• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৩ | জানুয়ারি ২০২৪ | গল্প
    Share
  • মালগুঞ্জি : অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়



    ১ গুঞ্জামালা গলে...

    এই নিয়ে তৃতীয়বার ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল।

    ভরা আসরে বহুবার গাওয়া চেনা গান, সুর পাল্টে, তাল পাল্টে গেয়ে এল সৌমিত্র। বলা ভাল কেউ যেন তার ঘাড় ধরে করিয়ে নিল এ কাজ। গানটা বাগেশ্রীর ধাঁচে, কিন্তু গাইতে বসলেই বারবার ধ় নি় সা রে গ -ম জাতীয় ফ্রেজ এসে সুরের মোকাম পাল্টে দিচ্ছে।

    কৌশিক, যে প্রায় তিন-চার বছর তার সঙ্গে তবলা বাজায় সে প্রথম দিন মুগ্ধ হয়েছিল। আপনি সুর দিতে পারেন কিন্তু, বলেছিল প্রশংসা করে।

    পরের বার সে বিস্মিত, এ কী দাদা, যেকোনো একটা ভার্সান ফাইনাল করুন এবার। সেবারেও হাঁহাঁ-হুঁহুঁ কিছু একটা বলে পাশ কাটিয়েছিল সৌমিত্র।

    কিন্তু তৃতীয় সন্ধ্যার পর সে বেশ বিরক্ত, দাদা, আপনি কি আমার পরীক্ষা নিচ্ছেন?

    তাহলে শুনুন, এ তো আপনার নিজের গান না। নামকরা ওস্তাদের পুরনো বাংলা রাগপ্রধান গান, লোকের মনে এর একটা চেহারা স্থায়ী হয়ে আছে, যত ভাল আর নতুন সুরেই গান, সে রূপ তাড়াবেন কী ভাবে?

    কী ভাবে তাড়াবে তার সৌমিত্র কী জানে? সেদিন ফেরার পথে ব্যাপারটা আলগোছে খোলসা করার চেষ্টা করেছিল কৌশিকের কাছে। মিনমিন করে বলল, তুমি ভাবছো আমি এটা ইচ্ছে করে করেছি, কিন্তু আসলে ব্যাপারটা ওরকম না। কেউ যেন আমাকে...

    কৌশিক এইসব মারফতি ব্যপারে ঢুকলো না, বললে, দেখুন ও আপনার ব্যাপার। কিন্তু পরের হপ্তায় আমাদের উত্তরপাড়ার প্রোগ্রামটা আছে, যা গাইবেন তা পাক্কা করে ফেলুন, আমাদের বোঝাপড়ার কম বেশি হলে বদনাম হবে কিন্তু।

    সে কী আর জানি না! সৌমিত্র আর মুখে কিছু বলল না। বাগুইহাটিতে কৌশিক নেমে গেল। কাঁকুড়গাছি অব্দি বাকি পথটা বেশ মনমরা হয়েই থাকলো সৌমিত্র, এরকম বেকুব হওয়া তার জীবনে এই প্রথম।

    অথচ কলকাতা আর মফস্বলে তার একটু-আধটু নাম হচ্ছে আজকাল। কিছু চ্যানেলে প্রভাতী শো ইত্যাদি করার জন্যই হয় তো...এমনিতে নিজের প্রতিভা সম্বন্ধে তার বিরাট কিছু যে হামবড়াই আছে তা নয়৷ মোটামুটি কিছু পুরনো বাংলা গান, রাগপ্রধান, রবীন্দ্র-নজরুল মিলিয়ে মিশিয়ে গড়া তার রিপার্টরি। রাগ-সঙ্গীতে তালিম আহামরি কিছু না হলেও অল্প বয়সে সুখময় দস্তিদারের মত একজন শিক্ষকের সংস্পর্শে এসেই সঙ্গীতের চোখ-কান-গলার বনিয়াদটা পোক্ত হয়েছে মাত্র। বাকিটা তার নিজের বাস্তববুদ্ধি আর পরিশ্রম। এরমধ্যে হতচ্ছাড়া মালগুঞ্জি রাগটা কোত্থেকে যে এসে জুড়ে বসলো তা-ই বুঝতে পারছিল না সৌমিত্র। অন্য অনেক রাগের মতই সুখময়জেঠুর কাছে শিখলেও এই রাগটা দু-চক্ষে দেখতে পারতো না। ইমন বেহাগ বাগেশ্রী ইত্যাদি সেধে নতুন ছাত্রের যে আরাম, মালগুঞ্জি বা মূলতানীর জটিলতায় কী আর তা থাকে?

    হ্যাঁ, একজন ছিল তাদের ক্লাসে...। মাখনের মধ্যে দিয়ে যেমন ছুরি চলে যায় তেমনি তার গলায় লাগতো দরবারির গান্ধার, ললিতের ধৈবত... এক গান্ধারের জয়জয়ন্তীর জটিল চলনের বুদ্ধিমত্তা...ক্লাসের সবারই বুক জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিত ।

    কিন্তু এই মধ্য বয়সেই কী ভীমরতি ধরেছে তাকে কে বলে দেবে? ভীমরতিও ঠিক না, প্রতি মূহূর্তে অনুতপ্ত হচ্ছে অথচ থামতে পারছে না। যা তার সাজে না, যার চর্চা নেই বহুদিন, তার প্রতি বহ্নিপতঙ্গের মত এই অমোঘ আকর্ষণ। মালগুঞ্জি রাগটার যদি মানুষের মত বোধবুদ্ধি থাকতো, তাহলে সে নিশ্চয়ই ভাবতো , কেমন ফাঁদে ফেলেছি বাছাধন!

    ২ জার্মান রিড

    মিসেস পাকড়াশী বলেছিলেন, জার্মান ডাবল রিড। সেডার উড বডি। এ জিনিষ আপনি পয়সা দিয়েও কিনতে পাবেন না মিস্টার দত্ত। রিচলি রেসোনেটিং।

    মিস্টার পাকড়াশী কিছু বলছিলেন না। ঘষা কাচের মার্বেলের মত চোখজোড়া দিয়ে এক দৃষ্টিতে সম্ভাব্য ক্রেতাকে দেখছিলেন। ইনি প্রোমোটারেরই অংশীদার, হয়ত উঠতি বড়লোক, হাতে প্রচুর কাঁচা পয়সা... ভঙ্গিমায় খানিকটা অবজ্ঞা ফুটে উঠেছিল কি! মিসেস পাকড়াশীর তীব্র দৃষ্টির ঝাঁঝে সম্বিত ফিরে এল যেন। মিস্টার পাকড়াশী মুখচোখে একটা বিনীত কোমলতা ফিরিয়ে আনলেন।

    বাড়ির দখল প্রোমোটার নিয়ে নিয়েছে। তাড়াতাড়িই ভাঙা পড়বে ইমারত। পুরনো রেলিং, শাল আর বার্মা টিকের কড়ি-বরগা নিয়ে যাবে। বাড়ির পুরনো আসবাব-পত্তর সব নীলামওয়ালারাই নিয়ে গেছে। প্রপিতামহীর এই হারমোনিয়ামটাই বাকি ছিল। শুধু তো হারমোনিয়াম না, তার সাথে যে কত স্মৃতি জড়িয়ে-মড়িয়ে থাকে...বেচার কথা ভাবলে মন ভেঙে যায়...তবুও যেটা করার সেটা করে যেতে হবে বৈকি! যেমন আশু-কর্তব্য এই শৌখিন বাবুটিকে পটিয়ে বিক্রি নিশ্চিত করা।

    খুকি হারমোনিয়ামটাকে বড়মা বলত। প্রপিতামহীর গল্প শুনেই হয়ত। একসময় তার ছোট্ট ছোট্ট আঙুলও ঝড়ের মত সুর তুলতে শিখেছিল এই যন্ত্রে। হয়ত তার মেয়েও এসে বসতে পারত একদিন এই হারমোনিয়ামের সামনে।...

    --এই শুনছো, উনি কুড়ি হাজারেই রাজি হয়েছেন। মিসেস পাকড়াশীর গলার আওয়াজে আবার বর্তমানে ফিরে এলেন।

    লোকটা ততক্ষণে মোবাইল উঁচিয়ে ধরেছে, জ়ী পে করে দিই? নাম্বারটা আরেকবার বলবেন প্লীজ়?

    লোকটা ফোন করে তার ড্রাইভারকে ডাকল। তাকে হারমোনিয়ামটা দেখিয়ে দিয়ে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে উঠে দাঁড়ালো। তারপর সিঁড়ির পালিশ-ওঠা বালুস্ট্রাডে হাত ঘষতে ঘষতে নেমে গেল দুজন মিলে।

    দোতলার জানালার পর্দার আড়াল থেকে পাকড়াশীবাবু দেখলেন তারা বিশাল গাড়িটাতে উঠে বেরিয়ে গেল ঝড়ের মত...মৃদুস্বরে বললেন, ভালো থাকিস খুকি, ভাল থেকো বট-ঠাকুমা।

    এবার বুঝি মুক্তি৷ যন্ত্র তার কাজ করে যাবে৷ দেখা যাক, রণোর কাছে, ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে সেই প্রার্থিত শান্তি পাওয়া যায় কি না।

    ৩ সৌমিত্র

    হারমোনিয়াম ঘাড়ে সিঁড়ি দিয়ে তিনতলা চড়তে চড়তে আরেকবার গোরাদার কাছে কৃতজ্ঞ বোধ করলাম৷ জিনিষটা পুরনো হলে কী হয়, আওয়াজখানা খাসা, পুরনো দিনের চার্চ অর্গানের মত৷ অথচ, পালকের মত হাল্কা৷ তাই ঘাড়ে করে নিয়ে যাচ্ছি আজকাল প্রোগ্রাম থাকলে৷ আজকের প্রোগ্রামেও তাই হল৷ আমি ঝোলালেও যন্তর ফেল করেনি।

    এটা গোরাদাই জোগাড় করে দিয়েছিল৷ গোরাদা শৌখিন মানুষ৷ ব্যবসায়ী কিন্তু সঙ্গীতরসিক, নিজে বেশ ভাল গায়৷ গানবাজনার যন্তর কালেক্ট করার শখ আছে৷ বাজাতেও পারে একটু আধটু৷ গোরাদা আমার কাইন্ড অফ মেন্টর৷

    বলেছিল, বাবাই, এই জিনিষ পয়সা দিয়ে পাবি না৷ নর্থ কলকাতার এঁদো গলিতে পড়তি বনেদী বাড়িতে অবহেলায় পচছিল দেখে দাঁও মেরেছি৷ আমার তো বাড়িতে দুটো হারমোনিয়াম পড়ে আছে, এটা বরং তুইই রাখ৷

    --আরেকটা হারমোনিয়াম কেনার মত পয়সা আমার হাতে নেই এখন৷

    --বললাম না, দাঁও মেরেছি! আচ্ছা, তোর জন্য তাহলে পে-এবল হোয়েন এবল৷

    সেই থেকে এটা আমার কাছে৷ মাস ছয় হল৷ ওজনে, আওয়াজে এমন একেশ্বরী হয়ে উঠেছে যে পুরনো গীতশ্রী মডেলটা আর বেরই করা হয় না আজকাল৷

    কোথা থেকে যে কী মনে পড়ে যায়...শুভা ক্লাসে আসার পর আমাদের ঠিক ওই গীতশ্রী মডেলের মত অবস্থা হয়েছিল৷ শুভা রণজিতের পিঠোপিঠি বোন, ভাইবোনে রীতিমত রেষারেষি কিন্তু আসল ব্যাপার হল শুভা অসম্ভব ট্যালেন্টেড৷ সুখময় জেঠুও এরকম ছাত্রী পেয়ে বাকি ক্লাস ভুলে নতুন ছাত্রীর তালিম নিয়ে পড়লেন৷ আমাদের কোনো একটা জটিল পাল্টা দিয়ে সারা সন্ধে বসিয়ে রেখে শুভার তালিম চলল। জেঠুদের গৌরাঙ্গ দে লেনের বাড়িটা থেকে যখন বেরচ্ছি তখন ক্ষোভে, ঈর্ষায় কান ঝাঁ ঝাঁ করছে আমার। রণজিতরা পাশেরই বাড়ি।

    কিন্তু কথা হচ্ছিল আমার নিজের গান নিয়ে। আসলে, কাউকে বললে বিশ্বাস করবে না, কিন্তু এই হারমোনিয়ামটা আমার উপর জোর খাটাতে শিখেছে। গীতশ্রী হারমোনিয়ামটা ছুঁতে পর্যন্ত দেয় না। একদিন জোর করে সেটা নিয়ে বসে রেওয়াজ করেছিলাম। পরের দিন একেশ্বরী আর বাজেন না। বেলো করে করে হাঁপিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু আওয়াজ বের হচ্ছে কুঁই কুঁই করে। কখনো জোরে বের হলেও চাবি আটকে গিয়ে বিশ্রী প্যাঁ-এ্যা-এ্যা করে বাজতেই থাকছে। সে এক শোচনীয় পরিস্থিতি। শেষে হাতজোড় করে বললাম, গান করে খাই, আজ বাদে কাল আসরে গান করতে হবে, এমন জ্বালাতন কি না করলেই নয় দেবী? তারপর দেখি আস্তে আস্তে আওয়াজ বের হতে লাগল।

    এমন সব কাণ্ডকারখানা দেখলে কী আর মাথা ঠিক থাকে কারু? রেওয়াজের বারোটা বাজলো বলে!

    ৪ গোরাচাঁদ দত্ত

    বাবাই ছেলেটাকে আমরা কর্তা-গিন্নী দুজনেই ভালবাসি, গান তার একটা কারণ। একটা সময় আমারও খুব শখ ছিল গানের জলসার সার্কিটে গান গেয়ে বেড়াব। বাবা নিজের প্রমোটারি ব্যবসায় জুতে দিলেন কড়া হাতে। আমরা দত্ত, কারো ভৃত্য নয়, জেনো মহীপাল... বাবা বলতেন আমাদের অহংকার এমনই। গান গাইতে গিয়ে অরগানাইজারদের সামনে মাথা নিচু করা, তুমি পারবে?

    আমাদের তো তর্ক করার সাহস থাকতো না তখন।

    বাবাই ছেলেটা ভাল। হ্যাঁ, প্রতিভার মাপে হয়ত মাঝারিই, কিন্তু পরিশ্রমী। ভাল করার, নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা আছে৷ গানটা ওর ভালবাসার জায়গা।

    কিন্তু তাছাড়াও আরেকটা কিছু আছে। যেটা ঠিক ধরতে পারিনি এখনও। গান বাদে বাকি সব কিছুতে কেমন একটা আলগা গা-ছাড়া ভাব৷ যেন যা কিছু ঘটছে সবই আসলে ঘটেনি কখনও৷

    ওর সঙ্গে আলাপ একটা ঘরোয়া আসরে। কানাঘুষোয় শুনেছিলাম ওর পারিবারিক বিপর্যয়ের কথা, থানা পুলিশ অব্দি গড়িয়েছিল নাকি। যদিও সেসব বছর পাঁচেক আগের কথা।

    কৌশিকের সাথে আলাপ করিয়ে দিলাম। আস্তে আস্তে ওর আত্মবিশ্বাসটা ফিরে আসছিল। ওরা একসঙ্গে প্রোগ্রাম করছিল ভালই।

    কিন্তু কৌশিক যা বলে গেল সেদিন শুনে ভাল লাগল না। কে জানে হারমোনিয়ামটা ওকে দিয়ে ব্যাপারটা আরো বিগড়ে দিলাম নাকি!

    ৫ আমরা এমনি এসে...

    কৌশিক একটা ওল্ড মঙ্কের বোতল রেখে গেছিল কখনো। এখন গ্লাসে চুমুক দিচ্ছি। আমি যে খুব টানতে পারি তা না। গলা জ্বলিয়ে নামছে জিনিষটা। জ্বলুক।

    আজ উত্তরপাড়া থেকে ফিরতে লাগলো পাক্কা সাড়ে তিন ঘন্টা। কাঁকুড়গাছির ফ্ল্যাটে ঢুকে তাঁকে টেবিলে বসিয়ে জোড়হাত করলাম। গান কী গেয়েছি জানি না, তিনি আমাকে কাটা ঘুড়ির মত খেলিয়ে নিয়েছেন আজকে। আইভরি ফিনিশের সাদা চাবিগুলো ঝকঝক করছে। মা কালীর দাঁতের মত।

    সারা রাস্তা একটা কথা বলেনি কৌশিক। মুখ-চোখ লাল। নামার সময় শুধু বলল, আমি কিন্তু বলেছিলাম দাদা। বইমেলা, বিদগ্ধ শ্রোতা, এখানে...বাকি কথা একটা চলতি অ্যামবুলেন্সের সাইরেনে ভেসে গেল।

    কিচ্ছু বলিনি। বলে লাভ নেই। কারণ আজ যা গেয়েছি তার চেয়ে ভাল আমি গাইতে শিখিনি এখনও। কিন্তু তার একটাও আমার রিহার্স করা, কৌশিকের সাথে টাইমিং করে বাঁধা গান নয়। এসব অন্য একজন গাইতো। খাটের গহ্বরে ফেলে রাখা পুরনো এলবামে তার কিছু ছবি থেকে থাকবে। কেউ কেউ ভেসে যায় বলেই তো তাকে ভাসিয়ে দিতে পারি না। কে যেন একটা পুরনো ভিডিও ক্যামেরা দিয়েছিল। বাসন্তী সময়ের কিছু টেপ...যা এখন আর মেমরি স্টিকে তুলে আনতে ইচ্ছে করে না। জেদ... ফালতু কারণে খটাখটি। রণোর গায়ে পড়ে উপদেশ দেওয়া এয়ারমেলের গোছা।

    অন্ধকার খোলা ছাদে পায়ে লেগে কিছু ভাঙল। বাড়িওয়ালার আচারের বোতল রোদে দিয়েছিল? ভুলে গেছে তুলতে? পা-টা চটচট করছে। রক্ত না তো?

    মরুক গে। হারমোনিয়ামটার মন আমি পড়ে ফেলেছি। সেই জেদ, সেই কম্পিটিটিভনেস ...অমুকে অল বেঙ্গল কনফারেন্সে তার থেকে ভাল গেয়েছে...অতএব আরো রেওয়াজ, আরো প্রাণায়াম...আরো বিষাদ। বিষিয়ে ওঠা দৈনন্দিনি। শেষে নিজের শখের শু-বক্স কালেকশন থেকে লাল কালো পুঁতি বের করে... পরে জেনেছি সুন্দর দেখতে ওই বীজগুলোর নাম কুঁচ, পোশাকী নাম গুঞ্জা৷ ও যে বিষের ডিপো আমি জানতামই না৷ লোকে ফিসফিস করে আমিই নাকি হিংসেয়...

    প্যারাপেট ওয়াল টপকালাম। বেশি না, ছয় ইঞ্চির মত ইঁটের খাঁজ। তিন-চারতলা নিচে শহর কলকাতা এল ই ডি আলোয় ভাসছে। রাত হয়েছে খানিকটা। বাগমারির দিকে একটা গাড়ি মাঝরাস্তায় পার্কিং লাইট জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভূতুমের মত।

    বেশ বুঝতে পারছি, হেঁটে এর চেয়ে বেশি যাওয়া যায় না। কিন্তু আমার যে একজোড়া ডানা টি শার্টের নিচে উসখুস করছে।

    গোরাদাকে ফোন করলাম।

    --হ্যালো দাদা।

    --প্রোগ্রাম কেমন হল?

    --ওই হল। আচ্ছা, একটা জিনিষ ঠিক করে বলবেন?

    --বলো।

    --হারমোনিয়ামটা কার থেকে কিনেছিলেন বলুন তো?

    --মিস্টার পাকড়াশী। তুমি চিনবে না।

    চিনবো না আবার! শুভার কাছে ওর বড়মার গল্প শুনেছিলাম৷ সত্যি মানুষের সারাৎসার এভাবে চিরকাল থেকে যায়? শুভাও থেকে গেছে? আমিও থেকে যাবো? একসাথে?

    নিশ্চিত হবার জন্য গোরাদাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম --ঠিকানাটা মনে আছে?

    --আরে, বাগবাজারের একটা পুরনো বাড়ি। গৌরাঙ্গ দে লেন। গিয়েছিস কখনো ওদিকে?

    চমৎকার! একটু জোরে হাওয়া এলেই ভেসে যাবে। আমরা এমনি এসে ভেসে যাই...



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)