

অতলকথা — স্বাতী গুহ ; প্রচ্ছদ -- দেবাশীষ সাহা; প্রকাশক- সোপান, কলকাতা- ৭০০০০৬; প্রথম প্রকাশ- বইমেলা ২০২২; ISBN: 978-93-90717-65-1 ‘অতলকথা’ কোনো গল্প বা উপন্যাস নয়, কিন্তু একটি গোটা জীবন এবং তার নাটকীয় ব্যপ্তিই তো কখনো কখনো একটি উপন্যাসের উপাদান হয়ে ওঠে। সেইরকমই লেখিকা স্বাতী গুহর জীবনের কিয়দংশ উপন্যাসের ছেঁড়াপাতার মতো ধরা দিয়েছে এই নিবন্ধ সংকলনে।
জীবনের অমসৃণ পথে ওঠা পড়া, কাটা ছেঁড়ার মধ্যেই বেঁচে থাকা। কেউ বাঁচে প্রথাগত শর্ত মেনে,কেউ আবার নিঃশর্তে নিজের মতো করে। ছাঁচে ফেলা জীবনের আবর্তে শুধু বয়সের মাইলস্টোন পেরিয়ে যায়, স্বপ্নহীন সংসার যাপনে চাওয়াপাওয়ার হিসেব কষতে কষতে সময় বয়ে যায়। শৈশবের ফুল কুড়নো নরম ভোর অথবা স্বপ্ন দেখা নির্জন দুপুর প্রাপ্তবয়সের চৌকাঠ পেরোলেই একদিন কোনো এক অচেনা কানাগলিতে পথ হারায়। আলগা হয়ে যায় সম্পর্কের বাঁধন। সঙ্গীহীন একলা পথে হাঁটতে হাঁটতে রোমন্থনে ফিরে দেখা সেই ছায়াছবির কিছু গল্প ,কিছু কথাই ‘অতলকথা’।
গতানুগতিক স্মৃতিকথা নয়, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নেই কোনো সময়সারণি। আছে বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে না যাওয়া কিছু উজ্জ্বল ছবি এবং তার সাবলীল শাব্দিক রূপান্তর। ‘অতলকথা’ এই বইটিতে বিভিন্ন সময়ে লেখা এবং প্রকাশিত মোট কুড়িটি গদ্যকে পর্বের আকারে সাজানো হয়েছে। প্রতিটি পর্ব বিষয়ানুসারে শিরোনামাঙ্কিত। নামগুলি যথাক্রমে :- ‘মাধুরীদি আপনাকে যেন কখনও না ভুলি’, ‘আমার ফুল কুড়োবার ভোরবেলা’, ‘সুন্দরদিদা’, ‘আলতামামী’, ‘বাসকাকু’, ‘ফুল সাজানো বুড়ো’, ‘আমার সম্পূর্ণ আকাশ’, ‘স্বাদ সরণী’, ‘কয়েকটা লাইন: অনেকটা আকাশ’, ‘কিছু অতলকথা’ ইত্যাদি। পর্বগুলির মধ্যে দিয়ে লেখিকা জীবনের অনেকগুলি প্রকোষ্ঠে আলোকপাত করেছেন। রামধনুর মতো চরিত্রগুলি আলাদা আলাদা রঙ নিয়ে লেখিকার ভাবনার প্রতিনিধিত্ব করেছে।
প্রথমেই বলা যাক বিন্দুবাসিনীর কথা। সম্পর্কে তিনি স্বাতী গুহর দিদা। ‘স্বাদ সরণী’ এই গোটা পর্বটি বিন্দুবাসিনী এবং তাঁর রান্নার ফিলজফিকে ঘিরে। শুধু একটি পর্ব নয় শৈশব থেকে সাম্প্রতিক সময়েও প্রতিনিয়ত লেখিকা এই মানুষটির স্মৃতির আঘ্রাণ বয়ে বেড়ান। “ন'বছর বয়সে বিয়ে হয়ে সংসারের মধ্যে ঢুকে পড়ার পর থেকে সাতানব্বই বছরে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া পর্যন্ত গোটা সময়কালটা ছিল দিদার নিজস্ব পৃথিবীকে চাখতে চাখতে চলা। অপু-দুর্গার কথকতা আমাদের শিখিয়েছিল জিভ দিয়ে কীভাবে পৃথিবীর আস্বাদকে চিনতে শেখে মানুষ। আর আমার হাতে খড়ি দিদাকে নিয়ে।” (পৃ-৭০)
ফোরামের কাজে বাঁকুড়ার প্রত্যন্ত গ্রামে লেখিকা পরিচিত হন স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে কর্মরতা নামমাত্র স্বাক্ষর কয়েকজন প্রান্তিক মহিলার সঙ্গে। যাঁরা প্রতিদিনের সুখদুঃখের তফাৎটুকুও বোঝেন না, তাঁদের মধ্যেই একজন হলেন মাধুরী। মাধুরীর অতুলনীয় জীবনবোধ সহজেই অনুপ্রেরণা হতে পারে যে কোনো মানুষের। “গল্প করতে করতেই জানা গেল ওই গ্রুপে একমাত্র মাধুরীদি তখনও পর্যন্ত শুধু সই করতে জানেন। লিখতে জানেন না। কিন্তু আমরা সেদিনই শুনেছিলাম মাধুরীদির তিনটে ছেলেই পড়াশোনায় বেশ ভাল। সবাই পিছিয়ে পড়া জাতি এবং উপজাতিভুক্ত পড়ুয়াদের জন্য নির্ধারিত সরকারি বৃত্তি পেয়েছে। তবে মাধুরীদিদের দলের একজন সক্রিয় সদস্য মাধুরীদির ছেলের বউ। তার হাতে তৈরি বাবুই ঘাসের জিনিস দেখলে নাকি আমরা শহরের মানুষেরা ট্যারা হয়ে যাব। অমন প্রত্যন্ত সমাজের মানুষ হয়ে মাধুরীদির ছেলের বউ সম্পর্কে মাত্রা ছাড়ানো অহমিকা সেদিন আমাকে যেন নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল,একজন অত্যন্ত এগিয়ে থাকা মানবীর সঙ্গে।” (পৃ-১৩)
অস্পৃশ্যতা যেমন একটি সামাজিক ব্যাধি তেমনি অন্ধকারাচ্ছন্ন মানসিকতায় একজন সর্বহারা, মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে নিষ্ঠুর অথবা অপয়া প্রমাণ করে সমাজের চোখে দাগিয়ে দেওয়াও বিপজ্জনক প্রবনতা। ছোটবেলায় দেখা তেমনি একজন মানুষের কথা লেখিকা তুলে ধরেছেন ‘ফুল সাজানো বুড়ো’ এই পর্বে। “বান-মারা বুড়ো থাকত মাসিদের বাগদি পাড়াতেই। মাঝেমাঝেই আমি মাসির সঙ্গে সে পাড়ায় গেছি। এমনই একটা দিনে আমি একা একা হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছেছিলাম সেই বান-মারা বুড়োর ঘরের সামনে। সেখানেও অমন একটা আলো আলো রঙের উঠোন। তার এক কোণে মাঝারি একটা কাঁঠাল-চাঁপা গাছ। ফুলে-গন্ধে অঝোর সেই গাছের পাশেই একটা মাটির বাঁধানো বেদি। আমি দেখেছি কী আশ্চর্য যত্নে সেই বেদিতে একটি করে ঝরে পড়া কাঁঠাল-চাঁপা সাজিয়ে দিচ্ছিল সেই বৃদ্ধ। শুনেছিলাম ওটি নাকি তার স্ত্রীর সমাধি। আর সেই সময় থেকে আমি আজও ভাবি, মৃত স্ত্রীর সমাধিতে যে মানুষ অমন যত্ন করে ফুল সাজায় সে কি কোন মানুষের ক্ষতি করতে পারে?”(পৃ-৩০)
শেষ পর্ব ‘কিছু অতলকথা’য় স্বাতী গুহ পাঠকের কাছে উন্মুক্ত করেছেন তাঁর জীবনের বিশেষ একটি অধ্যায়। যেখানে রয়েছে টিকে থাকার নিরলস প্রচেষ্টা, ব্যথা, লড়াই এবং সফলতার পথে উত্তরণের কাহিনি। এই কঠিন সময়ে অনেক প্রথিতযশা মানুষ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন, কাঁধে হাত রেখেছেন শক্ত করে। ফিরে দেখা মূহূর্তে যেমন তাঁদের মুখগুলো ভেসে উঠেছে বারবার তেমনই ভোলেননি মানবিক বাসকাকুর কথা। ভোলেননি সুন্দর দিদা, আলতা মামী,উমেশ,হরিমাধবদা ,আরও আরও অনেকের কথা।
পরিশেষে বলা যায় ‘অতল কথা’ এমন একটি স্বতন্ত্র এবং ব্যতিক্রমী আত্মকথা যার প্রতিটি ছত্রের সঙ্গে হয়তো পাঠক নিজেকে মেলাতে পারবেন না কিন্তু প্রতিটি ঘটনার মধ্যে দিয়ে যে গভীর আত্মোপলব্ধির কথা উঠে এসেছে তা একেবারেই ব্যক্তিগত নয় বরং সার্বজনিক।
জীবন এক নিরন্তর লড়াইয়ের নামান্তর। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তের মানুষ লড়ে শুধু তার নিজের মতো করে। লেখিকার কথায়, “স্বপ্ন দাও আরও স্বপ্ন। বেঁচে যাক প্রতিদিনের কঠিন যা কিছু। আমাকে এই পথে হেঁটে যেতে হবে জেনে যাবার পর পথ আর পথিকের একটা সম্পর্কের উত্তরণ হয়। কারও প্রার্থনার গান জীবনের ঊষর জমিতে ফুল হয়ে ফোটে। কিন্তু বিচ্ছিন্নতার কষ্ট তাকে ভোলাবে তেমন ভালোবাসা কোথায়? রুপ আর অরূপের বিরোধ নয় বরং একটা বোঝাপড়া হোক। আরও কতদূর যেতে পারলে কিংবা আরও কতদিন তোমার থেকে দূরে থাকার পর প্রমাণিত হবে যে আমার চাওয়াটা সত্যি? পরীক্ষার আগুনে সীতার মতো কিংবা মাটি পৃথিবীর কোলে ঘুমিয়ে পড়ার আগেই হাতে হাতে পেতে হবে তোমাকে।”(পৃ-৯৩)
পাঠকের চোখে খানিকটা স্নিগ্ধতার আবেশ তৈরি করে দেবাশীষ সাহার অনাড়ম্বর প্রচ্ছদ।