• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০১ | জানুয়ারি ২০২৬ | গল্প
    Share
  • চন্দ্ররেণু : রিঙ্কি দাস

    চন্দ্ররেণু

    ঝকঝকে নতুন হার্ড কভারের বইটা হাতে নিয়ে খানিকক্ষণ থম মেরে বিছানায় বসে রইলেন বিভাবরী। আজকেই ডাকযোগে দশ কপি পৌঁছেছে তাঁর কাছে। তাঁর সদ্য প্রকাশিত নতুন নভেল "প্রেম ও প্রত্নতত্ত্ব"।

    ছন্দবাণী পাবলিশার্স তাঁর বেশ কয়েকটা উপন্যাস ছেপেছে ইদানিং, ওদের কাজ বরাবরই বিভাবরীর খুব প্রিয়। সুন্দর বাঁধাই, রুচিসম্মত প্রচ্ছদ, বইয়ের পাতা আর মুদ্রণের গুণগত মান, কোনোটাই অভিযোগের সুযোগ দেয় না। তবে এবার সমস্যা একটাই। এবং সেটা গুরুতর।

    উপন্যাসটা আদৌ বিভাবরীর নিজের লেখা নয়।

    গত এক বছর ধরে খানিকটা রাইটার্স ব্লক চলছে বিভাবরীর। সেরকম মনোগ্রাহী নতুন প্লট কিছু মাথায় আসছে না। তাঁর সাহিত্যের একটা স্বকীয় আঙ্গিক আছে যেটা পাঠকদের খুব পছন্দ। তার দৌলতে এই হিন্দি সিনেমার বহুবার দেখা কিছুটা ইতিহাসের প্রলেপ দেওয়া প্রেম ও জন্মান্তরবাদ থিমের গল্পটা উতরে যাবে, এই আশা নিয়ে ছন্দবাণী পাবলিশার্সকে উপন্যাসটা পাঠিয়েছিলেন বিভাবরী, বইমেলার দুমাস আগে শেষ করতেই হবে, এই ডেডলাইনটা মানতে গিয়ে প্লট নিয়ে অতটা তলিয়ে ভাবা হয়নি। পুরোটা লেখা শেষ করে রিভিউ করে মনটা খুব খুঁতখুঁত করছিল বিভাবরীর কিন্তু তখন নতুন কোনো উপন্যাস শুরু করার পক্ষে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবু পাঠিয়েছিলেন। মাঝখানে ছন্দবাণীর পাণ্ডুলিপি সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো‌ প্রতিবারের মতো তাঁর সেক্রেটারি কাম মামাতো দিদি জয়শ্রী সামলেছে, তাই পাণ্ডুলিপি থেকে প্রকাশনীর মধ্যবর্তী সময়ে আর উপন্যাসটার দিকে ফিরে তাকানো হয়নি বিভাবরীর।

    তাই বলে আগাগোড়া লেখাটাই বদলে যাবে? প্রথম পরিচ্ছেদটা অন্তত তাঁর লেখার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। "প্রেম ও প্রত্নতত্ত্ব" নামটাই শুধু বজায় আছে, তাঁর উপন্যাসের আদি প্লটটার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।

    বৃহত্তর সমস্যা - গল্পটি যত পড়ছেন, তাঁর নিজের বেশ ভালো লাগছে, শেষ পর্যন্ত জল কোনদিকে গড়াবে ভেবে বেশ একটা উত্তেজনাও বোধ করছেন তিনি। তাঁর নিজের ওই জন্মান্তর আর প্রেমের জগাখিচুড়ি গল্পটার থেকে অনেক বেশি টানটান লেখা। বেশ সুন্দর একটা থ্রিলার, হালকা একটা রোম্যান্টিক প্লটও রয়েছে তলে তলে, কিন্তু গতিতে বাধা পড়েনি। সর্বোপরি "প্রেম ও প্রত্নতত্ত্ব" নামটা সুন্দর মানিয়ে গেছে।

    মামাতো দিদি জয়শ্রী দেবীকে তৎক্ষণাৎ ফোন করেন বিভাবরী। পাঁচ বছর আগে মোটা রিটায়ারমেন্ট প্যাকেজ সমেত কর্পোরেট সেক্টর থেকে অবসর নিয়েছেন জয়শ্রীদি, স্বামী সুধন্যদাও যথেষ্ট বিষয়সম্পত্তি রেখে তিন বছর আগে গত হয়েছেন, একমাত্র সন্তান বুবুন সপরিবারে ব্যাঙ্গালোরে থাকে, জয়শ্রীদির হাতে অফুরন্ত সময়। তিনি নিজের মত ছবি আঁকেন, পোড়ামাটি পুঁতি সুতোর গয়না বানান আর পিসতুতো বোনের লেখালেখির পি আর-এর দিকটা দেখেন। প্রুফ দেখাদেখির সময়ে প্রকাশনীর তরফ থেকে সবাই বিভাবরীকে সরাসরি ফোন না করে প্রথমে জয়শ্রী দেবীর সঙ্গে যোগাযোগ করে।

    "জয়ী দি, আমার লেটেস্ট বইয়ের পাণ্ডুলিপিটা পড়েছিলে? রিভিউ করে কেউ কি কিছু রদবদল করতে বলেছিল?" জয়শ্রী দেবী ফোন তোলামাত্র বিনা ভূমিকায় প্রশ্ন করেন বিভাবরী।

    "না রে, এবার আর পড়া হয়নি। ছন্দবাণীর থেকে একজন গতমাসে ফোন করে বলেছিল, এই বইটার নাকি পাণ্ডুলিপিতে একটা আঁচড়ও কাটতে হয়নি, এত নিখুঁত। তাই আমার আর পড়া হয়নি, এবার সরাসরি হার্ড কভারটা পড়ব। আসলে ওই সময়টা জানিসই তো, বুবুনরা বেড়াতে এসেছিল, এসেই বুবুনের মেয়েটা সর্দিগর্মি বাঁধালো, ওই ডাক্তার, ফার্মাসি দৌড়াদৌড়ি, তার ওপর আমি শর্মিদের গয়নার এক্সিবিশন নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, পড়া হয়নি। এবার পড়বো।"

    বিভাবরী ফোন ছেড়ে নিজে বইটা পড়তে বসেন। ঘণ্টার পর ঘন্টা পেরিয়ে যায়, খাওয়াদাওয়ার কথা মনেও থাকে না তাঁর। রাত দুটো পর্যন্ত জেগে এক নিঃশ্বাসে বইটা শেষ করেন। দুর্দান্ত একটা উপন্যাস।

    অদ্ভুত সমস্যা বৈকি। লেখাটা তাঁর নিজের নয়। অথচ কৃতিত্বটা তিনিই পেতে চলেছেন। প্রচ্ছদে লেখিকা হিসেবে সুচারু ফন্টে জ্বলজ্বল করছে তাঁর নাম। অথচ একটা নামকরণ বাদ দিলে এই কাহিনীর কিছুই তাঁর নিজস্ব নয়।

    প্রথম কিছুদিন চুপচাপ থাকেন বিভাবরী। “প্রেম ও প্রত্নতত্ত্ব” ঘিরে পাঠকপাঠিকাদের প্রশংসা, সমালোচকদের বিদগ্ধ আলোচনা সব কিছু চলতে থাকে, তিনি কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখান না। এমনকি বইমেলায় ছন্দবাণীর স্টলে দুদিন দাঁড়িয়ে তাঁর না-লেখা বইয়ে অটোগ্রাফও দেন। তাঁর সামনেই কদিনে শ-তিনেক কপি বিক্রি হয়ে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায়, পত্রপত্রিকা, গুডরিডস-এ ঢালাও প্রশংসা বেরোয়।

    চোরা অস্বস্তি হয় বিভাবরীর। ভবিষ্যতে কোনোদিন কি কেউ এসে পূর্বমুদ্রিত কোনো লেখা দেখিয়ে তাঁর সম্পর্কে প্ল্যাজিয়ারিজম-এর অভিযোগ আনবে? বাংলা বই প্রচুর পড়েছেন তিনি, বর্তমানেও জাঁদরেল পত্র-পত্রিকা থেকে শুরু করে লিটল ম্যাগাজিন, ওয়েব ম্যাগাজিন - সবের সংস্পর্শে থাকার চেষ্টা করেন। তাঁর অলিখিত গল্পর প্লটটা মৌলিক বলেই মনে হয়।

    কিছুদিন পর পূজাবার্ষিকীগুলোর জন্য লিখতে বসে আবার সমস্যায় পড়েন বিভাবরী। তিনটে ছোটগল্প, একটা ছোটদের গল্প আর একটা উপন্যাসের বুকিং রয়েছে, কিন্তু কিছুতেই কিছু মাথায় আসছে না সেভাবে। একটানা কুড়ি বছর দাপটে লেখার পর, নানা ধারার লেখা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার পর এমন শোচনীয় অবস্থাও হয়? আহা, "প্রেম ও প্রত্নতত্ত্ব"-র মুদ্রিত ভার্সনের রচয়িতাটিকে যদি পাওয়া যেত!

    যা হোক করে কাজগুলো শেষ করলেন বিভাবরী। একটা শাশুড়ি-বউ বনিবনা, একটা মধ্যবিত্ত নবদম্পতির ভাড়াবাড়িতে মানিয়ে চলার টানাপোড়েন, এক অসামান্য সুন্দরী বিদুষী নায়িকার ভাগ্যের ফেরে সর্বহারা হওয়ার গল্প। ছোটদের জন্য একটা সার্কাসের কিছু চরিত্রদের নিয়ে লেখা। সবচেয়ে খুঁতখুঁত লাগছিল "সর্বংসহা" উপন্যাসটি নিয়ে, একটু প্রাচীনপন্থী উপন্যাস, নারীপুরুষ নির্বিশেষে চরিত্রদের ভ্যালু সিস্টেমটাও একটু দিদিমা ঠাকুমাদের আমলের, অথচ প্রেক্ষাপট এ যুগের কলকাতার এক আধুনিক উচ্চশিক্ষিত পরিবার, এটা বোধহয় পাঠকদের কাছে তেমন গ্রহণযোগ্য হবে না। অনেক দোনামোনা করে লেখাগুলো পাঠিয়ে দিলেন বিভাবরী।

    ছোটদের গল্পটা বাদ দিয়ে আবারও চমকে যেতে হলো বিভাবরীকে। "কথকতা" পত্রিকায় মুদ্রিত "সর্বংসহা" তাঁর লেখার আঙ্গিক বজায় রেখে দিব্যি হয়ে উঠেছে ভারতের বাইরে এক আধুনিক বাঙালি মেয়ের কেরিয়ার আর পরিবার ব্যালেন্স করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার গল্প, "ক্রন্দসী" ম্যাগাজিনে শাশুড়ি-বউয়ের টিভি সিরিয়ালগন্ধী গল্পটা বেশ করোনার সময়ে এক ডাক্তার বাবা ও তার ডাক্তার মেয়ের কাহিনী, "পুঁথিপত্র"তে ছাপা মধ্যবিত্ত দম্পতির "এতটুকু বাসা" গল্পটা একেবারে গা ছমছমে ভূতের গল্প! যে কোনো একটাকে ধরলে "নামকরণের সার্থকতা" সম্পর্কে বিশ্লেষণমূলক রচনা লেখা যায়, এতটাই মানিয়ে গেছে শিরোনামের সঙ্গে। প্রত্যেকটা গল্পে তাঁর স্টাইল এতটাই স্পষ্ট যে পড়তে পড়তে বিভাবরীর মনে হচ্ছে, একটু তলিয়ে ভাবলে এগুলো তাঁর লেখাই হতে পারত। অবশ্য ছোটদের "দোলনা" পত্রিকায় সার্কাসের গল্পটা অপরিবর্তিত, অন্য লেখাগুলোর তুলনায় সেটা কেমন যেন মুচমুচে ফুলুরির পাশে মিয়োনো পাঁপড়ভাজার মত।

    প্রবল অস্বস্তি হতে থাকলো বিভাবরীর। পরপর এরকম তাঁর প্লটের আমূল পরিবর্তনের পিছনে কে বা কারা? পরিবর্তিত গল্পগুলো নিম্নমানের হলে তিনি অবশ্যই প্রতিবাদ করতেন, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে প্রতিবাদ করে নিজের দুর্বলতর কাহিনীর দিকে প্রকাশক বা পাঠকদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়ার সাহস হচ্ছে না। কিন্তু যারা এই লেখাগুলোর ভোল পাল্টে দিয়েছে, তাদের উদ্দেশ্যটাই বা কী? কেউ নতুন লেখক বা লেখিকা হিসেবে কলকে পাচ্ছিল না বলে তাঁর নামের আড়ালে নিজের লেখা প্রকাশ করছে? এতে তার কী লাভ? বিভাবরীর রক্তচাপটা একটু বেড়ে গেল।

    সেদিন রেডিওতে একটা গল্পপাঠের আসর থেকে ফিরে দুপুরে খাটে শুয়ে একটু জিরোচ্ছিলেন বিভাবরী, অল্পবয়সী কাজের মেয়ে বিজলী এসে বলল, "মাসী, একজন দেখা করতে এসেছে। বলছে জরুরি দরকার।"

    "চেনা কেউ? নাম বলেছে?"

    "আমি চিনলাম না, স্যুট পরা ভদ্রলোক, বলল, তোমার ফ্যান, নাম মিহির চৌধুরী। এই চিরকুটটা দিল।"

    ভাঁজ করা কাগজটা খুলে নভেম্বরের শেষেও ঘাম ছুটে গেল বিভাবরীর। চিরকুটে লেখা, "আপনার শেষ তিনটে গল্প আর দুটো উপন্যাসের আদি পাণ্ডুলিপি আমার কাছে।"

    বিজলীকে চা করার নির্দেশ দিয়ে চটজলদি হাউসকোট বদলে একটা ভাল সুতির শাড়ি জড়িয়ে বসার ঘরে এলেন বিভাবরী। বড় সোফাটায় আরাম করে বসে আছেন এক সুদর্শন ভদ্রলোক, বয়সে একটু ছোটই হবেন বিভাবরীর চেয়ে। কোলে খোলা ল্যাপটপ। সামনে বাহারি সেন্টার টেবিলের ওপর পাশাপাশি রাখা তাঁর লেখা দুটো উপন্যাস আর তিনটে ছোটগল্পের প্রিন্ট আউট।

    ভদ্রলোক ভনিতা করলেন না। "কেমন লাগলো, আপনার এই বছরের নভেল দুটো? 'প্রেম ও প্রত্নতত্ত্ব', 'সর্বংসহা' বা সাম্প্রতিক তিনটে ছোটগল্প? প্রতিক্রিয়া দেখে তো মনে হচ্ছে খারাপ লাগেনি।"

    "কে আপনি? যদি উপন্যাসগুলো আপনার লেখা হয়ে থাকে, তাহলে আমার নামে ছাপালেন কেন? আর সম্পূর্ণ আলাদা তিন-চারটে প্রকাশনী সংস্থা আর কপিরাইটার বা এডিটরদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে এই ধরনের কারচুপি করলেনই বা কীভাবে?"

    "কারচুপি? প্রেম ও প্রত্নতত্ত্ব প্রকাশিত হয়েছে প্রায় দশ মাস আগে, পুজাবার্ষিকীগুলোরও কম দিন হলো না। কোনো ধরনের ইন্টারভিউ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন আপনি এ ব্যাপারে টুঁ শব্দটিও করেননি, তখন প্লীজ 'কারচুপি'র মত নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করবেন না। আপনি নিজে আপনার নামে লেখা গল্পগুলো বেশ সাদরে গ্রহণ করেছেন এর অন্যথা প্রমাণ নেই।"

    "তা এগুলো কি আপনার লেখা?"

    "আমার লেখা? নাহ্, আমি মোটা দাগের ব্যবসায়ী মানুষ, সাহিত্যসৃষ্টির মত শৈল্পিক কাজকর্ম আমার দ্বারা সম্ভব নয়। তবে সাহিত্য ভালবাসি। আমার একটা সফটওয়ার স্টার্ট আপ আছে, সেখানে সবাই সাহিত্যানুরাগী এবং এ আই বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স স্পেশালিস্ট। তারা আপনার মত সরাসরি গল্প লেখে না, তবে যন্ত্রকে দিয়ে কীভাবে লেখানো যায়, সে ব্যাপারে তাদের মতো বিশেষজ্ঞ দুর্লভ।"

    "লোকে বিনা অভিজ্ঞতায় চ্যাট জিপিটি ব্যবহার করে যেমন গল্প লেখে, সেরকম?"

    "না, না, এটা আরো অনেক উঁচু মাপের কাজ। আমরা অল্প কয়েকজন মিলে শুরু করেছিলাম একটা বাংলা মানুস্ক্রিপ্ট এডিটিং সফটওয়্যার দিয়ে, ছন্দবাণীর মত বেশ কিছু প্রথম সারির পাবলিশার্স আমাদের ক্লায়েন্ট। শুনলে অবাক হবেন, এই পাণ্ডুলিপি পড়ে দেখা, সংশোধন করার কাজ আমার সফটওয়ারের সৌজন্যে শতকরা পঁচানব্বই ভাগ অটোমেটেড। আপনি পাণ্ডুলিপির সফট কপি ফিড করবেন, আর বানান ব্যাকরণ ইত্যাদি সব কিছু সংশোধন হয়ে যে পাণ্ডুলিপি আউটপুট হয়ে আসবে, তাতে ভুল ধরার সাধ্য মানুষের নেই।"

    "অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে, গ্রামার আর স্পেল চেক অটোমেট হতে পারে, কিন্তু প্রুফ রিডারদের এর বাইরেও তো অনেক কিছু..."

    "বহু অভিজ্ঞ পাবলিশারদের টিমের লোকেদের ইন্টারভিউ নিয়ে তার ভিত্তিতে এই সফটওয়ার তৈরি। অবস্থা দেখুন, যাঁরা এক কালে নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাদের সাহায্য করেছেন, আজ আমাদের জন্যই তাঁদের অনেকে চাকরি খুইয়েছেন। এখন এই পত্রপত্রিকার সংশোধনী বিভাগে শিক্ষিত সাহিত্যবোধ সম্পন্ন কর্মচারীদের প্রয়োজন নেই, একজন মোটামুটি ইস্কুলে পড়া, সামান্য কম্পিউটার জানা কর্মী অক্লেশে এক দিনে পাঁচ-ছটা পাণ্ডুলিপি নামিয়ে দিতে পারে। একজন ভালো ভাষাবিশারদ এই কাজ করতে অন্তত দেড় দু মাস নেবে! কর্তব্যের খাতিরে এখনও কোনো কোনো প্রকাশনী এক আধজন অভিজ্ঞ প্রুফরিডারকে দিয়ে আউটপুট রিভিউ করান, তাদের সঙ্গে আমাদেরও ব্যবস্থা আছে, যাতে রিভিউ ফিডব্যাক জানতে পারি। সেই অনুযায়ী সফটওয়ারের পরের ভার্সন আপগ্রেড হয়, আউটপুট আরো ধারালো হয়ে ওঠে।"

    "বুঝলাম। কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই এই প্রুফ দেখার সফটওয়ারের সেলস পিচ দিতে আসেননি। আমার নামে লেখাগুলোর উৎপত্তি কোথায়?"

    "ওখানেই ম্যাজিক। দেখুন, জনপ্রিয় সাহিত্যিক মাত্রই তো রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ বা তারাশঙ্কর নন। বিশেষ করে আজকের যুগে মার্কেটে অজস্র খুচরো লেখক-লেখিকার ভিড়। কোনোক্রমে একটা দুটো লেখা ভালো রিভিউ পেলেই লেখক একটা ফ্যান বেস পেয়ে যায়, তারপর কিছুদিন ওই প্রাথমিক কটা লেখার সুখ্যাতির ভিত্তিতেই লোকে লেখক বা লেখিকার পরবর্তী কাজগুলো নিয়ে মাতামাতি করতে থাকে। আমরা ঠিক করলাম, পপুলার কিন্তু অপেক্ষাকৃত মাঝারি মানের রাইটারদের নিয়ে একটা এক্সপেরিমেন্ট করব। জনা পনেরো লেখক লেখিকাদের শর্টলিস্ট করলাম। আমার কোম্পানির কজন এদের প্রত্যেকটা প্রকাশিত লেখা কেটে ছিঁড়ে বিশ্লেষণ করলো, কোনগুলো জনপ্রিয়, কোনগুলোর মাঝারি মানের প্লট হলেও ভাষাশৈলীর জোরে উতরে গেছে, ইত্যাদি। অনেক অ্যানালিসিস করে তারা বুঝল, লেখার "স্টাইল" কিন্তু এ আই-এর পক্ষে ধরে ফেলা অসম্ভব নয়। আর ইউ উইথ মি?"

    "কিছুটা বুঝতে পারছি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এ আই দিয়ে লেখা কয়েকটি নকল ‘রবীন্দ্ররচনা’ ভাইরাল হয়েছিল কদিন আগে। তবে সফটওয়ার যাঁরা তৈরি করেন তাঁরা প্রথম সারির সাহিত্যিকদের ছেড়ে ..."

    "কারণ দ্বিতীয় সারির যে লেখকদের বেছে নিয়েছি, এঁদের কাহিনী প্লটের অভিনবত্ব বা গভীর কোনো জীবনদর্শনের ধার ধারে না, এঁদের আঙ্গিকটাকে অনুকরণ করা সহজ, আর এই আঙ্গিকটাই পাঠকের কাছে এঁদের মূল পরিচয়।" বিভাবরীর প্রশ্নটাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিলেন মিহির চৌধুরী। "এ ছাড়া আমাদের সঙ্গে রয়েছে বিশ্বসাহিত্যের বিশাল ডেটাবেস। ধরে নিন ১৮০০ সালে ফিনল্যান্ডের কোনো অনামী গ্রামের পটভূমিতে লেখা একটা ফিনিস ট্র্যাজেডির প্লট আর চরিত্রদের যদি বাঙালিকরণ করে বর্তমান কলকাতার পটভূমিতে ফেলতে চাই, এবং যদি সেই গল্পটা আগাগোড়া আপনার স্টাইলে লিখতে চাই, আমাদের সফটওয়ার কিন্তু সেটা করতে সক্ষম। পৃথিবীর সব ভাষার গল্প তো আর বাঙালি পাঠকের নাগালে নেই, এটা আজকের যুগের নিরিখে অত্যন্ত উঁচু মাপের প্লাজিয়ারিজম। অবশ্য এ আই যেমন বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে চলেছে, এক দশক পর ফাঁকিটা হয়তো ধরা পড়ে যাবে। তবু বলব, বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে এমন সফটওয়ার প্রথম তৈরি করার কৃতিত্ব কিন্তু আমাদের।"

    একটু আগেই চা বিস্কুট দিয়ে গেছে বিজলী, মিহির চৌধুরী চায়ের কাপ তুলে নেন।

    "এই এক্সপেরিমেন্টের কি আমিই একমাত্র গিনিপিগ?" বিভাবরীর কন্ঠে চিন্তার সুর।

    "আপাতত আপনাকে নিয়ে মাত্র তিনজন‌ সাহিত্যিক আমদের গবেষণার ফার্স্ট ব্যাচ। শেষ সফটওয়ার আপগ্রেডের মধ্যে রচয়িতা আর গল্পের নামের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে নতুন গল্প সৃষ্টি করার মডিউলটা ঢুকিয়ে দিয়েছি, শুধুমাত্র আপনাদের তিনজনের রচনাশৈলী দেখলেই শিরোনাম অনুযায়ী গল্প বদলে যাবে। ছন্দবাণী আমাদের এক নম্বর ক্লায়েন্ট, ক্রন্দসী, পুঁথিপত্র, এসব পত্রিকাও সম্প্রতি আমাদের সফটওয়ার কিনেছে। দোলনা ছোট্ট পত্রিকা, ওরা আমাদের সার্ভিস অ্যাফর্ড করতে পারবে না, তবে ওরকম দুএকটা ছুটকোছাটকা ম্যাগাজিনে আপনার অরিজিনাল লেখা নিয়ে আমি চিন্তা করি না। যা বলছিলাম … অন্য যে দুজন সাহিত্যিক এই এক্সপেরিমেন্টের অন্তর্গত, তাঁদের পরিবর্তিত লেখাগুলোও পাঠকেরা সাদরে গ্রহণ করেছে, লেখকদের তরফ থেকেও আপত্তি আসেনি। আপনারা সবাই একটু ক্রিয়েটিভ চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছেন আজকাল, এটা আমার টিমের নজর এড়ায় না। তবে প্রথমবার বলে নতুন গল্পগুলো বিশ্বস্ত কিছু প্রুফরিডারকে দেখিয়েছি, কদিন পরে সফটওয়ারের পরবর্তী ভার্সনে আর তার প্রয়োজন হবে না।"

    "এতকিছু যখন আমার অনুমতির তোয়াক্কা না করেই করেছেন, তখন আর আমাকে এসব বলছেন কেন? আমার কাছে আর কী চান?"

    "আমরা চাই, আপনি এখন শুধুমাত্র আমাদের সফটওয়ার-এর ক্লায়েন্টদের সঙ্গেই কাজ করুন। আর বিপুল সংখ্যায় লেখার কন্ট্রাক্ট সই করুন। ধরুন ছন্দবাণী যদি বছরে দুটোর জায়গায় আপনার লেখা বারোখানা উপন্যাস ছাপে, তাতে আপনারই জনপ্রিয়তা বাড়বে, আর রয়্যালটির কথা তো ছেড়েই দিলাম!"

    "আমার রয়্যালটি না হয় বাড়লো, ছন্দবাণীও নাহয় চার পাঁচগুণ বেশি বই বিক্রি করলো, কিন্তু এতে আপনার কী লাভ? আপনার সফটওয়ার তো নিশ্চয়ই এরা বারবার চড়া দামে কিনবে না!"

    "এটাও বলে দিতে হবে? এবার আমার ক্লায়েন্ট শুধু পাবলিশাররাই নয়, এবারে ক্লায়েন্ট আপনি মানে সাহিত্যিকরাও। আমাদের সফটওয়ার-এর জাদুকাঠির জোরে আপনার প্রোডাক্টিভিটি ফুলে ফেঁপে উঠবে, বিনিময়ে আপনি লিখবেন শুধু আমার কোম্পানির ক্লায়েন্টদের জন্যে। সেটাই হবে আমাদের চুক্তিপত্র। সাহিত্যজগৎ দেখবে, শুধুমাত্র আমাদের পেটেন্ট সফট্ওয়ার-এর ক্লায়েন্টদেরই মুদ্রিত লেখা বিক্রী হচ্ছে রমরমিয়ে, বই ছাপানোর ক্ষেত্রে কোয়ালিটি কোয়ান্টিটি কোনো দিক দিয়ে তাদের ধারে কাছে আসতে পারছে না কোনো প্রকাশনী। বাংলা সাহিত্যের মার্কেট পুরোপুরি ডমিনেট করব আমরা।"

    "আপনি বললেন, আমি ছাড়া আরও দুজন সাহিত্যিককে নিয়ে এই এক্সপেরিমেন্টটা করেছেন। তাঁরাও কি এই চুক্তির টোপটা গিলেছেন?"

    "সম্বরণ শীল সঙ্গে সঙ্গে কন্ট্রাক্ট-এ সই করেছেন। বৈজয়ন্ত মুখার্জি দু দিন সময় চেয়েছেন ভেবে দেখার জন্য।"

    "আমিও তাই চাইব। আপনার ফোন নম্বর রেখে যান, যোগাযোগ করে নেব।"

    "আপনার ইচ্ছেটাকে সম্মান জানিয়ে আজ চলে যাচ্ছি…" পকেট থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড বার করে বিভাবরীর হাতে দেন মিহির চৌধুরী। "যদিও ভাবাভাবির কারণটা বুঝলাম না। আপনাকে যে প্রস্তাব দিয়েছি, তার দ্বারা একজন প্রলিফিক লেখিকা হিসেবে অমরত্ব পেতে চলেছেন। তার সঙ্গে অঢেল টাকাও। এরকম সুযোগ তো লুফে নেওয়া উচিত!"

    মিহির চলে গেলে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন বিভাবরী। ভালোমন্দ ভাবতে ভাবতে রিমোট টিপে টি ভি-টা অন করলেন তিনি। তখনই খবরটা চোখে পড়ল। প্রথিতযশা সাহিত্যিক বৈজয়ন্ত মুখার্জি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। ব্যাচেলর মানুষ, একাই থাকতেন, সুইসাইড নোটে লিখেছেন ইদানিং একটা রাইটার্স ব্লকের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন। লেখা ছেড়ে বাঁচা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

    মনটা খাঁ-খাঁ করতে লাগলো বিভাবরীর। এবার পুঁথিপত্র পূজাবার্ষিকীতে ওঁর লেখা একটা ডিটেকটিভ উপন্যাস পড়ে খুব ভালো লেগেছিল তাঁর, সেটা কি তবে মিহির চৌধুরীর সফটওয়ারের খেল?

    ফেসবুক খুলে একটা বড় পোস্ট লিখলেন বিভাবরী। অকপটে স্বীকার করলেন, এ বছর রাইটার্স ব্লকের কারণে আর ডেডলাইনের চাপে তিনি ভীষণভাবে এ আই-এর সহায়তা নিতে বাধ্য হয়েছেন। তবে কাহিনী সংক্রান্ত প্রম্পট-এর সন্ধানে তিনি যে সফটওয়ার ব্যবহার করেছেন, সেটি এক ধরনের উঁচুস্তরের প্লাজিয়ারিজম-এর আশ্রয় নেয়, তিনি অজ্ঞাতসারে সেই ফাঁদে পা দিয়েছেন।

    "যে পর্যায়ে লেখার জন্য এভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করতে হয়, সে পর্যায়ে পৌঁছে যেকোনো সাহিত্যিকের বোঝা উচিত যে সাহিত্যজগত থেকে তাঁর অবসর নেওয়ার সময় হয়ে এসেছে। আমিও অবসর নিলাম।" ফেসবুক-এ পোস্টটা আপলোড করে খুব স্বস্তিবোধ করলেন বিভাবরী। সারাবছর প্রচুর টেনশনে ভুগতে হয়েছে তাঁকে, আশা করা যায় আর তার প্রয়োজন নেই।

    কি ভাবছেন, বিভাবরীও এবার সাহিত্যিক সত্ত্বাকে বিসর্জন দিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেবেন? নাহ্, বিভাবরীর অত ঝামেলা পোষায় না। দিদি জয়শ্রী দেবীর অলংকার ব্যবসায় এখন তিনি পার্টনার হয়ে গেড়ে বসেছেন, বেশ অভিজাত এলাকায় "টুকিটাকি" জুয়েলারি আর অন্যান্য ফ্যাশন এক্সেসরিজের দোকানটা ইতিমধ্যে ভালোই নাম করেছে, দু বোনের প্রফিটও মন্দ নয়।

    সম্বরণ শীল সাহিত্যক্ষেত্রে গত দু বছরে অতুল যশস্বী হয়ে উঠেছেন, নামী অনামী কোনো পুরস্কারই বোধ করি আর পেতে বাকি নেই। বৈজয়ন্ত মুখার্জিকে সাহিত্যজগৎ সেভাবে স্মরণে রাখেনি। বিভাবরীর লেখাও কি প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে কিছুটা? লেখিকা থেকে “টুকিটাকি”-র মত সফল বুটিকের কর্ণধার - এই পথ চলার গল্প টিভির বেশ কয়েকটা চ্যানেলে ইন্টারভিউ-এ বলেছেন বিভাবরী, এ বছর মিস কলকাতার জাজিং প্যানেলে ছিলেন, গয়নার পাশাপাশি শাড়ি ধুতি পাঞ্জাবিও যোগ হতে চলেছে "টুকিটাকি” বুটিকে, বড়সড় একটা লাইফস্টাইল বুটিকের জন্য অভিজাত অঞ্চলে জমি খোঁজা চলছে--এই যাত্রাটাই বা মন্দ কি!

    সাক্ষাৎকারে যে তথ্যটা বেমালুম চেপে গেছেন বিভাবরী, সেটা হলো বোনঝি বুবুনের সহায়তায় জয়শ্রী ও বিভাবরী দুজনেই এ আই প্রম্পট নিয়ে বেশ পরীক্ষানিরীক্ষা চালাচ্ছেন ইদানিং, সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটা ইউনিক ডিজাইনের গয়নার পিছনে তাঁদের এই নবলব্ধ জ্ঞানের ভালই অবদান রয়েছে।

    গুগল-এ এখন অজস্র ফাইভ স্টার রিভিউ “টুকিটাকি”র। ঠিক বিভাবরীর শেষের দিকের লেখাগুলোর মতন।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments