• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০১ | জানুয়ারি ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • পম্পা বিশ্বাস: অন্তর্জীবনের নিভৃত কথক : শর্মিষ্ঠা সিংহ

    রোরো ও অন্যান্য গল্প — পম্পা বিশ্বাস ; পরম্পরা প্রকাশন, কলকাতা, প্রচ্ছদ – পম্পা বিশ্বাস; প্রথম প্রকাশ—ফেব্রুয়ারি ২০১৫; ISBN: 978-93-80869-22-3

    পম্পা বিশ্বাসের প্রথম গল্প ‘ওরা’ আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয় বিভাগে প্রকাশিত হয় ১৮-ই এপ্রিল ২০০৪। পরবর্তী দুই দশকে তাঁর বলিষ্ঠ,অভিনব ও ব্যতিক্রমী ভাবনার বেশ কিছু ছোটগল্প নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। পম্পার ভাষা ব্যবহার ও আঙ্গিক নির্মাণের দক্ষতা প্রথম গল্প থেকেই আশ্চর্যজনকভাবে পরিণত। কিন্তু তাঁর রচনার স্বল্পতা আমাদের ব্যথিত করে। প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ “রোরো ও অন্যান্য গল্প” -তে সংকলিত হয়েছিল পনেরোটি গল্প। ২০০৪ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত গল্পের এই সংকলন আত্মপ্রকাশ করে ২০১৫-এ ‘পরম্পরা প্রকাশনী থেকে। সাত বছরের ব্যবধানে ‘দে’জ পাবলিশিং’- এর পরিবেশনায় প্রকাশিত হয় ওঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ “আতাবাবু ও অন্যান্য গল্প”। সংকলিত গল্পের সংখ্যা ২২। এই ৩৭টি রচনাকে সঙ্গী করে আমরা পম্পা বিশ্বাসের লেখক সত্তা ও তাঁর লেখালেখির জগৎটি চিনতে চেষ্টা করবো।

    পম্পা বিশ্বাস অন্তর্মুখী লেখিকা,সাহিত্যের নির্জন পথের যাত্রী। নিঃসঙ্গ,পীড়িত এবং বিকৃত মানবমনের অতলে অবগাহন করে তিনি রহস্য সন্ধান করেছেন। ‘বিকার’ শব্দটি অবশ্য এখানে আপেক্ষিক, কারণ এক যুগে যা বিকার, পরবর্তী যুগের মানদণ্ডে তা স্বাভাবিক বলে গণ্য হতে পারে। মানবেতিহাসে এর দৃষ্টান্ত বিরল নয়। তবুও চিরকালীন কিছু সত্য থাকে যার অন্যথাকে আমরা ‘বিকার’ আখ্যা দিই।

    দুটি সংকলনের বেশ কিছু গল্পের কেন্দ্রবিন্দু ভয় — ফোবিয়া। অযৌক্তিক, ব্যাখ্যাতীত,রক্তের ভিতর দিয়ে প্রবহমান এক অনুভূতি এই গল্পগুলির প্রধান নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি। ‘ওরা’-তে দেওয়ালে বিচরণকারী নিরীহ সরীসৃপটি বারবার আছড়ে পড়েছে ভীরু মেয়েটির শান্ত, নির্বিবাদী অবস্থানে। তার নীরব পদসঞ্চারে ভেঙে গেছে মেয়েটির কষ্টার্জিত আত্মবিশ্বাস, প্রতিরোধ ও প্রশান্তি। বিনিদ্র রাত্রিযাপনের অসহায়তা থেকে পরিত্রাণ পেতে সে খুঁজে চলে পুরোনো প্রেসক্রিপশনে ঘুমের ওষুধের হদিশ। ‘রোরো’ গল্পে সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া রোরো কিন্তু ঘুমের প্রশান্তি চায় না। মা’র প্রতি তার তীব্র ঘৃণা, সন্দেহ,অবিশ্বাস ও ভয় লোহার হাতুড়ি হয়ে বালিশের নিচে প্রস্তুত থাকে। মাকে ঘিরে এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক অন্ধকার এ গল্পের আদ্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে । ‘নিখোঁজ’ গল্পে ভীত পুরুষতন্ত্রের শিকার নববধূ রুমা। মধুচন্দ্রিমায় স্বয়মাগতা, প্রণয়প্রার্থিনী নারীটিকে স্বামীর মনে হয়েছে ‘রাক্ষসীরানী ‘, তাকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়ে নির্দায় হতে চেয়েছে সে। এই গল্পে অতিপ্রাকৃতের আভাস রয়েছে। ‘যুদ্ধ ও শান্তি’গল্পের অরুণ জ্বরতপ্ত শরীরে ছুটে গেছে বোনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাড়িতে,মৃত্যুভয় সারারাত বিড়ালের থাবায় ধরা ইঁদুরের মতো তাকে নিয়ে খেলা করেছে,তারপর ভোরবেলা শরীর দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে বিজয়ীর মতো সগর্বে বিদায় নিয়েছে। তখনও ঘরে ‘গিসগিস‘ করে চলছিল ঠান্ডা মেশিন।’সমন’গল্পের রাতুলের ভয় তার প্রতিবাদী অতীতকে। ‘কালচে ছোপ’ গল্পের দিদি চিরকাল অজ্ঞাত কারণেই ভয় পেয়ে এসেছে কৃষ্ণাভ জিহ্বাকে। তার সমস্ত শঙ্কা সত্যি করে স্থির ও অবিচল লক্ষ্যে কালচে জিভ নিজের গহনে টেনে নিয়েছে আদরের ভাইকে। রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতা, চক্রান্ত এই গল্পে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

    অন্য স্বাদের গল্প ‘প্রস্থান’। মধ্যবয়সী তপতী অনুভব করে তার ‘সমস্ত অবয়বে প্রবল প্রাণশক্তিময় সৃষ্টিশীলতা ঝলমল করছে।’ মুখে মুখে ছড়া কেটে সকলকে ব্যতিব্যস্ত করে,রাগিয়ে তুলে নিজের সৃষ্টিশীলতাকে সে সার্থক করতে চায়। শেষে বাড়ির লোক মানসিক ভারসাম্যহীন এই মূর্তিমান অশান্তিটিকে পাগলাগারদে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত হয়।

    ‘বেলজার ‘, ‘মস্তি’ নগরজীবনের কুশ্রীতা,দৈন্য ও ব্যর্থতার বাণীরূপ। রূপা ও ভাস্কর কয়েকঘণ্টার নিভৃতি চেয়েছিল হোটেলের কদর্য, ঘুপচি ঘরে, অথচ রূপার মন পড়ে থাকে ‘ময়দানের সারি সারি রাধাচূড়ার তলায় পুরু হলুদ জাজিমের নির্জন’ শয্যায়।

    ‘সে ও তোতা’ গল্পে আত্মবিশ্বাসহীন, ভীরু তোতা ফুটপাতবাসিনী উদ্ধত রমণীর মধ্যে খুঁজে পায় বিপ্রতীপ ব্যক্তিত্ব। মেয়েটির বেপরোয়া, ঋজু ভঙ্গি পেনসিলের আঁচড়ে ধরে রাখার জন্য তার হাত নিশপিশ করে। এমনই রেখাগুচ্ছ আরও একটি তরুণীকে সম্মোহিত করেছিল ‘কমলা রঙের রোদে পরিপক্ক’কোনো এক দিনে ট্রামলাইন থেকে ম্যাজিকের মতো উঠে এসে। তারপর ব্লেড আর আলপিনের সূক্ষ্ম আঁচড়ে কালচিটে টেবিলের উপর মেয়েটি ফুটিয়ে তুলত প্রবাহমান অগনিত রেখার অন্তহীন যাত্রা। একদিন সেই সব রেখার সারি তাকে ছেড়ে চলে গেল,ফিরেও এলো আবার আরো আত্মবিশ্বাসী হয়ে। সজীব-নির্জীব সব কিছুর মধ্যেই মেয়েটি তখন তাদের আবিষ্কার করে ফেলেছে। (‘রেখায় রেখায়’)

    ‘হনন’ গল্পে বিশাখা সেনের প্রগলভতা, অতিরিক্ত উচ্ছলতার পিছনে যে মধ্যবয়সিনীর অসহায়, প্রণয়ভিক্ষু রূপটি ছিল লেখিকা তাকে বড় সজীবভাবে উপস্থাপিত করেছেন। ‘তিনজনে’ বেঁচে থাকার টুকরো আনন্দের গল্প। মোহনগাজীর বিলে পরিযায়ী পাখি দেখতে গিয়ে ভারী ঠকে যায় তিন বান্ধবী, সম্পর্কে তারা সহকর্মী। খবরের কাগজের নয়নমনোহর দৃশ্যের কিছুই বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। পথে কেনা দামি কমলালেবু যে পচা তা আবিষ্কার হয়, টকো মিষ্টি আর মিয়ানো নিমকিতে খিদে মেটে। তবু ফেরার পথে চলার আনন্দে সুখে মশগুল তিনজন , দরাদরি করে সায়া কেনে , পরখ করে দেখে নেয় রঙের স্থায়ীত্বটুকু। পম্পা বিশ্বাসের এই গল্পটি পাঠকের মনেও প্রসন্নতার রঙ ভরে দেয়।

    এই সংকলনের গল্পগুলিতে ঘটনা এবং চরিত্র বেশ কম,সংলাপ নিতান্ত প্রয়োজনে সংযোজিত। গল্পগুলি মূলত মানুষের মনোজগতের বিবিধ অনুভূতির কথা বলে।

    আতাবাবু ও অন্যান্য গল্প — পম্পা বিশ্বাস ; কমলিনী প্রকাশন, কলকাতা, প্রচ্ছদ – পম্পা বিশ্বাস; প্রথম প্রকাশ— আগস্ট ২০২২; ISBN: 978-93-91483-17-3

    দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘আতাবাবু ও অন্যান্য গল্প’। কমলিনী প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয় আগস্ট ২০২২ এ। ২০০৮ থেকে ২০২১ পর্যন্ত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত গল্প থেকে বেছে নেওয়া বাইশটি গল্পের সংকলন। প্রথম সংকলনে গল্পগুলি প্রকাশকাল অনুযায়ী সজ্জিত ছিল,কিন্তু দ্বিতীয় গ্রন্থে কালানুক্রম রক্ষিত হয়নি। প্রথম গ্রন্থের তুলনায় এই বইটির ভৌগোলিক পরিধি ব্যপ্ত,চিন্তাভাবনা বহুস্তরীয়, অভিজ্ঞতার ভান্ডার সমৃদ্ধতর। লেখিকার প্রথম গল্পগ্রন্থটি মূলত মানুষের অবচেতন মনের গহনে ডুব দিয়েছিল। দ্বিতীয় গ্রন্থে সমাজ তার নীতি-দুর্নীতি নিয়ে নিজস্ব উপস্থিতি জানায়।

    ‘আতাবাবু ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থের বেশ কিছু গল্পের বিষয় মা মেয়ের চিরকালীন সম্পর্ক। শান্ত, মার্জিত, অতি রুচিশীলা মা কোনো এক গভীর অবসাদে প্রগাঢ় নেতিবাদে আচ্ছন্ন। স্বাভাবিকতা তাঁর কাছে বিচ্যুতি, অতএব তা অস্থায়ী। মায়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে মেয়ে। একসময় মায়ের হতাশাব্যাঞ্জক প্রলাপগুলি তার মনে হতে থাকে’সুচিন্তিত, যুক্তিজর্জরিত এবং নিখুঁত বিশ্লেষণধর্মী ‘। মায়ের স্বরে কথা বলে সে,অবসান হয় সব দ্বন্দ্বের। (‘জট’) ‘আমার মা’গল্পের কিশোরী কন্যা স্বামীপরিত্যক্তা,মাত্র ৪১ বছরেই জড়াগ্রস্থ,অসহায় অশক্ত মাকে ব্যস্ত রাখতে তাঁর হাতে তুলে দেয় সাদা কাগজ,ঠোঙা বানানোর জন্য। এক-এক ঠোঙায় মা ইচ্ছেমতো এক-আধ লাইন লিখে চলেন। ঠোঙার সমুদ্র পার হয়ে মেয়ে এগিয়ে যায়, মা’র কোল ঘেঁষে বসতে। এই মেয়ে মাকে শিশুর মতো আগলে রাখে। আবার ‘নোনা জল’ গল্পে দেখি এক মা ছেঁড়া শাড়ি,রুক্ষ চুল, কর্কশ চামড়ার কালো, কঠোর প্রস্তরমানবী আসন্নপ্রসবা মেয়েকে নিয়ে চলেন দূরের হাসপাতালে। শিশুপুত্রের জন্ম দিয়ে প্রায় অচেতন মেয়ে, প্রহরী হয়ে তিনি একা রাত জাগেন। সে রাতেই ঝুরো বৃষ্টি পরিণত হয় প্রবল ঝড়বৃষ্টিতে। নাতিকে বুকে চেপে জীবনদায়ী নোনাজলের জন্য আর্তচিৎকারে ফেটে পড়েন তিনি, ‘স্ল্যাইন আনো…… স্ল্যাইন ‘।

    কিছু গল্পের মূল সুর বাঁধা আছে ‘অফিস এড়িয়ে’ গল্পের নামহীন প্রধান চরিত্রের আত্মকথনে, “আমি বরাবর একটা সুস্থিত আবহ চেয়ে এসেছি। কিন্তু আমারই চারপাশে পাগলের মতো লন্ডভন্ড জীবন।” নিজেরই মুদ্রাদোষে বারবার সে এই জীবনের কক্ষপথে ঢুকে পড়ে। এলোমেলো পথে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাই সে জীবনের নিয়তি। পরাবাস্তব বা surrealism এর ছোঁয়া ছিল ‘রোরো ও অন্যান্য গল্প’ সংকলনের ‘মাছ’ গল্পে,তা গাঢ়তর হয়েছে এই সংকলনের ‘ঝোড়ো গম্বুজ’,’যা থাকে কপালে’, ‘কেচু’ প্রভৃতি গল্পে। ‘সামান্য একটু ভালোবাসা’ যেমন আপোসহীনতার গল্প, তেমনি ‘আঞ্চলিক অ্যাজেন্ডা’ আপোসের গল্প। ‘ধ্বস্ত’ গল্পের প্রধান চরিত্র তার চলৎশক্তিহীন স্ত্রী অনুর সামনেই বৌদি রেবাকে ভোগ করে, খাওয়া-পরা দেওয়ার বিনিময়ে । দীর্ঘদিন পরে প্রবাসী দাদা ফিরে আসে বৌদিকে সঙ্গে নিয়ে যাবে বলে। রেবা রেখে যায় নতুন তত্ত্বাবধানকারিণী মিনতিকে। চাঁদের আলোয় বারান্দায় দাঁড়িয়ে মিঠে স্বরে সে প্রথম দিনের কাজের বিবরণ দেয়,”রাত হয়ে গেছে তো ,একটু পরে খেতে দিয়ে দেবো, হ্যাঁ? অনুকে খাইয়ে,শুইয়ে দিয়েছি।” শরীরী শোষণের চক্রটি সচল থাকবে,বক্তা আশ্বস্ত হয়। নিরীহ পোষ্য পুটুর শরীর থেকে প্রতিনিয়ত নির্গত হচ্ছে রক্তপিণ্ড। তার মানুষ বাবা-মা অঝোর বর্ষণের মধ্যেও তাকে নিয়ে যান প্রায় পরিত্যক্ত পশু হাসপাতালে। মহিলাকে একাকী পেয়ে পশু চিকিৎসক তাঁকে যৌন হেনস্থা করেন। পরিচিত রিক্সাওয়ালা সামনে থেকেও নির্লিপ্ত,উদাসীন। আবার অসুস্থ পশুটিকে নিয়ে ফেরার সময় তিনিই সতর্ক,সহৃদয়। বিবেকবোধ ও বিবেকহীনতার এ এক বড় চতুর হিসেবনিকেশ। (‘হাসপাতালে সেদিন’) ‘মাসি-বোনঝি’ গল্প যে কোনো মধ্যবিত্ত মানুষের কথা বলে। বৃষ্টিধারা থেকে রক্ষা পেতে মাসি-বোনঝি ঢুকে পড়েছিলেন অতি অভিজাত কফি শপে। তিনগুণ দামের নরম পানীয়ের ঝাঁঝ তখন অসহনীয়বোধ হয়। এক অর্থহীন অসহায় হীনমন্যতাবোধ কেড়ে নেয় আত্মমর্যাদা।

    নামগল্পটির কাছে কিছু প্রত্যাশা তো থাকেই। আতাবাবু’গল্পের তিনটি চরিত্র। তরুণ লেখক অনীক, প্রবীণ প্রকাশক আতাবাবু ও তাঁর চালাকচতুর অ্যাসিস্ট্যান্ট বুড়ো। অনীক লেখে মানুষের হাসি-কান্নার কথা।’ চারপাশে ছড়িয়ে থাকা বেদনার পাতলা লিকার, হতাশার নাছোড় ঘ্রাণ…. যা অনুভবের তন্ত্রীতে কম্পন তোলে’ - সেই বেদনার সে রূপকার। প্রকাশক আতাবাবুর নোনা ধরা,সব্জেটে চুনকাম করা প্রায়ান্ধকার ঘরে বসে সে শোনে তাঁর ব্যর্থতা ও হতাশার অন্তহীন কাহিনি। অনীকের তন্দ্রাবোধ হয়। তখন আতাবাবু তাকে উৎসাহ দেন,’ ঘুমিও না অনীক। তাকিয়ে থাকো। অতন্দ্র প্রহরী হয়ে পাহারা দাও নিজের ভবিষ্যৎকে।’ ভবিষ্যতের কথাকার অনীক লক্ষ করে ‘অদ্ভুত উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন আতাবাবু।’

    ‘ঠাঁই’ নিখাদ হাস্যরসাত্মক গল্প। মঞ্জুবালা সরকারি কোনো দপ্তরের অফিস-পিয়ন। অফিসে সে আসে প্রভূত ও পরিপাটি খাওয়াদাওয়া ও একটি নিশ্চিন্ত ভাতঘুমের জন্য। কিন্তু এই ‘সামান্য ‘ চাহিদার জন্য তাকে বারবার ঠাঁইনাড়া হতে হয়। পম্পা তাঁর রচনায় প্রমাণ দিয়েছেন সিরিয়াস লেখক হলেও হাস্যরসৃষ্টিতে তাঁর দক্ষতা কিছু কম নয়।

    একটি গল্পের আলোচনা দিয়ে আমরা এই রচনার উপসংহার টানবো। লালমাটির দেশে বেড়াতে গিয়ে প্রহর শেষের আলোয় টুনা দেখেছিল নিজের স্টুডিওতে শিল্পসৃজনে ব্যস্ত এক শিল্পীকে। তাঁর মুখে-মাথায়-গায়ে গোধূলির সোনা-আলোর বিচ্ছুরণ। টানা টানা চোখে স্তব্ধতার ঘোর। টুনার শরীরে হঠাৎই বিস্ফোরণ ঘটে যেন। অকারণ লজ্জায় নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দ আর সপ্রতিভ সহচরী রিয়াকে সঙ্গী করে সে পাড়ি জমায় শিল্পীর বাড়ি। ভোরের আকাশে তখন কোমল নীল আভা। সেখানে গিয়ে নিদারুণ মোহভঙ্গ হয় তার, এও অনিবার্য ছিল। বিতৃষ্ণায় টুনার মনে হয়,’এত অ্যাবারেশন সহ্য করা যায় না।’( ‘ রাঙা পথের পাশে ‘)

    মানুষের মনের এই টানাপোড়েন, তার পরিবর্তন, আশা ও আশাভঙ্গের নিপুন কথাকার পম্পা বিশ্বাস। বাক্যনির্মাণ, বিশেষণ প্রয়োগে তাঁর দখল প্রশ্নাতীত।

    এই আলোচনায় কিছু গল্প অনুল্লেখিত থেকে গেল, গুণমানে তারা এতটুকুও ন্যূন নয়। রচনার সীমিত পরিসরে তাদের ধরানো গেল না। পম্পা বিশ্বাসের সাহিত্যকৃতি ব্যাপ্ত আলোচনা ও বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

    দুটি গ্রন্থেরই প্রচ্ছদশিল্পী লেখিকা স্বয়ং। ‘রোরো ও অন্যান্য গল্প’ সংকলনে অতি সংক্ষিপ্ত আত্মপরিচয়ে তিনি জানিয়েছেন তাঁর প্রয়োজন ‘ধারালো কিছু (আঁক কাটার জন্য)’। গদ্যরচনা ও শিল্পরচনা দুটি ক্ষেত্রেই তার কলম তীক্ষ্ণ ও নিপুণ। বাংলাসাহিত্য ও পাঠক তাঁর কাছে আরো গল্প প্রত্যাশা করে। পম্পা, আপনি আরো লিখুন, এমনই লিখুন।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments