• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৩ | জানুয়ারি ২০২৪ | প্রবন্ধ
    Share
  • মাকে মনে পড়ে আমার: আলবের কোয়েনের ‘মায়ের বই’ : শুভময় রায়

    ‘তার মায়ায় ভরা সজল বীথি
    সেকি কভু হারায়
    সে যে জড়িয়ে আছে
    ছড়িয়ে আছে
    সন্ধ্যা রাতের তারায়...’

    উনিশ শো চৌষট্টির ফ্রান্সে ‘এ ভেরি ইজ়ি ডেথ’ (Une mort très douce) শিরোনামে সিমোন দ্য বোভোয়ারের উপন্যাস প্রকাশিত হয়। সে বইতে ছিল তাঁর মায়ের মৃত্যুর বর্ণনা। কয়েক বছর পরে তাঁর স্মৃতিকথা ‘অল সেইড অ্যান্ড ডান’ (Tout compte fait)-তে সিমোন লিখলেন:

    যাঁদের সঙ্গে চিঠিপত্রের বিনিময় হয়, তাঁরা জানিয়েছেন যে উপন্যাসের বিষয়বস্তুর অন্তর্নিহিত বিষণ্ণতা সত্ত্বেও তা তাঁদের জীবনের বর্তমান অথবা অতীতের দুঃখকষ্ট সহ্য করার শক্তি যুগিয়েছে। পত্রলেখকদের এই বিবৃতিগুলোর জন্যই বিষয়টা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনও প্রিয়জনের মৃত্যুর বিরহ-বেদনা সইতে সাহায্য করেছে। দুঃখ হয়ত আমাদের ছিঁড়েখুঁড়ে দেয়। কিন্তু, যিনি তা সহ্য করছেন তিনি যদি বাকি পৃথিবীর থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বলে মনে করেন, তা হলেই সে দুঃখ অসহ্য হয়ে ওঠে। যদি দুঃখ ভাগ করে নেওয়া যায়, তা হলে অন্তত সেই নির্বাসনের অনুভূতি থেকে দূরে থাকা যায়। পাঠক আর লেখকের মধ্যে মধ্যস্থতা করে শব্দ। আর শব্দকে কাজে লাগিয়ে লেখক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতাকে সর্বজনীন রূপ দেন। ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও সান্ত্বনা, সহমর্মিতা বা বন্ধুত্বের পরশ পাঠককে ছুঁয়ে যায়। আমার মতে সাহিত্যের একটি অত্যাবশ্যক ভূমিকা হল আমাদের সকলের একাকিত্ব ঘোচানো – আমরা একে অপরের সম্পূর্ণ অপরিচিত হলেও। সাহিত্য এই কারণেও অপরিহার্য...।

    স্বজন হারানোর বেদনাকে সাহিত্যে কেমন সর্বজনীন রূপ দেওয়া যায়, ফরাসি সাহিত্যে তার অনবদ্য উদাহরণ রেখেছিলেন আলবের কোয়েন (Albert Cohen: 1895-1981) এর বছর দশেক আগে। সন্তানের প্রতি মায়ের অপার স্নেহ-ভালোবাসার মর্মস্পর্শী নিদর্শন ‘বুক অব মাই মাদার’ (Le livre de ma mère) লিখে। মা লুইজ় কোয়েনের (Louise Cohen) মৃত্যুর দশ বছর পরে রচিত হয়েছিল সে বই। মায়ের মৃত্যুর অব্যবহিত পরের সময়টাকে আলবের কোয়েন বর্ণনা করছেন এইভাবে:

    ওরা তাঁকে তুলে নিয়ে গেল। মূক তিনি – কোনও প্রতিবাদ করলেন না। সেই মহিলা যিনি রান্নাঘরে অত ব্যস্তসমস্ত থাকতেন। ওরা তাঁকে সেই বিছানা থেকে তুলে নিল যেখানে শুয়ে শুয়ে প্রায়ই তিনি ছেলের কথা ভাবতেন, ছেলের চিঠির অপেক্ষায় থাকতেন। দুঃস্বপ্নে দেখতেন ছেলের বুঝি কোনও মারাত্মক বিপদ হয়েছে। ওরা তাঁর শক্ত হয়ে যাওয়া শরীরটাকে তুলে নিয়ে বাক্সে ভরে পেরেক ঠুকে ঢাকনা বন্ধ করে দিল। তিনি এখন বাক্সে ভরা একটা জিনিস, দুটো ঘোড়া যাকে বয়ে নিয়ে গেল। অথচ, রাস্তাঘাটে মানুষের কেনাকাটা যেমন চলছিল তেমনই তো চলেছে।

    আলবের যখন খুবই ছোট, তখন ভোর হওয়ার আগেই তাঁর মাকে স্বামীর সঙ্গে কাজে বেরোতে হত। মা বেরিয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরে শুনশান ঘরে আলবেরের ঘুম ভাঙত। বালক উঠে দেখত টেবিলে গরম দুধ আর কফি ঢাকা দেওয়া আছে। আর কাপটাকে ঘিরে আছে মায়ের হাতে আঁকা ছোট ছোট ছবি। ভোর পাঁচটায় উঠে পুত্রকে আশ্বস্ত করার জন্য তাঁর চুম্বনের বদলে মা এঁকে রেখে যেতেন সেই সব ছবি:

    আমি এখনও সেই ছবিগুলো স্মরণ করতে পারি: একটা জাহাজ ছোট্ট আলবেরকে নিয়ে চলেছে। শুধু তারই জন্য রয়েছে একটা দৈত্যাকার কড়াপাকের মিঠাই। মিঠাইয়ের পাশে তাকে পুঁচকে দেখাচ্ছে। গিয়োম নামের একটা হাতি মেয়ে বন্ধু পিঁপড়েকে পিঠে নিয়ে চলেছে। মেয়ে বন্ধুটিকে ‘নাস্‌ত্রিন’ এই মিষ্টি নামে ডাকলেই শুধু সে সাড়া দেয়। আছে একটা জলহস্তীও যে স্যুপটা খেয়ে শেষ করতে পারেনি।....সেই সব দিনগুলোতে আমি মায়ের ছবির সামনে বসে একাই সকালের খাবার খেতাম। যাতে নিঃসঙ্গতায় না ভুগি, তার জন্য তিনি আমার কাপের কাছে নিজের ফোটোটাও রেখে যেতে ভুলতেন না...।

    মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা লেখকের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। চরম একাকিত্ব ঘুচিয়েছিল। তাই মাতৃবিয়োগের পরে মায়ের স্মৃতিকে পাথেয় করে তিনি লিখে ফেললেন গোটা একটা উপন্যাস। কিন্তু মাকে এভাবে আঁকড়ে ধরার কারণ কী? কারণ খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে সিমোন দ্য বোভোয়ার যে বিচ্ছিন্নতা, সমাজ থেকে যে নির্বাসনের অনুভূতি, যে একাকিত্বের উল্লেখ করেছেন, তার ভেতরে। উনিশ শো আটাত্তরে প্রকাশিত Carnets-তে শৈশবের একদিন পার্কে তাঁর যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, আলবের কোয়েন তার বর্ণনা দিয়েছেন:

    সুন্দর সাজগোজ করা ছোট্ট একটা ছেলে আমাকে বলল তার সঙ্গে খেলতে। আমি তো সঙ্গে সঙ্গেই রাজি। খুব খুশি যে একটা বন্ধু পেলাম তা হলে। এমন সময় তার মা তাকে ডাকলেন। সে চলে গেল। ফিরে এসে বলল তার মা নাকি আমাকে দেখতে চাইছেন। আমরা দুজন হাত ধরাধরি করে ছুটতে ছুটতে গেলাম। আমি টুপিটা খুলে সেই সুন্দরী ভদ্রমহিলাকে মনের আনন্দে ‘শুভদিন’ জানালাম। খুশির কারণ আমার তা হলে একটা বন্ধু হল, আমি যার সঙ্গে খেলতে পারব! আমাদের দেখে ভদ্রমহিলা চুপ করে গেলেন, আমাকে ভালোভাবে ঠাহর করে নাম জিজ্ঞেস করলেন। বললাম আমি আলবের। তারপরে তিনি আমার পদবী জানতে চাইলেন। আমি সেটা বলায় আবার আমার দিকে চাইলেন। পরক্ষণেই আমাকে দূরে গিয়ে খেলার আদেশ করলেন। যখন আমি আবার বন্ধুর হাত ধরেছি, তখন তিনি তাকে টেনে ধরে রাখলেন। আমাকে বললেন, “না একা গিয়ে খেলো, আমরা এখন বাড়ি ফিরব।” আমি মনের দুঃখে সেখান থেকে চলে এলাম।

    বালক আলবেরের দোষ সে জাতে ইহুদি। তাই কেউ তার বন্ধু নয়, বাইরের জগতে সে একা। কৈশোরের আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা আলবের কোয়েন জানাচ্ছেন অন্য এক গ্রন্থে (Ô vous, frères humains)। দশ বছরের জন্মদিনে পকেটে তিন ফ্রাঁ নিয়ে এক বিকেলে তিনি হেঁটে চলেছেন মার্সেইয়ের রাস্তায়। গ্রীষ্মের স্কুলে অঙ্কের ক্লাস সবে শেষ হয়েছে। জামাকাপড়ের দাগ ওঠানো যায় এমন কিছু বিক্রি করছে রাস্তার এক হকার। তার চারদিকে ভিড়। বালক আলবেরের মনে হল এটা কিনে নিয়ে গেলে মা নিশ্চয়ই খুশি হবেন। আর সে যদি জিনিসটা কেনে, তা হলে ভিড় করে থাকা মানুষজন আর সেই ফিরিওয়ালাও নিশ্চয়ই আনন্দ পাবে। সে হাসি মুখে এগিয়ে গেলেও ফেরিওয়ালা তাকে দেখতে পেয়েই যেন চুপ করে গেল। তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই তো শালা একটা ইহুদি, না? একটা নোংরা ইহুদি, তাই না? আমি তোর থোবরাটা দেখেই সেটা বুঝেছি। তুই তো শুয়োর খাস না, তাই না? তুই একটা নোংরা ইহুদি, না? তোর বাপ বিশ্বের টাকাপয়সা নিয়ে মাথা ঘামায়, তাই না? আর তুই ফরাসিদের রুটি ধ্বংস করতে এসেছিস? ভালো কথা, আমরা এখানে ইহুদিদের দেখতে ভালোবাসি না। ওরা একটা নোংরা জাত। এখান থেকে ফোট, তোদের আমরা অনেক দেখেছি। এটা তোর বাড়ি নয়, তোর দেশ নয়। পালা, কেটে পড়, জায়গা ছাড়....যা না, গিয়ে একটু তোদের জেরুজ়ালেমটা দেখে আয়...’

    বালক আলবের আতঙ্কে হতভম্ব হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই ফেরিওয়ালা তার গালে সপাটে চড় মেরে তাকে সেখান থেকে সরে যেতে বলল।

    আলবের কোয়েনের জীবনে সেটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক মুহূর্ত। সেই দিনের আগে পর্যন্ত তাঁর ধারণা ছিল না যে ইহুদি জাতের সঙ্গে নেতিবাচক কিছুর সম্পর্ক থাকতে পারে। আসলে সে নিজের পরিচয় সম্পর্কেই সচেতন ছিল না। কিন্তু সেই দিনটির পর থেকে তার একমাত্র পরিচয় হয়ে উঠল এই যে সে ইহুদি। এ যেন অনেকটা ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ (Le Deuxième Sexe)-তে সিমোন দ্য বোভোয়ারের সেই উক্তির মত, ‘আমরা নারী হয়ে জন্মাই না, নারী হয়ে উঠি।‘ আলবের কোয়েন সেদিন থেকে ইহুদি হয়ে উঠলেন। তাঁর ইহুদি পরিচয়জনিত যে একাকিত্ব তার উপশম হত মায়ের সঙ্গ পেয়ে। নাৎসিদের হাত থেকে বাঁচতে তিনি লন্ডনে পালিয়ে যাওয়ার অল্পদিন পরেই ১৯৪৩-এ মার্সেই থেকে মায়ের মৃত্যুসংবাদ এল। আলবের শোকপ্রকাশ করেছিলেন ‘লা ফ্রঁস্‌ লিব্র’ (La France Libre) পত্রিকায় একগুচ্ছ রচনা লিখে যা পরবর্তীকালে সংকলিত হয়ে ‘বুক অব মাই মাদার’ (Le livre de ma mère) নামে প্রকাশিত হয়। সৎ, ঘনিষ্ঠ, মর্মস্পর্শী সে উপন্যাসটি হয়ে উঠল সমগ্র মাতৃজাতির উদ্দেশে লেখকের শ্রদ্ধার্ঘ্য:

    মায়ের জন্য কান্না হল নিজের শৈশবের জন্য কাঁদা। মানুষ শৈশবকে চায়, তাকে আবার ফিরে পেতে চায়। বয়েস যত বাড়তে থাকে, মায়ের প্রতি ভালোবাসাও যদি ততই বাড়তে থাকে, তা হলে তার কারণ হল মাই তো তার শৈশব। আমিও শিশু ছিলাম। এখন যে আর শিশু নই সেটা আমাকে আশ্চর্য করে।

    ‘আমার মায়ের বই’-তে লেখক সেই মহিলার প্রতি তাঁর ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন যিনি তাঁকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন। মৃত্যুর পরে মায়ের অস্তিত্ব তাঁর চেতনায় সদা জাগ্রত। বই লেখার সময় মায়ের বিদেহী আত্মার উপস্থিতি যেন তাঁকে ঘিরে আছে। নিজের শৈশব আর কৈশোর জীবনের ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনায় মা যেন বারবার তাঁর কাছে ফিরে আসছেন। কর্ফু (প্রাচ্য) থেকে ফ্রান্সের (পাশ্চাত্য) মার্সেই শহরে বাবা-মা চলে এসেছিলেন জীবিকার সন্ধানে। গরীব ইহুদি দম্পতি আর তাঁদের একমাত্র ছেলেটির দিন গুজরান হত ডিম কেনাবেচার মধ্যে দিয়ে:

    হঠাৎই মার্সেইতে আমাদের আগমনের কথা আমার মনে পড়ল। আমি তখন পাঁচ। মা চেরি-আঁকা টুপি পরেছিল। জাহাজ থেকে নামার সময় আমি তাঁর স্কার্ট চেপে ধরেছিলাম। ট্রামগুলো দেখে ভয় পেয়েছিলাম। কেউ না টানলেও সে গাড়িগুলো চলে! আমি ভেবেচিন্তে নিজেকে আশ্বস্ত করেছিলাম এটা কল্পনা করে নিয়ে যে গাড়ির ভেতরে নিশ্চয়ই একটা ঘোড়া লুকোনো আছে!

    প্রবাসের প্রথম দিনগুলো ছিল অতি কষ্টের। সম্পূর্ণ অপরিচিত নতুন দেশে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া, বাবা-মায়ের জীবিকার অনুসন্ধানে বেরোনো – এসবই ছোট শিশুটিকে হতভম্ব করে দিয়েছিল:

    মার্সেইতে আমরা কাউকে চিনতাম না। আমাদের কর্ফুর গ্রিক দ্বীপ থেকে আমরা সেখানে এসে নেমেছিলাম স্বপ্নের মত – মা, বাবা আর আমি – সেটা যেন একটা উদ্ভট স্বপ্ন, হাস্যকর, নিরর্থক কোনও স্বপ্ন। মার্সেই কেন? তা সে অভিযানের যিনি নেতা তিনিও জানতেন না। তিনি শুধু শুনেছিলেন মার্সেই একটা বড় শহর। আমার বেচারা বাবার প্রথম কৃতিত্ব ছিল আমাদের আগমনের কিছুদিন পরেই সোনালি চুল অথচ নাকটা বেঁকা নয় এমন এক জোচ্চোর ব্যবসায়ীর জালিয়াতির শিকার হওয়া। আমি এখনও দেখতে পাই বাবা-মা হোটেলের ঘরে তাঁদের বিছানার প্রান্তে বসে কাঁদছেন। মায়ের চোখের জল টপটপ করে তাঁর কোলের ওপর রাখা চেরি-আঁকা টুপির ওপর পড়ছে। কী হয়েছে তা না বুঝলেও আমিও কাঁদছি।

    সে ঘটনার পর থেকে আলবেরের মা লুইজ় ফ্রান্সকে আর কখনই স্বদেশ বলে ভেবে উঠতে পারেননি। গ্রীষ্মের এক রবিবারে মায়ের সঙ্গে বেড়ানোর স্মৃতিচারণ করেছেন লেখক। বাইরে তাঁরা যতক্ষণ ছিলেন সেই পুরোটা সময় তাঁদের অতিসতর্ক আত্মসচেতনতা আর শেষ পর্যন্ত বাইরের জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অসফল প্রচেষ্টাও বর্ণনা করেছেন তিনি:

    সেই সবুজ টেবিলে বসে আমরা অন্য গ্রাহকদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তাঁরা কী বলছেন চেষ্টা করছিলাম শুনতে। সেটা কিন্তু কোনও অশ্লীল কৌতূহলবশত নয়। আমরা মানুষের সঙ্গ পাওয়ার জন্য ছিলাম কাঙাল। দূরে থেকেও যদি একটু তাদের বন্ধু হওয়া যায়! আমরা চাইছিলাম সেখানকার বাসিন্দা হয়ে উঠতে।

    আলবের যখন কলেজে যাওয়ার মত বড় হয়েছেন, তখন মার্সেই থেকে জেনিভায় চলে গেলেন। আরও পরে তিনি যখন কাজের জগতে প্রবেশ করেছেন, তখন মা কখনও সখনও তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন, কয়েক মাস থাকতেন:

    হঠাৎই তিনি আমার বাহুটা ধরলেন, আমার ওপর ভর রেখে যেন আনন্দ পাচ্ছেন। বললেন, বল আমার চোখের তারা, তুই যে রূপকথাগুলো লিখিস (আমার সদ্য প্রকাশিত উপন্যাসকে তিনি তাই বলে ডাকতেন) সেগুলো তোর মাথার মধ্যে কীভাবে খুঁজে পাস? খবরের কাগজে যখন কোনও দুর্ঘটনার কথা লেখে, সে তো তেমন কঠিন কিছু নয়। সে ঘটনা তো বাস্তবিকই ঘটেছে। ওদের শুধু উপযুক্ত শব্দ দিয়ে তার বিবরণ লিখতে হয়। কিন্তু তোর এগুলো তো আবিষ্কার! তোর মাথা থেকে বেরোচ্ছে শত শত শব্দ। এ তো পৃথিবীর এক আশ্চর্য! ...শত শত পাতা! মা এমনভাবে আবার বললেন, যেন স্বপ্ন দেখছেন: আর আমি, আমি তো সমবেদনা জানিয়ে একটা চিঠিও লিখতে পারি না। ...তুই আমাকে শোক প্রকাশের একটা মডেল চিঠি লিখে দিস। তবে বড় বড় শব্দ দিস না যেন, তা হলে তো লোকে বুঝে ফেলবে চিঠিটা আমি লিখিনি! তারপরে হঠাৎই তিনি আরামের শ্বাস ছাড়লেন। তোর সঙ্গে হাঁটতে কত ভালো লাগে। তুই তো অন্তত আমার কথা শুনিস। তোর সঙ্গে কথোপকথন চালানো যায়।

    লেখক যদিও শেষমেশ তাঁর শৈশবের বাধানিষেধের বোঝা ঝেড়ে ফেলে এমন এক আত্মবিশ্বাসী যুবক হয়ে উঠলেন যিনি ‘প্রাচ্য’ অথবা ‘পাশ্চাত্য’ রূপ ধারণ করে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন, তাঁর ঘরে থাকা মায়ের জীবনে কখনও সে সুযোগ আসেনি। চিরকালীন বিদেশি হিসেবে তাঁর জীবনের সঙ্গে সব সময় জড়িয়ে ছিল সেই উদ্বেগ। ছেলে আলবের এর বর্ণনায়:

    তিনি কারও কাছে যেতেন না, তাঁর ওপরে ন্যস্ত থাকা দায়দায়িত্ব পালন করতেন, অধিকাংশ সময় একাই ফ্ল্যাটে থাকতেন। যেন সেই অ্যাপার্টমেন্টটাই তাঁর জীবন। যেন ছেলেকে চিঠি লেখা, ছেলের জন্য অপেক্ষা করে থাকা, বিদেশবাসী ছেলের কাছে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া, শুনশান ফ্ল্যাটে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করা – এই ছিল তাঁর জীবন। তিনি দর্শক হয়েই রয়ে গেলেন, খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পারলেন না। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর জন্য নির্দিষ্ট হয়ে রইল একাকিত্বের জীবন – তিনি যেন এক লাজুক শিশু যে সমাজ জীবনের কেকের দোকানের কাচের জানলায় তার ক্ষুধার্ত মুখটি চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

    মা লুইজ়ের ঘনিষ্ঠ উপস্থিতি লেখক টের পাচ্ছেন গোটা উপন্যাস জুড়ে। মায়ের সঙ্গে যেন কথা বলছেন, তাঁকে ডাকছেন। মা যে গৃহটি সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতেন তার বর্ণনা দিচ্ছেন। পুত্রের প্রতি মায়ের অপার ভালোবাসা, সন্তানের জন্য তাঁর আত্মত্যাগের কাহিনি বিধৃত হয়ে রয়েছে উপন্যাসটির প্রতিটি ছত্রে। মায়ের আত্মা লেখকের কাছে ফিরে আসছে সেই রূপটি ধরে যে রূপে মাকে তিনি শেষ জীবিত দেখেছিলেন। কিন্তু বেশিক্ষণ সে দৃশ্য যেন সহ্য হচ্ছে না। মৃতদের ভয়ঙ্কর ব্যাপারটা হল তাঁদের হাবভাব, অঙ্গভঙ্গি। সেগুলো আমাদের চেতনায় বেঁচে থাকে:

    বেচারি মা, তুমি কী ভয়টাই না পেতে এই ভেবে যে তোমার হাবভাব যথেষ্ট পশ্চিমি নয় – তা আমার ভালো লাগবে না।

    মায়ের প্রতিকৃতি, তাঁর দেওয়ালে টাঙানো ছবিও যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে:

    আমি তাঁর ফোটোগুলোর দিকে তাকানোর সাহস পাই না। জানি যে ওর মধ্যে থেকেও তিনি আমার কথাই ভাবছেন। ....আমি যেমন জীবিতদের মধ্যে আংশিক মৃত, মৃত হলেও তুমিও যেন তেমনই আংশিক জীবিত।

    মায়ের নম্রতা, তাঁর বিনয়, নিজের অস্তিত্ব প্রায় মুছে দিয়ে স্বামী-পুত্রের প্রতি নিবেদিত থাকা – এসবই বিবৃত হয়ে রইল আলবের কোয়েনের মায়ের বইটিতে। পুত্র হয়ত কোনও অসতর্ক মুহূর্তে সেই মায়ের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে ফেলেছেন, তারপরে অনুতপ্ত হয়েছেন:

    একবার আক্রোশবশত তাঁর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিলাম যা একেবারেই উচিত ছিল না। পুত্রের নিষ্ঠুরতা! সেই অভাবনীয় নিষ্ঠুর দৃশ্য যা আমার জন্যই ঘটেছিল। আর কী কারণে? না ভোর চারটেয় আমি তখনও বাড়ি ফিরিনি দেখে – ছেলে ঘরে না ফেরা পর্যন্ত তিনি ঘুমোতে পারতেন না – তিনি সেই কেতাদুরস্ত লোকেদের টেলিফোন করেছিলেন যারা সে রাতে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তিনি শুধু আশ্বস্ত হতে চেয়েছিলেন যে আমি ভালো আছি – খারাপ কিছু ঘটেনি। বাড়ি ফিরে আমি যে অমানবিক ঘটনা ঘটিয়েছিলাম তা এখনও আমার মনে খোদাই হয়ে আছে। আমি যখন বোকার মত তাঁকে বকুনি দিচ্ছি, তখনও আমার সন্ন্যাসিনীর মত মায়ের নম্রতা, তাঁর মর্মস্পর্শী বিনয় – তিনি কী দোষ যে করেছেন তা বুঝতে না পারলেও যেন তিনি নিশ্চিত যে দোষটা তাঁরই। অথচ, বেচারা মা, তিনি তো কোনও দোষই করেননি। তিনি কেঁদে ভাসিয়েছিলেন...আমার ছোট্ট শিশুটি তিনি....আর আমার অত রাগের কারণটাই বা কী ছিল?.....বোধহয় ফোন করার সময় তাঁর বেঠিক উচ্চারণে ভুল ফরাসি বলার জন্য আমি অপ্রস্তুত বোধ করেছিলাম.....সেই উচ্চারণ, সেই ভাষা তো আমি এ জীবনে আর কখনই শুনতে পাব না।....আমার কৃতকর্মের সেই দৃশ্যটি এখনও আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। আমি যাঁকে এত ভালোবাসতাম, তিনি সেদিন কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন “আমি ক্ষমা চাইছি”...

    মাকে যে দুঃখ দিয়েছিলেন, সেই স্মৃতি পুত্রকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তিনি নিজেকে ক্ষমা করতে পারছেন না। মাকে দুঃখ দেওয়ার জন্য লেখকের যে অনুতাপ তা শেষ হচ্ছে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধামিশ্রিত ভালোবাসার ঘোষণায়:

    ...আমি সেই একবারই তোমার প্রতি নিষ্ঠুর হয়েছিলাম। যখন ক্ষমা চেয়েছিলাম, তখন তুমি কত খুশি হয়েই না আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলে। তুমি জানতে, তাই না, যে আমি তোমায় প্রাণভরে ভালোবাসি?

    ‘আমার মায়ের বই’ পড়তে পড়তে মনে হয় যে মৃত্যু, আমাদের মরণশীলতার বোধ ঘনিষ্ঠ মানুষদের সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে – আমরা যেন দোষ স্বীকার করে শুদ্ধ হয়ে ওঠার চেষ্টা করি। রাগ দেখিয়ে, বিদ্বেষ বা ঘৃণা পুষে রেখে কী লাভ যখন আমরা সকলেই জানি এমন একটা সময় খুব তাড়াতাড়িই আসবে যখন আমরা আর এ পৃথিবীতে থাকব না?

    এ রচনাটির সূচনা হয়েছিল সিমোন দ্য বোভোয়ারের উপন্যাসের সূত্র ধরে। তাঁর Une mort très douce পড়লে মনে হবে মৃত্যুশয্যায় মায়ের শুশ্রূষা করার আগে পর্যন্ত মায়ের প্রতি ভালোবাসা লেখিকার হৃদয়ে ফিরে আসেনি – সেই মা যাঁকে এক সময় স্বৈরাচারী মনে হত, যিনি সন্তানদের জীবনে অহেতুক নাক গলাতেন, যিনি মনে করতেন মেয়ের কাছে যে চিঠিগুলো আসে সেগুলো পড়ে দেখার অধিকার তাঁর আছে। কিন্তু মৃত্যুর আগে মায়ের রুগ্ন, অসহায়, ক্ষয়িষ্ণু শরীরটা, রোগের সঙ্গে লড়াই করার তাঁর সাহস যেন মেয়ের মনে সেই ভালোবাসা ফিরিয়ে নিয়ে এল যা কদর্যতা অথবা দুর্বলতাকে ভয় পায় না। সিমোন দ্য বোভোয়ার লিখছেন:

    আমি সেই মুমূর্ষু মহিলাকে ভালোবাসতে শুরু করলাম। আধো অন্ধকারে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমি অতীতের অসুখী অনুভূতিগুলোকে প্রশমিত করার চেষ্টা করলাম। আমি যখন কিশোরী তখন যে কথোপকথনে ছেদ পড়েছিল, তা যেন আবার নতুন করে শুরু হল। আমাদের দুজনের মধ্যে যা কিছু আলাদা আর যা অনুরূপ সেগুলোই বোধহয় সেই কথাবার্তা আবার চালু করায় এতদিন বাধা দিয়েছিল। শৈশবের সেই স্নেহ-ভালোবাসা, যা আমি চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে বলে মনে করেছিলাম – আবার জেগে উঠল শুধু এই কারণে যে সহজ, সাধারণ কথা আর কাজের ফাঁক দিয়ে গলে সেগুলোর আবার অনুপ্রবেশ ঘটল।

    আলবের কোয়েন মনে করেছেন মায়ের বইটি তাঁর প্রায়শ্চিত্তের প্রচেষ্টা, মা জীবিত থাকাকালীন পুত্র হিসেবে তাঁকে পুজো করার ব্যর্থতা ঘোচানোর প্রয়াস:

    বাস্তবিকই অভাবনীয় ছিল সে সময়টি যখন শুধু দশটা শব্দ লিখে একটা টেলিগ্রাম পাঠালেই তিনি খুশি হতেন – ম্যাজিকের মত। আমার হাতেই ছিল সেই জাদুকাঠি – কিন্তু তখন তা ব্যবহার করিনি। বোকার মত তখন আমার মনকে আচ্ছন্ন করে ছিল উর্বশীরা। তখন দশটা শব্দ লিখতেও ছিল অনীহা। তাই এখন লেখো চল্লিশ হাজার শব্দ!

    যখন তাঁর বয়েস হচ্ছে, মরণশীলতা আর তজ্জনিত উদ্বেগ মনের মধ্যে গেড়ে বসছে, তখন কেউ সিমোন দ্য বোভোয়ারকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল যে তাঁর রচনাগুলো অমর হয়ে থাকবে। সিমোনের উত্তর ছিল, ‘যদি আপনি জীবনকে ভালোবাসেন, তা হলে মৃত্যুর মুখে অমরত্বের আশ্বাস কোনও সান্ত্বনা দেয় না।‘ আলবের কোয়েনের মায়ের কাছে তাঁর পুত্রের নিবেদন কোনও সান্ত্বনা বয়ে নিয়ে গেল কি না তা জানা যাবে না। তবে চিরকালীন মাতৃত্বের বন্দনাগান ‘আমার মায়ের বই’ যে লুইজ় কোয়েন-কে অমর করল সে বিষয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।


    [মূল ফরাসি থেকে সব উদ্ধৃতির বঙ্গানুবাদ প্রবন্ধকারের।]

    তথ্যসূত্র:

    ১। Albert Cohen, Le Livre de ma mère. (Paris: Gallimard, 1954)

    ২। Simone de Beauvoir, Tout Compte fait (Paris: Editions Gallimard, 1972)

    ৩। Albert Cohen, Carnets 1978. (Paris: Gallimard, 1979)

    ৪। Albert Cohen, O Vous, Frères humains. (Paris: Gallimard, 1972)

    ৫। Simone de Beauvoir, Une Mort très Douce (Paris : Gallimard, 1964)

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)