• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৩ | জানুয়ারি ২০২৪ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • নায়ারদার কথা : দেববাণী রায়চৌধুরী

    নায়ারদার কথা : বিক্রমন নায়ারের সঙ্গে তিন দশক — মানস ভট্টাচার্য; আক্ষরিক, কলকাতা; প্রচ্ছদ -- সোমনাথ ঘোষ; প্রথম প্রকাশ- ডিসেম্বর ২০২২, ISBN: 978-93-95850-02-5

    ‘নায়ারদার কথা’ সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে যখন হাতে এসে পৌঁছল, তখন খুব যে খুশী হয়েছিলাম এমন নয়। কারণ হাতে জমেছিল পছন্দ আর তত পছন্দ নয় এমন বেশ কয়েকখানা বই। আর তত পছন্দ নয় বইগুলোর বাধ্যবাধকতার চাপে পছন্দের বইগুলো কেবলই হারিয়ে যাচ্ছিল। চট করে কেবল ভূমিকাটা পড়ব বলে বইটা খুললাম কারণ বিক্রমন নায়ার মানুষটি অপরিচিত নন। তাঁর চোস্ত ইংরেজি আর গভীর প্রতিবেদনগুলি খুব হালকাভাবে হলেও মনে একটা ছাপ ফেলে গিয়েছিল কোনও সময়ে। “নায়ারদার কথা”-য় ভূমিকা ও অ্যালবাম সহ ছ-টি অধ্যায় — সিক্সটি নাইন, রিপন স্ট্রিট, সহজে মৃত্যু নেই, শতজলঝরনার ধ্বনি, গর্বাচেভ নাস্তানাবুদ, সিপিআইএম দপ্তর, বিকাশবাবু ব্যর্থ। ভূমিকা ও অ্যালবাম বাদ দিয়ে প্রথম অধ্যায় শুরু করলাম। কয়েকপাতা এগোতেই বুঝলাম শ্রী মানস ভট্টাচার্য আর তাঁর নায়ারদার কর্মস্থল কলকাতার বিখ্যাত বানিজ্য প্রতিষ্ঠানটির বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রের ‘Tag line’-টি এই বইটির ক্ষেত্রেও সমান ভাবে প্রযোজ্য — Unputdownable ।

    সহজের সাধনায় সর্ব অর্থে সিদ্ধ কেরালার আলেপ্পি জেলার আরুকুট্টি গ্রামের এই মানুষটি বাংলার সামাজিক ও বৌদ্ধিক জগতকে যে কতভাবে সমৃদ্ধ করেছেন তা এই বইটির পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে। আবার কেবলমাত্র জ্ঞান আর বৌদ্ধিক সাধনা যে একধরনের উন্নাসিকতা, বিচ্ছিন্নতা, আত্মকেন্দ্রিকতা — নামান্তরে স্বার্থপরতার জন্ম দেয় — মানসবাবুর নায়ারদা যে তার থেকে কতখানি মুক্ত ছিলেন অজস্র ঘটনার মাধ্যমে লেখক তার উদাহরণ দিয়ে গেছেন। নায়ারদার প্রসাদগুণে সমর সেন থেকে মহাশ্বেতা দেবী, আনন্দবাজার গ্রুপের সর্বময় অধীশ্বর অভীক সরকার থেকে রিপন স্ট্রিটের পাইস হোটেলের মালিক, সম্পূর্ণ অখ্যাত, অপরিচিত ট্রেন যাত্রী থেকে সমাজের উচ্চতম চূড়ায় অধিষ্ঠিত মানুষজন — এই বইয়ের ক্যালাইডোস্কোপে বহু বর্ণের আলো বিচ্ছুরণ করেছেন। দু-একজনের প্রসঙ্গ মানসবাবুর অনবদ্য কথকথায় আকর্ষণীয় লেখনী থেকে সরাসরি উল্লেখ করা যাক। ভূমিকায় লেখক স্মৃতিচারণ করেছেন এক অপরিচিত সাধারণ পাঞ্জাবি ট্যাক্সি-ড্রাইভার হরবিন্দরের সঙ্গে বিখ্যাত বিক্রমন নায়ারের আকস্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার কাহিনি। লেখক নায়ারদার সঙ্গে ট্যাক্সিতে যাচ্ছিলেন পাঞ্জাবিদের নিয়ে প্রচলিত জোকস্ বলতে বলতে। হরবিন্দর না রেগে নিজেও যোগ দিল স্বজাতি ব্যঙ্গের রসের আসরে। বিদ্বেষহীন মুক্ত মনের দ্বার খোলা সেই সামান্য সময় সামাজিক ভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানের হরবিন্দর ও নায়ারদাকে কাছাকাছি এনে দিল। লেখকের কথায়, ‘এরপর হরবিন্দর এলে আর আনন্দবাজারের উল্টোদিকের ফুটপাতে চায়ের ভাঁড় হাতে দাঁড়ানো নয়, ওরা বসত কাছাকাছি কোনো রেস্টুরেন্টে।’ (পৃ-১৯) শুধু হরবিন্দর কেন প্রথিতযশা মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের যে স্কেচ মানস ভট্টাচার্য এঁকেছেন তার মধ্যে দিয়ে নায়ারদা মানুষটির সহজিয়া চরিত্রটি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। একবার মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে তিনি ও লেখক মানসবাবু বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনদিনের সফরে ঝাড়গ্রাম। ছিলেন রাজবাড়িতে। সেবারের একটি ছোট্ট মজার ঘটনা লেখকের ভাষায়, ‘বাড়ি ফিরে, মানে রাজবাড়ি ফিরে, অনেক রাত পর্যন্ত খাঁটি মহুয়ার রসাস্বাদন পর্বে একটা মজার ঘটনা ঘটল। নায়ারদা কখন চুপিসারে উঠে গিয়ে রাজা মল্লদেবের ভূত সেজে মহাশ্বেতাদিকে এমন ভয় দেখাল যে উনি ভিরমি খেয়ে গ্লাস উল্টে সে এক হইহই কান্ড। ওনার মতো দাপুটে ভদ্রমহিলার যে এত ভূতের ভয় কে জানত!’ (পৃ ১৪৪) নায়ারদার মনের মধ্যে ছিল এক অক্ষয় শৈশবের বাসভূমি। বয়স বা ইনটেলেক্টের জ্যামিতিক আঁকজোক তাকে ছুঁতে পারেনি কোনও কালেই। তাই সাংবাদিক, লেখক, তার্কিক বিক্রমণ নায়ারের সঙ্গে শিশুদের ছিল অবাধ বন্ধুত্ব। ফুলটুসি, টিটো, লেখক পুত্র পাপন এরকম বেশ কয়েকজন শিশুর সঙ্গে নায়ারদার বয়স নিরপেক্ষ সম্পর্কের কথা লেখক অনবদ্য ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন।

    এই চরিত্র চিত্রের সঙ্গে চালচিত্রের মতো প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে এসেছে তিন-দশক সময় ব্যাপী বিস্তৃত আমাদের চিরচেনা, অতিপ্রিয় কলকাতা শহর। সাংবাদিকতার বিভিন্ন অনুষঙ্গে কলকাতার রাস্তাঘাট — লেকটাউন থেকে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ হয়ে লেক মার্কেট ছুঁয়ে দেশপ্রিয় পার্ক হয়ে ঢাকুরিয়া, যাদবপুর পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল অঞ্চলের অজস্র চেনাশোনা, আধাচেনা, অচেনা মানুষজন তাঁদের অপরিচয়ের আবরণ সরিয়ে রেখে আমাদের মনের একেবারে কাছাকাছি এসে বসেছেন।

    নায়ারদার কথা বলতে গিয়ে উঠে এসেছে বামপন্থী আন্দোলনের কথা, যা বইটির একটি সম্পদ। অতি বামপন্থী নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে শ্রী নায়ারের তাত্ত্বিক, আত্মিক ও সর্বস্ব পণ করা ঘনিষ্ঠ ও সক্রিয় যোগাযোগ ও পরবর্তীকালে এই আন্দোলনকে ঘিরে তাঁর আশাভঙ্গের কথাগুলি বইটিকে বিশেষভাবে মূল্যবান করে তুলেছে। প্রকৃতপক্ষে, নকশাল আন্দোলন নিয়ে লেখা অন্যান্য অনেক বইয়ের তুলনায় এই বইটির সংক্ষিপ্ত পঞ্চম অধ্যায়টি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। একজন সংবাদপত্র কর্মীর কলমে আরেকজন সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীর দ্বারা যাপিত কলকাতার হীরকদ্যুতিময় দিনগুলি আরেকটি বইয়ের কথা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে। সেই বইটির লেখকও কিছু দিন তন্নিষ্ঠভাবে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কুশানাভ চৌধুরী। বইটির নাম ‘The epic city’।

    শ্রী বিক্রমন নায়ারের মতো সংবেদনশীল, পরিশ্রমী, বুদ্ধিমান ও একজন গভীর মননশীল পাঠকের পরিচয়, শ্রী মানস ভট্টাচার্য পুরো বইটির ছত্রে ছত্রে যেভাবে পরিবেশন করেছেন, তাতে বলতে কোনও দ্বিধা নেই যে বইটির মুখবন্ধে (অ্যালবামে) শ্রী নায়ারের অবয়ব তৈরি প্রসঙ্গে যে সংশয় তিনি প্রকাশ করেছেন, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এই প্রাণবন্ত মানুষটির সমগ্র কলেবরে শ্রী ভট্টাচার্য এমনভাবে, এত অনায়াসে প্রাণ সঞ্চার করেছেন যে পাঠক সর্বক্ষণ অজান্তেই লেখকের সঙ্গে ছায়ার মতো শ্রী নায়ারকে অনুসরণ করতে শুরু করেন। এক অর্থে মানসভ্রমণ। নিজেকে সম্পূর্ণ প্রচ্ছন্ন রেখে কেবল উদ্দিষ্ট মানুষটিকে সর্বতোভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে গেলে কতখানি প্রলোভন জয় করতে হয় তা মানসবাবুর কাছে শেখার মতো।

    শেষে কেবল দু-একটি কথা। প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বইটি অত্যন্ত যত্নে নির্মিত। ছাপা, বাঁধাই, ফন্ট সাইজ আক্ষরিকভাবে নয়ন সুখকর। ছোট ছোট অনুচ্ছেদ, চমৎকার ঝরঝরে গদ্য, নির্ভুল বানান বইটিকে অন্যতর মর্যাদা দিয়েছে। হিরণ মিত্রের স্কেচটি উপরিপাওনা। কেবল একটি মৃদু আপত্তি টীকাগুলি বইটির একেবারে শেষে না হয়ে প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে হলে আমাদের মতো অলস পাঠকেরা আরও একটু আরাম পেতেন।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)