


[ খালিদা হুসেন (১৯৩৮ – ২০১৯) পাকিস্তানের জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার। ছয়ের দশকে ‘আদব-এ-লতিফ’ পত্রিকায় ছোটগল্প লিখে লেখালেখির সূচনা। মাঝে এক দশক লেখা থেকে বিরত রইলেও আটের দশক থেকে আবার লিখতে শুরু করেন। তাঁর ছটি গল্পসংগ্রহ এবং একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। উর্দু গল্পকার হিসেবে পাকিস্তানে ইন্তিজ়ার হুসেনের পরে সম্ভবত তিনিই সর্বাধিক পরিচিত।
অনূদিত গল্পটির ইংরেজি অনুবাদ মহম্মদ উমর মেমন সম্পাদিত শ্রেষ্ঠ উর্দু গল্পের ইংরেজি অনুবাদ সংকলনে প্রকাশিত হয়েছিল। উর্দু ভাষায় (মূল গল্পের নাম ‘সওয়ারি’) এ গল্প পড়া যাবে করাচির খালিদ পাবলিকেশনস্ থেকে প্রকাশিত ‘পেহচান’ (پہچان) গল্পসংগ্রহে।]
আমার শহরে পৌঁছোনোর তাড়া ছিল। কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে পুলের ওপর উঠে পড়েছিলাম। দূরে রাভি নদীর কাদামাখা পাড়ে সূর্য ডুবে আসছে, এখন শুধু জ্বলজ্বল করতে থাকা তামার সরু পাতের মত দেখাচ্ছে তাকে। অন্যমনস্কভাবে এক পলক সেই তামার পাতটার দিকে চেয়ে দেখতেই পা দুটো যেন দ্রুত ছুটল। তবে একটু এগিয়েই মনে হল কিছু একটা যেন আমার নজর এড়িয়ে গেল। তাই আবার পেছন ফিরলাম। দেখি তিনটে লোক পুলের রেলিঙের ওপর ঝুঁকে নদীপাড়ের কাদামাটিতে ডুবতে থাকা সূর্যের দিকে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছে। আমিও সূর্যের দিকে ঠাহর করলাম বটে, কিন্তু তেমন দেখবার মত কিছু না পেয়ে চোখ ফেরালাম আবার সেই তিনজনের মুখের দিকে। মুখগুলোর মধ্যে কোথাও মিল না থাকলেও মনে হল একজনই যেন তিন ভাগে ভাগ হয়ে তিনটে লোক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরনের জামাকাপড় গ্রামের বিত্তবান, উঁচু ঘরের মত হলেও জুতোর ওপর ধুলোর আস্তরণ এমন যে মনে হচ্ছিল তারা অনেক মাইল পথ চলার পরেই এখানে পৌঁছেছে। আর এসেছে শুধু এই মুহূর্তেই রাভি নদীর শুকোতে থাকা পাড়ে ডুবতে থাকা সূর্যকে দেখার জন্য। আর এখন, পুলের ওপর দিয়ে অনবরত চলতে থাকা ছোট-বড় গাড়ি আর মানুষের ভিড় সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন ওই তিনজন লাল হতে থাকা নদীপাড়টাকে যেন তন্ময় হয়ে দেখছে। আমি কয়েক মুহূর্ত সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম।
সূর্য এখন সম্পূর্ণ ঢলে পড়েছে, আর আকাশ যেখানে মাটির সঙ্গে মিশেছে, সেখানে গাঢ় লাল রং পড়েছে ছড়িয়ে। হঠাৎই সেই তিনজন এ-ওর মুখের দিকে শান্তভাবে এক পলক চেয়েই একসঙ্গে মাথা নোয়ালো। তারপরে ধীরে ধীরে শহরতলির দিকে পা বাড়াল। আমিও আরও কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে তাদের ক্লান্ত পায়ে চলার দিকে চেয়ে রইলাম। তারপরে শহরে জাগতে থাকা রাতের আওয়াজে সংবিৎ ফিরে এল। অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়তে থাকা নীল ধোঁয়াশার মধ্যে আলোর রোশনাই ঝিকমিক করে উঠছে। আমাকে তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরতে হবে -- মনে পড়তেই দ্রুত পা ফেলে এগোলাম।
পরদিন যখন খটখটে নদীর পুলের ওপর দিয়ে চলেছি, তখনও সূর্য ডোবার দেরি আছে। সূর্যের দিকে তাকাতেই ওই তিনজনের কথা মনে পড়ল। আর তেমন কোনও মতলব না থাকলেও আমি রেলিঙে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। আবারও মনে হল যে আমার বাড়ি ফেরার তাড়া আছে। মুন্না নিশ্চয়ই এতক্ষণে দেউড়িতে দাঁড়িয়ে গুড়ের পাক দেওয়া রেউড়ির জন্য অপেক্ষা করে আছে। জ়কিয়াও হয়ত সিনেমায় যাবে বলে তৈরি, এসব সত্ত্বেও কয়েক লহমার জন্য সেখানে থেমে গেলাম। সূর্যাস্ত হতে আর দেরি নেই। নদীর পাড় আর তামার পাতের মত অস্তগামী সূর্যের মধ্যে ওই তিনজন অত একাগ্রচিত্তে কী দেখছিল সে চিন্তাই আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।
এবার আলো কমে আসছে। কমলা রঙের থালার মত জ্বলন্ত সূর্য পৃথিবীর দিকে যেন নেমে আসছে। আর ঠিক সূর্যাস্তের আগেই শহরতলি থেকে সেই তিন দেহাতিকে আবার হেঁটে আসতে দেখলাম। মোটামুটি একই উচ্চতার, একই রকম কাপড়জামা পরা -- কাছে আসতে বুঝলাম এদেরই আমি গতদিন সেখানে দেখেছি। তারা তেমনই চুপচাপ এসে পুলের রেলিঙে ঝুঁকে দাঁড়াল -- আর সেই একই রকম মনোযোগ দিয়ে অস্তগামী সূর্যের দিকে চেয়ে রইল। আমিও তাদের একদৃষ্টে দেখছি! তিনজনের চোখই যেন কয়লার মত কালো -- আর দৃষ্টি একই রকম উদাস, বিষণ্ণ। আমি আবার এই ভেবে আশ্চর্য হলাম যে মুখের চেহারা আলাদা হলেও তাদের দেখে একরকম মনে হয়। একজনের বেশ বয়স হয়েছিল, মুখটা ঘন সাদা দাড়িতে প্রায় ঢাকা। দ্বিতীয় জনের গায়ের রং দুই সঙ্গীর তুলনায় ফর্সা। ডুবন্ত সূর্যের আলোয় খাঁটি সোনার মত উজ্জ্বল লাগছিল। তার বড় চুলগুলো ঝালরের মত কাঁধের ওপর পড়েছিল --মাথায় ছিল পুরোনো কোনও চোটের চিহ্ন। তিন নম্বর আগের দুজনের তুলনায় কালো -- তার নাকটাও বড়ই চ্যাপ্টা। আমি খুব মন দিয়ে যখন তাদের দেখছিলাম, ঠিক সেই সময় সূর্যটা ডুবে গেল। তারা তিনজনও আগের দিনের মতই একে অপরের দিকে চেয়ে তেমনই শান্তভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে ফেরার পথ ধরল।
সে রাতেও মন দিয়ে কোনও কাজই করতে পারলাম না। আফশোস হচ্ছিল এই যে লোকগুলোকে জিজ্ঞেসই বা করলাম না কেন যে তারা শুকনো নদীর পাড়ে ডুবতে থাকা সূর্যের মধ্যে কী খুঁজতে আসে? জ়কিয়াকে ওই তিনজনের কথা বলতে সে সব শুনে হেসে চুপ করে গেল, শুধু বলল, ‘আরে, কয়েকজন গ্রামের লোক শহরে দেখতে এসেছে। এ নিয়ে তোমার এত চিন্তা কেন?’
ভাবলাম জ়কিয়া হয়ত ভুল বলেনি। তবে ওই তিনজনকে না দেখলে তো কেউ তাদের মধ্যে যে রহস্য আছে তা অনুভবই করবে না। পরদিন সারাটা দিনই সন্ধের আগমনের প্রতীক্ষায় থেকে সূর্যাস্তের সময় আবার গিয়ে পুলের রেলিঙে ঠেস দিয়ে সেই তিন পাড়াগেঁয়ের অপেক্ষায় রইলাম। আলো কমে আসতেই তারা একইভাবে হাঁটতে হাঁটতে এসে পুলের ওপর ঠিক সেই জায়গায় আবার রেলিঙের ওপর ঝুঁকে দাঁড়াল -- আর আবারও লোকের ভিড়, যাতায়াতের গাড়িঘোড়া আর তাদের আওয়াজ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন থেকে, ডুবতে থাকা সূর্যের দিকে চেয়ে রইল। লোকগুলো এতই মগ্ন হয়ে থাকত যে এগিয়ে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলা একেবারেই অসম্ভব বলে মনে হচ্ছিল। তাই আমি সূর্য পুরো ডুবে যাওয়ার অপেক্ষায় রইলাম, আর ভাবলাম যে তারা ফেরার পথ ধরলে আমি পেছন পেছন গিয়ে জিজ্ঞেস করব, ‘আপনারা কে, অস্তগামী সূর্য, শুকিয়ে যেতে থাকা নদীর তীর আর সন্ধের ওই সময় কীসের খোঁজে আসেন?’
সূর্য পুরোপুরি ডুবে গেলে তিন গ্রামবাসী আবার তেমনই বিষণ্ণভাবে একে অপরের মুখের দিকে একবার ঠাহর করে নিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে নিল। আমি সেই সময়টারই অপেক্ষায় ছিলাম যখন তারা ফেরার পথ ধরবে যাতে আমি তাদের পিছু নিতে পারি। কিন্তু ভীষণ আশ্চর্য হলাম দেখে যে নিজেরা যে পথে এসেছিল সে পথে ফেরার বদলে তারা শহরের সদর এলাকার দিকে যাওয়ার রাস্তা ধরল। পায়ের জুতোগুলোয় ধুলোর আস্তরণ তেমনই জমে, আর প্রথম দিনের মতই একই সঙ্গে তারা পা ফেলে চলেছে।
শেষমেশ আমি সাহস করে এগিয়ে তাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাইরা, তোমরা কোন্ গাঁ থেকে এসেছ?’
চ্যাপ্টা নাকের লোকটা আমার দিকে ফিরে তাকালেও তিনজনই একে অপরের দিকে একবার চেয়ে চুপ করেই রইল।
‘ওখানে পুলের ওপর দাঁড়িয়ে কী দেখছিলে তোমরা?’ এবার তাদের রহস্যের বোঝাটা যেন ধীরে ধীরে আমার ওপর চেপে বসছিল। মনে হচ্ছিল যেন আমার পা দুটোয় -- আমার সারা শরীরেই জ্বলন্ত সিসে ভরা আছে, আর আমি বুঝি যে কোনও সময় মাটিতে লুটিয়ে পড়তে পারি। লোক তিনটে আমার পরের প্রশ্নটার সামনেও দেওয়ালে টাঙানো ছবির মত নিশ্চুপ রইল। এবারে আমি চিৎকার করে উঠলাম -- আমার কণ্ঠস্বর কান্নায় ভারী -- আমার চোখ জলে ভরে উঠেছে – ‘আপনারা ওই সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকেন কেন?’ আমি তাদের পায়ের সঙ্গে পা মেলানোর চেষ্টা করছিলাম কারণ তখন তারা খুবই জোরে হাঁটতে শুরু করেছে। কিন্তু তিনজনের কেউই আমার এই প্রশ্নেরও উত্তর দিল না। কাছেই শহরে যাওয়ার রাস্তার দুদিকেই সওয়ারি নিয়ে গাড়ির যাতায়াত বাড়ছে। ব্যস্ত রাতের আওয়াজ খুব কাছে চলে আসছিল -- বাতাসে অক্টোবরের হালকা শীতের আমেজ। কোথা থেকে যেন চামেলি ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। চুঙ্গি করের গুমটির পাশ দিয়ে যখন যাচ্ছি, তখন হঠাৎই তিনজনের মধ্যে বরফের মত একমাথা পাকা চুলের বয়স্ক লোকটা বলে উঠল, ‘কেন, আপনি কি দেখেননি? এ শহরের কোনও মানুষই কি দেখেনি? কী, আমাদের কী দেখার কথা বলছেন?’ তারপরে তিনি কাঁধের ওপরে চাদরটাকে ঠিক করতে করতে আবার বললেন, ‘যখন সূর্য ডুবতে থাকে আর পুরোপুরি ডুবে যায়...’
তারা আবার চুপ হয়ে যাবে এই ভয়ে আমি খুব তাড়াতাড়ি বলে ফেললাম, ‘সূর্য ডুবতে থাকে, আর একটা সময়ে সম্পূর্ণ ডুবে যায়... এ তো আমরা রোজই দেখি -- বরং বলতে হয় যে আমরা তো এটা দেখার জিনিস বলে মনেই করি না -- আরে সূর্য তো রোজই ডোবে!’
‘আমরা জানতাম যে এমনই হবে, এই জন্যই তো এসেছি। আগের শহরেও এমনই হয়েছে।’ বৃদ্ধ মানুষটি পুবের দিকে ইশারা করলেন, তারপর মাথা নামিয়ে আবার চুপ করে গেলেন।
‘হ্যাঁ, ওই যেখান থেকে আমরা এখানে এসেছি আর কি!’ এবার চ্যাপ্টা নাক মুখ খুলল।
‘কোত্থেকে এসেছেন? আমাকে স্পষ্ট করে বলুন!’
এবারে মাঝের জন আমার দিকে ঘুরে দেখল, তার মাথার আঘাতের চিহ্নটা যেন আগের চেয়েও আরও গভীর বলে মনে হচ্ছিল।
‘আমরা দেখিনি, আর আপনিও দেখেননি... কারণ সূর্য তো রোজই মাথার ওপর চড়ে, আবার ডুবেও যায়। তাই আমরা তাকে দেখি না।’ তারপরে হাত তুলে পুবের দিকে দেখিয়ে সে আবার বলল, ‘তাই সূর্য ডোবার পরে যখন ওই দিকটা প্রথমে লাল, তারপরে গাঢ় রক্তের মত দেখাচ্ছিল, আর তারপরেই রাত গড়িয়ে গেলেও অন্ধকারে সেই লাল যেন আগুনের লেলিহান শিখা, তখনও আমরা কিছুই জানিনি, কোনও খবরই পাইনি। আর তারপর ...’ সে হঠাৎই চুপ মেরে গেল। মনে হল যেন তার গলাটা বুজে এল।
‘ওই লাল রংটা বসতি থেকে বসতিতে ছড়িয়ে পড়ে। অমন রক্তের আভা আমি জীবনে দেখিনি। আমার চেয়ে বড় যাঁরা বা তাঁদের চেয়েও আরও বড়, তাঁরাও কখনও দেখেননি। বড়দের মুখ থেকে কেউ কখনও এমন কোনও ঘটনার কথা শোনেওনি। তারও আগের কথা তো আমাদের জানা নেই।’
একথা শুনে আমি পেছন ফিরে পেছনে ফেলে আসা নদীর ওপরে ছড়িয়ে থাকা আকাশটার দিকে চাইলাম। অন্ধকার তখন আরও গাঢ় হয়েছে, সড়কের ওপর বাতিগুলো টিমটিম করে জ্বলছে, আমার সঙ্গের লোকগুলোর মুখও নজরে আসছে না। শুধু তাদের সাদা জামাকাপড় চোখে পড়ছিল। কোনও বিজলি বাতির থামের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কেবল তাদের মুখগুলো অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। আমি মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম যে সেই অন্ধকারের মধ্যেও আকাশের ওই টুকরোটা যেন আগুনের মত জ্বলছে!
‘হ্যাঁ সত্যিই -- আমরা দেখিনি!’ আমি যে তাদের কথায় অবাক হয়েছি তা ঢাকার চেষ্টা করলাম।
‘তো এখন আপনারা যাচ্ছেন কোথায়?’ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা আমার মুখ থেকে বেরিয়েই গেল।
‘আমরা শহরের দিকেই যাচ্ছি, আরও পরে আর সেখানে গিয়ে লাভটাই বা কী!’
আমার মন চাইছিল ওদের সঙ্গে চলি। আমার ঘরে নিয়ে যাই। কিন্তু তারা হঠাৎই অন্য রাস্তা ধরল, আর আমারও মনে পড়ে গেল যে ঘরে ফেরার তাড়া আছে। মুন্না নিশ্চয়ই দেউড়িতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে রেউড়ি মিলবে এই আশায়। আর জ়কিয়া অবশ্যই প্রতীক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
পরদিন শুকিয়ে যেতে থাকা রাভি নদীর পুলের ওপর আবার দাঁড়ালাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সূর্যকে ডুবতে দেখলাম। সূর্য সম্পূর্ণ অস্ত গেলেও আজ আর সেই তিনজনকে দেখা গেল না। প্রথমে তো মনে কিছুটা অশান্তি নিয়ে তাদের অপেক্ষায় রইলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে ডুবন্ত সূর্যের গাঢ় রক্তবর্ণ আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। আকাশের ওপর কেউ যেন রক্তের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। সে রক্তের চাদরের সামনে একলা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই আমার বড় ভয় হল। আমার পেছনে -- ঠিক পেছনেই -- আমার কাঁধের হাড়ের মাঝখানে কারও অস্তিত্ব যেন টের পেলাম। কেউ একটা দাঁড়িয়ে আছে? আমি তাড়াতাড়ি পেছন ফিরে দেখলাম। কেউ নেই -- কিছু ভুল করলাম কি? আমি পেছন ঘুরে দেখলামই বা কখন? আমি আমার পিঠের দিকটা দেখছিই বা কীভাবে? আমি সত্যিই দেখতে পাচ্ছি না -- আমার পেছনে নিশ্চয়ই কেউ দাঁড়িয়ে আছে! হয়ত আমার ভেতরেই কেউ আছে, অথবা আমার বাইরে আছে।
গাড়িগুলো যাত্রী নিয়ে তাদের গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে। রাস্তার বাতিগুলো কেউ জ্বালিয়ে দিয়েছে। সন্ধে গড়িয়ে রাত ক্রমশ গভীর হচ্ছে। আর ছড়িয়ে পড়া অন্ধকারের মধ্যেও রক্তের চাদরে ঢাকা আকাশের ওই টুকরোটা জ্বলছে। সে আগুনের আঁচ অন্ধকারের মধ্যে দূর থেকে দূরে গিয়ে পৌঁছোচ্ছে। ভীষণ ভয় পেয়ে আমি ঘরের দিকে পালালাম। সেদিন ঘরে পৌঁছেই জ়কিয়াকে পুরো ঘটনাটা বলতে সে তো সেটাকে আমার কল্পনা বলে খুব একচোট হেসে নিল। তখন আমি তাকে বাড়ির ছাদে নিয়ে গেলাম। রাতের অন্ধকারেও আকাশের সেই লাল টুকরোটা ঝলমল করছে! তা দেখে জ়কিয়া যেন একটু চুপ করে গেল। বলল, ‘হয়ত একটা আঁধি ঝড় আসছে।’
পরদিন অফিসে ফাইলের মধ্যে মুখ গুঁজে কাজ করছি, এমন সময় মুজিবুল্লাহ আমাদের আরেক সহকর্মী হাফিজ আহমেদকে বলল, ‘ইয়ার, দেখেছো আজকাল সূর্য ডোবার পরে আকাশটা কেমন লাল হয়ে থাকে? চারদিক গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেলেও আকাশের ওইখানটা কিন্তু গাঢ় লাল!’ কথাটা শুনেই মনে হল যেন আবার একটা রক্তের চাদরের সামনে গিয়ে পড়লাম। ভয়ে ঘামতে শুরু করলাম, তারপরে সময় যতই এগোয় আর সন্ধে আরও কাছে আসতে থাকে, আমার প্রাণটাও ততই যেন ধড়ফড় করতে শুরু করে। আমি ওই শুকিয়ে যেতে থাকা রাভি আর ওই পুল, ওই আকাশ আর সূর্যের কাছ থেকে যেন পালিয়ে যেতে চাই! তাদের ভয়টা যেন আমার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ভয়ের সঙ্গে সঙ্গেই আবার আকাশের রক্তাভ কাদামাটি আর ওই তিন দেহাতির আকর্ষণও যেন আমাকে টানতে থাকে। একবার ভাবলাম সহকর্মীদের ওই তিনটে লোকের কথা বলি, তাদের জানাই যে রক্তাভ সন্ধে নামার সঙ্গে সঙ্গে তারাও এ শহরে আসে, সেই তারা যারা অনেকটা একই রকম! তারাই প্রথম ওই রক্তাভার দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আর আমাকে সেটা দেখানোর পরেই তারা অন্য রাস্তা ধরে শহরের ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়। আমার যেন মনে হচ্ছে তারা ওই লাল রঙের সন্ধের পিছু পিছু শহর থেকে শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তারপরে শহরে অনেক খুঁজলেও কোথাও তাদের আর কোনও চিহ্নই খুঁজে পেলাম না।
তবে মুজিবুল্লাহ আর হাফিজ আহমেদের মধ্যে কেউই আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইত না। বহুদিন আগে দুজনেই কখনও আমার কাছ থেকে দশ-বিশ টাকা ধার নিয়ে আর শোধ দেয়নি। আর তাই হয়ত আমাকে এড়িয়ে চলত। তাই তাদের কিছু আর বললাম না। বাড়ি ফেরার পথে পুলের কাছে পৌঁছে আরও তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করলাম। ডুবন্ত সূর্যটার দিকে একবারও চাইলাম না, বরং শহরে যাওয়ার রাস্তার দিকে নজর ঘোরালাম। তবে এসব সত্ত্বেও, ওই রক্তবর্ণ সন্ধে আমার পিছু ছাড়ল না। সে আমার সঙ্গে সঙ্গে চলে, কখনও আগে, কখনও বা পেছনে নিজেকে ছড়িয়ে দেয়। শ্বাস নিতে নিতে, ঝুঁকে পড়তে পড়তে আমার সঙ্গে যেতে থাকে। আমার সামনে ছড়িয়ে থাকা সন্ধের ফিকে অন্ধকারে দেখি পাঁশুটে আকাশে কালো পাখিরা একেক দলে আটজন করে ভাগ হয়ে আকাশে উড়ছে। তাদের মত আমিও আমার ঠিকানায় ফিরে যাচ্ছি। সেই ঘর যা আজ আর সুরক্ষিত নয়, কারণ ওই রক্তবর্ণ সন্ধেটা জানলা-দরজা এমনকী নিরেট দেওয়ালের মধ্য দিয়েও পথ খুঁজে নিয়ে ঘরে ঢুকছে -- ঘর ভরে যাচ্ছে!
ইদানীং বেশ রাত পর্যন্ত শহরে ঘুরতে থাকি। সব ধরনের দোকানপাটে উঁকি মারি যদি কোথাও সেই ধুলোমাখা জুতো আর সাদা চাদরে ঢাকা দেহাতি লোকগুলোর সন্ধান পাই। তা হলে তাদের জিজ্ঞেস করতে পারি যে ওই রক্তাভা কোত্থেকে আসছে আর আকাশ এমন রক্তিম হলে তারপরে কী হয়? আপনারা সেই শহরটা কেন ছেড়ে এলেন? এখন তার কী অবস্থা জানেন কিছু? কিন্তু ব্যস্ত, মানুষ কিলবিল করতে থাকা শহরে কোথাও তাদের চিহ্নমাত্র দেখা যায় না – বরং অদ্ভুত লাগে শহরবাসী আর সবকিছু সম্পর্কে অচেতন থেকে শুধু কেনাবেচা আর ব্যবসায় কতটা ডুবে থাকতে পারে!
কয়েকটা দিন পরেই অবশ্য এক সন্ধেয় শহরের কিছু লোককে দেখলাম এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পশ্চিম দিকে ছড়িয়ে পড়া লাল আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। জানি না কীভাবে সেই রক্তিম আকাশের খবর কয়েক দিনেই আগুনের মত সারা শহরে ছড়িয়ে গেল। আমি তো জ়কিয়া ছাড়া আর কাউকে ওই লাল আকাশটার খবর দিইনি! তা হলে আর সবাই রক্তবর্ণ আশমানের কথা জানল কী করে? সেই দেহাতি লোকগুলো কি এখনও শহরে আছে তবে?
এবারে সর্বত্র ওই লাল আকাশের চর্চা শুরু হল। চৌধুরী সাহেব ছিল আমার পুরোনো পরিচিতদের একজন। মুজ়াঙ্গের চার মাথার মোড়ে তার একটা বইয়ের দোকান ছিল। সন্ধের দিকে সে দোকানে বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতরা আড্ডা মারতে যায়। কিছুদিন হল আমি ওদিকে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম। আরও সঠিকভাবে বললে ওই তিন দেহাতিকে দেখার পর থেকেই আমার আর ওই বইয়ের দোকানে যাওয়া হয়নি। আর ওই তিনজন গায়েব হওয়ার পরে এখন এক অদ্ভুত উদ্বেগ আমাকে চেপে ধরেছে, ঘরেই থাকি বা বাইরে। ঘরে থাকলে মনে হয় বাইরে যাই আর বাইরে গেলে মনে হয় বাড়িটাই বোধহয় বেশি নিরাপদ ছিল! কোনও ফয়সালাই করতে পারছিলাম না যে কোথায় থাকলে ঠিক হয়। ভীষণ একটা বোঝা যেন আমার মনের ওপর চেপে বসে আছে।
তবুও এক সন্ধ্যায় পুরোনো দিনের মত চৌধুরী সাহেবের কিতাবখানায় গিয়ে পৌঁছোলাম। কিছু পুরোনো, কিছু নতুন লোকের জমায়েত হয়েছিল সেখানে। আমাকে দেখেই চৌধুরী সাহেব বলে উঠলেন, ‘কী ব্যাপার ভাই তোমার? তুমি কী ভাবছ? সবাই তো বলছে এসব আণবিক বিস্ফোরণের প্রভাব। শুনছি যে এখন দুনিয়ার ঠান্ডা অংশটা গরম আর গরম জায়গাগুলো নাকি ঠান্ডা হয়ে যাবে? ঋতুগুলো সব নাকি বদলে যাবে?’
তখন আবার ভাবলাম যে ওই তিন গাঁইয়া মানুষের কাহিনী আড্ডার জমায়েতকে শুনিয়ে দিই। কিন্তু অত লোকের ভিড়ে সত্যি কথা বলতে মন চাইল না। তাই এক কোণে চুপচাপ একটা খবরের কাগজ হাতে নিয়ে বসে রইলাম। আর ঠিক তখনই সেই অশুভ মুহূর্তটা এল।
কোত্থেকে তীব্র একটা দুর্গন্ধ হঠাৎই নাকে এসে লাগল। আজ পর্যন্ত আমার অচেনা এই দুর্গন্ধ, বুকের ভেতর ব্যথা বোধ করলাম। কে জানে কেন শরীরের আরও কোথাও তীব্র এক বেদনা উথলে উঠল যা মিঠে না তেতো আর গন্ধটা সুগন্ধ না দুর্গন্ধ তাও নিশ্চিত বুঝতে পারলাম না। অপ্রীতিকর গন্ধটা পেয়েই খবরের কাগজটা টেবিলের ওপর রেখে উঠে দাঁড়ালাম। সকলে আশ্চর্য হয়ে আমার মুখের দিকে চাইল।
‘কী হল কী, চললেন কোথায়?’ চৌধুরী সাহেব অবাক হয়ে বলল।
‘যাই, জানি না এ কেমন গন্ধ!’ আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
‘গন্ধ? কীসের গন্ধ?’ চৌধুরী সাহেব যেন বাতাস শোঁকার চেষ্টা করল।
আমি তার কথার উত্তর না দিয়েই ঘরের পথ ধরলাম। সারা রাস্তাটা সেই অদ্ভুত অপ্রীতিকর বেদনা আর ভয়ংকর গন্ধটা ঢেউয়ের মত ওঠানামা করতে করতে আমার সঙ্গ নিল। মনে হল যেন মাথা ঘুরে পড়ে যাব। আর পড়ে যাওয়ার আগে চোখের সামনে মানুষ যেমন শুধু নীল আর হলুদ আর ছায়া দেখে, আমিও যেন তেমনই দেখছি।
ঘরে পৌঁছোনোর পর জ়কিয়া তো আমার চেহারা দেখে ঘাবড়ে গেল।
‘কী হল তোমার? শরীর ঠিক আছে তো?’ মুখটা এমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে কেন?’
‘ঠিক আছি। ওই গন্ধটা.........জানি না কেমন।’ আমাকে কপালের ঘাম মুছতে হল, মাসটা নভেম্বর হলেও।
জ়কিয়া হাওয়া শুঁকতে শুঁকতে বলল, ‘এ পাড়ায় রাতদিন কে জানে কী সব ওষুধ তৈরি করে! হাকিম সাহেবের ওখান থেকে তো তারই গন্ধ আসে। আর আজ আবার আমার কড়াইটাও ধরে গিয়েছিল…’
‘কিন্তু এই গন্ধ তো সব জায়গায় -- সব রাস্তায় -- গোটা শহরেই!’
‘ঋতুও তো বদলাচ্ছে, ফুলপাতার গন্ধও তো হতে পারে।’ জ়কিয়া অন্যমনস্কভাবে বলে আবার সেলাইয়ের দিকে মন দিল। এবারে যখন আমি ভয়ে ভয়ে হাওয়া শোঁকার চেষ্টা করলাম, তখন গন্ধটা পেলাম কি না তা যেন ঠিক বুঝতে পারলাম না। হয়ত গন্ধটা চলেই গেছে আর সেটা চলে যেতে আমি খুব খুশি হলেও গন্ধের স্মৃতিটা যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ে না, কোনও আঘাত লাগার পরে জ্বলুনির মত। আর এটা ভেবেও আমার কাঁপুনি আসছে যে গন্ধটা যদি আবার ফিরে আসে!
তবুও অফিসের কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আমি সেই দুর্ঘটনাটার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। আজ আমার সামনে ফাইলের স্তূপ। মুজিবুল্লাহ আর হাফিজ আহমেদ খুব উৎসাহ নিয়ে আর বেশ চেঁচিয়ে কথা বলতে বলতে একটা ফিল্ম নিয়ে এমন আলোচনা করছে যে আমার সামনের কাগজে যা লেখা আছে তা যেন মন থেকে সরাৎ সরাৎ করে পিছলে যাচ্ছে। মনোযোগ দেবার চেষ্টা করতে করতে বিরক্ত হয়ে পড়ায় ঘণ্টির বোতামটা টিপে চাপরাশিকে আধ পট চা আনতে বলে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বার করলাম। কিন্তু সেই মুহূর্তে এমন একটা তীব্র ঝাঁকুনি লাগল যেন খুব উঁচু কোনও জায়গা থেকে পড়ে গেলাম। মাথাটা ঘুরে গেল, আমার চারদিকে যেন নীল আর হলুদ ছায়া ছায়া কীসব ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুটো হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরতেই মনে হল যে আবার সেই ভয়ংকর গন্ধটা পেতে শুরু করেছি। আমাকে কোনওমতে উঠে জানলাগুলো বন্ধ করতে দেখে মুজিবুল্লাহ আর হাফিজ আহমেদ অবাক হয়ে চেয়ে রইল।
‘ভাই, রোদ আসতে দিন! জানলা বন্ধ করছেন কেন?’ হাফিজ আহমেদের সতর্ক ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠস্বর কানে এল।
‘এই যে গন্ধটা... আপনারা পাচ্ছেন না নাকি? এটা তো আর সহ্য করা যাচ্ছে না!’ মুজিবুল্লাহ আর হাফিজ আহমেদ মুখ তুলে হাওয়া শোঁকার চেষ্টা করল, তারপর একটু দ্বিধা নিয়ে হাফিজ বলে উঠল, ‘হ্যাঁ বন্ধু। এটা কেমন গন্ধ? নাকি শুধুই খুশবু? এ তো মন খারাপ করা গন্ধ!’
সেদিন শহরের আরও কয়েকজনকে ওই গন্ধ নিয়ে আলোচনা করতে শুনলাম যা ঢেউয়ের পরে ঢেউয়ের মত আসছে, আবার একসময় থেমেও যাচ্ছে। তারপরে আবার আসছে, আবার থেমে যাচ্ছে। তবে সন্ধের মুখে সূর্যাস্তের সময় গন্ধটা যেন আরও তীব্র হয়ে ঘন ঘন আসতে থাকে। এক সময় সেটা এতটাই বাড়ল যে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওই গন্ধের মধ্যে নিঃশ্বাস নেওয়াই দুষ্কর হয়ে দাঁড়াল। শহরবাসীর উজ্জ্বল মুখগুলো গন্ধের ঢেউ এলেই কেমন ফ্যাকাশে হয়ে ওঠে, অনেকের বদহজম, পেট খারাপ আর বুক ধড়ফড় শুরু হল। ডাক্তারি ব্যবসার রমরমা দেখা গেল, জ্ঞানীগুণীরা বললেন আণবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণে দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গায় নানা কুপ্রভাব পড়ছে। এই অদ্ভুত গন্ধটাও ওই পরীক্ষা-নিরীক্ষারই ফল। এই কারণেই মানুষের স্নায়ুতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই আলোচনার পরেই সব দোকান থেকে স্নায়ুরোগ দূর করার ওষুধ গায়েব হতে শুরু করল। এমন নয় যে দোকানে ওইসব ওষুধ কম মজুত থাকত, তবে নাগরিকদের মধ্যে ওই ধরনের ওষুধ কিনে মজুত করার এমন পাগলামি শুরু হল যে কিছুদিনের মধ্যেই দাওয়াখানায় সাধারণ ঘুমের ওষুধও আর মেলে না।
ওই দুধরনের ওষুধের কোনওটাই অবশ্য কাজ করল না। আমার কাছে ওই ভয়ঙ্কর, বেদনাদায়ক গন্ধটা তরোয়ালের আঘাতের চেয়েও তীব্র বলে মনে হচ্ছিল। সেটা নিশ্চয়ই সকলের শরীরের গভীরেই প্রবেশ করছিল। ভাবলাম সকলকে এই উপদেশ দিই যে তরোয়ালের আঘাতের মত ভয়াবহ এই দুর্গন্ধ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় সহ্য করে নেওয়া, তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, তাকে সইয়ে নেওয়া। ওষুধপত্র কোনওই কাজ করবে না। কিন্তু অদ্ভুত এক অস্থিরতা আমাকে চুপ করিয়ে রাখল। তবে কিছুদিনের মধ্যেই দেখলাম সকলেই ওই পন্থাই অবলম্বন করল।
গন্ধটা ভয়ের অনুভূতিটা সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিল। কেউ নিজে থেকেই ভয় পাওয়ার কথা কবুল না করলেও সকলেই যেন সব সময় কোনও অজানা দুর্ঘটনার আতঙ্কে ভীত, সন্ত্রস্ত। ভয়টা বোধহয় খুব অমূলকও ছিল না কারণ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দুর্ঘটনাটা ঘটে গেল। ডিসেম্বরের মাঝামাঝির কোনও সন্ধে ছিল সেটা। চৌধুরী সাহেবের দোকান থেকে বেরিয়ে ঘরের দিকে চলেছি। চতুর্দিকে যাত্রীবাহী গাড়ি আর মানুষ পিল পিল করছে। দোকানগুলো ঝকমক ঝকমক করছে, নগরবাসী রোজের নানা সমস্যা সামলাতে ব্যস্ত। সেই ভয়ংকর বেদনাদায়ক গন্ধটাও কখনও কখনও আসছে আর যাচ্ছে। আর তখনই আমার মাথাটাও ঘুরছে। আমি দাঁড়িয়ে পড়ি, গন্ধের তরঙ্গটা সরে গেলে আবার চলতে শুরু করি। শহরের সব মানুষই এখন এভাবেই পথ চলে -- যদিও সকলে হয়ত এই বদলটা সম্পর্কে তত ওয়াকিবহাল নয়। শহরের নতুন আগন্তুকরা দেখে অবাক হত যে এখানে নাগরিকরা চলতে ফিরতে, কাজ করতে করতে হঠাৎ থমকে থেমে যায়। এদের কে জানে কী যে হয়, কিছুক্ষণ চোখ বুজে আর দম বন্ধ করে থাকে। তারপর আবার দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। হ্যাঁ, এখন এটাই শহরবাসী সকলের অভ্যেস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সেই সন্ধ্যায় যখন পুলের কাছাকাছি পৌঁছেছি, হঠাৎই মনে হল মাথায় যেন একটা বল্লম এসে বিঁধল। মাথা ঘুরে গেলেও বিজলি বাতির থামটা ধরে ফেলেই বুঝলাম বল্লম তো নয়! আর বল্লম ছোঁড়ার মত কেইবা ছিল সেখানে। আবার সেই তীব্র গন্ধটাই আমার নাকে এসেছে। বর্ণনার অতীত এত তীব্র গন্ধ! ভয় আমাকে এমন স্থবির করে দিল যে মনে হল বুঝি গন্ধটা খুব কাছ থেকে আসছে। সেটা যেন আমার গায়ের কাছে এবার পৌঁছে গেছে। গলার কাছে, আমার কাঁধের হাড়ের ঠিক মাঝখানে, ঘাড় প্রায় ছুঁয়ে ফেলছে -- সেটা যেন ঠিক আমার পেছনেই, এতই কাছে যে তাকে এখন আর আমার থেকে আলাদা বলা যায় না।
হঠাৎই নজর পড়ল সামনে উল্টোদিক থেকে আসা একটা অদ্ভুত গাড়ির ওপর। বিশাল বড় গরুর গাড়িকে সাদা দুটো বলদ টেনে নিয়ে আসছে। বলদগুলোর চোখে কালো ঠুলি, নাকে মোটা মোটা দড়ি লাগানো, তাদের সাদা চামড়ার নিচে পাঁজর আর কোমরের হাড়গুলো হাপরের মত ওঠানামা করছে। নাক থেকে গরম ধোঁয়া বেরোচ্ছে। গাড়িটার চারদিকে লকড়ির বেড়া দিয়ে কালো পর্দায় ঢাকা। পর্দা বলা উচিত হবে না, বরং নড়তে থাকা, কাঁপতে থাকা আঁধারের দেওয়াল বলাই ভালো। সামনের কিছুটা পর্দায় ঢাকা নয়, আর সেই কালো পর্দার বাইরে দুই গাড়োয়ান বসে হাড় জিরজিরে চোখ-ঢাকা বলদ দুটোকে হাঁই হাঁই হেঁকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। অন্ধকারে গাড়োয়ানদের মুখগুলো আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না, তবে তাদেরও পরনে কালো পোশাক। আর গায়ে মাথায় বিবর্ণ চাদর এমনভাবে জড়ানো যে মুখের অর্ধেকটা অদৃশ্য। গাড়োয়ানদের মুখগুলো নিচের দিকে ঝুঁকে আছে, দীর্ঘ ভ্রমণের পরে তারা যেন ঝিমোচ্ছে। তাদের ঠিক পেছনেই সেই কালো পর্দা অথবা দেওয়ালটা দুলছে। পর্দার ভেতরটায় ঘুটঘুটে অন্ধকার। আর সেই নিবিড় আঁধারের মধ্যে থেকেই যেন বেরিয়ে আসছে ভয় আর বেদনা মেশানো গন্ধের ঢেউ যা তরোয়ালের চেয়েও ধারালো। দেখতে দেখতে গাড়িটা আমার পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। আমার মাথাটা ঘুরে গেল, আমি পিচ রাস্তার ধারে গিয়ে বমি করে ফেললাম।
আমি জানি না সে গাড়িটা সেদিন শহরবাসীর চোখে পড়েছিল কিনা -- আর যদি কেউ দেখে থাকে তাহলে তাদের কী হয়েছিল। আমি অনেক কষ্টে ঘরে ফিরেই চারপাইটার ওপর লুটিয়ে পড়লাম। কী হয়েছে তা জানতে জ়কিয়া আমাকে হাজার শুধোলেও অবশ করে দেওয়া একটা ব্যথা যেন আমাকে মুখ খুলতে দিল না।
কয়েকদিন পরে খবরের কাগজে এই মর্মে একটা ছোট খবর বেরোল যে শহরের মিউনিসিপ্যালিটি কর্তব্যে ভীষণ অবহেলা করছে। জঞ্জালে ভরা গাড়িগুলোকে কখনওই শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর ওপর দিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়। তারা বাতাসকে দূষিত করে, শহরবাসীদের পক্ষেও ওই গাড়ির যাতায়াত কষ্টের কারণ হয়ে উঠেছে।
অফিস থেকে সপ্তাহখানেকের ছুটি নেওয়ায় সাত দিন শহরে কী ঘটছে সে সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা ছিল না। তবে কাগজ পড়ে বোঝা যেত যে কালো পর্দায় মোড়া অদ্ভুত গাড়িকে পর্দার আড়ালে জঞ্জাল নিয়ে শহরের নানা রাস্তা দিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। গাড়িগুলোর গাড়োয়ানদের দেখেও আধ-ঘুমন্ত বলে মনে হয়। শহরের প্রান্তিক এলাকা পেরিয়ে এসে তারা মূল শহরে ঢুকে পড়ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে মিউনিসিপ্যালিটির কাছে জনগণের দাবি এই ধরনের বেয়াড়া গাড়ির শহরে প্রবেশ যেন বন্ধ করে দেওয়া হয় অথবা তাদের যাতায়াতের জন্য কম ব্যস্ত রাস্তাগুলোকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় ইত্যাদি ইত্যাদি।
ছুটির পর অবশেষে ঘর থেকে বেরোতেই ঠাহর হল ওই সাত দিনের মধ্যেই শহরবাসী কী আমূল বদলে গেছে। যেদিকেই তাকাই ফ্যাকাশে, নিদ্রাহারা মুখের ভিড়। মানুষের মুখে একটা নিশ্চিন্ত বেপরোয়া ভাব আনার চেষ্টাটা দেখাও বেদনাদায়ক। সকালে আয়নায় দেখা আমার মুখটাও তো এদের থেকে তেমন কিছু আলাদা ছিল না! শহরে হঠাৎই বিনোদনমূলক আলোচনা সভার বাড়বাড়ন্ত দেখা যাচ্ছে, আর সে সভায় শহরবাসীর ভিড়ও চোখে পড়ছে! সময়ের অনেক আগেই উৎসাহী জনতাকে সভাগৃহের দরজায় অপেক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে। আর সভা থেকে বেরিয়ে আসার সময় তাদের মুখগুলো যেন আরও ফ্যাকাশে, আরও হাস্যকর হয়ে উঠছে।
দপ্তরে ফাইলগুলোর দিকে মন দেওয়ার চেষ্টা করা সত্ত্বেও বারবার আমার চোখের সামনে সেই গাড়িটা এসে হাজির হয়। মিউনিসিপ্যালিটির জঞ্জালের গাড়ির ওই চেহারা তো কখনও দেখিনি, তার আধঘুমন্ত গাড়োয়ান, চোখে ঠুলি পরানো হাড় জিরজিরে বলদ দুটো, কালো পর্দার আড়ালের ঘন অন্ধকার আর সেই ভয়ংকর গন্ধ যা নাকে এলে শহরবাসীর বমি আসছে, তাদের মুখগুলো রক্তশূন্য হয়ে উঠছে। তাদের চোখের উজ্জ্বলতা ধুয়ে মুছে যাচ্ছে, আর সেই পর্দায় ঢাকা অন্ধকারটা বারংবার যেন আমার সামনে চলে আসছে। কীসের এমন গন্ধ হতে পারে -- দুর্গন্ধ আর আকর্ষণের এমন মিশ্রণ!
হঠাৎই উন্মাদের মত এক ইচ্ছে এসে আমার গলাটাকে শুকিয়ে দিল। আমি কল্পনায় দেখলাম যে অন্ধের মত ওই গাড়িটার পিছু ধাওয়া করেছি, আর তারপর ভেতরে কী আছে তা দেখার জন্য কালো পর্দাটা সরিয়ে দিয়েছি। আর ভেতরে ... ওই আকর্ষণ আর দুর্গন্ধের উৎসটা খুঁজে বার করার উন্মত্ত আকাঙ্ক্ষা আমাকে আচ্ছন্ন করল। সেই কারণেই বোধহয় আজ আবার রাভি নদীর পুলের কাছে এসে আমার চলার গতি শ্লথ হয়ে গেল। সূর্য ডোবার এখনও কিছুটা দেরি, আর বেদনা ও ভয় মেশানো সেই গন্ধটা আবার যেন ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে। অদ্ভুত এক ভীতি আমাকে গ্রাস করে ফেলল। নদীর কর্দমাক্ত তীরটা যেন আমাকে দুহাত বাড়িয়ে ডাকছে। অনেক স্তর আছে সে তীরের, সব কিছুকে ঢেকে দিতে পারে সে। আমি ওর মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে পড়লে কেমন হয়? ওর মধ্যে ডুবতে থাকা সূর্যের সঙ্গে তবে আমিও তো বিলীন হয়ে যেতে পারি? রক্তবর্ণ ওই চাদর তো তাহলে চিরকালের জন্য আমাকে ঢেকে দিতে পারে?
মনে হল কিছু একটা যেন আমার খুব কাছে এগিয়ে আসছে, অথবা আমি হয়ত কোনও কিছুর খুব কাছে পৌঁছে গেছি। সেই জিনিসটা -- যার জন্য শুধু আমিই নই, আমাদের সকলে -- আমাদের আগে যারা এসেছে আর পরেও যারা আসবে তারাও -- অপেক্ষা করে আছে। আর এই ভাবনা শরীরটাকে যেন পাথরের মত অনড় করে দিল। কিন্তু সেই পুল, নদীর সেই পাড় আর সূর্যের কাছ থেকে কোনও পরিত্রাণ ছিল না। তারা আমার ভেতরে ঢুকে আছে, আমার সঙ্গে আছে। আমি অসহায়ের মত চারিদিকে দেখলাম আর যেন আমার হৃৎপিণ্ডটা বন্ধই হয়ে গেল।
একই রকম চলন এমন তিনজন আমার দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের কাঁধের ওপর সাদা চাদর ফেলা। আমার পাথর হয়ে যাওয়া চোখদুটো দিয়ে আমি তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা কাছাকাছি আসে। তাদের মধ্যে বয়স্ক লোকটার চোখের জল আজ আর বাধা মানছে না। তার সাদা দাড়িগুলো অনবরত ভিজে যাচ্ছে। অন্য দুজনের চোখ নিচের দিকে নামানো, মনে হয় যেন তাদের দাঁতকপাটি লেগেছে, তাদের মুখে যেন মৃত্যুর ফ্যাকাশে রং।
‘আপনারা এতদিন কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিলেন? আর আমি আপনাদের খোঁজ করেই চলেছি! আচ্ছা বলুন তো, আমাদের এই শহরটাতে এটা কী ঘটছে?’ আমি প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে কাঁপা কাঁপা স্বরে বললাম।
‘আমরা অপেক্ষা করছিলাম, নিজেরাই নিজেদের ধরে রেখেছিলাম। বলতে পারেন বেঁধে রেখেছিলাম। এই দেখুন!’
বৃদ্ধ মানুষটি আর তাঁর দুই সঙ্গী তাদের বাহুগুলো আমার সামনে ছড়িয়ে দিল। দেখলাম তাদের কাঁধে, পিঠে আর বাহুতে দড়ি বাঁধার চিহ্ন।
‘আমরা তো এখানে আসতেই চাইছিলাম না।‘ বৃদ্ধ এটুকু বলেই ফুপিয়ে কেঁদে উঠলেন।
‘কিন্তু তাছাড়া আর উপায়ই বা কী ছিল?’ দ্বিতীয় জনের অস্পষ্ট স্বর ভেসে এল। তারপরে হঠাৎই সে নিজের পেটটা ধরে ঝুঁকে পড়ল। দেখলাম যে বাকি দুজনও অসম্ভব যন্ত্রণায় ঝুঁকে আছে। সেই দুঃখ আর বেদনা ভরা গন্ধের ঢেউ তখনও বয়ে চলেছে, তা আমাদের শরীরে যেন কেটে বসছে, আমাদের রক্তে ভিজিয়ে দিচ্ছে, আমাদের শরীরের সব রস শুষে নিচ্ছে।
‘ওই দেখুন!’ বৃদ্ধ হঠাৎই যেদিকে তাঁদের গ্রাম সেদিকে ইশারা করলেন। আর তাদের তিনজনের মুখই আবারও মৃত্যুর মত ফ্যাকাশে হয়ে উঠল। আমি দেখলাম বহু দূরে ধুলোওড়া পথের অস্পষ্টতার মধ্য দিয়ে সেই কালো রঙের গাড়িটার যেন প্রায় অলৌকিক আবির্ভাব ঘটছে। চোখে কালো ঠুলি পরা আর নাকে মোটা রশি বাঁধা সাদা বলদ দুটো, কালো পোশাক পরা ঝিমোতে থাকা দুই গাড়োয়ান, তাদের শরীরে বিবর্ণ শালগুলো এমন ভাবে জড়ানো যে মুখের অর্ধেকটা ঢেকে আছে। তাদের এই প্রায় অজ্ঞান অবস্থা কি কালো পর্দার ভেতরে ওই ব্যথা বেদনা আর কষ্টে ভরা গন্ধটার অত কাছে থাকার জন্য? আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত কাঁপছে! তিন দেহাতির চোখের আলো যেন নিভে গেল, তারা যেন আসন্ন মৃত্যুর উপস্থিতি টের পাচ্ছে। গাড়িটা ধীরে ধীরে আমাদের দিকে যতই এগিয়ে আসছে ততই সেই গন্ধটা যেন আমাদের শরীরে ঢুকে সব রক্ত শুষে নিচ্ছে। গাড়িটা কাছে এল, তারপর আমাদের ছাড়িয়ে চলে গেল। গাড়োয়ানদের মুখগুলো চাদর দিয়ে ঢাকা, পেছনের কালো পর্দাটাও যেন হালকা হাওয়া বইলেও একেবারেই নড়ছে না।
অকস্মাৎ তিন দেহাতি গাড়ির পিছু ধাওয়া করে তিনজনে একসঙ্গে হাত লাগিয়ে কালো পর্দাটা তুলে দিল। পর মুহূর্তেই দেখলাম তারা ভয়ার্ত, হাড় হিম করা চিৎকার জুড়ে পাগলের মত তাদের গ্রামের রাস্তার দিকে দৌড়ে পালিয়ে গেল।
‘আপনারা কী দেখলেন? আরে দেখলেনটা কী?’ আমিও তাদের পেছনে দৌড় লাগালাম। কিন্তু তারা দৌড় থামালো না, তাদের চোখে মুখে অব্যক্ত যন্ত্রণা... ‘বলুন... বলুন...’ আমি তাদের কাছে প্রায় মিনতি জানালাম। কিন্তু তাদের দৌড় থামল না, আর আমিও তাদের পিছু পিছু দৌড়ে শহর থেকে বহু ক্রোশ দূরে যেন চলে এলাম।
‘আমায় বলুন... কিছু বলুন...’ বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত আমি বৃদ্ধ লোকটির চাদরটা নাগালে পেয়ে সেটাকেই পাকড়ে ধরলাম। তিনি যন্ত্রণাক্লিষ্ট চাউনি নিয়ে আমার দিকে একবার তাকিয়ে মুখটা খোলার চেষ্টা করতে আমি দেখলাম তার জিভটা টাগরার সঙ্গে আটকে আছে। তারা তিনজনেই বোবা হয়ে গেছে। আমার মাথা ঘুরে গেল, মাটিতে পড়ে গেলাম। কিন্তু ওই তিনজন দৌড় থামালো না, শেষে আমার দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। কিছুক্ষণ তাদের পেছনে উড়তে থাকা ধুলোর দিকে চেয়ে রইলাম – তারপরে ধুলো থিতিয়ে গেলে আমি কোনও মতে উঠে বাড়ির পথ ধরলাম।
তারপরে বেশ কয়েক মাস ধরে আমি এই তিন দেহাতির খোঁজ চালিয়েছি। কোথাও তাদের চিহ্নমাত্র দেখিনি। আর সেদিনের পর থেকে সেই কালো পর্দা ঢাকা গাড়িটাও নিশ্চয়ই যাতায়াতের পথ বদল করেছিল। সে বোধহয় আর শহরের মধ্যে ঢোকে না। পুল পেরিয়ে হয়ত কাঁচা রাস্তা ধরে। তারপরে হয়ত শহরপ্রান্তের বসতি এলাকায় ঢুকে যায়। শহরবাসীও সেই দুঃখ আর যন্ত্রণা ভরা গন্ধটায় এমনই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে সেই অনুভূতিটা হয়ত আর তাদের স্পর্শ করে না। মনে হয় তারা ভাবে যে তরোয়ালের মত ধারালো সে গন্ধটা মরে গেছে। ভুলে যাওয়া কোনও গল্পের মত। কিন্তু আমি এখনও টের পাই সেটা আমার শরীরে কেটে বসছে, আর কেউ যেন দিনরাত আমার মনের ভেতরে বলে চলে, ‘এবার তোমাদের পালা। এবার তোমাদের দেখতে হবে।’
আজ আমি আবার সেই পুলের ওপর এসে দাঁড়িয়েছি, সেই শকটের অপেক্ষায়।