• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৩ | জানুয়ারি ২০২৪ | প্রবন্ধ
    Share
  • সুবর্ণলতার খাতা : গোপা দত্তভৌমিক

      


    ।।১।।

    আশাপূর্ণা দেবীর বিখ্যাত ট্রিলজির মধ্যখন্ড ‘সুবর্ণলতা’। সত্যবতীর মেয়ে সুবর্ণলতা, সুবর্ণের মেয়ে বকুল, উনিশ থেকে বিশ শতকের মধ্যভাগ পেরিয়ে চলে আসা আখ্যানে নারীর দিক দিয়ে প্রজন্মপরম্পরার জীবনালেখ্য। ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’র শেষে দেখেছি সত্যবতীর জীবনব্যাপী বিদ্রোহ সুবর্ণর অকালবিবাহে এসে মুখ থুবড়ে পড়েছে। তিনটি সন্তানের মধ্যে সুবর্ণকে নিয়েই সবথেকে বেশি স্বপ্ন দেখেছিল সত্যবতী। বেথুনস্কুলে পড়া ন’বছরের বালিকা সুবর্ণ ছিল বাল্যকাল থেকেই মেধাবী, তেজি প্রকৃতির। সুবর্ণ কোলে আসার আগেই কুলত্যাগিনী ভ্রাতৃবধূ শঙ্করীর অভাগা সন্তান সুহাসিনীকে মানুষ করে তুলেছিল সত্যবতী। কিন্তু কোন চোখে পরিজনরা দেখতো তার এই প্রয়াসকে? ভাবিনী আর সৌদামিনীর সংলাপে তার পরিচয় আছে,

    ‘যে ভাজ বারো বছরে বিধবা, তার বাইশ বছর বয়সের গর্ভের ওই রত্ন! … সেই আস্তাকুঁড়ের জঞ্জালকে মাথায় করে এনে ঘরের মধ্যে দেবী পিতিষ্ঠে করেছেন। … কে ওই জাতজন্মহীন ধ্বজাকে বে করবে যে বে হবে? … আবার শুনি নাকি বেহ্মবাড়িতে বে দেবে বলে বর খুঁজছে।’
    সদু কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়ে বলে, … ‘অতিরিক্ত তেজ, অতিরিক্ত আস্পদ্দা! নইলে কোন সংসারে কোন্ মেয়েমানুষের এ সাহস হয়, নদ্দমার পাঁক তুলে নিয়ে এসে পূজ্যি করে?’ এই কদর্য কথাবার্তা শুনে ফেলেছিল সুহাস, আর কারুকে না বলে বাড়ি ছেড়ে গিয়ে উঠেছিল ব্রাহ্ম ভবতোষের বাড়ি। পরে সত্যবতীর অনুরোধে ভবতোষ সুহাসকে বিয়ে করেছেন, ক্রমে সুহাস বেথুনস্কুলের শিক্ষিকা হয়েছে। বিদ্যা ও সম্মানের আলোকে দীপ্ত হয়েছে একদা দত্তবাড়ির পানসাজুনি দাসী গলায় দড়ি দিয়ে মরা শঙ্করীর মেয়ে সুহাসিনীর জীবন। পালিতা কন্যার ক্ষেত্রে সফল হলেও সে ব্রাহ্মসমাজভুক্ত হবার জন্য নবকুমারের বাধায় সত্যবতীর সঙ্গে সুহাসের আর যোগাযোগ ছিলনা। তবে নিজের মেয়েকে পড়াশোনা শিখিয়ে জীবন অন্যভাবে গড়ে দেবে এই স্বপ্ন ছিল সত্যবতীর। কিন্তু অদৃষ্ট এবং মানুষের যোগসাজশে তার এই স্বপ্ন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। সুবর্ণলতার বিবাহ-পরবর্তী জীবন যেন অনন্ত নরকবাস। একটিই জানালা ছিল সেই শ্বশুরবাড়ি নামক কারাগারে — সুবর্ণলতার খাতা। এই লেখায় আমরা সেই জানালাটিরই খোঁজ নেবো।

    শ্বশুরবাড়িতে সত্যবতীরও দুর্ভোগ কম হয়নি। বিশেষ করে শাশুড়ি এলোকেশীর অত্যাচার কিছু কম ছিল না। কিন্তু ব্যক্তিত্বহীন, নরমপ্রকৃতির নবকুমার কখনো সত্যবতীকে নিপীড়ন করেনি। সেটাই হয়তো ছিল এলোকেশীর রাগের প্রধান কারণ, পুত্রবধূর ব্যাপারে প্রবল হীনমন্যতা তো ছিলই। শোধ তুলতে এলোকেশী বাল্যকাল থেকে নাতনি সুবর্ণর মন মায়ের বিরুদ্ধে বিষিয়ে রাখার চেষ্টা জারি রেখেছিল। নবকুমারের বাবা নীলাম্বর শয্যাধরা হয়ে পড়লে শুশ্রূষার জন্য দীর্ঘকাল সত্যবতী শ্বশুরবাড়ি বারুইপুরে থেকেছে, বালিকা সুবর্ণ থেকেছে তার সঙ্গে। ধীরে ধীরে নাতনিকে বশীভূত করেছে এলোকেশী। ‘ঠাকুমার কাছেই যে সর্ববিধ প্রলোভনের বস্তু। ঠাকুমার সঙ্গে পাড়া বেড়ানো, ঠাকুমার সঙ্গেই ঠাকুরতলায় গিয়ে বসে থাকা, ঠাকুমার কাছেই যত অপথ্যি-কুপথ্যি আর ঠাকুমার কাছেই যত গল্প।’ সেই সব গল্পে থাকত বিয়ে নামক একটি রূপকথার প্রলোভন। এলোকেশী সুবর্ণকে বোঝাত, তার মা তাকে শুধু লেখাপড়া করিয়ে চাকরি করতে পাঠাবে, বিয়ে দেবেনা। আর ‘যদি আমার কাছে থাকিস তো লাল টুকটুকে বর এনে বিয়ে দেব, এত এত গয়না দেব, লাল বানারসী শাড়ি দেব। তারপর সে বিয়েতে কতো ঘটা করব!’ … এই মাথায় মটুক, গলায় চিক্ সাতনরী, দানার মালা, হাতে তাগা বাজুবন্ধ মুড়কি মাদুলি, নীচের হাতে বাউটি কঙ্কণ, বালা শাঁখা, পায়ে মল চরণপদ্ম—’

    এইভাবে বালিকার মনে আপাত নীরস লেখাপড়ার বিপরীতে বিয়ে ও বরের মনোহর ছবিটি রচনা করা চলত। মা মানেই পড়া-লেখা; আর ঠাকুমা পড়া-লেখাকে বিষ দেখে। শিশু সুবর্ণর ও তখন পড়া-লেখা এমন কিছু ভালো লাগতো না। বরং ঠাকুমার আঁকা ভবিষ্যতের ছবিটিই দারুণ আকর্ষণীয় মনে হতো। গোটা ব্যাপারটিই পুত্রবধূকে শায়েস্তা করার জন্য কুচক্রী এলোকেশীর নারকীয় পারিবারিক রাজনীতি। যে ভাষায় সে নাতনির সঙ্গে কথা বলেছে তাতে সত্যবতীর প্রতি চূড়ান্ত বিদ্বেষই যে তার প্রধান প্রণোদনা তা স্পষ্ট।

    ‘মা যেমন কুকুর, তার উপযুক্ত মুগুর হবি তুই!’

    সেবার সফল হতে পারেনি বটে, কয়েক বছর পর সুযোগ যেন ছপ্পড় ফুঁড়ে হাতে এসে পড়েছে। বড়ো ছেলে সাধনের বিয়ে দেশের ভিটেতে দেবে বলে ব্যবস্থা করতে দিন দশেকের জন্য বারুইপুরে গেছে নবকুমার। অবোধ সুবর্ণ বায়না ধরেছে সে সঙ্গে যাবে, যেহেতু স্কুলে গরমের ছুটি পড়েছে আর ঠাকুমার কাছে আম খাওয়া ছাড়াও নানা আকর্ষণ। হরিণ যেন ফাঁদে এসে পড়েছে। ঠিক ঐ সময়ই সইয়ের মেয়ে মুক্তকেশীকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে আনাটিও মনে হয় ষড়যন্ত্রের অংশ। মাকে না জানিয়ে সুবর্ণকে মুক্তকেশীর মেজো ছেলে প্রবোধের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছে এলোকেশী। নবকুমার নীরব দর্শক শুধু নয়, অবশ্যই চক্রীদের একজন। কন্যাসম্প্রদান তো সে করেছে বটেই। ভালোভাবেই সে জানতো মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড়ো করে তোলার কতোখানি আশা ছিল সত্যবতীর। তবু কাপুরুষ, ব্যক্তিত্বহীন নবকুমার মায়ের দুষ্কর্মে বাধা না দিয়ে সহায়তা করেছে। ইচ্ছে করেই যে সত্যবতীকে খবর দেওয়া হয়নি তা তার সংলাপে স্পষ্ট। ‘আগে এলে বিয়ের বাধা দিত, তাই জানানো হয়নি।’ অর্থাৎ ন’বছরে মেয়ের বিয়ে দেবার মধ্যে সে নিজে কোনো দোষ দেখতে পায়নি। সুবর্ণকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করে তোলার স্বপ্নে তার কোনো অংশীদারিত্ব নেই। নবকুমারের কাছে কন্যা মানে কন্যাদায়। উপন্যাসের পরবর্তী অংশেও পাঠক তার এই মানসিকতার পরিচয় পাবে। মেয়েকে সে স্নেহ করতোনা তা নয়, কিন্তু সেই স্নেহ সমাজ ও পরিবারের নিয়মনিগড়ে নিতান্ত বাঁধা। এই ব্যাপারে সামান্য ব্যক্তি নবকুমারকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, সমাজের নামকরা ব্যক্তিরাও সে যুগে কন্যাসন্তান সম্বন্ধে বাল্যবিবাহ বিষয়ে অনুরূপ মনোভাষ পোষণ করতেন। মাইকেল মধুসূদনের বিখ্যাত সহপাঠী, হিন্দু কলেজের বিখ্যাত ছাত্র, নবজাগরণের এক চিন্তক পুরুষ ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের ‘পারিবারিক প্রবন্ধ’ থেকে তিনটি উদ্ধৃতি প্রাসঙ্গিক বোধে দেওয়া যাচ্ছে,

    ‘ছেলেবেলা হইতে মা-বাপ যে দুটীকে মিলাইয়া দেন, তাহারা একত্র থাকিতে থাকিতে ক্রমে ক্রমে দুইটী নবীন লতিকার ন্যায় পরস্পর গায়ে গায়ে জড়াইয়া এক হইয়া উঠে। তাহাদিগের মধ্যে যে প্রকার চিরস্থায়ী প্রণয় জন্মিবার সম্ভাবনা, বয়োধিকদিগের বিবাহে সেরূপ চিরস্থায়ী প্রণয় কিরূপে জন্মিবে?’
                                                 [বাল্যবিবাহ]
    ‘কন্যা অপেক্ষা পুত্রের সহিত সম্বন্ধ অধিক ঘনিষ্ঠ হয়। ঐ সম্বন্ধের শেষ নাই বলিলেও চলে। … যাঁহাকে কন্যাদান করিলে তিনি কায়মনে ভাল থাকিলেই কন্যার সম্বন্ধে একপ্রকার নিশ্চিন্ত হইতে পারিলে। তিনি ভাল না থাকেন, অথবা ভাল না হয়েন, তুমি বিশেষ কিছুই করিতে পারনা। … যাহাতে হাত না থাকে, বোধ হয়, তাহাতে মমতাও ক্রমশঃ ন্যূন হইয়া আইসে। … পুত্র সন্তানকে কাহাকেও দান করা হয়না। পুত্রবধূকে ও পুত্রের দ্বারা পরোক্ষভাবে শিক্ষা দিবার ত অধিকার আছেই, স্থলবিশেষে সাক্ষাৎ শিক্ষাদানেও অধিকার হয়। ঐ অধিকার থাকাতে ক্রমশঃ মমতাও বৃদ্ধি হইতে থাকে। সুতরাং কন্যা অপেক্ষাও পুত্রবধূ অধিকতর স্নেহভাগিনী হইয়া উঠেন। পুত্র পরকে আপনার করিয়া দিতে পারে; কন্যা আপনার হইয়াও পর হইয়া যায়।’
                                                 [পুত্রকন্যা]
    ‘সূতিকাগারে অনেক ছেলে মারা যায় — কিন্তু কন্যাসন্তান দুইটীর স্থলে পুত্রসন্তান পাঁচটী মারা যায়; আর পঞ্চমবর্ষ বয়স পর্য্যন্ত কন্যাসন্তান ছয়টীর স্থানে পুত্রসন্তান আটটী মারা যায়; আর দ্বাদশবর্ষ বয়স পর্য্যন্ত কন্যাসন্তান দশটীর স্থানে পুত্রসন্তান চৌদ্দটী মারা যায়, আর ষোড়শবর্ষ বয়স পর্য্যন্ত কন্যাসন্তান চৌদ্দটীর স্থানে পুত্রসন্তান পনরটী মারা যায়। ষোল সতর বৎসর উর্ত্তীর্ণ হইলে, পুত্রের জীবন কন্যার জীবন অপেক্ষা দৃঢ়তর হইয়া দাঁড়ায়। এই নৈসর্গিক নিয়মের অনুযায়ী হইয়াই সকল সমাজে কন্যার অপেক্ষা শৈশবে পুত্রের প্রতিপালনে যত্ন কিছু অধিক হইয়া থাকে। কিন্তু ঐ আধিক্য নিবন্ধন কন্যাদিগের হৃদয়ে যে বিশেষ ঈর্ষ্যা জন্মে তাহা বোধ হয়না।’
                                   [ভাই-ভগিনী]
    ‘নৈসর্গিক নিয়মের’ এমন টায়েটায়ে হিসেব কোথায় পেয়েছেন ভূদেব মুখোপাধ্যায় তা উল্লেখ করেননি। তবে পুত্র ও কন্যা সম্বন্ধে পরিবার ও সমাজের মানদন্ড এখনো অনেকটা এমনই আছে। ফলতঃ ভারতে জনগণনায় বারবার দেখা যায় পুরুষের তুলনায় নারীর অনুপাত কম। কোথাও কোথাও তা বিপদসীমা পার হয়ে বহুদূর নিম্নগামী। ‘নৈসর্গিক নিয়মের’ ফলে শক্তিমতী কন্যাসন্তানকে যথোপযুক্ত পুষ্টিকর খাদ্য না দেওয়া, উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা না করা ছাড়াও কন্যাশিশুহত্যা এবং বর্তমানে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের অপব্যবহারে কন্যাভ্রূণনাশ — ক্রমহ্রাসমান নারী অনুপাতের কারণ। ভূদেব স্পষ্টত পক্ষপাতিত্বের সমর্থক, পাশাপাশি অতিরিক্ত যত্ন পাবার জন্য ভাইদের প্রতি বোনদের ঈর্ষাকেও তিনি প্রকারান্তরে দূষণীয় মনে করেছেন। যুগের মানসিকতা এবং যুগাতিশায়ী বদ্ধমূল মানসিকতা তাঁর চিন্তায় প্রকাশ পেয়েছে। নবকুমারকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।

    ২.

    সুবর্ণলতার বিয়ে হয়েছিল নিতান্ত বালিকা বয়সে, সে বিয়ে ব্যাপারটা কী তা বুঝে ওঠবার আগেই। তার বিয়ের জন্যই তার মা সত্যবতী চিরদিনের মতো স্বামীগৃহ ত্যাগ করে গেছে এই ঘটনাটি সূচনা থেকেই তার বিবাহিত জীবনে কালো ছায়া ফেলে রেখেছে। বলাবাহুল্য শ্বশুরবাড়ির লোকের এতে প্রীত হবার কোনো কারণ ছিলনা বরং সুবর্ণর সামান্য ত্রুটিতেই শাশুড়ি মুক্তকেশী তার মায়ের ধারা দেখতে পেয়ে কুবাক্য বলেছে, ‘মা-টির গুণই গাই। কেমন মা! আমড়া গাছে কি আর ল্যাংড়া ফলবে।’ গোড়া থেকেই বাপের বাড়ি বলে বালকাটির কিছু ছিল না। মা নেই, কে নিয়ে যাবে। বাপ সাহসই করেনি। পিসি সৌদামিনী কাছেই থাকে, সে নিতে চেয়েছিল কিন্তু অনুমতি মেলেনি। মায়ের গৃহত্যাগে কলঙ্কিত পিতৃকুলের সঙ্গে সুবর্ণর যোগাযোগ থাক এটি একেবারেই চায়নি মুক্তকেশী। ফলে নবকুমার বা তার ছেলে সরল সুবর্ণর শ্বশুরবাড়িতে অপমানিত হয়েছে। যোগাযোগই বন্ধ হয়ে গেছে ধীরে ধীরে। সুবর্ণলতার নিশ্ছিদ্র কারাগারে কোথাও কোনো মুক্তির বাতাস খেলবার জায়গা ছিল না। ভার্জিনিয়া উলফ নারীর জন্য নিজস্ব একটি ঘরের কথা লিখেছিলেন, সুবর্ণলতার স্বপ্ন ছিল একটি দক্ষিণের বারান্দা — দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনের একেবারে অন্তে এসে সেই বারান্দা জুটেছিল বটে, ততোদিনে হয়তো তার ইচ্ছেটাই মরে গিয়েছিল। তবু সেই বারান্দাতেই কিন্তু সুবর্ণলতা তার শেষ শয্যা পেতেছে। সংসার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে।

    জন্মসূত্রে প্রাপ্ত সত্যবতীর নান্দনিক বোধ, নৈতিক সাহস, স্পষ্টবাদিতা আর নয়বছর পর্যন্ত বেথুন স্কুলে পড়াশোনা — এই সম্বল নিয়ে সুবর্ণ শ্বশুরবাড়িতে জীবন শুরু করেছিল। দর্জি পাড়ার সেই বাড়ি যেমন দমবন্ধ করা, চাপা, তেমনি সংকীর্ণ, স্বার্থপর সেই বাড়ির মানুষজন। ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে মধুসূদন ও কুমুদিনীর প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ যেমন ঘোরতর অমিলের কথা বলেছিলেন, সুবর্ণলতা-প্রবোধের অমিল তার থেকে কম নয়। প্রবোধ দেখতে সুদর্শন, জাতে গোত্রে মাপে মাপে যোগ্য — ভারতে যেমন বিবাহকে ‘রাজযোটক’ বলা হয়। কিন্তু অন্তরে প্রবোধ নীচ, সংকীর্ণমনা, কাপুরুষ, শিক্ষা বা সংস্কৃতি কোনোটিই তাঁর চিত্তে প্রবেশ করেনি। পড়াশোনা মুক্তকেশীর বাড়িতে শুধু জীবিকা অর্জনের চাবিকাঠি, তদতিরিক্ত কিছু নয়। সুবর্ণলতার গায়ে হাত তুলতে কোনোদিন দ্বিধা করেনি প্রবোধ এমনি সে অসভ্য বর্বর। গোড়া থেকেই তার সুন্দরী তেজস্বিনী সুবর্ণ সম্পর্কে হীনমন্যতা ছিল আর তার থেকেই হয়তো জন্ম নিয়েছে বিষাক্ত সন্দেহ। অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে সুবর্ণকে কথা বলতে দেখলেই সেই সন্দেহ দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছে আর সুবর্ণকে সহ্য করতে হয়েছে অপরিসীম লাঞ্ছনা। বস্তুত প্রবোধ মনোবিকারগ্রস্ত, সহবাসের অযোগ্য একজন মানুষ। প্রথমদিকে কিশোর বর সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ মোহ থাকলেও, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুবর্ণ নিজের ভাগ্যের ক্রূর রূপটি মর্মে মর্মে অনুভব করেছিল। আজীবন এই নিতান্ত অযোগ্য, অশালীন, হিংস্র, কামুক লোকটির সঙ্গে তাকে থাকতে হবে এই বিধিলিপি সে মেনে নিয়েও মানতে চায়নি। আটটি সন্তান হয়েছে তার, সুস্থ, সবল। তবু সংসারের সঙ্গে যেন কোথাও যোগাযোগ আলগা ছিল তার। আগাগোড়াই আজকের দিনের পরিভাষায় তাকে মানসিক অবসাদ ও বিষাদে দীর্ণ হতে হয়েছে। বারবার নানা ভাবে আত্মহত্যার চেষ্টা করে অসহনীয় অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চেয়েছে মেয়েটি।

    সত্যবতীর মতো তার বিদ্বান দৃঢ় চরিত্রের বাবা ছিলেন না। লেখাপড়াও সে তেমন কিছু জানতো না। বাপের বাড়ির দরজা কার্যত বন্ধ থাকায় অদৃশ্য শৃঙ্খল তার দুপায়ে। এই বোবা অন্ধকারে সম্পূর্ণ আত্মশক্তিতে ভর দিয়ে সে আলোর সাধনা করেছে। সুবর্ণলতার সংগ্রাম সত্যবতীর থেকে অনেক কঠিন এবং ট্রাজিক মহিমাময়। পাঠকের মনে হয় মেয়েটির এই ভয়ংকর দুর্দশার জন্য শুধু এলোকেশী, নবকুমার নয়, সত্যবতীও অনেকটা দায়ী। মৃত্যুর আগে সুবর্ণকে লেখা চিঠিতে সত্যবতী নিজের অপরাধ স্বীকার করেছে।

    “তোমার কাছে আমার অপরিসীম লজ্জা, তোমার কাছে আমার অপরাধের সীমা নাই। সে অপরাধের ক্ষমা নাই। … তোমাকে অমন করিয়া নিষ্ঠুর ভাগ্যের মুখে ফেলিয়া আসা আমার উচিত হয় নাই। হয়তো তোমার জন্য আমার কিছু করিবার ছিল।”
    কাশীতে সত্যবতী একটি মেয়েদের স্কুল স্থাপন করেছে, দেশের স্ত্রীশিক্ষা প্রসারের জন্য সে নিজের কর্মৈষণা নিয়োজিত করেছে। কিন্তু নিজের মেয়েকে বাঁচাতে পারেনি। পাশেও দাঁড়াতে পারেনি। নবকুমারের চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতায় বিরূপ হয়ে তৎক্ষণাৎ স্বামীগৃহত্যাগের মধ্যে অসামান্য বিদ্রোহ আছে কিন্তু মৌহূর্তিক ক্রোধ ও বিতৃষ্ণায় নয় বছরের বালিকাটির ওপর যে ভয়ানক অন্যায় করা হল তা সত্যবতী তখন ভাবেনি। পাঠক হিসেবে ভাবতে ইচ্ছে করে সত্যবতী যদি গোটা জীবনের মতো এবারও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে লড়াই বজায় রাখতো, হয়তো সুবর্ণলতার জীবন আরেকটু সুসহ হত। তার যে বাপের বাড়ি বলে কিছু নেই, এমনকি প্রথম সন্তান হবার সময়ও তাকে যত্ন করে নিয়ে যাবার জন্য বাপের বাড়ির কারুর বিন্দুমাত্র ঠেকা নেই, এতেই মুক্তকেশী, প্রবোধ এবং অন্যান্য কটুবাক্যবর্ষণকারী লোকেরা যৎপরোনাস্তি বেড়ে উঠেছে। হিংস্র জন্তুদের মধ্যে হরিণীর মতো নিতান্ত অসহায় সুবর্ণ। কিন্তু স্বভাবজাত সাহস ও মর্যাদাবোধ সম্বল করে সে সংগ্রাম চালিয়ে গেছে।

    ভার্জিনিয়া উলফ তার ‘A room of One’s Own’ বইতে মেয়েদের আত্মপ্রকাশ ও আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য একটি নিজস্ব ঘরের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। সুবর্ণ রক্ষণশীল বাঙালি বাড়ির নিতান্ত পরাধীন বধূ, যে ঘরটি স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গে তার জন্য নির্দিষ্ট হয়েছিল সেখানেই তার গোপন পড়াশোনা আর লেখালেখির জগৎটি গড়ে উঠেছে। স্বশিক্ষিত এই মেয়েটির ছিল প্রবল জ্ঞানতৃষ্ণা, কতো উপায়ে যে সে বই পত্রপত্রিকা সংগ্রহ করেছে। প্রথমে তাকে বই জোগান দিতো সুবর্ণর বড়ো ননদ সুশীলার দূর সম্পর্কের ক্ষ্যাপাটে ভাগ্নে ‘দুলো’। পাড়ার ধনী মল্লিকবাড়িতে লক্ষ্মী সরস্বতীর কৃপাধন্য মল্লিকবাবু অজস্র বই কিনতেন। দুলোকে স্নেহ করতেন তিনি। ফলে সেই লাইব্রেরি দুলোর মাধ্যমে অবারিত হতো সুবর্ণর কাছে। নির্জন দুপুরে নিচের তলার অন্ধকার ঘরে বই পড়ত সুবর্ণ, জানালা খুলে দুলোর কাছ থেকে বই নিতো। একদিন সমমনস্ক মল্লিকবাবুকে মেজোমামী সুবর্ণর সঙ্গে আলাপ করাতে নিয়ে এল দুলো আর সেটা চোখে পড়ে গেল সুবর্ণর উকিল দেওর প্রভাসের। মল্লিকের গায়ে হাত দেবার সাহস হয়নি বটে, দুলো বাড়ি ও পাড়ার বীরপুরুষদের হাতে মার খেতে খেতে অজ্ঞান হয়ে গেল। সুবর্ণ যে মল্লিককে ডেকে পাঠায়নি তা কেউ বিশ্বাস করেনি। মুক্তকেশী তার চরিত্রে ‘নষ্ট মেয়েমানুষ’ শব্দটি দেগে দিলেন।

    আরেকটি বইপত্রের উৎস ছিল জ্ঞাতি জা জয়াবতী। একই বাড়ির দুই অংশে ভাগাভাগি করে থাকে দুই জ্ঞাতি পরিবার। সম্পর্ক খুবই খারাপ, মামলা চলছে সম্পত্তি নিয়ে। কিন্তু দুই কিশোরী বধূ সিঁড়ির ঘুলঘুলির এপারে ওপারে সখী হয়ে উঠেছিল। জয়াবতীর স্বামী মুক্তকেশীর ছেলেদের মতো নয়, শিক্ষিত, সুসংস্কৃত মনের অধিকারী। জয়াবতী আর তার স্বামীই রবীন্দ্রনাথের ‘প্রভাত সংগীত’ দিয়েছিল সুবর্ণকে। স্বর্গের স্বাদ পেয়েছিল সুবর্ণ সেই সব কবিতায়। আর তাই তো নির্বোধ কিশোরী স্বামীর সঙ্গে সেই সুধাস্বাদ ভাগ করে নিতে চেয়েছিল।

    ‘হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি,
    জগৎ আমি সেথা করিছে কোলাকুলি,
    ধরায় আছে যত মানুষ শত শত,
    আসিছে প্রাণে মম, হাসিছে গলাগলি।’
    বিদ্রূপে আর রাগে চরম আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছিল প্রবোধ।
    ‘জগৎসুদ্ধ সবাই এসে কোলাকুলি করছে? তাই এত ভাল লাগছে? বাঃ, বাঃ, বেড়ে চিন্তাটি তো! শত শত মানুষ এসে প্রাণে পড়ছে? তোফা! এমন রসের কবিতাটি লিখেছেন কোন মহাজন?’
    ঘুলঘুলি পথ বন্ধ হল, তারপর তো সে বাড়ি ছেড়ে নতুন একই রকম শ্রীহীন বাড়িতে চলে এল মুক্তকেশীর পরিবার। বই পড়া সেই পরিবারের চোখে একটা কিম্ভূত অভ্যাস। বাড়িতে ছাদে ওঠার সিঁড়ি তাদের কাছে নেহাৎ অদরকারি। তাই সেই সিঁড়ি হয়নি। রান্না ঘরের নীচু ছাদটা আর উঠোনেই তো সংসারের নানা কাজ চলে যায়। এক টুকরো বারান্দা, ছাদে ওঠার সিঁড়ি কেন সুবর্ণর কাছে এতো আকাঙ্ক্ষিত তার কুৎসিত ব্যাখ্যা মনে মনে তৈরি করেছে প্রবোধ, ছাদে উঠে পাঁচবাড়ির জানালায়, বারান্দায় উঁকিঝুঁকি দেওয়া, নিজেকে আর দশজোড়া চোখের সামনে বার করা, ঢিল বেঁধে চিঠি চালাচালির উৎসাহ ছাড়া এমন ইচ্ছের আর কোনো কারণ সে খুঁজে পায়নি।

    রাসসুন্দরী দেবী বাড়ির সকলকে লুকিয়ে চৈতন্য ভাগবতের একটি পাতা থেকে পড়তে শিখেছিলেন। তাঁর জন্ম ১৮১০ সালে। সুবর্ণলতার থেকে তিনি অনেক বড়ো তাঁর শ্বশুরবাড়ির যে বর্ণনা ‘আমার জীবন’ বইতে পাই তাতে মেয়েদের পড়াশোনাতে বিপুল বাধা ছিল বটে কিন্তু রুচি ও সংস্কৃতির এমন দৈন্য ছিলনা। যদিও নিতান্ত বালিকা বয়স থেকে বৃহৎ সংসারের পাকশালা ও নিজের সন্তানদের লালনপালনে যে কঠোর পরিশ্রম তাঁকে করতে হয়েছে তাতে ধনী সংসারের গৃহিনীর আরাম আয়েসের ছিটেফোঁটাও ছিল না। সুবর্ণলতা যেমন শুধু নিপুণভাবে অজস্র গৃহকর্ম করে পরিবারের সদস্যদের কাছে ‘ভালো’ হয়ে থাকার মধ্যে কোনো গৌরব দেখতে পায়নি, পূর্বজ রাসসুন্দরীর মধ্যেও সেই মানসিকতা লক্ষ করেছেন ঐতিহাসিক তনিকা সরকার,

    ‘Rashsundari described her acts of cooking and feeding as hard work. She made no reference to the possibility of excitement in cooking, the gratification of feeding loved ones, the aroma and taste of memorable dishes that she would have prepared as a successful housewife …. She emptied out the act of cooking from associations of creativity and filled it with hard labour, with deprivation. She refused the iconic privilege of Annapurna.
    কলকাতায় প্লেগ সংক্রামক ব্যাধি হয়ে দেখা দিলে সুবর্ণলতা আর তার সন্তানদের আশ্রয় নিতে হয়েছিল চাঁপতায় ননদ সুবালার গ্রামের বাড়িতে। সেই নিতান্ত দরিদ্র সংসার ছিল সুবর্ণর বদ্ধ জীবনে এক ঝলক মুক্তির দক্ষিণা বাতাস। সংসারে দৈন্য থাকলেও মনে দৈন্য নেই ঐ পরিবারের কারুর। চাঁপতাতেই সুবালার স্বদেশী করা দেওর অম্বিকার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তার। সুবর্ণকে তার আগে থেকেই ছুঁয়ে গিয়েছিল সদ্যজাগ্রত জাতীয়তাবোধের আবেগ। মনের মতো কোনো সই পেলে ‘গঙ্গাজল’ বা ‘বকুলফুল’ নয় ‘বন্দেমাতরম’ পাতানোর ইচ্ছে ছিল তার। অম্বিকা শুধু দেশাত্মবোধক কবিতা লেখে তাই নয়, তার কাছে রয়েছে সুবর্ণর মনের মতো বই ও পত্রপত্রিকার সংগ্রহ। স্বভাবতই অম্বিকার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে দেরি হয়নি। যদিও সন্দেহবাতিকগ্রস্ত প্রবোধ আচমকা চাঁপতা এসে অম্বিকা আর সুবর্ণকে কথা বলতে দেখে কুৎসিত গালাগালির বন্যা বইয়ে দিয়েছে।
    ‘পায়ে জুতো নেই আমার? জুতিয়ে মুখ ছিঁড়ে না দেওয়া পর্যন্ত তোমার মতন বেহায়া মেয়েমানুষের মুখ বন্ধ করা যাবেনা! বেরিয়ে এসো! বেরিয়ে এসো বলছি! এতদিন পরে স্বামী এলো, ধড়ফড়িয়ে উঠে আসবে, তা না, পরপুরুষের বিছানায় বসে বসে স্বামীকে মস্করা!’
    এই অকথ্য অপমানের উত্তরে সুবর্ণ যে ক’টি কথা বলেছে পাঠকের মনে তা স্থায়ী দাগ কেটে যায়।
    ‘মিথ্যে তোমরা দেশ উদ্ধারের স্বপ্ন দেখছো অম্বিকা ঠাকুরপো। দেশকে আগে পাপমুক্ত করবার চেষ্টা করো। … এই মেয়েমানুষ জাতটাকে যতদিন না এই অপমানের নরককুন্ডু থেকে উদ্ধার করতে পারবে, ততদিন সব চেষ্টাই ভস্মে ঘি ঢালা হবে।’
    ৩.

    উনিশ শতকের শেষ দিক থেকেই বাঙালি মেয়েরা অনেকেই আত্মকথা বা ডায়েরি লিখেছেন, তার অনেকগুলি প্রকাশও হয়েছে। লেখিকাদের তালিকা এখানে নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিক হবে। তবু রাসসুন্দরী ছাড়াও কৈলাসবাসিনী, প্রসন্নময়ী, বিনোদিনী দাসী, কৃষ্ণভাবিনী দাস, কামিনী রায়, সুদক্ষিণা সেন, শরৎকুমারী, মানকুমারী, লীলাবতী মিত্র, আমোদিনী দাশগুপ্তের কথা মনে পড়ছে। অক্ষরজ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও মুখে মুখে নিজের জীবনকথা বলে গিয়েছেন সারদাসুন্দরী বা নিস্তারিণী। বোঝা যায় বহুদিন আপাত নির্বাক অন্তঃপুরে নিজের কথা বলবার আকাঙ্ক্ষা ক্রমে ফুটে উঠছে। ছড়া, লোকগান, রূপকথা বা উপকথার অর্থাৎ মৌখিক সাহিত্যে মেয়েদের কথা ফুটে উঠেছে আগে, এবার খাতার পাতায় এবং মুদ্রিত অক্ষরে আত্মপ্রকাশ ঘটল। সুবর্ণলতার খাতার গল্পে আশাপূর্ণা দেবী এক অজানা অনামা গৃহবধূর না মেটা অভীপ্সা প্রকাশ করেছেন। সুবর্ণও তার আত্মকথা প্রকাশ করার স্বপ্ন দেখেছিল আর কী নির্মম সেই স্বপ্নের নিধন।

    একটু অন্যভাবে এমন স্বপ্নসংহারের ছবি এঁকেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ১৩০০ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘খাতা’ গল্পে। বালিকা উমা লিখতে শেখার পর যত্রতত্র অক্ষরচর্চা করছিল। পঞ্জিকা, বাড়ির দেয়াল, বাবার হিসেবের খাতা — সর্বত্রই সে আঁকাবাঁকা অক্ষরে লিখে যাচ্ছিল। দাদা গোবিন্দলালের উগ্র পাশ্চাত্যবিজ্ঞানবিরোধী প্রবন্ধের ওপর উমা লিখেছিল ‘গোপাল বড়ো ভালো ছেলে, তাহাকে যাহা দেওয়া যায় সে তাহাই খায়।’ যদিও গোপাল বলতে সে গোবিন্দলালের সুবোধ প্রবন্ধপাঠকদের বোঝায়নি তবু তিরস্কার ও প্রহারের পর অনুতপ্ত দাদা ছোটোবোনকে একটি রুলটানা ভালো খাতা এনে দিয়েছিল। এই খাতাটি ছিল উমার সারাক্ষণের সঙ্গী। সাতবছরের মেয়েটি স্কুলে যাবার সময়, এমনকি রাতে ঘুমোবার সময়ও খাতাটি সঙ্গে রাখতো। ক্রমে ক্রমে লেখা কপি করার ফাঁকে ফাঁকে দু একটি স্বাধীন রচনা দেখা দিতে লাগল। নয়বছরে দাদার সহযোগী লেখক প্যারীমোহনের সঙ্গে উমাকে বিবাহ দেওয়া হল। স্নেহশীলা দাসী উমাকে শ্বশুরবাড়িতে রাখতে যাবার সময় খাতাটি নিয়ে গিয়েছিল। শ্বশুরবাড়িটি অতিরক্ষণশীল, মেয়েদের লেখাপড়ার কোনো ব্যাপার সেখানে কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। প্যারীমোহন গোঁড়ামিতে গোবিন্দলালের এক কাঠি ওপরে। উমা যে দরজা বন্ধ করে খাতায় কিছু লেখে তা দরজার ফুটো দিয়ে দেখেছিল তার সমবয়সী ননদরা। ‘তাহাদের অন্তঃপুরে কখনোই সরস্বতীর এরূপ গোপন সমাগম হয় নাই।’ খবরটি প্যারীমোহনকে বিচলিত করলো। পড়াশোনা শুরু হলেই নাটক নভেলের আমদানি হবে, ‘গৃহধর্ম রক্ষা করা দায় হইয়া উঠিবে।’ তাছাড়া তার একটি উদ্ভাবিত তত্ত্ব ছিল, সে বলত স্ত্রীশক্তি এবং পুংশক্তির সম্মিলনে পবিত্র দাম্পত্যশক্তির প্রাদুর্ভাব হয়, লেখাপড়া শিখলে স্ত্রীশক্তির পরাভব ঘটে একান্ত পুংশক্তি জাহির হয়। তখন পুংশক্তির সঙ্গে পুংশক্তির প্রতিঘাতে প্রলয়শক্তি উৎপন্ন হয়ে দাম্পত্যশক্তি বিনাশপ্রাপ্ত হয়, সুতরাং রমণী বিধবা হয়। সে স্ত্রীকে যথাবিহিত তিরস্কার করলো। তবু শরৎকালের সকালে এক ভিখারিণীর গলায় একটি আগমনী গান শুনে উমার হয়তো পিতৃগৃহ ও মায়ের কথা মনে পড়েছিল। অভিমানে হৃদয় পূর্ণ হয়ে তার চোখে জল এল। ভিখারিণীকে ঘরে ডেকে বিচিত্র বানানে সে গানটি খাতায় লিখতে আরম্ভ করল। ননদদের মাধ্যমে এই ‘ভয়ানক’ অপরাধের কথা চাউর হতে দেরি হলনা। ‘প্যারীমোহন খাতাটি লইয়া বালিকার লেখাগুলি উচ্চৈঃস্বরে পড়িতে লাগিল; শুনিয়া উমা পৃথিবীকে উত্তরোত্তর গাঢ়তর আলিঙ্গনে বদ্ধ করিতে লাগিল; এবং অপর তিনটি বালিকা-শ্রোতা খিল্খিল্ করিয়া হাসিয়া অস্থির হইল।’

    খাতাটি উমা আর পায়নি। ‘প্যারীমোহনেরও সূক্ষ্মতত্ত্ব-কন্টকিত বিবিধ প্রবন্ধপূর্ণ একখানি খাতা ছিল, কিন্তু সেটি কাড়িয়া লইয়া ধ্বংস করে এমন মানবহিতৈষী কেহ ছিল না।’ গল্পের এই শেষ বাক্যটিতে প্যারীমোহন ও ঐ শ্রেণীর লোকদের প্রতি লেখকের ক্রোধ যেন দপ্দপ্ করছে। সুবর্ণ বালিকা উমা নয়, তবু জগুর ছাপাখানায় মুদ্রিত হয়ে আসা তার মুদ্রণপ্রমাদভরা আত্মকথাটি উচ্চকন্ঠে পড়ে একই ধরনের ব্যঙ্গ করেছে সুবর্ণলতার গর্ভজাত জ্যেষ্ঠপুত্র ভানু। পরিবারের সকলে, প্রবোধ, পুত্রবধূরা সকলে পরম আমোদে সেই রঙ্গরসে যোগ দিয়েছে। সাদৃশ্য চোখ এড়ায়না ‘খাতা’ গল্পের সঙ্গে। কিন্তু সুবর্ণর অভিজ্ঞতাটি আরো মর্মান্তিক। ছেলেদের নিয়ে যে বড়ো আশা ছিল তার। গোটা জীবন ধরে সে স্বপ্ন দেখেছে ছেলেরা বড়ো হয়ে উঠলে তার না মেটা অনেক সাধ পূর্ণ হবে। ভানুর হাত ধরে বাল্যকালে ফেলে আসা বেথুন স্কুলটা একবার দেখতে যাবে। তার মনের মতো উদার হৃদয়ের ব্যক্তিত্ব থাকবে তার ছেলেদের। কিন্তু পরিবেশ আর বংশগতি যাবে কোথায়! সুবর্ণর ছেলেরা লেখাপড়া শিখে উপযুক্ত হয়ে ভালো রোজগার করতে শিখেছে বটে, চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যে তারা প্রবোধ ও তার সংকীর্ণচিত্ত ভাইদেরই মতো। মেয়েদের শ্রদ্ধা করতে শেখেনি তারা। তাদের নিম্নশ্রেণীর জীব মনে করে অবজ্ঞা, উপেক্ষা আর বিষাক্ত ব্যঙ্গবাণ ছুঁড়েই তাদের তৃপ্তি। মায়ের চারিত্রিক মহিমা তারা কিছুমাত্র অনুভব করেনি এবং সুবর্ণর তেজি, প্রতিবাদী স্বভাবের তারা কঠোর সমালোচক। সুবর্ণর বড়ো দুই মেয়েও মুক্তকেশীর দর্জিপাড়ার বাড়ির অনুদার, গ্লানিমাখা সংস্কৃতির শরিক। সুবর্ণর আত্মকথা নিয়ে তার নিজের বাড়িতে রগড়ের আসর বসে যাওয়া তাই কোনোভাবেই অস্বাভাবিক নয়। তবে এই ঘটনা সুবর্ণর কাছে তার গোটা জীবনের ব্যর্থতা আবার নতুন করে উপস্থিত করেছে। আগে বহুবার সে আত্মহত্যা করতে চেয়ে অভিশপ্ত সংসার জীবন থেকে পরিত্রাণ খুঁজেছে। সে সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এবার কিন্তু সে আত্মধিক্কার প্রকাশের সম্পূর্ণ অন্য পথ নিয়েছে। ছাদে আগুন জ্বেলে ছাপা বইগুলোর সঙ্গে প্রাণের থেকে প্রিয় খাতাগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে। আত্মহননের মতোই ভয়ানক এই ঘটনা। এই খাতাগুলো ছিল তার দীর্ঘকালের সঙ্গী। লোকচক্ষুর অন্তরালে কত সাবধানেই লেখা আর রাখা হত সেগুলিকে। এক-একখানি খাতা সংগ্রহের পিছনেই ছিল কত আগ্রহ, কত ব্যাকুলতা, কত চেষ্টা, আর কত রোমাঞ্চময় গোপনতার ইতিহাস।

    ‘ধ্বংস হয়ে গেল আজীবনের সঞ্চয়, নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল চিরকালের গোপন ভালবাসার ধনগুলি। সুবর্ণলতার আর কোনো খাতা রইল না।’

    তিলে তিলে খাতাগুলি সংগ্রহ আর গোপনে সাধের আখরে সাজিয়ে তোলা এবং পরিশেষে নিজের সবচেয়ে নিকট আত্মীয়দের ক্রূর পরিহাসে চূড়ান্ত অবসাদগ্রস্ত হয়ে সেই সব খাতা অগ্নিদগ্ধ করে ফেলা — সবটাই যেন প্রতীকী মনে হয়। কতো বেদনার পথ মাড়িয়ে, কাঁটাভরা রুক্ষ কতো বাধা বিঘ্ন পার হয়ে, কতো অবজ্ঞা, উপহাস, তিরস্কার ও নির্যাতন সহ্য করে খাতার অধিকার পেয়েছে মেয়েরা। উপন্যাসের শেষে জগুর বন্ধ হওয়া ছাপাখানায় সুবর্ণর ছোটো মেয়ে বকুল মায়ের হারিয়ে যাওয়া খাতা খুঁজতে এসে দাঁড়িয়েছে। পায়নি কোনো চিহ্ন, কিন্তু সংকল্প করেছে, ‘তোমার পুড়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া লেখা, না-লেখা সব আমি খুঁজে বার করবো, সব কথা আমি নতুন করে লিখবো। দিনের আলোয় পৃথিবীকে জানিয়ে যাব অন্ধকারের বোবা যন্ত্রণার ইতিহাস।’ পূর্ববর্তী নারীপ্রজন্মের অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব তুলে নিয়েছে পরবর্তী নারীপ্রজন্ম। অনায়ত্ত মুক্তির আকাশে ডানামেলার অভিযান অব্যাহত থাকবে এই আশাবাদী উজ্জীবনে উপন্যাস শেষ হয়।

    ৪.

    কী ছিল সুবর্ণর খাতার পাতায়? কয়েকটি পরিচ্ছেদে টুকরো টুকরো ভাবে আশাপূর্ণা তা জানিয়েছেন। যেসব কথা মুক্তকেশীর সংসারে মুখ ফুটে তার বলার উপায় ছিলনা, সেইসব ক্ষোভ, ক্রোধ, অভিমান পুঞ্জিত হয়েছিল খাতার মধ্যে। বাপের বাড়ির লোকদের প্রতি তীব্র অভিমানের পাশাপাশি ছিল তার শ্বশুরবাড়িতে উপযাচক হয়ে এসে নবকুমার ও সরলের অপমানিত হবার জন্য গভীর লাঞ্ছনার, লজ্জার অনুভূতি। প্রবোধের কর্কশ, সন্দিগ্ধ ব্যবহারে প্রতিদিন একটু একটু করে দূরত্ব বাড়বার ইতিবৃত্ত। কী ভয়ানক বিষাক্ত সেই সম্পর্ক।

    ‘দুই পরম শত্রু বছরের পর বছর একই ঘরে কাটিয়েছি, এক শয্যায় শুয়েছি, এক ডিবেয় পান খেয়েছি, কথা কয়েছি, গল্প করেছি, হেসেওছি।
    ওর বেশি অসুখ করলে আমি না খেয়ে না ঘুমিয়ে সেবা করেছি, আমার কোনো অসুখ করলে ও ছটফটিয়ে বেড়িয়েছে, আর তারই ফাঁকে ফাঁকে ও আমাকে, আর আমি ওকে ছোবল দেবার চেষ্টা করে ফিরেছি।
    অদ্ভুত এই সম্পর্ক, অদ্ভুত এই জীবন।’
    তাই বলে বদ্ধ এই রুদ্ধশ্বাস সম্পর্কে দক্ষিণের বাতাস কি বয়নি কোনোদিন! খাতার পাতায় ছিল সেই আলোর ঝিলিকের কথাও। একবার স্ত্রী, ভ্রাতৃবধূদের আর বোন বিরাজকে ‘বিল্বমঙ্গল’ দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল প্রবোধ। হাত খুলে খরচ করে মুখরোচক খাবার আর লেমনেড খাইয়েছিল। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে সেই ব্যতিক্রমী দিনটি সুবর্ণর স্মৃতি-সঞ্চয়ে দুর্লভ রত্নের দ্যুতি ছড়িয়েছে।
    ‘সেদিন উদার হয়েছিল প্রবোধ, সভ্য হয়েছিল, সুন্দর সেদিনের স্মৃতিকথা পরিচ্ছন্ন করে মাজা একটি গ্লাসে এক গ্লাস জলের মত স্নিগ্ধ শীতল।’
    কিন্তু শুধুই কি সাংসারিক অভিজ্ঞতার কথা? এতো যে বই, পত্র, পত্রিকা লুকিয়ে জোগাড় করে পড়তো সুবর্ণ, সেই সব পাঠের কথা কি ছিলনা খাতায়? বস্তুত এই সব পাঠের প্রতিক্রিয়াতেই ব্যক্ত হয়েছে সুবর্ণর ভাবনার মৌলিকতা, তার সাহিত্য রসাস্বাদনের ক্ষমতা। নয় বছরে স্কুল থেকে ছিঁড়ে সংসারের জোয়ালে জুড়ে দেওয়া মেয়েটি সম্পূর্ণ নিজে অর্জন করেছে রবীন্দ্রকবিতার দিগন্তস্পর্শী কল্পনাকে অনুভব করার ক্ষমতা। ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ বা ‘বধূ’ কবিতা তাকে আলোড়িত করেছে। মনে হয়েছে আশ্চর্য এক আনন্দলোকে কবি তাকে নিয়ে চলেছেন। সুবর্ণর রবীন্দ্রপ্রীতি বিষনজরে দেখেছে প্রবোধ। তার মন্তব্যে সে যুগের একশ্রেণীর গোঁড়া মানসিকতার লোকের বদ্ধমূল ধারণা প্রকাশ পেয়েছে। বক্র বিদ্বেষে রুচিহীন সেই আক্রমণ।
    “পদ্ম গেল পটল গেল গুগলি হল আঁখি;
    আর শালিক গেল ফিঙে গেল আরশোলা হল পাখী!’
    ‘এই এক রবিঠাকুর হয়েছেন দেশের মাথাটা খাবার জন্যে! মেয়েমানুষগুলো যাবে এবার উচ্ছন্নে। … হেম বাঁড়ুয্যে, ঈশ্বর গুপ্ত তো ছার — তোমার মতে বোধহয় তোমার ওই রবি ঠাকুর মাইকেলের চেয়েও বড় কবি!’
    সুবর্ণর নিজের লেখা একটি কবিতার পূর্ণ পরিচয় আছে উপন্যাসে। আশাপূর্ণা সেই কবিতায় সে যুগের সাবেকি কাব্যভাষাই ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ভাবনার মধ্যে, চিত্রকল্পে রবীন্দ্রপ্রভাব মিশিয়ে দিয়েছেন। সুবর্ণর অশিক্ষিতপটুত্ব আভাস দেয় জরুরি পরিশীলন ঘটলে তার কলম পিছিয়ে থাকতোনা।
    “অনন্ত নক্ষত্রপুঞ্জ আকাশেতে থাকি,
    পৃথিবীর পানে কি গো মেলে থাকে আঁখি?
    দেখিলে দেখিতে পাবে তারই দিকে চেয়ে
    জাগিয়া কাটায় এক পৃথিবীর মেয়ে।
    পিঞ্জরের পাখীসম বন্দী তার প্রাণ,
    ঊর্ধ্ব আকাশেতে যেন কি করে সন্ধান!
    কিন্তু হায় কাটে সুর, ভেঙে যায় মন,
    রুদ্ধ করি দিতে হয় মুক্ত বাতায়ন।
    নিষ্ঠুরা পৃথিবী আর প্রভাত নিষ্ঠুর।
    নিশীথের সব স্বপ্ন করে দেয় চুর।
    জেগে ওঠে শত চক্ষু, আসে দুঃখগ্লানি,
    নীরবে ঘোরাতে হয় নিত্যকার ঘানি।”
    দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গ, বিদেশি কাপড় পুড়িয়ে বস্ত্রযজ্ঞ — প্রতিটি প্রতিবাদে শামিল হতে চেয়েছিল সুবর্ণ, খাতায় আছে সেই সব চিহ্ন। কিন্তু চরকা কেটে দেশ স্বাধীন হবে — এই গান্ধীবাক্যে তার বিশ্বাস আসেনি। শেষপর্যন্ত নিজের হাতে গড়া সংসারের ওপরও বিশ্বাস হারিয়েছে তার। অনপনেয় অবসাদে আচ্ছন্ন হয়ে সম্পূর্ণ বিমুখ বিরূপতায় বারান্দায় শেষ শয্যা পেতেছে। তার জীবনের আদ্যন্ত ট্রাজেডিতে কোনো করুণধারার বর্ষণ নেই।

    উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের প্রথম দুই দশকে যে সব বাঙালি মেয়ের জন্ম — তাঁদের বেশির ভাগের ক্ষেত্রেই অনতিক্রম্য বেদনা যেন দুর্মোচ্য বিধিলিপি। অন্তঃপুরের অবরোধে বহির্জগতের আলো এসে পড়ছে, বাইরের ভাবনা-স্পন্দিত, কর্মচঞ্চল পৃথিবীর আহ্বানে দেহমন সাড়া দিতে চাইছে কিন্তু দুপায়ে অদৃশ্য শিকল। পিতৃতন্ত্রের সুকৌশলী ব্যবস্থায় মেয়েদের মুক্তির পথে বাধা দিতেন অনেকসময় মেয়েরাই, পরিবারের অন্নউপার্জনকারী পুরুষদের ধমকচমক তো ছিলই। সুবর্ণলতার স্রষ্টা আশাপূর্ণার জন্ম ১৯০৯ সালে। তাঁর ঠাকুমা ছিলেন কন্যাসন্তানদের ক্ষেত্রে প্রচন্ড রক্ষণশীল। মেয়েদের স্কুল বা পাঠশালায় যাওয়া কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ ছিল। আশাপূর্ণা জানিয়েছেন,

    “অতি রক্ষণশীল পরিবারে জন্মগ্রহণের পরম সুযোগে স্কুলে যাওয়ার বালাই নেই, বালাই নেই ভূগোল ইতিহাস মুখস্থ করার — অঙ্ক কষার। কারণ স্কুলে পড়লেই যে মেয়েরা … বাচাল হয়ে উঠবে এ তথ্য আর কেউ না জানুক আমাদের ঠাকুমা ভালোভাবেই জানতেন, এবং তাঁর মাতৃভক্ত পুত্রদের এই জানার বিরুদ্ধে কিছু করার শক্তি ছিলনা।”
    আশাপূর্ণা অসামান্য প্রতিভার অধিকারিণী, তাঁর পক্ষে সহায়ক ছিল বাড়ির সাংস্কৃতিক আবহাওয়া। মায়ের পুস্তকানুরাগের সূত্রে অজস্র পুস্তকের অবিরল সরবরাহ। কিন্তু আমাদের মনে পড়বে শাশুড়ি মুক্তকেশীর প্রবল বিরুদ্ধতায় এবং তাঁর অনুদার সংকীর্ণচিত্ত পুত্রদের নিশ্চেষ্টতার ফলে সুবর্ণলতা তাঁর চারটি মেয়ে চাঁপা, চন্দন, পারুল, বকুল, কারুকেই স্কুলে পাঠাতে পারেনি। আলোকপ্রাপ্ত পরিবারে নারীশিক্ষা বা নারীমুক্তির হাওয়া লাগলেও সমাজের বাকি অংশে অন্ধকার ও মেয়েদের প্রতি অবজ্ঞা তখনো জমাট।

    ভারতী রায় তাঁর ‘একাল সেকাল পাঁচ প্রজন্মের ইতিকথা’ বইতে দিদিমা ঊষাবালার চিরকালের জন্য হারিয়ে যাওয়া খাতার কথা লিখেছেন। ঊষাবালার জন্ম ১৯০০ সালে। স্কুলে যাবার সুযোগ পাননি। বাল্যকালেই বিয়ে হয়ে যায়। অধ্যাপক স্বামী জ্যোতিষ ও উজ্জ্বল পুত্রকন্যা নিয়ে সুখের সংসার ছিল তাঁর। দুপুরে সব কাজ সেরে বই পড়তেন। হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতা কন্ঠস্থ ছিল তাঁর। স্পষ্ট গলায় আবৃত্তি করতেন। লিখতেনও গোপনে, ডায়েরি, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, রম্যরচনা। একান্ত নিভৃত সেই জগৎ। বিদ্বান স্বামীকেও কখনো জানতে দেননি। ঘরের এক কোণে মেঝের ওপর অনাদৃত পড়ে থাকতো খাতাগুলি। একদিন ঘরের জঞ্জাল সাফ করার উদ্দেশ্যে জ্যোতিষ বাতিল কাগজপত্র মনে করে সেসব বিক্রি করে দিলেন। সুবর্ণলতার সঙ্গে তুলনা করেছেন ভারতী রায়। ‘আশাপূর্না দেবীর উপন্যাসের সুবর্ণলতার লেখাগুলি তার ছেলে নষ্ট করে দিয়েছিল অবজ্ঞা ও অবমাননার সঙ্গে। ঊষাবালার লেখা জ্যোতিষ নষ্ট করলেন অনবধানতায়। পরিনাম এক। আর লেখেননি ঊষা।’

    নীরদচন্দ্র চৌধুরীর জন্ম ১৮৯৭ সালে। তাঁর বিখ্যাত আত্মজীবনী ‘Autobiography of An Unknown Indian’ বইতে নিজের মায়ের কথা লিখেছেন। স্বভাবতই নীরদচন্দ্রের মায়ের জন্ম উনিশ শতকের শেষ দিকে। তাঁর মায়ের নাম ছিল সুশীলাসুন্দরী চৌধুরাণী। পুত্রের বর্ণনা থেকে বোঝা যায় সুশীলাসুন্দরী সাধারণ মহিলা ছিলেননা। তাঁর দৃঢ় চরিত্র, মিথ্যার প্রতি ঘৃণা, নৈতিক শৈথিল্যের ও কাপুরষতার প্রতি তীব্র বিরাগ এবং সুগভীর সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠার কথা নীরদচন্দ্র উল্লেখ করেছেন। কিন্তু পুত্রের কী করা উচিত — কর্তব্য, অকর্তব্য নিয়ে মা ও ছেলের মধ্যে প্রচন্ড তর্কবিতর্ক ও ভুল বোঝাবুঝি হত। স্বামী উপেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী সম্বন্ধে সুশীলাসুন্দরীর অভিযোগ ছিল। কিন্তু কী কারণে এবং সুনির্দিষ্টভাবে কী সেই অভিযোগ তা সুশীলা স্পষ্ট করেননি। ছেলেকে কয়েকটি চিঠি দেখাবেন বলেছিলেন, কিন্তু শেষপর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠেনি। নীরদচন্দ্রের বিচারে তাঁর বাবা সর্বার্থে আদর্শ স্বামী ছিলেন। কখনো স্ত্রীর ওপরে নিজের ইচ্ছা চাপাননি, বরং স্রীর প্রতিটি ইচ্ছাকে দাম দিতে গিয়ে নিজের অনবদ্য কেরিয়ারের ক্ষতি করেছেন। তবু সুশীলা সর্বদাই ছিলেন অসন্তুষ্ট। এমনকি তাঁর কুসংস্কার ছিল শাশুড়ি অভিশাপ দিয়েছিলেন বলে তাঁর সুখশান্তি জোটেনি। এই পর্যন্ত নীরদচন্দ্রের বর্ণনায় বোঝা যায় বাবার প্রতি তাঁর পক্ষপাতিত্ব বেশি। মায়ের অশান্তিপ্রবণ স্বভাব সম্বন্ধে পুত্র কিঞ্চিৎ বিরক্ত। একটি বিশেষ পরিবারের এই ইতিবৃত্তকে এরপরে বৃহত্তর সমাজছবির সঙ্গে যুক্ত হতে দেখি।

    ‘She was endowed with a fatal facility for self-torture, and this capacity for self-torture was the cause, effect, and accompaniment, all rolled into one, of the calamitous malady from which she suffered all her life.
    This was hysteria, a disease which at one time used to be quite common, almost fashionable, among Bengali women. But while others were able after a period of flirtation to get rid of it either through the coming of children, or assumption of household responsibilities, or some other changes in the way of life, in my mother’s case it became a psychologically well organized, insane state running parallel to her normal life.’
    নীরদচন্দ্রের মায়ের মানসিক বৈকল্যের সঙ্গে সেযুগের মেয়েদের হিস্টিরিয়াকে যুক্ত করাটা নানা দিক দিয়েই তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। ‘ফ্যাশনেবল’ শব্দটি অবশ্য আমাদের রীতিমতো আপত্তিকর লাগে। মানসিক অবসাদ ও তার শারীরিক প্রকাশ রোগীর পক্ষে যথেষ্ট যন্ত্রণাদায়ক। তাকে ‘ফ্যাশন’ বলাটা সহানুভূতির অভাব সূচিত করে। তবে নীরদচন্দ্রের সাক্ষ্য অনুযায়ী একটা বিশেষ সময়ে বাঙালি মেয়েদের মধ্যে হিস্টিরিয়া বেশি দেখা যেত। আমরা কি সামাজিক পারিবারিক পরিস্থিতির মধ্যে তার কারণ সন্ধান করতে পারি? মেয়েদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা সৃজনশীলতার কোনো মূল্য তো সমাজ বা পরিবারে ছিলনা। রন্ধনপটুতা বা গৃহস্থালির কাজ তাঁদের অবশ্য কর্তব্য বলেই ধরা হত। মেয়েদের দাম নির্ধারিত হতো দৈহিক সৌন্দর্য এবং বংশধারা প্রবাহিত করার ক্ষমতা দিয়ে। সেখানেও পুত্রসন্তানের জন্ম দিলে তবেই কদর জুটতো। খেলাঘর ছাড়ার সময় থেকেই গর্ভধারণ ও সন্তানপ্রসবের চক্র শুরু হয়ে যেতো। রীতিমতো প্রতিষ্ঠিত ছিল তাঁদের নির্বুদ্ধিতার তত্ত্ব, ‘মেয়েমানুষের দশহাত কাপড়েও কাছা হয় না।’ পড়াশোনার পথে ছিল খিল আঁটা। মেয়েরা অনেকেই তো অনুভব করতেন নিজেদের সৃজনাত্মক প্রবণতা, শিল্প বা সাহিত্যরচনার ক্ষমতা, যুক্তিবাদিতা, স্বাধীন ভাবে চিন্তা করবার শক্তি, অন্যায়ের প্রতিবাদের ইচ্ছা। কীভাবে তাঁরা চাপা দিতেন সেই স্বাতন্ত্র্য? ছড়া, রূপকথা, গান, আলপনা, ব্রতের জগৎ কি তৃপ্ত করতে পারতো তাঁদের? মেয়েদের মারাত্মক অবদমনকে আমরা কি কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারি? কখনো হয়তো ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির লাভা উদ্গীরণের মতো টলে যেত সব স্থিতির সাজানো চাপানো পাথর।

    উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের গোড়ায় শিক্ষা ও মুক্তচিন্তার আলো অন্তঃপুরে তির্যকভাবে এসে পড়েছিল বটে, জগদ্দল সংস্কার, প্রথাবদ্ধতা কীভাবে মেয়েদের আলোকপিপাসু মনে বিশাল প্রস্তরকঠিন বাধা হয়ে চেপে বসেছিল তার টুকরো টুকরো স্মৃতি-আলেখ্য জ্যোতির্ময়ী দেবীর মতো প্রতিভাময়ী লেখিকা, রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের মতো অগ্নিদীপ্ত মহীয়সীর লেখায় পাচ্ছি। পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েদের লেখালেখিতেও ধরা আছে পূর্বপ্রজন্মের মেয়েদের সেই সব অব্যক্ত বেদনার কথা। এইসব মেয়েদের ট্রাজেডি ছিল মোপাসাঁর গল্পের হতভাগ্য ঘোড়াটার মতো। ঘোড়াটা বুড়ো হয়ে পড়েছিল, তার গলার রশিটা ছোটো করে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল মাঠে। চারদিকে সতেজ সরস ঘাসের সমারোহ, কিন্তু গলা প্রাণপণ বাড়িয়েও ঘোড়াটা সেই ঘাসের নাগাল পেতোনা। নিজের আয়ত্তের মধ্যে যেটুকু খাদ্য পাওয়া যায় তা নিঃশেষ করে অনাহারে থাকতে হতো তাকে। সেকালের মেয়েদের ও কিঞ্চিৎ লেখাপড়া ও বাইরের জগতের স্বাদ দিয়ে গলায় অদৃশ্য শক্ত লাগাম পরানো থাকতো। নাগালের মধ্যে যেটুকু হাতে পেতেন তাঁরা পড়তেন, জানতেন, কিন্তু তারপর? গন্ডি ভাঙার ক্ষমতা ছিলনা তাঁদের। মোপাসাঁর গল্পের ঘোড়াটা শেষপর্যন্ত না খেতে পেয়ে মারা যায়।

    ‘ওইখানেই মাটিতে পুঁতে দেওয়া হল তার শব। তারও পরে নামল বর্ষার ধারা। জান্তব দেহের সারে আর বৃষ্টির জলে ঘোড়াটার কবরের উপর রাশি রাশি সতেজ আর শ্যামল ঘাসের জন্ম হল।’
    গল্পের সাংকেতিক সমাপ্তির রেশ টেনে বলা যায় অনামা এইসব মেয়ের আত্মাহুতির জমিতেই পরবর্তীকালে নারীমুক্তি আন্দোলনের ফসল ফলেছে। গোটা জীবনের আপোসহীন সংগ্রামের শেষে অনিবার্য ব্যর্থতা, গ্লানি, অবসাদ সুবর্ণলতাকে একটি বিশেষ যুগের প্রতীকমানবী করে তুলেছে। অসংখ্য নারীর আত্মআবিষ্কার, আত্মপ্রতিষ্ঠার কঠোর লড়াই এবং পরিশেষে বাধ্যতামূলক পরাজয় ও বিলুপ্তির ইতিহাস সুবর্ণলতার মধ্যে ধরে রেখেছেন আশাপূর্ণা দেবী।

    তথ্যঋণ:

    • সুবর্ণলতা : আশাপূর্ণা দেবী
    • প্রবন্ধ সমগ্র : ভূদেব মুখোপাধ্যায়
    • গল্পগুচ্ছ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    • Hindu Wife, Hindu Nation : Tanika Sarkar
    • Autobiography of an Unknown Indian : Nirad C Chowdhuri
    • প্রবন্ধসংগ্রহ : গোপা দত্তভৌমিক
    • সাহিত্যে ছোটগল্প : নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)