। হয়ত তাদের হৃৎপিণ্ডটা দুর্বল! বাচ্চারা কাঁদছে। বেলুনওয়ালারা বেলুন ঘষে ঘষে আওয়াজ তুলে তাদের কান্না থামানোর চেষ্টা করছে। তুলোর মত রঙিন মিঠাই নিয়ে মিঠাইওলারা ঘণ্টি বাজিয়ে চলেছে। মিষ্টি জল বিক্রেতা বোতলে বোতলে ঠোকাঠুকি লাগিয়ে তাদের সঙ্গে সংগত করছে। কেয়া বাত হ্যায়! পরস্পরের কী মিলমিশ!

    আরে, ওই লোকটা আবার কেন আমার দিকে পাগলের মত হাত নাড়ছে? আর তার কোল জড়িয়ে থাকা ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে তো ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। সে কাঁপতে কাঁপতে বাবাকে ধরে ঝুলছে। হ্যাঁ আরে ভাই, আপনি কেন ছেলেটাকে বোতলের মিষ্টি জল খেতে দিচ্ছেন না? কী? খেতে চাইছে না? ঠিক আছে, আপনি এই শাস্তি সম্পর্কে আমাকে আপনার মতামত দিন। আরে মতামত কাকে বলে জানেন না? কাগজ-টাগজ পড়েন না নাকি? রেডিও শোনেন না? টিভি-ও দেখেন না? কামাল করেছেন! আরে ওই সবে তো যে কোনও সংস্কারমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে খালি জনগণের মতামতই থাকে। অর্থাৎ আপনি চাইছেন যাতে আমি আপনাকে আর আপনার বেটাকে এখান থেকে বাইরে নিয়ে যাই? কিন্তু এত তাড়াই বা কীসের? আচ্ছা, আপনাকে একটা মাত্র ঘরে বিবি, বাচ্চা আর আপনার মাকে নিয়ে থাকতে হয়? কিন্তু এখন এটা আমাকে বলছেন কেন ভাই? আমাদের এই পবিত্র পাক রাষ্ট্র অর্থাৎ দেশে অসংখ্য মানুষ এভাবেই থাকতে বাধ্য হয়। এর সঙ্গে আপনার ছেলেটার কাঁপতে কাঁপতে কাঁদতে থাকার কী সম্পর্ক মিয়াঁ? তবে আপনি এটা ঠিকই বলছেন ভাই যে মানুষমাত্রেই ভুলত্রুটির একেকটা পুঁটলি। তারা তাদের মা-বাপকে কখনও একসঙ্গে দেখে ফেলেছে বলে? এটা অবশ্যই কখনও কখনও ঘটে যেতে পারে ভাই কিন্তু... ওহ্‌... এ মনে করছে যে আপনাকেও এখানে ওই রকম চাবুক মারা হবে? হা... হা... হা... আপনার ছেলেটা বড় বেকুব বলতে হবে! বসে পড়ুন... আর আমার রাস্তাটা ছাড়ুন।

    আচ্ছা, এদিকের ছেলেটা তো বেশ বড়... গোঁফের আভাস দেখা দিয়েছে। অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে তিনপায়ার দিকে তাকিয়ে দেখছে। তার মনোভাব কী একটু জানা যাক। কী ভাই ছেলে! এই সব কেমন লাগছে? কেনই বা এসব হচ্ছে? তোমার সব জানা আছে? এমনই হওয়া উচিত? এসব ঠিকই হচ্ছে! বাঃ, বাঃ, সাবাস, খাঁটি ছেলে তো তুমি, দারুণ বলেছ তো! অর্থাৎ, তোমার মনে হয় মুজরিমকে যথেষ্ট চাবকানো হচ্ছে না? এটা তুমি কেন বলছ? মানে তুমি বলতে চাইছ চাবুকধারী তোমার বাবার তুলনায় এই কাজে পটু নয়? তোমার বাবা সৎমাকে যখন মারে তখন চাবুকের দুটো বাড়ি পড়লেই কুর্তার পেছনের দিকটা লাল হয়ে যায়? ওফ্‌... হো... আরে... আরে ছেলে, তুমি এমন লাফাতে শুরু করলে কেন? হাততালিই বা দিচ্ছ কেন?' ওহো!... এবারে বুঝেছি ... ছেলেটা এই কারণে খুশি হয়েছে? সত্যিই এবারে তো তেপায়ায় বাঁধা অপরাধীর শরীরে জড়ানো সাদা কাপড়টায় রক্তের ধারা দেখা যাচ্ছে।... উফ্‌, আমার চারদিকে এইসব নির্লজ্জ যুবকেরা কারা? লা... হুল... উলা... বাতাসে হাত দুটো ছুঁড়ে দিয়ে এরা কী সব অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি যে করছে! মান্যবরেরা, এটা কি আপনাদের চোখে পড়ছে?... .আপনারা ওদের মানা করুন!... তা হলে আপনার মনে করেন মানা করে কোনও লাভ হবে না?... এই প্রজন্মের মধ্যে ভুল শিক্ষাদীক্ষা, মানুষ করায় ব্যর্থতা, ফিল্ম আর ভিসিআরের প্রভাব দেখা যাচ্ছে? আপনারা ঠিকই বলেছেন। আচ্ছা, তা হলে এই নবীন প্রজন্মকেই জিজ্ঞেস করি। হাঁ, তো পেয়ারে লড়কোঁ! তোমরা কোত্থেকে এসেছ? তোমাদের গ্রাম কোথায়? ও, সে তো বেশ দূরে। আচ্ছা... তোমাদের মালিক গরুর গাড়ি করে তোমাদের এখানে পাঠিয়েছে? মালিক মেম্বার হবে? কী বলছ? তোমাদের সঙ্গে অনেকে ট্রাকে করেও এসেছে?... ও, সারা রাত পথ চলে এখানে পৌঁছেছো?

    দেখুন, ওদিকে চাবুকের আরেকটা ঘা পড়ল। আর এই নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা চাবি-দেওয়া খেলনার মত আবার ওই রকম অশ্লীল দেহভঙ্গি শুরু করল! ...লা... হুল... উলা... লজ্জাও করে না? অথচ এত অল্প বয়েস এদের! আর ঠিক এই ছেলেছোকরার দলটার পর থেকেই সেই রঙিন বক্ররেখাটা শুরু হয়ে যাচ্ছে। তেপায়ায় যা ঘটছে সেদিকে না তাকিয়ে কোনও কোনও লাজুক মহিলা নিজেদের বোরখা বা চাদরে ঢেকে রেখেছেন। কোনও বুড়ি রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে এই যুবকদের কাণ্ড দেখছে! তবে অধিকাংশ মেয়েরই মনোযোগ তিনপায়ার দিকে। কেউ কেউ চোখের জল মুছছে। কেউ আবার চাবুকের প্রতিটা ঘা পড়লেই এমনভাবে ঝুঁকছে যেন সেটা তাদের পিঠেই পড়ছে। আবার কেউবা চাবুকের ঘায়ের সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ করে উঠছে। কেউ কাঁদছে। একদল আবার স্ট্যাচুর মত একে অপরের গায়ের সঙ্গে লেগে আছে। কিন্তু তারা হাসছে। চলুন, সাজার বিষয়ে ওদেরও মতামত নেওয়া যাক। একে অন্যের সঙ্গে চিমটে থাকা দুই মহিলার মতামত নিশ্চয়ই অনুরূপ হবে! হ্যাঁ মাননীয়া রমণীগণ! সাজা সম্পর্কে আপনার কী ভাবছেন?... আরে, আরে, মান্যবর! আরে ভাই! আপনারা দুজন আমাকে টানছেন কেন? আমি তো কেবল ওঁদের মতামতই জানতে চাইছি! হ্যাঁ? আপনারা মনে করেন মেয়েদের কোনও নিজস্ব মত থাকতে পারে না? কিন্তু দেখুন, কত মহিলা বিলাপ করছেন! শুনুন, শুনুন... ওঁরা বলছেন বেচারা তেমন অস্বাভাবিক তো কিছুই করেনি... চানন তো ছোটবেলা থেকেই তার বাগদত্তা... .ওই মহিলারা কি তাই বলছে? আপনাদের মনে হয় ওদের কথা বিবেচনার যোগ্য নয়? মহিলাদের বুদ্ধিশুদ্ধি কিছু থাকে না?... ঠিকই বলেছেন। ওঁদের চোখ তো জল ফেলার জন্য তৈরি হয়েই থাকে। খুব আনন্দ হলেও ওরা কেঁদে ভাসায়।... নিঃসন্দেহে আপনাদের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি ভদ্রমহোদয়গণ! তা হলে এখন এই বিষয়ে... আপনাদের রায় দেবেন কি?...

    আচ্ছা, তা হলে আপনাদের মনে হয় যে নারীদের সব দিক থেকে চাপে রাখা উচিত? তাঁদের ওপর ভরসা করা উচিত নয়? বহত খুব! আপনার বেটা এই সাহেবজ়াদা সমুদ্রপারে চাকরি করে? আল্লাহ্‌ তাকে অনেক দিয়েছেন? প্রথম বিবির সন্তান হচ্ছিল না? তাই ফটাফট দ্বিতীয় বউ বিয়ে করে এনেছে? ভালোই তো করেছে, মান্যবর! বংশরক্ষা তো গুরুত্বপূর্ণ। চলিয়ে, কোই বাত নহিঁ। অপেক্ষা করুন, আল্লাহ্‌ কখনও সখনও দশ-পনেরো বছর অপেক্ষার পরেও সন্তান দেন।... আচ্ছা, তা হলে আপনার এই সাহেবজ়াদা দুবছরে একবার ছুটিতে আসে?... তার অনুপস্থিতিতে আপনি দুই বউমার শোবার ঘরের দরজার কাছে চারপাইটা আড়াআড়ি পেতে শুয়ে থাকেন? বেশ ভালো পথ বেছেছেন তো! আপনার পরিবারের ইজ্জত নিয়ে কেউ আর একটা কথাও বলতে পারবে না। বাঃ, দারুণ! বহত খুব। আচ্ছা, তা হলে সাহেবজ়াদা, আপনার আব্বা সাহেব মহিলাদের চাপের মধ্যে রাখার কথা বলছিলেন। দারুণ! আপনিও তাঁর সঙ্গে একমত! আপনার মনে হয় বিবিদের কারও প্রতি পক্ষপাত দেখানো উচিত নয়? খুব ওড়াও, খাওয়াও পরাও... দুয়ের জায়গায় চারজন হলেও নিজেদের মধ্যে মানিয়েই থাকবে? ঠিক যেমন আপনার দুই বিবি থাকেন? ও, আপনি প্রথমেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে নিজেদের মধ্যে ভালোবেসে না থাকতে পারলে তাদের মুখ দেখবেন না? ভালো ধমক দিয়েছিলেন তো! তা হলে এখন তাদের দুজনের ভালোবাসার কোনও সীমা নেই। একে অপরকে ছাড়া থাকতেই পারে না? আপনার সঙ্গে কখনও কোনও ঝগড়াঝাঁটি হয় না? অসাধারণ! বিবিদের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি করা কোনও মামুলি কাজ নয়। আপনাকে অভিনন্দন।... .

    আহ্‌...হা... আর ওই যে রঙিন বাঁকা রেখার মধ্যে বোরখা পরা দুই বিবি মাথায় মাথা ঠেকিয়ে, একে অন্যের হাত পাকড়ে চুপচাপ বসে আছে, ওরা আপনার পরিবারের নয় তো? আপনারই? ….আপনি তারিফ পাওয়ার যোগ্য।

    আরে বিবি, আমার আস্তিনটা ছাড়ুন! যা বলার আছে বলুন। আচ্ছা, তা হলে আপনি চাননকে বহু বছর ধরে চেনেন? ছোটবেলা থেকেই ওই দুরাচার চাননের বাগদত্তা? হ্যাঁ, হ্যাঁ, জানি। আদালতে এই কথাটা উঠেছিল বটে। এখানে মহিলারাও তাই বলছিলেন। আর কী বলার আছে বোন, জলদি বলুন। আচ্ছা, তা হলে এই মুজরিম তার রোজগার ইয়ার-দোস্তদের সঙ্গে নিয়ে উড়িয়ে দিত? ওর মা তাতে খুব চিৎকার-চেঁচামেচি করতেন? ঠিকই তো করতেন। আর আপনি বলছেন অপরাধীর আর কোনও দোষ ছিল না? ভালো গুণ এটা ছিল যে খুব সুন্দর গান গাইত? কিন্তু বোন, এটাও তো ভাববেন যে গান গাইলে মায়ের পেট ভরে না।... তা হলে এই কারণেই অপরাধীর সঙ্গে চাননের বিয়ে না হয়ে তাকে চৌধুরীর বিবি করে শান্তির জীবন দেওয়া হয়েছিল? চলুন, এবার ছুটি দিন... .আচ্ছা, আরও বলার আছে? বলতে চাইছেন আপনার কাহিনিও চাননের মতই? আপনার বিয়েও অন্য কোথাও দেওয়া হয়েছিল? দারুণ! দারুণ! আপনি চাননকে বোঝাতেন কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ? কিন্তু সে কিছু বোঝার চেষ্টা না করেই পালিয়ে গিয়েছিল? আরে ভাই বিবি, আপনি কেন এমন বাচ্চাদের মত কাঁদছেন? …..আপনি চাননকে খুব ভালোবাসেন। তা নয়? তা হলে কেন কাঁদছেন? সবার সামনে? কিছু তো বলুন, আমি সকলের মতামত সংগ্রহ করছি। চোখের জলটা মুছুন। চানন পালিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আপনি পালাতে পারেননি?

    আশ্চর্য কথা বললেন! আরে, আরে... ওই বিবি তো পাগলের মত তিনপায়াটার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন!... ওকে আটকানো তো রক্ষীদের কাজ। তারাই সেটা করবে।

    দেখুন, চিৎকার আর স্লোগান এবার থেমে গেছে। যে হাতগুলো এতক্ষণ অশ্লীল ইশারা করছিল, সেগুলো এখন নিস্তেজ হয়ে ঝুলছে। মহিলারা কাঁদছে। বাচ্চারা যেন আরও গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে। যে কাপড়ের টুকরোটা মুজরিমের লজ্জা নিবারণ করছিল, সেটা রক্তে ভেসে গেছে। তার মাথাটা একদিকে হেলে পড়েছে। ওই দেখুন! ডাক্তার সাহেব তেপায়ার দিকে চলেছেন। যতগুলো চাবুকের ঘা পড়ার কথা ছিল, তা এখনও পুরো হয়নি।

    জনাব, লোকের জমায়েত খুব বেড়েছে। এত লোক যে আরও মানুষের মতামত আপনাদের কাছে পৌঁছোতে পারব না। ... সে কাজটা আমার সহকর্মী করবে। রক্ত পড়তে দেখে আপনাদের এই সেবকের মাথা তো চক্কর কাটছে। ভালো হয় যদি এখন ঘরে ফেরার পথ ধরি।

    এই, এই ছেলে, তুই আমার পেছনে লাঠিটা ঘোরাচ্ছিস কেন? মারব এক থাপ্পড়? আগে চল! তুই ছাগল-ভেড়া চড়াস? ভেতরে তামাশা দেখতে গিয়েছিলি?

    কমবখত, বাইরে ছাগলগুলো তো সব এদিক ওদিক ছড়িয়ে যাবে? চল, ভাগ জলদি সে! জনগণ যখন বেরোবে, তখন তো বকরিগুলো সব চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে যাবে। ... সাবাস! তাড়াতাড়ি গিয়ে ওদের ধর...

    আর কী বলব! একটা এত সুন্দর সাদা ছাগল... প্রকৃতির কী অদ্ভুত সৃষ্টি! ক্ষুর তো নয়, যেন কালো ফুলবুট পরে আছে। গলাতেও একটা কালো টাইয়ের মত বাঁধা। বাহ্‌... বাহ্‌... কী বল্‌ মেষপালক! তুই ওই ছাগলটা আমাকে বেচবি? আমার বাচ্চারা ওর সঙ্গে খেলবে। বেচবি না? কেন, বেচবি না কেন? হ্যাঁ, কী বললি? এটা তোর প্রাণ... আর তুই... ওর জন্য চাবুকের মারও খেতে পারিস? দাঁড়া তো, এই হারামজাদা...

    আরে, এ তো চাবুকধারীর স্টাইলে দৌড়োচ্ছে! আর... ইয়া খুদা... ছাগলটার শরীরের নরম জায়গাতেই ওর লাঠির বাড়িটা পড়ছে! ইয়া খুদা... এই চাবুকের আওয়াজও কত তাড়াতাড়ি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ভেসে যায়!



    অলংকরণ (Artwork) : অনুবাদক
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)