• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০১ | জানুয়ারি ২০২৬ | গল্প
    Share
  • জেহুলের মা : ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত

    ১ম পর্ব             ২য় পর্ব             ৩য় পর্ব


    জেহুল আর বেঘুল

    শনিবার সকালবেলা মায়ের সঙ্গে কথা বলে জে-ডি। সেদিন মেজাজটা সমে ছিল না। সে ঠিক করেছিল কয়েকটা প্রশ্নের জবাব বার করে ছাড়বে।

    – হ্যালো, জেহুল। কেমন আছিস?

    – হ্যালো, মা! খারাপ কেন থাকব? ভালোই আছি।

    মেজাজ হালকা ছিল না বলে জে-ডি শিষ্টাচারের পরেই একটানা নালিশ করতে থাকে।

    – আমার নাম জেহুল কেন? এটা কারো নাম হয়? যতবার জিজ্ঞেস করেছি দাদুর ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিয়েছ। দাদু কি বানানটা লিখে দিয়েছিল?

    হা–হা করে মায়ের হাসি ভেসে আসে। – বাচ্চার নাম কেউ লিখে দেয় নাকি? মুখে বলত।

    জে-ডি প্রসঙ্গটা ছাড়তে পারেনি। মৃত্যুশয্যায় লোকেদের গলা থেকে অনেক রকম ঘড়ঘড় শব্দ বেরোয়। সেসব সিরিয়াসলি নেয় না কেউ। পৃথিবীর কোনো ভাষায় এই বিদঘুটে শব্দটার মানে আছে কিনা কেউ বলতে পারে না। বাঙালিরা শুনে হাঁ করে চেয়ে থাকে। দিল্লীতে পাঞ্জাবী, মাদ্রাজী, গুজ্জর, কাহার সবাই জে-ডির নাম শুনে হাসত। টিটকিরি এড়াবার জন্য বিদেশে এসে তাকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে। এই ধরনের অনেকগুলো সন্দেহ আর ক্ষোভ সে গড়গড় করে মায়ের কাছে প্রকাশ করে ফেলল।

    – আরে বাবা, মৃত্যুশয্যায় নয়, সুস্থ শরীরে সারাজীবন ধরে বহুবার বলেছে নামটা। তোর দাদু বলত আরাকানিদের মধ্যে হয়।

    – সেটা দাদু কী করে জানল?

    – বলিনি তোকে? বর্মায় বাবার একটা পেন ফ্রেণ্ড ছিল। তখনকার দিনে এত ফোন–টোন করা যেত না। যাওয়াও যেত না। রেডিওর জন্য খবর লিখত বাবা, কিন্তু খবর পাবে কোথায়? সেইজন্য দেশ–বিদেশে চল্লিশটা পেন ফ্রেণ্ড রেখেছিল। তাদের কাছ থেকে চিঠি এলে সেগুলোই একটু নেড়ে–চেড়ে অল ইণ্ডিয়া রেডিওর নিউজ ব্যুরো থেকে ইংরিজি, হিন্দী, বাংলা, তিনটে ভাষায় পড়া হত। বাই গড বলছি।

    লজ্জায় জে-ডির মাথা নত। যে মুহূর্তে মায়ের মুখ থেকে ‘বাই গড’ শব্দদুটো বেরোয়, সেই মুহূর্ত থেকে কথার সততা আর প্রশ্নের অতীত থাকে না। – সেই আরাকানি ফ্রেণ্ড দাদুকে জেহুল নামটা লিখে পাঠিয়েছিল? জেহুল শুধোয়। – কোন ভাষায়?

    – হ্যাঁ সেটা একটা ভালো প্রশ্ন। দুটো নাম পাঠিয়েছিল। জেহুল আর বেঘুল।

    – বেঘুল!! গুড গড!

    – হ্যাঁ রে! পরিষ্কার মনে আছে, যেন কালকের কথা। তবে আরাকানি বন্ধু নিজে লিখতে পারত না, রাস্তার লোকেদের ধরে ধরে তাদের দিয়ে বেচারা লেখাত। ফলে অর্ধেক ইংরিজি আর অর্ধেক দুর্বোধ্য সব ভাষায় লেখা হয় তার চিঠি।

    – হাউ অ্যাবসার্ড! জেহুল টেবিলে চাপড় মেরে মায়ের মিথ্যেটাকে নেংটি ইঁদুরের মতো থাবার নিচে ধরে ফেলেছিল। – যে লিখতেই পারে না সে কারো পেন ফ্রেণ্ড হতে যাবে কেন?

    – সবেতে তোর জেরা করা চাই। আমি শুনেছি প্রথমে যে পেন ফ্রেণ্ড হয়েছিল এই লোকটা তার ফ্রেণ্ড। প্রথম ফ্রেণ্ড মরে যাবার পর এই লোকটা বাবার চিঠিগুলো অন্যদের দিয়ে পড়িয়ে উত্তর লেখাত। মোদ্দা কথা এই যে নামগুলো ভীষণ তেড়াবেঁকা হরফে এসেছিল। বলতে গেলে দুষ্পাঠ্য। কিন্তু আমার বাবাও হাল ছাড়ার পাত্র না, সারা রাত ধরে একটা ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস নিয়ে চেষ্টা করে যায়। পরদিন সকালে আমরা শুনলাম যে কিছু কিছু অক্ষর উলটে দেবার পর কয়েকটা কালির আঁচড় কমিয়ে দিলে ইংরেজি বেরিয়ে আসছে। সেইভাবে নাম দুটো উদ্ধার হয়েছিল।

    – লাভলি! জেহুল আর বেঘুলের মধ্যে একটাকে পছন্দ করতে খুব কষ্ট হয়নি তো? মিছরি মাখা গলায় ব্যঙ্গ করে বলে জে-ডি।

    মা খানিকক্ষণ চুপ।

    – কী হল? দেবার মতো জবাব নেই বোধহয়।

    – এত ভালো নাম পেয়ে কেন যে তুই দুঃখ করিস? তোকে খুব মানিয়েওছিল। জেহুল, বেঘুল দুই–ই বলতাম আমরা। স্কুলেও দুটো নাম লেখানো হয়। ওরা বজ্জাতি করে একটা বাদ দিয়ে দিয়েছে। আমার বন্ধু শীলা তার ছেলের নাম দিয়েছিল কম্বল। কই সে তো…?

    – কম্বল নয়, কন্‌ওয়ল। কঁওয়ল। অর্থাৎ কমল! মানে লোটাস! মায়ের কথার মাঝখানে খিঁচিয়ে ওঠে জেহুল।

    – নাঃ। আমার মনে হয় না। চুপ করে একটু ভাবার পর বলে জে-ডির মা। – শীলার বাবা–মা শিমলায় থাকত। ঠাণ্ডার দেশের লোক…। লোটাস ওরা পাবে কোথায়?

    এইভাবে কাজ হচ্ছে না। জে-ডি ঠিক করে রেখেছিল মা’কে দিয়ে অন্তত কয়েকটা সত্যি কথা বলিয়ে ছাড়বে। যার ছেলের মিথ্যে বলতে এত অসুবিধে হয় তার মা কেন একটা সত্যি কথা বলতে পারে না? সে গিয়ার পালটাল।

    – আচ্ছা, তার মানে সেই আরাকানির চিঠিটা যখন আসে তখন তুমি দাদুর কাছেই ছিলে? অর্থাৎ বিয়ের আগে?

    – ও, হ্যাঁ। তখন অল্প বয়স। বিয়ে তো হয় অনেক পরে। আমরা সবাই সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের চাকরি করতাম কিন্তু তাও একটা পয়সা জমত না। পেনিলেস্‌। সেই জন্য না দাদাদের বিয়ে হচ্ছিল, না আমাদের। ট্র্যাফিক জ্যামের মতো ভজঘট অবস্থা। বাড়িতে পা রাখার জায়গা নেই। সেরকম একটা সময়ে আমাদের বিরাট কুকুর দুটো, যাদের নাম ছিল জেহুল আর বেঘুল, তারা একসঙ্গে মরে যায়। তারপর অবাক কাণ্ড! একটার পর একটা আরো সব মির‍্যাকল্‌ হতে থাকে। দেখতে দেখতে পটাপট আমাদের প্রত্যেকের বিয়ে, বাচ্চা, কী না হয়ে গেল? এমনকি বিদেশ বিভুঁইয়ে নিজেদের বাড়িও। বিদেশ বলছি এই জন্য কারণ আমরা ছিলাম ঢাকার লোক। বাবার নির্দেশে ইন্ডিয়াকে কখনও আমরা নিজেদের দেশ ভাবতাম না।

    – গুড লর্ড! জে-ডি ডুকরে ওঠে। – নাম দুটো তাহলে কুকুরের জন্য পাঠিয়েছিল সেই আরাকানি? আমার জন্য নয়! এটাই আমি তোমার মুখ থেকে বলাতে চাইছিলাম। দুটো অপয়া কুকুরের নাম তোমরা আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছ!

    – অপয়া কাকে বলছিস? ওরকম পয়মন্ত কুকুর কোথায় গেলে পাবি তুই?

    – এতই পয়া যে মরে না যাওয়া অবধি তোমাদের কারো বিয়ে হল না? যা হবার সব তো ওরা মরবার পরে হয়েছে।

    – ওঃ, তুই জানিস না তার মানে। খুব মহান আর পয়মন্ত মানুষরা যখন গত হন তারপর দেখা যায় চারদিকে সবার মঙ্গল হচ্ছে।

    মা আবার মাথামুণ্ডুহীন তর্কে জড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিবার অবান্তর কথার স্রোতে নাকানি চোবানি খেয়ে জে-ডি নাজেহাল হয়ে যায়। চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে। সে একটা লম্বা দম নিয়ে প্রসঙ্গে ফেরার চেষ্টা করল।

    – সবাইকে ছেড়ে জেহুল আর বেঘুলের পুণ্য স্মৃতি তোমরা আমার ঘাড়ে চাপালে কেন? আমার আগেও তোমার ভাইবোনদের বেশ কয়েকটা বাচ্চা হয়েছিল। তাদের তো ফিল্ম স্টারদের মতো নাম দিয়েছিলে।

    – আমি তোর মধ্যে আমার বাবার স্মৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। তোর শরীরের মন্দিরে বাবার আত্মা এসে বাস করুক, এটা চেয়েছিলাম। বাবা তো তোকে দেখে যেতে পারেনি। কিন্তু জেহুল আর বেঘুলকে অনেক ভালোবাসা দিয়েছিল। আমি ভাবতাম বাবা উপর থেকে তোর গায়ে সেইভাবে হাত বুলিয়ে দেবে যেভাবে জেহুল–বেঘুলকে আদর করত। তোকে সব সময়ে রক্ষা করবে।

    – থ্যাঙ্ক ইউ। কিন্তু হোয়াই মী? মামাদের, মাসিদের ছেলেমেয়েদের নয় কেন? তারা কি বানের জলে ভেসে এসেছিল?

    – নইলে তোকে বাঁচানো যেত না। ছোটবেলা তোর উপর থেকে নজর সরালেই তুই চোখ বুজে নিঃশ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দিতিস। পাড়ার লোকে বলত কোনো শাপভ্রষ্ট বসুটসু হবে, সুইসাইড করার চেষ্টা করছে যাতে শাপমুক্ত হয়ে আবার দেবলোকে ফিরে যেতে পারে। তোর কিছু হলে এরাই আমাকে গঙ্গা–মা বলে বদনাম দিত। তো চব্বিশ ঘন্টা কে বাচ্চাকে চোখে চোখে রাখবে? তাই বাবাকে ডেকে বললাম, তুমি ওর ভিতরে ঢুকে পায়চারি করো। কিছুতেই এই বেবিটাকে মরতে দিও না। আমার বাবা খুব শক্তিশালী অ্যাথলেটিক পুরুষ ছিলেন। আমি জানতাম বাবাকে অতিক্রম করে যমও তোর কাছে আসতে পারবে না। তুই দাদুর সেই প্রোটেকশানটা অনুভব করিস না?

    – মা, আমি আগে একটু আধটু দৌড়োতাম। তারপর পিঠে তিনটে চাকতি স্লিপ করে গেছে। কোথায় আমার বন্ধুরা কেউ মুম্বাই, কেউ টোকিওতে ম্যারাথন হাঁকড়াচ্ছে, আর কোথায় আমি দৌড়োতে গেলে আমার পাশ দিয়ে হাই স্কুলের মেয়েরা একটু জোরে হেঁটে পেরিয়ে যায়। লজ্জায় পার্কে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছি। নাতিকে কীভাবে প্রোটেকশান দিতে হয় সেটা আমার অ্যাথলেটিক দাদুর বোধহয় উচিত আমার বন্ধুদের দাদুদের দেখে শিখে নেওয়া।

    আবার কোনো শব্দ নেই। জে-ডির মনে হয় নীরবতার মধ্যে দিয়ে মা তার শান্ত হবার অপেক্ষা করছে। বেখেয়ালে সে পিঠ সোজা করে টান হয়ে বসেছিল।

    – আমি বাবাকে ডেকে বলব। তুই চেষ্টা করে যা। একটু পরে শুনল জেহুল। – পার্কে যেতে একদম ভয় পাস না। দেখিস, শীগ্‌গীরই মেয়েগুলো তোর কাছে হারবে।



    জে-ডি’র টীম

    অফিসে জে-ডি দুপুরের খাওয়ার পর ঘন্টা তিনেক বিল্ডিংয়ের অন্য প্রান্তে এক বন্ধুর ঘরে লুকিয়ে আড্ডা দেয় আর কফি খায়। সেই কাবাবের মাঝখানে হাড্ডির মতো একটা টেক্স্‌ট্‌ মেসেজ হাজির। দলের জরুরী মীটিং। সবার উপস্থিতি প্রার্থনীয়। অত্যন্ত খারাপ খবর না থাকলে জে-ডিকে কেউ কাজের মধ্যে টানে না।

    দিনে তিন ঘন্টা আড্ডা দেবার ক্ষমতা এই অফিসে জে-ডি ছাড়া মাত্র আর একজনের, জে-ডির বন্ধু ভিকির, যে জে-ডির চেয়েও কম কাজ করে। ভিকির সাথে জে-ডির তফাৎ এই যে জে-ডি চাইলে হয়তো কিছু কাজ করে ফেলতেও পারে, কিন্তু তার ইচ্ছে হয় না। ভিকি পঁয়ত্রিশ পেরোবার পর থেকে পুরোপুরি অক্ষম। একমাত্র এল–এস–ডি সেবন করলে কয়েক ঘন্টার জন্য কর্মক্ষমতা ফিরে পায়। সেই ভয়ে বেচারা এল–এস–ডি খাওয়াও ছেড়ে দিয়েছে।

    ভিকি বলল – তুই মীটিংয়ে গিয়ে জ্ঞান দিতে শুরু করবি। কাজ তো এগোবেই না, তোর টীমটা নেতিয়ে যাবে।

    জে-ডি ভিকির কথাটাই টীমকে টেক্স্‌ট্‌ করে দেয়। – হ্যালো সবাই, আমি মুখ খুললে তোমরা বলবে জ্ঞানাচ্ছি। তাতে কাজ এগোবে না, তোমাদের দিনটাও নষ্ট হয়ে যাবে। তার চেয়ে নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে ফেললে ভালো হয় না?

    যামিনী অমনি লিখল – জে-ডি কোনো চিন্তা নেই, আমরা নিজেরা যা করার করে নেব। ধন্যবাদ।

    যামিনীর নাম আসলে যামিনী না। সে মোটেও বাঙালি কি ভারতীয়ও নয়। পৃথিবীর অন্য এক প্রান্ত থেকে তার মন্দ কপাল তাকে জে-ডির দলে এনে ফেলেছে। সবাইকে মনে মনে একটা বাঙালি নাম দেওয়া জে-ডির বাতিক।

    যামিনী এত তাড়াতাড়ি উত্তরটা দিয়েছিল যে জে-ডি কফি নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসতে পারছিল না। সে আলাদা করে হেমাঙ্গকে একটা চিরকুট পাঠাল। হেমাঙ্গও দূর দেশের ছেলে। সে প্রথম দিন থেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জে-ডির স্পাই হয়ে গেছে। প্রথমে হেমাঙ্গর স্পাইগিরি জে-ডির পছন্দ হত না। পরে অভ্যেস হয়ে যায়।

    – হেমু, আমি কী মীটিংয়ে না গেলে কোনো ক্ষতি আছে?

    – এলেই ভালো হয়। হেমুর জবাব এসে গেল পরমুহূর্তে। জে-ডি ভিকিকে বলে – যাব আর আসব। কফি অবধি ঠাণ্ডা হবে না। হেমু ব্যাটা কাজ তো কিছু পারে না, আমার হয়ে জাসুসী করাটাই ওর প্রধান কোয়ালিফিকেশন। কেন জানি না, ও আজ টীমকে একটু বাঁশ দিতে চাইছে। নিজস্ব স্পাইকে নিরাশ করা যায় না।

    ***

    কনফারেন্স রুমে গিয়ে মীটিংয়ে যোগ দেবার পর জে-ডি জানতে পারল জটিল অঙ্কের কোডিংয়ে গলদের ফলে তাদের সিস্টেম মাঝে মাঝে ক্র্যাশ করছে। অন্য টীমগুলোর কাছে জে-ডিকে হাতজোড় করে কোনো অজুহাত দেখাতে হবে।

    – যামিনী, রতন… হতাশ জে-ডি অনুযোগ করে। – তোমাদের তিনমাস আগে বলেছিলাম কোডে গণ্ডগোল আছে, আই–টি’র উপর ভরসা না রেখে চুপচাপ নিজেরাই শুধরে নাও। তারপর সব পরীক্ষা করে আমায় ফলাফল দেখাওনি?

    – সবই দেখিয়েছি, জে-ডি। যামিনী বলল।

    – এই বিকট ফেলিয়রগুলো আমার নজর এড়িয়ে গেল?

    যামিনী একটা প্যাঁচার মতো মুখ করে। অর্থাৎ মীটিংয়ে এত তলিয়ে জেরা করা ভদ্রলোকের কাজ না। তারপর সে বলল – তোমাকে যে রেজাল্ট দেখিয়েছি তা থেকে আজেবাজে ফলাফলগুলো বার করে নিয়েছিলাম।

    জে-ডিকে হাতড়ে হাতড়ে একটা সীট খুঁজে বসে পড়তে হয়। কিছুক্ষণ সত্যিই চোখে অন্ধকার দেখছিল সে।

    – জে-ডি, তুমি চাইলেই ফেলিয়রগুলো দেখাতাম। তুমি চেয়েছিলে? যামিনী তার অসন্তুষ্ট মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়েছে, যেন দোষটা সম্পূর্ণ জে-ডির।

    রতন মাঝখানে এসে বলল – একটামাত্র কেলো আছে, কারো সাহায্য লাগবে না, আমিই টুক করে সারিয়ে দেব।

    অসহায় জে-ডি ককায়। – কিন্তু পৃথিবীকে জানাতে হবে তো? ক্ষমা চেয়ে বলতে হবে সব কেঁচে গণ্ডূষ করো। তাতে আমাদের কীরকম বদনাম রটবে সেটা ভেবেছ তোমরা? যামিনী, মনে পড়ছে তোমাকে ই–মেল করে গোটা পাঁচেক প্রশ্ন পাঠাই। তার একটারও জবাব পাইনি…।

    – কাজ চলছে, শীগ্‌গীরই সবকটার জবাব দেব। যামিনী আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলে। – তুমি যা ভাবছিলে তা নয়। আগেরবার তোমাকে ঠিক ফাইলটা পাঠাইনি। আসলটা তনিমার নিজের হাতে লেখা। সেইটা দেখানো উচিত ছিল।

    জে-ডি মনে মনে বলল – যামিনী, তুমি আজ আমার প্রশ্নের যা উত্তর দেবে, কাল নির্দ্বিধায় বলবে সেটা ছিল ভুল। তনিমা তো একটা নতুন মেয়ে। সে কী করছে, কেন করছে, কিস্‌সু জানে না। তুমি তাকে মাস্টারনীর মতো নিজের তাঁবে রেখেছ। আমি কি জানি না যে তোমাকে না দেখিয়ে সে এক লাইন কোডও লেখে না? আমারই বোকামো। তোমাদের বিশ্বাস করে নিজের কবর খুঁড়ে ফেলেছি।

    ***

    সেদিন ভিকির সঙ্গে দুপুরবেলার আড্ডাটাকে গুলি মেরে নিজের সুনাম বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় জে-ডিকে। – শো মী। দেখা যাক তো কী লিখেছে তনিমা। এসো, লাইন ধরে ধরে সবাই মিলে দেখি।

    একটু পরে কম্পিউটারের স্ক্রীনে লেখাগুলো ফুটে উঠছিল। তিন–চারজন মধ্যবয়স্ক অঙ্কে পি–এইচ–ডি করা কোয়ান্ট লজ্জা লজ্জা মুখে তাদের কীর্তি উদ্‌ঘাটিত করছে। প্রথম লাইন দেখেই জে-ডি স্তম্ভিত। – এই ফাংশানটার ডেফিনিশানে একই আরগুমেন্ট দুবার ব্যবহৃত। ছ–নম্বর আর ন–নম্বর প্যারামিটার অবিকল এক! এটা কি আমার দৃষ্টির ভুল?

    সবাই সজোরে চোখ রগড়াতে লাগল, যেন জন্মাবার পর একটা শিশুর চোখ ফুটতেই সে নিজেকে কোনো অকথ্য সি–প্লাস–প্লাস প্রোগ্রামের সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় আবিষ্কার করেছে।

    যামিনী তড়বড় করে বলে – আসলে আই–টি গ্রুপের তনিমা আর তন্ময়ের মধ্যে রেষারেষি আছে। আমার মনে হয় ছয় নম্বরেরটা তন্ময় যোগ করেছিল। তনিমা সেটা ব্যবহার করবে না বলে নিজের জন্য পৃথকভাবে কাজটা করেছে। ওকে দোষ দেওয়া যায় না। তন্ময় যদি পরে দেখে তনিমা ওর লেখা কোড ব্যবহার করছে তাহলে সে চটে গিয়ে তনিমার ফাংশানে কিছু গণ্ডগোল করে দিতে পারে। তনিমা নতুন বলে ওকে ঘাঁটায় না।

    – তাই বলে এক গাড়িতে দুটো স্টিয়ারিং বসানো যায়? জে-ডি তাজ্জব। – দুটো দুদিকে ঘুরিয়ে দিলে কী হবে?

    – সেরকম বোকার মতো চালালে গাড়ি খাদে পড়াই উচিত। যামিনী কোনো কাল্পনিক ড্রাইভারকে কল্পনা করে ভুরু কুঁচকে ফেলে। – এত ডিটেলে তলিয়ে দেখা তোমাকে মানায় না, জে-ডি। কোড এখানে ব্রেক হচ্ছে না।

    জে-ডি আর্তনাদ করে বলে – তোমরা পোড় খাওয়া এক্সিকিউটিভ! অঙ্ক আর স্ট্যাটিসটিক্‌সের হাই–ফাই পি–এইচ–ডি খুঁজে এনে টীম গড়েছিলাম আমরা। রতন, তুমি তো অ্যাডজাঙ্ক্‌ট্‌ প্রফেসার ছিলে!

    রতনের মাথায় একটু টাক। ওজনও বেড়েছে পঁচিশ পাউণ্ড। সবার অলক্ষ্যে কয়েক–পা দূরে সরে যাবার পর জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিল, যেন ঝড় কেটে গেলেই বাড়ি চলে যাবে। জে-ডির মুখে নিজের নাম শোনার পর ঘুরে তাকিয়ে বলল – না, না। অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসার। টেনিওর ট্র্যাক ছিল আমার। খবরটা সলজ্জভাবে দিয়ে রতন আবার সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীদের মতো উদাসীন হয়ে যায়।

    যামিনী টীমের হয়ে বসের ঘাড়েই গাফিলতিটা চাপিয়ে দিল। – জে-ডি, তোমার যখন সন্দেহ ছিল তো লাল ঝাণ্ডা তুলে একটা মীটিং ডাকলে না কেন?

    – আমি হাত জোড় করে পোলাইটলি সব চেক করতে বলেছিলাম যাতে কেউ না ভাবো অসম্মান করছি। যামিনী, রতন, আমি তোমাদের তুলনায় বেবাক অশিক্ষিত। সবেতে কাঁচা। কিন্তু দশ–পনেরো বছর আগে করা কোনো কাজে এরকম একটা পাশবিক কদাচার দেখাতে পারবে?

    ‘পনেরো বছর’ কথাটা শোনার পর কয়েকজনের চোখ আকাশের দিকে উঠে গেছে, যেন জে-ডির মতো ডাইনোসরের দিকে তাকিয়ে ফেললে ফিক করে হাসি বেরিয়ে যাবে।

    ***

    হেমু এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সে লখ্‌নৌয়ী আদাবের অনুকরণে মাটির দিকে প্রায় অর্ধেকটা ঝুঁকে গিয়ে বলল – জে-ডি, পুরোপুরি আমাদের দোষ। আমরা তোমার কথাগুলো ঠিকমতো শুনিনি। সেই জন্য আমাদের শিক্ষা অসম্পূর্ণ। কাজে কোনো কোয়ালিটি নেই। অতি ওঁছা ডেলিভারি হয়েছে।

    হেমু এই প্রজেক্টে আদৌ ছিল না। কাজটা অতি ওঁছা হয়েছে স্বীকার করে সে অন্যদের বাসের তলায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে। জে-ডি বুঝতে পারছিল সে যখন থাকবে না তখন একদিন সবাই মিলে হেমুকে ট্রাকের নিচে ফেলে কীচক–বধ করবে। হেমু নিজের ভবিষ্যত দেখতে পাচ্ছে না, বর্তমান নিয়েই সে ব্যস্ত।

    শৈবাল লাস্ট বেঞ্চার। তার পক্ষপাতহীন চামচাগিরির একটা চোখ যামিনী আর একটা রতনের দিকে তাক করা ছিল। হেমুর অভিনয় শেষ হতেই সে যামিনী–রতনকে আড়াল করার চেষ্টায় কুঁইকুঁই করে বলল – কোয়ান্টরা খুঁতখুঁতে বলে আই–টি আমাদের পছন্দ করে না। বেশি সমালোচনা করলে তারা আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করবে না।

    যামিনী অমনি শৈবালকে সমর্থন করে। – একদম ঠিক। অত চিন্তার কী আছে, জে-ডি? রতন সমস্যাটা কোথায় অলরেডি ধরে ফেলেছে। কাউকে কিছু জানাবার দরকার নেই। নির্দিষ্ট দিনে সিস্টেম চালু করে দেব। তারপর রতন আর তনিমা চুপিচুপি একটা ব্যাণ্ড–এইড লাগিয়ে…। দ্যাখো, তুমি না এলেও আমরা চালিয়ে নিতাম। টীমের রেপুটেশান নিয়ে আমরা ভাবি। কেউ ই–মেল–এ কিছু লিখিনি তো!

    ***

    এতক্ষণ পরে জে-ডির মনে হয় বুদ্ধির ছিঁটে আছে এমন একটা কথা বেরিয়েছে যামিনীর মুখ দিয়ে। একটু ভেবে সে জিজ্ঞেস করে – এই আনাড়ি তনিমাটা যদি কিছু লিখে দেয়? সবে ঢুকেছে। কায়দা কানুন শেখেনি।

    – কী লিখবে তাই জানে না। আমরা ওকে কিচ্ছু শেখাই না তো এই কারণেই। জে-ডি, শোনো তোমাদের যুগে প্রোগ্রামিং ছিল এক ধরণের হাই ফিলসফি। আমাদের যুগে এটা হয়ে গেছে লো টেকনোলজি। আমরা এখন এসবের থেকে দূরত্ব বাড়াতে চেষ্টা করি। সবাই ভাবে নোংরামি…। তুমি যা চাও সেটা করতে গেলে গত দশ বছরের কোড বাতিল করে আবার গোড়া থেকে সব লিখতে হয়। তা কি সম্ভব? নিজেই বলো। কে ঘাঁটবে ওই ময়লা?

    সভায় নীরবতা। জে-ডি অনুভব করে বাস্তবের যবনিকা এসে পড়ছে তার জীবনের থিয়েটারে। যে নিজেই কিছু করতে চায় না সে অন্যদের দিয়ে কী করাবে? ভিকি ঠিক বলেছিল। সবাই তাকে একটা আপদের মতো দেখে।

    – আমি আর কী বলব? আমি তো মীটিং ডাকিনি। আসাও উচিত হয়নি বোধহয়। তোমাদের অসুবিধে করে দিলাম।

    – মীটিং তো শুরুই হয়নি। একটা ইনফর্মাল আলোচনা চলছিল। তুমি যদি মীটিংয়ে না থাকতে চাও তো থেকো না।

    যামিণী সাহায্য করার জন্য কনফারেন্স রুমের দরজাটা খুলে দেয় যাতে জে-ডি নিজের কফির কাপটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। মেয়েটা দশ বছর ধরে আছে। ভেটেরান। টীমের প্রতি বিশ্বস্ততা সন্দেহের অতীত। বেরোবার সময়ে তার নিচু গলা পাওয়া গেল – জে-ডি, তুমি ঠিক আছো তো?

    জে-ডি মানে না বুঝে বলে – হ্যাঁ, ঠিকই আছি। কেন বলো তো?

    যামিনী কিছুক্ষণ সন্দেহের চোখে বস্‌কে নিরীক্ষণ করার পর বলল – এমনিই।



    ১ম পর্ব             ২য় পর্ব             ৩য় পর্ব


    অলংকরণ (Artwork) : পরবাস ডিজিটাল আর্ট
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments