১ম পর্ব            
২য় পর্ব            
৩য় পর্ব

জেহুল আর বেঘুল
শনিবার সকালবেলা মায়ের সঙ্গে কথা বলে জে-ডি। সেদিন মেজাজটা সমে ছিল না। সে ঠিক করেছিল কয়েকটা প্রশ্নের জবাব বার করে ছাড়বে।
– হ্যালো, জেহুল। কেমন আছিস?
– হ্যালো, মা! খারাপ কেন থাকব? ভালোই আছি।
মেজাজ হালকা ছিল না বলে জে-ডি শিষ্টাচারের পরেই একটানা নালিশ করতে থাকে।
– আমার নাম জেহুল কেন? এটা কারো নাম হয়? যতবার জিজ্ঞেস করেছি দাদুর ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিয়েছ। দাদু কি বানানটা লিখে দিয়েছিল?
হা–হা করে মায়ের হাসি ভেসে আসে। – বাচ্চার নাম কেউ লিখে দেয় নাকি? মুখে বলত।
জে-ডি প্রসঙ্গটা ছাড়তে পারেনি। মৃত্যুশয্যায় লোকেদের গলা থেকে অনেক রকম ঘড়ঘড় শব্দ বেরোয়। সেসব সিরিয়াসলি নেয় না কেউ। পৃথিবীর কোনো ভাষায় এই বিদঘুটে শব্দটার মানে আছে কিনা কেউ বলতে পারে না। বাঙালিরা শুনে হাঁ করে চেয়ে থাকে। দিল্লীতে পাঞ্জাবী, মাদ্রাজী, গুজ্জর, কাহার সবাই জে-ডির নাম শুনে হাসত। টিটকিরি এড়াবার জন্য বিদেশে এসে তাকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে। এই ধরনের অনেকগুলো সন্দেহ আর ক্ষোভ সে গড়গড় করে মায়ের কাছে প্রকাশ করে ফেলল।
– আরে বাবা, মৃত্যুশয্যায় নয়, সুস্থ শরীরে সারাজীবন ধরে বহুবার বলেছে নামটা। তোর দাদু বলত আরাকানিদের মধ্যে হয়।
– সেটা দাদু কী করে জানল?
– বলিনি তোকে? বর্মায় বাবার একটা পেন ফ্রেণ্ড ছিল। তখনকার দিনে এত ফোন–টোন করা যেত না। যাওয়াও যেত না। রেডিওর জন্য খবর লিখত বাবা, কিন্তু খবর পাবে কোথায়? সেইজন্য দেশ–বিদেশে চল্লিশটা পেন ফ্রেণ্ড রেখেছিল। তাদের কাছ থেকে চিঠি এলে সেগুলোই একটু নেড়ে–চেড়ে অল ইণ্ডিয়া রেডিওর নিউজ ব্যুরো থেকে ইংরিজি, হিন্দী, বাংলা, তিনটে ভাষায় পড়া হত। বাই গড বলছি।
লজ্জায় জে-ডির মাথা নত। যে মুহূর্তে মায়ের মুখ থেকে ‘বাই গড’ শব্দদুটো বেরোয়, সেই মুহূর্ত থেকে কথার সততা আর প্রশ্নের অতীত থাকে না। – সেই আরাকানি ফ্রেণ্ড দাদুকে জেহুল নামটা লিখে পাঠিয়েছিল? জেহুল শুধোয়। – কোন ভাষায়?
– হ্যাঁ সেটা একটা ভালো প্রশ্ন। দুটো নাম পাঠিয়েছিল। জেহুল আর বেঘুল।
– বেঘুল!! গুড গড!
– হ্যাঁ রে! পরিষ্কার মনে আছে, যেন কালকের কথা। তবে আরাকানি বন্ধু নিজে লিখতে পারত না, রাস্তার লোকেদের ধরে ধরে তাদের দিয়ে বেচারা লেখাত। ফলে অর্ধেক ইংরিজি আর অর্ধেক দুর্বোধ্য সব ভাষায় লেখা হয় তার চিঠি।
– হাউ অ্যাবসার্ড! জেহুল টেবিলে চাপড় মেরে মায়ের মিথ্যেটাকে নেংটি ইঁদুরের মতো থাবার নিচে ধরে ফেলেছিল। – যে লিখতেই পারে না সে কারো পেন ফ্রেণ্ড হতে যাবে কেন?
– সবেতে তোর জেরা করা চাই। আমি শুনেছি প্রথমে যে পেন ফ্রেণ্ড হয়েছিল এই লোকটা তার ফ্রেণ্ড। প্রথম ফ্রেণ্ড মরে যাবার পর এই লোকটা বাবার চিঠিগুলো অন্যদের দিয়ে পড়িয়ে উত্তর লেখাত। মোদ্দা কথা এই যে নামগুলো ভীষণ তেড়াবেঁকা হরফে এসেছিল। বলতে গেলে দুষ্পাঠ্য। কিন্তু আমার বাবাও হাল ছাড়ার পাত্র না, সারা রাত ধরে একটা ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস নিয়ে চেষ্টা করে যায়। পরদিন সকালে আমরা শুনলাম যে কিছু কিছু অক্ষর উলটে দেবার পর কয়েকটা কালির আঁচড় কমিয়ে দিলে ইংরেজি বেরিয়ে আসছে। সেইভাবে নাম দুটো উদ্ধার হয়েছিল।
– লাভলি! জেহুল আর বেঘুলের মধ্যে একটাকে পছন্দ করতে খুব কষ্ট হয়নি তো? মিছরি মাখা গলায় ব্যঙ্গ করে বলে জে-ডি।
মা খানিকক্ষণ চুপ।
– কী হল? দেবার মতো জবাব নেই বোধহয়।
– এত ভালো নাম পেয়ে কেন যে তুই দুঃখ করিস? তোকে খুব মানিয়েওছিল। জেহুল, বেঘুল দুই–ই বলতাম আমরা। স্কুলেও দুটো নাম লেখানো হয়। ওরা বজ্জাতি করে একটা বাদ দিয়ে দিয়েছে। আমার বন্ধু শীলা তার ছেলের নাম দিয়েছিল কম্বল। কই সে তো…?
– কম্বল নয়, কন্ওয়ল। কঁওয়ল। অর্থাৎ কমল! মানে লোটাস! মায়ের কথার মাঝখানে খিঁচিয়ে ওঠে জেহুল।
– নাঃ। আমার মনে হয় না। চুপ করে একটু ভাবার পর বলে জে-ডির মা। – শীলার বাবা–মা শিমলায় থাকত। ঠাণ্ডার দেশের লোক…। লোটাস ওরা পাবে কোথায়?
এইভাবে কাজ হচ্ছে না। জে-ডি ঠিক করে রেখেছিল মা’কে দিয়ে অন্তত কয়েকটা সত্যি কথা বলিয়ে ছাড়বে। যার ছেলের মিথ্যে বলতে এত অসুবিধে হয় তার মা কেন একটা সত্যি কথা বলতে পারে না? সে গিয়ার পালটাল।
– আচ্ছা, তার মানে সেই আরাকানির চিঠিটা যখন আসে তখন তুমি দাদুর কাছেই ছিলে? অর্থাৎ বিয়ের আগে?
– ও, হ্যাঁ। তখন অল্প বয়স। বিয়ে তো হয় অনেক পরে। আমরা সবাই সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের চাকরি করতাম কিন্তু তাও একটা পয়সা জমত না। পেনিলেস্। সেই জন্য না দাদাদের বিয়ে হচ্ছিল, না আমাদের। ট্র্যাফিক জ্যামের মতো ভজঘট অবস্থা। বাড়িতে পা রাখার জায়গা নেই। সেরকম একটা সময়ে আমাদের বিরাট কুকুর দুটো, যাদের নাম ছিল জেহুল আর বেঘুল, তারা একসঙ্গে মরে যায়। তারপর অবাক কাণ্ড! একটার পর একটা আরো সব মির্যাকল্ হতে থাকে। দেখতে দেখতে পটাপট আমাদের প্রত্যেকের বিয়ে, বাচ্চা, কী না হয়ে গেল? এমনকি বিদেশ বিভুঁইয়ে নিজেদের বাড়িও। বিদেশ বলছি এই জন্য কারণ আমরা ছিলাম ঢাকার লোক। বাবার নির্দেশে ইন্ডিয়াকে কখনও আমরা নিজেদের দেশ ভাবতাম না।
– গুড লর্ড! জে-ডি ডুকরে ওঠে। – নাম দুটো তাহলে কুকুরের জন্য পাঠিয়েছিল সেই আরাকানি? আমার জন্য নয়! এটাই আমি তোমার মুখ থেকে বলাতে চাইছিলাম। দুটো অপয়া কুকুরের নাম তোমরা আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছ!
– অপয়া কাকে বলছিস? ওরকম পয়মন্ত কুকুর কোথায় গেলে পাবি তুই?
– এতই পয়া যে মরে না যাওয়া অবধি তোমাদের কারো বিয়ে হল না? যা হবার সব তো ওরা মরবার পরে হয়েছে।
– ওঃ, তুই জানিস না তার মানে। খুব মহান আর পয়মন্ত মানুষরা যখন গত হন তারপর দেখা যায় চারদিকে সবার মঙ্গল হচ্ছে।
মা আবার মাথামুণ্ডুহীন তর্কে জড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিবার অবান্তর কথার স্রোতে নাকানি চোবানি খেয়ে জে-ডি নাজেহাল হয়ে যায়। চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে। সে একটা লম্বা দম নিয়ে প্রসঙ্গে ফেরার চেষ্টা করল।
– সবাইকে ছেড়ে জেহুল আর বেঘুলের পুণ্য স্মৃতি তোমরা আমার ঘাড়ে চাপালে কেন? আমার আগেও তোমার ভাইবোনদের বেশ কয়েকটা বাচ্চা হয়েছিল। তাদের তো ফিল্ম স্টারদের মতো নাম দিয়েছিলে।
– আমি তোর মধ্যে আমার বাবার স্মৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। তোর শরীরের মন্দিরে বাবার আত্মা এসে বাস করুক, এটা চেয়েছিলাম। বাবা তো তোকে দেখে যেতে পারেনি। কিন্তু জেহুল আর বেঘুলকে অনেক ভালোবাসা দিয়েছিল। আমি ভাবতাম বাবা উপর থেকে তোর গায়ে সেইভাবে হাত বুলিয়ে দেবে যেভাবে জেহুল–বেঘুলকে আদর করত। তোকে সব সময়ে রক্ষা করবে।
– থ্যাঙ্ক ইউ। কিন্তু হোয়াই মী? মামাদের, মাসিদের ছেলেমেয়েদের নয় কেন? তারা কি বানের জলে ভেসে এসেছিল?
– নইলে তোকে বাঁচানো যেত না। ছোটবেলা তোর উপর থেকে নজর সরালেই তুই চোখ বুজে নিঃশ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দিতিস। পাড়ার লোকে বলত কোনো শাপভ্রষ্ট বসুটসু হবে, সুইসাইড করার চেষ্টা করছে যাতে শাপমুক্ত হয়ে আবার দেবলোকে ফিরে যেতে পারে। তোর কিছু হলে এরাই আমাকে গঙ্গা–মা বলে বদনাম দিত। তো চব্বিশ ঘন্টা কে বাচ্চাকে চোখে চোখে রাখবে? তাই বাবাকে ডেকে বললাম, তুমি ওর ভিতরে ঢুকে পায়চারি করো। কিছুতেই এই বেবিটাকে মরতে দিও না। আমার বাবা খুব শক্তিশালী অ্যাথলেটিক পুরুষ ছিলেন। আমি জানতাম বাবাকে অতিক্রম করে যমও তোর কাছে আসতে পারবে না। তুই দাদুর সেই প্রোটেকশানটা অনুভব করিস না?
– মা, আমি আগে একটু আধটু দৌড়োতাম। তারপর পিঠে তিনটে চাকতি স্লিপ করে গেছে। কোথায় আমার বন্ধুরা কেউ মুম্বাই, কেউ টোকিওতে ম্যারাথন হাঁকড়াচ্ছে, আর কোথায় আমি দৌড়োতে গেলে আমার পাশ দিয়ে হাই স্কুলের মেয়েরা একটু জোরে হেঁটে পেরিয়ে যায়। লজ্জায় পার্কে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছি। নাতিকে কীভাবে প্রোটেকশান দিতে হয় সেটা আমার অ্যাথলেটিক দাদুর বোধহয় উচিত আমার বন্ধুদের দাদুদের দেখে শিখে নেওয়া।
আবার কোনো শব্দ নেই। জে-ডির মনে হয় নীরবতার মধ্যে দিয়ে মা তার শান্ত হবার অপেক্ষা করছে। বেখেয়ালে সে পিঠ সোজা করে টান হয়ে বসেছিল।
– আমি বাবাকে ডেকে বলব। তুই চেষ্টা করে যা। একটু পরে শুনল জেহুল। – পার্কে যেতে একদম ভয় পাস না। দেখিস, শীগ্গীরই মেয়েগুলো তোর কাছে হারবে।
জে-ডি’র টীম
অফিসে জে-ডি দুপুরের খাওয়ার পর ঘন্টা তিনেক বিল্ডিংয়ের অন্য প্রান্তে এক বন্ধুর ঘরে লুকিয়ে আড্ডা দেয় আর কফি খায়। সেই কাবাবের মাঝখানে হাড্ডির মতো একটা টেক্স্ট্ মেসেজ হাজির। দলের জরুরী মীটিং। সবার উপস্থিতি প্রার্থনীয়। অত্যন্ত খারাপ খবর না থাকলে জে-ডিকে কেউ কাজের মধ্যে টানে না।
দিনে তিন ঘন্টা আড্ডা দেবার ক্ষমতা এই অফিসে জে-ডি ছাড়া মাত্র আর একজনের, জে-ডির বন্ধু ভিকির, যে জে-ডির চেয়েও কম কাজ করে। ভিকির সাথে জে-ডির তফাৎ এই যে জে-ডি চাইলে হয়তো কিছু কাজ করে ফেলতেও পারে, কিন্তু তার ইচ্ছে হয় না। ভিকি পঁয়ত্রিশ পেরোবার পর থেকে পুরোপুরি অক্ষম। একমাত্র এল–এস–ডি সেবন করলে কয়েক ঘন্টার জন্য কর্মক্ষমতা ফিরে পায়। সেই ভয়ে বেচারা এল–এস–ডি খাওয়াও ছেড়ে দিয়েছে।
ভিকি বলল – তুই মীটিংয়ে গিয়ে জ্ঞান দিতে শুরু করবি। কাজ তো এগোবেই না, তোর টীমটা নেতিয়ে যাবে।
জে-ডি ভিকির কথাটাই টীমকে টেক্স্ট্ করে দেয়। – হ্যালো সবাই, আমি মুখ খুললে তোমরা বলবে জ্ঞানাচ্ছি। তাতে কাজ এগোবে না, তোমাদের দিনটাও নষ্ট হয়ে যাবে। তার চেয়ে নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে ফেললে ভালো হয় না?
যামিনী অমনি লিখল – জে-ডি কোনো চিন্তা নেই, আমরা নিজেরা যা করার করে নেব। ধন্যবাদ।
যামিনীর নাম আসলে যামিনী না। সে মোটেও বাঙালি কি ভারতীয়ও নয়। পৃথিবীর অন্য এক প্রান্ত থেকে তার মন্দ কপাল তাকে জে-ডির দলে এনে ফেলেছে। সবাইকে মনে মনে একটা বাঙালি নাম দেওয়া জে-ডির বাতিক।
যামিনী এত তাড়াতাড়ি উত্তরটা দিয়েছিল যে জে-ডি কফি নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসতে পারছিল না। সে আলাদা করে হেমাঙ্গকে একটা চিরকুট পাঠাল। হেমাঙ্গও দূর দেশের ছেলে। সে প্রথম দিন থেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জে-ডির স্পাই হয়ে গেছে। প্রথমে হেমাঙ্গর স্পাইগিরি জে-ডির পছন্দ হত না। পরে অভ্যেস হয়ে যায়।
– হেমু, আমি কী মীটিংয়ে না গেলে কোনো ক্ষতি আছে?
– এলেই ভালো হয়। হেমুর জবাব এসে গেল পরমুহূর্তে। জে-ডি ভিকিকে বলে – যাব আর আসব। কফি অবধি ঠাণ্ডা হবে না। হেমু ব্যাটা কাজ তো কিছু পারে না, আমার হয়ে জাসুসী করাটাই ওর প্রধান কোয়ালিফিকেশন। কেন জানি না, ও আজ টীমকে একটু বাঁশ দিতে চাইছে। নিজস্ব স্পাইকে নিরাশ করা যায় না।
***
কনফারেন্স রুমে গিয়ে মীটিংয়ে যোগ দেবার পর জে-ডি জানতে পারল জটিল অঙ্কের কোডিংয়ে গলদের ফলে তাদের সিস্টেম মাঝে মাঝে ক্র্যাশ করছে। অন্য টীমগুলোর কাছে জে-ডিকে হাতজোড় করে কোনো অজুহাত দেখাতে হবে।
– যামিনী, রতন… হতাশ জে-ডি অনুযোগ করে। – তোমাদের তিনমাস আগে বলেছিলাম কোডে গণ্ডগোল আছে, আই–টি’র উপর ভরসা না রেখে চুপচাপ নিজেরাই শুধরে নাও। তারপর সব পরীক্ষা করে আমায় ফলাফল দেখাওনি?
– সবই দেখিয়েছি, জে-ডি। যামিনী বলল।
– এই বিকট ফেলিয়রগুলো আমার নজর এড়িয়ে গেল?
যামিনী একটা প্যাঁচার মতো মুখ করে। অর্থাৎ মীটিংয়ে এত তলিয়ে জেরা করা ভদ্রলোকের কাজ না। তারপর সে বলল – তোমাকে যে রেজাল্ট দেখিয়েছি তা থেকে আজেবাজে ফলাফলগুলো বার করে নিয়েছিলাম।
জে-ডিকে হাতড়ে হাতড়ে একটা সীট খুঁজে বসে পড়তে হয়। কিছুক্ষণ সত্যিই চোখে অন্ধকার দেখছিল সে।
– জে-ডি, তুমি চাইলেই ফেলিয়রগুলো দেখাতাম। তুমি চেয়েছিলে? যামিনী তার অসন্তুষ্ট মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়েছে, যেন দোষটা সম্পূর্ণ জে-ডির।
রতন মাঝখানে এসে বলল – একটামাত্র কেলো আছে, কারো সাহায্য লাগবে না, আমিই টুক করে সারিয়ে দেব।
অসহায় জে-ডি ককায়। – কিন্তু পৃথিবীকে জানাতে হবে তো? ক্ষমা চেয়ে বলতে হবে সব কেঁচে গণ্ডূষ করো। তাতে আমাদের কীরকম বদনাম রটবে সেটা ভেবেছ তোমরা? যামিনী, মনে পড়ছে তোমাকে ই–মেল করে গোটা পাঁচেক প্রশ্ন পাঠাই। তার একটারও জবাব পাইনি…।
– কাজ চলছে, শীগ্গীরই সবকটার জবাব দেব। যামিনী আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলে। – তুমি যা ভাবছিলে তা নয়। আগেরবার তোমাকে ঠিক ফাইলটা পাঠাইনি। আসলটা তনিমার নিজের হাতে লেখা। সেইটা দেখানো উচিত ছিল।
জে-ডি মনে মনে বলল – যামিনী, তুমি আজ আমার প্রশ্নের যা উত্তর দেবে, কাল নির্দ্বিধায় বলবে সেটা ছিল ভুল। তনিমা তো একটা নতুন মেয়ে। সে কী করছে, কেন করছে, কিস্সু জানে না। তুমি তাকে মাস্টারনীর মতো নিজের তাঁবে রেখেছ। আমি কি জানি না যে তোমাকে না দেখিয়ে সে এক লাইন কোডও লেখে না? আমারই বোকামো। তোমাদের বিশ্বাস করে নিজের কবর খুঁড়ে ফেলেছি।
***
সেদিন ভিকির সঙ্গে দুপুরবেলার আড্ডাটাকে গুলি মেরে নিজের সুনাম বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় জে-ডিকে। – শো মী। দেখা যাক তো কী লিখেছে তনিমা। এসো, লাইন ধরে ধরে সবাই মিলে দেখি।
একটু পরে কম্পিউটারের স্ক্রীনে লেখাগুলো ফুটে উঠছিল। তিন–চারজন মধ্যবয়স্ক অঙ্কে পি–এইচ–ডি করা কোয়ান্ট লজ্জা লজ্জা মুখে তাদের কীর্তি উদ্ঘাটিত করছে। প্রথম লাইন দেখেই জে-ডি স্তম্ভিত। – এই ফাংশানটার ডেফিনিশানে একই আরগুমেন্ট দুবার ব্যবহৃত। ছ–নম্বর আর ন–নম্বর প্যারামিটার অবিকল এক! এটা কি আমার দৃষ্টির ভুল?
সবাই সজোরে চোখ রগড়াতে লাগল, যেন জন্মাবার পর একটা শিশুর চোখ ফুটতেই সে নিজেকে কোনো অকথ্য সি–প্লাস–প্লাস প্রোগ্রামের সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় আবিষ্কার করেছে।
যামিনী তড়বড় করে বলে – আসলে আই–টি গ্রুপের তনিমা আর তন্ময়ের মধ্যে রেষারেষি আছে। আমার মনে হয় ছয় নম্বরেরটা তন্ময় যোগ করেছিল। তনিমা সেটা ব্যবহার করবে না বলে নিজের জন্য পৃথকভাবে কাজটা করেছে। ওকে দোষ দেওয়া যায় না। তন্ময় যদি পরে দেখে তনিমা ওর লেখা কোড ব্যবহার করছে তাহলে সে চটে গিয়ে তনিমার ফাংশানে কিছু গণ্ডগোল করে দিতে পারে। তনিমা নতুন বলে ওকে ঘাঁটায় না।
– তাই বলে এক গাড়িতে দুটো স্টিয়ারিং বসানো যায়? জে-ডি তাজ্জব। – দুটো দুদিকে ঘুরিয়ে দিলে কী হবে?
– সেরকম বোকার মতো চালালে গাড়ি খাদে পড়াই উচিত। যামিনী কোনো কাল্পনিক ড্রাইভারকে কল্পনা করে ভুরু কুঁচকে ফেলে। – এত ডিটেলে তলিয়ে দেখা তোমাকে মানায় না, জে-ডি। কোড এখানে ব্রেক হচ্ছে না।
জে-ডি আর্তনাদ করে বলে – তোমরা পোড় খাওয়া এক্সিকিউটিভ! অঙ্ক আর স্ট্যাটিসটিক্সের হাই–ফাই পি–এইচ–ডি খুঁজে এনে টীম গড়েছিলাম আমরা। রতন, তুমি তো অ্যাডজাঙ্ক্ট্ প্রফেসার ছিলে!
রতনের মাথায় একটু টাক। ওজনও বেড়েছে পঁচিশ পাউণ্ড। সবার অলক্ষ্যে কয়েক–পা দূরে সরে যাবার পর জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিল, যেন ঝড় কেটে গেলেই বাড়ি চলে যাবে। জে-ডির মুখে নিজের নাম শোনার পর ঘুরে তাকিয়ে বলল – না, না। অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসার। টেনিওর ট্র্যাক ছিল আমার। খবরটা সলজ্জভাবে দিয়ে রতন আবার সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীদের মতো উদাসীন হয়ে যায়।
যামিনী টীমের হয়ে বসের ঘাড়েই গাফিলতিটা চাপিয়ে দিল। – জে-ডি, তোমার যখন সন্দেহ ছিল তো লাল ঝাণ্ডা তুলে একটা মীটিং ডাকলে না কেন?
– আমি হাত জোড় করে পোলাইটলি সব চেক করতে বলেছিলাম যাতে কেউ না ভাবো অসম্মান করছি। যামিনী, রতন, আমি তোমাদের তুলনায় বেবাক অশিক্ষিত। সবেতে কাঁচা। কিন্তু দশ–পনেরো বছর আগে করা কোনো কাজে এরকম একটা পাশবিক কদাচার দেখাতে পারবে?
‘পনেরো বছর’ কথাটা শোনার পর কয়েকজনের চোখ আকাশের দিকে উঠে গেছে, যেন জে-ডির মতো ডাইনোসরের দিকে তাকিয়ে ফেললে ফিক করে হাসি বেরিয়ে যাবে।
***
হেমু এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সে লখ্নৌয়ী আদাবের অনুকরণে মাটির দিকে প্রায় অর্ধেকটা ঝুঁকে গিয়ে বলল – জে-ডি, পুরোপুরি আমাদের দোষ। আমরা তোমার কথাগুলো ঠিকমতো শুনিনি। সেই জন্য আমাদের শিক্ষা অসম্পূর্ণ। কাজে কোনো কোয়ালিটি নেই। অতি ওঁছা ডেলিভারি হয়েছে।
হেমু এই প্রজেক্টে আদৌ ছিল না। কাজটা অতি ওঁছা হয়েছে স্বীকার করে সে অন্যদের বাসের তলায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে। জে-ডি বুঝতে পারছিল সে যখন থাকবে না তখন একদিন সবাই মিলে হেমুকে ট্রাকের নিচে ফেলে কীচক–বধ করবে। হেমু নিজের ভবিষ্যত দেখতে পাচ্ছে না, বর্তমান নিয়েই সে ব্যস্ত।
শৈবাল লাস্ট বেঞ্চার। তার পক্ষপাতহীন চামচাগিরির একটা চোখ যামিনী আর একটা রতনের দিকে তাক করা ছিল। হেমুর অভিনয় শেষ হতেই সে যামিনী–রতনকে আড়াল করার চেষ্টায় কুঁইকুঁই করে বলল – কোয়ান্টরা খুঁতখুঁতে বলে আই–টি আমাদের পছন্দ করে না। বেশি সমালোচনা করলে তারা আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করবে না।
যামিনী অমনি শৈবালকে সমর্থন করে। – একদম ঠিক। অত চিন্তার কী আছে, জে-ডি? রতন সমস্যাটা কোথায় অলরেডি ধরে ফেলেছে। কাউকে কিছু জানাবার দরকার নেই। নির্দিষ্ট দিনে সিস্টেম চালু করে দেব। তারপর রতন আর তনিমা চুপিচুপি একটা ব্যাণ্ড–এইড লাগিয়ে…। দ্যাখো, তুমি না এলেও আমরা চালিয়ে নিতাম। টীমের রেপুটেশান নিয়ে আমরা ভাবি। কেউ ই–মেল–এ কিছু লিখিনি তো!
***
এতক্ষণ পরে জে-ডির মনে হয় বুদ্ধির ছিঁটে আছে এমন একটা কথা বেরিয়েছে যামিনীর মুখ দিয়ে। একটু ভেবে সে জিজ্ঞেস করে – এই আনাড়ি তনিমাটা যদি কিছু লিখে দেয়? সবে ঢুকেছে। কায়দা কানুন শেখেনি।
– কী লিখবে তাই জানে না। আমরা ওকে কিচ্ছু শেখাই না তো এই কারণেই। জে-ডি, শোনো তোমাদের যুগে প্রোগ্রামিং ছিল এক ধরণের হাই ফিলসফি। আমাদের যুগে এটা হয়ে গেছে লো টেকনোলজি। আমরা এখন এসবের থেকে দূরত্ব বাড়াতে চেষ্টা করি। সবাই ভাবে নোংরামি…। তুমি যা চাও সেটা করতে গেলে গত দশ বছরের কোড বাতিল করে আবার গোড়া থেকে সব লিখতে হয়। তা কি সম্ভব? নিজেই বলো। কে ঘাঁটবে ওই ময়লা?
সভায় নীরবতা। জে-ডি অনুভব করে বাস্তবের যবনিকা এসে পড়ছে তার জীবনের থিয়েটারে। যে নিজেই কিছু করতে চায় না সে অন্যদের দিয়ে কী করাবে? ভিকি ঠিক বলেছিল। সবাই তাকে একটা আপদের মতো দেখে।
– আমি আর কী বলব? আমি তো মীটিং ডাকিনি। আসাও উচিত হয়নি বোধহয়। তোমাদের অসুবিধে করে দিলাম।
– মীটিং তো শুরুই হয়নি। একটা ইনফর্মাল আলোচনা চলছিল। তুমি যদি মীটিংয়ে না থাকতে চাও তো থেকো না।
যামিণী সাহায্য করার জন্য কনফারেন্স রুমের দরজাটা খুলে দেয় যাতে জে-ডি নিজের কফির কাপটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। মেয়েটা দশ বছর ধরে আছে। ভেটেরান। টীমের প্রতি বিশ্বস্ততা সন্দেহের অতীত। বেরোবার সময়ে তার নিচু গলা পাওয়া গেল – জে-ডি, তুমি ঠিক আছো তো?
জে-ডি মানে না বুঝে বলে – হ্যাঁ, ঠিকই আছি। কেন বলো তো?
যামিনী কিছুক্ষণ সন্দেহের চোখে বস্কে নিরীক্ষণ করার পর বলল – এমনিই।
চুমকি
পরের দিন জে-ডি বাড়ি থেকে কাজ করছিল, অর্থাৎ কোম্পানির সিস্টেমে রিমোট লগ–ইন করার পর পৃথিবীতে যত অনলাইন ইংরেজি খবরের কাগজ আছে, সব পড়ে শেষ করার তালে ছিল। স্ত্রী চুমকি তার অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফেরার পর চেঁচিয়ে নিজের আগমন ঘোষণা করে। – জে-ডি, কফি হয়নি এখনো?
জে-ডি কফি বানিয়ে এনে দেখে চুমকি পার্কে দৌড়োবার পোষাক পরে তৈরি। শীত শেষ, কিন্তু এ বছর বসন্তও কম শীতল নয়। এই কাঁচের বাক্সের মতো বাড়িতে বসে বোঝা যায় না বাইরের হাওয়াটা কীরকম। কফিতে চুমুক দিয়ে জে-ডি বলল – ঠাণ্ডা লেগে যাবে না তো?
– জে-ডি, বাড়িতে বসে বসে আর কতদিন কাটাব? চলো একটু রোদ্দুর লাগিয়ে আসি। এ মাসে আমরা একটা উষ্ণ কোনো জায়গায় বেড়াতে যেতে পারি কি? ধরো তিন বা চার দিনের জন্য?
– আমার এত টায়ার্ড লাগে কেন?
– সারাদিন বসে থাকলে তো ওরকমই হবে! উঠে পড়ো। একটু নাচো। আমি তোমাকে তিনটে সহজ স্টেপ দেখাচ্ছি। দেখো পারো কিনা।
জে-ডি স্টেপগুলো কোনোমতে উতরে দেবার পর হাত জোড় করে নেয়। – আমার দ্বারা হবে না।
– হবে, হবে। তুমি আগে কত ভালো পারতে।
– তখন পৃথিবীটা ফ্ল্যাট ছিল। অসীম। এখন হয়ে গেছে গোল। প্রচণ্ড জোরে ঘুরছে। ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে গতি।
– বাজে বকা একটু কমাও, সব কাজ সহজ হয়ে যাবে। পৃথিবী চিরকালই ঘোরে। নইলে আমরা হয় দিন বা রাত, একটা জায়গায় আটকে যেতাম। একদম বসবে না, আরো চারটে স্টেপ দিচ্ছি। আমাকে দেখে দেখে করো। ওয়ান–টু–থ্রি–ফোর। বাঃ বাঃ। আবার করো। ওয়ান–টু–থ্রি–ফোর… গ্রেট জ–অ–অ–ব! টুনটুনির বিয়ে নেক্সট্ ইয়ার। দিল্লীতে গিয়ে আমরা দুজনে এই ডান্স্টার শো দেব। কেমন?
আমরা ততদিন বাঁচব? মনে মনে ভাবে জে-ডি। একটু পরে সে বলল – এই স্টেপগুলো আমার ভালো লাগে না। বড্ড মেয়েলি। আমি এগুলো করলে লোকে হাসবে।
– মোটেও না। হাততালি দেবে। তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আড়ষ্ট, রোবটের মতো মুভমেন্ট। আমি জয়েন্ট খোলার চেষ্টা করছি। এই নাও, কাঁধ থেকে শুরু করে হাতদুটোকে মাছের লেজের মতো নাড়াও দেখি?
– কয়েকটা ম্যাস্কুলিন স্টেপও তো দিতে পারো। অন্যরা যেরকম করে।
– এক পায়ে লাফিয়ে এদিক থেকে ওদিক যেতে পারবে তুমি? দরি বা কার্পেটের উপর নাচতে হলে টো মাটি থেকে এক ইঞ্চি উপরে রাখা চাই, নইলে পা আটকে গিয়ে আছাড়…।
– টিটকিরি খাওয়ার চেয়ে আছাড় খাওয়া ভালো।
– আচ্ছা, আমি দিচ্ছি সেরকম কয়েকটা। আগে কিন্তু তোমার ম্যাস্কুলিনিটি নিয়ে এরকম ইনসিকিওরিটি ছিল না।
জে-ডি ভাবে, হবে কী করে? ঘরভর্তি ফিমেল। তিরিশ বছর ধরে বাড়িতে শুধু মহিলা আর মেয়েদের বাসা। স্ত্রীর কাছে কবুল করল জে-ডি – লোকজন দাঁত বার করে বাঁদরের মতো হাসছে দেখলে সবার হীনমন্যতা হয়।
চুমকি জে-ডির পিঠে হাত বুলিয়ে বলে – ভয় নেই। এমন হনুমানের স্টেপ শেখাব যে বাঁদরদের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে।
***
পরে চুমকি আর তার বর পাড়ার বিশাল পার্কটার এক মাইল ট্র্যাকে দৌড়তে গিয়েছিল। জে-ডি’র গায়ে ফ্লীসের উপর পলিএস্টারের স্তর। মাথায় নাইলনের কানঢাকা ক্যাপ। চুমকি পরেছে স্কুবা ডাইভারদের মতো লাইক্রার মসৃণ এবং বাতাসরোধী দৌড়ের পোষাক। তা সত্ত্বেও তারা কচ্ছপের গতিতে ছুটছিল। হাত পা জমে যাওয়ার মতো ঠাণ্ডা হাওয়া।
আধ মাইলের কাছাকাছি এসে জে-ডির নালিশ শুরু হয়।
– এত আস্তে দৌড়ে আমরা কী প্রমাণ করছি? বুড়োবুড়িরা হেঁটে চলেছে, আমরা তাদেরও পেরিয়ে যেতে পারছি না।
– ঠিকই পেরোচ্ছি।
– ভিকির কুড়িটা ম্যারাথন হয়ে গেছে। সাড়ে ছ মিনিটে মাইল। তার বউ অঙ্গুরীও…
– ওরা আট–দশ বছর ছোট। তুমি ভিকি হও। আমি অঙ্গুরী হচ্ছি না। পারবে সে আমার মতো চল্লিশটা লুচি ভাজতে?
– লুচির নামও মুখে এনো না। ওটা বাঙালিদের ডিজগ্রেস। সতীদাহ প্রথার মতো। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, কেউ এটার বিরুদ্ধে কিছু বলেননি বলে আমি ওঁদের আর শ্রদ্ধা করি না।
ততক্ষণে চুমকির মুখে ফুর্তির ছটা এসে গিয়েছিল। সে তড়বড় করে বলে – শোনো, দৌড়োবার পর লুচি ইজ মাস্ট! বাড়িতে গিয়েই বানাব। বেশি না, দুই–দুই চার। বড়ো সাইজের। তোমারগুলো কড়া লাল। বেলুনের মতো ফোলা। সঙ্গে হিং দিয়ে ফালি করে কাটা আলুর তরকারি। কম হলুদ, একটু ঝোল, আর অনেকগুলো কাঁচা লঙ্কা। দশ মিনিটের বেশি লাগবে না। তুমি চা–টা করে ফেলো, প্লীজ। বলতে বলতে চুমকিকে জিভের জল সামলাতে হয়।
– আজকে আবার…? আমি কি তাহলে আরো কিছু বানাব?
– তুমি বড্ডো স্লো। চা করো, তাই যথেষ্ট। চায়ের আগে লুচি হয়ে যাবে। তারপর আর অপেক্ষা করতে পারব না।
সমালোচনাটা জে-ডি নিতে পারেনি। সে বলল – আমি স্লো হয়ে থাকতে চাই না। আজ যদি লুচি হয়, তাহলে আরো এক মাইল ছোটা উচিত। একটু স্পীডে।
– পাগলামি কোরো না। অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দিতে নেই। পড়ে গেলে কে ডাক্তার হাসপাতাল করে বেড়াবে?
– ওই যে দলটা ছুটছে, ওরা তো প্রায় বুড়োই। আমি অন্তত একবার ওদের পেরিয়ে যেতে চাই। তোমার সঙ্গে ছুটে ছুটে আমার একটুও স্পীড বাড়ছে না।
এটাই শোনার অপেক্ষায় ছিল চুমকি। সে তৎক্ষণাৎ থেমে গিয়েছে।
– কে সেধেছে আমার সঙ্গে ছুটতে? আমি বসলাম। তুমি যা ইচ্ছে করো। মনে রেখো এরা রানিং ক্লাবের মেম্বার! লুচিইংয়ের ক্লাব চালায় না।
***
জে-ডির স্ত্রী পার্কের ভিতরে ফাঁকা বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়েছিল। জে-ডিও একটু দম নিতে দাঁড়িয়ে যায়। একটা সাদা সারস পাখি ঝোপের ধারে কুট কুট করে কিছু খাচ্ছিল। সে জে-ডির কাছাকাছি সরে এসে তার মুখের দিকে চেয়ে রইল, যেন তাকে ডাকা হয়েছে।
সাদা–নীল টীমের জার্সি পরা রানিং ক্লাবের লোকগুলো সামনে দিয়ে চলে যেতেই সারসটা টেক অফ করেছিল। লোকগুলোকে একটু এগিয়ে যেতে দিয়ে জে-ডিও নিজের দৌড় শুরু করে। এবার সে থমথমে সিরিয়াস। চ্যারিয়ট্স্ অব ফায়ারের থীম সঙ্গীত বাজছিল তার বুকে। পেশির মধ্যে প্লাজমার বদলে হাই স্কুল আর কলেজের দিনগুলো থেকে নিংড়ে আনা পজিটিভ এনার্জি ঢালতে ঢালতে সে রাইফেলের গুলির মতো নিজেকে লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করল।
সারসটা বেশ কিছুদূর উপরে ওঠার পর ট্র্যাক বরাবর পার্কের চক্কর দিচ্ছিল। রানিং ক্লাবের সদস্যদের অবলীলায় পেরিয়ে যাওয়ার পর সে ডানা ঝাপটানো বন্ধ করে নিজেকে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছে। জে-ডি পণ করেছিল আধমাইল ফুরোবার আগে দলটাকে পেরিয়ে যাবে। সিকি মাইলের মাথাতেই টার্গেট নাগালে। একটু ফাঁকা জায়গায় সুযোগ পেয়ে জে-ডি ইনসাইড দিয়ে কাট করার চেষ্টা করেছিল। বুড়োদের মধ্যে একটা শয়তান লোক তার পথ আটকে দেয়। জে-ডি বুঝল, ইঁদুর বেড়ালের খেলা শুরু হয়েছে। সারসটা পার্কের ভিতর দিকে যাচ্ছিল। জে-ডিও ট্র্যাক ছেড়ে শিশির–ভেজা ঘাসের উপর নেমে যায়।
অ্যাড্রিনালিন আগেই ফুরিয়েছে। বাকিটা এইরোবিক রান। ছেলেবেলাকার কয়লার ইঞ্জিনের মতো হাঁ করে অক্সিজেন পোড়াতে পোড়াতে জে-ডি রানিং ক্লাবটাকে ছাড়িয়ে যেতে থাকে। এত জোরে অনেকদিন দৌড়নো হয়নি। ফুসফুসের ভিতর র্যাঁদা চালাচ্ছে কেউ যেন। জান লাগিয়ে দিয়ে পাঁচ–সাত সেকেণ্ডের মধ্যে সে ফাঁকায় এসে পড়ে। এবার কাট করে ট্র্যাকে ঢোকার পালা। দুর্ভাগ্য। কাজটা সমাধা হওয়ার আগে স্নিকারের রবার সোল শিশির ভেজা ঘাসে ট্র্যাকশান হারিয়ে ফেলেছিল। একটা লম্বা স্কিড করে অবশেষে নিজের হাঁটুর উপর থামল জে-ডি।
রেস ওভার। আত্মবিশ্বাস তালগাছের ডগা থেকে ধপাস করে মাটিতে। সারসটা আকাশে গোল পাক দিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসছিল।
– সিট্ ডাউন, ইউ ফুল!
পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে ক্লাবের সদস্যদের কেউ বাতাসে মন্তব্যটা ছুঁড়ে দিয়েছে।
তারপর যে সমবেত হাসির আওয়াজ এসেছিল তাতে জে-ডির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। এক লাফে ট্র্যাকে ফিরে গিয়ে সে চিতার মতো ক্ষিপ্রতায় খরগোশের দলকে তাড়া করেছিল। সারসটাও উড়ছিল মাথার উপরে। কিন্তু প্রতি পদক্ষেপে খরগোশরা অনায়াসে গতি বাড়িয়ে যায়। আশ্চর্য! এই দমটা আগে দেখায়নি শয়তানরা। আরো সিকি মাইল যুঝবার পর জে-ডি মানতে বাধ্য হয় যে তার খেল খতম।
***
বাড়ি ফেরার পথে স্টিয়ারিং হুইল ধরা চুমকি বলল – আচ্ছা, লুচির পর একটা করে পান্তুয়া বার করলে কেমন হয়? ফ্রিজে পড়ে আছে কিছু।
– কী? জে-ডি অন্যমনস্ক বলে শুনতে পায়নি।
– ভালো দৌড়েছো, জেহুল। আমি এর অর্ধেক স্পীডও তুলতে পারতাম না। চুমকি উৎসাহ দেয়।
– রাবিশ! হাত–পা ছড়িয়ে একটা ছাগলের মতো পড়েছি। মাঠশুদ্ধু সবাই হাসছিল। আর কোনোদিন এই পাড়ায় মুখ দেখাতে পারব না।
– তোমার তো ওদের মতো প্র্যাকটিস নেই। বেচারা, আমার সঙ্গে দৌড়ে দৌড়ে… চুমকি হাত বাড়িয়ে বরের কাঁধে বুলোতে গিয়েছিল। সহানুভূতির স্পর্শে গা জ্বালাবে না বলে জে-ডি এক ঝটকায় জানালার দিকে সরে গেছে।
চুমকি নিরাশ হয়ে চুপ। পরে সে বলল – অন্যদের সঙ্গে সব বিষয়ে পাল্লা দিয়ে কেউ সুখী হতে পারে না। আজকে যা ঘটল তা থেকে কিছু শিক্ষা নাও। নিজের যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
– আমি জানি তুমিও হাসছিলে। খিটখিটে জে-ডি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে।
– একদম বাজে কথা। হাসছিলাম তো দৌড় শেষ হবার পর। যখন তুমি পড়ে গিয়েছিলে আমি তোমাকে তুলবার জন্য ছুট মেরেছিলাম। তখন আমার মুখ তুমি দেখেছিলে? ওদিকে তাকিয়ে কী খুঁজছ? আমার দিকে তাকাও।
– একটা সারস ছিল এখানে। আমি ভেবেছিলাম সেটা আমাদের সঙ্গে যাবে।
– ডোন্ট বী সিলি জে-ডি, সারসরা কারো সঙ্গে যায় না।
– একবার পার্কের চারদিকে গাড়ি নিয়ে চক্কর দেওয়া যায়? যদি তাকে পেয়ে যাই।
– না। সোজা বাড়ি যাব এখান থেকে । লুচি, তরকারি, পান্তুয়া, আর চা। এর বেশি আজ কিচ্ছু চাইব না আমরা।
ভিকি
ভিকি আরেকটা ম্যারাথনের মেডেল নিয়ে ফিরেছে। প্রতিবার মেডেল পাওয়ার পর ভিকিকে আরো বিমর্ষ, আরো পর্যুদস্ত দেখায়। যেন তার আকাশ থেকে কেউ ধ্রুবতারাটাকে উপড়ে ফেলে দিয়েছে।
জে-ডি লক্ষ করে ভিকির ভুরু থেকে কয়েকটা চুল গায়েব। কাল পর্যন্ত ছিল। বেচারার ক্রনিক ট্রাইকোটিলোম্যানিয়া। মাঝে মাঝে ফিরে আসে। তখন ছেলেটা নিজের অজান্তে চুল ওপড়ায়।
– আই অ্যাম ডিপ্রেস্ড্। জে-ডিকে ঘরে ঢুকতে দেখে ভিকি ব্যাজার মুখে বলল। চেয়ারের সামনে বোকার মতো দাঁড়িয়ে সে নিজের শনের চেয়ে মোটা ভুরুর মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে কিছু খুঁজছিল।
– সিট্ ডাউন, ইউ ফুল! জে-ডি গুরগুরিয়ে বলে।
ভিকি আসন গ্রহণ করেছে। – জে-ডি, আমার একটা কিছু কাজ চাই। খুব শক্ত নয়। এমন কিছু, যা আমি করতে পারব।
– সেইজন্যই কি আবার ভুরুর চুল ছিঁড়ছিস?
– ওঃ, ড্যাম্ম্!
– শোন ভিকি, অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দিতে যাস না। নিজের যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। চেয়ারে বসার পর জে-ডি পণ্ডিতের মতো শুনিয়ে দেয়। কয়েক বছর আগে হাইস্কুলের টেক্সট্ বইতে পড়া একটা গল্প মনে করতে পারছিল না বলে ভিকি জুলপির চুল ছিঁড়ছিল। জে-ডি প্লটের একটু অংশ শুনে ধরে ফেলে সেটা বার্নার্ড শ’য়ের নাটক থেকে নেওয়া। এতে তার খুব একটা কৃতিত্ব ছিল না। ছেলেবেলায় জে-ডির শ–ভক্ত জ্যাঠামশাই তাকে কথায় কথায় চকোলেট–ক্রীম–সোলজার বলে বিদ্রূপ না করলে সে ‘আর্ম্স্ অ্যাণ্ড দ্য ম্যান’–এর পুরোনো কপিটা হাতেও তুলত না। যাহোক, সেই থেকে ভিকি খুব অল্প হলেও জে-ডির কথায় গুরুত্ব দেয়।
– আমার নিজের কী আছে, জে-ডি? দেখা গেল ভিকিও অস্তিত্বের প্রশ্ন নিয়ে নাস্তানাবুদ।
– তোর ফ্যামিলি। বউ, ছেলে–মেয়ে, বাবা–মা। কী নেই? জে-ডি উত্তর দেয়। – একুশটা ম্যারাথনের মেডেল। আই–আই–টির ডিগ্রী। ভদ্র চাকরি। অন্তত চার–পাঁচ শো ইউজলেস হলেও অ্যাক্টিভ বন্ধু–বান্ধব। প্রাক্তন প্রেমিকাই আছে আট দশজন। ইকোয়ালি ইউজলেস। কিন্তু তাদের হাজবেণ্ডরা পর্যন্ত তোকে পছন্দ করে। অজাতশত্রু ছেলে তুই। ইউনিভার্সালি ওয়েল লাইক্ড্। তোর মতো একটা বনমানুষ এর বেশি কী পেতে পারে?
ভিকি মাথায় গজানো জঙ্গলের মতো চুলগুলোতে আঙুল চালাবার পর বলল – আমার কোনো অ্যাকমপ্লিশমেন্ট নেই। প্রত্যেক সপ্তাহে ভাবি কিছু করে শেষ করব, কিন্তু পাঁচ মিনিটের বেশি মনোযোগ নেই। কাজ শুরুই হয় না তো শেষ হবে কী করে? অফ কোর্স, এখানে যারা কাজে বাহাদুরী দেখিয়েছে তারা সকলেই মরেছে। ফলে কিচ্ছু না করে সবচেয়ে বেশি প্রোমোশান পেয়েছি আমি। শেমফুল! ছ্যাঃ। আয়নার দিকে তাকাতে লজ্জা করে। এটা একটা জীবন?
ভিকিকে আবার চুল ছিঁড়তে নিষেধ করার পর জে-ডি প্যান্ট্রিতে গিয়ে দু কাপ ইথিওপীয় কফি বানিয়ে এনেছিল। ফিরে এসে সে বলল – ভিকি, তুই কাজ করতে চাস না। শুধু কাজ করার আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে চাস, তাই তো?
– ঠিক!
– তার প্রেসস্ক্রিপশান আগে দিয়েছি। লম্বা, স্লো, ক্লাসিক নভেল। মিশনারি স্কুলের ছেলে তুই, দেসী মাল চলল না। শরৎচন্দ্রের অনুবাদে এক অধ্যায়ের বেশি ঢুকতে পারলি না। তো বিলায়তি নে। টমাস হার্ডি? মাসে এক অধ্যায় পড়। কিছুতেই ছাড়িস না। নভেলে ডুবে যা। এমন একটা বই ধর যার পাত্র–পাত্রীরা তোকে নিজেদের মধ্যে টেনে নেবে। মনে হবে এই পরিবেশে আরেকটু থাকি। সন্ধ্যে হোক, যখন সব চরিত্ররা বাড়ি গিয়ে ঘুমোচ্ছে তখন আমি এখানে কোথাও লুকিয়ে পড়ব। দ্যাট ইজ মেডিটেশান। সবাই জানে ধ্যান করলে মনোযোগ বাড়ে। কিন্তু নভেল পড়ার ধ্যানটা ঠিকমতো করতে পারলে কাজের নামে জ্বরও আসবে।
অনেকটা বলার পর জে-ডি খেয়াল করে ভিকি ঘরের একটা ফাঁকা জায়গার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে যেন তার ভয়ে আলো আর হাওয়ার প্যান্ট হলুদ হয়ে যাবে।
– হোয়াট আর ইউ গ্লেয়রিং অ্যাট, ভিকি? কার দিকে চোখ পাকাচ্ছিস? ওখানে কেউ নেই।
– আই অ্যাম নট গ্লেয়রিং। আই অ্যাম ট্রাইং টু মেডিটেট। ধ্যান করতেও মনোযোগ লাগে। সেটা আসবে কোথা থেকে?
***
– হোয়াট অ্যাবাউট ম্যাজিক ডাস্ট্? পরে জে-ডি জিজ্ঞেস করেছিল তার বন্ধু এবং সহকর্মীকে। কয়েক মাস আগে ভিকি এক মুঠো মাশরুম ধুলোর উপঢৌকন নিয়ে জে-ডির বাড়িতে হাজির। চুমকি কাজে বেরিয়ে গেছে। অহেতুক ছুটি নিয়ে জে-ডি বন্ধুকে পাহারা দেবার জন্য তৈরি। পূর্ণ সিদ্ধি হয়নি ভিকির, কিন্তু প্রোটিন শেকের সঙ্গে কয়েক চামচ সাইকাডেলিক পাউডার সেবন করার পর সে বাড়ির দেয়ালগুলোতে টাঙানো সবকটা ছবি খুঁটিয়ে দেখেছিল।
– রঙের ছোপগুলোতে প্রাণ আছে। জে-ডিকে জানায় সে। – কথা বলছে আমার সঙ্গে।
– কী বলছে?
– টেনে বার করতে অনুরোধ করছে। কিন্তু কী ধরে টানব সেটা বুঝতে পারছি না।
পল ক্লে’র বিমূর্ত রিপ্রোডাকশনের মধ্যে অসংখ্য বন্দি মানুষের মুখ দেখে ভিকি সেদিন একটু ভয়ই পেয়েছিল। তারপর তিন চারদিন ধরে সত্যি তার মনোযোগ বাড়ে। এল–এস–ডি খেয়ে ভিকি অফিসে যেরকম দাপিয়েছিল, ম্যাজিক ধুলো নেবার পর সেরকম অবিমৃশ্যকারিতা করেনি।
– মাশরুম তো বাড়িতেই চলে এখন। ভিকি জানায়। – বউ বিন্দাস। আমি এবার তিন ঘন্টা ধরে বোকার মতো হে–হে করে গিয়েছি। তবে এখন আর তেমন ফোকাস বাড়ছে না। তোরও তো কিছুই হয়নি বললি।
জে-ডিও একদিন ভিকির দেওয়া খানিকটা ম্যাজিক চকোলেট খেয়ে দেখেছিল। ভিকি যা দেয় জে-ডি প্রশ্ন না করে গ্রহণ করে। কোথা থেকে আনা, কী দিয়ে তৈরি, এইসব না জানাই বুদ্ধিমানের কাজ। সেবার পল ক্লে’র ছবি জ্যান্ত না হলেও জে-ডি’র একটা অন্য ধরনের অভিজ্ঞতা ঘটে।
– আমি তোর কথামতো গান লাগিয়েছিলাম, ভিকি। যে গানটা চালিয়েছিলাম সেটাই তারপর লুপের মধ্যে ফেলে দিয়ে চল্লিশ–পঞ্চাশ বার শুনি। এটা একটা অস্বাভাবিক কাণ্ড। জীবনে কোনোদিন হয়নি এরকম আমার।
– গানটা কী?
– বলা যাবে না। কালোয়াতি কিছু নয়। ফিল্মী গান। তবে আর কিছু হয়নি আমার। তারপর একটা ঘুমের বড়িও নিয়েছিলাম। সেটাই বেশি কাজ দেয়।
ভিকি চেয়ারে এলিয়ে পড়ে তার নিদান শুনিয়ে দিল। – তুই একটা চিকেন শিট্, ভীতুর ডিম, নখরার নবাব। এ ছাড়া তোর কোনো সমস্যা নেই। সেইজন্য তুই আমার কষ্টও বুঝবি না। যত ইচ্ছে চকোলেটা খা। তোর ছুঁৎবাইগ্রস্ত দৃষ্টির সামনে ছবিরা কোনোদিন জ্যান্ত হবে না।
***
– আছে, আমারও সত্যিকারের সমস্যা আছে। ভিকি’র তিরস্কারে ক্ষুব্ধ জে-ডি বলেছিল পরে। – সেগুলো তোর উলটো। যেমন, কিচ্ছু করতে সাধ হয় না। নো অ্যাম্বিশান। নো ডিজায়ার ফর এন্টারটেইনমেন্ট। ছুটির দিনে বা সন্ধ্যেবেলা ঘন্টার পর ঘন্টা গা না তুলে, চুপচাপ চা–কফি খেয়ে কাটিয়ে দিই। টিভিও দেখি না। কিন্তু সেটাতে অন্যদের ভীষণ অসুবিধে হয়। তাদের সবাইকে তো ওষুধ দেওয়া যাবে না। তাই আমাকেই কিছু করতে হবে।
– জানি তুই কী চাইছিস। ঘ্যানঘ্যান না করে নিজে অর্ডার কর। রেট লিস্ট দিয়ে রেখেছি। ফোন নাম্বার আছে সেখানে।
– সরি, আমি অচেনা নাম্বারে টেক্স্ট্ করতে পারব না। তোর থেকে ঢের বেশি রেস্পেক্টেবল জীবন আমার। হাইলি স্ক্রুটিনাইজড্ লাইফ। আমার ক্রেডিট কার্ডের কোনো ট্রান্জ্যাকশান প্রাইভেট নয়।
– কেন? নিজস্ব কার্ড কোথায়? বউ স্পাইং করছে নাকি? জিজ্ঞেস করে ভিকি।
– তার সে ক্ষমতা নেই। কিন্তু মেয়েরা বড়ো হয়ে গেছে। তাদের দৃষ্টি আমাদের চেয়ে অনেক তীক্ষ্ণ।
– আচ্ছা ভেবে দেখি কী করতে পারি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে একটা মীটিং শুরু হচ্ছে কিন্তু আমার।
জে-ডি মিনমিন করে বলে – অনলাইন কল তো? আমি এখানে চুপচাপ বসে থাকলে অসুবিধে আছে? নিজের সীটে ফিরলেই টীমের সবাই মিলে আক্রমণ করে।
ভিকির অনুমতি পাওয়ার পর জে-ডি গিয়ে আরো দু–কাপ কফি বানিয়ে এনেছিল। তারপর যখন সে নিঃশব্দে চোখ বুজে বসে গরম পানীয়টা খাচ্ছে তখন হঠাৎ ভিকি নিজের মীটিং মিউট করে দিয়ে জে-ডির তন্দ্রাভঙ্গ করল।
– জে-ডি, এই অদ্ভুত আওয়াজটা কী?
– কী আওয়াজ, ভিকি?
খানিকক্ষণ কান খাড়া করে শোনার পর ভিকি বলে – লাইক আ মেশিন। কুঁ কুঁ করে আওয়াজ। পাচ্ছিস তুই?
জে-ডি একটু চিন্তা করার পর বলল – কোত্থেকে আসছে?
– তোর ভিতর থেকেই পাচ্ছি। ফ্রম ইনসাইড ইয়োর চেস্ট। তুই কখনো চেস্ট এক্স রে করিয়েছিস?
– রিসেন্টলি নয়। কী ধরণের শব্দ একটু খোলসা করে বলবি?
– প্রিন্টারের কাগজ ফুরিয়ে গেলে যেরকম কুঁ কুঁ শব্দ হয়।
জে-ডি স্তব্ধ। ভিকির স্কিজোফ্রেনিয়া হতে পারে ভাবাই যায় না। তাহলে পৃথিবীতে সুস্থ আছে কে?
– কাগজ ফুরিয়ে গেলে, না কালি ফুরিয়ে গেলে? পরে সে কৌতূহলী হয়ে শুধোয়। এই সমস্ত বিষয়ে ভিকির জ্ঞান অগাধ। ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ছেলেটা পাস্ট–মাস্টার।
– কাগজ। শোন জে-ডি, ভেবে দেখলাম। আমি তোকে এল–এস–ডি এনে দেব। স্যাম্পলটা আমিই আগে টেস্ট করব, যেরকম ভীতু তুই, প্রথমে নেবার সাহস হবে না জানি।
– প্যাকেট লাগবে না। এমনিই দিস। কেউ যাতে বুঝতে না পারে।
– এই জিনিসের বড়ি হয় না। ব্লটিং পেপারে অ্যাবসর্ব করা থাকে। বউ দেখলেও চিনবে না, ভাববে নাক ঝাড়ার টিস্যু। ট্রাই করে দেখ, যদি কোনো লাভ হয়।
ভিকির চোখ ম্যানিয়াকদের মতো পাকানো, ভুরুর জঙ্গলে যেন বুনো হাতিরা সদ্য দাপিয়ে গেছে। তবু গলা শুনে মনে হয় সে নিজের চেয়ে বেশি জে-ডিকে নিয়ে উদ্বিগ্ন।
খিটি আর মিটি
শনিবার সকালবেলা জে-ডির দুই কন্যা, খিটি আর মিটি, এসে হাজির। জেডি–রা গ্রামে থাকে। মেয়েরা শহরে আস্তানা খুঁজে নিয়েছে। তাদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা দেখে জে-ডি মুগ্ধ। ওই বয়সে সে হিপিদের মতো ছিল। অল্প বয়সে বাবা হয়ে যায়। তাই এখনো দশ–বিশ বছর চাকরি করার কথা। কাঁপুনি আসে ভাবলে।
চুমকি ছুটে ছুটে তোয়াজ করছে মেয়েদের। জে-ডি একটা প্লাস্টিকের বোতল আবর্জনার পাত্রে ফেলতে যাচ্ছিল। চুমকি দূর থেকে হাঁক পাড়ে।
– না। না। না। কতবার বলব ওটা রিসাইকেলে যাবে? পাড়ার লোকেরা লক্ষ করেছে আমাদের বাড়ি থেকে যথেষ্ট রিসাইকেলের বিন বেরোচ্ছে না। এটা খুব খারাপ দেখায়, জে-ডি। এবার থেকে আমাদের সাবধান হতে হবে।
– রিসাইকেলের বিন এমনিই বার করে দাও। কে খুলে দেখছে কী আছে ভিতরে। আমি নিশ্চিত ওরাও তাই করছে।
– আমি ঠিক জায়গায় ফেলে দিচ্ছি। কনিষ্ঠা কন্যা মিটি এসে জে-ডির হাত থেকে বোতলটা খসিয়ে নেয়।
জে-ডিরা সাম্যবাদী পরিবার। লঘু–গুরু বলে কিছু নেই। মেয়েরা ছোটবেলা থেকে মা–বাবাকে তুই–তোকারি করে।
জে-ডি মেয়েকে ব্যাপারটা জলের মতো বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করল। – লোক–দেখানো রিসাইকেল এদের। সবাই জানে ল্যাণ্ডফিলে যাচ্ছে।
– হোক লোক দেখানো, মা চাইছে যখন, হবে না কেন? মিটি পালটা বুঝিয়ে দেয়। তারপর সে আরো দুটো আচ্ছা–ভালা জলের বোতল রিসাইকেলের ঝুড়িতে ফেলে দিচ্ছিল। জে-ডি এগুলোতে ফিল্টারের জল ভরে বারবার ব্যবহার করে। সে তাড়াতাড়ি গিয়ে জিনিসগুলো বাঁচায়।
মেয়েদের আরেকবার বোঝাবার চেষ্টা করে জে-ডি। – এ পাড়ার সবটাই পারফরমেটিভ। গ্লোবাল ওয়ার্মিং–এর ভয় দেখায়, অথচ এতগুলো এসি, হিটার এসব চালিয়ে রেখেছে। আমাদের ছোটবেলায় ফ্যানও চলত না। সেই দিনগুলোতে ফিরে যাই না কেন? কেউ তো সেটা করছে না। আমার বাবা কোনোদিন প্লেনে চাপেনি। দাদু–দিদারা কেউ না। বাবা যতদিন বেঁচে ছিল অফিস করার পর ডালহাউসি স্কোয়্যার থেকে পাঁচ মাইল রাস্তা হেঁটে সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরত। তাদের সারাজীবনের কার্বন ফুটপ্রিন্ট তোরা কয়েক মাসে পেরিয়ে যাস।
বাবার ক্যালকুলেশান ভুল না ঠিক ঠাহর করতে না পেরে মিটি একটু থমকে গিয়েছিল। লোকে ভাবে জে-ডি অঙ্ক কষে খায়, তাই সংখ্যা নিয়ে কেউ তার সঙ্গে লাগতে যায় না। বড়ো মেয়ে খিটি এসে বাবার কাঁধে একটা হাত রেখে তাকে শান্ত করার ভঙ্গিতে বলল – বাবা, তুই একদম ঠিক বলেছিস। আমাদের উচিত যতটা সম্ভব এনার্জি কনজাম্প্শন কমানো। আগের সেঞ্চুরিতে ফিরে যাওয়া তো সম্ভব না। তাই বলে যা সম্ভব সেটা কেন করব না?
জে-ডি বলে – উনিশ শতাব্দীতে ফিরলে আরো এনার্জি বাঁচে, কিন্তু মর্টালিটি রেটও সেদিনের মতো হয়ে যাবে। লাইফ এক্সপেক্টেন্সি পঞ্চাশের নিচে। জনসংখ্যা পাঁচগুণ কম। কেউ চায় না সময়ের রেলগাড়ি উলটোদিকে চলুক। এত বিশাল জনসংখ্যা একটা আধুনিক কল–কারখানার অর্থনীতি ছাড়া বাঁচিয়ে রাখা যায় নাকি? বুঝতে পারিস না, এনার্জি কনজাম্প্শন বাড়ার মূল কারণ ওভারপপুলেশান? আমার দাদু আর ঠাকুরদার সাত দুগুনে চৌদ্দটা বাচ্চা। তাঁদের নিজেদের কার্বন ফুটপ্রিন্ট যতই কম হোক, আজকের পৃথিবীর এই দুর্দশার জন্য তাঁরা আমাদের চেয়ে বেশি দায়ী।
খিটি সবার মন যুগিয়ে কথা বলে। সে বলল – তোর ঠাকুরদাদাকে দোষ দিয়ে তো এখন কোনো লাভ নেই। আমাদের ফরোয়ার্ড থিঙ্কার হতে হয়। নিজেদের কর্তব্যগুলো করে যেতে হয়। তাই না?
***
জে-ডির মনে হয় মেয়েরা না–না করেও তার যুক্তিগুলো আস্তে আস্তে ধরে ফেলবে। সে একটু উৎসাহ পেয়ে বলল –জানিস, এই গ্রামে অনেকটা করে জমিতে বাড়ি কেনার পর সবাই প্রথমে বড়ো বড়ো গাছগুলো কেটে উচ্ছেদ করেছে? তোর মায়ের এনভায়রনমেন্টাল শিক্ষা এই পাড়া থেকেই হয়েছে কিনা, তাই আমাদের বাড়ির সামনের প্রাচীন বার্চ গাছটাও এবার ডিফরেস্টেড হল বলে। পরের বার এসে হয়তো দেখতে পাবি না।
চুমকি বেশ অনেকটা দূরে ছিল, কিন্তু জে-ডির কথা তার কান এড়ায়নি। সে দূর থেকে ছুটে আসতে আসতে বলল – তোর বাবাকে জিজ্ঞেস কর সেই গাছটার শিকড় বাড়ির তলায় ঢুকে ভিত নড়িয়ে দিচ্ছে কিনা। এইভাবে চললে কয়েক বছর পরে এসে আর বাড়ি দেখতে পাবি না। ওর কাছে এই সমস্যার কোনো অন্য সমাধান আছে?
– আছে, নিশ্চয়ই আছে। একটু খরচ বেশি। গাছটা পাখি আর কাঠবেড়ালিতে ঠাসা। যেন একটা কো–অপারেটিভ সোসাইটি। ছোটবেলা এরকম একটা মাল্টি–স্টোরিড বিল্ডিংয়ে আমরা থাকতাম।
চুমকি ততক্ষণে দলের মাঝখানে এসে পড়েছিল। সে গলা তুলে বলল – অ্যাবসার্ড। কোনো সমাধান নেই তোদের বাবার কাছে। এক বছর ধরে ‘আজ করব, কাল করব’ করছে। এর মধ্যে আমি দশজন লোকের সঙ্গে কথা বলেছি। সবাই এক পরামর্শ দিয়েছে। গাছটাকে রাখা যাবে না। আমি মালীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। পাখিদের বাচ্চারা উড়ে যাবার পর গরমের শেষে গাছ কাটা হবে। কাঠবেড়ালিদের জন্য অন্য জায়গায় আগেই গর্ত করিয়ে রাখছি। সব কটাকে আমরা দাঁড়িয়ে থেকে রিলোকেট করব।
জে-ডি রুখে দাঁড়িয়ে বলে – আর কালচারকে কে রিলোকেট করবে? বার্চ ইজ ভূর্জ। এর পাতায় মুনি ঋষিরা উপনিষদ লিখতেন। শোন খিটি–মিটি, অন্যরা বুঝবে না কিন্তু তোদের দুটো আসল জিনিস বলে দিচ্ছি আজ। পরে ভেবে দেখিস। এক – হিউম্যানদের মতো বদমাইশ আর স্বার্থপর জন্তুর সারভাইভাল নিয়ে কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর মাথা ঘামানো উচিত নয়। কাঠবেড়ালিদের যা হয়, মানুষেরও তাই হবে না কেন? সবচেয়ে আগে মানুষদের যেন হয়। ঝাড়ে–বংশে মরুক তারা। আর দুই …।
জে-ডিকে কথা শেষ করতে হয় না, মেয়েরা হাঁ হয়ে গিয়েছিল। মিটি বলে – বাবা, কী যা তা বলতে শুরু করেছিস? তুই পৃথিবীর সমস্ত মানুষের মৃত্যু চাস?
চুমকি চলে গিয়েছিল। খুন্তি হাতে ফিরে এসে বলল – শুনলি তো? যে লোকটা এককালে কবিতা আওড়াত এখন তার মুখ খুললেই এমন কর্কশ আর অফেনসিভ কথাবার্তা বেরোয় যে কয়েকটা বাদে আমাদের আর কোনো বন্ধুবান্ধব নেই। কোভিডে এতগুলো ক্ষতি হয়ে গেল… আমি তাও ভেঙে পড়িনি। নিজেকে শক্ত করে উঠে দাঁড়িয়েছি। ও চেষ্টাও করেনি। একে তো কোথাও যেতে চায় না। জোর করে পার্টি বা গেট–টুগেদারে নিয়ে গেলে সবাইকে অপমান করে। চেনাজানাদের মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার জো নেই আমার। বলতে বলতে চুমকির মুখ তার লাঞ্ছনার স্মৃতিতে লাল হয়ে যায়।
মায়ের এতটুকু দুঃখ খিটি সহ্য করতে পারে না। প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে গিয়ে সে বলল – বাবা, তুই সত্যি মাকে খুব জ্বালাচ্ছিস। কোভিডের আগে থেকেই জানি। আমরা যবে থেকে কলেজে গিয়েছি তবে থেকে আরো বেশি। দেখ, সেই সকাল থেকে কত কষ্ট করে লুচি ভাজছে বেচারা। তুই কোনো কাজে সাহায্য করিস? আগে তো করতিস।
কোভিড নয়, মেয়েদের যাওয়াও নয়। আসলে জে-ডি পালটে গিয়েছিল তারও আগে। তার অসুখটা কেউ লক্ষ করেনি।
– বানাচ্ছি আমি চা। সে বলল।
***
পরে সবাই মিলে যখন একসঙ্গে বসে লুচি ধ্বংস করা হচ্ছিল তখন মিটি জে-ডির দিকে ঝুঁকে বলে – তোর দুই নম্বর উপদেশটা জানা হয়নি। সেটা বলবি না?
জে-ডি লক্ষ করে দেখেছে, তার কনিষ্ঠা কন্যা বেশি তার্কিক হলেও, শেষ পর্যন্ত বাবার কথাগুলো অনেক সময়েই সে সমর্থন করে। লুচি নামিয়ে রেখে জে-ডি বলল – দুই নম্বর? শুনবি তুই? সেটা হল এই যে কোনো সভ্যতা যখন তার তুঙ্গে গিয়ে পৌঁছোয় তখন তার মানুষরা বংশবৃদ্ধি করা বন্ধ করে দেয়। তোর দাদু–দিদা যেটা পারেনি, মা–বাবা যেখানে ফেল করে গেছে, সেটা তোদের পারতে হবে। রীচ ফর দ্য টপ। নেভার মাল্টিপ্লাই। ডু নট ব্রীড।
মিটি কী করবে না ভেবে পেয়ে হেসে ফেলেছে। খিটি ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল – এটা একটা পার্সোনাল চয়েস, বাবা। কাউকে এইসব ব্যাপারে জ্ঞান দেওয়া শোভন নয়। তুই বাড়ির বাইরে এসব বলিস না তো?
চুমকির মুখ ভর্তি লুচি। তাড়াতাড়ি সব জল দিয়ে গিলে ফেলে সে বলল – দেখলি তো? একসঙ্গে বসে সবাই আনন্দ করে খাচ্ছি, আর তোর বাবা সেটাকে রুইন করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। আমি আজ কী কী করব সেটা সাতদিন ধরে প্ল্যান করেছিলাম।
খিটি মায়ের কবজিতে হাত রেখে সাহস দিয়ে বলে – শোন, আমি তোদের জন্য আজই প্লেনের টিকিট কেটে দিচ্ছি। তোরা তো এখনও ইয়াং আছিস। ছুটি নিয়ে কোথাও অ্যাডভেঞ্চার করে আয়। রাজস্থান যাবি? খুব ভালো ওয়েদার এখন।
জে-ডি কিছু বলছে না। চুমকি মাথা ঝাঁকিয়ে বলে – কে ইয়াং? শুধু আমি। ও যাবে নাকি? কোনো জিনিসে ইন্টারেস্ট নেই। না কিছু করার, না কোথাও যাওয়ার। হার্ট নয়, বডিটাও পাথরের হয়ে গেছে। নো ফীলিং, নো উৎসাহ।
জে-ডিকে নিরুত্তর দেখে খিটি আর ঘাঁটালো না। জে-ডি জানে, খিটি সহজে ছাড়ে না। প্রস্তাবটা অন্য কোনো সময়ে নতুন জন্ম নিয়ে ফিরে আসবে। মিটি বাবার দিকে আবার একটু সরে এসে বলল – পরিবেশ বাঁচাবার জন্য বংশবৃদ্ধি করতে বারণ করছিস? তার মানে তুই ইকোলজি নিয়ে ভাবিস?
জে-ডি শুধু মেয়েদের শোনাবার ভান করে গলা নামিয়ে বলে – হু কেয়ার্স অ্যাবাউট এনভায়রনমেন্ট? বাচ্চা করতে নেই বাচ্চার নিজস্ব মানব অধিকারের জন্য। ফর দ্য সেক অফ দ্য আনবর্ন চাইল্ড। ইচ্ছে অনিচ্ছে না জেনে একটা মানুষকে জন্ম দেওয়া ইম্মরাল নয়? একেবারে অনৈতিক।
– আণ্ডার নো সারকামস্ট্যান্সেস?
জে-ডি একটু ভেবে বলে – মা যদি অমর হয় এবং তার ছেলেমেয়েরা কোনোদিন দুঃখ পাবে না এই গ্যারান্টি দিতে পারে, একমাত্র তাহলে হয়তো বংশবৃদ্ধিতে দোষ নেই।
জেহুলের স্বর্গ
বিকেলে তারা বিরাট পার্কটাতে বেড়াতে গিয়েছিল। আধমাইল খুব আস্তে দৌড়ে আসার পর চুমকি ঘোষণা করল সে আর ছুটতে পারবে না। মেয়েরা বলে ওঠে – নো, প্রবলেম। আমরা সবাই একসঙ্গে হাঁটব।
জে-ডি ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বেঞ্চের উপর বসে পড়ল। শনিবার একটা বিশেষ কাজ থাকে তার। সেজন্য সে একটু একা হতে চাইছিল।
পরে চুমকি আর তার দুই মেয়ে যখন ট্র্যাক ধরে অদৃশ্য, তখন জে-ডির সাপ্তাহিক রুটিনবদ্ধ কাজটা আরম্ভ হয়।
***
– হ্যালো, জেহুল! কেমন আছিস?
– হ্যালো, মা! সরি, আজ সকালে তোমার সঙ্গে কথা বলা হয়নি। মেয়েরা এসেছে। তাই তাদের সময় দিচ্ছি আমরা।
– খুব ভালো করেছিস! সেটাই তো করার কথা। ওরা খুশি হলেই সবাই সুখী।
হতাশ জে-ডি মাথা নাড়ছিল। – মা, আমি কাউকে খুশি করতে পারিনি। চেষ্টাও করি না আজকাল। সবাই বুঝে গেছে।
– কেউ কিচ্ছু বোঝেনি। সবাই তোকে পছন্দ করে। তুই আগেও ভালো ছিলিস, এখনো অন্যদের চেয়ে ভালো। চাইলে সব পারিস। চুমকির কথা শুনবি। ওর চেয়ে বেশি কে তোর জন্য ভাবে? আর মেয়েদের কথা তো মানতেই হবে। নইলে তাদের মনে ঢুকবি কী করে?
– আচ্ছা মা, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব বলে এক সপ্তাহ ধরে বসে আছি। কিছুদিন আগে এই পার্কে একটা সারস আমাকে সাহস দিতে এসেছিল। কোথায় গেল সেটা?
কুলকুল করে মায়ের হাসির শব্দ পায় জে-ডি। যেন পানের পিকও খানিকটা পড়ে গেল।
– তুই বল কোথায়?
জে-ডি একটু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে – মা, তুমিই কি সারস হয়ে এসেছিলে?
– নইলে আর কে? তুই কত সহজে ওদের হারিয়ে দিলি দেখলি তো?
খানিকক্ষণ নীরব হয়ে থাকার পর জে-ডি বলল – মা, তুমি সারস হলে কী করে? তুমি তো আর নেই!
– কে বলেছে নেই? আমি হাজার বার বলিনি কোনোদিন তোকে ছেড়ে যাব না? যখনই চাইবি আমাকে পাবি? আমি সারাক্ষণ কাছে থাকব তোর?
– কাছে মানে কোথায়? আমার ভিতরে না বাইরে?
– ভিতরেও, বাইরেও।
– ভিতরেও, বাইরেও? সেই জায়গাটার নাম কি?
– বলতে চাইলে স্বর্গ বলতে পারিস।
– স্বর্গ! সেখানে কারা থাকে? সবাই কি সুখী? মৃত্যু আছে সেখানে?
– না, জেহুল, না। মৃত্যু একটুও নেই। শুধু হাসি–ঠাট্টা, গল্পগুজব এইসব চলছে। কে আছে এখানে জানতে চাস? আমার বাবা, মা, তোর বাবা, মামা–মামী। কে নেই বল?
– সেখানে যদি কেউ চুপ করে বসে থাকতে চায়? কিচ্ছু না করে?
মা আবার কুলকুল করে হেসে উঠেছিল। – আরে, এখানে এমন কত লোক আছে যারা ইচ্ছে না হলে নিঃশ্বাস অবধি নেয় না। আমরা যখন যা খুশি তাই করি।
– মা, ঠিক কোথায় এই জায়গাটা? ভেবেচিন্তে বলো একটু। আমার জানা প্রয়োজন।
নীরবতা। জে-ডি রুদ্ধশ্বাস হয়ে উত্তরের অপেক্ষা করছিল। কোথায় গেল মা? চলে গেল নাকি? না পানের পিক ফেলতে গেছে কোথাও?
একটু পরে অবশ্য আবার চেনা গলাটা শুনতে পাওয়া গিয়েছিল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে জে-ডি।
– বেঘুল্যা, তুই এইটুকু বুঝিস না? আমি থাকি তোর বুকের ঝিকঝিকটার ভিতর। সেটা যখন রেলগাড়ির মতো আকাশে যায় তখন আমি আকাশে, যখন মাটিতে দৌড়োয় তখন আমি মাটিতে। এত ভালো একটা জায়গায় আগে কোনোদিনও থাকিনি, তাই নাম দিয়েছি স্বর্গ। এখানে আসব জানতাম বলেই তোকে বলেছিলাম যে যখন চাইবি আমাকে পাবি। আর তোর চোখে জল আসার আগেই আমি সেটা মুছে দেব।
জে-ডির মুখ নিচের দিকে ঝুঁকে গিয়েছিল। সে বলতে চায় – আমার দুঃখ তুমি দেখতেও পাও না, তো মুছবে কী?
একটু পরে মায়ের গলা পাওয়া যায় আবার। – কিছু বলছিস না যে? ওই যে চুমকি আর মেয়েদের দেখা যাচ্ছে। এবার তাহলে আমি যাব কিন্তু।
– মা, যেরকম বর্ণনা দিলে, জায়গাটাকে স্বর্গই বলা উচিত। আমি সেখানে যেতে পারি না? তুমি ব্যবস্থা করবে? ‘না’ বোলো না।
মা আশ্বাস দিয়ে বলে – আসবি আসবি। এত ভালো একটা জায়গা, ‘না’ বলব কেন? তবে এখন নয়। ভয় পাস না, সময় হলে আসতেই হবে। অন্য কোনো জায়গা নেই তো যাওয়ার। আচ্ছা, সবাই ফিরছে দেখতে পাচ্ছি। আর না, আমি সত্যি পালালাম।
– মা, পারলে…
***
চুমকির সঙ্গে মেয়েরা এসে পড়েছিল। তারা দেখতে পায় জেহুল একটা গাছের নিচে বেঞ্চে বসে আছে। তার মাথাটা হাঁটুর দিকে নেমে আসছিল আর সে বিড়বিড় করে কী সব বলছিল।
তিনজন ইচ্ছে করে একটু আস্তে হয়ে যায়। একটা নুয়ে পড়া মানুষকে তার ব্যক্তিগত জায়গা দেওয়ার ব্যাপারে খিটি আর মিটি খুব সজাগ। চুমকিকেও তারা আটকে দিয়েছিল। ফলে জেহুলের শেষ কথাগুলো কেউ শুনতে পায়নি।
– মা, পারলে… আমাকে নিয়ে যেও। আমিও শুধু চুপ করে বসে থাকতে চাই…। এদের বুকের… ঝিকঝিকের ভিতর…।
১ম পর্ব            
২য় পর্ব            
৩য় পর্ব
অলংকরণ (Artwork) : পরবাস ডিজিটাল আর্ট