• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৪ | এপ্রিল ২০২৪ | গল্প
    Share
  • উভচরী : উস্রি দে

    মোবাইলটা বেজে যাচ্ছে ডাইনিং টেবিলের ওপরে। রাতের সব্জির জন্য কড়াইশুঁটি ছাড়াচ্ছিলেন কল্পনা। তড়িঘড়ি মোবাইলটা নিয়ে ‘রিনি, রিনি…’ করে ডাকতে ডাকতে নিচের ঘর থেকে যখন কোন সাড়া পেলেন না, তখন দোতলায় উঠে গেলেন। মোবাইলটা ততক্ষণে বেজে বেজে বন্ধ হয়ে গেছে। অষ্টমঙ্গলা থেকে ফিরেছে দুদিন হল। ওর মা-ই ফোন করছিলেন। ধরতে গিয়েও ধরেন নি কল্পনা। কী জানি, নতুন সম্বন্ধী, যদি কিছু মনে করে বসেন। মেয়ের মোবাইলে ফোন করলে শাশুড়ি ধরছে, একি! কোন প্রাইভেসি নেই নাকি!

    দরজাটা একটু ঠেলতেই খুলে গেল। খাটের ওপর শুয়ে আছে রিনি কাত হয়ে। ঘুমিয়েই পড়েছে বোধহয়। ঘুমের আর দোষ কি! যা ধকল যাচ্ছে কদিন ধরে! দক্ষিণের জানালার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে এক টুকরো রোদ্দুর চুপিসারে ঢুকে রিনির কপালের এক পাশ ছুঁয়ে গলা বেয়ে আলগোছে নিচে নেমেছে। কাছে যেতেই কল্পনার চোখ আটকে গেল। নাইটির ফ্রন্ট বাটনগুলো খোলা থাকাতে ভেতর থেকে স্তন বিভাজন রেখাটি দৃশ্যমান। সুডৌল স্তনের আভাষ অনেকটাই স্পষ্ট। কিছুতেই দৃষ্টি সরাতে পারছেন না কল্পনা। আরও কাছে এগিয়ে গেলেন। কল্পনার চোখ এখন জ্বলছে। বাঁ কাত হয়ে শোয়াতে রিনির ডান দিকের স্তনের খয়েরি বৃন্তের কিছুটা উদ্ভাসিত। পাকা গমের মত গায়ের রঙ রিনির। তার সঙ্গে দেহের গড়নটিও বেশ নজরকাড়া। মুখখানা মিষ্টি। তবে সবচাইতে বড় ব্যাপার হল, মেয়েটার মুখে হাসি লেগেই আছে। প্রথম দেখেই কল্পনার ভাল লেগেছিল। আর এই কদিনে তো মেয়েটা তার বন্ধুই হয়ে গেছে বলতে গেলে।

    সমীরণের আকস্মিক চলে যাওয়ার পর রূপমকে জড়িয়েই কল্পনার যাপন। স্কুলের চাকরির অবসরের সঙ্গে সঙ্গেই রূপমকে চাপ দিতে থাকেন কল্পনা, ‘এবারে কিছু ভাবনাচিন্তা কর, আমারও তো বয়স হচ্ছে।’ রূপম অব্শ্য প্রথমটায় অত গা করেনি। মা এখনও বেশ শক্ত-পোক্ত। বয়সের তুলনায় একটু বেশি রকমই। কিন্তু সেবার বুলু মাসির মেয়ের বিয়েতে গিয়ে সেই যে রিনিকে দেখল, তারপর আর রূপমের সিদ্ধান্ত নিতে একটুও দেরি হয়নি।

    কল্পনার শরীরের ভেতরে কী এক উত্তেজনার শিহরণ খেলে যাচ্ছে, বহুযুগের ওপার থেকে যেন এক অমোঘ ডাক শুনতে পাচ্ছেন। প্রতিটি কোষে কোষে তার অনুরণন। আরও ঝুঁকে পড়েছেন কল্পনা রিনির শরীরের ওপর। হঠাৎ নড়ে উঠল রিনি। তন্দ্রা ছুটে যেতেই চোখ খুলে – ‘কে!’ ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে রিনি। নিজেকে সামলে নিয়ে কল্পনা কোনমতে জড়ানো গলায় –‘তো…তোর মোবাইলটা বাজছিল’ বলতে বলতে ছুটে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।

    খাটের ওপর স্থাণু হয়ে বসে আছে রিনি। বিস্ময়াহত! এ বাড়িতে এসেছে ও বেশিদিন হয়নি। বাড়ির পরিবেশ ওর বেশ ভালই লেগেছিল। রূপমের সঙ্গে ওর মানসিকতার অনেক কিছুই মেলে। সর্বোপরি নিশ্চিন্ত হয়েছিল ও কল্পনার স্বাভাবিক ব্যবহারে। খোলামেলা মনের মানুষটি। ওকে মেয়ের মত করেই কাছে টেনেছিলেন। ওপর থেকে দেখলে মানুষটাকে একটু রুক্ষই মনে হয়, চেহারাটা বেশ লম্বা চওড়া, গড়নটা অনেকটা পুরুষালি। তার ওপর আবার গভরমেন্ট স্কুলের টিচার ছিলেন। কিছুটা রাশভারী তো বটে। রূপম ওনার একমাত্র ছেলে। সব দিক থেকেই চোরাবালির স্রোতের মত মনে মনে একটা ভয় কাজ করছিল। সাধারণত এইসব ক্ষেত্রে ছেলের ওপর মায়েদের অধিকারবোধ একটু বেশি মাত্রাতেই কাজ করে থাকে। কিন্তু এ বাড়িতে আসা ইস্তক সেরকম কোন অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়নি রিনিকে। বরঞ্চ কল্পনার উৎসাহেই অষ্টমঙ্গলাতে বাপের বাড়ি গিয়ে সেখান থেকেই হানিমুনে ভুটান ঘুরে এসেছে দুজনে। রূপম চিন্তা করছিল মায়ের এতদিন একা থাকা নিয়ে। কল্পনাই কোন অজুহাত শোনেন নি। রিনিদের বাড়িটা দমদম এয়ারপোর্টের কাছে, তাই ওখান থেকে ফ্লাইট ধরার সুবিধে, এই কথাটাই বুঝিয়েছিলেন ছেলেকে। তবে! ওই দৃষ্টি যে ভোলার নয়!

    রাতে দুচোখের পাতা এক করতে পারছিলেন না কল্পনা কিছুতেই। কেন এমন হল এতদিন পর! এত দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে! জীবনের সেই অধ্যায়টা তো ফেলে এসেছেন বহু বছর আগে। ভুলে যেতে চেয়েছিলেন পুরোপুরি। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে জন্ম থেকে রক্তের মধ্যে যে বীজ বোনা হয়ে যায়, তাকে উপড়ে ফেলা হয়ত অত সহজ নয়। নাহলে, আজ এতদিন বাদেও শরীর এভাবে জেগে ওঠে! কলেজ জীবনে লেডিস হস্টেলে থেকে পড়াশুনো করতে হয়েছিল কল্পনাকে। বর্ধমানের যে গ্রামে বাড়ি ছিল তাদের, সেখানে সেই সময় কোন কলেজ ছিল না। উচ্চ মাধ্যমিকে রেজাল্ট ভাল হওয়াতে কলকাতার নামী কলেজেই ভর্তি হওয়ার সুযোগ মিলে গেল। হস্টেলে সিট পাওয়াতে বাড়ির সবার চিন্তা অনেকটা কমলো। একটা ছোট সুটকেসে কিছু জামাকাপড় আর দুয়েকটা প্রয়োজনীয় জিনিষ গুছিয়ে নিয়ে বাবার সঙ্গে যেদিন কলকাতার হস্টেলে প্রথম পা রাখলেন পাকাপাকিভাবে থাকার জন্য, ভেতরে ভেতরে একটা চাপা উত্তেজনা অনুভব করেছিলেন কল্পনা। প্রথম প্রথম সব কিছুতেই বিস্ময়! কলেজের সামনেই হেদুয়া। ট্রাম চলছে রাস্তায়। দু পা হাঁটলেই ট্রামে উঠে চলে যাওয়া যায় কলেজ স্ট্রীট। কত কত বইয়ের দোকান! বন্ধুদের সঙ্গে ছুটির দিনে বেরিয়ে চোখ বড় বড় করে দেখতে দেখতে যেন রূপকথার রাজ্যে চলে যান অষ্টাদশী কল্পনা। সবকিছুই নতুন লাগে, রঙিন লাগে গ্রামের মেয়েটির চোখে। প্রথমে তিন জন মেয়ে এক ঘরে থাকতেন। তার মধ্যে একজন সিনিয়র দিদি, আর অন্য মেয়েটি ওনারই ইয়ারের, তবে আলাদা স্ট্রিমের। শুভ্রাদি দেখতে দারুণ ছিলেন। ফর্সা সুন্দরী, একমাথা ঘন কালো চুল। ওনার সহপাঠিনীটি অবশ্য বেশিদিন থাকেনি। তার বাবার ছিল বদলির চাকরি। কেন্দ্রীয় সরকারের। তাই তাকে কলেজ থেকে টি.সি. নিয়ে চলে যেতে হয় অন্য রাজ্যে। সিটটা ফাঁকাই থেকে যায়। অন্য কেউ আসে না। আর সেই সূত্রেই কল্পনার জীবনে শুরু হয় এক ইতিপূর্বে অনাস্বাদিত পর্ব, যা কোনদিনও কারোর সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন নি, আজও শুধু নিজের কাছেই সংরক্ষিত, মনের কোণে, গভীরে গোপনে।

    কয়েক লহমার জন্য হলেও, মামনির চোখের ওই ভাষা কেমন বিজাতীয় ঠেকেছিল রিনির কাছে। অদ্ভুত! যতই মন থেকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে, কিছুতেই পুরোপুরি যাচ্ছে না। একটা অস্বস্তির কাঁটা সারাক্ষণ খচ খচ করছে মনের ভেতর। কি যেন একটা ছিল সেই দৃষ্টিতে, ভাবতে গেলে শিউরে ওঠে রিনি। কিন্তু কেন? রহস্যটা ওর ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কারো সঙ্গে এটা নিয়ে আলোচনাও করা যায় না। কার সঙ্গেই বা বলবে? বাপের বাড়িতে একমাত্র মা, তা এইসব কিছু বলতে গেলে উলটে ধমক খাবে। বন্ধুদের সঙ্গে? নাঃ, কে কি ভাববে! আর রূপমের তো প্রশ্নই ওঠে না। ওই দিনের পর থেকে ও আর কিছুতেই সহজ হতে পারছে না মামনির সামনে। অথচ রূপম অফিস বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে এই বাড়িটাতে তো মামনি আর ও। একসঙ্গে জলখাবার খাওয়া, দুপুরে ভাত নিয়ে বসে রূপমের ছোটোবেলার কতরকম দুষ্টুমির গল্প, রূপমের বাবা, মানে প্রয়াত শ্বশুরমশাইএর বাজারের গল্প, এইসব কল্পনার মুখে শুনতে দিব্যি লাগত। বেশ ভালই কাটছিল দিনগুলো। কল্পনা অবশ্য আগের মতই স্বাভাবিক। কিন্তু রিনি কিছুতেই সেই ছন্দটা ফিরে পাচ্ছে না।

    সেটা ছিল একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের রাত। সন্ধ্যে থেকেই প্রচুর বজ্রপাত আর সঙ্গে তুমুল বর্ষণ। হস্টেলে রাতের খাওয়া তাড়াতাড়ি মিটিয়ে যে যার ঘরে ঢুকে গিয়েছিল। কল্পনা বিছানায় শুয়ে একটা গল্পের বই টেনে নিতে যেতেই, ‘এই এই, আলো নেভা, বড্ড ঘুম পাচ্ছে’ বলে চেঁচিয়ে উঠল শুভ্রাদি। কল্পনার যদিও ওই ঝড় জলের রাতে, বেশ জমিয়ে একটা রহস্য গল্প পড়ার ইচ্ছে ছিল, (আগের দিনই লাইব্রেরি থেকে নিয়েছে বইটা) যাহোক, সিনিয়র দিদি বলে কথা! আলো নিভিয়ে দিয়ে গায়ের চাদরটা টেনে নিয়েছিল কল্পনা। অনেক রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়, বুকের ওপর একটা চাপ অনুভব ক’রে। অন্ধকারে প্রথমটায় ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, কী হচ্ছে! তারপর মুখের ওপর গরম নিঃশ্বাস পড়তেই ভয়ে চেঁচিয়ে উঠতে যায় – ‘কে!’ আর ঠিক সেই সময়েই ওর কানের কাছে ফিসফিস করেকেউ বলে, ‘চুপ! আমি রে, আমি!’ ততক্ষণে অন্ধকারটা চোখ সওয়া হয়ে গেছে। যে মানুষটা ওর গায়ের সঙ্গে লেপটে আছে, সে যে শুভ্রাদি, সেটা বুঝতে দেরি হয় না। কিন্তু এটা কি করছে! ওর চাদরের ভেতরে শুভ্রাদি, গায়ে একটাও সুতো নেই! ওর হাতটা টেনে নিয়ে নিজের স্তনদ্বয়কে নিষ্পেষিত করাচ্ছে। ওকে চুমু দিতে দিতে লালায় লালায় ভরিয়ে দিচ্ছে ওর মুখ, বুক, সারা শরীর। ক্রমে জেগে উঠতে থাকে কল্পনার শরীর।

    সেই শুরু! এর পর থেকে প্রতি রাতেই …। সেই সময় দুজনে দুজনকে চোখে হারাতো। কলেজে সম্পূর্ণ আলাদা ইয়ার, আলাদা স্ট্রিম। তবু ক্লাসের ফাঁকে দু জনেই দুজনকে খুঁজে বেড়াতো। ক্যান্টিনে দেখা যেত দুজনকে, একে অপরের দিকে নিবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে আছে। কখনও বা গলা জড়াজড়ি করে হেঁটে যেতে দেখা যেত কলেজ গ্রাউন্ডে। সারা কলেজে এই নিয়ে ওদের দুজনের উদ্দেশ্যে টিটকিরি মারা, হাসাহাসি করা, এইসব চলতোই। কিন্তু ওরা একে অপরে এতটাই মগ্ন ছিল যে সেসব কিছু ওদের স্পর্শই করতো না। কলেজের ছুটি পড়লেই হতো সবচেয়ে মুশকিল। শুভ্রার বাড়ি ছিল বালুরঘাটে। আর কল্পনার তো বর্ধমানের ইন্টিরিওরে। সুতরাং দেখা হওয়ার কোনরকম সুযোগই ছিল না। বিচ্ছেদের আগের রাতে দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে কী কান্নাটাই না কাঁদত! আজও জ্বলজ্বল করে স্মৃতিতে! শুভ্রা তখন ফাইনাল ইয়ারে। শুভ্রার বাড়ি থেকে সম্বন্ধ দেখা শুরু হয়েছে। এদিকে ফাইনাল পরীক্ষার আর বেশি দেরি নেই। পরীক্ষা শেষ হলেই তো শুভ্রাকে হস্টেল ছেড়ে চলে যেতে হবে চিরদিনের মত। সেই দিনটার কথা ভেবে দুজনেই উদ্বিগ্ন। কি হবে এরপরে! কিভাবে থাকবে একে অপরকে ছাড়া!

    আজকাল রূপম অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পরে রিনির খুব একা লাগে। বাড়িটাতে শুধু ও আর কল্পনা, প্রায় সারাদিন। মনি মাসি সকালে এসে রান্নায় সাহায্য করে। ঠিকে মেয়েটাও মোটামুটি বেলা এগারোটার মধ্যে কাজ সেরে বেরিয়ে যায়। গ্রীষ্মের দুপুরগুলো এমনিতেই খুব দীর্ঘ। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কোনাকুনি তাকালে দূরের খেলার মাঠের এক চিলতে সবুজ চোখে পড়ে। যদিও গ্রীষ্মের দাবদাহে সবুজ এখন গেরুয়া রং ধরেছে। চোখ-ঝলসানো রোদ্দুরের তাপে বেশিক্ষণ একভাবে তাকিয়ে থাকলে কেমন ঝিমঝিম করে মাথাটা, দৃষ্টিবিভ্রম হয়। এখন যেমন মনে হচ্ছে মাঠ নয়, ওটা কোন জলাশয়। গল্পের বইতেও ইদানিং মন দিতে পারছে না রিনি। কোথায় যেন একটা খটকা লাগছে, বেসুরো বাজছে জীবনের কোন তারে। আনমনা হয়ে পরেছিল রিনি, তাই প্রথমটায় শুনতে পায় নি। মোবাইলের রিং টোন কানে যেতেই তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে এল।

    ‘কি রে, ঘুমোচ্ছিলি নাকি?’

    ‘কেয়া!’ রিনির গলা উচ্ছাস আর বিস্ময়ে মাখামাখি।

    ‘কেন বস, অন্য কাউকে এক্সপেক্ট করছিলি? অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক। তবে এখন তোর বরের অফিসে পিক আওয়ারস, তাই না?’

    ‘বাজে বকিস না তো! তোর যে হঠাৎ আমার কথা মনে পড়ল, তাতেই তো আমি...’

    ‘কি, ধন্য হয়ে গেলি তো, জানতাম!’

    ‘মার খাবি। তবে ভীষণ আনন্দ হচ্ছে রে! একা একা থাকি তো, খুব মনে হচ্ছিল বন্ধুদের কথা!’

    ‘হুঁ। আজ বিকেলে কোন অ্যাপোট্যাপো নেই তো, বরের সঙ্গে?’

    ‘না রে, কোনো চান্স-ই নেই। ইয়ার এন্ডিং চলছে না!’

    ‘গুড! তাহলে চলে আয়।’

    ‘কোথায়?’

    ‘সেই আমাদের বিখ্যাত আড্ডার জায়গায়।’

    ‘সত্যি! তোর সময় হবে তো?’

    ‘আরে হবে বলেই তো ডাকছি গুরু!’

    এই হল কেয়া! এভাবেই কথা বলে ও, আর মুহূর্তে মানুষের মন ভালো করে দেয়।

    রিনির মনটা নেচে উঠল সঙ্গে সঙ্গে।

    ‘ঠিক আছে, কটার সময় বল?’

    ‘এই ছটা নাগাদ--‘

    ‘ওকে।’

    ‘ওকে, ডান।’

    বিকেলে কল্পনা গা ধুয়ে বেরোতেই রিনির মুখোমুখি। রিনি ততক্ষণে সেজেগুজে রেডি।’মামনি, আমি একটু বেরচ্ছি।’

    ‘কোথায় যাচ্ছিস রে?’ কল্পনার কণ্ঠে কৌতূহল।

    ‘এই শপিং মল এ। বন্ধুরা আসবে।’

    ‘ঠিক আছে, সাবধানে যাস। আর শোন, সঙ্গে টাকা পয়সা আছে তো?’

    ‘হ্যাঁ হ্যাঁ।’

    ‘দাঁড়া, আমার থেকে আরও কিছু নিয়ে রাখ, কখন কি দরকার লাগে!’

    ‘না না, টাকা আছে, আর লাগবে না।’ কাতরোক্তি রিনির। কিন্তু কল্পনা তাতে কান দেন না।

    ‘কি কপাল করেছিস মাইরি, সাসু মা শপিং মলে আসার জন্য টাকা গুঁজে দিচ্ছে! আর আমরা সালা, চাকরি করি বলে কেউ একটা টাকাও ঠেকায় না কোনদিন!’

    ‘তা তুইও একটা বিয়ে করে ফেল। তারপর দেখবি...’

    ‘হ্যাঁ, তাহলেই হয়েছে! এবার তোর কথা বল। গায়ে গতরে তো বেশ লেগেছে মনে হচ্ছে! বরের আদরে আর বেশি গোল গাপ্পা হোয়ো না সোনা! এরপর ফেটে যাবে!’

    ‘তুই থামবি!’ কৃত্রিম ধমক লাগায় রিনি কেয়াকে। ‘কি খাবি বল, অর্ডারটা দিয়ে দিই।’

    খেতে খেতে দুই বন্ধুতে মশগুল হয়ে যায় আড্ডায়। কত পুরনো স্মৃতি, কত মজার ঘটনা সব! একসময় চুপ করে যায় রিনি। কেয়া সেটা লক্ষ্য করে। ‘কি রে, এনি প্রবলেম?’ প্রথমে রিনি মুখ খোলে না। তারপর কেয়ার পীড়াপীড়িতে আস্তে আস্তে পুরো ঘটনাটাই খুলে বলে। কেয়া বেশ মনোযোগ দিয়ে শোনে কথাগুলো। তারপর একটু চিন্তা করে বলে, ‘তুই ঠিক দেখেছিলি তো? ঘুম চোখে ভুলভাল কিছু ...’

    ‘না রে, আমার কোন ভুল হয় নি। ওই দৃষ্টি আমি ভুলতে পারছি না কিছুতেই। আবার কাউকে কিছু বলতেও পারছি না। কি যে অস্বস্তি হচ্ছে ভেতরে ভেতরে, কি বলব!’

    ‘দেখ, তোর কথা যদি ঠিক হয়, তাহলে তো অন্য ভাবে ভাবতে হচ্ছে ব্যাপারটা।’

    ‘মানে?’

    ‘মানে আর কি, ওই হোমো কেস!’

    ‘কি বলছিস!’ আঁতকে ওঠে রিনি। এই ভয়টাই যে ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে!

    ‘কিন্তু তাহলে?’

    ‘কি তাহলে?’

    ‘না মানে ... ও...’

    ‘ও, ভাবছিস তোর বরটা এল কি ভাবে? আরে বাবা, বাইসেক্সুয়ালিটির কথা শুনিস নি কখনও?’

    ‘হ্যাঁ, শুনেছি। তবুও ...’

    ‘বাস্তবে কখনও দেখিস নি, তাই মনে হচ্ছে কি করে সম্ভব, তাই তো? দেখ, এগুলো তো সবই হরমোনের খেল, ভেবে কোন কূলকিনারা পাবি না। সবই ওপরওয়ালার ব্যাপার, বুঝলি? তবে আমার মনে হয় ওটা তোর মনের ভুল ছিল, এই বয়সে কেউ ওরকম কিছু...নাঃ, নট ফিজিবেল!’

    ‘তুই বলছিস?’

    ‘হ্যাঁ রে, বি নর্মাল, দেখবি সব ঠিক আছে।’

    ‘আসলে আমি না ভীষণ একটা ...।’

    ‘বুঝেছি, বুঝেছি। রিল্যাক্স।’ তারপর বন্ধুর দিকে চোখ টিপে--‘আর যদি সেরকম কিছু হয়ই, তাহলে ক্ষতি কি, রাতে বরের আদর, দিনে সাসু মায়ের...’ বলতে বলতে নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে হাসতে থাকে কেয়া। আর মুঠি পাকিয়ে ওর দিকে তেড়ে যায় রিনি।

    শুভ্রাদির বিয়ের খবরটা কানে এসেছিল। এর পর চিঠিপত্রে কিছুদিন যোগাযোগ ছিল। ততদিনে কল্পনা কলকাতায় স্থায়ী বাসিন্দা। ইউনিভারসিটিতে এম এ পড়ছেন। একবার মনে হল শুভ্রাদির সঙ্গে দেখা করবেন। চিঠিতে ঠিকানা তো ছিলই, একদিন হঠাৎ গিয়ে উপস্থিত হলেন শুভ্রাদির শ্বশুরবাড়ি মালদায়। কাতর হয়ে ছুটে গেছিলেন, কিন্তু সেভাবে আর পেলেন না শুভ্রাদিকে। পাঁচজনের সংসারে সারাদিন ধরে খাটাখাটুনিতে শুভ্রাদির চেহারার সেই জৌলুস উধাও। দু দন্ড বসে কথা বলারই ফুরসত নেই! শুভ্রাদির এক ননদের গায়ের ঘেমো গন্ধের সঙ্গে সমঝোতা করে কোনমতে রাতটা কাটিয়ে ফিরে এসেছিলেন কল্পনা। আর কোনদিনও ওমুখো হননি। বুকের ভেতরটা এখনও কোথাও যেন খালি খালি লাগে।

    প্রথম বিবাহবার্ষিকীটা বেশ ভালই কাটল রিনির। গোয়ার বিচগুলোয় নানারকম ওয়াটার স্পোর্টস-এর ব্যবস্থা আছে। ঘোরের মধ্যে কেটে গেল সাত সাতটা দিন। রূপম এত প্রাণবন্ত, ওর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া বেশ মুশকিল। গভীর রাতে বিছানা থেকে টেনে তুলে দেখাবে আকাশে গোল থালার মত পূর্ণিমার চাঁদ আর সমুদ্রের জলে তার প্রতিবিম্ব। প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করতে চায় ও রিনিকে পাশে নিয়ে। চেটেপুটে নিতে চায় জীবনকে। ওর পাগলামোর সঙ্গে রিনিও নিজেকে মিলিয়ে দেয়। সত্যি, রূপমের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে মজাও আছে। কলকাতায় ফিরেই আরও একটা ভাল খবর। স্কুলের চাকরিটা হয়ে গেছে রিনির। গতমাসেই ইন্টারভিউ দিয়েছিল বাইপাসের ওপরে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলটাতে। ওরাই অ্যাপয়ন্টমেন্ট লেটার পাঠিয়েছে। টাইমিংটাও ভাল। সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটে। যাক বাবা, আর দুপুরগুলোতে বাড়িতে শুয়ে বসে বোর হতে হবে না রিনিকে। খুব খুশি রিনি। কল্পনাও খুব উৎসাহ জুগিয়েছেন রিনির চাকরির ব্যাপারে। রাতে রূপমের আদরে ডুবে যেতে যেতে রিনির ভেতরটায় একটা অদ্ভুত আবেশ ছড়িয়ে পড়ছিল।

    প্রথম মাসের মাইনে পেয়েই কল্পনার জন্য একটা দারুণ তাঁতের শাড়ি কিনল রিনি। আর রূপমের জন্য একটা ব্র্যান্ডেড টি সার্ট। কল্পনাকে প্রণাম করতেই উনি বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন। শাড়ি দেখে একচোট বকাবকি করলেন খামোখা পয়সা নষ্ট করার জন্য। তবে ভেতরে ভেতরে যে খুশি হয়েছেন সেটা ওঁর অভিব্যক্তিতেই প্রকাশ পেল। রিনি ওর নিজের মায়ের জন্য কেন কেনেনি, সেটা নিয়েও অভিযোগ জানালেন। যে আসে তাকেই দেখান বউমার দেওয়া শাড়ি। বলার সময় বেশ গর্ব অনুভব করেন, বুঝতে পারে রিনি। আজকাল রিনির মনে হয় মানুষটা কত স্ট্রাগেল করেছেন। হাসব্যান্ড মারা গেছেন যখন রূপমের বয়স দশ। নিজে চাকরি করেছেন, ছেলেকে প্রপার এডুকেশন দিয়ে বড় করেছেন। সত্যি! একা একা সব তো সামলাতে হয়েছে! কল্পনার কাছে শুনেছে ওনার বাপের বাড়ি কিংবা শ্বশুরবাড়ি, কোনদিক থেকেই তেমন কোন সাহায্য পান নি সেই দিনগুলোতে। যুদ্ধটা ওনাকে একাই লড়তে হয়েছে।

    স্কুল থেকে ফেরার পথে ফোনটা এল। বাসের জানালার ধারে একটা সিট পেয়ে গিয়েছিল রিনি। বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটু তন্দ্রামতন এসে গিয়েছিল। আজ স্কুলের একজন ক্লেরিকাল স্টাফের অকাল মৃত্যুর খবরে স্কুল হাফ ডে হয়েছে। চমক ভাঙল রিং টোনে। ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করে দেখল কেয়া। খুশি মনে রেস্পন্ড করল রিনি।

    ‘হ্যালো!’

    ‘হুম, কি খবর ম্যাডাম! চাকরি পেয়ে কি ভুলে গেলে নাকি বন্ধুকে?’

    ‘ভুলব কেন? তুই তো যোগাযোগ রাখিস না।’

    ‘কেন? যোগাযোগ রাখার দায়টা কি শুধু আমার নাকি, বস?’

    ‘আচ্ছা ঠিক আছে, ঝগড়া করতে হবে না। দায়টা না হয় আমারই হল। নে, বল—'

    ‘বলবি তো তুই! নতুন চাকরি, কেমন লাগছে, কি রকম অভিজ্ঞতা হচ্ছে, আচ্ছা, তুই কি রাস্তায়? তোর এখন ক্লাস নেই?’

    ‘না রে, একজন মারা গেছেন, তাই আজ হাফ ডে হয়ে স্কুল ছুটি হয়ে গেছে।’

    ‘এই জন্যই স্কুলের চাকরি! কোথায় কে কাশল, কে হাঁচি দিল, ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে স্কুল ছুটি!’

    ‘মার খাবি কিন্তু!’

    ‘তা একদিন চলে আয়, আমাদের সেই আড্ডায়। সামনাসামনি হয়ে যাক মারপিট।’

    ‘ঠিক আছে, তাই হবে!’ উৎসাহের সঙ্গে উত্তর দেয় রিনি।

    ‘তা তোর ওদিককার খবর কি?’

    ‘কোন দিক?’

    ‘আরে তোর সেই সমস্যাটা, সাসু মাকে নিয়ে।’

    ‘ওঃ, নারে কেয়া, মনে হয় তুইই ঠিক বলেছিলি। আমারই ঘুম চোখে …কি দেখতে কি দেখেছি…’

    ‘আমি তো তোকে প্রথমেই বলেছিলাম, তুই আর একটু ভাল করে ভাব, কেসটা স্টাডি কর।’

    ‘হ্যাঁ রে, ধীরে ধীরে সম্পর্কটা অনেক স্বাভাবিক হয়ে গেছে, মনের জটগুলো ছেড়ে গেছে।’

    ‘গুড! এবারে একটা নতুন কিছু ভেবে ফেল। নবাগত এলেই দেখবি, সিনারিও কিভাবে বদলাচ্ছে। সম্পর্কগুলো তখন গলে গিয়ে একেবারে মাখন!’

    ‘ফাজলামো করিস না। তোর কি অফিসে কাজটাজ নেই নাকি!’

    ‘আরে, এখন তো টি ব্রেকে বেরিয়েছি। তা তুই এখন বাড়ি গিয়ে কি করবি? তার থেকে মলএ চলে আয়, আমিও একটু পর কেটে পড়ব। আজ বস নেই, তেমন কোন কাজও নেই …’

    ‘না রে, আজ হবে না। আজ আমাদের বাড়িতে একজন গেস্ট আছেন।’

    ‘কে সে?’

    ‘মামনির কলেজ জীবনের বন্ধু। হস্টেলে একসঙ্গে থাকতেন। অনেক খোঁজ করে মামনির ঠিকানা জেনেছেন। প্রায় চল্লিশ বছর পর দেখা হয়েছে তো, বুঝতেই পারছিস, একদম জমে গেছে!’

    ‘ওঃ, কি জ্বালা! এই সময়েই আসতে হল?’

    ‘তা উনি আর কি করে জানবেন বল যে আমার পাগলী বন্ধুটার আজকেই সময় হবে?’

    ‘যা, আর কি বলব, বাড়ি গিয়ে সাসু মা আর তার বন্ধুকে সেবা কর।’ কৃত্রিম রাগ দেখায় কেয়া।

    এবারে হেসে ফেলে রিনি। ‘ঠিক আছে,রাগ করিস না, আর একদিন হবে, কেমন?’

    ‘ওকে বস।’ কেয়াটা সত্যিই একটা পাগলী, মনে মনে হাসে রিনি।

    এ. সি. বাস থেকে স্টপেজে নামতেই বেশ গরম লাগতে শুরু করেছে। আসলে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ হয়েছে, তাই এই অসময়ের গরম ভাব। বিরক্ত লাগে রিনির। এমনিতেই কলকাতাতে শীতটা প্রায় বোঝাই যায় না, এত স্বল্পমেয়াদি, তার মধ্যে আজকাল আবার সেই সীমিত সময়টুকুতে মাঝেমধ্যেই থাবা বসাচ্ছে নিম্নচাপ। কোন মানে হয়! ঠান্ডার আমেজটা উপভোগই করা যায় না। ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল রিনি আজ মামনি আর শুভ্রা মাসিকে যা একখানা সারপ্রাইস দেবে না! আসলে ওরা দুজন কাল রাতে খেতে খেতে গল্প করছিলেন ওদের কলেজ জীবনের কথা। তো তার মধ্যে আলুকাবলির প্রসঙ্গ উঠতেই দুজনে রীতিমত উত্তেজিত! ওদের কলেজের সামনেই ফুটপাথের ওপর একটা বিহারি লোক কেমন টেস্টি আলুকাবলি বিক্রি করত। খাওয়া শেষ হলে শালপাতাটাও কেমন চেটে চেটে সাদা করে ফেলত সবাই, সেই নিয়ে হাসাহাসি। সত্যি, পুরনো স্মৃতিরোমন্থন যে কি সুখের! ওদের মুখচোখের চেহারাই বদলে গিয়েছিল, লক্ষ্য করছিলো রিনি। আর ঠিক তখনই ওর মনে হল ওর স্কুলের বাইরেও একজন বোধহয় আলুকাবলি বিক্রি করে, ওর চোখে পড়ে গেছিল একদিন ছুটির পর ছেলেমেয়েদের ভিড়ে। মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিল, স্কুল থেকে ফেরার সময় কিনে ওর টিফিন বক্সে ভরে নিয়ে আসবে দুই বান্ধবীর জন্য। কেননা কাল ওরা বলাবলি করছিলেন আজকাল আর ও জিনিষ দেখতে পাওয়া যায় না। ওরা ভাবতেও পারবেন না, রিনির ঝুলি থেকে আজ কী বেরোবে! খুব মজা লাগছে রিনির।

    সারপ্রাইস দেবে বলেই বেল বাজালো না রিনি। এমনিতেই তো এই সময় ওর ফেরার কথা নয়। ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজাটা আস্তে করে খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল ও। সিঁড়ির নিচে জুতো খুলে চুপিসারে পা টিপে টিপে ওপরে উঠতে লাগল। এখন প্রায় দুপুর তিনটে। মামনির ঘরেই নিশ্চয়ই বিশ্রাম নিচ্ছেন দুজনে। ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো রিনি। কোন শব্দ নেই! তাহলে বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছেন ওরা। ডিস্টার্ব করাটা কি ঠিক হবে? কাঁধের ব্যাগটা বাইরে রেখে দ্বিধান্বিত পায়ে ভারী পর্দাটা সরিয়ে উঁকি মারতেই যে দৃশ্যটা চোখে পড়ল তাতে শিউরে উঠল রিনি। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। গলা থেকে একটা অস্ফুট আওয়াজ বেরিয়ে এল আর মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করতে লাগলো। এ কি! এটা কি দেখছে ও! এ কি সত্যি না স্বপ্ন! দুটি সম্পূর্ণ নিরাভরণ নারী দেহ, একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছে আষ্টেপৃষ্ঠে, গভীর আশ্লেষে!



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)