


হরিপদর মনমেজাজ আজ সকাল থেকেই ভালো ছিলো না। সকালে উঠে ব্রাশে মাজন লাগাতে গিয়ে প্যাচাৎ করে খানিকটা বাড়তি মাজন বেরিয়ে এল। সবাই জানে টিউব থেকে বেরনো মাজন আর টিউবে ভরা যায় না। তাও হরিপদ চেষ্টা করতেন, কিন্তু মাজনটা থপ করে গিয়ে পড়ল বেসিনের জল বেরনোর জায়গাটায়। কুলকুচি করে এঁটো জলটল ওই গর্তটাতেই ফেলা হয় তো, তাই ওখান থেকে মাজনটা তুলতে গা কেমন করলো। নিজেকে চাট্টি গালি দিতে দিতে কল খুলে দিতে হলো। সক্কাল সক্কাল তিনদিনের মাজন নষ্ট, যত্তসব!
তারপর জলখাবার বানাতে যেতেও বিপত্তি। হরিপদ একা মানুষ, রান্নার ঝক্কি বিশেষ নেই। একজন ছোকরা চাকর আছে ঠিকই, শেখর, সকালে এসে দু'বেলার রান্না করে দিয়ে যায়। কিন্তু মাসের মধ্যে পনেরো দিন তার কামাই লেগেই আছে। আজ দেশের জমির ধান বিক্কিরি হবে, কাল দেশ থেকে জ্যাঠতুতো পিসি আসবে ছানি কাটাতে, পরশু সকালে নিজের চোঁয়া ঢেকুর উঠছে বলে আসবে না, এরকম নানান অজুহাত লেগেই থাকে শেখরের। আজও সে আসেনি। হরিপদ দুধ গ্যাসে চাপিয়ে বাটিতে মুড়ি ঢালছিলেন। ঢালতে ঢালতে কানে এল কাদের বাড়িতে যেন বাজছে, "আ চলকে তুঝে ম্যায় লে কে চলুঁ এক অ্যায়সে গগন কে তলে..."। আহা! আর সঙ্গের বাঁশিটা! কবেকার সব কথা মনে পড়েছে একটু, ব্যস, চড়বড় সরসর হুশশ আওয়াজ, হুঁশ ফিরতে দেখেন দুধ উথলে গ্যাসের ওভেনে পড়ে গামলা আদ্দেক খালি হয়ে গেছে।
"আজ কার মুখ দেখে ঘুম ভেঙেছিল রে বাবা!" বিড়বিড় করতে গিয়ে মনে পড়ল ঘুম ভেঙে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে দেওয়ালঘড়ি আর তার পেছন থেকে মুণ্ডু বের করা টিকটিকি ছাড়া আর কারও মুখদর্শনের চান্স নেই। নিজের মুখ তো মুখ ধোওয়ার আগে দেখেন না তিনি, সেই ছোটবেলায় মা বলেছিলেন ঘুম থেকে উঠেই নিজের মুখ দেখতে নেই, অমঙ্গল হয়, সেকথা হরিপদ মনে রেখেছেন।
"তবে ওই উজবুক টিকটিকিই নষ্টের গোড়া। ব্যাটা আমারই খাবে, আবার আমারই জিনিস নষ্ট করবে! অপয়া রামছাগল কোথাকার!"
টিকটিকিকে রামছাগল বলা কতটা যুক্তিযুক্ত, কিংবা বাড়ির দেওয়ালে বসা পোকামাকড় কেউ ধরে খেলে তাকে 'আমারই খাবে' বলা উচিত কিনা, এসব প্রশ্ন তোলার মতো দ্বিতীয় মানুষ যেহেতু বাড়িতে নেই, কাজেই নির্বিঘ্নে বিড়বিড় করতে করতে হরিপদ দুধমুড়িকলা সাবাড় করে নাকে কানে ব্রহ্মতালুতে নাভিতে সরষের তেল ঘষে নাইতে গেলেন। বেশি দেরি হওয়ার জো নেই, বাদুড়ঝোলা হওয়া কিংবা লেডিস সিটের সামনে দাঁড়ানো কোনোটাই তিনি পছন্দ করেন না। একা মানুষ, একটু আরামেই যদি না থাকলেন! তাই তিনি চানটান সেরে সেজেগুজে সময় থাকতে বেরিয়ে বাসস্টপে মিনিট পনেরো দাঁড়িয়ে একটা ফাঁকা বাস দেখে উঠে জানলার ধারে বসে পড়েন। তারপর কনডাক্টরকে ডেকে বাসভাড়া দিয়ে জানলার দিকে মুখ ফেরান। ব্যস, তারপর বাকি রাস্তাটা তিনি কার আর কে যে তাঁর!
হ্যাঁ, লালবাজার চত্বরে একখানা দাঁত বের করা বিল্ডিংয়ের তিনতলায় ঝাঝারিয়াদের রিয়েল এস্টেটের আপিসের পাতি কেরানি হরিপদ নন্দীর জীবনের হাতেগোনা বিলাসিতাগুলোর মধ্যে একটা হল এইটা। আপিস যাওয়া আর ফেরার সময় বাসে জানলার ধারে সিট না পেলে তিনি সে বাসে ওঠেন না। এর জন্য অন্তত ঘণ্টাখানেক সময় বেশি লাগে তাঁর। ওতে কিছু আসে যায় না। আর, এই যে জানলার ধারে বসে শহরের হাওয়া মাখতে মাখতে, শহরটার ছবি চাখতে চাখতে বাসজার্নি, এই সময়ে কেউ গায়ে পড়ে কথা বলতে এলে তিনি বড় বিরক্ত হন। পাছে কেউ পাশে বসতে এসে "ও দাদা একটু চেপে বসুন" বলে হেঁকে ওঠে, সেই ভয়ে তিনি আগে থেকেই জানলার সঙ্গে সিঁটিয়ে গিয়ে বসেন। এই যাওয়া আসার সময়টুকু তাঁর একেবারেই নিজের, ওতে কোনও ভাগাভাগি নেই। তা, লোকে সেকথা বুঝলে তো! হ্যালহ্যাল করে আলাপ জমাতে আসা কিছু পাবলিক আছে, একা মানুষ দেখলেই তারা আলাপের ছুতো খোঁজে। এখন যেমন, সারাদিন আপিসে বড়াসাবের দাঁতখিঁচুনি দেখার পর, ফেরার সময় জানলায় গা এলিয়ে বেশ সাহেবের গুষ্টির তুষ্টি করছিলেন, ধর্মতলা থেকে বাসে উঠলো এক কোলকুঁজো ছোকরা। এই হাফসন্ধেতেও মাথায় টুপি, তাতে আবার ময়ূরপুচ্ছের ছাপ মারা। গায়ে একখানা নীলচে বেগনি শার্ট। বসবি তো বস, হরিপদর পাশেই এসে বসলো। কোলকুঁজো চেহারা দেখেই তাঁর বিরক্ত লেগেছিল, এই বয়সের ছেলেপুলে, বুক চিতিয়ে হাঁটবে, তা না, সর্বক্ষণ ঘাড় নিচু করে ফোন ঘেঁটে ঘেঁটে এদের শিরদাঁড়াটাই গেছে বেঁকে। বসার পর খেয়াল করলেন এরও কানের পাশে কালো যন্তরখানা আটকানো। প্রথমদিকে হরিপদ এমন কানে যন্তরঝোলানো ছেলেমেয়ে দেখলে ভারি দয়ার্দ্র হয়ে পড়তেন। তার ওপর আবার দেখতেন যন্তরঝোলানো ছেলেপুলের দল মাঝেমাঝেই নিজের মনে হেসে উঠছে, নয়তো একা একাই গল্প করছে, যেন ফোনে কথা বলছে। খারাপ লাগতো। আহা রে, বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো, এই বয়সেই কানের দোষ, মাথার দোষ! তারপর একদিন আপিসের দেবপ্রিয়র কাছে শুনলেন ওসব দোষটোষ কিছু নয়, ওই কালো যন্তরটা ফোনের কথা শোনার জিনিস। হাত দিয়ে ফোন ধরা বড় ঝক্কি, তাই কানের পাশে যন্তর আটকে নেয় এরা। তা, এই ছোকরাও ওরকমই। সে এসে বসতেই তিনি জানলার দিকে আরেকটু চেপে গিয়ে জানলার দিকে মুখ ফেরালেন। মনে মনে গজগজ চলছে,
'এই বসলো, একটু বাদেই 'কাকু কদ্দূর যাবেন? উঠেছেন কি শুরু থেকেই?' শুরু করবে। কেন রে ব্যাটা, আমি কদ্দূর যাব তাতে তোর কী?'
"না কাকু, কদ্দূর যাবেন জিজ্ঞেস করব না। নেমে মোড়ের দোকান থেকে দুধ কিনে নেবেন। গজার দোকান বন্ধ, ওর ঠাকুমা মারা গেছেন।"
"ত্-ত্-তুমি কী করে জানলে? ক্-ক্-কে তুমি?"
হরিপদর হার্টটা বোধহয় খুলে হাতে চলে আসবে। গজারা তাঁর পাশের বাড়িতে থাকে, বাড়ির লাগোয়া দোকান, গজার ঠাকুমা মাসতিনেক হলো শয্যাশায়ী। এ হতচ্ছাড়া সেসব জানলো কী করে? দুধ কিনতে হবে তাই বা জানলো কীভাবে?
"ও আমি পারি।"
আবার বিষম খেলেন হরিপদ। মনের কথা বুঝছে কী করে? আরেকটা কথাও মাথায় এল। এ ছোকরা দু'-তিন দিন ধরে নজরদারি চালাচ্ছে না তো তাঁর ওপর? তিনি আলাভোলা মানুষ, নিজের খেয়ালে আপিস যান বাড়ি যান, চান খাওয়া সেরে ঘুম দেন, কেউ পেছনে ফেউয়ের মতো লেগে থাকলেও বোঝার সাধ্যি তাঁর নেই। কিন্তু তাঁর আছেটা কী? লোকে চুরি ডাকাতি করার জন্য নজর রাখে, খবরাখবর নেয়।
ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ল, আরে, মায়ের গয়নাগুলো তো রয়েছে! তিনি একা মানুষ, ওগুলো তাঁর কোনও কাজে লাগেনি, ঠিক করে রেখেছেন ভাগ্নীদুটোকে ভাগাভাগি করে দিয়ে দেবেন। ওদের কাজে লাগবে। নাহ, এখনও না দিয়ে ভুল করেছেন। এই রোববারই বোনের বাড়ি যেতে হবে ওগুলো নিয়ে।
"আরে ধ্যার মশাই! আপনার গয়না কে চায়! আমায় দেখে কি চোর মনে হচ্ছে? ছ্যা ছ্যা, ধরাধামে এসে শেষে চোর অপবাদ নিয়ে ফিরতে হবে! কলি আর কাকে বলে!"
"দেখে আর ক'জনকে চোর মনে হয় বাছা? শান্ত সৌম্য চেহারার লোকজন কি দিনে ডাকাতি করছে না? তোমাদের ওই বড় বড় ইয়েরা, রাতারাতি সাধারণ লোকের টাকা মেরে দিয়ে বিদেশে লুকিয়ে বসে থাকছে। তাদের ক'জনকে চোর চোর দেখতে? তা তোমার মতলবটা কী বলো তো? আমার হাঁড়ির খবর জোগাড় করেছ কেন?"
"জোগাড় করিনি কাকু, খবরাখবর সব আপনি আসে আমার কাছে। আমি অত খবর পেতে চাই না, দুটো দিন নিজের মতো করে কাটাবো বলে এখানে এসেছি। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ঘুরবো, মাঠে ময়দানে হাঁটবো, রাস্তার দোকানে সুজির বিস্কুট দিয়ে চা খাবো, চিকেন ডাকবাংলো দিয়ে ভাত আর মাটন কোর্মা দিয়ে রুটি খাবো, শেষপাতে থাকবে নলেন গুড়ের আইসক্রিম, এসব ভেবে এসেছিলাম। ওখানে তো সারাক্ষণ শশা কলা আর মোহনভোগ খেয়ে মুখে চড়া পড়ে গেল।"
"তোমার বাড়িতে বুঝি নিরিমিষ খায় সবাই?"
"কে জানে কী খায়? আমিষ কোনওদিন চেখে দেখেছে নাকি কেউ, যে তফাত বুঝবে? লোকে যা ফলমূল চালের মণ্ড ধরিয়ে দিয়ে যায়, তাই সোনামুখ করে খেয়ে নেয় সব। ইয়ং জেনারেশন প্রোটেস্ট করলে বলে 'ইম্প্রেশন খারাপ হবে'। আরে ভাই, মনে শান্তি না থাকলে ইম্প্রেশন ভালো করে রাজা হবো?"
"তা বাবা, ডাকবাংলো, ইয়ে, শান্তি পেলে? ময়দানে হাঁটতে পেলে? সকালদিকটায় এলে একটু তাজা হাওয়া পাবে।"
"তাই গেসলাম। ঘোড়ায় চড়া পুলিশের দল এইসান তেড়ে এল, কিছু বলার চান্স পেলাম না। শুরুতে তো ভাবলাম কল্কি ব্যাটা না ডাকতেই হাজির হলো নাকি? তারপর শুনি, না, ব্রিগেড না কী আছে, উটকো লোক তফাৎ যাও তফাৎ যাও। এদের ডিকশনারিতে উটকো লোক কাকে বলে কে জানে! হুড়মুড় করে দৌড়তে গিয়ে বাঁশিটা মাঝখান থেকে গেল হারিয়ে।"
"ওরেবাবা, বাঁশিও বাজানো হয়! এলেমদার ছোকরা হে তুমি! বাঁশিতে তো কলজেয় হেব্বি জোর লাগে। আমিও চেষ্টাচরিত্তির করতাম এককালে, সবার দ্বারা সব হয় না বুঝে ক্ষান্ত দিয়েছিলাম। তবে ভাল্লাগে বড়! হারিয়ে যাচ্ছি মনে হয়। ঝাঝারিয়ার পো কবে জাত তুলে গালাগাল দিলো, কবে হাপবেলার মাইনে কেটে রাখলো, বাঁশি শুনলে ওসব আর মনে থাকে না।"
"তাই, না? ঠিকই বললেন কাকু। আমারও এই যে অ্যাত্তো অ্যাত্তো বেগার খাটা দিনভর, কার ছেলের চাকরি হচ্ছে না, কার মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না, দোষ সব নন্দঘোষের ব্যাটার। শান্তিতে দুটো ডুব অব্দি দিতে দেয় না, জানেন! রেগেমেগে একবার কলকাঠি নেড়ে একজনের মেয়ের চাকরি ঠিক করে তার সাথে একজনের বেকার ছেলের বিয়ে দিয়েছিলাম, তাতেও দেখি থানে এসে মাথা খুঁড়ে মরছে সব। তা, এসবের শেষে সুয্যি পাটে বসলে বাঁশিখানায় ফুঁ দিয়ে সত্যিই বড় আরাম লাগে।"
"তুমি চাকরিবাকরি, বিয়েথা সব ঠিক করে দিতে পারো! কে হে বট তুমি? কাদের আড়কাঠি?" এতক্ষণে হরিপদর মনে একটু সন্দেহ মতন উঁকি দিয়েছে। নইলে এতটা পথ চলে এলেন দিব্যি গপ্প করতে করতে, একটুও চোরছ্যাঁচোড় ফেরেব্বাজ বলে মনে হয়নি ছোকরাকে। প্রথমদিকে খটকা লেগেছিল বটে, কিন্তু ছোঁড়ার কথার তোড়ে তিনি একরকম ভেসেই গিয়েছিলেন। এখন মনে হচ্ছে, নাহ, আজকালকার দিনে এত সহজে কাউকে বিশ্বাস করা ঠিক নয় মোটে। কী ভাগ্যে তিনি তাঁর সুলুকসন্ধান বিশেষ দেননি। তাঁর পৈতৃক ভিটের একতলাটা বেবাক খালি পড়ে রয়েছে, তিনি একজন ভদ্র ভাড়াটে খুঁজছেন ক'মাস ধরে, এসব জানতে পেলে এ ব্যাটাচ্ছেলে হয়তো বলে বসবে, "আমি জমিবাড়ির দালালিও করি কাকা, লাগলে বলবেন"!
"আহ্, কাকু, অত সব নিজের গোপন কথা হাটের মাঝে ভাববেন না একদম। কার ভেতর কে আছে বোঝার সাধ্যি আপনার নেই। আপনি আলাভোলা মানুষ, কোনও তেঁটিয়া দালাল সত্যই মনের কথা বুঝে ফেলে আপনার গলায় ঝুলে পড়লে কী করবেন?"
"ভাববও না! এ আবার কী শাস্তি? খামোখা মনের কথা বুঝে ফেলবেই বা কেন লোকজন?"
"না! খামোখা নয়। কোথায় কোন্ সুবিধেবাদী ধাপ্পাবাজ তলে তলে তপস্যার তেজ জমিয়ে এসব পাওয়ার গেইন করছে, জানেন? তার ওপর ফ্রি ফাণ্ডে বরদানের কেস তো আছেই! মহিষাসুরের কেসটাই ধরুন না, বড়দার কী দরকার ছিলো হাত উপুড় করে ওর'ম একটা বর দেওয়ার? তোয়াজ পেয়ে গলে গেছ, বর দেবে, ভালো কথা, রয়েসয়ে দাও! ওই এক বরের জন্য কত্ত ঝকমারি রে ভাই!"
এসব শুনে হরিপদর মনে হলো তিনি এতক্ষণ ভুল ভাবছিলেন। ফেরেব্বাজ নয়, ছোকরার হয় মাথার দোষ আছে, নয়তো ব্যাটা পাতাখোর।
"উঁহু, পাতা নয়, পাতা নয়, ওটা ভোলাদার ডিপার্টমেন্ট। ওসব আমি টাচ করি না। মাখন আর বাঁশি, এতেই আমার মুখে ফোটে হাসি।"
"পাতা ছোঁও না তো এসব গাঁজাখুরি গপ্প শোনাচ্ছ কেন? বরদান, তপস্যা এসব তো পুরাণের গপ্পকথা। আজকালকার দিনে আবার কে কবে এসব করে? আর তুমি মনের কথা কীকরে বুঝছ বলো তো? ধ্যানে ট্যানে বসো নাকি রোজ? মন্ত্র কিছু আছে, নাকি এমনিই চোখ বুজে বসে থাকতে হয়?"
লোকের মনের কথা বোঝার বিদ্যে রপ্ত করলে বেশ হয়, মনে মনে ভাবেন হরিপদ। ঝাঝারিয়ার গুষ্টির চোটপাটের খানিক আগাম আঁচ পাওয়া যায় তাহলে। মাইনে বাড়ার কেসটারও হালচাল বোঝা যায়। গত পাঁচ বছরে এক পয়সা বাড়ায়নি ব্যাটারা। শেখর টু সব্জিওয়ালা সবাই তাঁর গলায় গামছা নিংড়ে ইনক্রিমেণ্ট আদায় করছে, তিনিই কেবল গামছা নিংড়ানোর জোরটা পাচ্ছেন না।
"তবে তাই হোক। তথাস্তু!"
"অ্যাঁ? যাত্রাটাত্রাও করা হয় নাকি? সর্বগুণে গুণান্বিত যে হে তুমি!"
"ইয়ে, মানে, একটু ঘোর মতো লেগে গেসলো বোধহয়। স্বপ্নের মতো কী যেন একটা..."
আমতা আমতা করছে কেন এ? স্বপ্নে যাত্রার ডায়লগ দিচ্ছিলো কেন কে জানে? অবশ্য হরিপদ নিজেও তো স্বপ্নে ফিলাডেলফিয়া যান ওয়ার্ল্ড ফিলাটেলিস্টস' মিট অ্যাটেণ্ড করতে। স্বপ্নের দোষ ধরলে চলে না।
অনেকক্ষণ পর জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন হরিপদ। আরে, নামার সময় হয়ে এল তো! আজ সময়টা বেশ কাটলো। রোজ বাসজার্নিতে শহরের সঙ্গ পান, আজ একটা মানুষের সঙ্গও মন্দ লাগলো না। হরিপদ ঠিক করলেন এবার থেকে পাশের সিটে বসা মানুষজনের সঙ্গেও অল্পবিস্তর আলাপ জমাবেন। আলাপ জিনিসটা খুব খারাপ নয়!
ছেলেটা কোথায় থাকে জিজ্ঞেস করতে মুখ ফেরালেন তিনি। ও মা, নামলো কখন? এক্ষুনি তো বসে ছিলো এখানেই। আশ্চর্য! নামার আগে একবার বলে অব্দি গেল না। খারাপ লাগলো হরিপদর। এক্ষুনি মানুষের সঙ্গে আলাপ জমানোর সুফল নিয়ে নিজেকে যেসব জ্ঞান দিচ্ছিলেন সেসব উইথড্র করে নিতে ইচ্ছে করলো। খেজুরে আলাপী মানুষজনের এই তো ভদ্রতার নমুনা! এতখানি পথ সঙ্গে এলি কথা বলতে বলতে, নামার আগে বলে যাবি না!
বাসস্টপ এসে গেছে। মনে মনে গজগজ করতে করতে উঠে দাঁড়াচ্ছেন, ঠক করে পায়ের নিচে কী একটা পড়লো। কুড়োতে গিয়ে হাঁ হয়ে গেলেন। একটা বাঁশি। বহু বছর হলো এ জিনিস হাতে তোলেননি, তাও বুঝতে ভুল হলো না, যথেষ্ট উঁচুদরের জিনিস। কার এটা? ওই ছেলেটার নয় তো? আহা, জিনিসটা কাছেই ছিলো, আর বেচারা ভেবেছে ময়দানে পড়ে গেছে। নামঠিকানা জানেন না, জানা থাকলে বাঁশিটা পৌঁছে দিয়ে আসতেন। সাধের জিনিস হারিয়ে গেলে কেমন লাগে, তিনি হাড়ে হাড়ে জানেন। বাস থেকে নামার আগে কিন্তু কিন্তু করে কনডাক্টরকে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন,
"আমার পাশে ছেলেটা বসেছিল না? নীলচে বেগনি শার্ট, মাথায় পালক ছাপ ফ্যাশানের টুপি, কোথায় নামলো খেয়াল করেছ ভাই? কাছেই নেমেছে, একটু আগেই।"
"বেঁধে, বেঁধে!" মাথার ওপরের দড়িটায় টং টং আওয়াজ তুলে হাঁকলো কনডাক্টর, সেইসঙ্গে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলো ছেলেটাকে সে খেয়াল করেনি।
বাস থেকে নামতে নামতে হরিপদ শুনলেন,
"ভাড়া গুনবো না লোকের মুখ চিনে রাখব? কে কোথায় নাবলো চোখ খুলে দেখতে হবে! লালবাজারের বড়কত্তা এলেন!"
জব্বর একখানা ধ্যাতানি দেবেন বলে কনডাক্টরের মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে গেলেন হরিপদ। সে তো মুখ খোলেনি, কী জানি চিবোচ্ছে কচরমচর। তাহলে?
ভাবার সময় যদিও বিশেষ পাওয়া গেল না, তাঁকে নামিয়ে দিয়েই বাস তীরবেগে দৌড় দিলো। গলিতে ঢুকতে গিয়ে দেখলেন রাস্তা জুড়ে টাটকা খই উড়ে বেড়াচ্ছে।
"ও হরিকা, আজ এখানেই দুধ নিয়ে নাও। গজার ঠাকমা মারা গেছে, দোকান বন্ধ।" মোড়ের শতপথি স্টোর্স থেকে হাঁক পাড়লো সুরেন।
পা দুটো থেমে গেল। পায়ে পায়ে হরিপদ এগোলেন সুরেনের দোকানের দিকে। হাতে বাঁশিটা রয়েই গেছে, ফেরত দেওয়া হলো না। হাত ঘামছে। সুরেনকে শুধোলেন,
"কখন মারা গেছে?"
"এই তো দুপুরের পর। একটু আগেই নিয়ে গেল। তাপুপিসিরা এলো, ওতেই একটু যা দেরি হলো। শুধু দুধ নেবে? নাকি আর কিছু লাগবে? হাফ পাউণ্ড ব্রেড আছে, টাটকা।"
"নাহ্, দুধই দে।" বলেই হরিপদ শুনলেন সুরেনের গলা,
"তা নেবে কেন? ওই গজার দোকানের ছ্যাতলাপড়া রুটিই মুখে রুচবে। আজব টেস্ট পাব্লিকের!"
হাঁকড়ানি দিতে গিয়েও থেমে গেলেন হরিপদ, লাভ নেই। হাঁটা লাগালেন বাড়ির দিকে।
গলিটা একটু অন্ধকার মতো, যেতে যেতে দুজন সাইকেলওয়ালার কাছে 'বুড়োহাবড়ার দল রাতে রাস্তায় বেরোয় কেন?" আর "এ ব্যাটা গাড়ির তলায় গিয়েই মরবে!" শুনতে হলো। যদিও হরিপদ আন্দাজ করতে পারছেন, ছেলেদুটো মুখ বুজেই ছিলো। অন্য সময় হলে তেড়ে গালাগাল দিতেন হয়তো, কিন্তু এখন আর সময় নষ্ট করতে ইচ্ছে করছিল না। এত বছর পর এমন একটা জিনিস হাতে পেয়েছেন, মনে হচ্ছে কতক্ষণে ঘরে ঢুকে দোরতাড়া আটকে বাঁশিটায় ফুঁ দেবেন। আহা, বেড়ে জিনিস ফেলে রেখে গেছে ছোকরা। ম্যাজিকট্যাজিকও জানে বোধহয়। এই তো হরিপদও এখন কেমন সুন্দর লোকের মনের কথা বুঝতে পারছেন! ধ্যান মন্ত্র এসব কিস্যু লাগলোই না। আহা, কাল সকাল অব্দি ম্যাজিক কাজ করলে ঝাঝারিয়ার পো কে আচ্ছা করে টাইট দেওয়া যাবে। আচ্ছা, ছোকরা নামটা যেন কী বললো, নন্দঘোষ?
গল্পের ঠিক এই জায়গাটাতে এসে জোর ঝাঁকুনি খেলেন হরিপদ। সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের সিনের মতো একেকটা ঝলক খেলে যেতে লাগলো মনের মধ্যে। নন্দঘোষ? নাকি তার ব্যাটা? বড়দার বরদান, তাও আবার মহিষাসুর বলে কাকে একটাকে! সাধারণ মানুষে শখ করে ছেলেপুলের নাম মহিষাসুর রাখে কি? আর ভোলাদা না কার যেন ডিপার্টমেন্ট বলছিলো না? মাথায় ময়ূরপুচ্ছ ছাপ টুপি, বাসে বাঁশি ফেলে গেল, ছোকরা কে ছিল?
অজ্ঞান হবো হবো ভাবটাকে অতিকষ্টে আটকালেন হরিপদ। একা মানুষ হাত পা ছড়িয়ে কেতরে পড়ে থাকলে দেখবে কে? তবে সব মিলিয়ে টালমাটাল লাগছে বড্ড। এমন অভিজ্ঞতা তাঁর চোদ্দপুরুষে কারও হয়েছে কি?
"অভিজ্ঞতাটা যে কী, তা-ই বুঝছি না ছাই! কে ছিল ওটা? ধোঁকাবাজ জালিয়াত কেউ? নাকি সত্যিই...? তা-ই বা হয় কী করে? বেবাক গুলিয়ে যাচ্ছে কেমন সব। যাই জল থাবড়াই গিয়ে।"
বাঁশিটাকে যত্ন করে খাটের ওপর শুইয়ে বিড়বিড় করতে করতে বাথরুমে ঢুকলেন হরিপদ নন্দী। ঘড়ির আড়াল থেকে মুখ বাড়িয়ে টিকটিকিটা ডেকে উঠলো, "টিক টিক, ঠিক ঠিক।"
গলা ছেড়ে ডাকলো, নাকি মনে মনে ডাকলো? কে জানে!