• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৩ | জানুয়ারি ২০২৪ | গল্প
    Share
  • দেড় ইঞ্চি উঁচুতে : নির্মল ভার্মা
    translated from Hindi to Bengali by ছন্দা চট্টোপাধ্যায় বিউট্রা

    আপনি চান তো এই টেবিলে চলে আসুন না। জায়গা আছে। একজনের আর কতটুকুই বা জায়গার দরকার? না... না... আমার কোন অসুবিধা হবে না। আপনি চান তো চুপচাপ থাকতে পারেন। আমি নিজেও চুপ থাকতেই ভালোবাসি...একজন একসঙ্গে কথা বলতে পারে আর চুপও থাকতে পারে। এটা অবশ্য অনেকেই জানেন না। আমি অনেকদিন ধরে এটা করে আসছি। অবশ্য আপনি নন...আপনি এখনো যুবক, আপনার বয়সে চুপ থাকার মানে চুপ থাকা আর কথা বলার মানে কথা বলা। দুটো একসঙ্গে করা যায় না। ... আপনি ছোট গেলাসটায় খাচ্ছেন? আপনার হয়তো এখনো আসক্তিটা ধরেনি। আমি আপনাকে দেখেই বুঝেছিলাম যে আপনি এখানকার নন। এই সময় এখানে যারা আসে, আমি তাদের সবাইকে চিনি। ওদের সঙ্গে আপনি কোনো কথা বলতে পারবেন না। ওরা সবাই আগে থেকেই চুর হয়ে আছে। ওরা এখানে আসে শুধু লাস্ট বিয়ারটার জন্য। অন্য পাবগুলো সব বন্ধ, আর কোথাও তো যাবার জায়গা নেই। এখানে সবাই চটপট শেষ করে, টেবিলে, রাস্তায়, ট্রামে।

    অনেক সময় আমাকে ওদের ধরে ধরে বাড়ি নিয়ে যেতে হয়। পরের দিন অবশ্য তারা আমায় চিনতেও পারে না। আপনি ভুল বুঝবেন না। আমি আপনাকে ইঙ্গিত করছি না। আপনাকে তো আমি এখানে এই প্রথম দেখলাম। আপনি এসে চুপচাপ টেবিলে বসে গেলেন। আমার একটু খারাপ লাগছিল। না, না, ভয় পাবেন না...আমি নিজেকে আপনার ঘাড়ে চাপাচ্ছি না। আমরা একসঙ্গে বসেও নিজের নিজের বিয়ার নিয়ে আলাদা থাকতে পারি। আমার বয়সে এই একটু মুশকিল, আমরা বুড়োরা একটু ভয়ে ভয়ে থাকি। আত্মসম্মান বজায় রেখে বুড়ো হওয়া একটা আর্ট। সবাই করে উঠতে পারে না।এটা আপনাআপনি হয় না। অনেক মেহনত করে শিখতে হয়। কী বললেন আপনি? আমার বয়েস? আন্দাজ করুন তো? আরে না, না! এটা আপনি আমায় খুশি করার জন্য বললেন। তাই না? তা, খুশি তো হয়েইছি। এই খুশি পালন করতে যদি আরেকটা বিয়ার নিই তো কোনো আপত্তি আছে? আর আপনি? নেবেন না? ঠিক আছে, আমি জোর করবো না।

    রাত তিনটে...খুব ডেঞ্জারাস সময়। সত্যি বলছি। দুটোর সময় মনে হয় এখনো রাত বাকি আর চারটের সময় মনে হয় ভোর হচ্ছে। কিন্তু তিনটের সময় মনে হয় আপনি না এদিকে, না ওদিকে। আমার মতে, মরার সময় যদি হয় তো ঐ তিনটের সময়।

    প্রত্যেক মানুষের নিজের জীবন আর নিজের পছন্দসই মদ বেছে নেবার স্বাধীনতা থাকা উচিত...শুধু একবারই ঐ দুটো বেছে নেওয়া যায়। পরে আমরা সেগুলো শুধু পুনরাবৃত্তি করে যাই। আপনি কি দ্বিতীয় জন্মে বিশ্বাস করেন? মানে, মরার পরেও জীবন? আশা করি ঐ পাখি-পড়ার মতো বলবেন না যে আপনি কোনো ধর্মে বিশ্বাস করেন না। আমি নিজে ক্যাথলিক কিন্তু আপনাদের ঐ মৃত্যুর পরেও একেবারে না মরে যাওয়ার ব্যাপারটা আমার বেশ লাগে। আমরা প্রথমে একটা জীবন সম্পূর্ণ করি, তারপর দ্বিতীয়টা, তারপর তৃতীয়। রাত্তিরে প্রায়ই আমি এইসব নিয়ে ভাবি। আপনি তো জানেন, এই বয়সে সহজে ঘুম আসে না। ঘুমের জন্য চাই এক ছটাক 'ডোন্ট কেয়ার' ভাব আর আধ ছটাক ক্লান্তি । এ'দুটো না থাকলে দেড় ছটাক বিয়ার খেয়ে নিতে পারেন... এইজন্যই আমি রোজ মাঝরাতে এখানে চলে আসি, গত পনেরো বছর ধরে।

    আমি একটু ঘুমোই ঠিক, কিন্তু রোজ তিনটের সময় আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়... তারপর আমি আর ঘরে একা থাকতে পারি না। রাত তিনটে... ভীষণ খারাপ সময়... সত্যি বলছি। কী বললেন আপনি? না মশায়, আমি একদম একলা থাকি না। আপনি তো জানেন, পেনশনভোগী লোকেদের নানারকম হবি থাকে। আমার একটা পোষা বেড়াল আছে, বছর খানেক হল আমার কাছেই থাকে। এই দেখুন না, আমি এখানে বসে বিয়ার খাচ্ছি আর আপনাকে বড়ো বড়ো কথা শোনাচ্ছি আর সে বেচারা দোরগোড়ায় আমার অপেক্ষায় বসে আছে। আপনার কথা জানি না, আমার কিন্তু এটা ভেবে ভালো লাগে যে কেউ আমার অপেক্ষায় রাস্তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে ।

    আমি তো ভাবতেই পারি না যে এমন লোকও আছে যাদের অপেক্ষায় কেউ বসে নেই বা যারা নিজেরাও কারুর অপেক্ষায় থাকে না। যে মুহূর্তে আপনি অপেক্ষা ছেড়ে দিলেন, সেই মুহূর্তে আপনি জীবনও ছেড়ে দিলেন। বেড়ালরা অনেকক্ষণ ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারে। এ বিষয়ে তারা মেয়েদের মতো। শুধু এ বিষয়েই নয়, মেয়েদের মতোই বেড়ালরাও অন্যদের আকর্ষণ করার অসাধারণ ক্ষমতা রাখে। আমরা তাদের দেখে ভয় আর মুগ্ধতায় বিমোহিত হই। ভয় তো কুকুর বা অন্য পশুদেরও পাই কিন্তু সেটা একটু নিচু স্তরের। কুকুর রাস্তার একদিক দিয়ে চলে যায়, আপনি অন্য দিক দিয়ে। তার ভয় যদি আপনি ওকে লাঠিতাড়া করেন আর আপনি সাবধান থাকেন যাতে ও আপনার ওপর ঝাঁপিয়ে না পড়ে। এই ভয়ের মধ্যে কোনো রহস্য নেই, নেই কোনো রোমাঞ্চ বা সম্ভাবনা...যা বেড়াল বা সাপ দেখলে হয়।

    সত্যি বলতে কি... মেয়েদের মতোই, বেড়ালকেও আপনি কখনোই পুরোপুরি চিনে উঠতে পারবেন না, সারা জীবন একসঙ্গে থাকলেও না। এমন নয় যে তারা জেনেশুনে তাদের স্বভাব লুকিয়ে রাখে, আসলে আপনারই এত মুরোদ নেই যে আপনি ওদের অন্তরতম দরজাগুলো খুলে উঁকি মারেন। আমরা ঐসব জিনিশে আকর্ষিত হই যাতে একটু আতঙ্ক মেশানো থাকে, তাই না? আপনি যদি কিছু মনে না করেন...আমি আরেকটা বিয়ার নিচ্ছি। একটু পরেই এই পাবটা বন্ধ হয়ে যাবে, তারপর কাল সকাল পর্যন্ত সারা শহরে এক ফোঁটাও মদ পাবেন না। চিন্তা করবেন না, আমি নিজের লিমিট বেশ ভালো করেই জানি... মানুষকে মাটি থেকে ঠিক দেড় ইঞ্চি ওপরে ওঠা চাই... তার বেশি না... বেশি ওপরে চড়লে পুলিস ষ্টেশনে বা নালায় গিয়ে পড়বে...সেটা খুব ভালো ব্যাপার হবে না। কিন্তু কেউ কেউ ভয়ের চোটে দুটো পা-ই মাটিতে সেঁটে রাখে। এদের মদ খাওয়া না-খাওয়া একই ব্যাপার। হ্যাঁ মশাই, দেড় ইঞ্চিটাই এক্কেবারে ঠিক মাপ। এর বেশিও নয়, কমও নয়।

    এটুকু খেয়াল রাখুন যাতে আপনার সচেতনতা ঠিক দেশলাইয়ের শিখার মতো নিভতে দেখা যায়। যখন ঠিক আঙুলের কাছে আসবে, তখনই ফেলে দিন। তার আগেও নয়। তার পরেও নয়। কতক্ষণ ধরে থাকবেন আর ঠিক কখন ফেলে দেবেন সেইটাই মদ খাবার আসল রহস্য। মুশকিল এই যে এটা জানতে হলে ঠিক দেড় ইঞ্চ ওপরে ওঠার দরকার। আপনি হয়তো শুনে হাসবেন, একটা জিনিস ভালো করে বুঝতে হলে বোঝার ওপারে চলে যাওয়া দরকার। হাসুন... আমি কিছু মনে করবো না। আমিও চেষ্টা করি মেনে নিতে যে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কোনো কোনো জিনিস অজানা রেখে দেওয়াই ভালো। আপনি এভাবে মানিয়ে নিতে শিখুন... যেমন নিজের স্ত্রীর সঙ্গে থাকা...একই ঘরে, বছরের পর বছর...সবসময় চিন্তা, সে-ও হয়তো আপনার খেলাটাই খেলছে।

    এই চিন্তার হাত থেকে ছাড়া পেতে আপনি হয়তো দ্বিতীয় বা তৃতীয় মহিলার সঙ্গে প্রেম শুরু করলেন। এভাবেই হতাশার শুরু। কারণ দ্বিতীয় মহিলারও নিজস্ব গোপনীয়তা আছে, রহস্য আছে, তৃতীয় জনেরও তাই। এ একরকম দাবা খেলার মতোই। আপনি এক চাল দেওয়া মাত্র আপনার বিরোধীর সামনে অসংখ্য সম্ভাবনা খুলে যায়। একটা খেলা হারলে আপনি পরের খেলায় জেতার স্বপ্ন দেখেন। এটা ভুলে যান যে দ্বিতীয় খেলাতেও হারজিতের সম্ভাবনা অন্তহীন ও অজানা, ঠিক প্রথম খেলাটার মতোই। দেখুন... আমি তাই বলি, আপনি যত ইচ্ছা মেয়েদের সঙ্গে প্রেম করুন, আপনার আসল সম্পর্ক শুধু একজনের সঙ্গেই হবে... কি বলুন?

    না মশাই, আমি তো আপনাকে আগেই বলেছি, আমি বাড়িতে একলাই থাকি। যদি আমার বেড়ালটাকে না ধরেন। আজ্ঞে হ্যাঁ... আমি বিবাহিত...তবে আমার পত্নী গত হয়েছেন... আমার মনে হয়। আপনি অবাক হলেন বুঝি? 'মনে হয়' এজন্য বললাম কারণ আমি তাকে মারা যেতে দেখিনি। যাকে স্বচক্ষে মরতে দেখিনি বা নিজের হাতে মারিনি, তার মৃত্যুটা অনুমান ছাড়া কীভাবে বলি? আপনি হয়তো হাসবেন কিন্তু আমি বলি, যাকে মরতে দেখিনি, তার সম্বন্ধে, আবছা হলেও, একটা আশা থেকে যায় যে সে হয়তো জীবিত আছে। আপনি দরজা খুললেন আর সে তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে আপনার সামনে এসে দাঁড়ালো। জানি, এটা ভুল। এ রকম হয় না। তার জায়গায় এখন শুধু বেড়ালটা আসে। দরজার পেছনে মাথা হেলিয়ে চোখের রং বদলায়। লোকে বলে সময় নাকি অনেক কিছু মুছে দেয়... আপনারও কি সেই মত? জানি না... কখনো কখনো মনে হয় যতটা মুছে দেয় তার থেকে বেশি লুকিয়ে ফেলে --অন্ধকার কোণে বা কার্পেটের নীচে, যাতে বাইরে থেকে দেখা না যায়। কিন্তু তার থাবাটা সবসময় বেরিয়ে থাকে, যে-কোন মুহূর্তে আবার খামচে ধরতে পারে। বোধহয় গোলমাল বকছি... বিয়ার খাওয়ার এই মজা।

    আপনি রাস্তা হারালে এদিক ওদিক ঘোরেন... একই জায়গার আশেপাশে চক্কর কাটেন, রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড। সেই বাচ্চাদের খেলার মতো, সবাই সুযোগমতো মাঝখানে বসে পড়ে আর শুধু একজন রুমাল হাতে ওদের চারদিকে চক্কর কাটে। আপনাদের দেশেও এরকম খেলে বুঝি? বাঃ... দেখুন তো...আমরা নিজেদের কত আলাদা ভাবার চেষ্টা করি, কিন্তু বাচ্চাদের খেলা সবদেশেই একরকম!...যাই হোক, ঐ সময় আমাদের সবারই এক হাল... কেউ জানতো না কখন কার গলায় ফাঁস পড়বে। আমরা সবাই ভীরু বাচ্চার মতোন বারবার পিছন ফিরে দেখছি কেউ পিছু নিলো না তো। হ্যাঁ মশাই, সেটা জার্মান অকুপেশনের সময়। আপনি তখন নিশ্চয়ই খুব ছোট। আমার বয়সও বেশি নয়, কিন্তু যুদ্ধের সময় বলে দিনরাত কাজে লেগে থাকতে হতো। এক যুবক ষাঁড়ের মতোই শক্তপোক্ত ছিলাম।

    একটা বয়স আসে, যখন প্রত্যেক মানুষ নিজের মতো একটা নিরাপদ সুখের বৃত্তের মধ্যে থাকতে শিখে যায়। কিন্তু তার পর আর দেখার অবকাশ থাকে না। মানে, এমন বোধ হয় না যে একটা বৃত্তের মধ্যে আছেন। আপনি প্রায়ই দেখেছেন যে আমরা যাকে সুখ বলি, সেটা একটা মুহূর্তকালের ব্যাপার... আপনি খুব গভীরভাবে অনুভব করেন কিন্তু মুহূর্তটা কেটে যাওয়ার পর অতটা তীব্র মনে হয় না... একটু হ্যাংওভারের মতো আবছা লাগে। কিন্তু যেটা আমরা দুঃখ, কঠিন বা কষ্টকর মনে করি তার কোনো বিশেষ মুহূর্ত নেই... মানে, কোন দুর্ঘটনার মুহূর্তে সেরকম কিছু বোধ হয় না। তখন আমরা একরকম বোধহীন হয়ে যাই, আগামী যন্ত্রণার কোনো রেফারেন্স পাই না যা তক্ষুনি মনের মধ্যে ফিট করাতে পারি। দুর্ঘটনা হওয়া এক আর জীবনভোর তা পরিণাম ভোগ করা একেবারেই অন্য... এটা অসম্ভব...এ হতেই পারে না। আমি বলতে চাইছি... নিজেকে অন্যের আসনে বসিয়ে তার দুঃখকষ্ট সঠিক অনুভব করা একরকম অসম্ভব। অনুভূতিটা হয় কিছু বেশি হবে, নয়ত কিছু কম... কিন্তু ঠিক ওইরকম নয় যেরকম সে বোধ করছে। না...না...আপনি ভুল বুঝবেন না। আমি আমার স্ত্রীকে ভুগতে দেখিনি।

    আমি যতক্ষণে বাড়ি পৌঁছেছিলাম, তারা তাকে নিয়ে গেছিলো। সাত বছরের বিবাহিত জীবনে এই প্রথম আমি শূন্যঘরে ঢুকলাম। বেড়ালটা? ঐসময় আমার কাছে ছিলো না। অনেক বছর বাদে তাকে পোষা শুরু করি। প্রতিবেশীরা নিশ্চয়ই জানলা দিয়ে আমাকে দেখছিল। স্বাভাবিক। আমিও দেখতাম যখন কারুকে বন্ধ গাড়িতে গেস্টাপো পুলিশে ধরে নিয়ে যেতো। কিন্তু এটা আমি কখনো ভাবিনি যে আমি বাড়ি আসব আর আমার স্ত্রীর ঘর খালি পড়ে থাকবে। দেখুন... আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই। আপনার কি এটা আশ্চর্য মনে হয় না যখন আমরা কোন দুর্ঘটনা বা কারুর মৃত্যুর খবর পড়ি, আমাদের কখনোই মনে হয় না যে ঐরকম আমাদেরও হতে পারে বা হতে পারতো... না, আমরা ভাবি এসব শুধু অন্যদেরই হয় ...বাঃ... দেখে সুখী হলাম যে আপনি এতক্ষণে আরেকটা বিয়ার নিলেন। সারারাত কি খালি গেলাস নিয়ে বসে থাকা যায়? কী বললেন? আমি জানতাম আপনি এই প্রশ্নটা করবেন। না করলেই অবাক হতাম।

    না মশাই। গোড়ায় আমি কিছু বুঝতে পারিনি। বললাম না, দুর্ঘটনার প্রথম মুহূর্তে মানুষ বোধশক্তিহীন হয়ে যায়। যন্ত্রণাটা সঠিক অনুভব করতে পারে না। আমার স্ত্রীর জিনিসপত্র চারদিকে ছড়ানো...কাপড়চোপড়, বই, পুরনো খবরের কাগজ, আলমারি আর টেবিলের ড্রয়ার খোলা, ভেতরের জিনিসগুলো কার্পেটের ওপর এলোমেলো। ক্রিসমাসের উপহার, সেলাই-এর জিনিস, পুরনো ছবি, আপনি তো জানেন বিয়ের পর কত জিনিস আপনাআপনি জড়ো হয়ে যায়। মনে হচ্ছিল, কেউ যেন প্রত্যেকটি জিনিস হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখেছে , প্রতিটি কোণেকানাচে তল্লাশি চালিয়েছে, কোন জিনিস তাদের হাত থেকে বাঁচেনি। সে রাত্রে আমি শোবার ঘরে বসেছিলাম। আমার স্ত্রীর বিছানাটা খালি পড়েছিল। বালিশের তলায় ওর রুমাল, দেশলাই আর সিগারেটের প্যাকেট। শোবার আগে ও সিগারেট খেতে ভালোবাসতো। প্রথম প্রথম আমি ঐ অভ্যাসটা পছন্দ করিনি কিন্তু আস্তে আস্তে মানিয়ে নিয়েছিলাম।

    খাটের পাশে তেপায়া টেবিলের ওপর ওর বইটা পড়েছিল। যেটা ও সেদিন পড়ছিল। যে পৃষ্ঠা পড়ছিল সেখানে ওর একটা ক্লিপ ঢুকিয়ে রেখেছিল। ক্লিপে ওর চুলের গন্ধ জড়ানো... জানেন, এতদিন পরেও এইসব টুকরো স্মৃতি মনে থেকে যায়। ঠিকই হয়। বিয়ের আগে আমরা সব বড়ো বড়ো অর্থপূর্ণ জিনিসই মনে রাখি। কিন্তু বিয়ের পর সর্বদা কাছাকাছি থাকার দরুন ঐসব বড়সড় ব্যাপারগুলো হাত ফসকে যায়। শুধু ছোট ছোট অভ্যাস, দৈনিক রুটিন, খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলোই মনে থাকে, যা অন্য কারুকে বলতে লজ্জা হয় কিন্তু যা ছাড়া সবকিছুই যেন বিস্বাদ মনে হয়। সেই রাত্রে আমি আমার স্ত্রীর জিনিসপত্রের মধ্যে বসেছিলাম... কিছুই খেয়াল ছিলো না। সে ঘরে নেই...এটাই বাস্তব, আমি বুঝতে পারি। কিন্তু তাকে কেন ধরে নিয়ে গেছিলো? সেটাই আমার নাগালের বাইরে।

    তাছাড়া আমার স্ত্রীকেই বা কেন? আমি বারবার নিজেকে ঐ প্রশ্ন করেছি। হয়তো শুনে অবাক হবেন, সাত বছরে এই প্রথম আমি নিজের স্ত্রীকে সন্দেহ করেছিলাম। হয়তো সে কিছু গোপন রেখেছিল? আমাকে জানিয়ে চিন্তায় ফেলতে চায়নি? পরে জেনেছিলাম যে গেস্টাপো পুলিশ অনেকদিন ধরেই ওর ওপর নজর রেখেছিল। ওর কাছে কিছু বেআইনি পোস্টার প্যামফ্লেট পাওয়া গেছিলো, যা ঐসময় লোকেদের মধ্যে বেনামীতে প্রচার করা হতো। জার্মানদের চোখে এসব কঠোর অপরাধ। পুলিশ এসবই আমার স্ত্রীর ঘর থেকে বাজেয়াপ্ত করে। আপনি হয়তো শুনে মজা পাবেন কিন্তু আমার এসব বিষয়ে সত্যিই কোনো ধারণা ছিলো না। সেদিন পর্যন্ত ঐ ঘরে আমরা এক বিছানায় ঘুমোতাম, প্রেম করতাম কিন্তু ঐ ঘরেই এমন কিছু ডেঞ্জারাস জিনিস ছিল যার সম্বন্ধে আমার কোনো জ্ঞান ছিলো না। মজার ব্যাপার, না? ওরা আমার বৌকে আমার থেকেও বেশি ভালো জানতো...একটু সবুর করুন। আমি এই গেলাসটা শেষ করি তারপর আপনাকে সঙ্গ দেবো। একটু বাদেই এরা দোকান বন্ধ করবে... কিন্তু এখনো সময় আছে, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। আরাম করে খাওয়ার মধ্যেই তো খাওয়ার আনন্দ। আমাদের ভাষায় একটা কথা আছে...প্রাণভরে খাও, কারণ, একশো বছরের মধ্যে আমরা কেউই এখানে থাকবো না। ... একশো বছর...অনেক দিন, তাই না? আমাদের কেউই এতদিন বাঁচবে না। মানুষ বাঁচে, খায়, পান করে...তারপর একদিন--ফট! না ভাই, মৃত্যু এমন কিছু ভয়ঙ্কর নয়। লক্ষ লক্ষ লোক প্রতিদিন মরছে আর আপনি টুঁ শব্দটি করেন না।

    আসল ভয়ঙ্কর হচ্ছে এই যে মরা মানুষ নিজের গোপনীয়তা চিরকালের জন্য সঙ্গে নিয়ে যায়। আমরা কোনোমতেই তার নাগাল পাই না। একদিক দিয়ে দেখলে, সে আমাদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে যায়। সেই রাতে আমি এক ঘর থেকে আরেক ঘরে পায়চারি করছিলাম... মজা পাবেন শুনে যে পুলিশের পরে আমিই দ্বিতীয় জন যে আমার স্ত্রীর জিনিসগুলি আবার তল্লাশি করেছিলাম... প্রত্যেকটা জিনিস উল্টেপাল্টে খুঁটিয়ে দেখেছিলাম। আমার বদ্ধ ধারণা সে আমার জন্য নিশ্চয়ই একটা কিছু চিহ্ন রেখে গেছে যাতে আমাদের দুজনেরই ভাগ ছিল। তার বিয়ের পোশাক, ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে রাখা কিছু চিঠিপত্র--যা আমি তাকে বিয়ের আগে লিখেছিলাম, কিছু পালক আর পাথর--যা সে জমাতো... দেখুন তো, সাত বছর বিয়ের পর সেই রাতে আমার মনে হচ্ছিল আমি তার স্বামী নই, আমি একটা পুলিশের চাকর... আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে আমি তাকে আর কোনদিন কিচ্ছু জিগ্যেস করতে পারব না। আমি জানতাম সে তাদের হাত থেকে কখনোই বেঁচে ফিরতে পারবে না। আমি ঠিক জানতাম।

    যাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো, তাদের মধ্যে একজনকেও আমি কখনো ফিরতে দেখিনি। কিন্তু সেই রাতে আমি তার আসন্ন মৃত্যু নিয়ে অতটা চিন্তিত ছিলাম না, তার বেশি চিন্তা ছিল এই ভেবে যে আমি আর কখনোই পুরো সত্যটা জানতে পারবো না। মৃত্যু চিরকালের জন্য সব গোপনীয়তার ওপর তালা লাগিয়ে দেয় আর সে আমার জন্য কোনো চাবি রেখে যাবে না যা দিয়ে আমি সেই তালা খুলতে পারি। পরদিন রাত্রে তারা আবার এলো আমার দরজায়। আমি তৈরি ছিলাম, জানতাম ওরা আবার আসবে। যদি আমার স্ত্রী তাদের সামনে সব দোষ স্বীকার করে নিত তাহলে হয়তো আমাকে ওদের দরকার পড়তো না। কিন্তু আমি জানতাম সে চরম যন্ত্রণা সত্ত্বেও মুখ দিয়ে একটি শব্দ বার করবে না। আমি তার গোপন কথা না জানলেও তার স্বভাবচরিত্র ভালোভাবেই জানতাম। না ভাই, আমি নিজের চোখে তার নির্যাতন দেখিনি কিন্তু কিছু কিছু অনুমান তো ঠিকই করতে পারি।

    আমাকে তাদের প্রথম প্রশ্ন, আমি কি শ্রীমতী অমুকের স্বামী? আমি উত্তরে শুধু হ্যাঁ বললাম। বাকি প্রশ্নগুলির উত্তর আমার জানা ছিলো না। কিন্তু তারা আমায় অত সহজে ছাড়বে কেন? যখন বললাম আমি আমার স্ত্রীর কাজকর্ম সম্বন্ধে কিছুই জানি না, তারা আমায় হেসেই উড়িয়ে দিলো, ভাবলো আমি নিজের প্রাণ বাঁচাতে মিথ্যে বলছি। তারা আমায় আলাদা সেল-এ নিয়ে পুরো এক সপ্তাহ ধরে নানাভাবে একই প্রশ্ন করতে থাকলো -- আমি স্ত্রীর কাজ সম্বন্ধে কী জানি, কার সঙ্গে সে দেখা করতো, কে তাকে ঐ লিফলেট দিয়েছিল ইত্যাদি, ইত্যাদি। আমার পেট থেকে উত্তর বার করবার জন্য তারা আমার ওপর যা সব করেছিলো তা আর আপনাকে বলতে চাই না। কারণ যতই বিস্তারিত বলি না কেন, আপনি একটুও অনুমান করতে পারবেন না। তারা আমায় মারতে মারতে বেহুঁশ করে ফেলত। তাদের ধৈর্য ছিল। তারা আমার জ্ঞান ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতো তারপর আবার শুরু হতো সেই পুরনো প্রশ্ন আর অন্তহীন নির্যাতন।

    তারা বিশ্বাস করতে পারতো না যে সাত বছর একসঙ্গে থাকার পরেও আমি আমার স্ত্রীর গোপন কাজকর্ম সম্বন্ধে অবহিত ছিলাম না। ওরা ভাবতো আমি ওদের বোকা বানাচ্ছি, ওদের চোখে ধুলো দেয়ার চেষ্টা করছি। না মশাই, আমার মারধরের যন্ত্রণা ছিলো না, যন্ত্রণা ছিলো ওদের প্রশ্নের উত্তর না জানার জন্য। বলবার মতো ছিল শুধু কিছু সাধারণ, ঘরোয়া কথাবার্তা যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হয়ে থাকে। কিন্তু এই দৈনিক জীবনের বাইরে ওর আরেকটা আলাদা জীবন ছিল...আমার অজানা, আমার বাইরে, আমার থেকে আলাদা। আশ্চর্যের ব্যাপার নয় কি? ও যদি ধরা না পড়তো তো আমি তাকে পুরোপুরি জানি ভেবে সারা জীবন কাটিয়ে দিতাম।

    আপনি তো জানেন, সেই সময় যুদ্ধের শেষ ঘনিয়ে আসছিল। গেস্টাপো তাদের শিকার হাতছাড়া করতে চাইছিল না। আমার স্ত্রী শেষ পর্যন্ত কিছু কবুল করেনি। আশ্বাস ছিল সে ছাড়া পাবে। আমাকে ওরা বোকা ভাবত। হয়ত একেবারে মেরে ফেলতে চায়নি কিন্তু না মেরেও যতটা যন্ত্রণা দেওয়া যায় তা দিয়েছিলো। আমি রেহাই পেতাম একদম অজ্ঞান হয়ে গেলে বা ওরা হাঁপিয়ে পড়লে। আমিও কিছু স্বীকার করিনি। সাহসের বলে নয়, কিছু না জানার জন্যই। আগেই বলেছিলাম--প্রথম রাত্রে স্ত্রীর শোবার ঘরে কিছু না পেয়ে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। মনে হয়েছিল সে ইচ্ছে করে আমার সঙ্গে ছলনা করেছে। মনের মধ্যে কাঁটা ফুটছিল যে আমার নিজের স্ত্রী আমায় বিশ্বাসযোগ্য মনে করেনি। কিন্তু পরে পুলিশের হাতে মার খেতে খেতে আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করেছিলাম যে সে আমায় কিছু জানায়নি। একদিক দিয়ে সে আমায় বাঁচিয়ে দিয়েছিল।

    একটা জিনিস আমি এখনও জানি না। যদি আমি স্ত্রীর সিক্রেটটা জানতাম, আমি কি চুপ করে থাকতে পারতাম? আমার কি সেই শক্তি বা সাহস ছিল? ভাবুন তো। যদি আমার কাছে কবুল করার মতো কিছু থাকতো তো মারপিটের যন্ত্রণাটা আরও বেড়ে যেত না কি? আমরা দায়ে পড়ে অনেক কষ্ট সইতে পারি, কিন্তু ছাড়া পাবার কোনো রাস্তা যদি জানা থাকে, তাহলে কতক্ষণ বাপ, মা, ভাই, বোনের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা না করে সেই যন্ত্রণা সহ্য করতে পারব? যন্ত্রণার সীমা অতিক্রম হলে কোন রাস্তাটা বেছে নেব? কেউ বলতে পারে না। এই বেছে নেওয়াটাও বড়োই যন্ত্রণার। হয়তো এই জন্যই আমার স্ত্রী আমায় কিছু না বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

    দেখুন...লোকে বলে ভালোবাসায় কোনো লুকোচুরি রাখতে নেই। ভালোবাসা হবে আয়নার মতো স্বচ্ছ, পরিষ্কার। আমি তো বলি এর থেকে বড়ো ভুল আর হয় না। প্রেম শুধু নিজেকে খুলে ধরাই নয়, নিজের অনেক কিছু লুকিয়ে রাখাও, যাতে অন্যকে নিজের বিপদ থেকে সরিয়ে রাখা যায়। প্রত্যেক মেয়ে এটা বোঝে। তারা পুরুষের থেকে বেশি ভালোবাসার ও নিজেদের লুকিয়ে রাখার সাহস রাখে। আপনি কী বলেন? হয়তো আমার ধারণা ভুল... কিন্তু রাতে যখন ঘুম আসে না, আমি এই ভেবে একটু সান্ত্বনা পাই যে... ছাড়ুন, আমিই ঠিকমতো বোঝাতে পারছি না। এসব বোঝাবার জন্য তো আপনাকে আমার টেবিলে ডাকিনি। কী বললেন? না মশাই... এরপর আমার স্ত্রীকে আর কখনো দেখিনি।

    একদিন দুপুরে বাড়ি ফেরার সময় ঐ পোস্টারটা নজরে পড়লো। ঐ সময় তিন-চারদিন অন্তর পোস্টার পড়তো দেয়ালে। সেখানে ত্রিশ চল্লিশ জনের নাম ছাপা থাকতো যাদের আগের রাতে গুলি করে মারা হয়েছিল... যখন আমার স্ত্রীর নামটা পড়লাম ...কয়েক মুহূর্ত অবাক লেগেছিল যে ঐ ছোট্ট নামটার পেছনে আমার স্ত্রীর চেহারাটা প্রচ্ছন্ন। আপনাকে বলেছিলাম না নিজের চোখে কাউকে মরতে না দেখলে পুরোপুরি বিশ্বাস হয় না যে সে জীবিত নেই। একটা ক্ষীণ আশা থেকে যায় যে সে ডাকলে সাড়া দেবে...আরে দেখুন তো, আমি একই কথা বারবার বলছি। বিয়ার খাওয়ার এইই মজা--আপনি একই বিষয়ের আশেপাশে চক্কর কাটেন-- রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড।... আপনি চললেন বুঝি? একটু দাঁড়ান... আমি কয়েক টুকরো সালামি বেড়ালটার জন্য কিনে নিচ্ছি। বেচারা খালিপেটে আমার অপেক্ষায়...না, না, আপনাকে আমার সঙ্গে আসতে হবে না। আমার বাড়ি কাছেই। আর আমি নিজের মদ খাবার সীমাটা জানি। বলেছিলাম না... মাত্র দেড় ইঞ্চি ওপরে।


    মূল গল্প 'দেড় ইঞ্চ উপর' সংগৃহীত হয়েছে: 'হিন্দী কহানী সংগ্রহ’—নির্মল ভার্মা; সম্পাদক-ভীষ্ম সাহানি; প্রকাশনা-সাহিত্য আকাদেমি ১৯৫৯


     নির্মল ভার্মা (এপ্রিল ১৯২৯–অক্টোবর ২০০৫) একজন অগ্রণী হিন্দী সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক ও অনলস সাহিত্যকর্মী। তিনি হিন্দী সাহিত্যের ‘নঈ কহানি’ (১৯৫৯) আন্দোলনের পথিকৃৎ। তাঁর বিখ্যাত ছোটগল্প ‘পরিন্দে’ (পাখিরা) এই আন্দোলনেরই প্রতীক। শ্রী ভার্মা ১৯৯৯ সালে জ্ঞানপীঠ, ২০০২ সালে পদ্মভূষণ ও ২০০৫ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পান। ।

    এই গল্পটির বাংলায় প্রথম অনুবাদের স্বীকৃতির জন্য আমি লেখকের স্ত্রী শ্রীমতী গগন ভার্মার কাছে কৃতজ্ঞ।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)