


[মধ্য এশিয়ার হুন উপজাতি ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে বহু শতাব্দী ধরে হানা দিয়ে এসেছে যদিও গুপ্ত-সাম্রাজ্যের পরাক্রমে তারা ঢুকতে পারেনি। গুপ্তসম্রাট স্কন্দগুপ্তের মৃত্যুর পর পঞ্চম শতাব্দীর শেষদিকে (খৃষ্টাব্দ ৪৯৩) হুনরাজা তোরমান ভারতে ঢুকে পড়াতে হুনরা বিশাল রাজ্য বিস্তার করে। হুনজাতি অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির ছিল। সে যুগের বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়নের কেন্দ্র কৌশাম্বী নগরটি তোরমানের সেনারা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিল। রাজা হবার পর তোরমানের পুত্র মিহিরকুলের নির্মমতা সব সীমা ছাড়িয়ে যায়। মিহিরকুলের সেনারা নালন্দা বিশ্ব-বিদ্যালয় বহুলাংশে ধ্বংস করে দিয়েছিল।
এখনকার রাজস্থান-মধ্যপ্রদেশ অঞ্চলে অলিকার নামে একটি রাজ্য ছিল। অলিকারের রাজা প্রকাশধর্মন ৫১৫ খৃষ্টাব্দে তোরমানকে একবার যুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন। তাঁর সুযোগ্য পুত্র যশোধর্মন রাজা হয়ে ৫৩৩-৫৩৪ খৃষ্টাব্দ নাগাদ মিহিরকুলকে পরাজিত করে হুনদের বিতাড়িত করেন। অবশ্য মিহিরকুলের পরাজয়ের পরেও অবশিষ্ট হুনেরা জোট বেঁধে এলাকা অধিকারের প্রচেষ্টা করত। যশোধর্মন তাদেরও পর্যুদস্ত করেন। বীর ও রণ-নিপুণ যশোধর্মন প্রজা-বৎসল রাজারূপেও খ্যাত ছিলেন।
পরাজিত হুনদের মধ্যে যারা পালিয়ে যেতে পারেনি ভারতের মহান সংস্কৃতি তাদের মতো শত্রুদেরও কালক্রমে আপন করে নেয়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “শক-হুনদল পাঠান মোগল এক দেহে হলো লীন…”]
শীত শেষ হয়ে তখন বসন্তকাল। গাছে গাছে নতুন পাতা, নীল আকাশে দু-চারটে সাদা মেঘ আপন মনে ভেসে বেড়াচ্ছে।
অপরাহ্ণ বেলা। বেতশ্রী নদী নুড়িপাথরের ওপর দিয়ে ছলছল করে বয়ে যাচ্ছে, জল তেমন নেই। এক দীর্ঘদেহী অশ্বারোহী জলধারা পেরিয়ে ঘোড়া থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়লেন। বাদামী তেজি ঘোড়াটিকে লম্বা দড়ি দিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে দিলেন যাতে সে ঘাস ও জল দুই-ই খেতে পারে। তারপর গ্রামের দিকে পা চালালেন।
গ্রামে মেলা বসেছে। কাপড়-চোপড়, মাটির কলসি, খেলনা, মেয়েদের শাঁখের মালা কত কী বিক্রি হচ্ছে, কিনছেও সকলে। এই কমাস আগে এদেশের বীর মহারাজা যশোধর্মন অত্যাচারী হুনরাজা মিহিরকুলকে পরাস্ত করে হুনদের বিতাড়িত করেছেন। অনেক বছর পরে রাজ্যে শান্তি ফিরেছে, মানুজনের মন-মেজাজ তাই এত ভালো।
কেনাকাটায় পুরুষটির আগ্রহ নেই, তিনি গোটা মেলার কোথায় কী হচ্ছে নজর করছিলেন। একদিকে একটি অল্পবয়েসী যুবক, হাতে তীর-ধনুক নিয়ে চেঁচিয়ে লোক ডাকছিল। “এসো, নিশানা পরীক্ষা করো! মাত্র একটি তামার মুদ্রা খরচ করে পঞ্চবাণের বাজি জিতে নাও!” পুরুষটি কৌতূহলী হয়ে সেখানে গিয়ে দাঁড়ালেন। ছেলেটি একটি কাপড়ের ওপর চাঁদমারি এঁকেছে, একেবারে কেন্দ্রের ছোট বৃত্তটিতে তীর নিক্ষেপ করতে হবে। যে পাঁচটায় পাঁচটা লাগাতে পারবে সে তিনটি তামার মুদ্রা পাবে। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলেন, কেউই পারছে না। বড়জোর দুটো লাগছে, বেশিরভাগ লোকের একটা তীরও নিশানায় লাগছে না। ছেলেটির রোজগার ভালোই হচ্ছে।
পুরুষটি এগিয়ে এসে একটি মুদ্রা ছেলেটির হাতে দিয়ে বললেন, দাও তীর-ধনুক। চেষ্টা করি।
নির্দিষ্ট রেখাতে পা রেখে, ধনুকে শর যোজনা করলেন। লক্ষ্য স্থির করে … সাঁই। তীর বিঁধেছে একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে। পরেরটা নিক্ষেপ করলেন … আবার কেন্দ্রবিন্দু। এটা আগের তীরটা উপড়ে সেখানে গেঁথে গেছে! তিন নম্বরটি কেন্দ্র থেকে একটু তফাতে লাগল যদিও বৃত্তের ভেতরে। আর দুটো হলেই বাজি জিতবেন তিনি। চতুর্থটি যেন হেলায় নিক্ষেপ করলেন তবু নিশানায় ঠিকই লাগল। অনেকে উৎসাহিত হয়ে হাততালি দিতে শুরু করেছে। এবার শেষ বাণ। লাগলে তিনি বাজি জিতবেন।
সবাই বুঝেছে ইনি একজন কুশলী তীরন্দাজ। শেষ তীরটি কি লাগাতে পারবেন লক্ষ্যে? ছেলেটি সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আরও লোক জমছে চারপাশে। পুরুষটি চারিদিক দেখলেন, ছেলেটিকেও দেখলেন। ছেলেটির মুঠিতে মুদ্রা, উৎকণ্ঠায় সে মুঠি খোলেনি তখনও।
তিনি পঞ্চম বাণটি নিক্ষেপ করলেন। সাঁই করে উড়ে গিয়ে লাগল … না, না, হলো না। তীর বিঁধেছে বাইরের বৃত্তে। বাজি জিততে পারলেন না। হতাশার নিশ্বাস পড়ল সকলের, ভীড়ও কমে এল। ছেলেটি মুদ্রাটি তার পেটিতে রাখতে গিয়ে চমকে উঠে বলল, “তুমি আমাকে ভুল করে স্বর্ণমুদ্রা দিয়েছ। ফেরৎ দেবার মতো অত পয়সা তো আমার কাছে নেই – তুমি একটা তামার পয়সাই দাও।”
পুরুষটি গভীর দৃষ্টিতে ছেলেটির দিকে তাকালেন। ছেলেটির সততা তাঁর ভালো লেগেছে। ছেলেটি বলল, “তোমার কৌশল ভালো কিন্তু মনঃসংযোগ নেই। তাই পারলে না…”
পুরুষটি বললেন, “ওহ, তুমি তো খুব বড় বড় কথা বলতে পারো। নিজে পারবে?”
ছেলেটি তাচ্ছিল্যভরে বলল, “আমি এত কাছে থেকে নিশানা করি না।”
“তাহলে?”
ছেলেটি কথা না বলে পেছিয়ে গেল অনেকটা। প্রায় তিনগুণ দূরত্বে দাঁড়িয়ে পলকের মধ্যে পাঁচ-পাঁচটা তীর নিক্ষেপ করল। পুরুষটি এবং যারা তখনও আশেপাশে ছিল, তারা সবিস্ময় দেখল প্রতিটা তীরই লক্ষ্যভেদ করেছে!
পুরুষটি ছেলেটির কাঁধে হাত রেখে বললেন, “তোমার নাম?”
“অত্রিক।”
“তোমার তো কৌশল আছে, আর ‘মনঃসংযোগ’ – তাও আছে দেখছি…”
ছেলেটির মনে হলো, ইনি ইচ্ছে করেই শেষের তীরটা নিশানার বাইরে মেরেছেন। নয়তো তারই কথা এরকম কৌতুকের সুরে বলবেন কেন? যাই হোক লোকটি বলতে লাগলেন, “তোমার হাত ভালো, রাজার সৈন্যদলে যোগ দাওনি কেন?”
“দশপুরের রাজবাড়িতে গিয়েছিলাম। দ্বারপালেরা ঢুকতেই দিল না। কম করে দুটো রুপোর মুদ্রা উৎকোচ চায় – অত পয়সা তো আমার নেই। তাই ফিরে এসেছিলাম।”
“আমি রাজাকে ভালো করে চিনি। তুমি বরং কাল সকালে ঈশানগড় দুর্গে যাও। নাও, এই পেতলের আংটিটা দ্বাররক্ষীদের দেখাবে। ওরা তোমাকে যেতে দেবে। সোজা দুর্গাধিপতি ললিতসিংহের সঙ্গে দেখা করবে।”
পুরুষটি ঘুরতে ঘুরতে মেলার আরেক প্রান্তে এলেন। দেখলেন একটি যুবক হাপরে লোহা গরম করে পিটিয়ে পিটিয়ে কুড়ুল, শাবল, কাস্তে ফরমায়েশ মতো তৈরি করছে। কিছুক্ষণ দেখে বুঝলেন, নাঃ, এ কুশলী কারিগর। ভীড় কমলে কাছে গিয়ে বললেন. “তোমার হাত তো বেশ ভালো দেখছি। তোমার নাম কী? এরকম কাজ শিখলেই বা কার কাছে?”
“আজ্ঞে আমি বলরাম। আচার্য ব্রজগুপ্তর কাছে কাজ শিখেছি।”
পুরুষটি ব্রজগুপ্তের নাম জানতেন। ভূভারতে এমন যন্ত্রবিদ আর রণকৌশল বিশেষজ্ঞ সে যুগে আর ছিল না। বললেন, “আচার্য ব্রজগুপ্ত! তিনি তো নালন্দায় থাকতেন।”
“হ্যাঁ তা ঠিক। নালন্দায় ওনার আশ্রয়ে থেকে কিছু কিছু কারিগরি কাজ শিখেছিলাম। তারপর হুনরাজ মিহিরকুল নালন্দা আক্রমণ করাতে কত যে ছাত্র, শিক্ষক, বৌদ্ধ শ্রমণ মারা গেল, কত যে পুঁথিপত্র ভস্ম হয়ে গেল তার ঠিক-ঠিকানা নেই। আমরা দুজনে কোনোরকমে পালিয়ে এসেছিলাম। পরে যখন শুনলাম অলিকার রাজ্যের বীর মহারাজা যশোধর্মন মিহিরকুলকে হারিয়ে হুনদের তাড়িয়ে দিয়েছেন, তখন আমরা এই রাজ্যে এসে বাসা বাঁধলাম।”
“আমি মহারাজ যশোধর্মনকে ভালো করে চিনি। বলরাম, তুমি কাল সকালে আচার্য ব্রজগুপ্তকে নিয়ে ঈশানগড় দুর্গে যাবে। দুর্গাধিপতি ললিতসিংহ আচার্যের সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন অনেকদিন ধরে। এই পেতলের আঙটিটা রাখো, এটি দেখালে রক্ষীরা তোমাদের প্রবেশ করতে দেবে।”
পরের দিন সকালে প্রথমে অত্রিক তারপর বলরাম আর আচার্য ব্রজগুপ্ত ঈশানগড় দুর্গে পৌঁছে গেলেন। রক্ষীরা তাদের, বিশেষ করে আচার্যদেবকে সমাদর করে এনে বসাল ললিতসিংহের মন্ত্রণাকক্ষে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ললিতসিংহ এলেন এবং মাথা নিচু করে আচার্যদেবকে প্রণাম করে বললেন, “এই অধমের দুর্গে আপনাদের স্বাগতম। আজ একটা অত্যন্ত জরুরী বিষয় নিয়ে আমাদের আলোচনা করতে হবে – বুঝিয়ে বলছি।”
ললিতসিংহ বলে চললেন, “যদিও মহারাজের পরাক্রমে মিহিরকুল পরাস্ত এবং হুনসেনা ছত্রভঙ্গ হয়ে পলায়ন করেছে, তবু বিপদ এখনো কাটেনি। চিংকা নামে একজন হুন সেনাপতি এখনও অধরা। খবর পাওয়া যাচ্ছে চিংকা আমাদের এই অলিকার রাজ্যের উত্তর সীমানার বাইরে হুনদের সংগঠিত করছে। তারা ঈশানগড় আক্রমণ করতে চায়। আসলে এই দুর্গের অবস্থানগত সুবিধে এত যে এটি অধিকার করতে পারলে হুনরা গোটা রাজ্যটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তার মানে আবার স্বৈরাচার, আবার সন্ত্রাস। হুনসেনাদের প্রতিরোধ করলেই হবে না তাদের বিনষ্ট করতে হবে, করতেই হবে …”
কক্ষের দ্বার খুলে গেল, ললিতসিংহ ও অন্যরা সকলে উঠে দাঁড়ালেন। মহারাজ এসেছেন। এসেই তিনি আচার্যদেবকে শ্রদ্ধা সহকারে প্রণাম জানালেন।
বলরাম আর অত্রিক তো মহারাজকে দেখে হাঁ করে চেয়ে আছে তো আছেই। তাদের চোখে আর পলক পড়ছে না। ইনি তো কালকের সেই লোকটি। কাল শুধু পাগড়ির একটা প্রান্তের কাপড় দিয়ে মুখের একাংশ ঢেকে রেখেছিলেন!
মহারাজ বললেন, “ললিত, আমাদের সৌভাগ্য যে আজ আমরা আচার্যদেবকে পেয়েছি। আর এই দুটি যুবক, অত্রিক এবং বলরামকে আমার ভালো লেগেছে। এরা কাজের ছেলে। আচার্যদেবের পরিকল্পনা আর তোমার নেতৃত্ব – দুয়ে মিলে ঈশানগড় হুনসেনার অভেদ্য হয়ে উঠুক। মনে থাকে যেন আর বড়জোর সাত-আটমাস সময়, তারপর যে কোনো দিন তারা দুর্গ আক্রমণ করতে পারে। তোমরা আলোচনা করে কাজ শুরু করো। আমার তরফ থেকে সব রকম সহায়তা পাবে।”
আচার্য ব্রজগুপ্ত বললেন, “মহারাজা যশোধর্মন, হুনদের নিমর্মতা আর অমানবিকতার শত শত দৃষ্টান্ত আমি দেখেছি। আপনাদের সঙ্গে মিলে হুনদের যদি বিনষ্ট করতে পারি তাহলে আমার বিদ্যা, আমার জীবন দুই-ই সার্থক হবে।”
****
সভা শেষ হলে ব্রজগুপ্ত দুর্গটির সর্বত্র ঘুরে ঘুরে অভিজ্ঞ চোখে জরিপ করলেন। ভাবতে লাগলেন কী করলে হুনদের নিশ্চিহ্ন করা যাবে। তারপর বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হলো, অবশ্য নীরবে। বাইরে কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পেল না।”
দুর্গটি টিলার ওপরে। সামনে অর্ধচন্দ্রাকার গভীর ও প্রশস্ত পরিখা, তার বারো-আনা জলে ভর্তি। পেছনে পরিখা কাটার দরকার পড়েনি কারণ সেখানে দুর্গম অরণ্যসঙ্কুল পাহাড়ের শ্রেণী। দুর্গের পেছন দিকে একটু উচ্চতায় একটি বড় সরোবর আছে, বর্ষায় ভরে যায়। দুর্গ আর পাহাড়ের মাঝে সমতল ভূমিও আছে, বাড়তি সৈন্যদের থাকার জন্য ছাউনি ফেলা যায়। আছে চাষের জমি, দুর্গের অধিবাসীদের সংবৎসরের শষ্য ফলে সেখানে।
*****
ব্রজগুপ্ত বললেন, “অত্রিক, তুমি দেড়শ তরুণ যোদ্ধাকে ধর্নুবাণের উন্নত প্রশিক্ষণ দেবে। পঞ্চাশ জন শিখবে লম্বধনু আর বাকি একশ আড়ধনু।”
“আড়ধনু কেন আচার্যদেব? আড়ধনুর পেতলের সরু পাটাতে তেল লাগিয়ে পিচ্ছিল না করে রাখলে তীর চালানো যায় না … আর আড়ধনু তৈরি করাও সময়-সাপেক্ষ।”
“আমরা দুর্গপ্রাচীরের আড়াল থেকে বাণ নিক্ষেপ করব। সেক্ষেত্রে আড়ধনু অনেক সুবিধের। আমার কাছে আড়ধনুর সহজ নকশা আছে, সেই মতো তৈরি করতে হবে।”
“বলরাম, তুমি দশজন কারিগরকে অস্ত্র বানাবার কাজ শিখিয়ে দেবে। আমাদের বহুসংখ্যক ধনুক, তীর, বল্লম, কুঠার, গন্ধক-গোলা বানাতে হবে। গন্ধক-গোলা মনে আছে তো?”
“হ্যাঁ, আছে। নারকেলের অর্ধেক খোলার ভেতর গন্ধক ভরে, মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া। মাঝে আগুন দেওয়ার জন্য একটা গর্ত।”
“আর একটা বড় কপিকল আর একশ হাত লম্বা শিকল লাগবে।”
অনেক কাজ দুজনের। তারা দেরি না করে কাজে লেগে গেল। ব্রজগুপ্তকে দেখা গেল কটা লোক নিয়ে পরিখার কিনারায় একটা জায়গায় মাটি খুঁড়ে কী সব করাচ্ছেন।
*****
বর্ষার দিন শেষ হয়ে শরতের রৌদ্রে মাঠঘাট শুকিয়েছে। প্রস্তুতিপর্বও প্রায় সম্পূর্ণ। ব্রজগুপ্ত বলেছিলেন এরকম সময়তেই হুনরা আক্রমণ করবে। তাঁর কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল। দূরদূরান্তে চর লাগানো ছিল, তাদের মশাল সংকেত দেখা গেল গভীর রাত্তিরে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সাদা পায়রার পায়ে বাঁধা তালপাতার ফালিতেও একই বার্তা পাওয়া গেল। প্রায় হাজার খানেক হুনসেনা আসছে।
দুর্গে টানটান উত্তেজনা। পরিখার সেতু, পারাপারের নৌকা তুলে নেওয়া হলো। বজ্রগুপ্ত বলেছিলেন ওরা আঘাত হানবে ভোর রাত্তিরে যখন সকলে ঘুমের ঘোরে থাকে। ঠিক তাই-ই হলো। হৈহৈ করে হুনসৈন্যের দল ঢালু জমি বেয়ে উঠে পরিখার ধারে এসে দাঁড়াল। ওপারে একটা শালকাঠের খুঁটি দেখতে পেয়ে একজন জলে নেমে দড়ি ছুঁড়ে দিল, দড়ি জড়িয়ে গেল খুঁটিতে। দড়ির সঙ্গে তারা জুড়ে দিল দড়ি আর কাঠ দিয়ে বানানো সেতু। হুনরা ভীষণ ক্ষিপ্র ও দুঃসাহসী। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বর্শা ও ধনুক হাতে সৈন্যরা সেতুতে উঠতে লাগল, সেতু শক্তপোক্ত হয়েছে দেখে ঘোড়সওয়াররাও এক এক করে উঠতে শুরু করল।
এর মধ্যে বলরাম চলে গেছে সরোবরের ধারে যেখানে শেকল পরানো কপিকল লাগানো হয়েছে। বলরাম ইশারা করতেই অনুচরেরা শেকল টানতে লাগল। শেকল লাগানো ছিল সরোবরের নিচে একটা পাথরে। সে পাথর স্থানচ্যুত হতেই হু-হু শব্দে জল সরোবরের নিচের খাল বেয়ে পরিখায় যেতে লাগল। পরিখার জল বাড়ছে কিন্তু হুনরা পরিখা পার হতে এত ব্যস্ত যে তেমন খেয়ালই করল না।
ব্রজগুপ্ত দুর্গের ফোকর দিয়ে দেখছেন। মনে মনে বলছেন, “আয় আয় তোরা আয়। তাড়াতাড়ি আয়, লোক-লস্কর ঘোড়া সব নিয়ে সেতুতে ওঠ …”
জল আরেকটু উঠতেই শালের খুঁটিটা আলগা হয়ে গেল – সেভাবেই পরিকল্পনা করে ঝুরোমাটিতে পোঁতা ছিল খুঁটিটা। খুঁটি উপড়ে যেতেই সৈন্য-সামন্ত ঘোড়সওয়ার সমেত সেতু পড়ে গেল জলে। গোটা পঁচিশেক সেনা, সাতটি ঘোড়সওয়ার জলে হাবুডুবু খেতে লাগল।
অত্রিকের ধনুকধারীরা দু-দলে বিভক্ত ছিল। তাদের কাজ শুরু হলো এবার। অত্রিক এক বললে প্রথম দল এক সঙ্গে তীর নিক্ষেপ করছে। দুই বললে দু নম্বর। ততক্ষণে একের দল তীর লাগিয়ে তৈরি। এভাবে দুর্গ-প্রাচীরের লুকোনো ফাঁক-ফোকর দিয়ে অবিশ্রান্ত বর্ষার মতো আসতে লাগল আড়ধনুর তীর। হুনরা এতটা ভাবেনি। জলে হাবুডুবু খেতে খেতে তীর বা বর্শা কোনোটাই ব্যবহার করা যায় না। তাছাড়া মারবে কাকে? কেউ তো দুর্গের বাইরে নেই। পরিখার জলে সেদিন হুনরক্তরেখার আলপনা আঁকা হয়ে গেল! যারা কোনো রকমে এপারে বা পিছনে হটে অন্য তীরে উঠেছিল তারাও কেউ বাঁচল না। সেরা নিশানাবাজদের লম্বধনুর শক্তিশালী তীর তাদের শেষ করে দিল। মারা পড়ল বেশ কটা যুদ্ধের ঘোড়াও।
ললিতসিংহ বললেন, “হুনদের প্রভূত ক্ষতি হয়েছে, আমরা নিরাপদ!” ব্রজগুপ্ত বললেন. “ওকথা বলবেন না। ওরা এক্ষুনি হানা দিতে পারে, সাবধান!”
বলতে না বলতে পরিখার ওপর আরেক দৃশ্য! হুনরা নিচে থেকে পাতা সমেত ডালপালা কেটে নিয়ে আসছে আর তা ভাসিয়ে আড়ালে আড়ালে সাঁতরে পরিখা পার হচ্ছে! পাতার আড়ালে আছে বলে, তীরের নিশানা বিফলে যাচ্ছে। ব্রজগুপ্ত চীৎকার করে বললেন. “বলরাম, এখুনি ছাদে যাও!!”
বেশ কিছু হুন সেনা আর কটা ঘোড়াও সাঁতরে পরিখা পেরিয়েছে। তীরবৃষ্টি অগ্রাহ্য করে ক্ষিপ্রগতিতে তারা ফটকের সামনে… ললিতসিংহ সমুহ বিপদ দেখে বললেন, “সৈন্যরা দুর্গের বাইরে এসে বাধা দিক এবার।” ব্রজগুপ্ত বললেন, “তাতে আমাদের প্রচুর লোকক্ষয় হবে। একটু ধৈর্য ধরুন …”
দুর্গের সকলেই বিচলিত, এবার তো হুনরা ফটক ভেঙ্গে ফেলবে!
দুর্গ-ফটক আর পরিখার মাঝখানে কয়েক সারি আম-কাঁঠাল ইত্যাদি ফলের গাছ লাগানো হয়েছিল কোনোকালে। লোকেরা বলত বাগান। ব্রজগুপ্ত বলরামকে ছাদে খবর পাঠালেন, গন্ধক-গোলা বাগানে ফেল, হ্যাঁ, বাগানে।
প্রায় গোটা পঁচিশ-তিরিশ হুনসৈন্য তখন বিপজ্জনক ভাবে ফটক ভাঙার আয়োজন করছে। দুর্গের দেয়াল ঘেঁষে আছে বলে ওপর থেকে আড়ধনুর নিশানায় তাদের পাওয়া যাচ্ছে না।
এই যখন অবস্থা, ফটকের হাত চল্লিশেক দূরে সবার অলক্ষ্যে একটি শিমুল গাছের আড়ালে এসে দাঁড়াল এক অদ্ভুত-দর্শন ধর্নুধর। গোটা শরীর তার সাদা কাপড়ে মোড়া। শুধু চোখ দুটিতে একটু ফাঁক। দিনের আলোতেই যেন এক প্রেতাত্মার আর্বিভাব হয়েছে!
এদিকে বাগানে এবং আশেপাশে অগ্নিগোলক পড়তে শুরু করেছে। গন্ধকের তীব্র ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় হুনসেনাদের অস্বস্তি হচ্ছে তবু সব তুচ্ছ করে তারা কুঠার দিয়ে ফটকের ওপর আঘাত হেনে চলেছে। তারা জানে এ ফটক বেশিক্ষণ টিকবে না।
আচমকা এক কাণ্ড ঘটে গেল। বাগানের গাছগুলিতে বড় বড় মৌচাক ছিল। গন্ধকের ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় চাক ছেড়ে বেরিয়ে এল হাজার হাজার মৌমাছি। ক্রুদ্ধ মৌমাছির ঝাঁক সোজা আক্রমণ করল হুনসেনা আর তাদের ঘোড়াগুলিকে। হুলের যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তারা ফটক ছেড়ে এলোমেলো এদিক-ওদিক ছুটতে লাগল। ছুটে আর কতদূর পালাবে! গাছের আড়াল থেকে অদ্ভুত চেহারার সে নিশানাবাজের তীর এক এক করে হুনসেনাদের ইহলীলা সাঙ্গ করে দিতে লাগল। যারা বাঁচল তারা জলে ঝাঁপ দিল, অবস্থা দেখে ওপারের হুনেরা পরিখা না পেরিয়েই পালিয়ে গেল।
মৌমাছির ঝাঁক অন্যদিকে চলে যেতে অত্রিক কাপড়ের মোড়ক খুলে বেরিয়ে এল। বলল, “যাক – হুন, মৌমাছি দুই-ই গেছে! এতক্ষণে শরীরে খোলা হাওয়া লাগল!”
দুর্গের সৈন্যদল এবারে বাইরে এসে ফটক সুরক্ষিত করল। তবে দেখা গেল হুনদের তীর এবং বল্লমের আঘাতে কিছু রক্ষী হতাহত হয়েছে।
এদিকে হুনসেনাপতি চিংকা হাজার দুয়েক সেনা নিয়ে ঈশানগড়ের দিকে আসছিল, মহারাজার সেনারা খবর পেয়ে তৈরি ছিল। পথেই হুনদের বাধা দিয়েছে এবং বল্লমের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছে চিংকা।
সব শুনে ব্রজগুপ্ত বললেন, “মনে হচ্ছে, দেশে হুন-সন্ত্রাস শেষ হাবার মুখে।”
ললিতসিংহের নির্দেশে দুর্গ থেকে কিছুদূরে বিশাল গর্ত খনন করে মৃত হুনসেনা ও ঘোড়াগুলিকে সমাধিস্থ করা হলো। যে রক্ষীরা প্রাণ হারিয়েছিল, তাদের সৎকার করা হলো সম্মানের সঙ্গে। চিতার অগ্নিশিখা বেয়ে তাদের দেশভক্ত আত্মা পাড়ি দিল স্বর্গলোকে।
আরও দুদিন কেটে গেছে। দুর্গের অলিন্দে পায়চারি করছিল অত্রিক। কত কী ঘটে গেল এই কদিনে। অত্রিকের দৃষ্টি বড় তীক্ষ্ণ – হঠাৎ সে থমকে দাঁড়াল। দুর্গের পেছন দিকে ঝোপঝাড়ের ভেতরে ওটা কে? দেখা গেল এক কিশোর হুন, তার বাদামী ঘোড়াটির গলায় হাত বুলোচ্ছে। অত্রিক মনে মনে বলল – শয়তানটা এ দুটো দিন কোনোরকমে লুকিয়ে ছিল!!
শত্রুর শেষ রাখতে নেই। অত্রিক কিশোরটির মাথা লক্ষ্য করে তীর লাগালো ধনুকে। তীরটি যেই নিক্ষেপ করতে যাবে, ছেলেটি ঠিক তখনই মাথা নামালো। অত্রিককে দেখে নয় – তার ঘোড়াটির পেটে তীরের ক্ষত, ছেলেটি নিজে মুখ লাগিয়ে ক্ষত থেকে পুঁজ আর বিষিয়ে যাওয়া রক্ত টেনে ফেলে দিচ্ছে। অত্রিক নিশানা পালটে তীরটি নিক্ষেপ করতে যাবে, ফের বাধা। কে যেন পেছন থেকে অত্রিকের হাত চেপে ধরল। অত্রিক ঘুরে তাকিয়ে তো অবাক, “আচার্যদেব, আপনি!”
“অত্রিক, তুমি হুন কিশোরটিকে হত্যা করবে না। চল ওর কাছে যাই।”
হুন কিশোরটি পালাবার কোনো চেষ্টা করল না। বজ্রগুপ্ত বললেন, “তোমার নাম?”
“চিনাত্রা। আর আমার ঘোড়া শিপারা। আমি হুন, তোমাদের শত্রু। আমাকে মেরে ফেল। শিপারাকে কিছু কোরো না, সে তো হুন নয়।”
ছেলেটিকে ভালো করে দেখে নিয়ে ব্রজগুপ্ত বললেন, “তোমার দেহে নিষ্ঠুর হুনরক্ত বইছে ঠিকই তবে একটি প্রাণীকে যখন তুমি এতটা ভালবাসতে পারো, তখন সঠিক শিক্ষা পেলে তুমি মানুষকেও ভালবাসতে পারবে। চিনাত্রা, তোমাকে আমরা মারব না। আজ থেকে শিপারাকে নিয়ে তুমি এই দুর্গে থাকবে।”
হুন কিশোরটি তো ভারি অবাক। শিশুকাল থেকেই সে দেখে আসছে শত্রুকে হত্যা করা, বিদেশিদের হত্যা বা বন্দী করাই হুনধর্ম। ভারতের লোকেরা কী ধরনের মানুষ?
এদিকে বলরাম তাদের দেখতে পেয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বলল, “আচার্যদেব, আপনার কাছে আমরা অনেক বিদ্যা শিখেছি, কিন্তু এই মাত্র আপনি যা শেখালেন তা না শিখলে আমাদের শেখা অনেক বাকি থেকে যেত।”
অত্রিক আর বলরাম দুজনে পা ছুঁয়ে প্রণাম করল আচার্যদেবকে । হুনদের মধ্যে এ প্রথা নেই তবু এদের দেখাদেখি হুন বালকটিও তাই-ই করল।
অত্রিকের হাত থেকে তীরটি নিয়ে ব্রজগুপ্ত বললেন, “তীরটি আমি রেখে দিলাম। তোমার এই নিক্ষেপ-না-করা তীরটিই হুনদের বিরুদ্ধে ভারতের বহুশতাব্দী ব্যাপী সংঘর্ষের সমাপ্তিচিহ্ণ হয়ে থাকবে।”