• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৪ | এপ্রিল ২০২৪ | গল্প
    Share
  • ফাঁড়া : সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

    কী কুক্ষণে যে সামাজিক মাধ্যমে নোটিশ লাগিয়েছিলাম, যারা আমার বই পড়ার জন্য ধার নিয়ে দিচ্ছি-দেব, গড়িমসি করে ফেরত দাওনি তারা সেগুলি অবিলম্বে ফেরত দিয়ে যাও আর আমার বইয়ের আলমারিতে পড়ে থাকা তোমাদের বইগুলি নিজ দায়িত্বে চিনে, ফেরত নিয়ে যাও!

    হয়েছে কী, গত শনিবার মলি আর আমি সী-উড স্টেশনের ওপর গ্র্যাণ্ড সেন্ট্রাল ম্যলে ঘুরতে গিয়েছিলাম। ফার্স্ট ফ্লোরে, রাজস্থানী হস্তশিল্পের দোকানের সামনে জলচৌকির ওপর আসন পেতে এক জ্যোতিষী বসেছিল। পরনে ধবধবে সাদা ধুতি-কুর্তা, মাথায় রঙিন পাগড়ি, কাঁধে আচকান, সামনে ল্যাপটপ কম্প্যুটার... দেখলেই ভক্তি হয়। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হাত তুলে ডেকে হিন্দিতে বলল, বেটা তোর সামনে তো বিরাট ফাঁড়া দেখছি। একটু সাবধানে থাকিস।

    মলি আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে ফুডকোর্টের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল, “সব ক’টা চোর-চোট্টা বদমাশ। এদের কথায় একদম কান দিস না।”

    আমি আর মলি ক্লাসমেট। কলেজের শেষ দিকে এসে নিরামিষ বন্ধুত্বটায় রং ধরেছিল। পাকতে পাকতে বছর দু’য়েকের মধ্যেই সাত পাক। সেও হয়ে গেল এক যুগ। তবু এখনও তুই-তোকারিটা রয়ে গেছে। কচি-কাঁচা একটা এসে পড়লে, দায়িত্ব বাড়লে, হয়তো ছেলেমানুষি শুধরে যেত। কিন্তু ডাক্তার-টাক্তার দেখিয়েও কিছু লাভ হয়নি। মলির কোল আলো করে খোকা অথবা খুকু আসেনি। মুখে কিছু না বললেও, সেই নিয়ে মলির একটা চাপা দুঃখ আছে। সে যাই হোক, মলির আদেশ, মন খুঁতখুঁত করলেও জ্যোতিষীর কথায় কান দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

    পরের দিন রবিবার, সকালে চায়ে চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজের পাতা ওল্টাচ্ছিলাম। রাশিফলের পাতায় এসে চোখ আটকে গেল। দেখলাম আমার জন্মমাসের রাশির ভাবগতিক মোটেই সুবিধের নয়। গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান অনুযায়ী আকস্মিক দুর্ঘটনা প্রায় অবশ্যম্ভাবী। মনে হল আগের দিন মলির কথায় অতটা গুরুত্ব না-দিলেই বোধহয় ঠিক হত। সোমবার সন্ধেবেলা অফিস ফেরতা গ্র্যাণ্ড সেন্ট্রাল মলে গিয়ে দেখি সেই জ্যোতিষী হাওয়া। তার জায়গায় এক বাঙালি ছোকরা বসিরহাটের গামছার স্টল দিয়েছে।

    পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হলে ধার-দেনা রেখে না যাওয়াই মঙ্গল। সেই ভেবেই নোটিশটা লাগিয়েছিলাম। নোটিশ দেওয়ার আধ ঘন্টার মধ্যেই কুড়ি-বাইশটা লাইক পড়ে গেল। খান দশেক লাভ সাইন। তিনটা লাল-লাল রাগী মুখ। আর অন্তত সাড়ে-বত্তিরিশটা কমেন্ট। আমার বন্ধুরা পরিষ্কার দুই গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে গেল। (১) যারা বই ধার দেয় (লাইক এবং লাভ গোষ্ঠী), (২) যারা বই ধার নেয় (রাগী মুখ এবং কমেন্ট গোষ্ঠী)। আমি মিনমিন করে জীবনের নশ্বরতা, তজ্জনিত অনিশ্চয়তা এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমার দেওয়া নোটিশের যৌক্তিকতা নিয়ে কিছু বলতে গিয়েছিলাম। কিন্তু কমেন্ট গোষ্ঠীর বন্ধুরা সমবেত ভাবে আমায় জানাল যে বই ধার দিয়ে ফেরত চাওয়া অত্যন্ত নীচ মনোবৃত্তির পরিচয়। আমি আর কথা বাড়ালাম না।

    দু’-দিন পরে সন্ধেবেলা অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পর মলি বলল, “তোর সেই বন্ধু এসেছিল – ইছামতী। একটা বই রেখে গেছে।”

    ইচ্ছা, ইছামতী... নদীর নামে নাম। আমার পিসতুতো বোন অদিতির বন্ধু। ইচ্ছার বরের ট্রান্সফারের চাকরি। কয়েক মাস হল ওরা মুম্বাই এসেছে। দু’-একবার কথা হয়েছে ফোনে, ওই করেছিল। বলেছিল আমার ফোন নম্বর অদিতির কাছ থেকে পেয়েছে। অদিতির সঙ্গেও নাকি ইছামতীর যোগাযোগ ছিঁড়ে গিয়েছিল। বলল, তাকে সে খুঁজে পেয়েছে সামাজিক মাধ্যমে।

    খুব দেখতে ইচ্ছা করছিল ইচ্ছাকে। কতওদিন তার ডান বুকের তিল দেখিনি, বাঁ বাহুর টিকের কুয়োয় আঙুল ডোবাইনি। এখনও কি সে কথা বলতে বলতে মাঝপথে থেমে যায়? ভুলে যায় কী বলছিল? অন্যমনস্ক হয়ে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ায়? এখনও কি আদর পেলে তার ঠোঁটের ওপর ভোরবেলার শিউলি ফুলের মত স্বেদবিন্দু ফুটে ওঠে? অদিতির বন্ধুদের প্রোফাইল ঘেঁটে ইচ্ছাকে খুঁজে বার করে ভারচ্যুয়াল বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠিয়েছিলাম। ভাবিনি স্বীকার করবে। সপ্তাহ খানেক পরে দেখেছিলাম আমার বন্ধু-লিস্টিতে ইছামতীর নাম থৈ-থৈ করছে।

    সেন্টার টেবিল থেকে বইটা তুলে হাতে নিয়ে দেখলাম একটা গল্প সংকলন, ‘অসহবাস সংগ্রহ’। বছর দশ-বারো আগে একটা নামকরা প্রকাশনা সংস্থা সংকলনটা বার করেছিল। তখন আমাদের ঠা-ঠা যৌবন। বইটার মলাট দেখে চেনা লাগল। বইটার বাষট্টি আর তেষট্টি পাতার মাঝখানে একটা চিরকুট থাকার কথা, আর একটা শুকনো ফুল। পাতা উলটে দেখলাম সেসব কিচ্ছু নেই। একটা অস্পষ্ট দাগ লেগে আছে শুধু। মলিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আর কিছু রেখে যায়নি?”

    মলি উল্টে জিজ্ঞেস করল, “আরও কিছু রেখে যাওয়ার কথা ছিল নাকি?”

    মলির গলায় যেন লুকনো ছুরির টান ছিল। আমি চুপ করে গেলাম। ইচ্ছা কি কিছু বলেছে মলিকে? আমি জামসেদপুর ছেড়ে কলকাতার কলেজে পড়তে আসার পর থেকেই ইচ্ছার সঙ্গে যোগাযোগ কমছিল। সম্পর্কটা আলগা হয়ে যাচ্ছিল। সেকেন্ড ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষার আগে শুনেছিলাম ইচ্ছার বিয়ের তোড়জোড় চলছে। তখনও মলির সঙ্গে তেমন ঘনিষ্ঠতা হয়নি। সেই কবেকার কথা! কসবায় দুই বন্ধু, আমি আর অতীন একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকতাম। সঙ্গে একটা হুলো বিড়াল থাকত। সে আমাদের এঁটোকাঁটা খেত।

    একটা ছুটির দুপুরে কলিং বেলের শব্দ শুনে দরজা খুলে দেখি ইচ্ছা। ইচ্ছা আমার সঙ্গে শেষ বোঝাপড়া করতে এসেছিল। ফলত যা হয়, কথাবার্তার উত্তাপ বাড়ছিল। খানিকক্ষণ পরে, অতীন অতিষ্ঠ হয়ে আমাদের একা ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। ফিরেছিল সন্ধে পার করে। ততক্ষণে আমরা হুলোটাকে একটা বড়সড়ো ঝাঁপির নিচে ঢেকে, শিল চাপা দিয়ে ফেলেছি।

    ইচ্ছা ফোন করে এলেও না-হয় অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করতাম। হয়তো আমার সঙ্গে দেখা হোক সে চায়নি। ফোনে কথা বলা এক রকম... বোধহয় ভয় পেয়েছে, দেখা হলে আমাদের ঝাঁপি চাপা দিয়ে রাখা বিড়ালটা বেরিয়ে পড়বে, আঁচড়ে কামড়ে দেবে। মলি বলল, “তোর বন্ধুটা বেশ মিশুকে। অনেক গল্প করল।”

    “কী গল্প?” আমি ভুরু কোঁচকালাম।

    “তুই নাকি একবার পিকনিকে গিয়ে নদী দেখে লোভ সামলাতে পারিসনি, জামাকাপড় ছেড়ে উদোম হয়ে জলে নেমে গিয়েছিলি,” মলি মুচকি হেসে বলল। গল্পটা প্রাপ্তবয়স্কতার দিকে মোড় নিচ্ছে দেখে আমি আর মলিকে ঘাঁটালাম না।

    আমার অনুপস্থিতিতে ইচ্ছার আসা-যাওয়া বাড়ছিল, বুঝতে পারছিলাম। আমার অস্বস্তিও বাড়ছিল। মলি কখনও জানাত সে এসেছিল, কখনও বেমালুম চেপে যেত। তবু আমি বুঝতে পারতাম। ঘরের মধ্যে অতীত থেকে উঠে আসা একটা ফ্লোরাল পারফ্যুমের তীব্র গন্ধ ঘুরপাক খেত। মলি ফ্লোরাল বিলকুল পছন্দ করে না। অবশ্য জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে যেত। একদিন অফিস থেকেই ইচ্ছাকে ফোন করলাম, সে ধরল না।

    ফাঁড়াটা যে ইচ্ছা, সেটা ধীরে ধীরে বোধগম্য হচ্ছিল। আজকাল অধিকাংশ দিনই অফিস থেকে ফিরে দেখি মলির মুখ কালো। কেন, কী বৃত্তান্ত জিজ্ঞেস করলে জবাব দেয় না। উঠে চলে যায়। পাঁচ মিনিট পরে সেন্টার টেবিলের ওপর ঠক করে এক কাপ চা নামিয়ে রেখে যায়। চুমুক দিয়ে দেখি চায়ে চিনি দিতে ভুলে গেছে।

    এর মধ্যে একটা শনিবার আবার সেই গ্র্যাণ্ড সেন্ট্রাল ম্যলের জ্যোতিষীটার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সব সময় লোকটার সঙ্গে শনিবারই দেখা হয় কেন কে জানে! এবার অবশ্য ম্যলে নয়। সবজি বাজার করে ফিরছিলাম, দেখলাম পেভমেন্টের ধুলোর ওপরেই আসন বিছিয়ে বসে আছে। সামনে খাঁচার মধ্যে একটা কটকটে টিয়াপাখি। পাশে গাদা করে কতগুলো বই রাখা। তার ওপর টাক মাথা, ভুঁড়িদাস একটা লোকের ফ্রেমে বাঁধানো ছবি। ছবির লোকটার মুখ হাসি-হাসি। কিন্তু জ্যোতিষী ভদ্রলোকের গোঁফ ঝুলে গেছে, পোষাক ময়লা, চেহারাতেও আগের চাকচিক্য নেই। মনে হল তার নিজেরই সময়টা ভাল যাচ্ছে না। সামনে দাঁড়িয়ে হিন্দিতেই বললাম, মহারাজ, সব কুশল-মঙ্গল তো?

    সে আমায় চিনতে পারল না। যতই যাই হোক, এই লোকটাই প্রথম আমায় সতর্ক করেছিল। সেবার মলি কাছে ঘেঁষতে দেয়নি। এবার কাছাকাছি মলি নেই, আমি উবু হয়ে বসে হাতটা সামনে এগিয়ে দিয়ে বললাম, “দেখিয়ে তো, কব মুসীবতসে ছুটকারা মিলেগা।”

    জ্যোতিষী ছবির ফ্রেমের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “পহ্‌লে গুরুদেবকে চরণোমে শ’ রুপিয়া রাখো, উস কে বাদ বাতায়েগা।”

    একশ’ টাকা আক্কেল সেলামী দেবার পর সে জানাল, মুসীবত মানে ফাঁড়া একটা আছে বটে। কিন্তু সেটা সাময়িক। শিগগিরই রেহাই পাওয়া যাবে।

    জয় গুরু! তার মানে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে ইচ্ছার যাতায়াত বন্ধ হতে বেশি দেরি নেই। মলিকে তো চিনি, ইচ্ছার সঙ্গে একঘেঁয়ে গল্প করতে করতে নিশ্চয়ই বোর হয়ে গেছে। এবার ইচ্ছাকে কাটিয়ে দেবে। অথবা কে বলতে পারে? হয়তো ইচ্ছার বরের অন্য শহরে ট্রান্সফার হয়ে যাবে। আমি উঠতে যাচ্ছিলাম, জ্যোতিষী টিয়া পাখিটাকে দেখিয়ে বলল, “যজমান, উর্বশী কে লিয়ে কুছ নেহি দেগা?”

    বাজারের থলে থেকে উর্বশীর জন্য একটা সিমলা মির্চি বার করে দিলাম।

    জ্যোতিষীর সঙ্গে দেখা হওয়ার তিন-চার দিন পর, রাত্তিরে বিছানায় উল্টোদিক ফিরে শুয়ে মলি বলল, “ইছামতীর বরটা একটা চামার।”

    আমি অবাক হয়ে বললাম, “সে কী? কেন?”

    মলি আমার দিকে ফিরে বলল, “চামার না হলে একটা ফুলের মত মেয়েকে কেউ এভাবে কষ্ট দেয়?”

    আমি বললাম, “মলি, কী হয়েছে খুলে বল। ক’দিন ধরেই দেখছি তুই মনের মধ্যে গুমরোচ্ছিস।”

    “জানিস, ইতরটা ইছামতীকে সন্দেহ করে,” মলি এমন ভাবে বলল যেন বিবাহিতা স্ত্রীকে সন্দেহ করা পৃথিবীর জঘন্যতম অপরাধ, “ওইরকম নদীর মতো সহজ একটা মেয়ে কোনওদিন কাউকে মিথ্যে কথা বলতে পারে, বল?” মলি আমার সম্মতি চাইল।

    আমি ব্যাপারটাকে লঘু করার জন্য বললাম, “মলি, আগে তুই ঠিক করে নে, ইছামতীকে নদী বলবি না ফুল।”

    মলি বলল, “সব কিছুতে ইয়ার্কি ভাল লাগে না। ব্যাপারটা সিরিয়াস।”

    আমি বললাম, “আচ্ছা, আচ্ছা, সিরিয়াস... কিন্তু কী নিয়ে সন্দেহ করে? হঠাৎ সন্দেহ করার মত হলই বা কী?”

    মলি বলল, “হঠাৎ নয়, বিয়ের পর থেকেই।”

    আমার বিশ্বাস হল না, বললাম, “ভ্যাট, ওদের দুটো বাচ্চা... বললেই হল?”

    মলি বলল, “ইছামতী বলছিল, বড় মেয়েটাকে ওর বর নিজের ব’লে মানতে চায় না। বলে ইছামতী নাকি পেটে বাচ্চা নিয়ে বিয়ে করেছিল।”

    কী কেলো! আমি আঁতকে উঠে বললাম, “বলিস কী? ইছামতী এতদিন ধরে হতভাগাটাকে সহ্য করে যাচ্ছে?”

    মলি বলল, “আর বলিস না। যত দিন যাচ্ছে ততই নাকি তার অসভ্যতা বাড়ছে। বাচ্চাদের সামনেই ইছামতীকে যাচ্ছেতাই করে। ছেলে-মেয়ে বড় হচ্ছে...”

    আমি বললাম, “আমি একবার কথা বলে দেখব?”

    “লাভ নেই। তুই বোধহয় জানিস না, ইছামতীরা সুরাট চলে যাচ্ছে। ওর বর বড় মেয়েটাকে জোর করে পুণের একটা বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে। ভাব একবার! তেরো-চোদ্দ বছরের একটা মেয়ে বাপ-মাকে ছেড়ে কী করে থাকে!”

    আহা বেচারা! মেয়েটার কথা ভেবে আমারও খারাপ লাগল। মলি আমার দিকে ফিরে বুকের কাছে গুটিসুটি হয়ে এসে বলল, “শোন না, আমি ইছামতীকে কথা দিয়েছি, আমরা ছুটিছাটায় গিয়ে মেয়েটাকে দেখে আসব।”

    *

    জানি না, ইচ্ছা মলিকে কতটা কী বলেছে। ইচ্ছার সঙ্গে যেদিন শেষ বার দেখা হয়েছিল আমরা দু’জনেই নেহাত ছেলেমানুষ ছিলাম। তবু যতদূর মনে পড়ে সেদিন আমরা হঠকারীর মত কোনও কাজ করিনি, যথেষ্ট সাবধানতা নিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ঘটনা হওয়ার হলে কে আটকাতে পারে? কে জানে, ইচ্ছার বড় মেয়ের শরীরে সত্যি-সত্যিই আমার ফেলে আসা ডিএনএ আছে কি না? পুণে যাওয়ার সময় গাড়িতে বসে বেশ টেনশন হচ্ছিল। মলি কি মেয়েটার মুখে আমার মুখের আদল খুঁজে পাবে? উর্বশীকে সিমলা মির্চি খাওয়ানোটা কি সম্পূর্ণ বৃথা যাবে? ফাঁড়াটা যেন কাটি-কাটি করেও কাটছে না!

    বোর্ডিং স্কুলের গেট দিয়ে ঢোকার সময় বুকটা ধুকপুক করছিল। মলি হোস্টেল সুপারিন্ডেন্টকে আগে থেকে ফোন করে দিয়েছিল। ভদ্রমহিলা গার্লস হোস্টেলের সামনে ইচ্ছার বড় মেয়েকে নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কাছে গিয়ে মেয়েটাকে দেখে আমার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। ঝাপুর-ঝুপুর কোঁকড়ানো চুল, পাতলা ঠোঁট, ছোট চিবুক... ইচ্ছার মুখ যেন কেটে বসানো।

    মলি এগিয়ে গিয়ে মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। আমারও খুব ইচ্ছা করল মেয়েটার কাছে যেতে। মাথায় হাত রাখতে। কেন কে জানে, পারলাম না। স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)