• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০১ | জানুয়ারি ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • কাদম্বরী ও মৃণালিনী: সম্পর্কের এক অনাবিল ছায়াপথ : শেখর মুখোপাধ্যায়

    সম্পর্কের আলো অন্ধকার: কাদম্বরী ও মৃণালিনী — অমিত মণ্ডল; প্রচ্ছদ-- সম্বিত বসু; প্রকাশক- আখরকথা; কলকাতা, জানুয়ারি ২০২৫; ISBN: ??

    অমিত মণ্ডলের ‘সম্পর্কের আলো অন্ধকার: কাদম্বরী ও মৃণালিনী’ গ্রন্থটি বিষয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজনীয় মনে হল। গ্রন্থকার অমিত মণ্ডলের আগ্রহ বাংলা সাহিত্যের রসসন্ধান, জীবনভর রবীন্দ্রজীবনের রসপিপাসু তিনি। অন্তরে লালন করেছেন রবীন্দ্র সংস্কৃতিকে, পোষণ করেছেন স্বতন্ত্র চিন্তাধারা। বর্তমান গ্রন্থটি রচনায় তাঁর যত্নশীল প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ দিতেই হয়।

    তিনটি ভিন্ন কালিতে লেখা ‘সম্পর্কের আলো অন্ধকার’ কাদম্বরী ও মৃণালিনী। প্রথমজন রবীন্দ্র জগতে বহু চর্চিত নারী, দ্বিতীয় জন সেভাবে নন। যতটুকু ঠাকুরবাড়ির পরিমণ্ডলের মধ্যে তাঁকে দেখা গেছে সেটুকুই জ্ঞাতব্য। কবির একজন নতুন বৌঠান, অন্যজন স্ত্রী। আবারও বলি, ‘সম্পর্কের আলো অন্ধকার’ লাল-সাদা-কালো কালিতে যা পাঠকের দরবারে হাজির হয়েছে, লেখকের অভিপ্রায় বোঝা গেল।

    বর্তমান গ্রন্থের ‘কিছু কথা’ অংশটুকু পড়ে আমরা বুঝতে পারি, ‘কাদম্বরী দেবী’ বিভাগে বারোটি অধ্যায়, ‘মৃণালিনী দেবী’ বিভাগে নয়টি অধ্যায়ের নামকরণগুলি। পরিসর প্রত্যেকটির সংক্ষিপ্ত, সযত্ন অনুরাগে ঠাকুরবাড়ির আভিজাত্যের চেহারাটুকু লেখার মধ্যে ধরা পড়েছে। শ্রদ্ধেয় শঙ্খ ঘোষের কথায় নানাধরনের ‘অন্যায়রকম প্রশ্রয়’ বা অধ্যাপক বিশ্বজিৎ রায়ের মন্তব্য ‘তরল মেলোড্রামার প্রতি আমবাঙালির আগ্রহ’— এধরনের নিখাদ সত্য উক্তির সার্থক ব্যবহারে লেখকের মানসিকতা বোঝা যায়। তবে কিছু অধ্যায় একটু বিস্তৃত হলে সাধারণ জিজ্ঞাসু পাঠক উপকৃত হতেন।

    কলকাতার ময়দানে স্বামীর সঙ্গে ঘোড়ায় চড়া নারী কাদম্বরী অভিনয় ভালো করতেন। কবির বসন্ত উৎসবে লীলার চরিত্রে অভিনয় করেন, নায়ক স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ গানও জানতেন ঠাকুরবাড়ির প্রথামত (তবে কোনো ওস্তাদের কাছে তালিম নেননি)। যশোরের মেয়ে কাদম্বরীর সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির যোগ বহুকালের। পিতামহ জগন্মোহনের সঙ্গে দ্বারকানাথের মামাতো বোনের বিয়ে হয়। জ্যাঠা রামলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের মেয়ে অন্নদাসুন্দরীকে বিয়ে করেন দ্বারকানাথের ভাগ্না নবীনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। কাদম্বরীর মা ত্রৈলোক্যসুন্দরী ছিলেন পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুরপরিবারের বংশধর মথুরানাথের দৌহিত্রী। পিরালি ব্রাহ্মণ পরিবারে মহর্ষির পছন্দ ও মতকে মান্যতা দিয়েই কাদম্বরীর এবাড়িতে আসা। রবীন্দ্রকবিমন চিরকালই শুদ্ধতাসন্ধানী, অন্তরে ছিল ব্যাপ্তির পিপাসা। নতুন বৌঠান ছিলেন গভীর অনুভূতির অধিকারিণী এক নারী।

    ‘খুঁটিয়ে লেখা’ বলতে যা বোঝায় এটি সে ধরনের বই নয়, লেখকের সে অভিপ্রায় ছিল না। রবীন্দ্রপ্রেমীদের কাছে দুই নারীর অকালপ্রয়াণ এক অর্থে ট্রাজেডিও বটে, কাদম্বরীর হঠাৎ থেমে যাওয়া জীবন আর মৃণালিনীর ফুলের মতো সাজানো এক সংসার ও কবির নীরব সেবার অবদান খুব সহজ সরল ভাবেই উপস্থাপনা করা হয়েছে, মাতৃসান্নিধ্যের প্রত্যক্ষ সুযোগ থেকে শিশু রবি বঞ্চিত ছিলেন, এই দূরত্ববোধ ঠাকুরবাড়ির অনুশাসন বলা যায়। কাদম্বরী সেই শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে এলেন তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব নিয়ে। প্রায় কাছাকাছি বয়েসের বৌদি-দেওরের ‘রোমান্টিক রিলেশন’ বাঁকা চোখ বাঁকা মনে দেখার মধ্যে বাহাদুরি নেই। আধুনিক চিন্তার নিয়ম হল নতুন পথ দেখানো, মননের জগতকে খুলে দেওয়া।

    রবি ইস্কুল থেকে ফিরলে নতুন বৌঠান পান্তা ভাত আর চিংড়ি মাছের চচ্চড়ি নিজে হাতে মেখে খেতে দিতেন। বৌঠানের হাতের পরম ভালোবাসার স্বাদ পরিণত বয়সেও কবি ভোলেননি। বরং অনেক ব্যথার তুফান তুলেছে। ৫৭ বছর বয়েসে ‘পূজা’ পর্যায়ের গান—

    অকারণে অকালে মোর পড়ল যখন ডাক
    তখন আমি ছিলেম শয়ন পাতি।
    বিশ্ব তখন তারার আলোয় দাঁড়ায়ে নির্বাক
    ধরায় তখন তিমির গহন রাতি।
    ঘরের লোকে কেঁদে কইলে মোরে
    ‘আঁধারে পথ চিনবে কেমন করে?’
    আমি কইনু, ‘চলব আমি নিজের আলো ধরে,
    হাতে আমার এই যে আছে বাতি।’
    তরুণ যৌবনের ‘রুদ্ধগৃহ’, ‘পথ প্রান্তে’ প্রবন্ধের পর ৬৪ বছর বয়েসের গানে সেই একই পথ — এ পথে আমি যে গেছি বারবার ভুলিনি তো একদিনও/ আজ কি ঘুচিল চিহ্ন তাহার, উঠিল বনের তৃণ…/ একেলা যেতাম যে প্রদীপ হাতে নিবেছে তাহার শিখা/ তবু জানি মনে তারার ভাষাতে ঠিকানা রয়েছে লিখা। দুই গানে দূর অতীতের বিরহ বিধুর সুর যা আমাদের চেনা, প্রথমটি ‘পূজা’ পর্যায়ে দ্বিতীয়টি ‘প্রেম’ পর্যায়ে।

    এক বিশেষ সৌন্দর্যদৃষ্টি নিয়ে বইটি লেখা। যে দৃষ্টি না থাকলে কোনো সৎ সাহিত্য সৃষ্টি করা যায় না। মৃণালিনী দেবী সম্পর্কে লেখাগুলি পড়তে পড়তে বারবার মনে আসে ‘শিশু’ কাব্যগ্রন্থটি। এ কাব্যগ্রন্থের অন্তরের কান্নাটি সে তো ছোট বৌ। মাতৃহারা শিশু আর পত্নীহারা তরুণ স্বামী। রবীন্দ্রনাথ যেহেতু শিল্পী, তাই মনের জীবনকে বেশি মর্যাদা দিয়েছেন। শিল্পীর সহজ অনুভুতিতেই বুঝতে চেয়েছেন মনের জীবনকে। সহজে ভোলার মানুষ ছিলেন, আমরা যারা তাঁর অনুরাগী পাঠক, তাদের ভোলাতে চাননি। কঠিন সাধনার দ্বারাই শুধু সত্যকে লাভ করা যায়। ফাঁকি সহজ, সত্য কঠিন— এ শিক্ষা কবিরই।

    মৃণালিনী দেবী পর্বের অধ্যায়গুলি পাঠককে এক নজরে আকর্ষণ করে। ‘ভাই ছুটি— পত্রলেখায় অনন্য দাম্পত্য’, ‘আটপৌরে মৃণালিনী’, ‘আশ্রম জননী’ প্রভৃতি পর্বগুলি কবিপত্নীর ব্যক্তিত্বের নানা রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। আশ্রম জননীর মূর্তি মনে করিয়ে দেয় চিত্রাঙ্গদার কথা— ‘যদি সুখে দুঃখে মোর কর সহচরী/ আমার পাইবে তবে পরিচয়।’ ছোটো বৌ-এর সরল শান্ত স্নিগ্ধ মধুর জীবনরূপটি পড়তে ভালোই লাগে।

    অন্যদিকে ঠাকুরবাড়ির বনেদি বৈশিষ্ট্য ছিল ‘ভৃত্যরাজক তন্ত্রে’ শিশুদের বড় হয়ে ওঠা, অর্থাৎ স্নেহের গণ্ডির বাইরে মানুষ হওয়া। ‘মা আর কোনোদিন ফিরবেন না, ‘আমার প্রাণের ’পরে চলে গেল কে’ অধ্যায়গুলি পড়ে মনে হয় এক্ষেত্রে কাদম্বরী দেবী ক্রমশ কিশোর রবির সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে উঠছিলেন। ছাদের নন্দনকাননে সাহিত্যের মহারথীদের ভিড়— জানকীনাথ, স্বর্ণকুমারী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, অক্ষয় চৌধুরী, বিহারীলাল প্রমুখ, ভারতী প্রকাশের পরিকল্পনা। জ্যোতিদাদা বাজাতেন বেহালা, কাদম্বরী দেবী ছাদের বাগানের মধ্যেই সৃষ্টি করেছেন কিশোর দেবরটির মায়াবী জগৎ। সে কি কবি কখনও ভুলতে পারেন? লেখক অমিত মণ্ডল সেই সুরেই নিজের লেখনিকে বেঁধেছেন, পড়তে গিয়ে এটাই মনে হয়েছে।

    বইটির বাঁধাই ও অক্ষর বিন্যাস বেশ ভালো। কিছু ত্রুটি থেকে গেছে। মৃণালিনী দেবীর বংশলতিকায় রেনুকা-সত্যেন্দ্রনাথের পুত্র-কন্যা হিসেবে নীতিন্দ্রনাথ-নন্দিতার নাম প্রমাদবশত মুদ্রিত হয়েছে। ৪৩ পৃষ্ঠায় উল্লখিত হয়েছে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নাটক ‘দায়ে পড়ে দ্বারগ্রহ’, হবে ‘দায়ে পড়ে দারগ্রহ।’ ১০৫ পৃষ্ঠায় ‘বেলি বা রেণুকার মৃত্যুর দিনে’ কথাগুলি হবে না কারণ কবিকন্যা বেলা জোড়াসাঁকো বাড়িতে মারা যাননি।

    সবশেষে বলি, পাঠকদের এই বই আশা করি ভালো লাগবে। কাদম্বরী ও মৃণালিনী— রবীন্দ্র আলোর জ্যোতিতে এই দুই নারী আলোকিত। কাদম্বরী আমৃত্যু স্বপনচারিণী। ‘জীবিত ও মৃত’ গল্পের ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই।’ কাদম্বরীর পূর্ব নাম কাদম্বিনী আর আলোর কাঙাল রবীন্দ্রনাথের কাছে স্ত্রী মৃণালিনী আত্মার আত্মীয়া। লেখকের সঙ্গে এই ভাবনায় একমত হতে বাধা নেই।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments