• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৪ | এপ্রিল ২০২৪ | প্রবন্ধ
    Share
  • ‘বিদ্রোহী’: সমান্তরাল পাঠে পাশ্চাত্য সাহিত্য : সুমিতা চক্রবর্তী

    ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথম প্রকাশ ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ৬ জানুয়ারি ‘বিজলী’ পত্রিকায়। লেখা হয়েছিল ১৯২১-এর ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের এক রাত্রে। যে-বাড়িতে লেখা হয় তার ঠিকানা ৩/৪ সি. তালতলা লেন। সেখানেই তখন মুজফ্ফর আহমদ-এর সঙ্গে থাকতেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-প্রত্যাগত সৈনিক কাজী নজরুল ইসলাম। কবি রূপে তখন তাঁর অল্প একটু পরিচিতি হয়েছে বঙ্গীয় পাঠক সমাজে।

    ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশের গল্পটি প্রায় সকলেই জানেন। ভোরবেলায় কবিতটির প্রথম শ্রোতা ছিলেন মুজফ্ফর আহমদ। কিছুক্ষণ পরে এসে উপস্থিত হলেন ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকার সম্পাদক আফজাল-উল-হক। কবিতাটি শুনে মুগ্ধ হয়ে তখনই নিয়ে গেলেন ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় মুদ্রণের জন্য। তার তিন-চার দিন পরে এলেন ‘বিজলী’ পত্রিকার ম্যানেজার অবিনাশ চন্দ্র ভট্টাচার্য। তিনিও কবিতটি শুনে মুগ্ধ হলেন। ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় কবিতাটি দেওয়া হয়ে গেছে শুনে পুনর্মুদ্রণের অনুমতি নিয়ে তিনিও নিয়ে গেলেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতার একটি প্রতিলিপি। কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা হল অন্যরকম। ‘মোসলেম ভারত’-এর প্রকাশ ছিল অনিয়মিত। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি নেওয়া হয়েছিল ১৩২৮ বঙ্গাব্দের কার্তিক সংখ্যার জন্য (অক্টোবর-নভেম্বর, ১৯২১)। কিন্তু সংখ্যাটি প্রকাশ পেতে পেতে হয়ে গেল ফাল্গুন মাস (ফেব্রুয়ারি-মার্চ, ১৯২২)। তার আগেই ‘বিজলী’তে প্রকাশিত হয়ে গেছে ‘বিদ্রোহী’। বিপুল আলোড়ন তুলেছে পাঠকদের মধ্যে। মজার কথা এই যে, ‘বিজলী’তে লেখা হল — কবিতাটি ‘মোসলেম ভারত’ থেকে পুনর্মুদ্রিত। অথচ ‘মোসলেম ভারত’ তখনও প্রকাশিতই হয়নি। সেটা জানতেন না ‘বিজলী’র কর্তৃপক্ষ। তাঁরা নিজেদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সততাই দেখিয়েছিলেন। ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকার পক্ষ থেকেও কোনো ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছিল বলে জানা নেই। সেই সময়ে একই লেখা বিভিন্ন পত্রিকায় স্বীকৃতিসহ পুনর্মুদ্রিত করবার রেওয়াজ ছিল। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির পুনর্মুদ্রণ হল আরও বেশ কয়েকটি পত্রিকায়। কাজী নজরুল ইসলামের নামই হয়ে গেল ‘বিদ্রোহী কবি’।

    এই নিবন্ধের আলোচ্য বিষয় হল পাশ্চাত্য সাহিত্যের সমান্তরালে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার পুনঃপাঠ। দিনে দিনে প্রমাণিত হয়েছে যে, ‘বিদ্রোহী’ এক বিস্ময়কর সৃষ্টি, এক কালোত্তীর্ণ কবিতা। এই কালোত্তীর্ণতার বিভিন্ন কারণ আছে এবং বিভিন্ন মাত্রাও আছে।

    প্রথম কারণ হল এই কবিতা চিরন্তন মানবতার বাণী-বাহক। ‘বিদ্রোহী’ কবি বলেছেন—অত্যাচারীর খড়গকৃপাণ যখন বিনাশ ডেকে আনবে না, উৎপীড়িতের ক্রন্দন যখন আর শোনা যাবে না—তখনই তিনি শান্ত হবেন। মানুষের সভ্যতায় আধিপত্যবাদী অত্যাচার এবং দুর্বলের বিপন্নতা চিরকালই আছে। সেই সঙ্গেই আছে সেই উৎপীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ। প্রতিবাদ সবসময় সফল হয়নি। কিন্তু প্রতিবাদের এই স্বরায়নও কখনও সম্পূর্ণ নীরব হয়নি।

    এই কবিতার কালোত্তীর্ণতার আর একটি মাত্রা হল কবিতাটির প্রকরণগত বহুব্যাপ্তি। মিথ ও পুরাণকে; সেই সঙ্গে প্রাচীন ধর্ম-কথাগুলিকে কবি কবিতার অঙ্গীভূত করেছেন। ভারতীয় মহাকাব্য ও পুরাণ, ইহুদিদের প্রাচীন বাইবল্, খ্রিস্টানদের নব্য বাইব্‌ল্, ইসলাম ধর্মালম্বীদের কোরান; তারই সঙ্গে গ্রিক পুরাকথার অনুষঙ্গের মিশ্রণে এই কবিতা স্থানিক পরিসরের ক্ষেত্রেও হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক। একটি কবিতায়—দীর্ঘ কবিতা হলেও, দেশ ও কালের এতখানি বিস্তার সহজে যেন সাধারণ পাঠকের কল্পনায় ধরা দেয় না। সেজন্য এই কবিতার মূল ঘোষণাটি সরল হলেও এই কবিতার প্রাকরণিক বিশালতা এখনও সব পাঠকের সম্পূর্ণ বোধগম্য নয়।

    কবি যখন লিখেছিলেন তখন বিভিন্ন দেশের প্রাচীন কথা এবং ইতিহাস খনন করে নিয়ে এসেছেন বিভিন্ন উপমা, চিত্রকল্প এবং প্রসঙ্গ। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ভাষায় বিভিন্ন দেশের পুরা-কথা যেভাবে সংমিশ্রিত হয়েছে তার বিশ্লেষণ এই নিবন্ধে থাকবে না। এ-বিষয়ে এই প্রাবন্ধিকের বিস্তৃত আলোচনা ভিন্ন একটি গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট হয়েছে। এই রচনায় পাশ্চাত্য সাহিত্যের সঙ্গে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কিছুটা তুলনাত্মক পাঠ করবার চেষ্টা করেছি। সেটুকুই নিবেদন করব পাঠকদের সামনে। তুলামূলক পাঠ কোনও প্রভাব সন্ধান নয়, ভালো-মন্দের বিচারও নয়। এই পাঠের উদ্দেশ্য হল দুটি টেক্‌স্ট-কে পাশাপাশি রেখে - দুটিরই মিল-অমিলের পর্যালোচনার মধ্যে দিয়ে দুই শিল্পীর দুটি সৃষ্টির তাৎপর্য ও সৌন্দর্যের অনুভবকে স্পর্শ কবার প্রয়াস।

    যেহেতু ‘বিদ্রোহী’ এবং টি. এস. এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫)-এর ‘দ্য ওয়েস্টল্যান্ড’—দুটি মহাকবিতাই প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২২-এ, তাই শতবর্ষ উপলক্ষ্যে এই দুটি রচনা নিয়ে বেশ কিছু আলোচনা হয়েছে। দুটি লেখার সাদৃশ্য কোথায়? দুটিই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ উত্তরকালে রচিত। কিন্তু সেই সময়ের ইউরোপের যে-চিত্র এলিয়ট-এর লেখায় আছে তা ‘বিদ্রোহী’তে নেই। এলিয়ট-এর দৃষ্টি ছিল ইউরোপের দিকে। নজরুল ইসলামের কল্পনায় ছিল সমগ্র বিশ্ব! ‘বিদ্রোহী’-তে উৎপীড়কের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহের বার্তা তা সরাসরি ‘দ্য ওয়েস্টল্যান্ড’-এ নেই। কিন্তু একেবারে নেই তা-ও বলা যায় না। পরোক্ষ একটু আছেও। ‘দ্য ওয়েস্টল্যান্ড’-এর পঞ্চম কবিতা ‘হোয়াট দ্য থান্‌ডার সেইড’। কবিতাটি শেষ পর্যন্ত এক ঝড়ের বাণী বহন করে। নজরুল ইসলাম লিখেছেন—‘আমি বিদ্রোহী, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল বৈশাখীর’। সেই ঝড় পরিবর্তন আনে। যদিও সুরটা আলাদা। তবুও ‘দত্ত। দয়ধ্বম। দাম্যত - শান্তি শান্তি শান্তি’। -এলিয়ট-এর এই উক্তিগুলির মধ্যেও থেকে গেছে বিশ্ব-শান্তির প্রার্থনা—‘যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না’—যখন ভেঙে পড়বে না ‘লন্ডন ব্রিজ’ তথা মানুষে মানুষে সৌহার্দ্যের সেতু। বৃহদারণ্যক উপনিষদ-এর পঞ্চম অধ্যায় দ্বিতীয় ব্রাহ্মণ থেকে নেওয়া- দান করো, দয়া করো এবং দমন করো - এই বাণীও ‘বিদ্রোহী’ কবিতা থেকে অনুভব করা যায়। উৎপীড়ককে দমন করো, উৎপীড়িতকে দয়া করো এবং নিজের শক্তিকে পরার্থে দান করো। ভাব-সাদৃশ্য পাঠক মনের মধ্যে অনুভব করতে পারেন। দুটি কবিতার অভিব্যক্তি পৃথক, দৈশিক পরিস্থিতিও আলাদা। কিন্তু লক্ষ্যটা শেষ পর্যন্ত একই।

    ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সঙ্গে ওয়ল্ট হুইটম্যান (১৮১৯-১৮৯২)-এর ‘সং অব মাইসেল্ফ্’ নামের দীর্ঘ কবিতার সাদৃশ্যের কথা অনেকেই বলেছেন। লক্ষ করা যায় হুইটম্যান-এর জীবনের সঙ্গেও নজরুল ইসলামের জীবনের মিল আছে। হুইটম্যান-ও এগারো বছর বয়সে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যায়তনে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেননি। আমেরিকার গৃহযুদ্ধে দাসপ্রথার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ১৮৬২-তে। ছিলেন গণতন্ত্রের একনিষ্ঠ উপাসক। নজরুল হুইটম্যান-এর অনুরাগী ছিলেন। ‘অগ্রপথিক’ নামে অনুবাদ করেছিলেন তাঁর ‘পায়োনিয়াস’ কবিতাটি। রবীন্দ্রনাথও হুইটম্যান-এর কবিতা পছন্দ করেছিলেন। তাঁর ‘লিভস্ অব্ গ্রাস’ সংকলনের প্রকাশ ১৮৫৫। এই সংকলনেরই প্রথম দীর্ঘ কবিতা ‘সং অব্ মাইসেল্ফ্’। বইটি নিষিদ্ধ করবার দাবি উঠেছিল। তাঁর কবিতা ‘সং অব্ মাইসেল্ফ্’- এর সঙ্গে ‘বিদ্রোহী’র কোনও কোনও অংশের ভাষার মিল আছে। অনুভবেরও মিল আছে। ‘আই সেলিব্রেট মাইসেল্ফ্’ লিখেছেন হুইটম্যান। নজরুল ইসলাম লিখেছেন—‘আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ’। হুইটম্যান লেখেন, ‘আই অ্যাম লার্জ, আই কনটেন মাল্টিচ্যুড্স্’। নজরুল লেখেন, ‘আমি উত্তাল আমি তুঙ্গ ভয়াল মহাকাল’। আরও সাদৃশ্যের উদাহরণ- স্টেপ্ল্ করা আছে।***

    এছাড়া মাল্টিচ্যুড্স্-এর বহুমাত্রিকতার প্রসঙ্গ এনেছেন হুইটম্যান। তা-ও বহুলভাবে পাওয়া যায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়। পুরাণ-অনুষঙ্গ, প্রেম, প্রকৃতি, নৃত্য-গীতের ছন্দোময়তা, শক্তির সংঘাত, মৃত্যুবোধ, উৎপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও উৎপীড়িতের প্রতি সহমর্মিতা- সবই মিশে আছে নজরুল ইসলামের রচনায়। কেউ কেউ এমন কথাও বলেছেন- ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রধান লক্ষণ হল অস্মিতাবোধ - আত্মবোধের জাগরণ। হুইটম্যান-এর ‘সং অব মাইসেল্ফ্’ কবিতারও কেন্দ্রীয় অনুভব এই অস্মিতাবোধ।

    হুইটম্যান-এর ‘সং অব মাইসেল্ফ্’-এর সঙ্গে নজরল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’-র তুলনা নিয়ে আলোচনা করেছেন অনেকেই। কিন্তু ‘বিদ্রোহী’ কবিতা-র আলোচনায় প্রমিথিউস-এর প্রসঙ্গে বিশেষ আসেনি। বিশ্বসাহিত্যে ‘প্রমিথিউস’-পরম্পরার সঙ্গে কবিতাটির তুলনাত্মক উপস্থাপন সেভাবে করা হয়নি।

    গ্রিক পুরা-কথায় ওলিম্পাস পর্বতবাসী ওলিম্পিয়ান দেবতাকুল আর মানব-প্রজাতির মধ্যবর্তী স্তরে অবস্থান করেন ‘টাইটান’ গোষ্ঠী। তাদেরই একজন প্রমিথিউস। মনে ওরা হয় টাইটান-রা দেবযোনি সম্ভূত কিন্তু ধরিত্রী মাতার সন্তান। দেবতারা আধিপত্যবাদী, অত্যাচারী এবং নিষ্ঠুর। মানুষের উপর চলে তাঁদের স্বেচ্ছাচারী নিপীড়ন। টাইটানরা মানুষের প্রতি সহানুভূতি সম্পন্ন এবং দেবতাদের উৎপীড়নের বিরোধী। এই পুনরাবৃত্ত উপাদান অর্থাৎ ‘মোটিফ’—যেখানে থাকে উৎপীড়কের বিরুদ্ধে উৎপীড়িতের প্রতিবাদ—বিশ্বসাহিত্যে এসেছে অনেকবার।

    প্রমিথিউস স্বর্গ থেকে গোপনে আগুন এনে দিয়েছিলেন মানুষকে। আগুন ব্যবহার করবার কৌশল আয়ত্ত হলে মানুষের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছিল। সেই অপরাধে দেবরাজ জিউস-এর দেওয়া শাস্তি ভোগ করছিলেন তিনি। পর্বতশৃঙ্গে আবদ্ধ প্রমিথিউস-এর যকৃৎ প্রতিদিন ঠুকরে খেয়ে যেত ঈগল পাখি; রোজ রাত্রে আবার গজিয়ে উঠত সেই যকৃৎ, আবার সেই যন্ত্রণা ভোগ করতেন প্রমিথিউস। জিউস-এর মৃত্যু কীভাবে হবে তা জানলেও প্রমিথিউস কিছুতেই তা বলেননি। বললেই তাকে মুক্তি দেবার আশ্বাস দিয়েছিলেন জিউস। মানুষের বন্ধু, দুর্বলের সহায় প্রমিথিউস পরাজয় মেনে নেননি। প্রমিথিউসকে কেন্দ্রে রেখে যত ভাষাশিল্প রচিত হয়েছে তার মধ্যে প্রধান কয়েকটির উল্লেখ করা হল।

    সাহিত্যে প্রমিথিউসকে প্রথম পাওয়া গেল খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর আখ্যানকাব্য ‘থিও গোনি’-তে, কবি হেসিওড-এর লেখায়। এই কাব্যে জিউস-এর সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন প্রমিথিউস। পশু-বলিদানের আনুষ্ঠানিক ক্রিয়ায় কিছুটা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তিনি জিউসকে এমন একটি পশু নির্বাচন করতে প্ররোচিত করেন যার ফলে মানুষকে পশুবলির অনুষ্ঠানে আগুন ব্যবহার করতে হবে। এই কাব্যে দেখানো হয়েছে, মানুষ আগে আগুনের ব্যবহার জানত কিন্তু জিউস সেই আগুন মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন। এই অনুষ্ঠানের ফলে মানুষকে আগুন ব্যবহার করতে দিতে বাধ্য হতে হয় জিউসকে। লুকিয়ে রাখা আগুন প্রমিথিউস মানুষকে ফিরিয়ে দিলে জিউস খুবই ক্রুদ্ধ হয়ে প্রমিথিউস এবং সেই সঙ্গে মানুষকে নানাভাবে নির্যাতন করেন। জিউস-এর বিধানে শৃঙ্খলিত প্রমিথিউস ও ঈগল পাখির দ্বারা প্রতিদিন তার যকৃৎ ভক্ষণের ঘটনা হেসিওড-এ আছে।

    প্রমিথিউস-কে ট্র্যাজেডি-র নায়করূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মহৎ গ্রিক নাটককার ইসকাইলাস। তাঁর জন্ম ৫২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে; ৪৫৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন। প্রাক-খ্রিস্টীয় পঞ্চম-চতুর্থ শতকের গ্রিস-এ নাট্যচর্চার যে সমুন্নতি দেখা দিয়েছিল সেই পর্বের প্রধান নাটককারদের অন্যতম ইসকাইলাস-এর প্রধান একটি ট্র্যাজেডি হল ‘বন্দি প্রমিথিউস’। কথাবৃত্তটি প্রায় অপরিবর্তিত। মানুষের শক্তি বৃদ্ধির জন্য স্বর্গ থেকে আগুন হরণ করে মানুষকে দান করবার কারণে ক্রুদ্ধ জিউস প্রমিথিউস-কে পর্বতশৃঙ্গে আবদ্ধ করে রাখেন। শকুনেরা প্রতিদিন তাঁর যকৃৎ ও হৃৎপিণ্ড ঠুকরে খেয়ে যেত। জিউস-এর মৃত্যু কীভাবে হবে সেই গোপন খবরটি বলে দিলে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে—একথা জিউস বললেও, তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করেও তথ্যটি প্রকাশ করেননি প্রমিথিউস। গ্রিক নাটকের নায়কের দুটি লক্ষণ হল—চরিত্রের মহত্ত্ব এবং দুর্ভাগ্যের মার। দুটিই এই নাটকে পরিস্ফুট। সূক্ষ্মভাবে অনুধাবন করলে দেখা যায়, প্রমিথিউস-এর মধ্যে আছে সেই অনমিত অহংকার যা দেবতাদের কাছে অসহ্য বোধ হয়। এই অহংকারের অভিব্যক্তি নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার উদ্গাতার স্বরক্ষেপণে সঞ্চারিত করেছে এক অগ্নিময় সৌন্দর্য। গবেষকরা মনে করেছেন যে, প্রমিথিউস-কে প্রধান ভূমিকায় রেখে আরও তিনটি ট্র্যাজেডি লিখেছিলেন ইসকাইলাস—যথাক্রমে ‘শৃঙ্খলমুক্ত প্রমিথিউস’, ‘অগ্নি আনয়নকারী প্রমিথিউস’ এবং ‘অগ্নি-উদ্দীপক প্রমিথিউস’। সেগুলি পাওয়া যায়নি।

    একথাও মনে না হয়ে পারে না—নজরুল ইসলাম তাঁর ‘বিদ্রোহী’-র রূপাবয়বে বারবার অগ্নিময় সত্তার প্রকাশ লক্ষ করেছেন—

    ‘আমি হোমশিখা, আমি সাগ্নিক জমদগ্নি,
    আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি।’
    আরও একবার-
    ‘আমি বসুধাবক্ষে আগ্নেয়াদ্রি, বাড়ব বহ্নি কালানল’
    ইসকাইলাস-এর ট্র্যাজেডি-তে প্রমিথিউস ও জিউস ছাড়া আর যে চরিত্রদের পাই তারা হল আয়ো, সমুদ্র, প্রকৃতি আর কোরাস। সমুদ্র আর প্রকৃতিকে আধা-বাস্তব আধা-প্রতীকী চরিত্র বলা যেতে পারে। কোরাস ধ্রুপদি গ্রিক নাটকের প্রায় আবশ্যিক সম্মেলক-চরিত্র- আয়ো (৯০) কে? অ্যারগাস্-এর রাজার মেয়ে আয়ো-কে দেখে প্রলুব্ধ হয়েছিলেন জিউস। ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন জিউস-পত্নী হেরা। মেয়েটিকে বাড়ি থেকে বার করে দেবার পর হেরা তাকে একটি গাভীতে রূপান্তরিত করেন এবং দেশে দেশে তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় এক গো-পালক। ঘুরতে ঘুরতে সে চলে আসে বন্দি প্রমিথিউস-এর কাছে। প্রমিথিউস তার ভাগ্যবিপর্যয়ের বৃত্তান্ত জানেন। তাকে দেখে তিনি আরও কষ্ট পান। এই ভাবে অত্যাচারী শক্তির দ্বারা নিগৃহীত এক পুরুষ ও এক নারীকে একই মঞ্চে দেখতে পাই। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় আয়ো-র পুরা-কথাটি নেই, কিন্তু নারীর একাধিক রূপের উল্লেখ আছে—‘চপল মেয়ের ভালোবাসা’, ‘যৌবনভীরু পল্লিবালা’ এবং ‘বিধবার বুকে ক্রন্দন শ্বাস’।

    ধ্রুপদী যুগের পর, রেনেসাঁস-এর শেষের দিকে আলোকায়ন পর্বের সমুজ্জ্বল পরিমণ্ডলের প্রতিভাদীপ্ত কালজয়ী কবি জার্মানি-র যোহান উল্ফ্গ্যাং ভন গ্যোঠে (১৭৪৯-১৮৩২)। একটি কবিতা লিখেছেন ‘প্রমিথিউস’ নামে। কবিতাটি ১৭৭২ থেকে ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে লিখিত কিন্তু প্রকাশিত হয়েছিল প্রায় পনেরো বছর পরে ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে।

    ধ্রুপদী যুগ আর রেনেসাঁস-এর কালপর্বের মধ্যবর্তী স্তরে ছিল বিস্তীর্ণ খ্রিস্টীয় যুগ—তেরোশো বছর ব্যাপ্ত। ছিল মহাকাব্যিক গ্রন্থ বাইব্ল্। বাইব্ল্ ধর্মগ্রন্থ রূপে চিহ্নিত হলেও, বিশেষ করে আদি বাইব্ল্-এর কথাবৃত্ত-বিন্যাসে মহাকব্যের লক্ষণ দেখা যায়। বাইব্ল্-উত্তর কালের পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে গ্রিক পুরাকথা আর মহাগ্রন্থ বাইব্ল্ - কোনওটিকেই উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

    গ্যোঠে-র প্রমিথিউস গ্রিক সংস্কৃতির প্রমিথিউস-এর থেকে একটু আলাদা। গ্যোঠে-র পরিকল্পনায় মিশেছে বাইব্ল্-এর অনুষঙ্গ। বাইব্ল্-এ ঈশ্বর ও মানুষের সম্পর্ক পিতা-পুত্র সম্পর্কের দ্যোতক। পিতার অবাধ্য সন্তান মানুষকে সেজন্য দুঃখ-কষ্টের পৃথিবীতে নেমে আসার দুর্ভাগ্য সহ্য করতে হয়েছে।

    গ্যোঠে-র কবিতায় জিউস প্রমিথিউস-এর জনক এবং আর মা এক দেবী। গ্যোঠে-র প্রমিথিউস টাইটান নন। জিউস-এর পুত্র।

    গ্যোঠে-র সাত স্তবকবিশিষ্ট নাতিদীর্ঘ সাতান্ন পঙ্ক্তির কবিতাটিতে দুটিই চরিত্র—প্রমিথিউস ও জিউস। একজনই কথক—প্রমিথিউস। পর্বত এবং ওক গাছের উল্লেখ আছে। কিন্তু শিকলে বাঁধা থাকবার উল্লেখ নেই। কবিতাটির পঙ্ক্তিতে শ্রুত হয় অত্যাচারী পিতার প্রতি পুত্রের ক্ষোভের ভাষা। ক্ষোভের কারণও উল্লেখিত আছে। প্রমিথিউস মানুষের প্রতি সহমর্মী। নিষ্ঠুর জিউস-এর বিরুদ্ধে সেজন্যই তাঁর প্রতিবাদ।

    মোটের উপর বলা যায় মূল গঠনের দিক থেকে প্রমিথিউস চরিত্রের বিশেষ পরিবর্তন নেই। তিনি অত্যাচারী দেবতাদের বিরুদ্ধে, দুর্বল মানুষের পক্ষে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতারও একই বার্তা। তবে দুটি কবিতার মধ্যে পার্থক্যও আছে। গ্যোঠে-র কবিতায় জিউস-এর প্রতি প্রমিথিউস-এর অভিযোগ অনেকটাই ব্যক্তিগত। তবে কবিতার শেষ স্তবকে প্রমিথিউস মানুষের সঙ্গেই একাত্ম হতে চেয়েছেন। গ্যোঠে-র ‘প্রমিথিউস’ কবিতার তিনটি স্তবকের অনুবাদ উদ্ধৃত হল। অনুবাদ করেছেন এ. জেড. ফোরম্যান (আন্তর্জালে প্রাপ্ত)

    When I was a child
    That knew not its way in the world
    I would lift my deluded eyes
    To the sun as though out beyond it
    There were an ear to hear my complaints
    A heart like mine
    That would take pity on my oppression
    (তৃতীয় স্তবক)
    I should honor you? For what?
    Did you ever gentle
    The ache of my burden?
    Did you ever dry
    The tears of tribulation?
    Was I not forged to manhood
    By Time Almighty
    And Eternal Destiny,
    My master and Yours?
    (পঞ্চম স্তবক)
    Behold
    Here I sit, fashioning men
    In my own image,
    A race after my likeness,
    A race that will suffer and weep,
    And rejoice and delight with heads held high
    And heed Your will no more
    Than!!
    (সপ্তম ও শেষ স্তবক)

    প্রমিথিউস-কে কেন্দ্র করে রচিত সর্বাধিক পরিচিত দুটি টেক্সট্-ই নাটক। প্রথমটি ইসকাইলাস-এর ধ্রুপদী সৃষ্টি; দ্বিতীয়টি রোমান্টিক যুগের অন্যতম প্রধান কবি পার্সি বিশি শেলি-র লেখা কাব্যনাট্য ‘প্রমিথিউস আনবাউন্ড’। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার নাট্যগুণও আমাদের মনে জাগ্রত থাকে। চরিত্র নির্মাণ, নাটকীয় একোক্তি (মনোলগ), দৃশ্যরূপের উদ্ভাস, গতিময়তা, ছন্দের উচ্চারণ মাত্রেই আবহধ্বনির সঙ্গত—কোনওটিই তুচ্ছ করা যায় না। তবে ‘বিদ্রোহী’ শেষ পর্যন্ত কড়ি ও কোমলের সমন্বয়ে গড়া এক তীব্র-মধুর, ভীষণ-সুন্দর রোমান্টিক কবিতা রূপেই পাঠককে মুগ্ধ করে।

    শেলি-র ‘প্রমিথিউস আনবাউন্ড’ কাব্যনাট্যের প্রকাশ ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে। তার চার বছর আগে ‘প্রমিথিউস’ নামের কবিতা লিখেছিলেন ইংল্যান্ড-এর আর এক খ্যাতনামা কবি জর্জ গর্ডন বায়রন (১৭৮৮-১৮২৪)। ইংল্যান্ড-এর রোমান্টিক কাব্য-আন্দোলনের পাঁচ প্রধান কবি হলেন ওয়র্ডসওয়র্থ (১৭৭০-১৮৫০), কোলরিজ (১৭৭২-১৮৩৪), শেলি (১৭৯২-১৮২২), কিট্স্ (১৭৯৫-১৮২১) এবং বায়রন। তাঁর লেখা কাব্য ডন জুয়ান (১৮১৯)। এই বেপরোয়া পর্যটক ও বীর-প্রেমিক নায়ক ডন জুয়ান বিশ্ব-সাহিত্যে নায়ক-চরিত্রের এক ধরনের আদর্শই স্থাপন করেছে। তাঁর আর একটি বিখ্যাত কাব্য ‘চাইল্ড হ্যারল্ড’স পিলগ্রিমেজ’ (১৮১২)।

    বায়রন ছিলেন সচ্ছল ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। যদিও তাঁর পিতার চরিত্রে নানাবিধ স্খলন ছিল। কেমব্রিজ-এর ট্রিনিটি কলেজে শিক্ষাপ্রাপ্ত, ভ্রমণপ্রিয় বায়রন শেলির বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। তুরস্ক-এর অটোমান রাজশক্তির সঙ্গে গ্রিস-এর যুদ্ধে গ্রিকদের পক্ষে লড়াই করেছিলেন বলে গ্রিস-এও তিনি বীর নায়ক রূপে সম্মানিত। ছত্রিশ বছর বয়সে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।

    বায়রন-এর ‘প্রমিথিউস’ কবিতাটি ঊনষাট পঙ্ক্তিতে রচিত, তিনটি স্তবকে বিন্যস্ত। প্রথম স্তবকে চৌদ্দ, দ্বিতীয় স্তবকে কুড়ি এবং তৃতীয় স্তবকে পঁচিশ পঙ্ক্তি।

    ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার সময়ে নজরুল ইসলাম ইসকাইলাস, গ্যোঠে, বায়রন এবং শেলি-র রচিত নাটক, কবিতা ও কাব্যনাট্য পড়েছিলেন কিনা, তাতে কিছুটা সংশয় থাকেই। তাঁর বয়স তখন বাইশ-তেইশ। যখন স্কুলের ছাত্র তখনই তাঁর সেনা-প্রশিক্ষণ-শিবিরে যোগদান এবং প্রথম মহাযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত সেখানেই থাকা। কলকাতায় ফিরে বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের সন্ধানের মধ্যেই এত কি পড়তে পেরেছিলেন? ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় যে বিপুল বৈদগ্ধ্যের স্বাক্ষর পাওয়া যায় তার অবলম্বন প্রধানত পুরাণ ও ইতিহাস। কিন্তু পাশ্চাত্য সাহিত্য স্বীকরণের প্রমাণ বিশেষ নেই। ‘কল্লোল’ পত্রিকা ১৯২৩-এ প্রকাশিত হলে পত্রিকাটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগ স্থাপিত হয় তাঁর। ‘কল্লোল’-গোষ্ঠী পাশ্চাত্য সাহিত্য সম্পর্কে বিশেষ সচেতন ছিলেন। এমনও বলা যায়, কেবল ইংরেজি সাহিত্যের বেষ্টনীতে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর ইউরোপীয় সাহিত্যের সঙ্গে এই পত্রিকাই বাঙালি পাঠকের যথার্থ পরিচয় ঘটিয়েছিল। সেই সূত্রেই নজরুল ইসলামেরও বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয়। কিন্তু ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তার আগেই লেখা হয়ে গছে। সম্ভবত প্রমিথিউস সম্পর্কে গ্রিক পুরাণের আখ্যান ছাড়া অন্য রচনাগুলির সঙ্গে পরিচয় ছিল না তাঁর।

    তা সত্ত্বেও ‘বিদ্রোহী’ পাঠ করবার সময়ে আমাদের প্রমিথিউস-এর কথা মনে পড়ে। কারণ অন্যায় উৎপীড়নের বিরুদ্ধতা আর মানুষের প্রতি সহমর্মিতা নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ আর গ্রিক পুরাণের প্রমিথিউস—উভয় কল্পনারই অন্তঃসত্য। আমরা সমান্তরালভাবে পাঠ করতে চাইছি প্রমিথিউস-কেন্দ্রিক সাহিত্য আর ‘বিদ্রোহী’। সুনির্দিষ্ট ভাবে মিল-অমিল দেখানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার উপর অন্য কোনও রচনার প্রভাব সন্ধানও নিরর্থক।

    বায়রন-এর প্রমিথিউস আর নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী-র মধ্যে বিশেষ পার্থক্যটি হল—বায়রন এর কবিতার প্রমিথিউস কোনও কথা বলেন না। পর্বত-শৃঙ্গে শিকলে বাঁধা থেকেও তিনি তাঁর ক্রোধ, ক্ষোভ, প্রতিবাদ ভাষায় প্রকাশ করেননি—অনড় নীরবতাই তাঁর প্রতিবাদের ভাষা। কবিতাটিতে প্রমিথিউসকে সম্বোধন করেছেন কবিতার কথক। যেমন ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথম বাক্যে বিদ্রোহী বীরকে সম্বোধন করে কবি বলেছেন - “বল বীর! বল উন্নত মম শির” –

    এই প্রথম বাক্য থেকেই কবিতার গঠনে কথকের উচ্চারণ ভেদ করে বিদ্রোহী-র ভাষা ধ্বনিত হয়। আর দুবার মাত্র মধ্যম পুরুষের সম্বোধন আছে কবিতাটিতে, প্রথম স্তবকেই। কিন্তু তার পর থেকে ‘তুমি’ সর্বনামের আড়াল সরিয়ে সমগ্র কবিতায় ‘আমি’-র আত্মঘোষনাই হয়ে ওঠে মূল সুর।

    বায়রন-এর কবিতায় তেমন হয়নি। মধ্যম পুরুষের বাচনেই ‘প্রমিথিউস’ কবিতাটি আগাগোড়া রচিত। কবি-কথক সম্বোধন করেছেন টাইটান প্রমিথিউসকে এবং প্রতিষ্ঠিত করেছেন এই সত্য—প্রমিথিউস-এর নীরব যন্ত্রণা ভোগের দ্বারাই অত্যাচারী শাসকের পতন সূচিত হয়েছে।—

    And in thy Silence was his Sentence,
    And in his soul a vain repentance,
    And evil dread so ill dissembled,
    That in his hand the lightnings trembled.
    “তোমার নৈঃশব্দই ছিল শাস্তি তার,
    এবং হৃদয়ের নিঃশব্দ অনুশোচনা,
    এমনভাবেই চূর্ণ হয়েছিল তার বৈনাশিক শক্তি,
    যার ফলে কেঁপে উঠেছিল তার হাতের বজ্র।” নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী বীর কবিতাটির শেষ স্তবকে অক্লান্ত সংগ্রামের বার্তা দিয়েছে—
    “যবে অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ
    ভীম রণভূমে রণিবে না
    আমি সেই দিন হব শান্ত।”
    বায়রন-এর কবিতার কথক জানিয়েছেন যে, বিদ্রোহী প্রমিথিউস বিজয়ী হয়েছে—সে মৃত্যুকেই করে তুলেছে তার বিজয়-নিশান।
    Triumphant where it dares defy
    And making Death a Victory
    দুটি কবিতার উপস্থাপনা পৃথক, কিন্তু প্রাণধর্ম একই।

    পার্সি বিশি শেলির কাব্যনাট্য ‘প্রমিথিউস আনবাউন্ড’ ১৮২০-তে প্রকাশিত হওয়ার আগেই ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত একটি উপন্যাসে ‘প্রমিথিউস’ শব্দটির বিচিত্র প্রয়োগ আছে। উপন্যাসটির নাম ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন; অর দ্য মডার্ন প্রমিথিউস’। ঘটনাচক্রে এই উপন্যাসের লেখক ম্যারি শেলি (১৭৯৭-১৮৫১) ছিলেন পার্সি বিশি শেলির পত্নী।

    ম্যারির মাতা ও পিতা দুজনেই ছিলেন সময়ের তুলনায় এগিয়ে থাকা প্রগতিশীল মানুষ। ম্যারি-র মা ম্যারি ওল্স্টোনক্রাফ্ট (১৭৫৯-১৭৯৭) ছিলেন বিশ্বের প্রথম নারীবাদী চিন্তক। তাঁর লেখা গ্রন্থ থেকেই শুরু হয় নারীবাদী চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পিতা উইলিয়ম গডউইন (১৭৫৬-১৮৩৬) ছিলেন রাজনৈতিক তত্ত্ববিদ। তবে কন্যার শিক্ষা সম্পর্কে সচেতন। ম্যারি-র সঙ্গে কবি শেলির প্রেমের সম্পর্ক যখন গড়ে ওঠে তখন শেলি বিবাহিত। তা সত্ত্বেও ম্যারি, শেলির সঙ্গে ঘর ছেড়ে চলে যান। তাঁদের দিন কাটতে থাকে বহু সমস্যায় এবং দারিদ্রে। শেষ পর্যন্ত ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে শেলির আগের স্ত্রী হ্যারিয়েট আত্মহত্যা করলে তাঁরা বিবাহ করেন।

    ম্যারি, কবি শেলি, কবি বায়রন, ম্যারির বৈমাত্রেয় বোন ক্লেয়ার এবং আরও এক বন্ধু একত্রে সুইজারল্যান্ডে একটি গ্রীষ্মকাল কাটিয়েছিলেন। সেখানেই এই উপন্যাসটি লেখার পরিকল্পনা তাঁর মাথায় আসে। পরবর্তীকালে ম্যারি শেলির জীবন খুব সুখে কাটেনি। চার সন্তানের তিনজনই শৈশবেই মারা যায়। কনিষ্ঠ পুত্রকে বহু কষ্টে তিনি বড়ো করেন। পার্সি বিশি শেলির মৃত্যু হয় ১৮২২-এ, সমুদ্রের ঝড়ে নৌকাডুবি হওয়ার ফলে। তখন ম্যারির বয়স ছিল মাত্র পঁচিশ। বাকি জীবন তিনি বিভিন্ন ধরনের লেখার সাহায্যে জীবিকার ব্যবস্থা করেন এবং সন্তানের দেখাশোনায় ব্যাপৃত থাকেন। তাঁর মৃত্যু তিপান্ন বছর বয়সে। জীবনের শেষ দশ বছর শারীরিক অসুস্থাতায় কেটেছিল। কিন্তু কুড়ি বছর বয়সে লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাস, ১৮১৮-র ৩ জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয়। এই একটি উপন্যাসের জন্য তিনি কালজয়ী লেখক হয়ে উঠেছেন। প্রথম সংস্করণে লেখকের নাম ছিল না, দ্বিতীয় সংস্করণে তাঁর নাম ছিল, সেটি প্যারিস থেকে ১৮২১-এ প্রকাশিত হয়।

    তাঁর উপন্যাসটির নাম ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন; অর দ্য মডার্ন প্রমিথিউস’। উপন্যাসটির সঙ্গে প্রমিথিউস-এর সম্পর্ক কোথায় তা আমরা দেখবার চেষ্টা করব।

    চার বন্ধু ছিলেন ম্যারি শেলি, তাঁর প্রণয়ী পার্সি বিশি শেলি, কবি বায়রন এবং জন পলিডোরি (১৭৯৫-১৮২১)। তিনি ছিলেন চিকিৎসক; সেই সঙ্গেই সাহিত্যিক। অনেকে তাঁকে ভ্যাম্পায়ার কল্পনার স্রষ্টা বলে মনে করেন। তখন ইউরোপ ভ্রমণ করছিলেন তাঁরা। সময় ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দ। জার্মানি-র রাইন নদীর তীরে একটি স্থানে কিছুদিন ছিলেন যার কাছাকাছি ছিল ছ-শো বছরের পুরোনো এক প্রাচীন দুর্গ। যার নাম ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন ক্যাসল্’। সেই প্রাসাদে দুশো বছর আগে জোহান কনরাড ডিপেল নামের এক শরীরতত্ত্ববিদ্ ও রসায়নবিদ্ বিভিন্ন ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করতেন—এমনই ছিল জনশ্রুতি।

    তার পর সাহিত্যমনস্ক চার বন্ধু চলে গেলেন সুইজারল্যান্ড-এর জেনেভা শহরে। তাঁদের আলোচনায় উঠে আসত রহস্যময়, রোমাঞ্চকর, অধিবাস্তবতা সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রসঙ্গ। একসময়ে তাঁরা এক বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হলেন—তাঁর লিখবেন ‘ভয়’-এর গল্প—দেখা যাবে কার রচনা সবার চেয়ে ভালো হয়। সেই প্রতিযোগিতার ফল এই উপন্যাস।

    আঠারো-উনিশ শতকের ইউরোপে এই ধরনের রহস্যময় আখ্যান-বীজ নিয়ে উপন্যাস ও দীর্ঘ-কবিতা লেখার বেশ প্রচলন ছিল। ম্যারি শেলি-র ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন অর দ্য মডার্ন প্রমিথিউস’ উপন্যাসের পরিকল্পনায় ফ্র্যাংকেনস্টাইন ক্যাস্ল্-এর অনুষঙ্গ ছিল আরও বিস্তৃত। জনশ্রুতি ছিল যে, জোহান কনরাড ডিপেল একটি জৈব রাসায়নিক তরল প্রস্তুত করেছিলেন যা ছিল জীবনদায়ী। এই তরলটির প্রস্তুত-প্রক্রিয়ার বিক্রয়মূল্যে তিনি ফ্র্যাংকেনস্টাইন ক্যাস্ল্ কিনতে চেয়েছিলেন কিন্তু দুর্গের মালিক রাজি হননি। আর একটি প্রচলিত গল্প ছিল যে, ডিপেল সেই দুর্গে শবব্যবচ্ছেদের কাজও করতেন। প্রাণদায়ী রাসায়নিক তরলের পরীক্ষা করতে করতে তিনি এক মৃত ব্যক্তিকে পুনর্জীবিত করেছিলেন। সেই গ্রামের ধর্মযাজক গ্রামবাসীদের সতর্ক করে বলেছিলেন যে, ডিপেল সৃষ্টি করেছেন এক দানব (মন্স্টার) যার শরীরে প্রাণ সঞ্চারিত হয়েছে বিদ্যুৎ-প্রবাহের দ্বারা।

    দেখা যাচ্ছে ‘ফ্র্যাংকেনস্টাইন…’ উপন্যাসে ম্যারি শেলি সূত্রপাত অংশের প্রতিবেশ বিন্যাসে অনেকটাই ব্যবহার করেছেন ফ্র্যাংকেনস্টাইন দুর্গ-কে। দ্বিতীয় অংশে আখ্যান চলেছে নিজের পথে।

    আঠারো-উনিশ শতকে পাশ্চাত্য উপন্যাস ও গল্পের একটি প্রচলিত গঠন-শৈলী ছিল পত্ররীতি। এই উপন্যাসও ক্যাপটেন রবার্ট ওয়লটন এবং তাঁর বোন মার্গারেট ওয়লটন-এর পত্র-বিনিময়ের মাধ্যমে কথিত। কালের দিক থেকে আখ্যানটি অষ্টদশ শতকের।

    রবার্ট ওয়লটন এক লেখক, যিনি লেখার জগতে প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে পারেননি। বিজ্ঞান-সাধনার উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি উত্তর মেরু যাত্রা করেন। যাত্রাপথে তাঁর জাহাজের নাবিকেরা এক বিশালদেহী ব্যক্তিকে দেখতে পায়। ব্যক্তিটি স্লেজ নিয়ে কোথাও যাচ্ছিল। আরও কয়েক ঘন্টা পরে তারা বরফে জমে যাওয়া এক ব্যক্তিকে উদ্ধার করে। জ্ঞান ফিরে আসবার পরে ব্যক্তিটি জানান যে, তাঁর নাম ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন। তিনি একজন বিজ্ঞানী। সেই বিশাল শরীরের মানুষটিকে সৃষ্টি করেছেন তিনিই এবং তাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ওয়লটন-এর মধ্যে ভিক্টর দেখতে পান সেই একই নেশা যা তাঁকে ঘরছাড়া করেছে এবং সংকটাপন্ন করে তুলেছে তাঁর জীবন। এর পর ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন তাঁর জীবনকথা শোনান রবার্ট ওয়লটন-কে। এখানে দেখি আঠারো-উনিশ শতকের পাশ্চাত্য উপন্যাস কথনের আরও একটি রীতি গ্রহণ করেছেন ম্যারি শেলি—তা হল ‘টোয়াইস টোল্ড টেল’ পদ্ধতি।

    এখানে আখ্যান-কথক পাঠক-শ্রোতাকে গল্পটি সরাসরি বলেন না; অপর কারও কাছ থেকে শ্রুত বা অন্য কোনও ব্যক্তির ডায়রি-তে পাওয়া বিবরণ তুলে ধরেন। এইভাবে ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন যে গল্প রবার্ট ওয়লটনকে বলেছেন—সেটি লিপিবদ্ধ করেছেন ম্যারি শেলি। ভিক্টর-এর গল্পটি শোনা যাক।–

    ইটালি-র নেপ্ল্স প্রদেশে এক ধনী পরিবারে তাঁর জন্ম। জার্মানির এক বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অধ্যয়ন। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ভিক্টর অল্পদিনেই সহপাঠীদের ছাড়িয়ে যান। তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন প্রাচীন রসায়নবিদ্যা অর্থাৎ ‘অ্যালকেমি’-তে। তৈরি করতে চান এক নতুন মানুষ। এখানেই আখ্যানে প্রমিথিউস ধারণার প্রবেশ। উপন্যাসে এই ভিক্টর ফ্র্যাংকেনস্টাইন-কেই ‘প্রমিথিউস’ আখ্যায় অভিহিত করা হয়েছে। উপন্যাসটির নাম ‘ফ্র্যাংকেনস্টাইন অর দ্য মডার্ন প্রমিথিউস’। প্রাচীন ও পৌরাণিক প্রমিথিউস মানুষের জন্য আগুন হরণ করেছিলেন স্বর্গ থেকে। আগুনের ব্যবহার সম্পর্কিত জ্ঞান মানুষের সভ্যতাকে অনেকখানি অগ্রসর করে দিয়েছিল। প্রমিথিউস গড়েছিলেন নতুন মানুষ—যারা নব শক্তিতে বলীয়ান। আগুন করায়ও করবার আগের যুগের মানুষ ছিল দুর্বল ও দৈব শক্তির দ্বারা উৎপীড়িত। এভাবেও প্রমিথিউসকে দেখা হয়। এজন্যই ম্যারি শেলির উপন্যাসে নতুন মানুষের স্রষ্টা ফ্র্যাংকেনস্টাইন-কে ‘মডার্ন প্রমিথিউস’ বলা হয়েছে।

    ম্যারি শেলি তাঁর উপন্যাসে অতঃপর যে ঘটনা ধারার বিবরণ দিয়েছেন তা সম্পূর্ণই তাঁর নিজস্ব উদ্ভাবন। ভিক্টর ফ্র্যাংকেনস্টাইন এক নতুন মানবশরীর নির্মাণ করলেন কিন্তু বিভিন্ন প্রত্যঙ্গের প্রতিস্থাপনে অনভিজ্ঞতার কারণে সেই মানুষ হল আট ফুট দীর্ঘ, বিশাল শরীর এবং ভয়ঙ্করদর্শন। ভিক্টর ফ্র্যাংকেনস্টাইন তাঁর নিজের নাম অনুসারে এই প্রাণীর নামকরণ করলেন ফ্র্যাংকেনস্টাইন। এর পর থেকে বিজ্ঞানীকে ভিক্টর ও তাঁর সৃষ্ট প্রাণীকে ফ্র্যাংকেনস্টাইন নামে অভিহিত করা হবে। কিন্তু নিজের সৃষ্টির রূপ দেখে ভীত ভিক্টর পলায়ন করলেন। এক সময়ে আবিষ্কার করলেন যে, ফ্র্যাংকেনস্টাইন মানুষ খুন করেছে কিন্তু তিনি আসল রহস্য প্রকাশ করতে পারলেন না।

    হঠাৎ একদিন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল তাঁর সৃষ্টির। ক্লান্ত, বিষণ্ণ ফ্র্যাংকেনস্টাইন নিজের কথা শোনায় তার স্রষ্টাকে। ক্ষুধার্ত, পলাতক ফ্র্যাংকেনস্টাইন একটি জীর্ণ কুটিরে ঢুকে পড়ল যেখান থাকে এক অতি দরিদ্র পরিবার। সে তাদের সাহায্য করতে লাগল বিভিন্নভাবে। তাদের ভাষা শুনে কথা বলতেও শিখে নিল, পড়তে শিখল নিজের চেষ্টায়। এই সময়ে জলে নিজের ছায়া দেখে সে বুঝল—কেন তাকে লোকে ভয় পায়। মানুষের উপকার করতে গিয়ে সে বারবার লাঞ্ছিত হয়েছে মানুষেরই কাছে। তার কারণ তার স্রষ্টা তাকে স্বাভাবিক আকৃতি দিতে পারেননি। কাজেই স্রষ্টা ভিক্টর-এর উপর তার ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক।

    উপন্যাসে এর পর ঘটেছে অনেক ঘটনা। বহু ঘটনাবহুল আখ্যান রচনার একটি ধারা আঠারো-উনিশ শতকের পাশ্চাত্য উপন্যাসে ছিল। অনেক ঘটনা অনেক চরিত্র এবং অনেকটা কালপরিসর-ব্যাপ্ত সেই আখ্যানগুলিতে যেমন একদিকে থাকত মিস্ট্রি আর ভায়োলেন্স, অন্যদিকে তীব্র প্যাশন। এই ধারারই অনুবর্তী ম্যারি শেলি-র এই কাহিনি।

    ভিক্টর কৃতসংকল্প হন যে, তিনি যেভাবেই হোক ফ্র্যাংকেনস্টাইন-কে তার মানববিরোধী কার্যকলাপ থেকে নিবৃত্ত করবেন, অথবা তাকে হত্যা করবেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে ভিক্টর-এরই মৃত্যু হল আগে, ওয়লটন-এর জাহাজেই। মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ কথা ছিল—‘প্রশান্তিতেই আনন্দ খুঁজে নাও, ত্যাগ করো উচ্চাকাঙ্ক্ষা’। রোমান্টিক যুগের একটি বাণী এইভাবে গেঁথে দেওয়া আছে ভিক্টর-এর সংলাপে। মনে রাখতে হবে উপন্যাসের নামকরণেই ভিক্টর ফ্র্যাংকেনস্টাইন-এর পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘মডার্ন প্রমিথিউস’- আখ্যায়। একালের প্রমিথিউস মানুষের জন্য আগুনের পরিবর্তে এই শিক্ষাই দিতে চান—‘উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করো, সন্ধান করো শান্তি’—একথাই কি বলতে চেয়েছিলেন ম্যারি শেলি? সেই ১৮১৮-তে কুড়ি বছর বয়সের মেয়েটি?

    এর পরেও উপন্যাস শেষ হয় না। ওয়ল্টন দেখতে পান ফ্র্যাংকেনস্টাইন তাঁর জাহাজে উঠে এসেছে। ভিক্টর-এর দেহের উপর পড়ে শোকবিলাপ করছে সে। ওয়লটনকে ফ্র্যাংকেনস্টাইন-এর শেষ স্বীকৃতি - নিজের কৃতকর্মের জন্য সে অন্তরে বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। অগ্নিদহনে সে শেষ করে দেবে নিজেকে। ফ্র্যাংকেনস্টাইন চলে যায় ওয়ল্টন-এর দৃষ্টিসীমার বাইরে—জমাট বরফের উপর দিয়ে। এই হল উপন্যাসের শেষ দৃশ্য।

    খুবই অর্থবহ এই উপন্যাস। ভিক্টর ফ্র্যাংকেনস্টাইন হলেন একালের প্রমিথিউস—যিনি মানুষকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন পুরাণের প্রমিথিউস-এর মতোই। গড়তে চেষ্টা করেছিলেন নতুন মানুষ। কিন্তু সেই নতুন মানুষ ফ্র্যাংকেনস্টাইন হয়ে উঠল ভয়ংকর—যেন এযুগের সভ্যতার মানুষের মতোই। (এযুগ বলতে অবশ্য এখানে উনিশ শতকের প্রথম দুই দশক বুঝতে হবে।) ভুল সংশোধন করবার চেষ্টায় এক সময়ে মৃত্যু হল ভিক্টর-এর। তাঁর সৃষ্টি করা নতুন মানুষ হয়েছে অসম্পূর্ণ, নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেনি সমাজের সঙ্গে; ফলে সাধিত হয়েছে তার নিজের এবং সমাজের ক্ষতি। অবশেষে আত্মগ্লানি-বিদ্ধ ফ্র্যাংকেনস্টাইন নিজেকে বিসর্জন দিতে চেয়েছে আগুনে। যে-আগুন একদিন মানুষের উপকারের জন্য এনে দিয়েছিলেন পুরাণের-প্রমিথিউস। ম্যারি শেলি-র এই উপন্যাস তাই পরবর্তী কালের আলোচকদের কাছে আধুনিক মানুষের হতাশার কথাবয়ন রূপে, আধুনিক সভ্যতার মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি রূপে প্রতিভাত হয়েছে।

    নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার অন্তরের বাণীর সঙ্গে এই উপন্যাসের পরিণামী উপলব্ধি মেলে না ঠিকই; কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়াবার চিরকালীন মানবীয় আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরে এই কবিতা এবং একরকমভাবে উপন্যাসটিও।

    এর পরেই ১৮২০-তে প্রকাশিত হল পার্সি বিশি শেলি-র ‘প্রমিথিউস আনবাউন্ড’ কাব্যনাট্য। চার অঙ্কের এই কাব্যনাট্য গ্রিক পুরাণ এবং ইসকাইলাস-এর নাটকের অনুসরণেই পরিকল্পিত হয়েছে। প্রমিথিউস-এর চরিত্রে মানুষের পাশে দাঁড়াবার যে সংকল্প এবং উৎপীড়ক দেবরাজ জিউস-এর বিরুদ্ধে যে নির্ভীক ও অবিচলিত অবস্থান—তার সঙ্গে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কথকের যে মৌল সাদৃশ্য, সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই শেলি ও নজরুল ইসলামের এই দুটি অমর সৃষ্টিকে সমান্তরাল ভাবে পাঠ করা যায়। কিন্তু প্রমিথিউস-পরম্পরার সঙ্গে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রধান পার্থক্য এই যে, জিউস-এর বিধানে প্রমিথিউস-এর শাস্তিস্বরূপ প্রবল যন্ত্রণাকাতর যে ট্র্যাজিক মূর্তি উপস্থাপিত তার সঙ্গে বিদ্রোহী নায়কের মিল নেই। নজরুলের বিদ্রোহী এক সর্বব্যাপ্ত প্রাণশক্তি, সে ‘মুক্ত জীবনানন্দ’; পার্থিব অস্তিত্বের প্রতিটি কণিকায় তার উল্লসিত উপস্থিতি; সে কোনও বন্ধন ও শাসন স্বীকার করে না। স্বৈরতন্ত্রকে সে সর্বতোভাবে ধ্বংস করতে চায়। সেই সঙ্গেই সে সুন্দরের পূজারি, প্রেমের উপাসক এবং উৎপীড়িতের প্রতি সহমর্মী। দুটি চরিত্রের এই স্বতন্ত্র অবস্থানও মনে রাখতে হবে।

    শেলি-র কাব্যের প্রথম অঙ্কেই পর্বতশিখরে শৃঙ্খলিত প্রমিথিউস-এর সঙ্গে আকাশ, সমুদ্র, সূর্য, মৃত্তিকার যে একাত্মতা ব্যক্ত হয়েছে তার সঙ্গে নজরুলের কবিতার বিদ্রোহী সত্তার সাজুয্য পাই—“মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি / চন্দ্রসূর্য গ্রহতারা ছাড়ি / ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া / খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া / উঠিয়াছি চিরবিস্ময় আমি বিশ্ববিধাত্রীর”—যদিও মহাবিশ্বের সঙ্গে এই সংযোগের ধরণটি দুটি লেখায় একজাতীয় নয়। প্রমিথিউস মিথ-এর অন্তরের কথাটি হল মানবকল্যাণে প্রাণ উৎসর্গ করা ট্র্যাজিক নায়কের প্রতিষ্ঠা; ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কেন্দ্রীয় উপলব্ধিতে উৎপীড়িতের প্রতি সহমর্মিতার সঙ্গে মিশে আছে সব অনুশাসন অগ্রাহ্য করা উদ্দামতা।

    তবে শেলি-র কাব্যনাট্যের শেষ তিনটি পঙ্‌ক্তিতে প্রমিথিউস সম্পর্কে ডেমোগর্গন-এর উক্তিও বেশ ভাববার মতো। এই কাব্যনাট্যে বন্দি প্রমিথিউস-এর সঙ্গে যারা কথা বলেছে তাদের মধ্যে যেমন আছে আকাশ, ধরিত্রী, সূর্য ও সমুদ্রকন্যারা, সেই সঙ্গে আছে ডেমোগর্গন। পুরাকথায় উল্লেখিত এই চরিত্রের পরিচয় হল ‘অ-শরীরী পৃথিবীর অধীশ্বর’, শেলি-র ভাষায় ছায়া-জগতের ‘সুপ্রিম টাইর‍্যান্ট’। সে বিশ্বের অশুভ শক্তির কথা বলে, অমোঘ ভবিতব্যের কথা বলে। এই ডেমোগর্গন-ই উচ্চারণ করেছে ‘প্রমিথিউস আনবাউন্ড’ কথানাট্যের অন্তিম বাক্য। সেই বার্তা কিন্তু হতাশার নয়; সেই বার্তা প্রমিথিউস-এর কল্যাণ-শক্তির জয় ঘোষণা করেছে।–

    Neither to change, nor falter, nor repent
    This, like thy glory, Titan, is to be
    Good, great and joyous, beautiful and free;
    This is alone Life, Joy, Empire, and Victory
    এই পঙ্‌ক্তিগুলি ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মর্মবাণীও স্মরণ করিয়ে দেয়। ‘গ্রেট টাইটান’ প্রমিথিউস নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’-র মতোই

    ‘জগদীশ্বর ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য’ (গ্রেট)

    আমি নৃত্যপাগল ছন্দ
    আমি আপনার তালে নেচে যাই আমি মুক্ত জীবনানন্দ (জয়-আস)

    আমি ইন্দ্রাণী সূত হাতে-চাঁদ ভালে-সূর্য,
    মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য (বিউটিফুল)

    আমি চিনেছি আমারে আজিকে আমার খুলিয়া
    গিয়াছে সব বাঁধ (ফ্রি)

    আমি সেইদিন হব শান্ত,
    যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না (গুড)

    আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি এক
    চির উন্নত শির। (ভিক্টরি)

    শেলি নিজেই মিলটন রচিত ‘প্যারাডাইজ লস্ট’ কাব্যের ‘স্যাটান’-এর সঙ্গে প্রমিথিউস-এর তুলনা করেছেন। সপ্তদশ শতকের কবি জন মিল্টন (১৬০৮-১৬৭৪) ‘প্যারাডাইজ লস্ট’ (রচনা ১৬৫৮-১৬৬৪, প্রকাশ ১৬৬৭) কাব্যে সর্বাধিপতি স্বৈরশাসক ঈশ্বরের প্রতিস্পর্ধী রূপে স্যাটান-এর চরিত্রকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন স্যাটান-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল পরাধীনতাকে অস্বীকার করে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় শাস্তি বরণ করে নেওয়া। কিন্তু সেই শাস্তি তার মনোবলকে ক্ষুণ্ণ করেনি। এই সব বৈশিষ্ট্যই আছে প্রমিথিউস-এর মধ্যে। কিন্তু তার মধ্যে আছে আরও কিছু গুণ যা স্যাটান-এর মধ্যে নেই। কাব্যনাট্যের ভূমিকায় শেলি নিজেই তাঁর এই ভাবনাকে ব্যক্ত করেছেন—

    The only imaginary being, resembling in any degree Prometheus is Satan; and Prometheus is in my judgment, a more poetical character than Satan, because in addition to courage, and majesty and firm and patient opposition to omnipotent force, he is susceptible to being described as exempt from the taints of ambition, envy, revenge and a desire for personal aggrandizement, which, in the hero of Paradise Lost, interfere with the interest.
    শেলি আদর্শ মানবদরদি চরিত্র প্রমিথিউস-এর সঙ্গে স্যাটান-এর (স্যাটান-কে, অন্তত মিল্টন-এর স্যাটানকে ‘শয়তান’ বলতে মন সায় দেয় না। এই চরিত্র মিল্টন-এর নিজস্ব সৃষ্টি।) পার্থক্য যথার্থভাবেই নির্দেশ করেছেন। বলেছেন - স্যাটান-এর মতো সাহস, রাজকীয়তা (ম্যাজেস্টি) এবং ঈশ্বরের সর্বাধিপত্যের সামনে অবিচলিত বিরুদ্ধতার শক্তি প্রমিথিউস-এর ছিল। কিন্তু তার ছিল না স্যাটান-এর উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ঈর্ষা, প্রতিশোধস্পৃহা এবং অহংকার। প্রমিথিউস-এর সঙ্গেই নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’র অন্তঃসাদৃশ্য অনুভব করেছি আমরা। কিন্তু শেলি-র এই কথাগুলি শোনবার পর আমাদের মনে হয় ‘বিদ্রোহী’-র চরিত্রে ‘স্যাটানিক কোঅলিটি’—স্যাটান-এর বৈশিষ্ট্যও কিছু কিছু মিশে আছে-

    আমি      চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
    মহা      প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস,
    আমি      মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর
    আমি      দুর্বার
    আমি      ভেঙে করি সব চুরমার!
    আমি      অনিয়ম, উচ্ছৃঙ্খল,
    আমি      দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!

    ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সঙ্গে আর একটি ইংরেজি কবিতার প্রতিতুলনা চোখে পড়েছিল একসময়। সূত্র কাজী আবদুল ওদুদ। প্রথমে ওদুদ-এর উক্তি—“নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা অতি উচ্চশ্রেণির কবিতা, কবিতাটি পড়িতে পড়িতে পাঠকের বুক ফুলিয়া ওঠে, মাথা উঁচু হয়। শেষের দিকে কিয়দংশ পড়িলে সুইনবার্ন রচিত Hertha মনে পড়ে। কিন্তু ওই Hertha অপেক্ষা ‘বিদ্রোহী’ অনেক উচ্চে”। (বঙ্গবাণী, চৈত্র, ১৩২৮ বঙ্গাব্দ, মার্চ-এপ্রিল, ১৯২২) প্রবন্ধটির প্রকাশকাল ১৯২২-এর মার্চ-এপ্রিল; অর্থাৎ ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের (জানুয়ারি ১৯২২) ঠিক পরেই।

    ‘হার্থা’ কবিতার লেখক অ্যালগারনন চার্লস সুইনবার্ন (Algernon Charles Swinburne, ১৮৩৭-১৯০৯) ছিলেন উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের সুপরিচিত ব্রিটিশ কবি। তিনি কবিতা, নাটক, উপন্যাস এবং সাহিত্য সমালোচনা লিখতেন। ব্যক্তিজীবনের প্রথম পর্বে ছিলেন মদ্যপানে আসক্ত এবং উত্তেজনাপ্রবণ। ফলে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। ১৮৮০-র কাছাকাছি সময় থেকে এক সহৃদয় বন্ধুর নিরন্তর সেবা ও সহায়তায় সুইনবার্ন সত্তর বছরের বেশি জীবিত ছিলেন। কবিরূপে সুইনবার্ন ছিলেন শক্তিমান, সাহসী এবং ব্যাপ্ত ও বিচিত্র কল্পনাশক্তির অধিকারী। মাঝে মাঝে এমন বিষয়বস্তু নিয়ে কবিতা লিখতেন যা সেই যুগে সাধারণত লেখা হত না। যেমন সমকামিতা, নরমাংস ভক্ষণ, ঈশ্বর বিরুদ্ধতা ইত্যাদি। তাঁর কবিতায় ধ্রুপদী কল্পনার স্পর্শ থাকত। অনেকেই তাঁকে প্রাচীন গ্রিক কবি সাপ্ফো এবং কাতুল্লুস-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। সাপ্ফো ছিলেন পঞ্চম খ্রিস্টপূর্বাব্দের মহিলা কবি, তিনি লেসবিয়ান বা সমকামী বলে পরিচিত। মোটের ওপর সুইনবার্ন উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ এবং উনিশ-বিশ শতকের সন্ধিক্ষণে একজন গুরুত্বপূর্ণ কবিরূপে স্বীকৃত। তাঁর কবিতা-সংকলন ‘সঙস্ বিফোর সানরাইজ’ (১৮৭১)-এর অন্তর্ভুক্ত দীর্ঘ কবিতা ‘হার্থা’ (প্রায় ‘বিদ্রোহী’-র মতোই আকার)।

    ‘হার্থা’ ছিলেন দেবী। তাঁকে ধরিত্রীমাতার প্রতীকরূপে দেখা হয়েছে। অভিধানে তাঁকে বলা হয়েছে ‘টিউটনিক গডেস অব ফার্টিলিটি’ অর্থাৎ উর্বরতার দেবী। সুইনবার্ন-এর 'হার্থা' কবিতায় তাঁকে দেবী ধরিত্রী, ধরিত্রী মাতা অর্থাৎ মাদার আর্থ-রূপেও কল্পনা করা হয়েছে। এই দেবী হার্থা স্বর্গের শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন; নিজের শক্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দীপ্ত তেজের সঙ্গে। তাঁর কবিতায় বার বার ‘আই অ্যাম’ শব্দের প্রয়োগ আছে। এখানেই ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সঙ্গে কিছু কিছু ভাবসাদৃশ্য অনুভূত হয়। হার্থা ‘পেগান গডেস’ অর্থাৎ বহুদেববাদী বিশ্বাসের তিনি প্রতিনিধি। এই বিশ্বাস গ্রিক মিথোলজিক্যাল দেবতাদের প্রাধান্য স্বীকার করে না। খ্রিস্টধর্মের ঈশ্বর-ধারণারও তিনি বিরোধী। অর্থাৎ পুরাকথায় দেবকুলের আধিপত্য তিনি স্বীকার করেন না। আবার খ্রিস্টধর্মে যে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কথা বলা হয়েছে তাঁরও আনুগত্য করতে তিনি প্রস্তুত নন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মতোই বার বার তাঁর কবিতায় ‘আই অ্যাম’ শব্দবন্ধে নিজের সগর্ব উপস্থিতির জানান দেওয়া হয়েছে। কাজেই সামগ্রিক গঠনে ‘হার্থা’ কবিতার সঙ্গে বিদ্রোহী কবিতার কিছু সাদৃশ্য আছেই। দেবী হার্থা-র উক্তিতেও সেই আত্মশক্তির প্রতিষ্ঠা, যা আছে নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়।

    ‘হার্থা’-র সঙ্গে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার এবং প্রমিথিউস-কল্পনার আরও একটি সাদৃশ্য আছে। হার্থা ঈশ্বরের আধিপত্যের বিরুদ্ধে পার্থিব প্রাণীর পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। এমনই স্বাভাবিক, তিনি জননী ধরিত্রী, কাজেই মানব প্রজাতি তাঁর প্রিয়। সেই সঙ্গে বিশ্বের যাবতীয় মরণশীল প্রাণীকুলও তাঁর একান্ত আপন।

    চল্লিশ স্তবকে গঠিত ‘হার্থা’ কবিতাটি থেকে কয়েকটি স্তবক উদ্ধৃত হল-

    Beside or above me
    Nought is there to go;
    Love or unlove me,
    Unknow me or know,
    I am that which unloves me and loves; I am stricken, and I am the blow.
    আমার পাশে বা আমার উপরে
    কোথাও যাবার জায়গা নেই;
    ভালোবাসো আমাকে অথবা বেসো না,

    আমাকে জানো অথবা জানো না,
    আমি সে-ই যে আমাকে ভালোবাসে না এবং বাসে;
    আমি সে-ই যে আঘাতে বিদ্ধ,
    এবং স্বয়ং আঘাত।
    I am in thee to save thee,
    As my soul in thee saith;
    Give thou as I gave thee,
    They life-blood and breath,
    Green leaves of thy labour, white flowers of thy thought and red fruit of thy death
    তোমার মধ্যে আমি আছি তোমাকে ত্রাণের জন্য,
    তোমার ভিতরে কথা বলে আমার অন্তরাত্মা,
    নিজেকে দাও যেমন আমি দিয়েছি তোমাকে,
    তোমার জীবনদায়ী রক্ত এবং শ্বাস,
    সবুজ পল্লব তোমার শ্রমের, তোমার ভাবনার শুভ্র কুসুম,
    আর তোমার মৃত্যুর রক্তিম ফল
    The storm-winds of ages
    Blow through me and cease,
    The war-wind that rages,
    The spring-wind of peace,
    Ere the breath of them roughen my tresses, ere on of my blossoms increase. সময়ের ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যায়
    আমার ভিতর দিয়ে এবং থেমে যায়
    যুদ্ধের হাওয়া ক্রুব্ধ,
    বসন্ত-বায়ু শান্তির,
    রুক্ষ তাদের শ্বাস-প্রশ্বাস আমার শরীরে লাগে
    ফুটে ওঠে ফুল আমার, আরও ফুল, আরও ফুল। তবে হার্থা কবিতার সঙ্গে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার অমিলও আছে। হার্থা কবিতায় কথকের সৃষ্ট দেবীকল্পটি স্পষ্ট। তিনি ধরিত্রী দেবীরূপে অন্য দেব-শক্তির বিরুদ্ধে পার্থিব প্রাণীকুলকে রক্ষা করছেন। নজরুল ইসলামের কবিতার মধ্যে উৎপীড়ক ও উৎপীড়িতের সার্বিক অবস্থানে সর্বদাই উৎপীড়িতের পক্ষে যাবার বাণী ‘হার্থা’ কবিতার কেন্দ্রীয় অনুভূতি নয়। এজন্যই সম্ভবত কাজী আবদুল ওদুদ ‘হার্থা’ কবিতার তুলনায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতাকে উচ্চশ্রেণির বলে মনে করেছিলেন। আমরা যদিও এভাবে কবিতা দুটির তর-তম বিচার করব না। দুটি কবিতার কেন্দ্র-ভাবনা কিছু পৃথক। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় আত্মশক্তির প্রবল বিস্ফোরণের সঙ্গে সেই আত্মশক্তিকে নিপীড়িতের পাশে স্থাপন করেছেন কবি। এটিই ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মূলভাব। এই কবিতার কথক ‘চিরবিদ্রোহী বীর’। কিন্তু ‘হার্থা’ কবিতার মূলভাব হল—আধিপত্যকামী দৈবশক্তির হাত থেকে পার্থিব প্রাণীকুলকে রক্ষা করবার প্রতিভা—কারণ হার্থা হলেন ধরিত্রী মাতা। তাহলেও সমান্তরাল পাঠে অবশ্যই দুটি কবিতাকে রাখা চলে। উৎপীড়কের অত্যাচারের বিরুদ্ধে উৎপীড়িতকে রক্ষা করবার বার্তা আছে দুটি কবিতাতেই।

    ‘বিদ্রোহী’ কবিতার এই কেন্দ্রীয় উপলব্ধির সমুজ্জ্বল উদ্দীপনা এভাবেই বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন শিল্পসংরূপের সঙ্গে মিলে যায়। অত্যাচার ও তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ—এই দুই-এর সম্পর্কের দ্বন্দ্বময়তাই এগিয়ে নিয়ে যায় মানুষের জীবনকে।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)