


(১)
“রাতের কবিতা শেষ করে দাও,
এবার ঘুমাও কবি।”
ঘুমাও বললেই কি ঘুম আসে? ব্রেক-আপ। টনটনে বুক। নিশুত রাতের দমচাপা নিঃসঙ্গতা। কিছুক্ষণ বিছানায় ছটফট করে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল বিতান। ব্যস্ত মহানগরের উপকণ্ঠ এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। কয়েকশো মিটার দূরের ধুমসো বহুতলের দু-একটা জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে মূলত নাইট ল্যাম্পের আলো। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ বিতানের চক্ষু চড়কগাছ! ঠিক দেখছে তো? নিশ্চিত হবার জন্য সে ভেতর ঘরে ছুটল, যন্ত্রটা আনতে।
একটু পরে যখন সে শুলো, তার সর্বাঙ্গ থরথরিয়ে কাঁপছে। পৃথিবীটা কি শান্ত হবে না? এভাবেই লাট খেতে থাকবে হিংসার দুষ্টচক্রে? তার মতো মানুষদের চাহিদা তো যৎসামান্য। ছোটরা নিশ্চিন্তে স্কুলে যাবে, মাঠে খেলবে। যুব প্রজন্ম করেকম্মে খাবে। প্রেম নির্ধারিত হবে হিসেবে নয়, হৃদয়ে। আর কবিদের বুকের গভীরতম অনুভূতিগুলি নিঙড়ে আনার সাধনা এলোমেলো হয়ে যাবে না হিংসার ঝোড়ো হাওয়ায়।
ইউটোপিয়া? কে জানে! তবে ঘুম আসতে বোধহয় আরো দেরি হবে। বিতান শুয়ে চোখ বুঁজে ভাবতে লাগল তার সদ্য লেখা অসমাপ্ত কবিতার পঙ্ক্তি:
“কবির প্রিয় রাতের নেশা, মদের চেয়েও চড়া।
তবু যে রাতে ঝোড়ো স্মৃতি দুয়ারে নেড়ে কড়া
উস্কে তোলে প্রেমের ক্ষত অবাধ্য যন্ত্রণায়
শিরায় ছড়ায় তরল আগুন দেহের কোনায় কোনায়
রেহাই নেই একফোঁটাও, অন্ধকারের কারা।
চাতক চোখ চেয়ে কখন ঝরবে আলোর ধারা।”
কখন ভোর হবে? ভাবতে ভাবতে এক সময় বিতানের চোখের পাতা একটু লেগে গেল।
(২)
“এ কোন সকাল,
রাতের চেয়েও অন্ধকার?”
ডোরবেলের কর্কশ আওয়াজে ঘুম ভাঙল। এত সকালে কারো আসার কথা নয়। বিরক্ত চোখে কোনোমতে গায়ে চাদরটা জড়িয়ে বিতান দরজা খুলল। সামনে পুলিশের পোশাক পরা এক বলিষ্ঠ পুরুষ।
“মহারাষ্ট্র পুলিশ। আপনি এই ফ্ল্যাটে থাকেন?”
“হ্যাঁ। কিন্তু –”
“কাল আপনার উল্টোদিকের বিল্ডিংয়ে একটা মার্ডার হয়েছে। রাত দেড়টার সময় আপনি কী করছিলেন?”
বিতানের বুক কেঁপে উঠল। বলল, “কী আবার, ঘুমোচ্ছিলাম।”
লোকটা তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকে মাপছে। হঠাৎ বিতানের মনে হল, সব ঠিক নেই। লোকটা পুলিশ নয়।
“চলুন, ভেতরটা একটু দেখব।”
বিতান দরজা আগলে বলল, “ওয়ারেন্ট?”
“এই যে।”
লোকটা একটা রিভলবার বের করেছে। বিতান ফ্যাকাশে মুখে পিছু হঠছে। হঠাৎ ফুট করে একটা শব্দ আর লোকটা টলতে টলতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। করিডোর দিয়ে দৌড়ে আসছে এক ছিপছিপে পেশাদার। “আর এক সেকেন্ড দেরি হলেই –” এসে সে তাড়াতাড়ি লুটিয়ে পড়া দেহটা উল্টে ভুরু কুঁচকাল। তারপর বিতানের দিকে ফিরে বলল, “ইন্টার-গ্যাং কিসসায় থার্ড পার্টির ইনভলভমেন্ট আমরা পছন্দ করি না। বাট ইন এনি কেস, থ্যাঙ্কস। এবার ব্যাপারটা ভুলে যান।” বলেই সে একটা মোটা খাম বিতানের হাতে ধরিয়ে দিল।
“এখন দেখছি এটাকে কী করা যায়। গাণ্ডু পাণ্ডু সেজেছে, ব্যাজ কোনদিকে লাগাতে হয় জানে না!” পেশাদার এবার এদিকওদিক তাকিয়ে কেউ দেখছে না নিশ্চিত হয়ে তাগড়াই দেহটাকে অনায়াসে ফুট দশেক বয়ে নিয়ে লবির খোলা জানালা দিয়ে আটতলা নিচে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
বিতান ভয় পেতেও ভুলে গেছে। ইতিমধ্যে সে দেখে নিয়েছে, খামটা বড় নোটে ভর্তি। “এই যে।” লোকটা কাছে এলে সে খামটা এগিয়ে ধরে বলল, “রং নাম্বার।”
লোকটা মিষ্টি হেসে বলল, “রাখুন, কাজে দেবে। বুঝতেই পারছেন জায়গাটা গরম হয়ে উঠেছে, কিছুদিন কোথাও ঘুরে আসুন। আর রক্তটক্ত দেখছি বিশেষ পড়েনি, তবু দরজার কাছটা একটু ভালো করে ধুয়ে নেবেন। অ্যালকোহল বা ফর্মালডিহাইড দিয়ে হলে আরো ভালো।”
আমার সঙ্গেই কেন এমন হয়? আমি তো শুধু একটু শান্তিতে থাকতে আর কবিতা লিখতে চাই! উদ্যত অশ্রু দমন করতে করতে ভাবছিল বিতান।
(৩)
“ফিরে যে আসিবে না ভোলো তাহারে,
চাহ তাহার পানে দাঁড়ায়ে যে দ্বারে।”
“আকাঙ্ক্ষা!”
মেয়েটি পেছন ফিরল। তারপর দুষ্টু হেসে বলল, “দেখুন তো, আমি বোধহয় আপনার আকাঙ্ক্ষা নই।”
“সরি!” বিতানের লজ্জায় মাটিতে মিশে যাওয়ার জোগাড়। মেয়েটির সঙ্গে আকাঙ্ক্ষার অনেকটা মিল, তাই স্থানকাল ভুলে চেঁচিয়ে উঠেছিল। অবশ্য আকাঙ্ক্ষা হলেই বা কী, সে তো অতীত!
“নেভার মাইন্ড।” সে হাত বাড়িয়ে দিল, “উর্বশী দেশমুখ, ইন পি-আর।”
“বিতান চক্রবর্তী, ডেটা অ্যানালিস্ট।”
“ও, আপনিই তবে থানে ব্র্যাঞ্চ থেকে নতুন এলেন। তাহলে নিশ্চয়ই প্রায়ই ক্যান্টিনে দেখা হবে। অবশ্য তার কী দরকার, আপনার নাম্বারটা –”
***
সত্যিই, বিতান কপাল করে বস পেয়েছিল! তাদের হাউজিং কমপ্লেক্সে গ্যাং রাইভালরিতে দুটো মার্ডার হওয়ার খবরটা নিউজ চ্যানেলের দৌলতে কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাইরাল হয়েছিল। প্রথম গুণ্ডাটা নাকি গভীর রাতে এক তরুণীকে ভয় দেখিয়ে কিডন্যাপ করার সময় সম্ভবত রাইভাল গ্যাংয়ের দূরপাল্লার বন্দুকের গুলিতে মারা গিয়েছিল। আর দ্বিতীয় জন বোধহয় তার বদলা নিতে আরেকটা বিল্ডিংয়ে গিয়ে নিজেই খুন হয়ে গিয়েছিল। প্রথমে মনে হয়েছিল পালাতে গিয়ে উঁচু থেকে ঝাঁপ দিয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু দেহে নানা ক্ষতচিহ্ন থাকায় মনে হচ্ছে তাকে খুন করে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
ওখানে থাকতে ভয় করছে, ক'দিন ছুটি চাই, বলতেই বস স্বরূপ বললেন, “বেশ। তবে তুমি তো ঝাড়াঝাপটা মানুষ, পুণে যাবে? গ্যাংস্টাররা যখন একবার ঢুকেছে, বদলার খেলা কবে থামবে ঠিক নেই। তুমি কম্পানির দামি অ্যাসেট, ভয়ের রাজ্যে থাকলে তোমার ব্রেন কাজ করবে না।”
সুতরাং বিতান তিনদিনের মধ্যে মালপত্র নিয়ে পুণে এসে সাতদিনের মধ্যে এই ইনফোটেক পার্ক ব্র্যাঞ্চে জয়েন করেছে। থানের ফ্ল্যাটে সত্যিকারের পুলিশ একবার এসেছিল, তবে মামুলি জিজ্ঞাসাবাদ সেরে চলে গেছে। হিস্ট্রি-শিটাররা নিজেরা মারামারি করে মরলে পুলিশের দায় পড়েছে তাই নিয়ে বেশি খুঁড়তে!
বিতানের আরো সৌভাগ্য, তার বৃহত্তর পরিবার সচ্ছল হওয়ায় তাকে আর্থিক বিষয়ে বিশেষ ভাবতে হয় না। অতীতে চাকরিটাকে অধিকন্তু ধরে কাব্যচর্চা চালিয়ে যেতে পেরেছে। এখন আবার পুণেয় এসেই পিজিতে না গিয়ে ডিপোজিট দিয়ে ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে পারছে।
***
বিতানের পুণের জীবন তরতরিয়ে এগিয়ে চলেছে। থানের আতঙ্ক বিস্মৃতপ্রায় দুঃস্বপ্ন। কাজ এখানে মোটামুটি মসৃণ গতিতেই এগোচ্ছে। আর ‘আইসিং অন দ্য কেক’ হচ্ছে উর্বশীর কমনীয় উপস্থিতি।
ক্যান্টিনে প্রায়ই দেখা হয়। উর্বশীই সাধারণত উঠে এসে নিঃসঙ্গ বিতানের টেবিলে বসে। গল্প করে, বাড়ির বিষয়ে জানতে চায়। হঠাৎ একদিন বলল, “আকাঙ্ক্ষা কে?”
বিতানের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। বলল, “সে অতীত। প্লিজ, তার কথা আর জিগ্যেস কোরো না।”
“ভেরি সরি।” সত্যিই সে আর আকাঙ্ক্ষার নাম নেয়নি।
আবার একদিন বলল, “তোমার ফ্ল্যাটে আমায় যেতে বলবে না?”
অপ্রস্তুত বিতান বলল, “ফ্ল্যাট মানে, ওটা তো বেচেলরস ডেন। ওখানে কি একজন ভদ্রমহিলাকে হুট করে আসতে বলা যায়?”
“গিয়ে দেখব যত্রতত্র দারুর খালি বোতল, সেই ভয়?”
“সরি, আমি টী-টোটালার।”
“তবে আর কী? অন্তত বার্থ-ডেতে তো বলবে?”
“বেশ, বলব। কিন্তু তুমি থাকো কোথায়?”
“উওমেনস হস্টেলে, তোমার কাছাকাছিই। আমার বাড়ি বিড় ডিস্ট্রিক্টে, এখান থেকে দুশো কিলোমিটার দূরে।”
“আমি কোথায় থাকি জানলে কীভাবে?”
“ভুলে যেও না, আমি এইচ-আরে।”
এরপর উর্বশী একদিন হঠাৎ জিগ্যেস করল, “সারাদিন তো দেখি এত ব্যস্ত, করোটা কী?”
“সে অনেক কাজ, নইলে কি কম্পানি শুধুমুধু এতগুলো টাকা দেয়?”
“তুমি তো ডেটা অ্যানালিস্ট। কাজটা এগজ্যাক্টলি কী? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। একটু সোজা করে বুঝিয়ে দেওয়া যায় না?”
“নিশ্চয়ই যায়।” বিতান তার কাজের বহিরঙ্গ সম্বন্ধে যথাসাধ্য বলে গেল। উর্বশীর কৌতূহলের গভীরতাও ক্রমশ বাড়তে লাগল।
কেমন খটকা লাগছে। বিতান একদিন প্রাক্তন বসকে মেসেজ পাঠাল, “উর্বশী দেশমুখ। পুণে ইউনিটের এইচ-আরে আছে। সেক্স বম্ব। একটু পতা লাগাবেন?”
ক'দিন পর স্বরূপের হট লাইনে কল, “চিন্তা কোরো না, শি ইজ পারফেক্টলি ক্লিন। মফস্বলের মেয়ে। তবে ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো আর স্ট্রং রেকো নিয়ে ঢুকেছে।”
“কিন্তু আমার কাজ সম্বন্ধে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চায়।”
“স্রেফ মেয়েলি কৌতূহল। ও নিয়ে ভেবো না। তুমি একবার আভাসে বলেছিলে তোমার কিছু একটা অতীত আছে। কিন্তু স্মৃতিভারাক্রান্ত হয়ে যে কাছে আসতে চাইছে তাকে দূরে ঠেলো না।”
“থ্যাঙ্ক ইউ, বস।” চিন্তিত মুখে বিতান হ্যাং-অফ করল।
***
সন্ধেবেলা। বিতান সবে অফিস থেকে ফিরেছে, ডোরবেল বাজল। খুলে দেখল, কতগুলো প্যাকেট হাতে হাস্যমুখী উর্বশী।
“হ্যাপি বার্থডে!”
“জানলে কীভাবে?”
“কথা দিয়ে ফাঁকি দেবার মতলব? ভুলে যেও না, আমি এইচ-আরে।”
উর্বশী নিয়ে এসেছে একটা ছোট্ট কেক, কিছু প্যাকড ডিনার আর গিফট হিসেবে একটা লাল টি-শার্ট।
“এটা মনে হয় তোমাকে খুব মানাবে। আর আমাদের গাঁউটি খানা তো তোমার মতো রইস আদমির মুখে রুচবে না, তাই একটু চাইনিজ।”
“মেনি থ্যাঙ্কস। কিন্তু সব তুমি করলে আর আমি?”
“তুমি – একটু কফি খাওয়াবে?”
“মাই প্লেজার।” বিতান কিচেনে দৌড়োল। একটু পর সে কফির কাপ দুটো নামিয়ে রাখলে উর্বশী বলল, “আমি কিন্তু মরাঠি মুলগি, চা-কফিতে চিনি একটু বেশি খাই।”
“এক মিনিট।” বিতান কিচেনে গেল চিনি আনতে।
এক মিনিট পরেই কিচেন থেকে ফিরতে ফিরতে বিতান দেখল, উর্বশীর হাত ঝট করে কফি কাপের ওপর থেকে সরে গেল। বিতান তার উল্টোদিকে বসলে সে ঠোঁটে রহস্য ফুটিয়ে বলল, “তোমার যখন অ্যালকোহল চলে না, এসো কফিতেই টোস্ট করা যাক।”
বিতানও হেসে বলল, “শিওর। তবে তুমি নিজের হাতে তুলে দিলে আমি অ্যালকোহল কেন, বিষও পান করতে রাজি।”
উর্বশীর মুখ এক মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তারপর প্রায় হিস্টিরিক হয়ে বলল, “হ্যাঁ, আমি কফিতে কিছু মিশিয়েছি – তবে বিষ নয়, ভায়াগ্রা। দেখতে তো মাকাল ফল। কিন্তু তুমি আমার দেখা প্রথম পুরুষ, যার আমার সামনে বসলে ইরেকশন হয় না। তুমি কি গে, না ইমপোটেন্ট?”
“কোনোটাই নই। আমার ভায়াগ্রাও লাগে না।” বিতান উর্বশীকে গভীর আলিঙ্গনে বাঁধল। ছদ্ম প্রতিরোধ অগ্রাহ্য করে তাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে গেল বিছানায়। যখন সে সঙ্গিনীর শেষ আবরণটুকু উন্মোচিত করল, ততক্ষণে নারীদেহ থেকে উগ্র কামনার গন্ধ বেরোতে শুরু করেছে। গভীরে ডুব দিতে দিতে বিতান ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করল, “আকাঙ্ক্ষা, মাই ডিজায়ার!”
খেলা শেষে কিছুক্ষণ বুঁদ হয়ে থাকার পর উর্বশীর প্রথম সচকিত প্রশ্ন, “আমার নেকলেস?”
বিতান মৃদু হেসে বলল, “খুলে তো মাথার কাছের টেবিলে রাখলে, ওখানেই আছে। আমি অবশ্য হাত বাড়িয়ে পেন্ডেন্টের ভেতরকার খুদে সুইচটা অফ করে দিয়েছি। ভিডিওটা বোধহয় উঠল না।”
উর্বশীর মুখচোখ মুহূর্তে হিংস্র হয়ে উঠল। নগ্নিকার চুলে হাত বুলোতে বুলোতে বিতান বলল, “সব বুঝেও কিন্তু আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছিলাম। তুমি আমার বুকের ক্ষতে শান্তির প্রলেপ হয়ে এসেছিলে। কারা তোমায় পাঠিয়েছিল জানি না, তবে তারা লোক ভালো নয়। এই ব্যর্থতাটাকে ওরা ভালোভাবে নেবে না। তুমি সাবধানে থেকো। পারো তো কোথাও চলে যেও।”
“কোথায় যাব, আমি কোথায় যাব!” অসহায় কান্নায় ভেঙে পড়ল উর্বশী।
“যাবে? আমরা যদি আজ রাতেই পালিয়ে যাই?”
(৪)
“একদিন ঝড় থেমে যাবে,
পৃথিবী আবার শান্ত হবে।”
দীর্ঘ বাসযাত্রার পর বিতান অওরঙ্গাবাদ পৌঁছেছে। এখানে এক রাত বিশ্রাম নিয়ে আবার যাত্রা জলগাঁও অভিমুখে। তার পরেরটা তার পর।
বাসে উর্বশী তার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছিল। জানালার হাওয়ায় কখন বিতানের চোখদুটো একটু লেগে এসেছিল। উঠে দেখল, বাস ছুটছে কিন্তু উর্বশী পাশে নেই। নেই তার ছোট্ট লাগেজটাও।
ওরা তুলে নিয়ে গেল না তো? ভাবতে ভাবতেই পকেটে খসখস এক টুকরো চিট কাগজ। একটা ক্যাশমেমোর উল্টোদিকে অপটু হাতে আঁকা হার্ট।
না, সে নিজেই নেমে গেছে। এই রুটে আসার পরামর্শ সে-ই দিয়েছিল। নিশ্চয়ই পথের কোথাও তার এক টুকরো ভরসার বন্দর আছে। সেখানেই স্বস্তি খুঁজতে গেছে।
ভালো থাকিস, মেয়ে। আর এই হতভাগ্য একাই তার দুর্ভাগ্যের বোঝা বয়ে চলুক।
***
একটা দিন বিশ্রাম নিয়ে কাল ভোরে আবার যাত্রা। আবার অনিশ্চিতে ভাসা। কিন্তু কেন বারবার তার সঙ্গেই এমনটা হয়? সে তো বেশি কিছু চায়নি। সম্পন্ন পরিবারের ছেলে। মেধাবী ছাত্র, জিম-এনসিসি করা পেটা শরীর। ডিগ্রি কমপ্লিট করে দেশের কোথাও প্রেমিকা আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ঘর বাঁধবে, ব্যস!
কিন্তু হঠাৎ একদিন শুনল আকাঙ্ক্ষা স্বেচ্ছায়, খুশিমনে এক ধনী পরিবারের বৌ হয়েছে। আঘাত পেলেও বিতান ধাক্কাটা সামলে নিচ্ছিল, অন্তত আকাঙ্ক্ষা সুখে আছে ভেবে।
দুর্ভাগ্য, গল্পটা এখানেই শেষ হল না। কিছুদিনের মধ্যে বিতান জানল, আকাঙ্ক্ষার শ্বশুরবাড়ির লোকগুলো শয়তান। বৌটাকে বাপব্যাটা কিছুদিন ছিঁড়েখুঁড়ে খেল। তারপর বোধহয় মেয়েটা প্রাণের দায়ে প্রতিবাদ করতে শুরু করেছিল, হঠাৎ একদিন সে উধাও হয়ে গেল। গয়না চুরি করে পালিয়েছে বলে ওরা পুলিশে ডায়েরি করেছিল। কিন্তু সবাই বলে, ওরা বৌকে হয় খুন করে গুম করে দিয়েছে নয় বেচে দিয়েছে।
লোকে নাকি কর্মফল পরজন্মে পায়। আকাঙ্ক্ষার স্বামী আর শ্বশুর অবশ্য সেটা ইহজন্মেই পেয়েছিল – দুজনেই কিছুদিনের মধ্যেই পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হয়েছিল। স্বামী কোনো কুপল্লীতে যাবার পথে সম্ভবত ক্রিমিনালদের ক্রস ফায়ারে পড়ে গিয়েছিল। আর শ্বশুর ঘটা করে এক মন্দিরে পুজো দিতে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ ‘উঃ’ করে বুক চেপে লুটিয়ে পড়েছিল, আর ওঠেনি।
আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বিতানের কিন্তু বিয়ের পরই কাট-অফ হয়নি। আকাঙ্ক্ষা দু-একবার লুকিয়ে চুরিয়ে ফোন করেছিল, কেঁদে কেঁদে তার দুঃখের কাহিনি জানিয়ে। বিতান বুঝত না কী সান্ত্বনা দেবে। তারপর তো আকাঙ্ক্ষা হারিয়েই গেল।
কিন্তু কেউ জানে না, তারও বেশ কিছুদিন পর যখন বিতান চাকরি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়েছে, হঠাৎ সে আবার আকাঙ্ক্ষার কল পেতে শুরু করেছিল। রাতে বিছানায় যখন ঘুম আসবে কিনা ভাবছে, তখনই আসত আকাঙ্ক্ষার ভিডিও কল। আকাঙ্ক্ষা কিন্তু আর দুঃখের কথা বলত না। সে দুজনের সুন্দর মুহূর্তগুলির স্মৃতিচারণ করত আর ভবিষ্যতের এক স্বপ্নের পৃথিবীর ছবি আঁকত। তারপর বিতানকে ঘুম পাড়িয়ে বিদায় নিত।
সর্বনাশটা হল বিতানের এক ছোট্ট ভুলে। অসাবধানে একদিন তার বাক্সটা খোলা রেখেছিল। কথা বলতে বলতে আকাঙ্ক্ষার নজর গেল সেইদিকে।
“তোমার বাক্সে ওসব কী!” সে দু'চোখ বিস্ফারিত করে বলেছিল, “ছি, ছি, তুমি এই! আমি তোমাকে অন্য রকম জানতাম। তোমার সঙ্গে তবে আর ওদের কী ফারাক রইল?”
আকাঙ্ক্ষা লাইন কাটার আগে বিতান চোখের জলে ভাসতে ভাসতে বারবার বলেছিল, “বিশ্বাস করো আকাঙ্ক্ষা – সব শুধু তোমার জন্য, শুধু তোমাদের জন্য!”
কিন্তু আকাঙ্ক্ষা শোনেনি, আর কোনোদিন ফিরেও আসেনি। এখন তাই বিতানের ঘুম আসতে দেরি হয়। অশান্ত স্নায়ুকে শান্ত করার চেষ্টা করে কবিতা লিখে।
তারপর এতদিন কাটল, বারবার কেন তারই সঙ্গে এমনটা হচ্ছে? কেন সে অনিচ্ছায় একের পর এক অনভিপ্রেত ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে?
***
ডেটা অ্যানালিসিস ছাড়া সে কী কাজ করে সেটা উর্বশীকে বলার উপায় ছিল না। সে ছাড়া সেটা জানেন শুধু সুপার বস স্বরূপ। বিতান প্রতিদ্বন্দ্বী কম্পানিগুলির ইম্পর্টেন্ট অ্যাসেটদের ধ্বংস করে। বিগ ডেটা থেকে মোটামুটি আইডিয়াটা করে নিয়ে সে টার্গেট শর্টলিস্ট করে। তারপর হ্যাকিং প্রভৃতি সৃজনশীল উপায়ে তথ্য জোগাড় করে লিস্টের থেকে নির্বাচিত কয়েকজনের কালা কাজগুলির খবর বেনামে অথরিটিকে পৌঁছে দেয়। কখনো যদি তারা প্রমাণ লোপাট করে থাকে, দরকারে তাদের অ্যাকাউন্টে মিথ্যে প্রমাণ প্ল্যান্ট করে।
বেআইনি? একশোবার। কিন্ত অনৈতিক? আদৌ নয়।
অবশ্য স্বরূপও জানেন না, বিতান তাদের প্রতিই সবচেয়ে নির্মম, যারা কুখ্যাত নারীলাঞ্ছনাকারী কিন্তু উঁচু পজিশনের দাপটে এতদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে। কুকীর্তি ফাঁস হবার পর এবার তারা কঠোর শাস্তি পাবে। কেউ কেউ নাকি অপমানে আত্মঘাতীও হয়েছে।
শুধু তোমাদের জন্য, আকাঙ্ক্ষা!
***
তবে এবার বিতানও ক্লান্ত। স্পষ্টতই, কেউ উর্বশীকে সেট করেছিল বিতানকে মেয়ে কেসে ফাঁসাবার জন্য। বিতানের ভিকটিমদের তরফ থেকে কেউ বদলা নেবার চেষ্টা করতেই পারত। কিন্তু তারা বিতানের কথা জানবে কীভাবে?
একটা সম্ভাবনাই মাথায় আসছে। এমন একজন, যে নিজেও তুখোড় ডেটা অ্যানালিস্ট। যে হয়তো একদিন বিতানের ভিকটিমদের লিস্ট অ্যানালাইজ করে চমকে উঠেছে – সর্বনাশ, এবার যদি উল্টে সে-ই টার্গেট হয়? উর্বশীকে দিয়ে সে প্রথমে বিতানের কাছ থেকে বের করতে চেয়েছিল আশঙ্কাটা সত্যি কিনা। সেটা জানতে না পারলেও সে জুনিয়র কলিগের সঙ্গে বিতানের যৌনসম্পর্কের ভিডিও তুলে সেটা দিয়ে ব্ল্যাকমেল করে তাকে বশে রাখতে চেয়েছিল।
সরি বস, তুমি হেরে গেলে! এসব কাজে এমন এজেন্টকে পাঠাতে হয় যার ব্রেন আছে, মন নেই। তবে গুলিটা যখন প্রথম তুমিই ছুঁড়লে, পরিণতির জন্য বিতানকে দায়ী কোরো না।
অবশ্য ব্যর্থ উর্বশী শেষে বিতানের কাছেই নিজেকে সঁপে দিলেও একটা ব্যাপার বিতানকে ভাবাচ্ছিল। তাই সে উর্বশীকে একটু বসতে বলে বাইরে গিয়েছিল কিছু দরকারি জিনিসপত্র কেনার অছিলায়। বেরিয়ে দেখল যা ভেবেছে, একটু দূরে আড়ালে মোতায়েন উর্বশীর নজরদার। একে কাটাতে না পারলে উর্বশীকে নিয়ে বেরোনো অসম্ভব। তাই সে লোকটাকে কৌশলে তার পেছন পেছন এক অন্ধকার গলিতে ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
সেখান থেকে সে আর বেরোবে না। ভোর হলে এক এঁদো নালার থেকে বডিটা আবিষ্কৃত হলে মিডিয়া মিউনিসিপালিটির মুণ্ডপাত করবে।
ভালো লাগে না। কিন্তু কেন যেন সে বারবার জড়িয়ে যায়!
***
একদিন হিংসার ঝড় থেমে পৃথিবীটা শান্ত হবে। বিতান বোঝে, এই মুহূর্তে সেটা হয়তো সুদূর স্বপ্ন। কিন্তু সে আশায় আশায় আছে এই বিরাট দেশে অন্তত একটা কোণ খুঁজে পাবে, যেখানে কোনো আকাঙ্ক্ষার আর্তনাদ কানে পৌঁছে তার রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দেবে না। যেখানে টুলবক্সেই বন্ধ থাকবে তার টেলিস্কোপিক রাইফেলের পার্টস, ডার্ট গান আর চিহ্ন না রেখে উপে যাওয়া বিষ।
সেখানে যাত্রা সাঙ্গ করে সে নিশ্চিন্তে প্রকৃতির ঘ্রাণ নেবে আর কবিতা লিখবে। সেখানে আকাঙ্ক্ষা আবার প্রতি রাতে এসে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে।
(লিরিক্স কৃতজ্ঞতা: অনিল ভট্টাচার্য, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, কাজি নজরুল ইসলাম ও নচিকেতা চক্রবর্তী।)