

জঙ্গলের ঘের — শৈলেন সরকার; প্রতিভাস; কলকাতা, জানুয়ারি ২০২৩; ISBN: ?? ঘরে ফিরলেও পরমেশের অবচেতনে শহরের রেশ থেকে যায়: "ভোরের দিকে বেশ হঠাৎ করেই মনে হল, কেউ কিছু বলছে যেন তাকে। যেন অনেক দূর থেকেই। শোঁ-শোঁ শব্দের মধ্য থেকে একটা খুব চেনা গলার স্বর। কিন্তু পরমেশ তখনও গুরগাঁও-এ। রাজীবনগরের বাঙাল বস্তির এক নম্বর গলিতে। মোবাইলের এলার্মের শব্দ শুনেছে সে। আর তার ঘরের দরজার ঠিক বাইরে কমন ল্যাট্রিনের সামনের লাইনটাকেও অনুমান করতে পারছে... হাজার মাইল দূরের দেশ থেকে এখানে আসা তো টাকা রোজগারের জন্যই। পরমেশকেও অবশ্য ছুটতে হবে, যাবে সেই সেক্টর চোদ্দোয়। তবে ওর কাজ ক্যামিলিয়াতে। হাসপাতালে। সপ্তাহভরই এখন দুপুর বারোটার শিফট পরমেশের। না বুঝে এতটা বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে রইল সে! শোঁ-শোঁ ধ্বনির মধ্য থেকে জেগে ওঠা চেনা-চেনা গলার আওয়াজটাকে অর্চনা ম্যাডামের বলেই ভেবে বসল। ইস, বকা খেতে হবে ফের। খোলা দরজা দিয়ে ঢুকতে থাকা হাওয়ার ঠান্ডায় সৎবিৎ ফিরল পরমেশের। গুরগাঁওয়ের রাজিবনগর নয়, এটা তার সুন্দরবনের দেশ-বাড়ি। গ্রাম, জঙ্গলের ঘের।"
শৈলেন সরকারের সাম্প্রতিক উপন্যাস 'জঙ্গলের ঘের' (প্রতিভাস, কলকাতা, জানুয়ারি, ২০২৩) আবর্তিত হয়েছে পরিযায়ী শ্রমিকের জীবনযাপনের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রাম-শহরের সীমারেখা মুছে যাওয়ার নানা আখ্যানে।
কিছু সময়ের ব্যবধানে চেনা গ্রাম অচেনা ঠেকছে পরমেশের: "গেল দু-তিন বছর তার মধ্যে একেবারেই আসা হয়নি। জামা-প্যান্ট পরে মায়ের কাছ থেকে ছাতা নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে চোখের সামনে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা রাস্তা-ঘাট, মাঠ বা সবজি খেত সব সবকিছুই একেবারে নতুন দেখছে সে। কিন্তু এ তো তোমার অজানা-অচেনা জায়গা নয়, এ তোমার নিজের গ্রাম।"
গ্রাম ছেড়ে রোজগারের ধান্দায় যাওয়ার আগেই উপন্যাসের নায়ক পরমেশ শহরজীবনের আঁচ পেয়েছিলো: "গল্পটা গনেশেরই বলা। ওর কাছ থেকে আগেই শোনা পরমেশের। ফোনে ফোনেই। সেই যখন দিল্লি যাবে বলে ঠিক করে নিয়েছে সে। বলেছিল, বস্তি বলতে আমাদের দেশগ্রামের বস্তি ভাবিস না কিন্তু, পাকা ঘর তিনতলা বাড়ি, প্রত্যেক তলাতেই আলাদা বাথরুম। বলেছিল, এখানকার নিয়ম কড়া খুব। মদ, মেয়েছেলে আর জুয়া চলবে না কিছুই। জাঠদের কথায়, 'ইনকাম করতে এসেছ, কর। দেশে টাকা পাঠাও। আর মদ, মেয়েছেলে নিয়ে খুব ইচ্ছে হলে বাইরে যাও, বস্তিতে বেলেল্লাপনা হবে না।"
প্রবাসী দোস্ত গনেশ গুরগাঁও-র রাজিবনগরের বাসিন্দা। তার বোন মায়ার সঙ্গে প্রেমের বন্ধনে জড়িয়ে পড়বে পরমেশ শহরে গিয়ে। সে থাকে টিকলিগাঁও-য়ে। লেখকের আখ্যানে ফুটে উঠেছে সেখানকার যাপনচিত্র: "ঘোসনাগাঁও বা টিকলিগাঁও-এ প্রচুর নতুন কোম্পানি তৈরি হচ্ছে। অফিস, হোটেল, টাওয়ার বাড়ি। টাওয়ার বাড়ি মানে বিশ-পঁচিশ-ত্রিশ তলা উঁচু সব বিল্ডিং। একেবারে নতুন করে তৈরি হতে থাকা একটা শহরের জন্যই হয়তো আয় বেশি ওখানে। দু-জায়গাতেই বাঙালি প্রচুর শুধু নয় বাঙালি মার্কেটই আছে একটা করে। টিকলিগাঁও-এ মায়ার চারটি মাত্র ঘরে সকাল-বিকেল রান্নার কাজ করেই কুড়ি হাজার টাকা আয়। ...টিকলিগাঁও-এ মেয়েদেরই নাকি বেশি আয়। আর কোঠিতে না থেকে কষ্ট করে জুজ্ঞি-ঝুপড়িতে থাকতে পারলে খরচও কম। ...অসুবিধা আছে অবশ্য গরমকালের। তা দিনের বেশির ভাগ তো তোমার কাটবে বাবুদের টাওয়ার বাড়ি বা কোঠিবাড়িতে, সমস্যা শুধুমাত্র ওই রাতটাতেই। তখন ঘর ছেড়ে পার্কে বিছানা পাতো গিয়ে, পাহারাদারদের দাও কিছু। আর একটা অসুবিধা ল্যাট্রিনের। ভোর হলেই পার্কের পাশের জঙ্গলে যেতে হবে তোমাকে। ...এই টিকলিগাঁও বা পাশের ঘোসনাগাঁও একেবারে নতুন করে গড়ে উঠতে থাকা এক একটা শহর, এগুলি সবই জাঠদের এলাকা।"
সুন্দরবনে নিজের গ্রামে ফিরেও মায়ার চিন্তায় মশগুল হয়ে যায় পরমেশ: "হাজার মাইল দূরের গুরগাঁওয়ের সেই টিকলিগাঁওয়ের এক জুজ্ঞি-ঝুপড়ির কথাই ভাবছে পরমেশ। মায়া হয়তো এখন ওর ঘরে, আবার পার্কেও হতে পারে। গরমে নাকি ওরা দল বেঁধে জুজ্ঞি লাগোয়া জঙ্গলের পাশে গিয়ে বসে। এটাকে পার্ক বলেই ডাকে ওরা সবাই। ...ফোনটাকে চালু করে মায়াকে ফিরে কল করতে গিয়েই বোকা বনল পরমেশ। নম্বর টিপে মায়ার ফোনে রিং-এর শব্দ শুনবে ভেবে মোবাইল কানে নিয়ে দেখল একটা শোঁ-শোঁ করা আওয়াজই শুধু। আর তা এই জঙ্গলের ঘের গ্রামেরই। মোবাইলের মাথায় টাওয়ারের কোনো রকম চিহ্ন নেই একেবারে।"
মায়াকে ফোনে না পাওয়ার আপাত কারণ, যান্ত্রিক গোলযোগ। কিন্তু লেখকের আখ্যানে গ্রামের কাঞ্চনদার স্ত্রী 'ছোটোবউ'-এর প্রতি পরমেশের পিছুটান যেভাবে চিত্রিত হয়েছে, তা ব্যাপারটাকে অযান্ত্রিক মাত্রা দিয়েছে: "দু'বছর আগেকার সেই ছোটোবউকে চিনতে পারেনি পরমেশ। ...সেই সিঁদুরটিপ, টানা চোখ, লম্বাটে মুখ। শুধু শাড়ির রঙেই ভুল করেছিল পরমেশ। সেই মেরুন রঙের ওপর ফুল ফুল হলুদ। কিন্তু সেই শাড়ি কি শুধু একটিই থাকবে কোনো মেয়ের? ...পরমেশ একবার আড়চোখে দেখল মেয়েটিকে। আর যা ভয় পাচ্ছিল ঠিক তাই, একেবারে চোখের ওপর চোখ পড়ে গেল।" আখ্যানের পরের অংশ পাঠ করে বোঝা যায় পরমেশের সঙ্গে মায়ার প্রবাসী সম্পর্কে চিড় ধরছে: "হঠাৎ করেই মায়ার কথা মনে পড়ল। ইস, সারাদিনে একবারও ফোন করা হল না তো। মোবাইলের জন্য প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাল পরমেশ। মিসকল হয়ে রয়েছে। পাঁচটা। তিনটে মায়ার...হ্যালো। সাড়া নেই কোনো। রাগ করতেই পারে। পরমেশ ফের ডেকে উঠল, 'হ্যালো মায়া প্লিজ, হ্যালো।' লাটে গিয়ে ভুলেই গেলে, সারাদিনে একবারও মনে পড়ল না আমার কথা।... টাওয়ার থাকে না বললে, তাহলে আমি তিন-তিনবার যখন ফোন করলাম সেই ফোন ঢুকল কী করে তোমার ফোনে। বারবার রিং হয়ে গেল।...পরমেশকে রাখতে হয়নি। মায়াই কেটে দিল দুম করে।"
আসলে গ্রাম-শহরের সম্পর্কের টানাপোড়েন পরমেশের মনের দোলাচলতার মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক: "বাড়ির বাইরে এসে মনে হল মায়ার কথাটা না বললেই হত বড় বউদিকে। কিন্তু একবার জিজ্ঞেস করার পর মিথ্যেই বা বলে কীভাবে পরমেশ। তবে এটা ঠিক, একবার এখান থেকে বাইরে বেরিয়ে শেয়ালদা হয়ে হাওড়া স্টেশনে গিয়ে পৌঁছতে পারলে মায়া ছাড়া কারও কথাই মাথায় থাকবে না আর।"
সুদূর গুরগাঁও শহরেও পরিযায়ী শ্রমিকদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে বাঙালি সমাজ: "শীতলামাতা মার্কেটের এই ফুটপাথের বা মাটিতে বসে থাকা মাছ বা সবজির লোকজনেরা সবাই বাঙালিই পরমেশদের মতো। ...মার্কেটে যেমন ফুটপাথের দোকানিদের মধ্যে ছড়াছড়ি বাঙালিদের, তেমনি মন্দির চত্বরেও। মন্দিরের কাজের মেয়েদের অনেকেই এই উত্তর বা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা বা মেদিনীপুরের। মন্দিরের কাজে সুবিধা অনেক। খাওয়া ফ্রি, শাড়ি-জামা কাপড়েরও খরচ নেই কোনো।"
সুন্দরবনের গ্রামে থাকাকালীন পরমেশ অন্য কারো অচেনা নাম্বারে মায়ার কাছে জানতে পারে যে কর্পোরেশনের গাড়ি ওদের জুজ্ঞি-ঝুপরি ভেঙে দিয়েছে। ডামাডোলে মায়ার নিজের ফোন খোয়া গেছে। পরমেশ ব্যাপারাটা বোঝার চেষ্টা করলো: "'জঙ্গলের ঘের' গ্রামের এই বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে টিকলিগাঁওয়ের দৃশ্যটা ভাবার চেষ্টা করল সে। কেমন প্রায় নিরুদ্বিগ্নভাবে কথাগুলি বলে গেল না মায়া? আবার কেমন ওর জুজ্ঞির মালিক ছোটলালের প্রশংসাও করল। বলল, সেই জঙ্গল আর পার্কে সব রাস্তার দোকানি আর জুজ্ঞি-ঝুপরির যারা আশ্রয় নিয়েছে তাদের ভালো-মন্দ দ্যাখভাল করছে গাঁওয়ালি সব মস্তানরাই।"
গুরগাঁও শহরে ফিরে পরমেশ মায়ার খোঁজ পায় না। আজ পাঁচটা নিম্নবর্গের মেয়ের মতো মায়া নিখোঁজ হয়ে যায়। পরমেশ আবার নিজের গ্রামে ফেরে। কিন্তু একদিনের নোটিশে বাবার আদেশে ঘরছাড়া হয়। ইতিমধ্যে ক্যান্সার আক্রান্ত 'ছোটবউ'-এর স্বামী কাঞ্চনদা মারা গেছে। এখন পরমেশের একমাত্র ভরসা 'ছোটবউ' সরমা: "এ পথ তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? কালিবেরার উত্তরের খালের মতো এ যেন এক শুকনা খালই শেষ পর্যন্ত। আটকে যাবে জেনেও শুধু ঝড়ের হাত থেকে বাঁচতে মরিয়া পরমেশ সরমাকে নিয়ে এ খালে ঢুকে পড়েছে। এ যেন এক নৈঃশব্দের রাজত্ব। যেন সুরঙ্গই একটা।..."
সরমাকে নিয়ে ঘর ছাড়ে পরমেশ। প্রথমে ভেবেছিলো তাকে নিয়ে টিকলিগাঁও যাবে। কিন্তু মত পালটালো: "কেন মত পালটাল পরমেশ? তবে কি কারও নজর থেকে বাঁচতে চাইছে সে?" সরমাকে নিয়ে গিয়ে উঠলো জাহাঙ্গিরপুরীর খাত্তা-য়, যেখানে দিল্লি শহরের আবর্জনার পাহাড় জমা হয়। 'ওয়েস্ট বেঙ্গলের বাঙালিরা' রোজগারের ধান্দায় ওখানে যায়। মারুতি চালক দেবু মাইতি পরমেশ- সরমাকে ওর দাদা-বৌদি পরিচয় দিয়ে পানদোকানের আফসারকে একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দিতে বললো। ওখানকার নরক জীবনের অনবদ্য ছবি এঁকেছেন ঔপন্যাসিক শৈলেন সরকার। নরকদর্শন না হলে এই ছবি আঁকা দু:সাধ্য।
জাহাঙ্গিরপুরীর নারকীয় জীবন বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক অকস্মাৎ পাঠককে নিয়ে আসেন পরমেশের নিজের গ্রামের মাটিতে: "ক-জন মিলে মারবে বলে একজনকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে, এ দৃশ্য পরমেশ সেই জঙ্গলের ঘেরে থাকতেও দেখেছে।একটা ছোটখাটো ভিড়ের মধ্যে লোকটা যাকে পাচ্ছে তারই হাতেপায়ে ধরে তার প্রাণ বাঁচানোর কথা বলছে এ দৃশ্য নতুন কিছু নয় পরমেশের কাছে। এসইউসি আর সিপিএমের মারদাঙ্গার টাইমে এমন কত লোকের চিৎকার শুনেছে পরমেশ। সব চিৎকারই শেষ হত এক সময়। জঙ্গলের ঘেরে অবশ্য বডি পড়ত নদীতেই।"
খুনখারাপি জাহাঙ্গিরপুরীর জীবনের অঙ্গ। এই দিল্লি লাগোয়া জাহাঙ্গিরপুরীর চারপাশে চুরি বা ছিনতাই করা মোবাইলের ব্যবসার ডন ইনসানের হাতে খুন হয়ে গেল আশরাফুল। কে এই আশরাফুল?: "আশরাফুল। নন্দীগ্রামের বাড়িতে ওর মা-বাবা-ভাই-বোন। সেই যে সিপিএম আমলে কাকে মার্ডার করে কবে দেশ ছেড়েছিল আশরাফুল, সেই সব কথা নাকি ভুলেই গিয়েছে একেবারে। এখন ওখানে আর সিপিএম কোথায়, সব তৃণমূল। একবার লাইনে গেলে আশরাফুল অন্তত তিনটে দিন ঘরে কাটিয়ে আসত। একমাত্র আশরাফুলেরই লাইন ছিল বাকিতে। ইনসানের কাছ থেকে হিসেব মতো মোবাইল নিয়ে, পরে বিক্রি হলে দাম মেটাত। সেই আশরাফুল নাকি ইনসানের বিশ্বাসের মান রাখতে পারেনি। আর যা হওয়ার হয়েছে। যা হয়েছে তা হয়েছে পরমেশদের এই সরদলন কলোনিতে আসার প্রথম রাতেই। বলতে গেলে, পরমেশের চোখের সামনেই।"
আশরাফুল মার্ডার হওয়ার পর পরমেশকে তলব করলো ইনসান: "তোমাকে মোবাইলের কাজে লাগাব। একেবারে মামুলি কাজ। তবে বেইমানি করবে না। ইনসান বেইমানি সহ্য করবে না। আশরাফুল মরেছে বেইমানির জন্য। সে তো তুমি জান, মার্ডারের পরদিন শুনেছ আমার মুখ থেকে। শোননি? আমার আর আফসারভাইয়ের পেছনেই তো দাঁড়িয়েছিলে তুমি। তার মানে, তোমরা তো আর স্বামী-স্ত্রী নও, আফসারভাইয়ের সেদিনের বলা কথাটাও নিশ্চিত শোনা তোমার। ...ইনসানের কোনো কথারই কোনো জবাবের কথা ভাবল না পরমেশ"।কাজে নেমে পড়লো পরমেশ: "আনন্দবিহার থেকে হলদিয়া। মঙ্গলবার ট্রেন। পরমেশের হাতে এখন হলদিয়ার টিকিট, সঙ্গে ইনসানের করে দেওয়া একটা ভোটার কার্ড। ভাগ্য ভালোই বলতে হবে, গোটা পাঁচেক ছিনতাইয়ের মোবাইল ছাড়াও, ফার্স্ট টিপে চার-চারটে দামি মোবাইল। একেবারে গো-ডাউন থেকে হাফিস করা। ঠিকঠিক থাকলে সব নিয়ে এক টিপেই মিনিমাম পঁচিশ হাজার।"
সরমার কাছে মোবাইল না থাকায় হলদিয়া ভ্রমণকালে পরমেশের তার সঙ্গে কথা হয়নি। জাহাঙ্গিরপুরীতে ফিরে পরমেশ জানতে পারলো যে সরমা নিখোঁজ: "আলোটা জ্বালল। ঘরের এখানে-ওখানে সরমার নানান চিহ্ন হয়ে ছড়িয়ে। বিছানার ওপর ওর শাড়ি একটা। লাল পাড়ের হলুদ রঙা যে শাড়িটা পরে বাড়ি ছেড়েছিল সরমা। শাড়ির পাশে পড়ে থাকা কানের একজোড়া দুল আর গলার চেনের সেট।...ইনসানের কথায় কী এমন ছিল যে, দুজনই একেবারে অচেনা হয়ে গেল দুজনের কাছে। কিন্তু তা বলে পালিয়ে যাবে? কার সঙ্গে পালাবে? কাকে চেনে সরমা?"
পরদিন রাতে সরমার কথা ভাবতে ভাবতে নিজের দেশ-গাঁয়ের স্মৃতিতে ফেরে পরমেশ: "সেই কৃষ্ণের চায়ের দোকানের কথা মনে পড়ছে। আকাশের গড়িয়ে যেতে থাকা মেঘ। চাঁদের আলো। ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ। ছায়া। বা দূর নদীর সেই মিলিয়ে যেতে থাকা ভট্ভট্-ভট্ভট্ - বড়োগাঙের উদ্দেশে রওয়ানা হওয়া ট্রলার। কবে ফিরবে কে জানে? কোস্টাল পুলিশের সার্চলাইটের আলোর কথা মনে পড়ল পরমেশের। কত দূর থেকে সেই আলো ঘুরতে থাকে জঙ্গল ছুঁয়ে ছুঁয়ে।" আবার কিছুদিন বাদেই সে নেমে আসে বাস্তবের কঠিন মাটিতে: "আজ কিন্তু হঠাৎ করেই অন্য একটা কথা মনে হল পরমেশের। অহেতুক ভূতের ভয় পাচ্ছে কেন সে, সরমা তো আর মরে যায়নি। সে পালিয়েছে কারও সঙ্গে। কিন্তু পালাবার পর যদি কেউ ওকে গলা টিপে বা, হয়ও তো এমন।"
বেশ কিছুদিন বাদে একদিন রাতে ডন ইনসান এসে পরমেশকে আবর্জনার পাহাড় মানে খাত্তার ব্যবসার টাকা তোলা, হিসেব রাখার কাজের লোভনীয় অফার দিলো। রাজি হয়ে গেলো পরমেশ।
জাহাঙ্গিরপুরীর খাত্তার নরকের বর্ণনায় লেখক অনবদ্য ভাষায় মনুষ্যজীবন ও পশুজীবনকে মিলিয়েছেন: "মাঝে মাঝে খাত্তার গোরু আর কুকুরগুলির কথা ভেবে অবাক লাগে পরমেশের। খাত্তার মাল করতে যাওয়া মানুষজন নাহয় রোজ খাত্তায় উঠবে কাজ করতে, বা কাজ শেষে নীচে নামবে। কিন্ত গোরু বা কুকুরগুলি? ওরা নামেই বা কবে আর ওঠেই বা কখন? আসিফ বা রুকসানাদের কথায়, ওরা নাকি নামে-ওঠে না। এমনকি বর্ষা-শীত বা গ্রীষ্মের দিনগুলিতেও। রোদ-জল বা ঠান্ডা থেকে বাঁচতে ওরা নাকি জঞ্জালের স্তূপেই আড়াল খুঁজবে। এর মধ্যেই ওদের জন্ম হবে, সরবে।"
আবর্জনার ব্যবসায় পরমেশের পসার হলো: "লোক রাখতে হল পরমেশকে। মানে রাখতে হতই। এত বড়ো ব্যবসা একা সে কীভাবে সামলাবে? নিতে হল দুজনকে। এমন দুজন যারা ঘর থেকে ঘর চেনে সবাইকেই। নীচে বস্তির বাচ্চা-বুড়ো-মেয়েছেলে বা খাত্তায় ওঠা সবাইকেই। যেন চোখের বাইরে না যায় কেউ।...ওদের সবার বিশ্বাস আর ভালোবাসা অর্জন করতে হবে পরমেশকে। এবার ধীরে ধীরে সে নিজের সাম্রাজ্য বানাবে।"
এক রাতে জাহাঙ্গিরপুরীর খাত্তায় আবর্জনার স্তূপে কাটা নারী-মুন্ডুর দেখা মেলায় সোরগোল ওঠে। পরমেশ চিন্তাস্রোতে ভাসতে থাকে: "কাঁড়ি-কাঁড়ি চুল হলে তো তা কোনো বউ বা উনিশ-কুড়ির মেয়েই হবে। তবে কি সরমা?" উত্তর মেলে না। মাঝে ইনসানের তিন নম্বর 'বউ' রেহেনার গোপন ফোন পেয়ে পরমেশের তাকে মায়া বলে ভ্রম হয়। নৈতিক সংকটে পরে সে: "যদি সরমাকে ভালোই না বাসবে তবে পালাল কেন ওকে নিয়ে? বলতে পারো, আমি তো ঠিক ইচ্ছে করে পালাইনি। আমি বাঁচাতে চেয়েছিলাম সরমাকে, বাঁচাতে চেয়েছিলাম কতগুলি হিংস্র প্রাণীর হাত থেকে।...কিন্তু তুমি কেন বললে না সরমাকে সত্যি কথাটা, কেন তুমি মায়ার কথাটা বলতে পারোনি। না বলে রাতের পর রাত।..."
রেহেনার সাবধানবাণীতে স্নেহের পুচন ছাড়া অন্য কাউকে না জানিয়ে জাহাঙ্গিরপুরী থেকে পালালো পরমেশ। দুদিন বাদে জাহাঙ্গিরপুরী থেকে পুচনের ফোন এলো। পরমেশের চলে আসার দিন পুচন নাকি একাই ঘুমিয়েছিল। সেই রাতে সে নাকি দরজায় তাঁর মৃত মায়ের ডাক শুনেছে। পরদিন দোস্ত রমজান আর চানুকে নিয়ে সে আফসারচাচাকে পুকুড়পাড়ে আটকায় এবং নিজের হাতে তার শ্বাসনালী কেটে হত্যা করে। লেখকের আখ্যান থেকে পাঠক জানতে পারে: "আফসারভাইই যে পুচনের মাকে, এটা নাকি জানত সবাই। জানত পুচনও। সেই ওর ছোটোবেলা থেকেই।...ওর মা তার মানে দরজায় ধাক্কা দিয়ে শুধু ওকে মনে করিয়ে দিতে চেয়েছে। বলল, আফসারচাচার হিসেব বরাবর করার পর থেকেই দরজায় আর শব্দ নেই কোনো। ওর মায়ের আত্মা নাকি এবার শান্তি পেয়েছে।" পরমেশ পুচনকে কথা দিতে বলে: "কথা দে, ইনসানকে কিছুতেই প্রাণে মারবি না। আর ওর তিন নম্বর বউ, মানে রেহেনা, রেহেনার কোনো ক্ষতি করবি না।"
নিজের গ্রামে ফেরার পর পরমেশের মনে অনেক কাল্পনিক ঘটনা ঘটতে থাকে। অবশেষে সে থিতু হয়: "অনেক হালকা লাগছে। পেছন থেকে ডাকার মতো তার আর আজ কেউই নেই। অনেক দিনের এক গল্প আদৌ সত্যি কিনা দেখে নেবে পরমেশ। কালিবেরার সেই উত্তরের খাল। খালের শেষ মাথায় সেই সিন্দুক, যদি সত্যিই থাকে তবে কী আছে সেই সিন্দুকের মধ্যে? জানতেই হবে পরমেশকে। মাটির কত গভীরে? কত গভীর পর্যন্ত গিয়েছে সেই সিন্দুক। শুধুই কি অলংকার আর গহনা? গল্প নেই? হাজার-হাজার বছরের মানুষজন, হাজার হাজার বছরের জঙ্গলের ঘেরের গল্প। কৃষ্ণের কথায়, জঙ্গলের ঘের থেকে নাকি বের হতে পারেনি কেউই। পারবেও না। পরমেশ বা কৃষ্ণ বা কেরল, চেন্নাই বা অন্ধ্রপ্রদেশ যাওয়া কেউ নয়। জঙ্গলের মতোই জঙ্গলের সেই বেগোমুরি সর্বত্র।...অন্ধকারে এখন অনেক মুখ, অনেক কলরব, আনন্দ-বিষণ্ণতা, অনেক অনেক গল্প সেই সব ভাঙা ঘরবাড়ি, মন্দির আর ঝোপ-জঙ্গলে ঢাকা রাস্তায় যেন অপেক্ষা করে। যেন উত্তরের খালের একেবারে শেষ মাথার সেই সিন্দুকের ডালা খুলতে পারলেই জেগে উঠবে সব। সেই সব মায়া, রেহেনা, সরমা, লক্ষ্মণ, কৃষ্ণ, বাবলু প্রামাণিক। ...জাহাঙ্গিরপুরীর আফসারভাই, ইনসান, আশরাফুল। থাকবে পুচন, খাত্তার পাহাড়ে মার্ডার হওয়া ওর মা। থাকবে পরমেশও। যেন নীরব সেই অন্ধকারে ডুবে।...নৌকার গতি বাড়াল পরমেশ। ভাটার টানে খাল শুকনো হওয়ার আগেই একেবারে শেষ মাথায় পৌঁছতে হবে তাকে।"
যাঁদের পায়ের তলায় মাটি নেই সেই গরীবগুর্বো মানুষদের বাঁচা-মরা, প্রেম-বিরহ, হিংসা-প্রতিহিংসার নানা আখ্যান এই উপন্যাসের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে।বোঝা যায় যে লেখক এই গোষ্ঠীভুক্ত মানুষগুলোকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। লেখকের মুন্সিয়ানায় এই উপন্যাস হয়ে উঠেছে পরিযায়ী মানুষদের দিনযাপনের আধুনিক রূপকথা।