• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৪ | এপ্রিল ২০২৪ | গল্প
    Share
  • অকস্মাৎ : গান্ধর্বিকা ভট্টাচার্য

    “বাবার কী হয়েছিল, মা?”

    অর্ণা কফির কাপে চামচ ঘোরাতে ঘোরাতে মায়ের দিকে তাকাল। মায়ের মুখ গম্ভীর। ছোটবেলা থেকে এই মুখটাকে অর্ণা যমের মতো ভয় পেয়ে এসেছে। আজও দু'জনের মধ্যিখানে খবরের কাগজের নিরাপদ দূরত্ব না থাকলে হয়তো কথাটা সে জিজ্ঞেস করে উঠতে পারত না।

    অর্ণার প্রশ্নে অদিতি বিরক্তভাবে নিজের কাপটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলেন।

    “ছিলি তো হসপিটালে। সব তো শুনলি। দেন?”

    “আমি বিকিসের কথা বলছি না।”

    কথাগুলো অর্ণার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে পালকের চেয়েও হাল্কা স্বরে বেরিয়ে এল।

    অদিতি একবার যেন চমকে উঠলেন। নাকি সেটা অর্ণার কল্পনা? কারণ পরক্ষণেই ইস্পাতের মতো দৃঢ় দুটো হাত কফির কাপটা আবার তুলে নিল।

    “আই সী।”

    অর্ণা দু'হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে চোখ টিপে ধরল। কাল রাত থেকে ঘুম হয়নি। মাথা ভার হয়ে আছে। সত্যি বলতে, বিকিস হসপিটালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বাড়িতে কারুর চোখে ঘুম ছিল না। আজ অবশ্য সকাল সকাল উঠে বিকিসকে দেখতে যাওয়ার তাড়া নেই। মৃত্যু সব উৎকণ্ঠার অবসান করে দিয়েছে। আর সেই সঙ্গে এনে দিয়েছে গড়ের মাঠের মতো শূন্য অবসর।

    “অসীম আবার কবে থেকে বিকিস হয়ে গেল?”

    মা অনেক বছর আগে একদিন জিজ্ঞেস করেছিল। তখন মায়ের চুল কোমর অবধি লম্বা ছিল। অফিস যাওয়ার আগে খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে আয়নায় পড়া অর্ণার ছায়াকে মা জিজ্ঞেস করেছিল।

    কেন জিজ্ঞেস করেছিল? মা কি ওইদিন অর্ণার সঙ্গে ছিল না?

    রাস্তার দু'ধারে লাল লাল বাড়ি। রহস্যময়। দরজায় সবুজ রং করা গ্রীল। তার ভেতরে গাঢ় অন্ধকার। ছোট্ট অর্ণা বুঝতে পারছে না কোনদিক দিয়ে যাবে। দোতলার বারান্দা থেকে কারা উঁকি মারছে, কী সব ফিসফিস করছে। সেই দেখতে দেখতে অর্ণা গিয়ে পড়ল একদম সেই লোকটার সামনে। নোংরা শার্ট আর লুঙ্গি পরা একটা লোক, চোখ দুটো টকটকে লাল, পিঠের বিশাল বোঁচকায় যে কতগুলো বাচ্চা ভরে নিয়ে যাচ্ছে তার কোন সীমাসংখ্যা নেই। অর্ণাকে দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর ঠান্ডা চোখে অর্ণার দিকে তাকিয়ে রইল। ভয়ে অর্ণার বুকের ভেতর অবধি শুকিয়ে গেছিল।

    এমন সময়ে একটা লোক – প্রায় আকাশের সমান উঁচু একটা লোক এসে ছেলেধরাটাকে আড়াল করে অর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। অর্ণাও কোন চিন্তাভাবনা না করেই লোকটার পা জড়িয়ে ধরল। উফ, কী নিশ্চিন্ত সে, কী শান্তি তার মনে! মিল্ক বিকিস বিস্কুটের মতো স্ট্রং ওই লোকটা থাকতে অর্ণাকে কেউ চুরি করে নিয়ে যেতে পারবে না!

    অর্ণার তখন বয়স কত ছিল? বিকিসের সঙ্গেই কি ও বেরিয়েছিল? তাই হবে, নাহলে বিকিস হঠাৎ কোথা থেকে এল?

    মাকে গল্পটা বলার পর অর্ণা বলেছিল,

    “ও খুব স্ট্রং। আমি ওকে মিল্ক বিকিস বলে ডাকব।”

    “তোকে কে শেখাল, মিল্ক বিকিস খেলে স্ট্রং হওয়া যায়?”

    অর্ণার সে কথা মনে নেই। কেউ একজন ছিল, অর্ণার সঙ্গে খেলা করত, খাওয়াত...তারপর একদিন হাওয়ার মতো মিলিয়ে গেল। নাঃ, এখন আর তাকে মনে নেই। যাই হোক, সেই থেকে, 'মিল্ক বিকিস' নামকরণের সূত্রপাত হল। তারপর একদিন মিল্ক উড়ে গিয়ে শুধুই বিকিস পড়ে রইল।

    অর্ণার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। এখন আর বিপদ হলে বিকিস এসে অর্ণাকে আড়াল করে দাঁড়াবে না। মা ভুল করে নি। চিরকাল বাবা বলতে অর্ণা বিকিসকেই জেনে এসেছে।

    কিন্তু আজ ওর মাথায় অন্য চিন্তা ঘুরছে।

    “আমার বাবার কথা বলছি। বাবা কী করে মারা গেল?”

    অদিতির ঠোঁটের রেখাটা সরু হয়ে গেল। জানলা দিয়ে আসা তেরচা রোদে তাঁর রং করা চুলগুলো আরো লাল হয়ে উঠেছে। অর্ণা জানে, অদিতি ওর বাবার ব্যাপারে কথা বলতে চান না। প্রসঙ্গ উঠলেই কথা ঘুরিয়ে দেন, চোখ ঘুরিয়ে নেন। কিন্তু অর্ণার আজ ব্যাকুল লাগছে। সত্যিটা যারা জানত – ঠাকুমা, বিকিস – কেউই আর নেই। বাকি রয়েছে একমাত্র মা। মা যদি অর্ণার প্রশ্নের উত্তর না দেয় তাহলে সত্যিটা সে কোনদিন জানতে পারবে না। অজানা কথা বন্ধ দরজার মতো – দমটা যেন বন্ধ করে দেয়। সত্যি যতই কঠিন হোক অর্ণা সেটা মেনে নেবে, কিন্তু না-জানার মতো অসহ্য কিছু নেই।

    “মা?”

    অদিতি কফিতে চুমুক দিতে গিয়েও দিলেন না। কাপটা আবার নামিয়ে রাখলেন। তারপর গলাটা ঝেড়ে নিলেন।

    “তোমার বাবার কথা তো তোমার থেকে লুকনো হয়নি। হাইপারটেনশনের পেশেন্ট ছিল, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। ফেটাল হেড ইঞ্জুরি।”

    অর্ণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই গল্পটা তার থেকে লুকনো হয়নি বটে। ডেথ সার্টিফিকেটও দেখানো হয়েছে। কিন্তু তার সন্দেহ, গল্পের আড়ালে আরো কিছু আছে। অসাবধান মুহূর্তে আত্মীয়স্বজনদের মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়া কথা অর্ণার কানে অনেকবার এসেছে। সবাই ঈঙ্গিত করে – ওর বাবার মৃত্যুকে ঘিরে কিছু একটা রহস্য আছে।

    “ঠাকুমা বলেছিল, খোকারে ওরা না, বাঁচতি দিল না।”

    এবার আর অর্ণার কল্পনা নয়। সত্যিই মা শক খাওয়ার মতো করে কেঁপে উঠল।

    “তোর ঠাকুমা বলেছিল? কবে?”

    “মারা যাওয়ার আগে, যখন ঘোরের মধ্যে ছিল।”

    মায়ের ঠোঁটের রেখা আরো সরু হয়ে গেল।

    “ও নিয়ে ভাবার কিছু নেই। ঘোরের মধ্যে মানুষ এমন অনেক কথাই বলে যার কোন মানে নেই।”

    অর্ণা একটু ইতস্তত করে মাথা নাড়ল। মনের মধ্যে প্রশ্নের দল ভিড় করেই চলেছে। মা নাকি বিকিসকে কলেজ থেকে চিনত। যাকে বলে বেস্ট ফ্রেন্ডস। বাবার সঙ্গে বিয়ের পরেও সেই বন্ধুত্ব অটুট ছিল। কিন্তু সেটা কি নিছকই বন্ধুত্ব ছিল নাকি আরো কিছু? বাবা মারা যাওয়ার দেড় বছরের মধ্যেই মা বিকিসকে বিয়ে করে নিল কেন? আজ অর্ণা নিজে ম্যারেড, চার বছরের একটা ছেলে আছে। নীলের যদি কিছু হয়ে যায় সে দেড় বছরের মাথায় অন্য কারুর সঙ্গে সংসার পাততে পারবে?

    “তুমি বিকিসকে বিয়ে করার ডিসিশানটা কীভাবে নিলে? তোমরা তো বন্ধু ছিলে,” অর্ণা ঘুরিয়ে প্রশ্ন করার চেষ্টা করল। বিকিস চলে যাওয়ার পরের দিনই মাকে চার্জ করাটা হয়তো ঠিক হচ্ছে না, কিন্তু একবার মা নিজেকে সামলে নিলে এভাবে খোলাখুলি বসে কথা বলার সুযোগও হয়তো পাওয়া যাবে না। “তুমি কীভাবে ঠিক করলে বিকিসের সঙ্গেই সারা জীবন থাকতে চাও?”

    অদিতি অন্যমনস্কভাবে ডান হাতে পরা আংটিটায় হাত বোলালেন। আংটিটা বিকিস মাকে বিয়ের সময়ে দিয়েছিল। পান্না বসানো আংটি – মায়ের ফেভারিট। এত বছরে মা মোটা হয়ে গেছে, কিন্তু সারা জীবন আংটিটা পরে থাকার দরুন আঙুলের গাঁটটা সরু রয়ে গেছে।

    “তোমরা এখন বুঝবে কি না জানি না, কিন্তু তখন আমরা মনে করতাম একজন বাচ্চাকে ঠিকঠাক মানুষ করতে মা, বাবা দুজনকেই প্রয়োজন। তোমার বাবা চলে যাওয়ার পর তুমি অসীমকেই সাবস্টিটিউট ফাদার ফিগার করেছিলে, আর অসীমও তোমাকে খুব ভালোবাসত। আমার মনে হয়েছিল, তোমার বাবাকে তো ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, সেই অবস্থায় এটাই সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা। কেন, তোমার কি মনে হচ্ছে আমি ভুল করেছিলাম?”

    “না, ভুল কর নি।”

    অর্ণা মাথা নাড়ল। মনে যতই প্রশ্ন থাক, বিকিস ছাড়া অন্য কাউকে তার পক্ষে বাবা বলে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। আর বিকিসও মা ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবে, অন্য কেউ বিকিসকে বাবা বলে ডাকবে, সে কথা অর্ণা ভাবতেই পারে না।

    “তোমরা কখনো নিজেদের ছেলেমেয়ের কথা ভাব নি?”

    অদিতি কাঁধ ঝাঁকালেন।

    “আমি একবার অসীমের সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলেছিলাম, কিন্তু ওর মনে হয়েছিল আমাদের সন্তান এলে তুমি আইসোলেটেড ফীল করতে পার। ও বলল, তুমি থাকতে আর কারুর দরকার কী? হি ডোটেড অন ইউ।”

    অর্ণা নিঃশব্দে মাথা নাড়ল।

    “আই নো।”

    অন্যের সন্তানকে কতখানি আপন করে নেওয়া যেতে পারে তা বিকিস নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। অর্ণা আলতো করে অদিতির হাতে হাত রাখল।

    “মাম্মা, আমার মোজা খুলে গেছে।”

    বাঁশির মতো সরু গলা শুনে অদিতি, অর্ণা দু'জনেই দরজার দিকে তাকাল। চার বছরের নাতি ঝুপুস অদিতির চোখের মণি। কিন্তু ছেলেটা খুব পিটপিটে। এক দণ্ড মোজা ছাড়া থাকবে না। এদিক থেকে সে পুরোপুরি দাদুর স্বভাব পেয়েছে।

    দাদু মানে বিকিস, অর্ণা নিজেকে মনে করিয়ে দিল।

    “চল, মোজা পরিয়ে দিচ্ছি।”

    টেবিল থেকে উঠে অর্ণা ঝুপুসের মোজা খুঁজতে গেল। অদিতি ফাঁকা কাপ দুটো নিয়ে বেসিনের দিকে রওনা দিলেন। কিন্তু পা যেন আর চলে না। এতদিন পরে সুজয়ের কথা তাঁকে বেসামাল করে দিয়েছে।

    অসীম চলে যাওয়ার পরের দিন এইসব কথা মনে পড়বে কল্পনাও করিনি...

    সুজয়ের মুখ, সেই হাসি, সেই গলার আওয়াজ যা শুনে অদিতি প্রথম দিনই প্রেমে পড়ে গেছিল...হানিমুনে কাশ্মীর যাওয়া, প্রথম বরফ পড়া, প্রথম হট চকলেট খাওয়া...

    এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না!

    অদিতির কানে সুজয়ের দরাজ গলার গান বাজতে থাকে। এ এক অদ্ভুত জগৎ - চোখের সামনে যা বাস্তব তা ভেল্কির মতো মিলিয়ে যায়, আর অতীত আর স্মৃতির মাঝামাঝি মুহূর্তগুলো মূর্ত হয়ে ওঠে।

    অর্ণার তখন তিন বছর বয়স। সুজয়ের কিনে দেওয়া খেলনা তীর-ধনুক নিয়ে সারা বাড়ি হুজ্জুতি করে চলেছে। এখানে সেখানে লুকিয়ে বসে থাকছে, আর কেউ পাশ দিয়ে গেলেই তাকে তীর ছুঁড়ে 'বধ' করছে। অদিতি আর অর্ণার আয়া মিলে সামলে রাখতে পারছে না। কী যেন নাম ছিল আয়ার? ওঃ হ্যাঁ, মুক্তি। সেদিন মুক্তির কাছে অর্ণাকে রেখে অদিতি রান্নাঘরে রুটি বানাচ্ছিল। দরজায় বেল বাজল, মুক্তি খুলে দিল। সুজয়ের ঢোকার আওয়াজ পাওয়া গেল। অর্ণা হনুমানের মতো 'হুপ' করে উঠল। তার পরেই একটা বিকট আওয়াজ। অদিতি ছুটে বেরিয়ে এসে দেখেন সুজয় সিঁড়ির নীচে পড়ে আছে, মাথার পেছন থেকে কালো মতো কী মেঝেতে ছড়িয়ে যাচ্ছে।

    আর সিঁড়ির ওপরে অর্ণা শুধু ধনুক হাতে দাঁড়িয়ে। তীরটা সিঁড়িতে গড়াগড়ি দিচ্ছে।

    বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে অদিতি ভাবতে থাকেন, মৃত্যু কি শুধু এক মুহূর্তের ব্যাপার? নাকি একটা নির্দিষ্ট ঘটনাপরম্পরা মানুষকে তার অমোঘ নিয়তির দিকে টেনে নিয়ে যায়? সেদিন যখন সুজয় সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল তখনই যদি অর্ণা তীরটা না ছুড়ত, সুজয় যদি চমকে না তাকাত, অসাবধানে পা না হড়কে যেত, মাথাটা সিঁড়ির কোনায় ঠুকে না যেত, তাহলে কি এই মর্মান্তিক ঘটনাটা ঘটত? এতগুলো ঘটনা যে পরপর ঠিক এভাবেই ঘটবে তার সম্ভাবনা কতখানি ছিল? অংকবিদেরা হয়তো বলতে পারবেন।

    সেদিন অদিতির মাথায় এত কথা আসেনি। সেদিন অদিতি একটাই কথা ভেবেছিলেন – এই দুর্ঘটনার সঙ্গে অর্ণার কোন যোগাযোগ আছে তা যেন সে বুঝতে না পারে। না বুঝে করে ফেলা একটা কাজের বোঝা আর অনুতাপ নিয়ে যেন তার সারাটা জীবন না কাটে। এর মধ্যেই তার ছোট্ট মুখটা শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। তার খেলা দেখে কেউ হাসছে না, হাততালি দিচ্ছে না। সে যেন বুঝতে পারছে গুরুতর কিছু একটা হয়ে গেছে।

    অদিতি জোর করে মুখে হাসি ফোটালেন। অন্তত দাঁত বের করলেন।

    “বাঃ, দারুণ টিপ তো!”

    মাকে হাসতে দেখে অর্ণার মুখ একটু স্বাভাবিক হল।

    “মুক্তি, অর্ণাকে ওর ঘরে নিয়ে যা, ওখানে খেলা কর। আমি দাদাকে খাবার দিয়ে আসছি।”

    হতভম্ব মুক্তি যেন কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেছে। অদিতি একটু জোর দিয়ে আবার বললেন।

    “অর্ণাকে ঘরে নিয়ে যা। এই সুজয়, ওঠো, খাবে তো।”

    এতক্ষণে মুক্তি ব্যপারটা ধরতে পেরেছে। সে সুজয়ের পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল।

    “চল, আমার সাথে পুতুল নিয়ে খেলবে চল।”

    “না, পুতুল না, গাড়ি নিয়ে খেলব!”

    অর্ণা চলে যাওয়া মাত্রই অদিতি ফোন তুলে হসপিটালে খবর দিয়েছিলেন। তারপর ব্যান্ডেজ নিয়ে এসে সুজয়ের মাথাটা জোড়া লাগানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। একা। অসহায়। একমাত্র দেওর আমেরিকায় পড়াশোনা করছে। বাড়িতে লোকবল বলতে শুধু তিনি আর বয়স্ক শাশুড়ি ভবতারিণী। বাপের বাড়িতে তো ফোনই নেই।

    হঠাৎ মনে পড়ল, অসীমদের বাড়িতে তো ফোন আছে! অসীম অদিতির বাপের বাড়িতে খবর পাঠিয়ে দেবে।

    সেদিন যে অদিতি কীভাবে সুজয়কে নিয়ে হসপিটালে গেছিলেন, কী কী ফর্মে সই করেছিলেন, তা আর তাঁর মনে নেই। শুধু মনে আছে তাঁর বারবার মনে হচ্ছিল, “আমার কাঁদার সময় নেই”। কান্না এসেছিল অনেক পরে, অসীমের সামনে। তার আগে তিনি অসীমকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন, ডাক্তার, পুলিশ, আত্মীয়, বন্ধু কারুর সামনে যেন অর্ণার নাম উচ্চারণ না করা হয়। তিনি নিজেও সেই দিনের কথা আর মুখে আনেন নি। এমনকি বুকে পাথর রেখে মুক্তিকেও ছাড়িয়ে দিয়েছিলেন - পাছে কোনদিন তার মুখ ফস্কে কিছু বেরিয়ে পড়ে।

    হ্যাঁ, শোকের মধ্যে একদিন ভবতারিণীকে সত্যিটা বলেছিলেন। অদিতির ভুরু কুঁচকে গেল। না, ঠিক শোকের কারণে নয়। তাঁর মনে হয়েছিল ভবতারিণীর জানার অধিকার আছে, তাঁর ছেলের ঠিক কী হয়েছিল।

    ভবতারিণীর কথা মনে পড়তেই অদিতির গা রিরি করে উঠল। অর্ণা না বুঝলেও ঘোরের মধ্যে বলা তাঁর কথাগুলোর মানে অদিতি ভালোই বুঝতে পেরেছেন। “খোকারে ওরা না, বাঁচতি দিল না” নয়, স্খলিতস্বরে তিনি বলেছিলেন, “খোকারে অর্ণা বাঁচতি দিল না”।

    মানুষ এত নিষ্ঠুর হতে পারে? তিন বছরের একটা নিষ্পাপ শিশুর দিকে এত বড় অভিযোগ তুলতে পারে? সারা জীবন অর্ণার জন্য এত বিষ ছিল তাঁর মনে? কী করে? তিনিও তো মা। পারলেন তিনি নিজের নাতনিকে এভাবে দোষ দিতে?

    সুজয় চলে যাওয়ার দেড় বছরের মাথায় অসীমের হাত ধরাটা ভবতারিণী সমেত অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু অদিতি জানতেন, অর্ণার বাবা অসীম ছাড়া কেউ হতে পারবে না। অসীমের সান্নিধ্য, নিরাপত্তা, ভালোবাসায় ঘিরে থেকে ধীরে ধীরে অর্ণা সেই বীভৎস দিনটার কথা ভুলে যাবে।

    তবুও অর্ণার মনে প্রশ্ন উঠেছিল। ওর হয়তো মনে নেই, কিন্তু আগেও একবার ও অদিতিকে সুজয়ের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন করেছিল। অসীম আর অদিতি তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন – অর্ণার সন্দেহের তীরটা তাঁদের দিকেই ঘোরানো থাকবে। অর্ণার মনে প্রশ্ন থেকে যাক তবু সত্যিটা যেন সে জানতে না পারে। বাবাকে মারার গ্লানি, অপরাধবোধ নিয়ে সে বেঁচে থাকবে না। অসীম জীবনের শেষ দিন অবধি তার কথা রেখেছে। এবার অদিতির পালা।

    “দিমদিম, দেখ আমি মোজা পরেছি।”

    ঝুপুসের গলার আওয়াজ পেয়ে অদিতি চমকে গেলেন। অতীতের মধ্যে হারিয়ে তিনি বর্তমান থেকে বহু দূরে চলে গেছিলেন। তাকিয়ে দেখলেন ঝুপুস পা তুলে তার মোজা দেখাচ্ছে।

    “বাঃ, এই তো কী সুন্দর মোজা পরেছ!”

    ঝুপুসের পেছনে অর্ণা দাঁড়িয়ে আছে। কফির মতো বাদামি চোখে প্রশ্ন আর অনিশ্চয়তা তখনও ঘুরপাক খাচ্ছে।

    অদিতি ম্লান হাসলেন, চোখে চোখ রেখে।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)