

সলিল চৌধুরী জন্মেছিলেন ১৯২৩ সালের ১৯ নভেম্বর দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার রাজপুর-সোনারপুর অঞ্চলের মধ্যবর্তী গাজিপুরে। শৈশব কাটে হরিনাভিতে। বাবা জ্ঞানেন্দ্রনাথ ছিলেন চিকিৎসক, উদারহৃদয় সেই মানুষটি মিশতেন সবার সঙ্গে। কিছুকাল পরে আসামের শিবসাগর জেলার লতাবাড়ি চা বাগানে চিকিৎসক হিসেবে তিনি যোগ দেন। দিনে ডাক্তারি আর রাতে চা বাগানের কুলিকামিনদের সুখ-দুঃখের গল্প শোনা এই ছিল তাঁর রোজকার কাজ। কিন্তু হঠাৎ একদিন ঘটে গেল এক ভয়ানক কাণ্ড। চা বাগানের সাহেব ম্যানেজার জ্ঞানেন্দ্রনাথকে ‘কাম হিয়ার ডার্টি নিগার’ বলে সম্বোধন করায় তিনি এক ঘুঁষিতে তার তিনটে দাঁত ভেঙে দেন। সেই কাণ্ড ঘটানোর পর তিনি সিএমও ডাঃ মালোনির সহায়তায় রাতারাতি স্ত্রী, দুই পুত্র (একজন সলিল), এক কন্যা নিয়ে কলকাতায় চলে আসার আগে সবকিছু জলের দরে বেচে দিলেও সঙ্গে করে নিয়ে এলেন ‘একটা চোঙা দেওয়া কুকুর মার্কা কলের গান আর শতখানেক ইংরেজি বাজনার রেকর্ড।’ সলিলও ধীরে ধীরে মজে গেলেন মোৎজার্ট, চায়কোভস্কি বা বেটোফেনের সঙ্গে। আর মনে হয়তো তখনি তাঁর বাসা বেঁধেছিল এক সুপ্ত ইচ্ছে তা হল একদিন এইসব অসাধারণ সুরের আস্বাদ বিলিয়ে দিতে হবে মানুষের মধ্যে। আট ভাইবোনের মধ্যে মধ্যম সলিল ছোটোবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো, পাশাপাশি অল্প বয়সে জ্যাঠতুতো ভাই নিখিল চৌধুরীর কাছে শিখেছিলেন নানা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে। আসাম থেকে চলে আসার পর দু-তিন বছর বাদে আবার জ্ঞানেন্দ্রনাথ চলে গেলেন আসামের একড়াজান নামের এক চা বাগানে। ডাক্তারির পাশাপাশি তাঁর ছিল নাটকের শখ। পরে হাতিখুলি চা বাগানে বাঙালি-অসমিয়া সবাইকে নিয়ে তিনি দুর্গাপুজোর প্রবর্তন করেন এবং সেই উপলক্ষ্যে প্রতিবছর নাটক অভিনয় হতো এবং সেক্ষেত্রে নির্দেশনা ও সংগীত পরিচালনার ভার গ্রহণ করতেন জ্ঞানেন্দ্রনাথ। তিনি চা বাগানে ‘বেহুলা’ পালা রচনা ও সেই নাটকে নারী চরিত্রে আদিবাসী মহিলাদের অংশগ্রহণের মতো বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে পুত্র সলিলকে নাটকের মোট বারোটি গানের ছ’টা গানে সুর করার দায়িত্ব দিলেন। পরে সলিলের করা সুরগুলি শুনে তিনি বললেন, 'আমার গানগুলোও তুই সুর কর। আমারটা এত ভালো হয়নি।’ সেই প্রথম তাঁর বাবার সহকারী হয়ে সংগীত পরিচালনা। সেই হাতিখুলি চা বাগানে তাঁর বাবার সিনিয়র কম্পাউন্ডার সুকুমারবাবু ছিলেন সংগীতরসিক ও ভালো তবলিয়া। ছুটিতে আসাম গেলে বাড়িতে গানের আসর বসত আর সেই আসরে কিশোর সলিল হারমোনিয়াম বাজিয়ে সেইসময়ের সিনেমার গান এবং রেকর্ডের মৃণালকান্তি ঘোষ, কৃষ্ণচন্দ্র দে, কমল ঝরিয়া প্রমুখের গান হুবহু নকল করে গাইতেন। তাঁর বাবা সে সময়ে বেশ কয়েকদিন বাগানের বাবুদের সস্ত্রীক বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে সলিলের গান ও বাঁশি শোনাতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘বেহুলা’ নাটকে মেয়েদের অভিনয় করা হলো না, কুলি পুরুষরাই নারী চরিত্রে অভিনয় করলেন। সেই বছরের অনুষ্ঠানে ‘নাকে ক্লিপ দেওয়া এক বিশাল গোঁফ এঁটে’ সলিল নবদ্বীপ হালদারের কিছু ‘কমিক’ অভিনয় করেছিলেন। আর তাঁর মায়ের ছিল সাহিত্যপ্রীতি। এইসব গুণ তাঁর মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তেছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি কলকাতার উপকণ্ঠে হরিনাভি স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করার পর আইএসসি উত্তীর্ণ হয়ে বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন।
শিল্পী হিসেবে তাঁর আবির্ভাবের মুহূর্তটি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের নানা ঘটনাসংঘাতে উথালপাথাল। ১৯৪১-’৪২ থেকেই সলিল বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন, পরে বৃহত্তর গণ আন্দোলনের সঙ্গেও। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার স্থানীয় অঞ্চলেই তাঁর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়। ১৯৪৩-এ দেখা দিল ভয়াবহ মন্বন্তর। সেই সময় দুর্ভিক্ষ শেষে নানা ব্যাধির মোকাবিলায় পিপলস্ রিলিফ কমিটির নানা জনসেবামূলক কাজে তিনি অংশগ্রহণ করেন। কোদালিয়া বোসপাড়ায় অনুষ্ঠিত হলো জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র-র ‘নবজীবনের গান’ ও বিজন ভট্টাচার্যের একাঙ্ক নাটক ‘জবানবন্দী ’ আর সেই প্রযোজনায় একটি বিশিষ্ট চরিত্রে অভিনয় করলেন সলিল। ১৯৪৪ সালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের একটি স্কোয়াড প্রায় এক মাসের জন্য আসামে যায় যে দলে ছিলেন সলিল চৌধুরী, শম্ভু ভট্টাচার্য, সরোজ হাজরা, সাধন দাশগুপ্ত, সজল রায়চৌধুরী প্রমুখ। তখন সলিলের পরিচিতি বিশিষ্ট বংশীবাদক হিসেবে, যদিও তিনি অসাধারণ হারমোনিয়াম বাজানোর পাশাপাশি দারুণ গানও গাইতেন। সেই স্কোয়াড সিলেটে যাওয়ায় পরিচয় হলো হেমাঙ্গ বিশ্বাস, নির্মলেন্দু চৌধুরী, খালেদ চৌধুরী প্রমুখের সঙ্গে। ওই সময়েই রাজপুর পৌরসভার সাফাইকর্মীদের সংগঠন গড়ার কাজে এগিয়ে আসেন সলিল। সম্ভবত ১৯৪৫ সালে রংপুরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র সম্মেলনে গায়ক হিসেবে তাঁর স্বীকৃতি জুটল, ডাক আসতে লাগল দেশের নানা সভা-সম্মেলন থেকে। গণসংগীতে ভাষা ও সুরের সম্মিলনে এক নতুন জোয়ার আনলেন সলিল, সমসাময়িক নানা উত্তাল ঘটনা, আন্দোলনের আঁচ লাগল গানের বাণী ও সুরে। যেমন, আন্দামানে যাবজ্জীবন অগ্নিযুগের বিপ্লবী বীরদের মুক্তির দাবিতে কলকাতায় ছাত্র মিছিলের উপর পুলিশের লাঠিচার্জ উপেক্ষা করে মিছিল হলো। সলিল গান লিখলেন : ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা/আজ জেগেছে এই জনতা।’ সাম্রাজ্যবাদী শাসকের বিরুদ্ধে কৃষক-শ্রমিক-যুবকদের তীব্রতর আন্দোলনের প্রবাহে সলিল ভাসিয়ে দেন আগুনে সুরের ভেলা। যেমন :
হিমালয় আর নিদ্রা নয়
কোটি প্রাণ চেতনায় বরাভয়
জাগো ক্রান্তির হয়েছে সময়
আনো মুক্তির খর-বন্যা।
২. আমার প্রতিবাদের ভাষা। আমার প্রতিবাদের আগুন।
দ্বিগুণ। জ্বলে যেন দ্বিগুণ। দারুণ প্রতিশোধে করে চূর্ণ।
ছিন্নভিন্ন শত ষড়যন্ত্রের জাল যেন আনে মুক্তির আলো আনে
আনে লক্ষ শত প্রাণে।
(তাই) তোমরা রাজভোগ খেলে আমরা ঢেকুর তুলি কষে।
(আজ) তোমরা প্রাসাদ চূড়ায় রইলে আমরা তাহার ইঁটকাঠ বইলুম।
এক তীব্র শ্লেষে তীক্ষ্ণতায় বিদ্রূপে নিমেষে ফালাফালা হয়ে যায় সমাজে অসাম্যের চেহারাটি। শুধু দেশ নয়, বিশ্বের দিকেও দৃষ্টি তাঁর। তাই বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলেও তাঁর প্রতিবাদী সত্তা গান বাঁধে : ‘আর যুদ্ধ নয় নয়/ আর ধ্বংস নয় নয়।/ আর নয় মায়েদের শিশুদের কান্না/ রক্ত কি ধ্বংস কি যুদ্ধ আর না।’ সুরের জগতে তো তিনি ধীরে ধীরে খ্যাতি লাভ করেছেন, কিন্তু তাঁর অভিভাবকদের ইচ্ছে ছিল তাঁর মেধাবী, বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন দাদা ডাক্তার হন আর সলিল বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার; তাঁর দাদা ডাক্তারি পড়া ছেড়ে রেলে কেরানির চাকরি নেন এবং সলিল বাবার মতের বিরুদ্ধে পূর্ণ সময়ের জন্য সংগীতকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন, রাজনীতিতে যোগ দেন। সে নিয়ে বাবা-ছেলেয় খানিক মনান্তরও হলো। আসলে সলিল চৌধুরীর জীবন কেটেছে নানা বাঁকে। সেই পথসন্ধিগুলির খোঁজ পেতে আগ্রহী পাঠক একটিবারের জন্য হাতে তুলে নিতে পারেন তাঁর ‘জীবন উজ্জীবন’ নামের অসাধারণ আত্মজীবনীটি। তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলি একসময় এই বইটি প্রতিক্ষণ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল সেটি পুনরায় সুহৃদ প্রিয়দর্শী চক্রবর্তীর চমৎকার সম্পাদনায় ‘সলিল চৌধুরী জীবন উজ্জীবন এবং…’ নামে দে’জ পাবলিশিং থেকে ২০২০ সালে পুনরায় প্রকাশিত হয়েছে।
১৯৫১ সালে বাবার মৃত্যুর পর মা ও ছ’টি ছোটো ছোটো ভাইবোনের দায়িত্বভার গ্রহণ তাঁকে সমস্যাসংকুল জীবনসমুদ্রের মাঝে এনে ফেলল। তখন তাঁর প্রিয় দলের সঙ্গেও সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে। 'জীবন উজ্জীবন' গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ে আক্ষেপ ও ক্ষোভের সুরে তাঁর কলমে শুনতে পাই : ‘ … তখন পার্টি বলতে কতকগুলো মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল, যাঁরা সংস্কৃতির ধারক-বাহক হয়ে বসেছেন … শুনলাম ডিসিপ্লিন ভঙ্গের অপরাধে আমাকে পার্টি থেকে বের করে দেওয়া হবে… চব্বিশ পরগনায় স্থানে স্থানে গণনাট্যের শাখা আমিই গড়ে তুলেছি— তা সত্ত্বেও! অপরাধ? ডিসিপ্লিন ভঙ্গ। কার ডিসিপ্লিন? পার্টির। পার্টি কে?--- ওই কতকগুলো মুখ! এ সবই ঘটে গেছে বাবার মৃত্যুর আগে। তাই বলছিলাম, পার্টির সাংস্কৃতিক নীতি ও নেতৃত্ব সম্বন্ধে মোহমুক্তি ঘটছিল বেশ কিছু বছর ধরেই। বাবার মৃত্যু তাতে সিলমোহর লাগিয়ে দিল।’ দল থেকে তিনি দূরে চলে গেলেন কিন্তু ভাবাদর্শ থেকে কোনোদিন বিচ্যুত হননি। ১৯৫২ সালের মাঝামাঝি থেকে তিনি বোম্বাইয়ে ডেরা বাঁধলেন। কিন্তু কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হলো না। তার আগে ১৯৪৯ সালে প্রথম সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন ‘পরিবর্তন’ ছায়াছবিতে, এছাড়া ‘বরযাত্রী’ (১৯৫১) ও ‘পাশের বাড়ি’(১৯৫২)-র মতো চলচ্চিত্রে। পরবর্তীকালে অনেক বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে তিনি সংগীত পরিচালকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। যেমন, ‘দো বিঘা জমিন’ (১৯৫৩), ‘মধুমতী’ (১৯৫৮), ’বাড়ি থেকে পালিয়ে’ (১৯৫৯), ’গঙ্গা’ (১৯৬০), ’কাবুলিওয়ালা’ (১৯৬১), ’হাফ টিকিট’ (১৯৬২), ’লাল পাথর’ (১৯৬৪), ’চেম্মিন’ (১৯৬৫), ’আনন্দ’ (১৯৭০), ’অন্নদাতা’ (১৯৭২), ’রজনীগন্ধা’ (১৯৭৪), ’ছোটি সী বাত’ (১৯৭৫), ’মৃগয়া’ (১৯৭৬), ’কবিতা’ (১৯৭৭), ’আকালের সন্ধানে’ (১৯৮০) ইত্যাদি।
জীবনের সঙ্গে কঠিন লড়াই তাঁকে পরিজন ছেড়ে বোম্বাই (অধুনা মুম্বই) যেতে বাধ্য করেছিল। তার আগেই বেশ কিছু স্মরণীয় গণসংগীত তিনি রচনা করেছেন। যেমন, ‘ঢেউ উঠছে কারা টুটছে’, ’হাতে মোদের কে দেবে’, ‘গাঁয়ের বধু’, ‘ও আলোর পথযাত্রী’, ‘অবাক পৃথিবী’, ’সেই মেয়ে’, ‘নাও গান ভরে’, ‘প্রান্তরের গান আমার’, ‘ উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা’ ইত্যাদি। তাঁর নেতৃত্বে চারের দশকের মাঝামাঝি দক্ষিণ কলকাতা গণনাট্য সংঘের সংগীত শাখা গড়ে উঠেছিল যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন গীতা মুখার্জি,অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবীর মজুমদার, অনল চট্টোপাধ্যায় (যাঁদের তিনি ডাকতেন ‘ প্রাবীরানলাভিজিৎ’ নামে), হীরালাল সরখেল প্রমুখ। সেখানেই রচিত হলো ‘পথে এবার নামো সাথী’, ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’-র মতো গান। তাঁর আত্মজীবনীর পাতায় আমরা দেখতে পাই : ‘১৯৪১ থেকে ১৯৫১—এই দশ বছরে নানা উত্থান পতন ঝড়ঝঞ্ঝাটের মধ্যে দিয়ে বহু গান রচিত হয়েছে। আজ তা ইতিহাস।’ তাঁর মুম্বই যাওয়ার আর একটি কারণও ছিল। তাঁর বয়ানে আমরা শুনতে পাই: ‘চল্লিশ দশকের একেবারে শেষের দিকের কথা। আমি বুঝতে পারছিলাম চূড়ান্ত বাম-বিচ্যুতির মধ্যে শিল্প হিসেবে দম আটকে মরা ছাড়া আমার কোনো গত্যন্তর নেই। ‘গাঁয়ের বধূ’ গানকে গণনাট্যের আসরে নিষিদ্ধ করা হলো, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘পালকির গান’ প্রতিক্রিয়াশীল ঘোষিত হলো। পাশাপাশি ‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে’ এইচএমভি রেকর্ডে এই গানে ‘বিধি’ শব্দটির প্রয়োগ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হলো।’ ‘বোঝার ছড়া’ নামে একটি রচনায় তাঁর কলম লেখে: ‘রাজনীতি ছেড়ে বুঝলুম/কত তার মাঝে খল ছিল।’ পরিসরের কথা ভেবে আমরা এই প্রসঙ্গের বিস্তারে যাচ্ছি না। তাঁর লেখা ‘রিকশাওয়ালা’ কাহিনির চিত্রনাট্য নিয়ে তিনি মুম্বই গিয়েছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক বিমল রায়ের কাছে যা থেকে তৈরি হলো বিখ্যাত ‘দো বিঘা জমিন’ ছবিটি। সেই সিনেমায় ‘ধরতি কহে পুকার কে’ (মান্না দে) গানটি রেড আর্মির মার্চিং সুর অবলম্বনে, এটা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। এছাড়া ‘আজা রে পরদেশি’ (লতা মঙ্গেশকর),’সুহানা সফর ঔর ইয়ে মৌসম হঁসি’, (মুকেশ) ‘দিল তড়প তড়প কর’ (লতা ও মুকেশ/ মধুমতী)। ‘মধুমতী’ ছবির জন্য সলিল পৌঁছে যান জনপ্রিয়তার শীর্ষে এবং শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের সম্মান লাভ করেন যদিও পরবর্তীকালে নানা বাধায় তিনি মুম্বই থেকে সরে আসতে বাধ্য হন, এক বুক স্বপ্ন নিয়ে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। বাংলা গানের পাশাপাশি তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম, গুজরাতি প্রভৃতি চৌদ্দটি ভাষার ছবিতে সংগীত পরিচালকের দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন। শুধু মালয়ালি ভাষাতেই পঁচিশটি ছবিতে সুর করেছেন তিনি। বহু জনপ্রিয় গানের সুরসৃষ্টি করেছেন তিনি। তার কয়েকটি উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন, ’ইতনা না মুঝসে তু’ (লতা ও তালাত মেহমুদ/ছায়া, মোৎসার্টেরএকটি সিম্ফনি ভেঙে সুরারোপ ), ’গঙ্গা আয়ে কহাঁসে (হেমন্তকুমার/কাবুলিওয়ালা), ’অ্যায় মেরে প্যারে বতন’ (মান্না দে/কাবুলিওয়ালা), ’কোই হোতা জিসকা আপনা” (কিশোরকুমার/মেরে অপনে), ‘ছোটাসা ঘর হোগা’( উষা মঙ্গেশকর ও কিশোরকুমার/ নৌকরি), ’ রজনীগন্ধা ফুল তুমহারি’( লতা/ রজনীগন্ধা),’ জাগো মোহন প্রীতম’(লতা ও সহশিল্পীবৃন্দ/ জাগতে রহ’),’ কহিঁ দূর যব দিন ঢল যায়ে’(মুকেশ/আনন্দ), ‘জিন্দেগি কৈসি পহেলি হায়’ (মান্না দে /আনন্দ), 'ও সজনা বরখা বাহার’ (লতা/পরখ), 'যা রে যারে উড়ে যা রে পাখি(লতা/মায়া), ' তসবির তেরি দিল মেঁ’ (লতা/মায়া), 'এই দুনিয়ায় ভাই’ (মান্না দে/একদিন রাত্রে), ’ঝিরঝির বরষা’ (ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য/ পাশের বারি), 'বন্ধু রে কেমন করে’ (হেমন্ত/ পাড়ি),’ ‘বিশ্বপিতা তুমি হে প্রভু’ (সবিতা চৌধুরী/ সিস্টার), ‘বাজে গো বীণা’ (মান্না দে/ মর্জিনা আবদাল্লা), ’হায় হায় প্রাণ যায়’(লতা/মর্জিনা আবদাল্লা) সহ আরও অসংখ্য চিত্রগীতি যার অনেকগুলিতে বাংলা সুরের অনুসৃতি ঘটেছে।
মুম্বইয়ে সলিল নিজের অসাধারণ প্রতিভার জোরে সকলের সম্ভ্রম আদায় করে নিয়েছিলেন। তাঁর প্রয়াণের পর আর এক বিখ্যাত সুরকার নৌশাদ বলেছিলেন, ‘One of the seven notes of music has been lost!’ সমসাময়িক সমাজ যেমন তাঁর গানে ক্রিয়াশীল থেকেছে তেমনি পাশাপাশি তাঁর অব্যবহিত পূর্বসূরিদের সংগীতের উত্তরাধিকারকে তিনি বহন করেছেন। গানের জগতে তিনি এসেছিলেন স্বদেশি ও বিদেশি গানের মূল ভাব ও সুরকে আত্মস্থ করে। বাংলা গানের ক্ষেত্রে সেই গণনাট্যের যুগে পুরোনো চিন্তা ও রীতি বর্জনের মতো ব্যতিক্রমী ভাবনা তাঁর মন ও মননে সঞ্চারিত হয়েছিল, তার প্রমাণ মধুসুদনের ‘রেখো মা দাসেরে মনে’ ও 'আশার ছলনে ভুলি’ (দ্বিজেন মুুুখোপাধ্যায়), সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’, ’অবাক পৃথিবী’, ’ বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে’ (হেমন্ত), সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘পাল্কির গান’, বিমলচন্দ্র ঘোষের 'উজ্জ্বল একঝাঁক পায়রা’ (সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়), আবার রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গান ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’কে মনে রেখে সলিলের অনবদ্য সৃষ্টি ‘সেই মেয়ে’ (সুচিত্রা মিত্র) সহ একাধিক বাংলা কবিতার অনবদ্য গীতিরূপ! কোন গান কোন শিল্পীকে দিয়ে গাওয়াতে হবে সেই সম্বন্ধে তাঁর এক অদ্ভুত পারঙ্গমতা ছিল! তিনি নিজে কোনোদিন প্রতিষ্ঠিত হতে চাননি, অথচ অনবদ্য সব গান অসাধারণ শিল্পীদের কণ্ঠে শ্রোতাদের উপহার দিয়েছেন। সলিল তাঁর সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ভালোবেসে। বাংলা গানের গতানুগতিক স্রোতে তিনি এনেছেন ব্যঙ্গ, শানিত বচন ও সুরের ভিন্নতা। ‘নাকের বদলে নরুন পেলাম টাক ডুমা ডুম ডুম’,’সাদা হাতির কালা মাহুত তুমি না’ (‘হেই সামালো'), ’শোন ভাই ইস্কাবনের দেশে’, 'ও ভাইরে ভাই মোর মতো আর দেশপ্রমিক নাই’, 'আমি রাজনীতি-ফিতির ধার ধারি নে’, 'আমরা গান গাই কেন না গান গাই’, 'নন্দলাল দেবদুলাল’-এর মতো একাধিক গানে তার স্বাক্ষর ছড়িয়ে আছে। এই ব্যঙ্গাত্মক অভিব্যক্তি তাঁর কলমে সহজাত বৈশিষ্ট্যের একটি। মনে রাখতে হবে তিনি একজন স্বভাবকবি, ছড়াকার, প্রাবন্ধিক ও কথাকারও। রসিক পাঠকের নিশ্চয়ই মনে পড়ে যাবে তাঁর লেখা বিখ্যাত 'কানকাটার ছড়া’ রচনাটির কথা যেটি অনেকে তাঁর স্বকণ্ঠে বা রেকর্ডে পাঠ শুনেছেন। সেই ছড়ার শেষাংশে আছে : ‘তখনও দেশ হয়নি স্বাধীন মন্ত্রী ছিলেন ‘ডানকান’/ একবার কানপুরে এলেন কিনতে তাঁর বাঁ কান/ একানড়ে বললে দেখুন সময় দিতে হবে/ মন্ত্রীর কান আনতে গেলে দিল্লী যেতে হবে’। কিন্তু ছ’দিন পর ফিরে এসে বিফলমনোরথ একানড়ে ‘বল্লে কেঁদে নিন ফিরিয়ে অ্যাডভান্স টাকাটা/ দিল্লী গিয়ে দেখি ওদের সবার দু’কান কাটা।’ ‘মাংসাশীর জন্য বিজ্ঞাপন’ নামের কবিতায় লিখেছিলেন: ‘ভূতপূর্ব বিপ্লবীর মাংস নিরামিষ/সর্বত্রই ব্রাঞ্চ আছে, দিল্লি হেডাপিস।’
সময় বদলেছে, রাজনীতির হাল কতখানি বদলেছে সে বিষয়ে মানুষের মনে আজও ধন্দ ঘোচেনি। ‘ড্রেসিং টেবিল’, 'গুণময় গুঁই-এর জীবনচরিত’-এর মতো গল্প, ’অরুণোদয়ের পথে’-র মতো নাটক,’সুর সৃষ্টি সম্পর্কে’, 'আধুনিক ভারতীয় সংগীতে বিবর্তন’ ইত্যাদি নানা রচনায় তাঁর সাহিত্যিক সত্তার পরিচয়ের চিহ্ন মুদ্রিত আছে। তাঁর সব ধরনের লেখার মধ্যেই এক অসাধারণ স্বতঃস্ফূর্ততা লক্ষ করা যায়, অনুভব করা যায় এক সৎ শিল্পচর্চার অঙ্গীকার। রাজনীতিও আসে, আসে সমসাময়িক কবন্ধ সময়। তাই লেখা হয় এমন পঙ্ক্তি : ‘কবন্ধের সংস্কৃতি নিয়ত প্রচার করে/ প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে রোজ তীব্র উচ্চ তারস্বরে/ লাউড স্পিকার,/ওদিকেতে মূল্যবৃদ্ধি সহস্র বেকার গ্রামে গঞ্জে হাহাকার’ (‘মহাকাব্যের দলিল ‘)। একসময় বামপন্থী গণ আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগ তাঁর অক্ষরে এই বারুদশলাকার তাপ যুক্ত করে দেয় : ‘ কার বাছার জোটেনি দুধ শুকনো মুখ/ তৈরি হও,/ঘরে ঘরে ডাক পাঠাই তৈরি হও, জোট বাঁধো,/ মাঠে কিষাণ, কলে মজু্র, নওজোয়ান, জোট বাঁধো।’ ('শপথ’)। সলিল চৌধুরী যখন পুরোপুরি সংগীতের জগতে মনোনিবেশ করেছিলেন তখন শোনা যায় সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এমন কথা নাকি বলেছিলেন যে, বাংলা সাহিত্য একজন গল্পকারকে হারাল। নানা কাজের ফাঁকে তিনি কবিতা ও ছড়া লেখার অভ্যাস বজায় রেখেছিলেন।তাঁর লেখা গানের গীতিরূপে তাঁর কবিসত্তার পরিচয়টি শ্রোতা খুঁজে পাবেন। যেমন, 'হৃদয়ের শাখা ধরে নাড়া দিয়ে গেছে/ঝুরঝুর ঝরে গেছে কামনার ফুল’, ‘ওরে স্মরণ নদীর পারে/ ডাক দিল যাইবারে/ পরাণবধুঁ আইল না’, ‘কারা যেন ভালোবেসে আলো জ্বেলেছিল,সূর্যের আলো তাই নিভে গিয়েছিল’,’যতো যতনে সাজানো স্বপ্ন, হল সকলি নিমেষে ভগ্ন/ আমি দুর্বার স্রোতে ভাসলাম তরী অজানায় নিশানা’--- এইরকম অজস্র চিত্রকল্প তাঁর কলমে আঁকা হয়েছে। একসময় সুর আর গান তাঁকে নিয়ে গেছে ভিন্নতর এক সৃষ্টির জগতে। প্রথম জীবনে সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং সহজাত প্রতিভায় মুখে মুখে তিনি গান বেঁধেছেন, পরবর্তীকালে মুম্বই পর্বে তিনি সুর সৃষ্টি করেছেন হারমোনিয়াম বা পিয়ানোর সাহায্যে। এছাড়া তিনি নিজে বাঁশি, তবলা, এসরাজ সহ বিবিধ বাদ্যযন্ত্র বাজাতে জানতেন। মুম্বই পর্বে তিনি নতুন নতুন কর্ড, হারমনি বা কাউন্টার পয়েন্ট, প্রিলিউড- ইন্টারল্যুড সৃষ্টি করে তাঁর সুরের ভুবনে বিরাট বৈচিত্র্য এনে দিলেন, যা এক নতুন আস্বাদন এনে দিল শ্রোতাদের কাছে। তাঁরই উদ্যোগে 'বম্বে ইয়ুথ কয়্যার’ (১৯৫৬) প্রতিষ্ঠা এবং সেখানে লতা মঙ্গেশকর, মুকেশ, মান্না দে, রুমা গুহঠাকুরতা, সবিতা চৌধুরীর মতো অনেক শিল্পী, অনিল বিশ্বাস, নৌশাদ, রোশনের মতো সুরকারের যোগদান যেমন বিশেষভাবে উল্লেখ্য, পাশাপাশি এই তথ্যটিরও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সেখানে একশো থেকে দেড়শোজন শিল্পীর সমাবেশ ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। দু’বছর বাদে কলকাতায় যখন রাজেন তরফদারের ‘গঙ্গা’ ছবিতে সলিল সুর করতে এসেছেন তখন তাঁরই পরামর্শে রুমা গুহঠাকুরতা, শ্যামল মিত্র সহ অন্যান্য শিল্পীর সমন্বয়ে ‘ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার-এর জন্ম। চলচ্চিত্রের আবহসংগীত বিষয়েও তাঁর বিশেষ ভাবনা ছিল। তিনি মনে করতেন ‘রাগসংগীত ও লোকসংগীত হলো ভারতীয় সংগীতের দুই স্তম্ভ।’ সেই কারণেই হেমাঙ্গ বিশ্বাস, নির্মলেন্দু চৌধুরী, ওমর শেখ প্রমুখ তাঁর গুণমুগ্ধ ছিলেন। তাঁর রচিত বহু গানে, চিত্রগীতিতে ও সুরে লোকসংগীতের প্রভাব আছে। শ্রোতাদের মনে পড়ে যাবে ‘ গঙ্গা’ ছায়াছবিতে ‘আমায় ডুবাইলি রে’(মান্না দে), ‘গঙ্গা গঙ্গার তরঙ্গে’ (নির্মলেন্দু চৌধুরী,মান্না দে ও সহশিল্পীবৃন্দ), 'ইচ্ছা করে ও পরাণডারে’ (পঙ্কজ মিত্র), হিন্দি ‘কাবুলিওয়ালা’ চলচ্চিত্রে ‘গঙ্গা আয়ে কহাঁ সে’ (হেমন্ত)--যেগুলির সুরের কাঠামো ছিল বাংলার ভাটিয়ালি। আবার অসমের চা বাগানের এবং পাহাড়ি লোকসুরকে অবলম্বন করে তিনি রচনা করেছিলেন ‘ঘড়ি ঘড়ি মোরা দিল ধড়কে’, ’আজা রে পরদেশি’, ’ছোড় গ্যয়ে পাপী বিছুয়া’(লতা/ মধুমতী)-এর মতো গানগুলি। এই প্রসঙ্গে একটি সংক্ষিপ্ত তথ্য পাঠকদের দেওয়া যেতে পারে তা হলো, নির্মলেন্দু চৌধুরীকে নিয়ে ‘নির্মাল্য’ নামে তাঁর একটি স্মরণলেখ আছে। মুম্বই পর্বে তিনি ভি বালসারা সহ বহু উচ্চমানের সংগীতবিদ ও যন্ত্রশিল্পীদের সাহচর্য পেলেন যা তাঁর অর্কেস্ট্রার আয়োজনে উৎসাহ জোগাল। ১৯৫৮ সালে যখন ট্র্যাক সিস্টেমে গান রেকর্ড শুরু হয়নি, তখনি তিনি বাংলা গানে প্রথম ভোকাল হারমনির প্রয়োগে সৃষ্টি করেছিলেন ‘সুরের এই ঝর ঝর ঝরনা’ ( সবিতা চৌধুরী)। আবার ১৯৫৯ সালে রাগাশ্রয়ী বাংলা গানেও হারমনির ব্যবহার করলেন ‘না যেও না’ (লতা মঙ্গেশকর)-এর মতো গানে। আবার কাউন্টার পয়েন্টের সার্থক ব্যবহার করে বাঁধলেন ‘আজ নয় গুনগুন গুঞ্জন প্রেমের’ মতো গান (লতা) কিংবা ‘এবার আমি আমার থেকে আমাকে বাদ দিয়ে’ (লতা) গানটিতে। আবার একটি গানের মধ্যেই স্কেল বদলে বদলে গানটিকে গতিশীল করে তোলার মতো দুরূহ পরীক্ষাও তিনি করেছেন। 'শোনো কোনো একদিন আকাশ বাতাস জুড়ে রিমঝিম বরষায়’(হেমন্ত) বা ‘এই রোকো পৃথিবীর গাড়িটা থামাও’ (সলিল)-এর মতো অনেক গানে তার স্বাক্ষর ধরা আছে। আবার গাথা বা আখ্যানধর্মী এবং ব্যালাডের মিশ্রণেও পরিকল্পিত হয়েছে ‘কবিতা’ ছায়াছবির গান ‘শুন শুন গো সবে শুন দিয়া মন’(কিশোরকুমার)। গণনাট্যের গানে ও আধুনিক রোমান্টিক গানের ক্ষেত্রে তাঁর স্বকীয় পরীক্ষানিরীক্ষা চিরকাল অব্যাহত থেকেছে। আবার সংগীত রচনার ক্ষেত্রে তিনি যেমন অনেক কাব্যিক শব্দ ব্যবহার করেছেন, তেমনি অনেক অকিঞ্চিৎকর প্রাত্যহিক শব্দও প্রয়োগ করেছেন—লাট্টু, লেত্তি, বরাত-ফরাত, ঢাকনা, ফন্দি, ঢেঁকুর, তেলানী, পিশাচ প্রভৃতি।
আসলে সলিল চৌধুরীর মতো বহুমুখী প্রতিভা সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে কথা শেষ করা কঠিন! কিন্তু কোথাও তো থামতেই হয়। অনেক কথাই হয়তো বলা হলো না। তাঁর গানের ভাষাতেই বলা যায় 'আজ তবে এইটুকু থাক,বাকি কথা পরে হবে।’ তাঁর মতো সংগীতবোধের এত বিস্ময়কর ব্যাপ্তি নিয়ে খুব কম বাঙালি সংগীত পরিচালকই এসেছেন। তিনি চিরকালীন। তাঁর সুরে কত জনপ্রিয় গায়ক-গায়িকা যে আরও কত গান গেয়েছেন তার উল্লেখ আর করছি না। আর এ ক্ষেত্রে যেটা বলার সেটি হলো প্রায় প্রতিটি গানে সঠিক গায়িকা বা গায়ক নির্বাচন। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় দেশের কিংবদন্তি নারীকণ্ঠ লতা মঙ্গেশকরকে দিয়ে একাধিক জনপ্রিয় গান গাওয়ানো,’যা রে যারে উড়ে যারে পাাখি’, ’না মন লাগে না’, 'সবার আড়ালে’, 'ঝিলিক ঝিলিক ঝিনুক খুঁজে পেলাম’, ‘ও মার ময়না গো’, ‘আমি চলতে চলতে’ ইত্যাদি। এই প্রসঙ্গে সলিল চৌধুরীর সাক্ষাৎকারের কিয়দংশ মনে পড়তে পারে: ‘লতা মঙ্গেশকরের গলায় আমার গান বাংলা গানকে একটা অন্য জায়গায় নিয়ে চলে গেছে। লতা মঙ্গেশকর এক প্রচণ্ড বিস্ময়। ওঁকে ব্যাখ্যা করা যায় না। কণ্ঠের ওই যে প্রসাদগুণ তা বোধহয় হাজার বছরে একবার আসে। অসাধারণ।’ নিজে সুরকার হিসেবে তিনি মনে করতেন একজন সংগীতকারের ‘অন্তত পাঁচটি বিষয়ে দখল থাকা একান্ত প্রয়োজন। সেগুলি হলো পাশ্চাত্যসংগীত, লোকসংগীত, মার্গসংগীত, অর্কেস্ট্রেশন এবং হারমনিয়াম।’ তাঁকে সংগীতজ্ঞ হিসেবে প্রাণিত করেছেন তিনজন পাশ্চাত্য সংগীতবেত্তা– বিঠোফেন, মোৎসার্ট ও বাখ। তাঁর গানে দর্শনগত প্রভাব ফেলেছেন বিঠোফেন, যাঁর পছন্দ ছিল মানবতা ও স্বাধীনতা। প্রখ্যাত সংগীত সমালোচক ডোনাল্ড টোভে বিঠোফেনকে পৃথিবীর অন্যতম Complete Artist বলেছিলেন। আবার মোৎসার্টের সরলতা বিশেষত মেলোডি থেকে মেলোডিতে যাওয়ার প্রবণতা সলিলকে প্রণোদিত করে। আর বাখ মুক্তি দিয়েছিলেন সংগীতকে তা-ও তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি গানকে পেশা মনে করেননি, জীবনের অপরিহার্য ও অবিচ্ছিন্ন বলে মনে করেছিলেন।
সলিল চৌধুরীর গান বিষয়ে আলোচনা হবে আর সেখানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রসঙ্গে দু-চার কথা বলা হবে না তা কি হয়? হেমন্তের সঙ্গে সলিলের প্রথম দেখা ১৯৪৫-৪৬ সাল নাগাদ দেবব্রত বিশ্বাসের বাড়িতে। তারপর ১৯৪৮-৪৯ থেকে গণনাট্যের সূত্রে নিয়মিত যোগাযোগ। তারপর ১৯৪৯-এ এই জুটির প্রথম স্মরণীয় কাজ ‘কোনো এক গাঁয়ের বধূ’ ‘পুজোর গান’ হিসেবে বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে এক অভিনব উপহার হিসেবে হাজির হলো। আর বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই সুপার ডুপার হিট। তখন সলিল চৌধুরীর বয়স কুড়ি-একুশ। এরপর ১৯৫০ সালে কালজয়ী আর একটি সৃষ্টি ‘রানার’। ওই বছরেই সুকান্তের ‘অবাক পৃথিবী’ কবিতাটি সুরারোপিত হয় এবং রেকর্ড করা হয়। গানটা প্রথমে বিভিন্ন সভায় গাইতেন দেবব্রত বিশ্বাস ও প্রীতি সরকার। তারপর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা ‘পালকির গান’ (১৯৫২)। এরপর ১৯৫৫-য় ‘পথে এবার নামো সাথী’ ও ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’, ‘দুরন্ত ঘূর্ণির এই লেগেছে পাক’, ‘পথ হারাব বলেই এবার’ (১৯৫৮), ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম’, ‘মনের জানালা ধরে’(১৯৬১)। এরপর তৃতীয় পক্ষের চক্রান্তে কয়েক বছরের জন্য দুজনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কারণে সংগীতের পথ চলায় সাময়িক বিচ্ছেদ ঘটে। আবার তা মিটে গিয়ে ১৯৬৯-এ রেকর্ডে শোনা গেল ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’ ও ‘শোনো, কোনো একদিন’। পরের বছর সুকান্তের আর একটি কবিতা ‘ঠিকানা’। এই জুটিতে একজনের মায়াবী, মন্দ্র মধুর কণ্ঠস্বর আর অন্যজনের অনবদ্য কম্পোজিশন ও গীতিকার সত্তা বাংলা গানে এক নতুন মাত্রা যোগ করল। তাঁর সুরে অনেক ছায়াছবিতেও কণ্ঠ দান করেছেন হেমন্ত। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে একটি সাক্ষাৎকারে সলিল চৌধুরী বলেছিলেন : ‘হেমন্তদার ছিল গাম্ভীর্য, রসবোধ। জর্জদা তো হেমন্তদার নামে পাগল ছিলেন। জর্জদা বলতেন—'হেমন্ত কথা বললেও লোকে শুনবে।’ শুধু কণ্ঠেই এক নতুন দিগন্ত এনেছেন হেমন্তদা। তারপর যখন ভালো সুর পড়েছে, কথা পড়েছে তখন তো আর কথাই নেই। হিন্দিতে যাকে বলে চার চাঁদ এক হো গিয়া। আমি একবার রসিকতা করে বলেছিলাম, ঈশ্বর যদি মনে করতেন তিনি গান গাইবেন—তবে তিনি হেমন্তদার গলাতেই গাইবেন।’ সলিল চৌধুরীর জীবনের শ্রেষ্ঠ সৃজনগুলির বেশিরভাগ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে শ্রোতারা শুনে চলেছেন। তবে সলিল নিজে মনে করতেন ‘জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র মাটি না কোপালে সলিল চৌধুরীর জন্ম হতো না।’
সলিল চৌধুরী নিজেই এক প্রতিষ্ঠান, সুরের সমুদ্র যার তল পাওয়া অসম্ভব। সেই সমুদ্রে তিনি ভাসমান এক সাম্পান। সংগীত নিয়ে তিনি সারাজীবন ভেবেছেন। রাগ-রাগিণী-লোকজ সুর তাঁর আগেও বাংলা গানে ব্যবহৃত হয়েছে কিন্তু তিনি অভিনবত্ব এনেছেন প্রয়োগ বা ট্রিটমেন্টের ক্ষেত্রে। পারকাশ্সনের ব্যবহারে এক নতুন ছন্দের চলন, কীর্তনের সুরকে গণসংগীতে ব্যবহার, বিদেশি নান সুরের দেশীয় সুরের মিশ্রণে আত্তীকরণ, নানা যন্ত্রের সার্থক আবহ, হারমোনাইজেশনে কর্ডের নিপুণ ব্যবহার, কয়্যার গানের বিন্যাসকুশলতা—তাঁর গানকে অন্য সবধরনের গানের থেকে আলাদা করে দিয়েছে অভিনব এক স্টাইলে যার স্থিতি চিরন্তন। তাই ‘সলিল সংগীত’ একটি যুগ হলেও যুগাতীত। তাঁর গানে আছে এক তীব্র আশাবাদের কথা ‘আর দূর নেই দিগন্তের বেশি দূর নেই’--- সুরের সেই প্রান্তরের দিগন্তরেখাটিকে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন। অফুরন্ত প্রাণশক্তি তাঁর সৃষ্টির উৎস। সেই প্রাণশক্তির বীজমন্ত্রটি আমরা খুঁজে পাই তাঁর কবিতায় : ‘দু’হাত বাড়াও আর প্রাণ খুলে চাও—/ লক্ষকোটি প্রাণ এসে ধরা দেবে বুকে/ সংস্কার কুয়াশাকে সত্য দিয়ে ছিঁড়ে/ সূর্যের আলোর মত চোখ তুলে চাও।’