


সমরেশ মাঝেমাঝেই শব্দ পায় ঝনঝন করে কোথাও কাচ ভেঙে পড়ল। জানলার শার্শি? নাকি অসাবধানে কারও হাত লেগে শো-কেসের ওপর রাখা শৌখিন ফুলদানি… কী ভাঙল? টের পায় না। চারপাশে তাকিয়ে দেখে সব কিছুই কেমন সুন্দর করে সাজানো, যেন ঘর নয়, কিউরিও শপ। দেওয়ালে ঝোলানো মুখোশগুলো দেখে সামান্য ভয় হয়। এক পাশে একটা চোঙওলা গ্রামাফোনে গান বাজছে, শুনতে পায়, খসখসে গলায়, ‘আজ যানে কী জিদ না করো, ইঁউহি পহেলুমে ব্যয়ঠে রহো’। মগজের অলিগলিতে অপার্থিব জল ঢুকছে, গাড়িবারান্দা, সিঁড়ি ভেসে যাচ্ছে গজলের হু-হু জলে। গলার কাছে তিরতির করছে ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট। আহা! একটু মাত্র সময় বেঁচে থাকা, যখন তুমি কাছে এসে বস। গানটা অলকার খুব প্রিয়। শুনলেই একটা অদ্ভুত গন্ধ নাকে আসে, অনেকটা ওই কিউরিও শপের বিসর্পিল হাওয়ার মতো। যেন কেউ বুকের মধ্যে আধখোলা আতরের শিশি নিয়ে বসে আছে। সমরেশ এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কবেকার আতর? এখনও এত তীব্র গন্ধ?”
কেউ জবাব দেয় না। সমরেশ তাকিয়ে দেখে, কাউন্টারে এতক্ষণ যে বৃদ্ধ ভদ্রলোক বসে ছিলেন কখন তার অজান্তে উঠে চলে গেছেন। বস্তুত কিউরিও শপ একটা আজব জায়গা। যে যায়, সে আর ফেরে না। অন্য মানুষ ঘরে ফিরে আসে। নাকি মানুষ নয়! পরের দিন সকালবেলা পলিথিনের চেককাটা থলি হাতে ঝুলিয়ে, এলোমেলো পা ফেলে যখন সে বাজারে যায় মনে হয় অবিকল এক যূথভ্রষ্ট জোম্বি হেঁটে যাচ্ছে। প্রতিদিন নয়, কোনও কোনও দিন কেউ পিছন থেকে ডেকে ওঠে - অশোক অশোক। যদিও তার নাম সমরেশ, কস্মিন কালেও অশোক নয়, তবু থমকে দাঁড়ায়। ঘাড় ফিরিয়ে দেখে তার উদাসীন ছায়াশরীরকে পাশ কাটিয়ে উলটোমুখো চলে যাচ্ছে একটা ধুলো-ধূসর কাফিলা। জীপগাড়িগুলোর জানলায় বানজারা মেয়েদের সারিসারি আয়ত চোখ। সমরেশ প্রথমে ফিসফিস করে, তারপর চিৎকার করে বলে, “এই… তোমরা কোথায় যাচ্ছ? দাঁড়াও, আমায় ফেলে যেও না।”
মেয়েগুলো খিলখিল করে হাসে। হাত নেড়ে বলে, “সামনের বছর শীতে আসব, তখন আবার দেখা হবে।”
কাফিলা থামে না। যেমন শ্লথ মসৃণ গতিতে যাচ্ছিল, চলে যায়। সমরেশ ভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যায়। একদিন যারা সক্রিয় ছাত্র-রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল এখন তারা মন দিয়ে মুরগি পালন করে। এক কালের উদীয়মান বন্ধু-কবিরা ইদানীং রবিবাসরীয় ক্রোড়পত্রে উন্নত বর্গের মৌমাছির প্রজনন সংক্রান্ত প্রবন্ধ লেখে। পাড়া-কাঁপানো ছম্মক-ছল্লু সুন্দরীরা আপাতত খাণ্ডার গৃহিণী। তাদের কোমরের ভাঁজে গোলাপকুঁড়ি রাখলে, আর ফুল হয়ে ফুটে ওঠে না। হায়! শ্বাস-প্রশ্বাস না নিতে পেরে শুকিয়ে চিমসে হয়ে যায়, যেন কোমর নয়, বইয়ের ভাঁজ। খুললেই বাদামী পাপড়ি ঝুরঝুর করে ঝরে পড়বে। অলকা গজগজ করে, “বাজার যাওয়ার সময় এত বার বললাম, গন্ধরাজ লেবু আনতে, ভুলে গেলে?”
সমরেশ অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়। আজকাল এই এক ভুলে যাওয়া রোগ ধরেছে। আজকের কথা কাল ভুলে যায়, সকালের কথা সন্ধেয়। অথচ পুরনো কথা পরিষ্কার মনে থাকে। সদ্য আলাপ হওয়া মানুষের নামটুকু মনে থাকে না। মনে থাকে পুরনো বন্ধুদের যাবতীয় ইতিবৃত্ত। পুরনো শহরের গলিঘুঁজি। পার্টি অফিস। ক্লাব। বাবলিদের বাড়ি। কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে এক্সকারসান। বিকেলবেলা পাহাড়ের রাস্তায় মেঘ নেমে এসেছিল। টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিল। মাথা বাঁচাতে সমরেশ কিউরিও শপে ঢুকে পড়েছিল। ভিতরে আবছা অন্ধকার। চোখ সইয়ে নিয়ে দেখেছিল কাউন্টারে বসে একটা চাপা নাক, টানা চোখের ফর্সা মেয়ে তার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা ইংরিজিতে জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনি কি বিশেষ কিছু খুঁজছেন?”
সমরেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পাতি বাংলায় আমতা আমতা করে বলেছিল, “না না…”
সমরেশের অবস্থা দেখে মেয়েটা হেসে ফেলেছিল। বাংলাতেই বলেছিল, “ঘুরে দেখুন, হয়তো কিছু পছন্দ হয়ে যাবে, সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার মতো কিছু পেয়ে যাবেন।”
কিউরিও শপ থেকে কিছু কিনেছিল কি না মনে নেই। তবে সঙ্গে করে মেয়েটার নাম আর টেলিফোন নম্বর নিয়ে এসেছিল সমরেশ। অলকার মা ছিল পাহাড়ের মেয়ে। বাবা সমতলের। পাহাড়ের মিশনারি স্কুলে শিক্ষকের চাকরি নিয়ে গিয়েছিলেন ভদ্রলোক। সেখানেই অলকার মায়ের সঙ্গে আলাপ। কিউরিও শপটা ছিল অলকার দাদুর। পড়াশুনোর ফাঁকে সময় পেলে কখনও কখনও অলকাও গিয়ে বসত। বাবাই নাম রেখেছিল - অলকানন্দা। নদীর নামে নাম, কলকল করে কথা বলত অলকা। ফোনেই কথা হত সমরেশের সঙ্গে। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে চাকরি পাওয়ার পর সমরেশ আবার ফিরে গিয়েছিল সেই পাহাড়ি জায়গাটায়, এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে। এবার কিউরিও শপে নয়, অলকার সঙ্গে দেখা করেছিল একটা ক্যাফেতে। ক্যাফের জানলা দিয়ে মেঘ ঢুকে এসেছিল সেদিন। ফলত মন জানাজানি হতে বেশি সময় লাগেনি। তারপর দু’পক্ষের সম্মতি নিয়ে বিয়ে, বছর খানেকের মধ্যেই।
কোলকাতায় চার বছর চাকরি করার পর সমরেশ লোটা কম্বল গুটিয়ে অলকাকে নিয়ে নতুন মুম্বাই চলে এল। কেরিয়ারে একটা ভাল ব্রেক পেয়েছিল। বাবা-মাকে ছেড়ে দূরে চলে আসতে অলকার দুঃখ হয়েছিল। মফসসলের পৈতৃক বাড়ি, যৌথ পরিবার ছেড়ে আসতে সমরেশের অস্বস্তি। কিন্তু সংসার সামলানোর ব্যস্ততায় মনখারাপের পাখিরা কবে যে পশ্চিমের জানলা দিয়ে উড়ে পালিয়েছিল দুজনের কেউই খেয়াল করতে পারেনি। প্রথম দিকে অবশ্য ভাড়া বাড়িতেই থাকত। মুম্বাইয়ের নিয়ম মতো প্রতি এগারো মাসে বাসা বদলাতে হত। দু’-তিন বছর পরে বিরক্ত হয়ে ব্যাঙ্ক থেকে মোটা টাকা লোন নিয়ে একটা টু-বেড-হল-কিচেন কিনে ফেলেছিল সমরেশ। খানিকটা হঠকারিতাই করে বসেছিল তখন, ই-এম-আই দিতে দম ছুটে যেত। অলকা সে সময় সন্তানসম্ভবা। খুব খুশি হয়েছিল। যদিও পুরনো, রি-সেল-এ কেনা, তবু নিজস্ব বাড়ি। মনের মতো করে সাজিয়েছিল।
তিরিশ বছর পর গত এপ্রিলে সেই বাড়ি রি-ডেভেলপমেন্ট-এ চলে গেল। সমরেশের খুব যে উৎসাহ ছিল এমন নয়। কিন্তু হাউসিং সোসাইটির সবাই চাপ দিল। পাঁচতলা বাড়ি ভেঙে পঁচিশ তলা ইমারত উঠবে। ফ্লোর-স্পেস-ইনডেক্স বেড়ে গেছে। সবাই বড়-বড় ফ্ল্যাট পাবে। যে বিল্ডার কাজ হাতে নিয়েছে সেই আপাতত ওদের একটা ভাড়া-বাড়ি দেখে দিয়েছে। মাস গেলে ভাড়ার টাকাটাও সে-ই দেয়। তার সঙ্গে হাউসিং সোসাইটির সেই রকমই চুক্তি হয়েছে। তিন বছর পরে নতুন ফ্ল্যাট পাওয়া যাবে। ততদিন পুনর্মূষিক। পুরনো আসবাবগুলো মোটামুটি এঁটে গেছে। ভাড়ার বাসাটা খুব ছোট নয়, তবে একতলায়। এই সেক্টরে গায়ে-গায়ে বিল্ডিং। আলো-হাওয়া বিশেষ ঢোকে না। সমরেশের দম বন্ধ হয়ে আসে। অলকা বলে, “সারাদিন ঘরে বসে আছ, তাই অমন মনে হচ্ছে। আজ বিকেলে বৃষ্টি নেই। পার্কে গিয়ে হেঁটে এসো। ভাল লাগবে।”
আচ্ছা, অবসর নেওয়ার পর মানুষ ঘরে বসে থাকবে না তো কি? সারা জীবন দেশে বিদেশে ছুটে বেড়িয়েছে সমরেশ। এখনই তো আরাম করার সময়। অলকা মানতে চায় না। বলে, “ঘরে বসে আয়েশ করলে তাড়াতাড়ি বুড়ো হয়ে যাবে।”
সমরেশ বোঝাবার চেষ্টা করে, “একদিন না একদিন তো বুড়ো হতেই হবে।”
অলকা শোনে না। জোর করে ঠেলে বাড়ি থেকে বার করে দেয়। সমরেশ বলল, “তুমিও চলো সঙ্গে।”
অলকা বলল, “আমার রাজ্যের কাজ পড়ে আছে। সেগুলো কে করবে শুনি!”
আজকাল অলকার ব্যবহারে কেমন যেন আলগা আলগা ভাব এসেছে। সমরেশের সঙ্গে বেরোতে চায় না। বরং কোথাও ‘সৎসঙ্গ’ হচ্ছে খবর পেলে দৌড়ে গিয়ে প্রবচন শুনে আসে। কীর্তনের আসরে হাত জোড় করে বসে থাকে। সমরেশের চিরকালই ভক্তি-শ্রদ্ধা কম। সেসব জায়গায় যেতে ইচ্ছা করে না।
এই সেক্টরে পার্কটা বেশ বড়। মাঝখানে ঘাসের লন, ছোটদের দোলনা, স্লাইড, চারদিকে পাথর বাঁধানো জগার্স ট্র্যাক। সমরেশ পাথর গুনতে গুনতে হাঁটে। পাথর শব্দটা মনে এলেই, কেন কে জানে, মাথার মধ্যে আতর শব্দটা অনুরণিত হয়। আর অবধারিত ভাবে অনেক দিনের পরিচিত আতরের গন্ধটা পায়। নাক সুলসুল করে ওঠে। থমকে দাঁড়িয়ে চারদিক জরীপ করে, আধখোলা আতরের শিশিটা আশেপাশে কোথাও পড়ে আছে কি না। খুঁজে পায় না। চোখ তুলে দেখে কৃষ্ণচূড়ার গাছ থেকে একটা শেষ-বর্ষার শুঁয়োপোকা নিজের লালার সুতোয় দোল খাচ্ছে। আচমকা একটা কাঠবিড়ালি তুড়ুক করে লাফ দিয়ে পা ডিঙিয়ে চলে যায়। সামনের বেঞ্চ থেকে একটা লোক হাত তুলে ডাকে, জিজ্ঞেস করে, “কেয়া সোমোরেশ-ভাউ, চলতে চলতে অচানক রুখ কিঁউ গয়ে? তবিয়ত ঠিক হ্যায় না?”
সমরেশ কাছে গিয়ে দেখে শংকর বাবুরাও শাঠে। শংকরও সমরেশের মতো ঘরছাড়া। একই বিল্ডিঙে থাকে। চারতলায়। বিল্ডার ওর পরিবারকেও ভাড়ার বাসা খুঁজে দিয়েছে। সমরেশ বলে, আরে শংকর-ভাই, তবিয়ত বরোবর। কিন্তু আমাদের পুরনো ঘর কতদূর তৈরি হল? খবর জানো কিছু?
শংকর বলে, কিস্যু এগোয়নি। ছ’মাস হয়ে গেল। বিল্ডার এখনও কর্পোরেশন থেকে ক্লিয়ারেন্স পায়নি। কাজ আটকে পড়ে আছে। জানি না কবে শুরু হবে। তিন বছর ছাড়ো, তেরো বছরেও শেষ হলে বাঁচি।
সমরেশ বিমর্ষ গলায় বলে, সে কী! বাউন্ডারি ওয়াল তুলে, অত ঘটা করে ভূমিপূজন করল! মিঠাই খাওয়াল।
শংকর বলে, এরা এই রকমই। কথার কোনও দাম নেই। বলে এক আর করে আর এক। ভয় লাগছে ঠিক সময়ে কন্সট্রাকশন শেষ না হলে ভাড়া দেওয়া না বন্ধ করে দেয়। তাহলে পরিবার নিয়ে পথে বসতে হবে।
শংকরের কথায় চিন্তা বাড়ল। মাথাটা এখনও ভার হয়ে আছে। এই সময়টায় একটা হাওয়া ওঠে, খাঁড়ি থেকে। আজ নেই, থমথম করছে চারদিক। গাছের একটা পাতাও নড়ছে না। ভুরুর পাশ দিয়ে ঘাম গড়াচ্ছে। চশমায় ভাপ জমছে। সমরেশ পকেট থেকে রুমাল বার করে চশমা মুছল। ধুপ করে শংকরের পাশে বেঞ্চে বসে পড়ল। শংকর বলল, ভেবো না, সবাই মিলে পরামর্শ করে একটা উপায় বার করা যাবে। বিল্ডিং না বানিয়ে যাবে কোথায়?
শংকর নানারকম কথা বলছিল। অধিকাংশই সাংসারিক। সমরেশ হুঁ-হাঁ দিচ্ছিল। মন দিতে পারছিল না। শংকর জিজ্ঞেস করল, ভাউ, ছেলের খবর কী? ফেরার কথা কিছু বলে নাকি?
সমরেশ আর অলকার ছেলে সায়ন কানাডায় এমএস করতে গেছে। ইন্টার্নশিপ করছে। যা পায় থাকা-খাওয়ার খরচ চলে যায়। সমরেশকে টাকা পাঠাতে হয় না। একদিন অন্তর ভিডিও কলে কথা হয়। ভালই আছে। ফেরার কথা জিজ্ঞেস করলে চুপ করে থাকে। যারা বিদেশে পড়াশুনো করতে যায়, ক’জন আর ফেরে? শংকরের মেয়ে ব্যাঙ্গালোরে, একটা আইটি কোম্পানিতে কাজ করে। সে তবু দু’-তিন মাসে একবার মুখ দেখিয়ে যায়। আসে যখন অলকা-আন্টির সঙ্গেও দেখা করে যায়। খুব পছন্দ অলকা-আন্টিকে। মচ্ছি-ফ্রাই খাওয়ায়। অলকা একদিন বলছিল, ছেলের বৌ করলে কেমন হয়! ছেলেমেয়েগুলো বড় হয়ে গেল আর সমরেশ-শংকররা বুড়ো। অন্ধকার নামছিল। পার্কের আলোগুলো এক সঙ্গে জ্বলে উঠল। শংকর বলল, যাই, গিন্নির আবার বায়না হয়েছে সন্ধেবেলা বড়া-পাও খাবে, রসুনের চাটনি দিয়ে। ফেরার পথে ‘এ-ওয়ান বড়া-পাও হাউস’ থেকে কিনে নিয়ে যাব।
সমরেশ অন্যমনস্ক ভাবে বলল, “আচ্ছা…”
সমরেশ বসে রইল। লোকজনের চলাচল কমে আসছে। পাখিদের কিচিমিচি বন্ধ হয়ে গেছে। একটা বিড়াল পায়ে গা ঘষে গেল। ক’দিন ধরেই মনে হচ্ছে কিছু একটা হারিয়ে গেছে। কী যে হারিয়েছে সেটাই ঠিক মনে পড়ছে না। আতরের শিশিটা কি? কে জানে? যা-ই হোক একবার কিউরিও শপটায় ফিরে যেতে পারলে ঠিক মনে পড়ে যেত। ওখানেই আছে হারিয়ে যাওয়া বস্তুটা। কোনও একটা তাকে। সমরেশ জানে, হাবিজাবি জিনিষপত্রের আড়ালে। ফিসফিস করে বৃষ্টি শুরু হল। সমরেশ তাকিয়ে দেখল পার্কের আলোগুলোর চারদিকে একটা আবছা বলয় তৈরি হচ্ছে। যেন কোনও যুবতী নারীর শ্যাম্পু করা চুল। সারাদিন গাড়ি চলাচলের কার্বনের সঙ্গে বৃষ্টির হালকা কণা মিলেমিশে একটা ভিজে ভিজে কুয়াশা ছড়াচ্ছিল। কুয়াশাটা আস্তে আস্তে সমরেশের মাথার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। চিন্তা-ভাবনাগুলো ঘেঁটে দিচ্ছে। হাতের মোবাইলটা বাজছে। তুলে দেখল অলকার ফোন, “কী গো, সাড়ে আটটা বেজে গেল, কখন ফিরবে?”
“এত দেরি হয়ে গেছে! ফিরছি,” বলে সমরেশ তড়িঘড়ি উঠে পড়ল। পার্ক থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে পা চালাল। ধ্যুত্তেরি! রাস্তাটা যেন শেষ হচ্ছে না। যত হাঁটছে বাড়িটা যেন ততই পিছিয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা, ঝামেলায় পড়া গেল, যা হোক! স্বপ্নের মধ্যে অনেক সময় এই রকম একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়। সমরেশ চোখ ছোট করে দেখল ওই তো গলির মুখে বাসস্টপ। কিন্তু বাড়িটা কোথায়? নিজের বিল্ডিংটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না সমরেশ। বাড়িটা যেখানে ছিল সে জায়গায় একটা দু’মানুষ উঁচু ধাতব দেওয়াল। দেওয়ালের চারদিকে দু’বার চক্কর লাগিয়ে ঘুরে এসেও ভিতরে ঢোকার গেট খুঁজে পেল না সমরেশ। পা-দুটো আর দিচ্ছে না। ক্লান্ত হয়ে ফুটপাথের ওপরই বসে পড়ল। শীত করছে। চোখ ভেঙে ঘুম আসছে। সমরেশ দেওয়ালে মাথা হেলিয়ে চোখ বুজল।
*
সমরেশ ফিরছে না, ফোনও ধরছে না। ভয় পেয়ে শংকরদের দরজায় কলিং বেল টিপেছিল অলকা। শংকর বলল, ভাউকে তো একটু আগেই দেখলাম পার্কে। কথাও হল। একটু যেন বেখেয়াল লাগল।
কী যে হয়েছে মানুষটার! ক’দিন ধরেই কেমন এলোমেলো হয়ে আছে। অলকা বলল, এত রাত পর্যন্ত কোনওদিন বাইরে থাকে না। শংকর-ভাই আমার সঙ্গে একটু বেরোবে?
দু’জনে বেরিয়ে একটা অটোরিকশা ধরল। পার্কে পৌঁছে দেখল গেট বন্ধ। একটা ওয়াচম্যান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি টানছিল। সে বলল, ভিতরে কেউ নেই। অলকা অটোটাকে খাঁড়ির ধারে নিয়ে যেতে বলল। জায়গাটা সমরেশের প্রিয়। এখানে এসে প্রথম প্রথম অলকাকে নিয়ে হাওয়া খেতে আসত। কয়েক ধাপ পাথরের সিঁড়ি ভেঙে ছলাৎ-ছল জল। পাড়ে শেডের নিচে তিনটে পাথরের বেঞ্চ। খালি। অলকা অসহায় গলায় বলল, কোথায় যে খুঁজি! কোনও অ্যাক্সিডেন্ট হয়নি তো? একবার লোকাল হাসপাতালে গিয়ে… বলতে বলতে থেমে গেল।
শংকর চিন্তিত গলায় বলল, ভাউ পুরনো বাড়ির কথা বলছিল। সেখানে গিয়ে দেখবে নাকি?
অলকার চোখে জল আসছিল। সামলে নিয়ে বলল, চলো।
*
কেউ গায়ে ধাক্কা দিয়ে ডাকছে। চোখ খুলতে কষ্ট হচ্ছিল। সমরেশ কোনওমতে দু’চোখের পাতা ফাঁক করে দেখল চেনা মুখ। দুটো উদ্বিগ্ন চোখ। যেন তাদের পৈতৃক বাড়ির চিলেকোঠা ঘর। ভিতরে অন্ধকার নির্ভরতা, অথচ খোলা জানলা দিয়ে বিকেলবেলার আলো এসে পড়েছে লাল সিমেন্টের মেঝেতে।
“এত দেরি করলে কেন? কোথায় ছিলে এতক্ষণ?” সমরেশ জড়িয়ে জড়িয়ে বলল। ক’দিন ধরে এই আশ্রয়টুকুই খুঁজছিল। পাচ্ছিল না। আহ্ কী শান্তি! সমরেশ আবার চোখ বুজল। দেখল কিউরিও শপের দরজাটা খোলা। ভিতরে কাউন্টারে সেই অমায়িক ভদ্রলোক ফিরে এসেছেন। অলকার দাদু। সমরেশ অলকার হাত চেপে ধরল, বলল, “বাড়ি যাব।”
অলকা পরম স্নেহে পিঠে হাত জড়িয়ে তাকে ধরে দাঁড় করাল। অটোরিকশায় তুলতে তুলতে বলল, “চোখ খোলো। পড়ে যাবে যে। বাড়ি নিয়ে যেতেই তো এসেছি। দেখো, আর কোনওদিন তোমায় একা ছাড়ব না।”
অটোরিকশায় মাঝখানে সমরেশ। একদিকে অলকা, অন্যদিকে শংকর। শংকর বলল, “ভাউ, যা খেল দেখালে! এবার থেকে বাড়ির বাইরে যেতে হলে আমায় ডাকবে। সঙ্গে যাব।”
অলকা গুনগুন করে গাইছিল, “যানেকি জিদ না করো…” সত্যিই কি গাইছিল? নাকি সমরেশের কান বাজছিল। সত্যি মিথ্যে যাই হোক, শুনে সমরেশ ছেলেমানুষের মতো হাসল।