• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০১ | জানুয়ারি ২০২৬ | গল্প
    Share
  • অপেক্ষারা : তৃষিতা মিত্র

    অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছি। বাসের জন্য। কখন যে হেলতে দুলতে দুশ চল্লিশ নম্বর বাসটি সিমলে স্ট্রিটে আসবে কেউ জানে না। না কথাখানি একেবারে সঠিক নয়। হয়ত বাসের ড্রাইভার খালাসি ছাড়াও কোনো কোনো প্যাসেঞ্জার আন্দাজ করতে পারছে কিন্তু তা আমার সম্পূর্ণ অগোচরে। গরমে ভেপসে ঘেমে তথৈবচ অবস্থা আমার। সিমলে স্ট্রিটে স্বামী বিবেকানন্দের বাড়ির কাছে এ জায়গাটিতেই সাধারণত দাঁড়িয়ে থাকি আমি। বাসের জন্যে। গন্তব্য সেই বাগবাজার। হিয়াদির বাড়ি। আজ একদম ভালো লাগছে না একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে। এত লোকজন আশেপাশে। কী ভিড়! তবে সকলে অচেনা। সারাদিন কলেজ করার পর গলদঘর্ম হয়ে দিনশেষে বাসের জন্য ঠায় দাঁড়িয়ে থাকাটাকে আজ যেন মনে হচ্ছে পিলে চমকানো পানিশমেন্ট।

    শেষমেষ ঠিক করলাম হেঁটে যাব। আচমকা এ সময় দেখি ফুটপাতের ওপার থেকে হাত নাড়তে নাড়তে ঈশান এগিয়ে আসছে। ঈশান আর আমি একসঙ্গে কলেজে পড়ি। আসলে ও এক ইয়ার সিনিয়র ছিল। গতবছর সেমেস্টার স্কিপ করেছে বলে এখন আমার ব্যাচমেট। রিপিটর বলা যেতে পারে। এতক্ষণ আমি ওই ফুটপাতের দিকেই মুখ করে চেয়েছিলাম অথচ ঈশানকে আমার চোখেই পড়ল না। আশ্চর্য!

    ঈশান কাছে এসে বলল, এই অপর্ণা এদিকে কোথায়?

    ঈশানকে দেখে আমি অহেতুক অস্থির হয়ে উঠি। কলেজেও তাই। আমার নাকের ডগা লাল হয়ে যায়। ঠোঁটের ওপর শিশিরবিন্দুর মতোন ঘাম ফুটে ওঠে। সারা গায়ে কেমন শিহরণ জাগে যেন। আমি কী বলব কী করব বুঝে পাই না। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি। কেমন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে ঈশান যে কোনো উত্তর প্রত্যাশা করছে সে কথা আর মাথায় নেই আমার। বোধহয় ঈশান আমার মনের অবস্থাটা বুঝতে পেরেছে। ও আবার আমায় জিজ্ঞেস করল, এ দিকে কোথায় অপর্ণা? ঈশানের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। বিষম খেলাম আমি। তারপর মনের যত সাহস ছিল সবকটাকে ডাকলাম। একসঙ্গে জড়ো করলাম। বললাম, বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। টিউশন যাব সে কথা বেমালুম চেপে গেলাম। আমার একেবারে পড়তে যেতে ইচ্ছে করছে না। ঈশানকে দেখে মনের মধ্যে হাজার রকম উদ্ভুট্টি ইচ্ছেরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

    ততক্ষণে ঈশান আমায় আবার দ্বিতীয় প্রশ্ন ছুঁড়ে মেরেছে। কোথায় যাবে অপর্ণা? বলতে ইচ্ছে করছে কোথাও যাবো না ঈশান কোত্থাও না। শুধু তোমার দিকে তাকিয়ে থাকলেই যে আমার মনজুড়োনো প্রশান্তি। কিন্তু এখন ঈশানকে সেকথা বললে ভীষণ ন্যাকা ন্যাকা শোনাবে। তাই এখনকার মতো বললাম, ছোট দিদিমার বাড়ি। মা আর মাসিদিদা ওদের বাড়ি বেড়াতে গেছেন কি না। আমিও তাই কলেজ সেরে যাচ্ছি। ঈশান বলল, কতদূর তোমার ছোটদিদিমার বাড়ি? কোথায় থাকেন? আমার মাথায় তখন চট করে কোনো জায়গার নাম এলো না। অগত্যা বললাম, বাগবাজার। এমন সময় ঈশানের ফোনে একটা কল এল। খুব ব্যস্তসমস্ত হয়ে ও কথা বলতে লাগল কারোও সঙ্গে। ঈশানের সঙ্গে তখন কথোপকথনের সুযোগ হ'ল না আর।

    অথচ আমার তখন ঈশানকে খুব ডেট করার ইচ্ছে পেয়ে বসল। কফিডেট। মুখে বলতেও পারছি না। যদি আমায় ও হ্যাংলা ভাবে। যদি ওর আমায় এতটুকুও ডেট করার ইচ্ছে না থাকে। হয়তো নিছক কৌতূহলবশত ঈশান আমায় আমার গন্তব্য জিজ্ঞেস করেছে। চেনা মুখ দেখে হাত দেখিয়েছে ফুটের ওপার থেকে। তাতে করে আমি যদি এখন ঈশানকে বলে বসি, ঈশান তুমি আমায় কফি ডেটে নিয়ে যাবে? হয়ত তাতে ঈশান অপ্রস্তুত হয়ে যেতে পারে। অথচ আমার অনেক দিনের ইচ্ছে ঈশানের সঙ্গে কিছু ভালো মুহূর্ত কাটাবো। কলেজের ক্লাসে ঈশান তেমন আসে না। ইউনিয়ন পার্টির কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকে। তবে ওর ওই অগোছালো উদাসীন বোহেমিয়ান লুকখানি বড্ড বেশি অ্যাট্রাকটিভ। অন্তত অপর্ণার কাছে। অপর্ণার মনে হয়, পৃথিবীতে ওর ইচ্ছের ওর চাওয়ার কি কোনো দাম নেই? অপর্ণার মন আর এক্ষণে মন নেই। ক্যাঁচোরম্যাচোর করছে। যেন জিলিপির প্যাঁচ। অপর্ণা চিন্তাশীল হয়ে যায়।

    ঈশানকে কি আমি আমার অভিলাষের কথা বলে বিপদে ফেলব? অথচ আমার তো এমন কিছু সব্বোনেশে চাহিদা নয়। আমি তো আর ঈশানকে আমার সঙ্গে নাগমণি সংগ্রহের জন্য দুরুহ অভিযানে যেতে আহ্বান করছি না। সামান্য কফিডেট। বিল না হয় আমিই পে করে দিতাম। কী আর এমন কুমির ডাইনোসর খাবো কফির সঙ্গে। ঈশান কি মনে করবে আমার পয়সার গরম? না কি ঈশান চাইবে বিল স্প্লিট করতে? আমি চাই ঈশান অর্দ্ধেক বিল পে করুক। ও বলুক ফিফটি ফিফটি। তখন আমি না হয় জোরজার করব। বলব, না ঈশান। ইকোনমিক ইনডিপেনডেন্সের স্বাদ আমায়ও খানিক পেতে দাও ঈশান। আমার টিউশনের টাকায় বইপত্তরের খরচা ওঠে। কফিটফির বিল না হয় আমি দিলাম। তোমার সঙ্গে আমার প্রথম ডেট। কখনও এরপর তুমি পে কোরো। আরেকবার ডেটের সুযোগও থাকবে এতে করে। সেটা অবশ্যি মুখে বলা যাবে না তখন। ছি ছি এ কী হ্যাংলামো। নাহ ওভারথিংকিং করি আমি বড্ড। অপর্ণার মনে হ'ল। আমার কলেজের ব্যাচমেটরাও বলে সে কথা। কে জানে কেন।

    বাস এসে গেছে। কতক্ষণের প্রতীক্ষিত কতক্ষণের কাঙ্ক্ষিত সেই দুশো চল্লিশ নম্বর বাস। কন্ডাক্টর আমার চেনা। আমি এ বাসের বলা চলে প্রায় নিত্যদিনের যাত্রী। আমায় দেখে বাস স্লো হয়ে এলো কিন্তু পুরোপুরি থামেনি। কী করে আর আমি ঈশানের কাছে এইসকল অধিকারহীন দাবির কথা ব্যক্ত করতাম! ঈশানের সময় মূল্যবান আমারও মনে হয় টিউশন যাওয়া জরুরি। আগুপিছু আর ভাবলাম না আমি। ঝটপট উঠে পড়লাম বাসে। বাসে উঠবার আগে অবশ্য ঈশানকে বিদায়ী সম্ভাষণ জানাতে ভুলিনি।

    তখনও ঈশান ফোনে। কথা বলছে। কার সঙ্গে সেই তখন থেকে এতো কথা বলে যাচ্ছে ঈশান? আচ্ছা, আমি কি ঈশানের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছি?যার সঙ্গে খুশি ঈশান কথা বলতে পারে। তাতে আমার কোনোরকম খারাপ লাগার কথা নয়। পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত আমার চোখের আড়ালে কতো কিছু ঘটছে। ঘটনার কি আর শেষ আছে? সকলের সকল ঘটনার খোঁজ রাখতে গেলে এতোদিনে তো বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যাওয়ার কথা। সেই মুহূর্তেই অপর্ণার মনে হয় সে কি মনকে প্রবোধ দিচ্ছে? নিজেকে খুশি করতে যুক্তি সাজাচ্ছে? কোথাও যেন তবু অপর্ণার মনে একটা বিষাদ লুকিয়ে রয়েছে। সত্যি সত্যিই আজ ঈশানের সঙ্গে কফিডেটে গেলে মন্দ হ'ত না। থাক, অন্য কোনোদিন হয়ত হয়ে যাবে। কিছু কিছু বিষয় ডেস্টিনির হাতে ছেড়ে দেওয়াই ভালো। আচ্ছা, ঈশানের কি তেমন আগ্রহ ছিল? সে তো ফোনকল ইগ্নোর করতে পারত। করেনি। কে জানে হয়ত আর্জেন্ট কল ছিল। ব্যস্ত মানুষ। অপর্ণাকে অল্প হলেও পাত্তা দিয়েছে এই অনেক।

    আচ্ছা, দিন শেষে প্রত্যেকের কি নিজের মতো করে খুশি থাকার অধিকার নেই?

    পা ঝুলিয়ে বাসে বসে বসে পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরে গেছে অপর্ণার। কানে হেডফোন গুঁজলো ও। উঠে দাঁড়িয়ে ওর সিট সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলাকে ছেড়ে দিলো। উনি সুন্দর সৌজন্যমূলক হাসি হাসলেন। ভালো লাগলো অপর্ণার।

    বিকেলের এ সময়ে গঙ্গার হাওয়া ছাড়ে। প্যাচপ্যাচে গরমে বেশ স্বস্তি। অপর্ণার কফিডেটের ইচ্ছেরা ততক্ষণে মন থেকে উড়ে গেছে। আচ্ছা, ইচ্ছেদের কি ডানা থাকে? ধের, আলতু ফালতু বোকা বোকা কথারা কি অপর্ণার মাথাতেই শুধু ভিড় করে?

    এই তো শ্যামবাজার। আর একটুখানি পথ। তারপর বাগবাজার। টিউশন ব্যাচে গিয়ে পড়লেই হুসহুস করে অপর্ণার মাথার ভেতরের কিলবিলে ভাবনাপোকাগুলো পালিয়ে যাবে।

    এই টিকিট টিকিট।

    হ্যাঁ এই যে টাকা।

    অপর্ণা টিকিটের টাকা দিয়েই বাস থেকে নেমে পড়ল। ওর ঈশানের কথা এ মুহূর্তে আর মনে পড়ছে না। কী সাময়িক ইনফ্যাচুয়েশন। মোহ বলা যেতে পারে। যেন বিকেলে দেখাই হয়নি ওর সঙ্গে। কক্ষনো যেন ঈশান অপর্ণার মন কাড়েনি। আজাদ পারিন্দের মতোন পায়ে পায়ে হেঁটে অপর্ণা সেদিন হিয়াদির টিউশন ব্যাচে ঢুকে পড়ল।



    অলংকরণ (Artwork) : সঅনন্যা দাশ
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments