


১
পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে বিধবা হয়েছিল অপ্সরা পাল। এখন সে পঞ্চাশ। বয়স হলে কী হবে, আগের মতই রূপ আর যৌবন আছে তার। এখনও পুরুষেরা তাকে ফিরে ফিরে দেখে, তাকিয়ে থেকে মুগ্ধ হয়; তার সঙ্গলাভে উৎসুক জনতাও কম নেই। বছর পাঁচেক আগে একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছে সে। এখন সে ঝাড়া হাত-পা। এখন যদি পাকাপাকিভাবে নতুন করে কোনো সম্পর্কে জড়ায়, তাতে অসুবিধে নেই। তাকে বিয়ে করতে চায়, কাছে পেতে চায়, এই বয়সেও— এমন পুরুষের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু অপ্সরা পাল আর সে পথে পা দিতে রাজি নয়। পুরুষের মুগ্ধ দৃষ্টিটুকু অব্দি ঠিক আছে; সঙ্গে একটু হাসি, গায়ে গা ঠেকা, আদুরে কথা, হালকা রসাত্মক—এই অব্দিই, তারপরে আর নয়; বেশিকিছু নয়। তার মেয়ে ছোট থাকতে যা হবার হয়েছে, অনেকের সঙ্গেই হয়েছে; তখন বয়স ছিল, যৌবন ছিল, শরীরে জ্বালা ছিল, মনের খিদে মেটানোর ব্যাপার ছিল। কিন্তু এখন আর এগোনো যায় না। সে এগোতে চায়ও না। বদলে সে চায় সোহাগি হাজরার ভিটেটুকু।
মেয়ের বিয়ের পরে সে এখন একাকী। একার জীবন। পুরাতন পুরুষদের চেয়ে, নতুন পুরুষের আনাগোনার চেয়ে এখন মাঝে মাঝেই তার মানসপটে ভেসে ওঠে সেই বাড়িটি। বাড়ির মানুষগুলোর কথা মনে পড়ে। বাড়ির মধ্যে অবস্থান করে থাকা সেই সুন্দর, মনোমুগ্ধকর গন্ধটুকু যেন এখনও নাকে ভাসে। আর সোহাগির সেই স্নিগ্ধ, সুন্দর, নরম চাহনির কথা নিরন্তর ভেসে ওঠে মানসপটে। সোহাগির সেই মিষ্টি-মিষ্টি, মেপে মেপে উচ্চারণ; আপনজনের মত ব্যবহার—সব মনে পড়ে। অথচ এতগুলি দিন সে যেন ভুলেই ছিল সেসব। আর এখন, এই বয়সে, একাকী হবার পরে, দেহসুখের চিন্তা থেকে দূরে থাকার চেষ্টায় কোনো ঈশ্বর তার চেতনায় আসে না, কেবল আসে সোহাগির সেই বাড়িটির কথা, সোহাগির কথা; সেই বাড়িতে কাটানোর মুহূর্তগুলির কথা। সোহাগি আজ আর বেঁচে নেই, সেটা অনুমানে কোনো ভুল থাকার কথা নয়। কিন্তু সেই বাড়িটি? সেই আদুরে সোহাগ? সেই সুগন্ধ? সেও কি আজও আছে সেদিনের মতন? বড় জানতে ইচ্ছে হয়।
সোহাগির ভিটে এখানে নয়, এখান থেকে অন্তত কিমি পনেরো দূরে, গণেশপুর গ্রামে। সেই গ্রামে ছিল অপ্সরার মামার বাড়ি। মামার বাড়ি এখনও আছে বটে, তবে কারও সঙ্গে আর তেমন যোগাযোগ নেই। মামারা সব মরেছে, এক মামাই কোনোক্রমে টিঁকে আছে; যাই বললেই তার যাওয়া হয়ে যায়। অপ্সরার মা যতদিন বেঁচে ছিল ততদিন ক্ষীণ হলেও একটা যোগাযোগ ছিল, এখন একেবারে পুরোপুরি স্টপ। এতদিন পরে অপ্সরার খেয়াল হল, একবার মামাদের খোঁজ-খবর করলে হয়। মামাদের খোঁজ পেলেই তবে সে যেতে পারবে সোহাগির সেই ভিটেতে।
মামাদের প্রতি অপ্সরার যা টান ছিল, সেটা ছেলেবেলায়। বড় হতে হতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা কেটে যায়। তাছাড়া একদম প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্যে মামাবাড়ি হওয়ায়, ছোটবেলায় জলা-জঙ্গল, পুকুর-খাল-বিল-কচুরিপানা, নানান পাখি-পতঙ্গ-শিয়ালের ডাক ভালো লাগলেও বড় হবার পরে সেই মুগ্ধতাবোধও আর নেই। পরে পরে আসা-যাওয়া উঠেই যায় প্রায়।
একটা লাল-হলুদ শাড়ি, সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ পরে, ফিটফাট সেজেগুজে সে চলল মামাবাড়ি। যথারীতি পঁচিশ থেকে পঞ্চাশ—সব চোখ তার দিকেই। এখন আর কোনো সম্পর্কে জড়াতে না চাইলেও ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করে অপ্সরা। তাকে দেখে বোঝাই যাবে না তার বয়স পঞ্চাশ, সে মেয়ের বিয়ে দিয়েছে, পনেরো বছর আগে সে বিধবা হয়েছে। টকটক করছে তার গায়ের রঙ। কাটাকাটা চোখ, মুখ, টিকালো নাক। রোগা, লম্বা চেহারা। কানের পাশ দিয়ে ঝুলছে দু-চার গাছি চুল। দেহের কোথাও সে এতটুকু মেদ জমতে দেয়নি। তাকে দেখে বয়স অনুমান করা শক্ত। অচেনা লোকে দেখে তাকে এইটুকু ভাববে যে তার বয়স হবে খুব জোর পঁয়ত্রিশ বা ছত্রিশ।
অপ্সরাদের বাড়ি চণ্ডীতলায়। সেখান থেকে সে ছাব্বিশ নম্বর বাস ধরে মশাতে নামল। তারপরে একটা অটো করে জিয়াড়ার মোর। তারপরে সেখান থেকে মিনিট পনেরোর হাঁটাপথে তার মামাবাড়ির গ্রাম গণেশপুর।
তাদের চণ্ডীতলাও পঞ্চায়েত এলাকার মধ্যে পড়ে। কিন্তু এই গণেশপুর যেন সময়ের থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। আর গ্রামটা আগে যেমন দেখতে ছিল তেমনিই আছে। কেবল রাস্তাগুলো ঢালাই হয়েছে, এই যা। আর এই গ্রামে একজন খ্রিশ্চান হয়েছে, এখন তার তিনতলা পাকা বাড়ি।
সে জানে মামাবাড়ির অনেকেই হয়ত তাকে চিনতে পারবে না। অনেকেই হয়ত তাকে দেখে অবাক হয়ে যাবে। এমন অবস্থা তারও হবে। মামাতো ভাইদের ছেলেপুলেদের তার চেনার কথা নয়। বা তাদের বিয়েতে এলেও বউদেরও আজকে গিয়ে নতুন করে চিনতে হবে। আর সেই চেনা-জানার পর্ব মিটিয়ে সে যাবে সেই বাড়িটিতে যেটা যাবার জন্যেই তার আজ মামাবাড়িতে আসা। সেই সোহাগি হাজরার বাড়িতে যাবে সে। সেই কোন ছেলেবেলাতেই সে সোহাগিকে প্রৌঢ়া দেখেছিল, আর আজ সে নিজেই পঞ্চাশ। সোহাগি যখন মারা যায় তখন অপ্সরা খবর পেয়েছিল বটে কিন্তু নিজের সংসার ছেড়ে আর আসা হয়নি। এখন সেই ভিটেতে থাকার কথা তার ছেলেপুলের। অবশ্যি তারা থাকলেও হবে। সে একবার সোহাগির ভিটেটুকুকে দেখতে চায়, ছুঁতে চায়। জীবনের এই মধ্যপর্বে বা অনেকটা প্রাণ নিজের মধ্যে শেষ করে এসে সে চায় এখন এই ভিটের স্পর্শটুকু। আর কিছু চাইবার নেই তার।
সোহাগির গায়ে এক ধরনের চন্দনের গন্ধ ছিল - ভোরবেলাকার পুজো থেকেই লেগে থাকত তা। দিনরাত্তির সব সময়েই এই সৌরভ তাকে ঘিরে থাকত সুসংবাদের মতন। স্বামী গেলেন, একটি দুটি মেয়ের কপাল পুড়ল। ছেলেরা বাইরে চলে গেল। তখনো তিনি সেই চিরন্তন সন্ন্যাসিনী, শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে ব্যস্ত; দেখলে কে বলবে তার জীবন এক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ছোটবেলায় সোহাগির সঙ্গে তার হাজারো কথা হত। এটা কেন সেটা কেন, কৃষ্ণের হাতে বাঁশি কেন, বাঁশি কিসের বানানো, বাঁশিতে কখন কৃষ্ণ ফুঁ দেন, এখানে কি কৃষ্ণের ময়ূর আসে? ডাকে? ইত্যাদি নানা প্রশ্নে সে ব্যতিব্যস্ত করে তুলত সোহাগিকে। বলত, তুমি ভূতের ভয় পাও?
না-রে।
তবে কাকে ভয় পাও?
বিষয়-সম্পত্তিকে আমার খুব ভয় করে।
আর কারোকে ভয় পাও না?
ধুলোকে।
ধুলো!
হ্যাঁ। সবকিছুই তো একদিন ধুলো হয়ে যায়—মানুষের জীবন, ইতিহাস, গৃহপালিত পশু, সম্পর্ক—সব। ধুলোই জগতে সত্য।
আর ধুলোর পর?
ধুলোর পর!
হ্যাঁ, ধুলোর পরে কী?
এটা তো ভাবিনি! সত্যি তুই আমাকে অবাক করলি, ধুলোর পরে কী? সত্যি! এইটুকুখানি মেয়ে তুই, মনের মধ্যে এত প্রশ্ন? এর উত্তর আমার জানা নেই।
তবে জেনে নাও শ্রীকৃষ্ণের কাছে।
আহা, কী বললি!
তোমার আরাধ্য তো তিনি।
তিনি তো আনন্দ।
এসব কথাগুলো এখন অপ্সরার মনে হয়। কত ছোটবেলার কথা, মনের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিল এইসব আলাপচারিতা, দীর্ঘ সংলাপ ও প্রগাঢ় বন্ধনগুলি। এখন তা ভেসে উঠছে আবার। ভেসে উঠছে মনের জল-তরঙ্গে। এতদিন ধরে যা রয়ে গেছিল মনের মণিকোঠায়। গোপনে। এখন তারা জানান দিচ্ছে নিজেদের অস্তিত্ব। যেন বলছে, আছি, আছি। তুমি আমাদের ভুলে যেতে পারো, আমরা ভুলিনি নিজেদের। তোমার মনের অতল থেকে ভেসে উঠছি শ্যাওলা জড়িয়ে। দেখো তো, আমাদের চিনতে পারো কিনা?
আর সেই নিয়ে কেমন যেন বি-মনা হয়ে যাচ্ছে সে।
সারাজীবনটাই মনে হয়, খুব একা ছিল সোহাগি। যখন সকলে তাকে ঘিরে থাকত, তখনও। তারপরে একদিন দীক্ষা নিয়ে এলেন নবদ্বীপ থেকে। যেন নিজের একাকীত্বকেই স্বীকৃতি দিলেন তিনি।
গণেশপুরের পথে যেতে যেতে অপ্সরার মনে হয়, অজ্ঞাতে ঐ একা থাকার দীক্ষা আমিও নিয়ে থাকতে পারি। হয়ত নিয়েওছি। হয়ত সেদিনই। সেই ছেলেবেলাতেই। হয়ত সোহাগির হাতেই। আর হয়ত তাই, এইভাবে এখানে আসা; কত বছর পরে? আসা, কিন্তু কেন আসা? দীক্ষার ঠিকানা পাকাপাকিভাবে চিনতেই কি? এর উত্তর অপ্সরার কাছে এখন নেই।
গ্রামের মধ্যে সে যতটুকু পথ হাঁটল, দেখল তাকে কেউ চিনতে পারছে কিনা। কেবল নিজের মামারাই নয়, গ্রামের সকল পুরুষই তখন ছিল মামা, মেয়েরা মামি বা মাসি। সেসময় গণেশপুরের পথে পা রাখলেই কেউ না কেউ বলত, রতনের ভাগ্নি না তুই? কেউ জানতে চাইত, এই আসছিস বুঝি?
আর আজ? কেউই তাকে চিনতে পারছে না। পুরানোরা কেউই চিনল না তাকে! দাঁড়িয়ে দু-দণ্ড কথা কইল না! হাঁটার সময় কেউ তার দিকে দেখল, কেউ দেখল না। কেউ তাকে চেনার চেষ্টা করল, কেউ করল না। সে এক চরম উৎকণ্ঠায় হাঁটতে লাগল। বহিরঙ্গে না বদলাক, অন্তরঙ্গে অনেক বদল ঘটেছে গ্রামের মানুষের। গ্রাম আর সেই গ্রাম নেই। কখন যে সে গিয়ে পৌঁছবে সোহাগির বাড়ি!
২
ছোটবেলায় মামাবাড়িতে থাকাকালীন যখনই তার মনে পড়ত অমনি ছুটত সোহাগির বাড়ি। মাঝে মাঝে দেখত বাড়িতে সবাই আছে, কেবল সোহাগিই নেই। ফিরলে, বা পরেরদিন দেখা হলে অপ্সরা বলত, সারাদিন বাড়ি থাকো না কেন? কতবার তোমাদের বাড়ি আসি বারে বারে ফিরে ফিরে যাই।
আমাকে খুঁজতে এসেছিলি বুঝি?
তোমাকে তো আমি খুঁজবই।
আমাকে ভালো লাগে এত?
খুব লাগে। তুমি কোথায় যাও একা একা? আমি শুধু পথে পথে ঘুরি।
কী আছে পথে?
ধুলো।
সেই ধুলো?
হ্যাঁ-রে; সেই ধুলো।
ধুলো থেকে কী হয়, বললে না?
সেই উত্তর খুঁজতেই পথে বেরোই।
রাস্তায় তো ধুলো থাকবেই। বাড়তি কী আছে?
শুনে মাসি ভারি ভাবনায় পড়ে যেত। তাই তো, আর কী আছে? তুই যে দেখি আমাকে বারে-বারে ভাবনায় ফেলিস তোর কৌতূহলে। তুই বল দিকি, কী উত্তর দিস তুই।
উঁ…
ভাবনা ছেড়ে এবার বল দিকিনি, কী আছে? তুই পারবি, বল।
ঠাকুর। ঠাকুর আছে।
ঠিক বলেছিস। ধুলোতেই ঈশ্বরের বাস। একদম ঠিক কথা। কীভাবে বলিস তুই এমনি করে?
এমনিই বলি।
কেউ কি তোর মুখে উত্তর জুগিয়ে দেয়?
কে জোগাবে?
কেউ কি তোর মনে প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে?
কে তুলবে?
তিনি ঈশ্বর।
কৃষ্ণ?
হতেই পারে।
তার জন্যে পথে বেরুতে হবে কেন?
পথ তো কারু নিজস্ব নয়। তাই। তোমার কাছে সে তোমার, আমার কাছে সে আমার। পথই আসলে জীবন। মানুষের জীবন।
অপ্সরার সব গুলিয়ে যেতে থাকে। তখন যেত। এখন মনে হয়, সোহাগির কথাগুলোর মধ্যে একটা হেঁয়ালি থাকত। সোহাগি পথে যেতে যেতে আমলকি কুড়ায়, আম-জাম লিচু তুলে নেয়—পথই সব। তখন যে খুব অভাব, তা নয়। তবে বোঝা যায়, এসব কুড়াতে, ফুলে-ফলে, পাখির ডাকে আর প্রকৃতির সঙ্গে থাকতে মাসি খুব ভালোবাসে।
মামাবাড়ি এসে তার অবাক হবার পালা। যে আনন্দ বুকে চেপে, যে উৎফুল্লতার সঙ্গে সে এত দ্রুত হাঁটাপথটুকু পার হয়ে এল, দেখে সেখানে মামারা কেউ নেই!
৩
অপ্সরার দুই মামা আর দুই মাসি। তার মাকে নিয়ে মোট পাঁচ ভাইবোন ছিল মামারা। বছর কুড়ি আগে মামারা ‘আমাদের কোনো বোন নেই’ এই মর্মে কাগজপত্র তৈরি করে বাড়ি-জমি সব নিজেদের নামে করে নেয়। মামারা এখন আর বেঁচে নেই। শহরের কোথায় তাদের পুত্র-কন্যারা ঠাঁই নিয়েছে তা গ্রামের লোক জানে না। গ্রামের কারো সঙ্গে মামাদের ছেলে-মেয়েরা কোনো যোগাযোগ রাখে না, পুরাতন ভিটেতে আসেও না। এই বাড়ির ভবিষ্যৎ নিয়ে গ্রামবাসীরা নানাকথা আলোচনা করে।
মামাবাড়ি তালা-মারা অবস্থায় পড়ে আছে দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল অপ্সরা। অনেকদিন বাদে মনের মধ্যে যে আলো জ্বলে উঠেছিল, এক লহমায় কেউ যেন তা ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল। কী হবে এবার? সে ভেবেছিল পুরানো সমস্যা মিটিয়ে সে কদিন থেকে যাবে মামাবাড়িতে। তারপরে যোগাযোগ করবে পাশের পাড়ার সোহাগির বাড়ির সঙ্গে। কিন্তু বাস্তবচিত্র অন্য। এখন কী করবে সে?
অপ্সরার বড়মামা ছিল অবস্থাপন্ন লোক। এলাকার মধ্যেই বড় ব্যবসা ছিল। ধান-চালের কারবার ছিল। সঙ্গে বাজারে সারের দোকান। সব ক্ষয়ে গেল মাত্র এই কয় বছরেই? কী এমন হল!
বড়মামার দুই মেয়ে। বড়মামা তাদের বিয়ে চুকিয়ে দিয়েছিল অনেকদিন। মামা দিনরাত ঠাকুরের মালা জপে যেত, বড়মামি কিন্তু এমন ছিল না। সংসার নিয়েই থাকত। বর্ধমানের বনগ্রামের কোথায় এক গুরুর কাছে বড়মামা দীক্ষা নিয়েছিল, প্রতিমাসে একবার করে তার সেখানে যাওয়া চাই। নিজে যেত, একলা; কখনও পাড়ার লোক, বাড়ির লোক, বড়মামিমাকেও নিয়ে যেত। কিন্তু বড়মামিমা যেতে চাইত না। মাকে দু-একবার নিয়ে গিয়েছিল, মায়ের ভালো লাগেনি—দু একবার গিয়ে আর যায়নি। সেই লোক, এমনি করে “আমাদের কোনো বোন নেই” দেখিয়ে সব সম্পত্তি নিজেদের নামে করে নিল দেখে অপ্সরার মা ও মাসি খুব হতবাক হয়ে গেছিল। ধর্মকর্ম করা একটি মানুষ এতটা কুটিল কী করে হতে পারে, সেটা অপ্সরার মা মাসি ভাবতেই পারেনি। মায়ের সেসময় মনে হয়, ধর্ম করে তাহলে দাদার কী লাভ হল? ধর্ম মানুষকে এই শেখায়? ধার্মিকের সঙ্গে অধার্মিকের তাহলে তফাত কী রইল? সেই থেকে মা ধর্মের ব্যাপারে, দীক্ষা নেবার ব্যাপারে খুব ক্ষিপ্ত হয়ে গেছিল। বলেছিল, দীক্ষা নেয় মানুষ, কিন্তু তা থেকে কোনো শিক্ষা নেয় না। নিজ ব্যবসা বাড়ানোর জন্য ধর্ম হল একটা ছলমাত্র।
পরে একসময়, অপ্সরার মা এটি নিয়ে খেদ করলে বড়মামা বলছিল, কিছু করার ছিল না-রে বনো, তোর জন্যে আমি ডরাই না, আমি ভয় পেতাম নিলুকে। কেন? ওকে তো জানিস। একে ওর জন্যে ছেলে মিলছিল না, এমন খাণ্ডারনি; পাড়ার কারও সঙ্গে সদ্ভাব রাখল না, ওর মুখের উপর কেউ কথা বলতে পারত না, কাউকেই ও মানেনি কোনোদিন, তাই শেষমেশ যা পাত্র জুটল তার গলাতেই ওকে ঝুলিয়ে দিয়ে বাবা-মা পরিত্রাণ পেয়েছিল, মনে আছে তোর? শেষমেশ পাত্র যাও বা মিলল তারা হল বাঙাল; ভারতীয় সেনার সৈন্য, চাকরি থেকে অবসর নেবার পরে যা টাকা পেল, মদ খেয়ে সব টাকা ফুটিয়ে দিল। কথায় আছে বসে খেলে রাজার ভাণ্ডারও শেষ হয়। ওদের তাই হল। নইলে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে সকলেই কিছু না কিছু করে। কেউ ব্যাঙ্কে সিকিউরিটির কাজ করে, কেউ বা অন্য কিছু, বড় বড় কোম্পানিতেও ওদের সিকিউরিটি হিসেবে নিয়োগ করে। কিন্তু আমাদের ছোট জামাই কিছুই করল না। চাকরি যেতে ঘরে বসে গেল। নিজে না কিছু করতে পারল, না পারল ছেলেদের মানুষ করতে। মদ খেয়ে খেয়ে ছোট জামাইয়ের পেটটাই মদের পিপে হয়ে গেছিল। তোর মনে আছে আমাদের মা আড়ালে বলত, পেট তো নয়, যেন জালা। সেই প্রাণাধিক মদই ওর প্রাণ হরণ করল। ওর ছেলেরাও তেমন কিছু করতে পারেনি, সেটা তোর অজানা নয়। একজন অটো চালায় তো অপরজন মুরগির দোকান দিয়েছে রাস্তার ধারে। যেদিন অপারেশন সানসাইন হবে, সেদিন ওকেও তুলে দেবে, আমি ভয় পেয়েছিলাম, আমাদের ছোটবোন যদি বাপের সম্পত্তি দাবি করে তখন আমরা কোথায় যাব? আমাদের ছেলেপুলেদের কী থাকবে? আর দাবি করলেই তা আমরা দেব কেন? এত কষ্টে বাপের সম্পত্তি আগলে রেখেছি, বাড়িয়েছি। এখন যদি কেউ এসে বলে, আমাকেও ভাগ দিতে হবে, ভালো লাগে? বল?
মা প্রশ্ন তুলেছিল, ও যদি মামলা করে? বড়মামা ঠোঁট উলটে বলেছিল, সে খ্যামতা ওর নেই। বলে হেসেছিল।
আর আমি যদি করি? বলে ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটিয়েছিল অপ্সরার মা। শুনে বড়মামা থমকে গেছিল।
দিন চলে গেছে। সময় বহিয়া যায়। নদী যায় জল যায় মানুষ চলে যায়। যায়, কিন্তু কিছুই নিয়ে যেতে পারে না। নদী যেমন তার জলে ছুঁড়ে দেওয়া সমস্ত কিছুকে পাড়ে ফিরিয়ে দিয়ে যায়, মানুষকেও তাই করতে হয়। তবুও সারাদিন জুড়ে শুধু আমার আমার চিৎকার! হাতে মালা নিয়ে সারাক্ষণ আমি আমি, আমার আমার জপ করতে করতে বড়মামা চলে গেল। কিছু নিয়ে যেতে পারল না। সর্বক্ষণ ‘আমি আমি’ আর ‘আমার আমার’ করার মানুষটি ধর্মকেও নিয়ে যেতে পারেনি। ধর্মাচরণ করলেও হয়ত ‘ধর্ম’ মামার সঙ্গে ছিল না। অত কষ্টে আগলে রাখা বাড়ি এখন ধ্বংসস্তূপ প্রায়!
মামাবাড়ির এই অবস্থা দেখে সে খানিক থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। পুরানো কথা সব মনে পড়ছিল। সম্পর্কটা এখান থেকে সেই-যে খারাপ হয়ে গেল, আর দাঁড়াল না। সে তখন পায়ে পায়ে গেল সোহাগির বাড়ির দিকে। আসলে সে এই কারণেই তো এসেছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে কী দেখবে সে? কেউ তাকে চিনতে পারবে? চিনলেও কাছে টেনে নেবে? ঠাকুরঘরটা দর্শন করতে দেবে? সেখানে বসতে দেবে খানিক? কে-কে এখন থাকে সোহাগির বাড়িতে?
কিন্তু সেখানেও গিয়ে দেখল এক অন্য চিত্র। এখন সেখানেও কেউ থাকে না। বাড়ি ফাঁকা! সোহাগির বাড়িতে ছেলেপুলেরা কেউ নেই বটে, তবে অতবড় বাড়িখানা তারা হাতছাড়া করেনি। নিজেরা শহরে থাকে, পালা-পার্বণে আসে; আর বাড়ির দেখভালের জন্যে রেখে দিয়েছে পাড়ারই এক বিধবা বুড়িকে। তার নাম ষষ্ঠী দুলে। প্রত্যহ সে-ই বাড়ি খুলে ঝাঁটপাট দেয়, তারপরে ঠাকুরকে জল-বাতাসা দিয়ে তবে সে ঘরে যায়। ফের আসে বিকেলে। ঘরে সন্ধে দেয়, ঠাকুরের জল-বাতাসা বদলে দেয় আর উঠোনে তুলসিতলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখে।
৪
ঠাকুরের কৃপায়, যখন সোহাগির বাড়িতে প্রবেশ করল অপ্সরা তখন সেখানেই উপস্থিত ছিল ষষ্ঠী। অপ্সরা তাকে না চিনতে পারলেও সে ঠিক চিনতে পারলে, বললে, তুমি বনলেখার মেয়ে না?
ঘাড় নাড়ে অপ্সরা। হ্যাঁ। ঠিক চিনেছ। তুমি?
আমাকে চিনতে পারলে নে?
অপ্সরা মাথা নিচু করে থাকে। লজ্জা পায়। বলে, একদম ভুলে গেছি, কতদিন আসি না।
আমি তোমার ষষ্ঠীমাসি, মনে পড়ে?
হ্যাঁ, এইবারে মনে পড়ল তার। যতবার সে এখানে এসেছে ততবার সে এই বাড়িতে ষষ্ঠীকে দেখেছে। এখন কত বুড়ি হয়ে গেছে মাসি। সব চুল পেকে গেছে। তবে একটা জিনিস বদলায়নি, মাসির চেহারা। ঠিক তেমনি রোগাই রয়ে গেছে।
ষষ্ঠী এবার তুই করে কথা বলতে থাকে। সে বললে, আমি তোকে চিনব নে? তখন কত মামাবাড়িতে আসতিস, তা কি আমরা সব ভুলে গেছি। আর তোর মা-ও বাপের বাড়ি বলতে ছিল অজ্ঞান। ওঃ, কীসব দিন ছিল তখন! এখন তোর মামাবাড়ি ভোঁ-ভা। অত দপদপানি সব শেষ! তোর বড়মামা মল্ল রাস্তায় পড়ে, হার্ট এরট্যাক। ছোটোমামা আগেই গেছিল, তিনদিনের জ্বরেই সব শেষ। তার ছেলেপুলেরা সব—বাপের ভিটেতে কার কত অধিকার—এই নিয়ে ঝামেলায় জইড়ে পড়ে বাড়িতে তালা ঝোলালো। সেই ফয়সালা আজও হয়নি—এইসব জানিস?
না। বলে মাথা নাড়ে অপ্সরা। আর মনে মনে ভাবে, এই হয়। এটাকেই বলে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। যে জিনিস তোমার নয়, সেটা শেষ অব্দি তোমার থাকেও না। ঈশ্বরের খেলা এখানেই।
জানবি কী করে, জানার কথাও নয়। মন ভেঙে গেলে সম্পর্ক থাকে নে। ষষ্ঠী নিজের খেয়ালেই বলে চলে।
ওরা সব কোথায় গেছে? জানতে চায় অপ্সরা।
শুনেছি তোর ছোটমামার এক ছেলে বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে ঘরজামাই থাকে। আর মেয়েটার বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু সংসার হয়নি। জামাইটা ভালো নয়। হাতটানের দোষ আছে। তোর মামাতো বোনের ব্যাঙ্কে যত টাকা ছিল সব হাতসাফাই করে কেটে পড়েছে কোথাও। তাকে এখন কে দেখবে, শ্বশুরবাড়ি নেয় না। ওরা বলে, তোর মামাতো বোন এক মুসলমান লেবারের সঙ্গে পালিয়েছিল, তাই ওকে তারা তাড়িয়ে দিইছে, এর সত্যি-মিথ্যে জানিনে। সে এখন কোনো এক হোমে থাকে। আর বড়মামার দুই মেয়ে। ওদের বিয়েতে এসেছিলিস?
অপ্সরা মাথা নাড়ে, হ্যাঁ।
একজন তো পাইলে গিয়ে বাগদিদের ছেলেকে বিয়ে করল। এখন সেখানে নিত্য ঝামেলা। বড় মেয়েটাও ভালো নেই, জামাই বেকার। তোমার বড়মামা ছেলের বাপের পয়সা আছে দেখে মেয়ের বিয়ে দিল। ছেলে কী করে তার খোঁজ নিল না। মেয়েটা এখন শ্বশুরবাড়িতে ঝিয়ের মত খাটে, তবে দুটি খেতে পায়। কী ছিল তোর মামাবাড়িটা, আর কী হল! দেখলে দুঃখ হয়।
বাড়িতে তালা পড়ল কেন?
তোর দুই মামার দুটি করে চারজন ছেলেপুলে। কে ভাগ পাবে না পাবে, কে কোনদিকটা নেবে, কটা গাছ নেবে, কতটা জমি নেবে—এইসব নিয়ে বাদ-বিবাদ, মারপিট অব্দি হয়েছে। তারপর থেকে বাড়িতে তালা ঝোলানো আছে, হিসেব হয়নি। ছোটমামার ছেলের বক্তব্য, আমাদের ঠকানো হচ্ছে, আমরা কম পাচ্ছি। আর বড় তরফের কথা হল গিয়ে, বাবা আমাদের যা বলে গেছে আমরা সেইভাবে চলছি। তাও সে হয়ে গেল অনেকদিন। এখন আর কেউ আসে না খোঁজ-খবর করে না। অনেকে বলে মামলা চলছে, মামলা কোর্টে উঠেছে, ফসসালা এখন যা করার করবে সেই কোর্ট।
এমন ব্যাপার।
কার পাপে কে ভোগে!
অপ্সরা স্মিতমুখে চুপ করে রইল। ভাবল, পাপ লেগে থাকে বংশে।
এমনটা হবারই ছিল। ঈশ্বর সব দেখেন, সময়মত জবাব দেন। তা তুই এতদিন পরে?
এমনি।
এমনি বললে আমি শুনব কেন। কিছু ব্যাপার আছে তোর। নইলে এই যে একযুগ পরে মামার বাড়ি এয়েচ, সে কি মামাদের খোঁজে? মুখ দেখে তো তা মনে হচ্ছে না।
অপ্সরা বলল, তোমার বাড়িটা কোথায়?
ভুলে গেলি?
শুনে লজ্জা পেল যেন অপ্সরা। বলল, সত্যি ভুলে গেছি, কিছু মনে কোরো না মাসি। এই কয় বছরে গ্রামে এত বদল ঘটেছে যে কার পাশে কোন বাড়ি তা ঠাওর করা মুসকিল। পাকা একতলা দোতলা হয়েছে, মাটি ভেঙে কোটা গড়েছে, ফাঁকা জায়গা-জমি আর নেই। তাহলে চিনব কী করে? পাড়ার মধ্যে ঘুরলে, নজর করে দেখলে হয়ত চিনে ফেলতাম। বলে, আবার এই প্রসঙ্গ ঘোরাতে বলল, মাসি তোমার ছেলেপুলে? তারা কোথায় থাকে না থাকে…।
সে তার বাপের ভিটেতেই।
আর তুমি? এখানেই থাকো?
হ্যাঁ, আমি থাকি আমার বাপের ভিটেতে। ছেলে জায়গা না দিলে যা হয়।
অপ্সরা চুপ করে গেল। বুঝল, কিছু একটা গোলমাল আছে। মাসির জীবনটা সহজ নয়। অবশ্যি সেদিক দিয়ে দেখলে কোনো মানুষের জীবনই সহজ পথে এগোয় না। জীবন যত গড়ায় তত জটিলতা-কুটিলতার মধ্যে ঢুকে যায়। সেই জটিলতা থেকে কোনো মানুষের নিস্তার নেই।
অপ্সরা বলল, এই বাড়িটার কথা আমার মাঝে মধ্যেই মনে পড়ে মাসি। আরও ভালোভাবে বললে, মামাবাড়ির চেয়ে এই বাড়ির কথাই বেশি মনে ভাসে। এখানে সেই ছেলেবেলার স্নিগ্ধতা, গন্ধটা, ভালোবাসাটুকু যেটুকু পড়ে আছে আলগোছে—মাটিতে ঘরে-দোরে, ডালপালায়— তার শেষটুকু নিতে এলাম গো মাসি। ঠাকুরঘরটা একবার খুলে দেখাবে আমায়?
এমনি শুনে ষষ্ঠী খুশি হয়। বলে, বেশ বেশ। বাড়ির চাবি আমার হাতে। এখন আর কেউ থাকে না। ও বংশের কেউ থাকে কলকাতায়, কেউ দিল্লি, কেউ আমেরিকা না কোথায় যেন, সে কোন বিদেশে। এখন আমি এ বাড়ি দেখভাল করি। আয়।
মন্দির ঘরটি খুলে দিল ষষ্ঠী। পায়ে পায়ে ঘরে প্রবেশ করল সে। বেশ আলো আছে। আর আলো আছে কষ্টি পাথরের মূর্তিতে। ঠাকুরের মুখে সেইদিনের হাসিটি ঠিক লেগে আছে। দেখে মনটা ভরে গেল তার। সে মাটিতে হাঁটু পেতে প্রণাম করল। বলল, মাসি, প্রসাদ আছে?
খাবি? আছে, অনেক আছে, এই নে।
বলে রেকাব থেকে নানা ফলের টুকরো, বাতাসা, চিনির দানা তার হাতে তুলে দিল ষষ্ঠী। বলে, বাবুরা টাকা পাঠায়, সেই টাকায় ঠাকুরের নিত্য সেবা হয়। আমার উপরে সব ভার। ঘর-দোর খেয়াশোনা থেকে বাড়ি পোষ্কার রাখা—সব। তুই এলি, কদ্দিন পরে তোকে দেখলুম, মনটা ভাল হয়ে গেল। আয়, বোস। দীক্ষা নিয়েছিস?
বলে দুয়ারে চ্যাটাই পেতে দিল সে। অপ্সরা বসল। আর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল গোটা বাড়িটিকে, যা দেখার জন্যেই তার এখানে আসা।
৫
বাড়িটি মাটির। না, পুরোপুরি তা মাটির নয়। দেওয়ালের অর্ধেক মাটির, বাকি ইটের। মাথায় টালিখোলা চাপানো। একদিকে দুটি বড় বড় ঘর, তারই লাগোয়া ঠাকুরঘরটি। উল্টোদিকে আছে রান্নাঘর, মাটির দাওয়া যেখানে বসে দুপুরের ভাত খাওয়া হত। রান্নাঘরের পাশে একটি চালা, যেখানে বাড়ির নানান জিনিসপত্র রাখা হত। এই দুইয়ের মাঝে আছে প্রশস্ত উঠোন। সেখানে চাঁপাফুলের গাছটা আজও আছে, তবে অনেক বড় হয়ে আরও উঁচুতে উঠে গেছে। সোহাগি যখন সন্ধেতে ঠাকুরকে জল-বাতাসা দিত তখন ফুলগুলি থেকে সুবাস ছড়াত। টুপটাপ করে ফুল ঝরে পড়ত গোটা উঠোনে। পুরো বাড়ির চৌহদ্দি ঘেরা ছিল মাটির প্রাচীর দিয়ে, সেই প্রাচীরের মাথা ঢাকা দেওয়া থাকত টালি-খোলায়। আর প্রাচীরের গা বরাবর বসানো থাকত নানা ধরনের ফুলের গাছ। গাঁদা, রজনীগন্ধা, বেল, জবা, জুঁই, টগর আর ফাঁকে ফাঁকে বেড়ে উঠল তুলসীর গাছ। দুই জাতের তুলসী থাকত। কৃষ্ণ তুলসী আর রাধা তুলসী।
এখনও তেমনি আছে বাড়িটি। কেউ থাকে না, তাই পরিবর্তন হয়নি।
তারপরে ষষ্ঠী যখন শুনল তার মামাবাড়িতে আসার আসল কারণ তখন বললে, মামাবাড়িতে আজকে তালা পড়েছে বলে তুই ফিরে যাবি? কেন? তোর এই ষষ্ঠীমাসি আছে কী করতে? তাকে তোর কোন কাজে লাগবে? তুই এই বাড়িতেই থাকবি। বৌদি আজকে বেঁচে থাকলে কী তোকে এইভাবে ফিরে যেতে দিতে দিত?
অপ্সরা আপত্তি করেছিল। কিন্তু ষষ্ঠী কোনো কথাই শোনেনি। সে বলেছে, এখানের সব ঘরের চাবি আমার কাছে থাকে। বাবুরা এসে যে ঘরে থাকে সেই ঘরের চাবি ছাড়া। সেটা বাদ দিয়ে সব ঘরই ভালো। তুই পছন্দমত একটা বেছে নিয়ে থাক; থাকো যতদিন মন চায়।
এতকরে যখন বলছ একদিন থেকে যাব আজকের রাতটা। সকাল হলেই ফিরে যাব।
সেটি হবার নয়। এ বাড়িতে তুই নিজের ইচ্ছেয় ঢুকতে পারিস কিন্তু ফেরাটা নিজের ইচ্ছেয় হবে নে। যা করার সব করবে বৌদি।
কিছুই বুঝলাম না।
হ্যাঁ, বৌদি আজ আর বেঁচে নেই। আবার সে মরেওনি। সে আছে, এখানেই আছে।
কী বলছ!
এ বাড়ির কে-না তোকে চেনে? তুই যে এ বাড়ির মালকিনের কত নেওটা ছিলি ছেলেবেলায়, সেটা সবাই মনে রেখেছে। তোকে কে ভুলতে পারে? ঠাকুরঘরে বসে কত চন্দন বেটে দিয়েছিস ছোট ছোট হাতে। শাঁক বাজিয়েছিস পুজোর সময়। ধূপ নিয়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়িয়েছিস। সেই কোন ছেলেবেলা থেকে তুই এ বাড়িতে আসিস, কত বড় ভক্ত তুই সেই বয়স থেকেই, এ বাড়ির সবাই সেসব ভুলেছে ভেবেছিস? সবার সবটা মনে আছে, যেমন তোর আছে। মাঝখানে কেবল সময় বয়ে গেছে। বরং তুই এসেছিস জানলে সবাই কত খুশি হবে, আনন্দ পাবে। আনন্দই তো জীবনে সব।
বাড়ির ছেলেরা সব কোথায় এখন?
কেউ নেই। সব মারা গেছে। এখন তাদের ছেলেরা রাজত্ব করছে।
আর বিলু?
বীরেশ্বরের কথা মনে আছে তোর? বেশ। বিলু এখন বাইরে থাকে। বাইরের দেশের ডাক্তার সে। বিলুর সঙ্গে খুব করে খেলতিস মনে পড়ে?
বড় করে একটা শ্বাস ফেলে অপ্সরা। মনে আছে, রাসের সময়, একদিন ফাঁকা পেয়ে, বীরেশ্বর তাঁর ঠোঁটে চুম্বন করেছিল। কত বয়স ছিল তখন, দুজনের?
ছোটবেলার সেই ঈশ্বরপ্রেম, ভক্তি, যৌবনের ঠেলায় কবেই উড়ে গিয়েছিল, মনেই পড়ে না। কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে, মোটেই কোথাও যায়নি সে, ঘাপটি মেরে বসেছিল সে মনের কোনায়, এখন অস্তমিত যৌবনকে দু হাতে ঠেলে সরিয়ে বেরিয়ে এসেছে সে। এও এক আনন্দের প্রকাশ বইকি!
ষষ্ঠী বলে, তাছাড়া তুই থাকলে বৌদিরও ভালো লাগবে।
মানে! এইবার সে ঘুরে তাকাল।
বৌদি যে এখন তাঁর শ্রীগোপালের রাঙা-চরণ ছাড়তে পারেননি। তিনি যে নিত্য লক্ষ রাখেন তাঁর গোপালের সেবা ঠিকভাবে হচ্ছে কিনা।
কী বলছ!
সে তুইও বুঝবি। থাক কদিন এখানে। পিছুটান তো নেই তোর। আর কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষাটা নিয়ে নে।
দীক্ষা নিতেই হবে মাসি।
নিলে দেহ শুদ্ধ হবে।
আর না নিলে?
তা তো জানি না বাবু। তবে এটুকু বলতে পারি, ভগবানের আরাধনা ঠিকভাবে করতে গেলে দীক্ষা নেওয়াটা খুব জরুরি।
অপ্সরা আর কিছু বলল না। সে চুপ করে রইল।
আমি তো তাঁর নির্দেশিত পথেই গোপালের সেবা দিই, নামগান করি। তুই যখন কাঠের নড়বড়ে দরজাটার ঠেকে এই বাড়িতে পা রাখলি তখন সবে আমি হরিনাম করে দুয়ারে বসেছি। আমি জানি বৌদি হরিনাম শোনে। তাঁর জন্যেই আমাকে রোজ গাইতে হয়। তখন একটু বাতাস নিচ্ছি। নামগান শেষ হয়ে গেছে। তারপরে দুয়ারে বসি। কোনোদিন উঠোনে চ্যাটাই পেতে। বসি। বাতাস নিই। এই বাড়ির শুদ্ধ বাতাস। ভক্তির বাতাস। ধর্মের বাতাস। কৃষ্ণের গন্ধ মিশ্রিত বাতাস।
এমন বাতাস!
হবে না? স্বয়ং গিরিধারী বাস করেন যে এখানে। হতেই হবে।
৬
কেন জানি, অপ্সরার মন উদাস হয়ে উঠল এই কথায়। সে দেখে বাড়ির ওই কোণে যে ঝোপ সেখানে জোনাকি জ্বলে উঠেছে। উঁচুতে যে আকাশ, সেখানের মেঘে রঙ ধরেছে। এখানের বাতাস যেন বাঁশি-নির্গত। কৃষ্ণের ঠোঁটের ধাক্কা খেয়ে ঢুকে পড়েছে এই বাড়িতে।
ষষ্ঠী বলে, এখানে বসে থাকতে থাকতে মনে হয়, জীবনটা বুঝি তরে গেল, তবু ভগমানের দেখা পেলুম না।
এত সেবা করি। ভালো লাগে, তাই করি। আবার করলে দুটি পয়সা পাই। তাতে আমার খাওয়া-পরা চলে। কৃষ্ণসেবা আমার খোরাক জোগায়।
হরিনাম তুমি রোজ করো?
রোজ। নইলে মুক্তি নেই।
অনেকদিন ধরে এসব করছ তো?
সে অনেকগুলি বছর।
এত করেও তুমি যদি মুক্তি না পাও, আমাদের কী হবে?
তোর হয়ে যাবে। আটকাবে না।
এমন বলছ কেন?
ভগবানকে পুজোর অনেক মন্তর আছে। সেসব আমি জানি নে। ঠাকুরের আসবে বসে সেসব বলবে, লক্ষবার নামজপ করবে, মুক্তি হয়ে যাবে। আর জন্ম নিতে হবে না তো, ভগবানের পাদপদ্মে ধুলোর রেণু হয়ে মিশে যেতে পারবি।
সকলে তা পারে না মাসি।
তুই পারবি। তুই যে রাধিকা। তুই যে খুব সুন্দরী।
দূর! কোথায় তিনি বৃষভানুর কন্যা আর কোথায় আমি।
খুব সুন্দর সাজ তোর। ভারি ভালো লাগছে তোকে।
রাধিকা কেন, একজন সখীও যদি হতে পারতাম তাঁর, জীবনটা উদ্ধার পেত।
তোর মনে আছে, ছোটবেলায় বৌদি তোকে রাধা সাজাত ঝুলনের দিনে?
আছে।
আর বিলু সাজত কৃষ্ণ।
অপ্সরা চুপ করে রইল।
তখন এসে থাকতিস তো। রাস হত এ বাড়িতে, তখনও আসতি মায়ের সঙ্গে। খুব সুন্দর লাগত তোকে। এখনো লাগছে। এমনি করে রোজ সুন্দর করে সেজে যদি তাঁকে ডাকিস, প্রেমের ঠাকুর সে ডাক উপেক্ষা করে কী করে? তাঁকে যে আসতেই হবে। তারপরে তিনি লীলা রচনা করবেন তোর সঙ্গে। হ্যাঁ, এই উঠোনেই।
এটা তো বৃন্দাবন নয়।
তিনি যেখানে লীলা করেন সেটিই বৃন্দাবন।
অনেক বড় কথা বলে দিলে মাসি! আমার গা কাঁপছে। মাথা টলছে যেন।
তাঁর রাসলীলায় তুই রইবি না তো রইবে কে?
তুমি আমাকে কেমন যেন করে দিচ্ছ মাসি।
আহা, গোরা অঙ্গ তোর, এখনও তেমনি আছে, আগের চেয়ে ফেটে পড়ছে যেন। এই তো রাসের রঙ, রাসের সময়। এই সময়ে তাঁর সঙ্গে রাসে মাতবি না তো কবে মাতবি?
আর তোমার কাছে তিনি আসবেন না?
জানিনে তাঁকে পাব কিনা।
আর পেলে?
তখন পথে পথে ঘুরব।
আবার পথ! সেই পথের গল্প ষষ্ঠীর গলায়! অপ্সরার মধ্য থেকে জড়োসড়ো ভাবটা যেন কেটে যায়। সে উঠে দাঁড়ায়। চোখে চোখ রেখে বলে, কোন পথ?
ওই দেখ! বলে বুড়ি হাত উলটায়। বলে, জীবনে পথই তো সব গো! পথ ছাড়া আর আছে কী?
আর ধুলো?
মানুষই তো ধুলো। মরলে সবাই ধুলো।
তবে যে বললে আনন্দ, আনন্দই সব। কোনটা ঠিক?
দুটোই। পথই তো মানুষকে আনন্দ দেবে। আমার এই পথ চলাতেই তো আনন্দ। আবার আনন্দের কারণেই তুই পথে নামবি। আমি শুধু এটুকু জানি।
আর অন্ন? পথে যেতে যেতে খিদে পায় আমাদের। সেটা কোত্থেকে আসবে?
আসবে, ও নিয়ে ভাবনা নেই। তিনি পথে টেনেছেন, অন্নও তিনিই জোগাবেন। সব দায়িত্ব তাঁর। তোর কাজ কেবল বেরিয়ে পড়ার।
তবুও একটা ভাবনা থাকে বইকি।
অত ভাবলে কী করে তাঁকে পাবি।
আমি কেন পাব? আমি কী করেছি? কখনও তিল-তুলসী দিয়ে তাঁর সেবা করিনি। হঠাৎ একদিন স্বপ্নে তাঁকে দেখলুম। প্রথমে সোজাসুজি দেখিনি। ছায়া দেখেছি। আবার কখনও শুনেছি কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে। বাঁশি বেজে চলেছে আমার স্বপ্নের ভেতর। সে যে কী অবস্থা মাসি তোমাকে কী বোঝাব। তাই ভাবলাম একবার এখানে আসি। আমার চেনাজানার মধ্যে একমাত্র সোহাগিমামির বাড়িতেই ঠাকুরের মূর্তি আছে, তাও পাথরের। যতবার স্বপ্ন দেখি, ঘুম থেকে উঠে এই মূর্তিটির কথা মনে পড়ে। তাই চলে এলাম। একটু ঠাকুরের কাছে বসব, একবার দেখব, পুজো করব, নামগান করব—এইটুকুই চাই, আর কী?
ভাবিস না তুই এখানে এসেছিস নিজের ইচ্ছেয়। ঠাকুর ডেকেছেন, তাই এসেছিস তুই। তিনি এখন তোকে নিয়ে কী করবেন, তোকে দিয়ে কীভাবে সেবা দেওয়াবেন—তা তিনিই জানেন। কারণ তিনি সবাইকে ডাকেন না। যে তাঁর মনোমত ভক্ত, যে সর্বক্ষণ তাঁর কথা ভেবে চলে—তিনিও তাকে ভাবেন।
কিন্তু আমি কোনো টান অনুভব করিনি!
ওরে পাগলী, টান না থাকলে এতদিন পরে এখানে আসবি কেন? আমার সঙ্গে দেখাই বা হবে কেন? আমি তো এখানে বেশিক্ষণ থাকি না। ঘরদোর ঝাঁটপাট দিয়ে ঠাকুরের সেবা দিয়ে তালা দিয়ে চলে যাই। বাড়িতে তালা দেওয়া থাকলে তুই আমাকে পেতিস এখানে? টান না থাকলে আমার সঙ্গে তোর দেখা হয়? ঠাকুরই করিয়ে দিয়েছেন। এখন তোকে টান-টা বুঝতে হবে, উপলব্ধি করতে হবে। কেবল টান থাকলেই তাঁকে পাওয়া যায় না; তাঁকে পেতে গেলে, অনুভব করতে গেলে, সেই টানকে মনের মধ্যে ধরতে হবে; স্বপ্ন যখন মনের ঘরে হানা দেবে তখন। তখন এই ঘর-দোর-আসবাব তোর আর ভালো লাগবে না; তোকে পথে বেরুতে হবে। পথ তোকে টেনে নেবে। তখন জানবি, ঈশ্বর পথেই থাকেন।
পথে তুমি বেরিয়েছিলে কোনোদিন?
বেরোই। মাঝে মাঝেই বেরোই; তারপরে ফিরে ফিরে আসি।
কোথাও পৌঁছাওনি?
পারি কই?
তাহলে বেরোও কেন?
না বেরোলে চলে কই?
ফেরো কেন?
তিনিই ফেরান।
তোমার এই পথের জটিলতায় আমি যে পথের খেই হারিয়ে ফেলছি মাসি।
পথ আমার জন্যে নয়, জানিস।
পথ তবে কার জন্যে?
তোর জন্যে।
কেমন করে?
এই যে, টান। এই টান পথে বের করে দেবে তোকে। এই টান মারাত্মক। সব ভুলিয়ে দেয়।
পথ যদি না থাকে তবে তোমার জন্যে রইল কী?
কিছুই নেই। হ্যাঁ-রে, বিশ্বাস কর। তাঁকে নিত্য সেবা দিই বলেই আমি তাঁর কাছে পৌঁছতে পেরেছি, এটা ভুল ভাবনা। আমিও একদা তাই ভাবতুম। সেই কবে থেকে দু-বেলা নিত্য সেবা দিই, মনে মনে ডাকি। কিন্তু এতদিনে বুঝেছি, সব ডাক ডাকার মতন হয় না, তাই তিনি সাড়া দেন না। তাই পথ আমার জন্যে নেই, ঈশ্বরও নেই—সব ফুল্ল আর তুস্ক।
ঈশ্বরের এত কাছাকাছি থেকে তুমিই পারছ না, আমি তাহলে কী করব? আমার কী হবে?
ঈশ্বরের কাছে আমি থাকলে কী হবে, ঈশ্বর আমার কাছে থাকেন না।
তুমি আমাকে অবাক করলে।
অবাক করার মালিক আমি নই।
ফিরে আসো কেন?
ভগবানের টানে।
তবে বেরোও কেন?
সেই ভগবানেরও টানে।
আবার সব গুলিয়ে যাচ্ছে মাসি! ধাঁধার মত কথা বলো। সবই যদি ভগবান তাহলে তুমি কে?
ধুলোর কণা।
আর ধুলো?
সে ঈশ্বর।
সবই ঈশ্বর?
জগত ঈশ্বরময়।
তোমার সঙ্গে দেখা না হলে কতকিছু জানা অধরাই থেকে যেত।
সবই তাঁর ইচ্ছে।
মানুষের তাহলে নিজের কোনো ইচ্ছা নেই?
তাঁর ইচ্ছাই মানুষের ইচ্ছা।
আমি এমনি করে ভাবতে পারি না। সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, যে পথেই তুমি হাঁটো, সব পথ গিয়ে মিশে যাচ্ছে সেই ঈশ্বরের পাদপদ্মে।
সেসব ধাঁধা কাটানোর জন্যেই তোর এখানে আসা।
কীভাবে কাটবে?
থাক কদিন। দিন পুড়িয়ে রাত হোক। তারপরে পথের কথা ভাববি।
একা একা কী করব আমি?
কে বললে একা? তিনি আছেন।
তিনি কি আমায় দেখবেন?
তোকে দেখার জন্যেই উনি বসে আছেন।
তুমি আসবে কখন?
আমি আসব। তবে আমার ভরসায় থাকিস না। তিনি আছেন। তিনি দেখবেন। তিনি সব জানেন।
ভয় হচ্ছে মাসি।
ভয় পাস কেন? এই বাড়িতে তুই কি নতুন? কত এসেছিস, কতদিন এখানে কাটিয়েছিস। তখন আর এখন অনেক তফাত হতে পারে, কিন্তু বাড়ি সেই এক। হয়ত সময় চলে গেছে, সেইসব মানুষেরা নেই, তাই বলে ঈশ্বর পালটে গেছে তা নয়। সেই ভগমান, সেই ঈশ্বর, সেই তাঁর বাঁশি, ময়ূরের পালক—সব আছে। তুই শুধু নিজেকে নির্ভার করে তোল।
তুমি যে চলে যাবে, আসবে কখন?
আমার নিজের সংসার আছে, রান্নাবান্না আছে। সেসব মিটিয়ে আমাকে আসতে হবে।
সেসব কি এখানে করা যায় না?
যায়। তবুও আমাকে যেতে হবে।
ততক্ষণ আমি একা? এই বাড়িতে? আমার যদি ভয় পায়?
ঐ যে বল্লুম, ভগবান আছেন।
আমার গা ছমছম করছে।
এ হল কৃষ্ণের প্রতি অনুরাগ।
তুমি সত্যি এখনই যাবে?
যাব আর আসব।
৭
ষষ্ঠী তাকে কিছু কাপড়চোপড় দিল। বলল, সব নতুন। তবে আলমারিতে একভাবে থেকে থেকে কাপড়ে গন্ধ লেগে গেছে, এই যা। আলমারিতে সব তোলা ছিল। গোপাল-উৎসবে দাদাবাবুরা আসেন বাড়িতে, তখন পুজোর নতুন সব কাপড়চোপড় জমা করে রাখা হয়। গ্রামবাসীরা দেয়, পুরোহিত কিছু নেয়, কিছু রেখে দেয়; এইগুলো সব সেইসব রেখে দেওয়া কাপড়। পড়েই আছে, তাই জমে থাকা গন্ধ লেগে আছে। বাতাসে আর রোদে খানিক মেলে রাখলে সব গন্ধ উবে যাবে। আর সব গন্ধ যদি না ওড়ে তবে বুঝবে সে গন্ধ তাঁর। কৃষ্ণের।
এইসবের মধ্যে কৃষ্ণের গন্ধ কীভাবে আসবে?
তাঁর পায়েই তো সব জমা হয়।
পাপ?
তাও হয়।
পাপ কাকে বলে মাসি?
ভগবানকে ভালো না-বাসাই পাপ।
পাপ এত সহজ!
ঈশ্বর খুবই সহজ।
তিনি কেমন?
বাতাসের মতন। তাঁকে পাওয়া খুব সোজা। তাঁকে দেখব না, তাঁর কথা শুনব না, তাঁর গান গাবো না—কারণ সময় নেই, সংসার আছে, ছেলেপুলে আছে; এই করতে করতে সে সর্বক্ষণ ভগবানের নামই করে। সে ভাবে যে, সংসার করতে গিয়ে তাঁকে ডাকা হল না, তাঁর পাদপদ্মে যাওয়া হল না, তাঁর হৃদয়ে স্থান নেওয়া হল না। এই যে তাঁকে এত করে ভাবা, তাঁর সঙ্গে থাকা—এই জিনিসই সব পাপ কাটিয়ে দেয়।
আর পুণ্য?
তাঁকে ভালোবাসাই পূণ্য। যাক, এখন কাজের কথা বলি শোন। খাবার-দাবার নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, সেসব আমি রেঁধে দিয়ে যাব।
ও আমি দুটি চালে-ডালে সকাল সন্ধে ফুটিয়ে নেব ’খন। কেবল তুমি সঙ্গে থেকো। তোমাকে এত কষ্ট আমি দেব না।
তাহলে বৌদি আমাকে আর আস্ত রাখবে ভেবেছিস? আমাকে আর সেবা করতে দেবে এ বাড়ির।
তুমি আমাকে ধাঁধায় ফেললে!
ঈশ্বর তো তাই।
এই বলো ঈশ্বর সহজ, আবার পরক্ষণেই বলছ তিনি ধাঁধা। এর মানে কী?
তিনি এমনিই।
শ্রীভগবানকে তুমি খুব ভালোবাসো, না?
তা বাসি।
দেখেছ কোনোদিন?
শোনো মেয়ের কথা শোনো! সবাই কি তাঁর দর্শন পায়!
বৃন্দাবন কি আর তেমনি আছে মাসি?
বেন্দাবন কি বদলায়?
আর ব্রজ?
সেও তেমনি আছে।
গ্রাম এখন শহর হয়ে উঠেছে।
হোক। তবু সে বেন্দাবন। ব্রজ। আর ব্রজের রাখাল এখনও ধেনু চরায়।
আর কৃষ্ণ?
সে আসে। সখাদের পাশে বসে। ননী চুরি করে। সব তেমনি আছে, তেমনি করেই বয়ে চলেছে, কেবল চিনতে পারা চাই। বেন্দাবন তুই যাবি তো?
তবে চলো দুজনে যাই।
সে হবার নয়।
কেন?
হৃদয়-মন্দিরে মোর, কানু ঘুমাইল।