• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০১ | জানুয়ারি ২০২৬ | উপন্যাস
    Share
  • অপ্রতিহতা (১) : শিবানী ভট্টাচার্য দে

    লেখকের কথা

    কলহনের ‘রাজতরঙ্গিণী’ ইতিহাসকাব্যে ধারাবাহিকভাবে চারটি রাজবংশের কথা উল্লেখ আছে, এর মধ্যে তৃতীয় রাজবংশের শেষ শাসক হলেন রানি দিদ্দা (জন্মবর্ষ ৯২৪ সাধারণ অব্দ, বৈধব্য ৫৫৮ অব্দ, শাসনকাল ৫৫৮- ৯৮০ অব্দ, পুত্রের অভিভাবকরূপে, নিজে সিংহাসনাসীন স্বাধীন শাসক রূপে ৯৮০-১০০৩ অব্দ, আমৃত্যু।) এঁর ইতিহাস আছে রাজতরঙ্গিণীর ষষ্ঠ তরঙ্গের (শ্লোক ১৩৬-৩৬৮) শেষ অবধি। এই ঐতিহাসিক কথা অবলম্বন করে আমি ‘অপ্রতিহতা’ উপন্যাসিকা লিখতে চেষ্টা করেছি। দিদ্দা কাশ্মীরের ইতিহাসেই শুধু নয়, সমগ্র প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাসে অনন্যা। তুর্ক-আফগান বংশ থেকে মুঘল বংশ পর্যন্ত মুসলিম-শাসিত ভারতে মাত্র একজনই মহিলা সিংহাসনে বসে রাজত্ব করেছিলেন— তিনি রাজিয়া সুলতান, তাঁর মাত্র চার বৎসরের রাজত্ব ছিল। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে কোনো কোনো রাজ্যে এরকম দু’একজন শাসক রানির দেখা পাওয়া যায় যাঁরা স্বামীর মৃত্যুর পর অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্রের প্রতিভূ হয়ে রাজ্য চালিয়েছেন, এমন কী যুদ্ধও করেছেন, এবং ছেলে বড় হবার পর তার হাতে শাসনের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে সাতবাহন রাজ্যের দ্বিতীয় সাতকর্ণীর মা নগনিকা বা নয়নিকা (দ্বিতীয় শতাব্দী) এবং কাকতীয় বংশের রানি রুদ্রাম্মা (১২৬২-১২৮৯)-র নাম করা যায়। সহমরণ থেকে উদ্ধার পেয়ে দিদ্দাও বালকপুত্রের অভিভাবিকা হিসেবেই রাজ্যশাসন শুরু করলেন, তখন তিনি অনভিজ্ঞ বিধবা যুবতী, পায়ের সমস্যার কারণে সাবলীল চলাফেরায় সক্ষম নন, তাই তিনি পুতুল শাসক হিসেবেই থাকবেন— সুযোগসন্ধানী প্রতিপক্ষরা এমনি ধারণা করেছিল। তাঁর অভিভাবকত্বে পুত্র অভিমন্যুর রাজত্বের প্রথম দিকেই দুবার তাদের আক্রমণ আসে, দুবারই দিদ্দা কূটনীতি এবং সম্মুখযুদ্ধ— দুটো উপায়েরই সফল প্রয়োগে শত্রুর আক্রমণ সামলে ওঠেন এবং কঠোর হাতে বিদ্রোহ দমন করেন। তাঁর কূটনীতির স্বাভাবিক বোধ যে অন্যদের তুলনায় যথেষ্ট বেশি, তাঁর চারপাশের লোকে সেটা মানতে পারে না, তাই তিনি ডাইনিবিদ্যার জোরে সব করছেন এমন রটনা বারে বারেই রটে। পুত্রের যক্ষায় অকালমৃত্যুর পর সিংহাসনে অভিষিক্ত দুই পৌত্রও শিশু অবস্থায়ই মারা যায়, নাতিদের মৃত্যুর পেছনে দিদ্দার হাত থাকার উদ্দেশ্য বা প্রমাণ না থাকলেও পরবর্তীকালে রটনা হয় যে দিদ্দাই নাতিদের ডাইনিবিদ্যার জোরে হত্যা করিয়েছেন। এরপর পুত্রবধূর পালিতপুত্র বালক ভীমগুপ্ত রাজা হয় এবং দিদ্দারই অভিভাবকত্বে পাঁচ বছর সিংহাসনে ছিল। একটু বড় হলে সে নিজের গুরুত্ব দেখাতে দিদ্দাকে শাসন করতে শুরু করে, পরিণামে তাকে সিংহাসনচ্যুত করে কারাগারে পাঠানো হয়, এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়। যদ্দূর মনে হয় এই ক্ষেত্রে দিদ্দার সম্মতি থাকতেও পারে। ভীমগুপ্তের পর সিংহাসনের পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকায় দিদ্দা নিজেই সিংহাসনে বসেন এবং পরবর্তী তেইশ বছর স্বাধীন রানি হিসেবে অপ্রতিহত প্রতাপে রাজত্ব করেন। বৃদ্ধবয়সে নিজের ভাইপোদের পরীক্ষা করে তাদের রাজ্য চালানোর উপযোগী কূটনীতিক জ্ঞান আছে কি না দেখে সবচাইতে উপযুক্তকে তাঁর মৃত্যুর পর রাজা করার নির্দেশ দিয়ে যান।

    অমাত্য নির্বাচনেও দিদ্দার বিচক্ষণতা ছিল। নরবাহনকে দিয়ে প্রথম দিকে রাজ্য সামলেছেন, নরবাহনের আত্মহত্যা ও বিদ্রোহীদের দমনের পর যখন রাজ্যে অভিজ্ঞ অমাত্য নেই, তিনি নির্বাসিত ফল্গুনকে রাজ্যের স্বার্থে ফেরত আনেন, এবং তার সহায়তায় শাসন সামলান। ফল্গুনের পর অতি নগণ্য পরিবারের এক লেখহারককে তার কর্মদক্ষতা ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে বেছে নেন অমাত্য পদে। সেই তুঙ্গ তাঁর নিজের রাজত্বের সময় স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা দুই-ই দক্ষভাবে পরিচালনা করেছিল। মূলত তার জন্যই কাশ্মীর রাজ্য আবার দৃঢ ভিত্তিতে ফিরে আসে, এবং তার হাতেই নিজের বেছে রাখা উত্তরাধিকারীর ভার দিয়ে দিদ্দা নিশ্চিন্তে পরিণত বয়সে পরলোকগমন করেন।

    দিদ্দার নিন্দা কবি নিজেও অনেকবার করেছেন। বিমূঢ়ধী- বুদ্ধিহীনা, কারণ যে সব অমাত্যের সঙ্গে মন্ত্রণা করেও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে না, অসতী- যে বহুপুরুষ সংসর্গ করে, দুঃশীলা-- যে অর্থের বিনিময়ে আনুগত্য কেনে, নিষ্ঠুরা, যে অভিচারের প্রয়োগে নিজের বিরোধীদের হত্যা করে এসব বিশেষণ আমরা বারে বারে দেখতে পাই।

    দিদ্দার শাসনের শুরুতেই কবি বলে ফেললেন,

    রক্ষিত্রী ক্ষ্মাপতের্মাতা স্ত্রীস্বভাবাদ্‌বিমূঢ়ধীঃ।

    সারাৎসারবিচারেণ লোলকর্ণী ন পস্পৃশে।। ১৯৩/৬

    (অনুবাদ - রাজার মা অভিভাবক হলেও স্ত্রী-স্বভাবের জন্য বুদ্ধিহীনা এবং সারকথা কানে শুনেও বুঝতে পারতেন না।)

    খানিক পরে আবার--

    উর্বীপতেশ্চ স্ফটিকাশ্মনশ্চ

    শীলোজ্‌ঝিত স্ত্রীহৃদয়স্য চান্তঃ ।

    অসন্নিধানাত্‌ সততস্থিতীনাং

    অন্যোপরাগঃ কুরুতে প্রবেশম্‌।। ২৩৪/৬

    (সঙ্গীর অভাবে নৃপতির স্ফটিক পাথর ও দুঃশীলা নারীর হৃদয় অন্যের রঙে রঞ্জিত হয়, অর্থাৎ কুস্বভাব নারী অন্যের মতামত নির্বিচারে গ্রহণ করে।)

    এমন আরো অনেক নিন্দাবাক্য সত্ত্বেও তাঁর শাসনকালে বিচ্ছিন্নভাবে ছাড়া রাজ্যজুড়ে অশান্তি হয়েছে এমন ঘটনা কিন্তু ঘটতে একবারও দেখা যায় না, যেমন তাঁর আগের এবং পরের একাধিক রাজার সময়ে দেখা যায়। পুরুষদের সঙ্গে কাজ করতে কখনো প্রেমের ছলনা, কখনো কঠোরতা, কখনো দণ্ড যখন যেমন নীতি কার্যকর তিনি অবলম্বন করেছেন ঠিকই। কিন্তু শাসনের কাজটা দিদ্দা ভালই চালিয়েছিলেন বলে ধরে নেওয়াই যায়, তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্র কেমন তা না ধরলেও চলে। এইসব দোষারোপও অনেকটাই পূর্বধারণা সঞ্জাত, প্রমাণহীন এবং নারীশাসকের প্রতি নাসিকাকুঞ্চনের মনোভাব থেকেই বলেই আমাদের ধারণা হয়। সারা ইতিহাসে প্রায় সব রাজাই এধরণের উপায় অবলম্বন করে রাজ্যের শাসন, রক্ষা ও বিস্তার করেছেন, কিন্তু তাঁদের এধরণের লিঙ্গগত বিশেষণে সমালোচনা করা হয়নি। অথচ আমরা দেখি, দিদ্দা তখনকার দেশীয় রাজ্যগুলোর সবচাইতে দীর্ঘকাল শাসনকারীদের অন্যতম, তাঁর মৃত্যুর পরও রাজ্য দৃঢ় ভিত্তির উপর বহুদিন দাঁড়িয়েছিল, এবং পরের রাজবংশ-- লোহর বংশের সূচনা তিনিই করে যান। সবদিক বিবেচনা করে আমার মনে হয়েছে ‘অপ্রতিহতা’ অভিধা এই নারীর চরিত্রের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি খাপ খায়, সেই অনুসারে আখ্যানের নামকরণ হয়েছে।

    এই বিশেষ আখ্যানটি আমাকে এই কারণেই প্রভাবিত করেছিল যে কীভাবে একজন প্রবল শক্তিময়ী নারী সমস্ত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে যোগ্য শাসক হয়ে ওঠেন, অথচ তাঁর শাসননীতি, তাঁর পরিপার্শ্ব এবং সঠিক মানুষ চেনার বিচক্ষণতা ঠিক বিচার পায়নি। এমন কী কবিও দিদ্দাকে তাঁর প্রাপ্য প্রশংসাটুকু দেননি বলেই মনে হয়। আমার লেখায় ঐতিহাসিক তথ্যের অপলাপ না করে যথাসম্ভব এই অপযশ অপনয়নের চেষ্টা করেছি, এইটুকুই।

    আরেকটা কথা। ঐতিহাসিক উপন্যাস বললেই প্রথমেই আমাদের মনে আসে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তিনি নমস্য, তাঁর শতাংশের একাংশ প্রতিভাও আমার থাকলে ধন্য বোধ করতাম। আমার তা নেই। খুব বেশি পড়াশোনাও আমার নেই। নিজের আকাঙ্ক্ষার বইগুলো পেলে অবসরমত পড়ি, আর যা আমাকে আকর্ষণ করে তার সম্পর্কে একটু-আধটু লিখি। মেয়েদের বিষয়গুলো আমাকে বেশি আকর্ষণ করে, এই সমাজে এখনো মেয়েদের কথা এবং ইতিহাস অবহেলিত, যা লেখা হয়েছে তার বেশিরভাগই পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে। নারীর ইতিহাস এবং নারী লেখকের দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা ইতিহাস পুরুষের ইতিহাস এবং পুরুষ লেখকের দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা ইতিহাস থেকে আলাদা হতেই পারে। এটুকু মেনে নিয়ে ক্ষমা করে দিলে নিজেকে ধন্য মনে করব।

    শিবানী ভট্টাচার্য দে

    অপ্রতিহতা

    বিবাহ

    কাশ্মীরখণ্ডে সেবছর ফাল্গুন মাসে নামেই বসন্ত এসেছে। এখনো হিমপতনে দিনের আলো কুহেলির অন্তরালে কখন সন্ধ্যার সঙ্গে মিলে যায় বোঝা যায় না। প্রচণ্ড শীত ও দ্বিগুণ অন্ধকারের বিষণ্ণতা কাটাতে মানুষ ঘরের ভেতরে কাঠের আগুন জ্বালিয়ে তাদের প্রিয়জনের সান্নিধ্যে বসে আছে। কিন্তু রাজপ্রাসাদে সেই একান্ত আনন্দটুকুরও অভাব। কনিষ্ঠা রাজমহিষী এই ভয়ানক শীতে অন্তঃপুরের খোলা গবাক্ষের ধারে বসে আছেন। দাসীকে গবাক্ষের কপাট বন্ধ করতে, আলো জ্বালাতে মানা করেছেন, বলে দিয়েছেন খুব জরুরি সংবাদ নিয়ে কেউ এলে তবেই যেন তাকে তাকে দর্শনকক্ষে বসায়, নইলে কেউ যেন না ঢোকে। মহারাজ ক্ষেমগুপ্ত দুদিন থেকে প্রাসাদে আসেননি।

    ভেজানো কপাট ঠেলে ধীরে ধীরে ঢুকল হংসী। রানির সর্বক্ষণের বিশ্বস্ত দাসী।

    কিছু সংবাদ পেলি? রানি জিগ্যেস করলেন।

    মাথা নিচু করে আছে সে। রানি বুঝলেন, খবর ভাল নয়। বল, কী খবর এনেছিস। আমি দুঃসংবাদ শুনবার জন্য প্রস্তুত। বল, ভয় করিস নে।

    দেবী, বিয়ের আয়োজন চলছে দ্বারপতি ফল্গুনের বাড়িতে। আড়াল থেকে দেখে এলাম, সেখানে সার সার আলো জ্বলেছে, সেই আলোয় আগুনের ধারে পান, ভোজন, নাচ, গানের উষ্ণ আতিথেয়তা চলছে। ফল্গুনের কন্যা চন্দ্রলেখার বিয়ে। মহারাজ সেখানেই বরবেশে --

    রানি বুঝলেন, মহারাজ কোথায় গিয়েছেন এবং কেন, আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

    রাজমহিষী ওষ্ঠাধর দৃঢ়ভাবে চেপে ধরলেন, না, তিনি চোখের জল ফেলবেন না। তাঁর বিয়ের সাত বছর হয়েছে, ছ’বছরের একটি ছেলে, যে এই রাজ্যের উত্তরাধিকারী, তার মা তিনি। এই সেদিনের কথা বলে মনে হয়-- তাঁর বিয়ে ঠিক হবার পর থেকেই দুখানা রাজ্যে মহা ধুমধাম শুরু হয়েছিল। জাঁকজমকপূর্ণ সজ্জায় সজ্জিত ঘোড়া, পালকি, পদাতিকের বিশাল সমারোহের মধ্য দিয়ে তিনি স্বামীর সঙ্গে শ্রীনগরীর রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করেছিলেন। বিয়ের পর স্বামী এমন প্রেমে পড়েছিলেন যে তাঁকে চোখের আড়াল করতে চাইতেন না। রাজপ্রাসাদের দাসী, ধাত্রী ইত্যাদির ছোটখাটো ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তায় প্রথমটা যা শোনা গিয়েছিল, মহারাজ উদ্দাম জীবন যাপন করেন--- সেসব কথা যেন মিথ্যা প্রতিপন্ন হচ্ছিল। রাজসভায় বসবার দায়িত্ব শেষ করে এক সাধারণ গৃহী প্রজার মতই রাজা সেই দিনগুলোতে প্রিয় পত্নীর কাছে ফিরে আসতেন। ছেলের জন্ম হবার পর মহাদেবীর পদবি তাঁকেই দিয়েছিলেন। যদিও তাঁর আগের আরো দুজন মহিষী ছিলেন, তারা দুজনেই অমাত্যকন্যা, একজন আবার রাজবংশীয়া, তবে রাজার মেয়ে নন, এবং তাদের কারো আগে ছেলে হয়নি, এগুলো কারণ ছিল বটে, তবে রাজার ইচ্ছাও নিয়মকে প্রভাবিত করেছিল। লোহর রাজ্যের রাজকুমারী কাশ্মীরের কনিষ্ঠা রাজমহিষী হয়ে রাজ্যের জন্য উত্তরাধিকারীর জন্ম দিলেন, প্রথম পুত্রের জন্ম হওয়ায় রাজা নিজেকে সৌভাগ্যশালী জ্ঞান করলেন। সেই সময়ে রাজ্যে একপ্রকার মুদ্রা পর্যন্ত প্রচলন করা হয়েছিল যার উপরে ‘দি ক্ষেমগুপ্ত’ নাম খোদিত থাকত। অমাত্যেরা, নাগরিকেরা সবাই হাসাহাসি করত রাজার এই পাগলামি নিয়ে -- আজ পর্যন্ত কাশ্মীরে নাকি এমন বেহায়া রাজা কেউ হয়নি যে পত্নীর নামের সঙ্গে নিজের নাম জুড়ে মুদ্রার প্রচলন করেছে! যদিও রানির পুরো নামটি খোদিত ছিল না, লোকের বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে ‘দি’ দিদ্দা নামের সংক্ষেপ। তারা ক্ষেমগুপ্তকে আড়ালে ‘দিদ্দাক্ষেম’ যুগ্মনামে উল্লেখ করত।

    অথচ লোকে আগে বলত, রাজা ক্ষেমগুপ্ত অত্যন্ত নারীলোলুপ। দুশ্চরিত্র। অকর্মণ্য। না জানে রাজকার্য চালাতে, না অস্ত্রশস্ত্র চালাতে। যা কিছু কাজ সব অমাত্যেরাই করে। অমাত্যদের রচিত আদেশনামায় রাজা শুধু স্বাক্ষর করেন।

    নবীনা রাজমহিষী সমস্ত শোনা কথা মনে মনে বিশ্লেষণ করে যতটুকু বুঝেছিলেন, উচ্চপদস্থ রাজপুরুষেরা নিজেদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে যেত রাজাকে, মদ্যপান করাত, সুখাদ্য খাওয়াত, তারপর তারপর কোনো সুন্দরী নারীকে-- সে আত্মীয়া হোক বা দাসী-- রাজার সামনে এগিয়ে দিত। রাজাকে প্রলোভিত করে রাজসরকারে ভাল পদ, যেখান থেকে বহু অর্থ আদায় করা যায় তা পাবার তদবির করত, পেতও। এখনকার যারা অমাত্য, তাদের মধ্যেও একাধিক ব্যক্তি এরকম আছে। ক্ষেমগুপ্ত যখন সদ্য তরুণ, দুজন মন্ত্রী প্রতিযোগিতা করে রাজাকে হাতে রাখার জন্য নিজেদের কন্যার সঙ্গে তাঁর বিয়ে দিয়েছে। তাঁর সিংহাসনে বসবার কিছুকাল আগেও পরপর ষড়যন্ত্রের কারণে রাজবংশের ধারাবাহিকতা ছিল না, রাজাকে মেরে মন্ত্রী সিংহাসনে বসছিল, আবার অন্য মন্ত্রীরা সিংহাসনে বসা রাজাকে চরিত্রভ্রষ্ট করে টেনে নামাচ্ছিল। ক্ষেমগুপ্ত রাজা হবার পর তাঁর জীবনও বয়স্য ও অমাত্যদের প্ররোচনায় উচ্ছন্নে যেতে বসেছিল।

    কাশ্মীরের উত্তরপশ্চিমে ছোট অথচ শক্তিশালী লোহর রাজ্য। সেই সময়ে সেখানকার অধিপতি, খশ উপজাতির পরাক্রান্ত নায়ক সিংহরাজের মেয়ে দিদ্দার সৌন্দর্য এবং তেজস্বিতার কথা ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে জানা গিয়েছিল যে কন্যার পায়ে কিঞ্চিৎ খুঁত আছে। এরকম মেয়ের উপযুক্ত পাত্র সহজে মেলে না। কাশ্মীর ভারতবর্ষের সর্বোত্তর অংশে সবচাইতে বিখ্যাত ও সমৃদ্ধ রাজ্য, আর সেখানকার রাজবংশও পুরোনো, তাই সেখানকার রাজাকে জামাতা করতে পারলে ভাল হত, কিন্তু বর্তমান রাজা ক্ষেমগুপ্তের চরিত্রের কুখ্যাতি সিংহরাজকে সন্দিহান করেছিল। আবার ক্ষেমগুপ্তের অমাত্যরা চাইছিলেন শক্তিশালী লোহর রাজ্যের সঙ্গে বিবাহসম্বন্ধ করা কাশ্মীরের জন্য ভাল, রানির আর সব গুণ থাকলে সামান্য পায়ের খুঁত কোনো সমস্যা নয়। এই বিয়ে হলে দুটো রাজ্য পরস্পরের সহায়তা করে পশ্চিমদিক থেকে আগত ম্লেচ্ছ বহিঃশত্রুর প্রতিস্পর্ধা করতে পারবে। সিংহরাজ বাস্তবতা বুঝে ক্ষেমগুপ্তের সঙ্গে কন্যাকে বিবাহ দিতে রাজি হলেন, কিন্তু শর্ত রাখলেন, তাঁর মেয়েকে অনাদর করা চলবে না, এবং রাজার অন্য স্ত্রী থাকলেও লোহরকুমারীকেই মহাদেবী পদ দিতে হবে। ক্ষেমগুপ্ত তো হাতে চাঁদ পেলেন, শর্ত মানলেন এবং উলটে খশকুলপতিকে তাঁর রাজ্যের লাগোয়া ছত্রিশখানি গ্রাম উপহার দিয়ে রাজকন্যাকে বিয়ে করলেন। দিদ্দা জানতেন রাজাদের কন্যা সম্প্রদানের জন্য খুব সচ্চরিত্র রাজবংশীয় পুরুষ সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁদের স্বামীদের কিছু বিচ্যুতি মেনে নিতেই হয়, তাঁর নিজেরও শারীরিক খুঁত আছে, বয়সও পঁচিশ হয়ে গেছে, যা সেই সময়কার মেয়েদের ক্ষেত্রে বেশ বেশি।

    স্বামীর প্রেম কোন নারী না চায়? তবে দিদ্দা শুধু প্রেম চাননি। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক পুরুষ যিনি হবেন পৌরুষদৃপ্ত। তিনি রাজা হিসেবে বীর যোদ্ধা হবেন, যাতে তাঁর রাজ্য রক্ষা করার বল থাকে, বুদ্ধি ও কর্মদক্ষতা থাকে। সেগুলোই রাজার গুণ, যা না থাকলে তাকে বিয়ে করতে কোনো রাজকন্যারই বা চায়? আর এসব রাজকীয় গুণ থাকলে সেই মেয়ের সপত্নীর ঘরও বরণীয় মনে হয়, যদিও সপত্নীর সঙ্গে স্বামীর দৃষ্টি ও প্রেম আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। কিন্তু দিদ্দা সেরকম পুরুষ আর পেলেন কই! শুধুই স্ত্রীর শরীরের কাছে বসে থাকা পুরুষকে কি ভাল লাগে! তবু ছ’বছরে ক্ষেমগুপ্তকে তিনি একরকম ভালবেসেছিলেন, কারণ ভেবেছিলেন স্বামী তাঁর প্রতি একনিষ্ঠ।

    দিদ্দা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সেই মোহ আজ ভেঙ্গে গেছে। শ্রীনগরীর রাজপ্রাসাদে পা দিয়ে প্রথমদিকে যেসব গুঞ্জন শুনেছিলেন, তাই সত্য হয়েছে বটে।

    দিদ্দার মাতামহের রাজ্য বেশ বিখাত শাহিরাজ্য, তার রাজধানী বিখ্যাত উদ্‌ভাণ্ডপুর। তাঁর মা-বাবার বিবাহমিলনে শাহি ও লোহর মিত্র হয়েছিল। এই বিয়েতে কাশ্মীর রাজ্যও তাদের মিত্র হবে, কাজেই তিনটে রাজ্যের মধ্যে আত্মীয়তা তিনেরই শক্তিবৃদ্ধি করবে--- দিদ্দা এইধরনের কূটনীতি দেখেশুনেই বড় হয়েছেন। তিনি বাস্তব বোঝেন, রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত। রাজ্যগুলোর মধ্যে যেমন নিজেদের স্বার্থের পুষ্টির জন্য বৈবাহিক যোগাযোগ দরকার আছে, অমাত্যেরাও রাজার সঙ্গে বৈবাহিক যোগাযোগ এই কারণেই করে, অমাত্যের কন্যার সঙ্গে রাজার বিবাহ হলে অমাত্যের পদোন্নতি হয়, এবং রাজকার্যে তার নিজের তো বটেই, তার পরিবারেরও গুরুত্ব বাড়ে।

    ঠিক এই উদ্দেশ্যে দ্বারপতি অমাত্য ফল্গুন বেশ কিছুদিন ধরেই তার মেয়েকে রাজার সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব করছিল, রাজা নিজে আমল দিচ্ছিলেন না। দিদ্দা একথা জেনেছেন খোদ ক্ষেমগুপ্তের কাছ থেকে। ফল্গুনের আগের জীবনকাহিনির ব্যাপারেও দিদ্দা রাজার কাছ থেকেই জেনেছেন। সে অনেক বছর ধরেই কাশ্মীরের রাজসভায় মন্ত্রীর পদে আছে, রাজা যায় রাজা আসে, ভট্ট ফল্গুন মন্ত্রীপদে অটুট থাকে। যে-ই সিংহাসনে বসুক, ফল্গুন রাতারাতি আনুগত্য বদল করে সেই রাজার অনুগত হয়ে যায়। হ্যাঁ, লোকটা কাজকর্মে অভিজ্ঞ, অস্ত্রশস্ত্র চালাতেও পারে, তায় পণ্ডিত, তাই সহজেই অমাত্যপদ পেয়ে যায়, যেমন এখনো আছে। তার লম্বা কাঁচাপাকা দাড়ি, মাথায় মণিরত্নের মালা জড়ানো পাগড়ি ও গলায় রত্নহার, পার্বত্য ছাগরোমের মিহি কম্বল কাঁধে, পায়ে চর্মপাদুকা, মহার্ঘ ও রাজকীয় পোশাক পরে সে রাজসভায় আসে। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। সে যা বলে জোর দিয়ে বলে, যা-ই করে তার জন্য শাস্ত্রের প্রসঙ্গ টেনে যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করে, সাধারণের চোখে তা অন্যায় হলেও। রাজাও তার কথা অমান্য করেন না। তাই লোকে তার সামনে ভয়ে সম্ভ্রমে থাকে। দিদ্দার প্রতি প্রেমের জন্যই রাজা তার মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন— কথাটা বোঝবার পর লোকটি দিদ্দাকে এড়িয়ে যায়, না দেখার মত করে, অভিবাদন করে না। এই রানিটি ক্ষেমগুপ্তকে যেন দখল করে রেখেছে। এর জন্যই চন্দ্রলেখার রানি হওয়া হচ্ছে না, নিজের জন্য মুখ্য অমাত্য পদটাও রাজার কাছে সে চাইতে পারছে না, রাজার শ্বশুর হলে সে অনায়াসেই তা পেতে পারত। পূর্ববর্তী তিন রাজার অমাত্য ছিল সে, তার যোগ্যতা প্রশ্নাতীত।

    এতদিন এভাবেই চলছিল। দিদ্দা বিশ্বাস করেই ফেলেছিলেন যে তাঁর প্রতি ভালবাসার কারণে স্বামী অন্তত আর বিয়ে করবেন না। তারপর রাজার মনে সে কী পরিবর্তন করিয়ে দিল কে জানে, তিনি গত দুরাতে দিদ্দার ঘরে এলেন না। বড় দুই সতিনের ঘরে দাসীতে দাসীতে কথাবার্তার মধ্য দিয়ে কৌশলে খোঁজ করিয়ে দেখা গেল ওখানেও যাননি। এই খোঁজ করার ব্যাপারটাও আর কেউ জানে না, কারণ লোকে হাসবে-- রাজাকে ঘরে আটকে রাখবে, কত স্পর্ধা! কোনো রানিই তা পারে না। তুমি তো তবু ছ’বছর টানা পেয়েছ, কপাল ভাল, তোমার পিতা সিংহরাজ বলে। তোমার বড় সপত্নীরা এর আদ্ধেক সময়ও পায়নি। রাজারা নিজের ইচ্ছামত বিয়ে করে, যার ঘরে ইচ্ছা তার ঘরে গিয়ে রাত কাটায়, এরকমই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।

    দাসী সর্বশেষ খবর এনেছে, ফল্গুনের মেয়ে চন্দ্রলেখার সঙ্গে আজ সকালে রাজার বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে, সন্ধেয় তিনি নববধূকে নিয়ে প্রাসাদে ফিরবেন সম্ভবত। বিশাল প্রাসাদপ্রাঙ্গণের একদিকের একটা মহল সাজানো হয়েছে, বধূবরণের উপযোগী করে আলো জ্বালানো হয়েছে, হংসী দেখে এসেছে। তবে রাজা তাঁর ঘরে যে আর আগের মত করে ফিরবেন না, সে কথা নিশ্চিত বুঝতে পেরে দিদ্দার মন বিদ্রোহী হয়ে গেল। নতুন নারীর গন্ধ মেখে স্বামী পুরোনো শয্যায় আসবেন, ভাবতেই তাঁর দম বন্ধ লাগছে। বিশ্বাসঘাতক! আর ফল্গুন! তোমার কপটতা একেবারে দিনের আলোর মত পরিষ্কার। দিদ্দা তোমার সঙ্গে আর সুব্যবহার করবে না।

    মৃত্যু

    তিনচারদিন অতীত হলে ক্ষেমগুপ্ত প্রতিহারীকে পাঠালেন মহাদেবী দিদ্দাকে খবর দিতে, তিনি দ্বারে উপস্থিত। দাসী তাঁকে যথাযোগ্য আপ্যায়ন করে বিনীতভাবে আসন গ্রহণ করতে অনুরোধ করল। দিদ্দা খানিকটা সময় নিয়ে এলেন, মহাদেবীর সম্পূর্ণ সজ্জা নিয়ে। চোখ তাঁর রক্তিম, মাথা সোজা। ক্ষেমগুপ্ত এই অভিজাত রূপের থেকে চোখ ফেরাতে পারছেন না, এই রূপের কাছে নিজেকে যেন এক দীনহীন প্রজার মত লাগছে। তিনি আসন ছেড়ে উঠে রানিকে হাত ধরে আসনে বসাতে গেলে, তিনি একটু পিছিয়ে গিয়ে হাতের ইশারায় রাজাকে বসতে বললেন, তারপর নিজের আসনে বসলেন, প্রতিহারী ও দাসীরা তাঁর ইশারায় কক্ষ ত্যাগ করল। দিদ্দা ক্ষেমগুপ্তর চোখে চোখ রেখে বললেন, মহারাজ, অভিনন্দন। আশা করি তোমার নূতন বিবাহ সুখাবহ হয়েছে। তবে এবারে আমার সঙ্গে তোমার দিন কাটানোর শেষ হল।

    ক্ষেমগুপ্ত এই তীব্র অভিমানের কী উত্তর দেবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। তিনি বললেন, দিদ্দা, আমাকে ক্ষমা কর। চন্দ্রলেখাকে বিবাহ করলেও আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে ভালবাসতে পারব না। ফল্গুন আমাকে বাধ্য করেছে—

    দিদ্দা বাধা দিয়ে বললেন, সত্যি, মহারাজ, আপনি এখনো বালকের মতই কোমলমতি। ফল্গুন আপনার অভিভাবক, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। সে আপনাকে কিছু করতে করে, সুবোধ বালকের মত আপনাকে তা করে ফেলতেই হয়। আমার সেখানে কিছুই বলার নেই!

    একটু থেমে দিদ্দা আবার বললেন, তবে আপনি জানেন, আমি লোহরাধিপতি সিংহবিক্রম সিংহরাজের কন্যা। আমার লজ্জা হয় ভাবতে যে এমন ব্যক্তি আমার স্বামী যাঁর একমাত্র গুণ হল বিবাহ করা। তিনি না জানেন ঠিকমত অস্ত্রশস্ত্র চালনা করতে, না রাজকার্য পরিচালনা করতে, শুধু অন্তঃপুরে নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করতে লেগেছেন। যে কেউ তাঁকে বিবাহ করতে বলবে, তিনি বিবাহ করে ফেলবেন। যদি কোনো দুর্ভাগ্যবশত বহিঃশত্রু আক্রমণ করে, আমাদের অন্তঃপুরবাসিনীদের কী গতি হবে ভাবি। মহারাজ যদি অন্তত একটা অস্ত্রও চালনা করাতে কুশলতা দেখাতেন। তিনি নারীর হৃদয় ভেদ করতে লেগেছেন, লক্ষ্যভেদ নয়। হায়, এতজন পত্নীর কী দুর্ভাগ্য!

    ক্ষেমগুপ্ত ভেবে এসেছিলেন দিদ্দার কাছে মাফ চাইলে হয়তো তিনি মাফ করবেন, রাজাদের জীবনে এরকম কতই হয়; বড় মেজো দুই রানির কাছে চন্দ্রলেখাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, সেখানে মান-অভিমানের ব্যাপার বিশেষ ছিল না, দুই রানির মর্যাদাও কম। দিদ্দার সঙ্গে ব্যাপার আলাদা, এখানে একটু রয়ে সয়ে নূতন স্ত্রীকে পরিচয় করাবেন। দিদ্দা সেদিক দিয়ে একেবারেই না গিয়ে তাঁর পৌরুষকেই আক্রমণ করে বসলেন। ক্ষেমগুপ্তের মুখের কথা হারিয়ে গেল। দিদ্দা চুপ করলে তিনি মাথা নত করে উঠে গেলেন। ভাবলেন, দিদ্দা মিথ্যে তো বলেনি, সত্যি তিনি অস্ত্র চালনা করতে, শস্ত্র নিক্ষেপ করতে জানেন না। তাঁকে তেমনভাবে কেউ কোনো কিছুই শিখতে বলেও নি, যদিও অল্পবয়সে গুরুগৃহে পাঠানো হয়েছিল। সেই সময়টা ছিল অস্থিরতার, তাঁর পিতা পর্বগুপ্ত নিজে প্রধান অমাত্য হয়েও ষড়যন্ত্র করে সিংহাসনে আসীন বালক রাজা সংগ্রামদেবকে তার আত্মীয়গণ সহ হত্যা করে নিজে রাজা হয়েছিলেন। তিনি পিতাকে এজন্য অপরাধী ভাবেন না, বেশির ভাগ রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠার মূলে অনেক ছলবল কূটকৌশল থাকে, অনেক নির্দোষের রক্ত বহাতে হয়। পর্বগুপ্তের কাছে নীতিশিক্ষা মানে ছিল ছলেবলে পরস্ব আগ্রাসন, যুদ্ধবিদ্যা মানে আড়াল থেকে লুকিয়ে বয়স নির্বিচারে বিশ্বস্তকে নিজ স্বার্থের জন্য হত্যা। এহেন পিতার রাজা হবার মাত্র দুবছরের মধ্যেই মৃত্যু হলে ক্ষেমগুপ্ত কিশোর বয়স পেরোতে না পেরোতেই রাজসিংহাসনে বসলেন। নূতন স্বাধীনতা উপভোগ করতে সঙ্গে জুটল বন্ধু বয়স্য। তাদের সঙ্গে তিনি উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়েছিলেন। দ্যূত, সুরাপান ও কুট্টনীদের জোগাড় করে আনা নারীদের শরীর উপভোগ করে প্রথম যৌবনের দিনগুলো গেছে। প্রথম দুই স্ত্রী তাঁর জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেননি। তাঁরা সুন্দরী হলেও নির্বিরোধ মহিলা, তাঁদের পিতারা নিজেদের অমাত্যপদ প্রাপ্তির জন্য রাজার হাতে মেয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর জীবন গভীর খাতে বইতে শুরু করে দিদ্দা জীবনে আসার পর থেকেই। একদিকে সিংহরাজের প্রতাপ, অন্যদিকে দিদ্দার ব্যক্তিত্ব। হ্যাঁ, বিয়ের আগে থেকেই, লোকমুখে তাঁর রূপগুণের চর্চা সহ সামান্য পঙ্গুত্বের কথা শুনেও দিদ্দা তাঁর আকাঙ্ক্ষার নারী। তাঁকে কাছে পেয়ে তিনি পত্নীর শরীরের খুঁত সত্বেও ভালবেসেছিলেন, অমাত্যদের কাজকর্ম সম্পর্কে বুদ্ধিমতী দিদ্দার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে আরম্ভ করেছিলেন, রাজকার্য বুঝতে শুরু করেছিলেন। তাঁকে অবহেলা করার কথা মনেও আনতেন না, ফল্গুন তাঁকে চন্দ্রলেখাকে বিয়ে করার জন্য নানাভাবে অনুরোধ করাতেও তিনি এতদিন হ্যাঁ বলেননি।

    সেদিন সে তাঁকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছিল। দ্বারপতি অমাত্য হিসেবে ফল্গুন খুবই প্রতাপশালী, তার উপর রাজ্যের সুরক্ষা নির্ভর করে। রাজার খাস রক্ষীবাহিনীর মুখ্য সে, প্রাসাদের সুরক্ষাও তারই হাতে, সেজন্য প্রাসাদের অলিন্দে তার যাওয়া আসা অবারিত। তাছাড়া তার ছেলেরাও যোদ্ধা, পরবর্তীতে অমাত্য হবার যোগ্যতা রাখে, এখন তারা শাসনতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তাই ফল্গুনের নিমন্ত্রণ ফেরানোর প্রশ্ন ওঠে না। রাজাকে মদ্য পরিবেশনের পর সে তার মেয়ে তরুণী চন্দ্রলেখাকে বলেছিল রাজাকে খাবার পরিবেশন করতে। চন্দ্রলেখার তনুদেহ, হরিণচোখের দৃষ্টি, তার লাবণ্য, শরীরী বিভঙ্গ, তার দু-একটা মিষ্টি কথা তাঁর সংযম ভেঙ্গে দিয়েছিল। তিনি উঠতে চেয়েও মোহগ্রস্ত হয়ে ঊঠতে পারছিলেন না। সে খাবার পরিবেশন করছিল রাজাকে, তার আঁচল খসে পড়ছিল, আর রাজা তার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলেন। পরে বুঝেছিলেন, ফল্গুন তার ছেলেদের লাগিয়েছিল তাঁকে প্যাঁচে ফেলে চন্দ্রলেখাকে বিয়ে করার কথা দিতে-- সেজন্য একটা ঘরে শুধু দুজনকে রেখে তারা সরে গিয়েছিল। রাজার জন্য চন্দ্রলেখার চরিত্রে কলঙ্ক লাগবে— খাওয়াদাওয়ার পর এই কথা বলে ফল্গুনের ছেলেরা তাঁকে বলল, তাঁকে চন্দ্রলেখাকে বিয়ে করতেই হবে, নইলে মেয়েটার আর বিয়ে হবে না, আর বিয়ে না করলে রাজারও শুভ হবে না। এই শেষের বাক্যটি তারা বেশ জোর দিয়ে বলেছিল, ক্ষেমগুপ্ত তাৎপর্য বুঝেছিলেন। তারপর তাঁকে পুরো এক দিন বেরোতেই দেওয়া হল না। এই বিয়ে তাঁকে করতেই হল। তিনি জানেন, এই নারীকে তিনি ভালবাসেননি, শুধু ফল্গুনের ফাঁদে পড়ে ক্ষণিকের মোহে এই বিয়ে তিনি করেছেন। শ্বশুর কন্যা সম্প্রদান করলেন, রাজ-জামাতার কাছ থেকে মুখ্য অমাত্যের পদ প্রতিদানে নিলেন। কিন্তু এই বিয়ের ফলে অভিমানিনী দিদ্দার মনে যে আঘাত লেগেছে, যে অনমনীয়তার পরিচয় ক্ষেমগুপ্ত পেয়েছেন, তাতে আর সম্পর্ক জোড়া লাগার সম্ভাবনা নেই।

    ক্ষেমগুপ্ত ভাবলেন, অন্তঃপুরের মনকষাকষির মধ্যে থাকবেন না। ভল্ল নিক্ষেপ যদি শেখা যায়, তাহলে শিকার করতে বেরিয়ে যাবেন। মৃগয়া করবার সময় রাজার সঙ্গে যে ডোমেরা জাল, কুকুর নিয়ে যেত, তাদের সর্দারের কাছে বর্শা ছোঁড়া শিখবার জন্য অনুশীলন করতে আরম্ভ করলেন, কিন্তু কিছুতেই তিনি তাঁর লক্ষ্য স্থির করতে পারতেন না। তবুও বর্শা নিয়ে শিকারে যেতেন, এবং হরিণের বদলে শেয়াল শিকার করে ফিরতেন। সঙ্গী ডোম সর্দার উপহাস করত--- অস্ত্রশস্ত্র চালনা শেখা বেশ আয়াসসাধ্য ব্যাপার।

    সেইরকম একবার ব্যর্থ শিকার থেকে ফিরে জ্বরে আক্রান্ত হলেন, দুদিনেই গায়ে বসন্তরোগের লক্ষণ দেখা গেল। সেকালে বসন্ত মারণ রোগ ছিল। বসন্তরোগ হলে রোগীকে জনপদ ছেড়ে নির্জন স্থানে চলে যেতে হত, যাতে অন্যেরা সংক্রমিত না হয়। ক্ষেমগুপ্তও বারাহক্ষেত্রে চলে গেলেন এবং অল্পদিনের মধ্যে তাঁর মৃত্যু হল।

    সহমরণ

    প্রাচীন গোনন্দ বংশের শেষের দিক থেকে কাশ্মীরে সহমরণ এবং অনুমরণ প্রথা শুরু হয়েছিল, এবং কার্কোটক বংশ পেরিয়ে উৎপল বংশের সময় এই প্রথা জাঁকিয়ে বসেছিল। মৃত ব্যক্তির সঙ্গে তার স্ত্রী একই চিতায় উঠলে সেটা সহমরণ, আর কোনো ব্যক্তি দূর কোন স্থানে মারা গেলে এবং তার মৃতদেহ আনা সম্ভব না হলে, তার স্ত্রী, (এমন কি কোনো ক্ষেত্রে প্রিয় ভৃত্য ও) মৃত ব্যক্তির চিতায় না উঠে তার স্মরণে আলাদা চিতায় পুড়ে মরত, সেটা হল অনুমরণ। রাজাদের প্রায়ই অনেক রানি থাকতেন, তাদের মধ্যে দুএকজনকে অবশ্যই চিতায় উঠতে হত। রাষ্ট্রবিপ্লবের মত বিশৃঙ্খল ঘটনায় রাজা নিহত হলে অনেক সময় সব রানিই সহমরণ বা অনুমরণে যেতেন, কারণ তখন শত্রুর হাতে রাজ্য চলে যেত, পুত্রপরিজন নিহত হত, বেঁচে থাকা রানির অসম্মানের অন্ত থাকত না। তবে রাজার সাধারণ মৃত্যুর ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় মরতে যাওয়া রানি কমই হত, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রধান মন্ত্রীরা সিদ্ধান্ত নিতেন কে কে সহমরণে কিংবা অনুমরণে যাবে। আবার কোনো কোনো রানি সহমরণে যাবার ইচ্ছে করেও বাস্তবে যখন চিতার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেন, ত্রাসে চমকে যেতেন, পালিয়ে আসতে চাইতেন। হয়তো কোন আত্মীয় বা সমব্যথী তাঁকে চিতায় উঠতে দিতেন না, এমন ঘটনাও হত। পূর্বতন রাজা প্রবরসেন যেমন তাঁর মাকে পিতা তোরমানের চিতায় উঠতে দেননি।

    নতুন রাজা রানির নিজের ছেলে হলে অসুবিধে তত নেই, কিন্তু বেশিরভাগ রাজার মৃত্যুর পর সিংহাসন নিয়ে লড়াই বাঁধত। রাজপুত্র ভাইদের মধ্যে লড়াই ছাড়াও অন্যান্য আত্মীয় যেমন রাজার ভাই, ভাইয়ের ছেলে, জ্ঞাতিরাও এই রক্তাক্ত প্রতিযোগিতায় যোগ দিত। রাজপরিবারের বাইরে মন্ত্রী বা সেনাপতিরাও সিংহাসনের লোভে রাজপরিবারের উত্তরাধিকারীদের হত্যা করে ক্ষমতা দখল করত। এইধরনের ঘটনা সর্বত্র এবং সব কালেই কিছু কিছু ঘটত। বয়ঃস্থ বিবাহিত পুত্র রাজা হলে হলে তার মা বিধবা রানির ক্ষমতা, অর্থ হ্রাস পেত, স্বাভাবিকভাবে পুত্রবধূ তাঁর স্থান দখল করত।

    তবে তার চাইতে বড় কারণ ছিল যে লোকে বিশ্বাস করত বিধবা রানি যদি যুবতী হন তাঁর চরিত্র ভ্রষ্ট হবে। সমাজের মাথারা বিধবা নারীর পুনর্বিবাহ সমর্থন করতেন না, যদিও শাস্ত্রে তার বিধান আছে। নারীর উপর সন্দেহ ছিল--- নারীর হাতে ধন থাকলে সে যথেচ্ছ যৌনজীবন যাপন করবে, সেই নারী রাজপত্নী হলে রাজার বংশে কলঙ্ক লাগবে। এইসব ধারণার বশবর্তী হয়ে সহমরণকে গৌরবান্বিত করা হত--- সহমৃতা নারী সতী, সে পতির স্বর্গলাভের সহায়ক হয়, নিজেও অক্ষয় পুণ্যের ভাগী হয়। এই মগজধোলাই সমাজে সহমরণ ও অনুমরণ ব্যবস্থা পোক্ত করেছিল।

    ক্ষেমগুপ্তের মৃত্যু হলে তাঁর শেষকৃত্যের আয়োজন হল। রানিরা সহমরণে যাবেন, যতজন যাবেন সেই অনুসারে চিতার ও অন্যান্য কৃত্যের আয়োজন করতে হবে, এসব মুখ্য অমাত্য ফল্গুনের দায়িত্ব। ফল্গুন সব রানিকেই সহমরণে যেতে মন্ত্রণা দিয়েছিল, শাস্ত্রের বচন শুনিয়ে তাদের মানসিকভাবে তৈরি করছিল। বড় রানিদের থেকে রাজার কোনো উত্তরাধিকারী পুত্রসন্তান নেই, তাই একদিকে তাদের নিজেদের জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার অভাব তো হবেই, এবং রাজ্যেও অরাজকতার সম্ভাবনা আছে, এই ভয়ে তারা দুজনেই রাজি হয়েছিলেন। তাদের দেখাদেখি দিদ্দাও প্রথমটা সহমরণে যাবেন বলে হ্যাঁ বলেই ফেলেছিলেন। দিদ্দার ব্যক্তিত্ব ফল্গুনের পছন্দ ছিল না, তার গোপন উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে সরিয়ে দিয়ে নিজের মেয়ে চন্দ্রলেখার মাধ্যমে সে রাজ্যের কর্তৃত্ব নিজে্র হাতে নিতে পারবে।

    শ্মশানভূমিতে দিদ্দা এসে সপত্নীদের পেছনে একটু দূরে দাঁড়ালেন। শীতশেষের সময়, বরফের শরীর আলিঙ্গন করে আসা পাহাড়ি বাতাসও কিছু করতে পারছে না, জ্বলন্ত চিতার প্রচণ্ড তাপ দূর থেকেও যেন ঝলসে দিচ্ছে। তাঁর বড় দুই সপত্নী এক এক করে পাল্কিতে উঠে চিতায় ঝাঁপ দিলেন। না, কেউই হাসিমুখে নয়, ঠোঁট চেপে, যেন বাধ্য হয়ে। একজন অনিচ্ছায়ই মনে হল ছিলেন, পাল্কিতে কেউ যেন তাঁকে ঠেলে ঢোকাল, ঝাঁপ দেবার সময় তাঁর তীব্র আর্তনাদ উঠে আগুনের ফোঁস ফোঁস শব্দের মধ্যে মিলিয়ে গেল। দেখে দিদ্দা চমকে উঠলেন--- এ কী ভুল সঙ্কল্প তিনি করলেন! এই মরণ কোনো স্বর্গীয় নয়, এ যে নরকের মত তপ্ত ! না, তিনি মরতে চান না। এই সুন্দর পৃথিবী, এই তুষারশুভ্র পর্বতশ্রেণী, চিরতরুণী নদী বিতস্তা্র কলধ্বনি, এই মানুষ-জীবন--- মুহূর্তেই নেই হয়ে যাবে তাঁর কাছে? এই সুন্দর শরীর যা ক্ষেমগুপ্ত একসময় এত ভালবাসতেন, যে শরীরে সুন্দর অলঙ্কার দিয়ে সাজালে, সুন্দর বস্ত্র পরলে আয়নায় নিজেরই চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করে না, সেই শরীর এত তাড়াতাড়ি ছাই হয়ে যাবে? আর তাঁর ছেলে অভিমন্যু? মা ছাড়া তার কী হবে? --- না, তিনি পারবেন না চিতায় উঠতে। তিনি উচ্চস্বরে কেঁদে উঠলেন, না, না--- ফল্গুন ওদিক থেকে বড় বড় রক্তিম চোখে তাকাল। কী বলছে এই দিদ্দা? সে পালকি থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছে, পেছনে সরে যাচ্ছে! সে পালাচ্ছে? তার মানে সে আবার তার চোখের সামনে আসবে, অথচ ধরা দেবে না। ফল্গুনের চোখের আগ্রাসী আগুনে অনেক নারী পতঙ্গের মত ঝাঁপ দিয়েছে এককালে। এই নারী তাকে প্রথম থেকেই চঞ্চল করে দেয়, কিন্তু সে কাছে ঘেঁষবে না। তাই তাকে মরতে হবে। ফল্গুন বলে উঠল, ধরো ধরো ওকে।

    ফল্গুন মুখ্য অমাত্য হবার পর বর্তমান দ্বারপতি অমাত্য নরবাহন দিদ্দার কাছেই দাঁড়িয়েছিল। সে সহমরণ প্রথাটিকে মনে মনে পছন্দ করত না, কাশ্মীরী সমাজে প্রথাটা বাইরে থেকে ব্রাহ্মণদের আমদানি হয়ে এসে গেঁড়ে বসেছে, রাজাদের আজ্ঞায় বলবৎ হয়ে। তাই এর বিরুদ্ধে কথা বলাও মুশকিল। সে বুঝত, রানিরা কেন সহমরণে যায়। তবে দিদ্দার সহমরণে যাবার অনুমতি তো দেওয়াই উচিত নয়, সাধারণত গর্ভবতী রানি এবং রাজ্যের উত্তরাধিকারী শিশুপুত্রের জননীকে সহমরণ থেকে নিবৃত্ত করা হয়। নরবাহন ভাবছিল, তাহলে দিদ্দাকে কেন ফল্গুন অনুমতি দিল? এর পেছনে ফল্গুনের কোনো গোপন উদ্দেশ্য আছে?-- এমনি সময়ে দিদ্দার ভীত আর্ত চীৎকার ও পশ্চাদপসরণ দেখে সে অতি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাঁকে বলল, রানি, আপনি মন পরিবর্তন করেছেন? তাহলে আপনাকে চিতায় উঠতে হবে না। দিদ্দা আকুলভাবে তার হাত ধরে বললেন, আমি মরতে পারব না নরবাহন, আমায় ঘরে নিয়ে চলো। আমার ছেলের কাছে নিয়ে চল। নরবাহন দিদ্দার পাল্কিবাহককে এগিয়ে আসতে ইঙ্গিতে আদেশ করল, তার অনুচরবর্গ মুহূর্তে দিদ্দার চারপাশে বলয় তৈরি করে, তাঁকে আবার পালকিতে তুলে প্রাসাদে নিয়ে চলল। উপস্থিত ব্রাহ্মণ এবং অমাত্য ফল্গুন বলতে লাগল, এ কী, এতো পাপ। সহমরণের সঙ্কল্প করে তার থেকে পিছু হঠা পাপ। নরবাহনের অনুচরদের হাতে উদ্যত তরবারি দেখে ফল্গুনের অনুচরেরা ইতস্তত করছিল, তারা কী এগোবে? ততক্ষণে নরবাহনের রক্ষীদল দিদ্দাকে নিয়ে চিতা দ্রুত পেছনে ফেলে বেশ এগিয়ে গিয়েছে।

    দলের শেষে অশ্বারোহী নরবাহন পেছনে ঘুরে বলল, প্রাণের রক্ষা সবচাইতে বেশি পুণ্যের কাজ, ভট্ট ফল্গুন। আপনারা শিশুপুত্রের জননীকে সহমরণের অনুমতি দিয়েছিলেন, সেটা তো ভয়ানক পাপ।

    এদিকে ক্ষেমগুপ্তের ছোট রানি চন্দ্রলেখা ততক্ষণে চিতায় ঝাঁপ দিয়েছেন। ফল্গুন এই আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে পাপপুণ্যের বিচার স্থগিত করল, তার অনুচরেরা আর এগোলো না। তাদের পেছনে রেখে নরবাহন দিদ্দাকে নিয়ে প্রাসাদে পৌছে দিল। সেইসঙ্গে প্রাসাদের বাইরের সুরক্ষা দৃঢ় করল, যাতে রাজপুত্র ও তার মায়ের বিপদ না হয়।

    রাজমাতা

    সিংহাসন শূন্য থাকলে চলে না। সিংহাসন রাজার প্রতীক, সুশাসনের প্রতীক। রাজা পালটায়, সিংহাসন পালটায় না। অকালমৃত রাজা ক্ষেমগুপ্ত দিদ্দার গর্ভজাত যে শিশুপুত্র রেখে গিয়েছেন, সে-ই এখন উত্তরাধিকারী, তার নাম অভিমন্যু। নরবাহন দিদ্দাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, মহারানি, আপনার এই শিশুটিই হবে আমাদের রাজা। আপনি রাজমাতা, শিশুপুত্রের অভিভাবিকা হয়ে রাজ্য যথানিয়মে শাসন করুন। ভয় নেই, আমি আপনার সঙ্গে আছি।

    নরবাহন, আরো দুচারজন অমাত্য এবং তাদের অনুবর্তীদের সাহায্যে শিশুপুত্র অভিমন্যুকে সিংহাসনে বসিয়ে দিদ্দা রাজ্যশাসনের ভার নিজে তুলে নিলেন। অভিমন্যুর জন্য শূরমঠ থেকে সুযোগ্য শিক্ষক আনিয়ে শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন।

    ক্ষেমগুপ্তের আমলের প্রধান অমাত্য ছিল ফল্গুন। সে এখনো তা-ই আছে। প্রধান অমাত্য হিসেবে ফল্গুনকে মৃত রাজার শেষকৃত্যের কাজ সুষ্ঠুভাবে সারার দায়িত্ব ছিল। শ্মশান থেকে ফিরেও অনেক কাজ। প্রথমেই বারাণসীর গঙ্গায় রাজার অস্থি বিসর্জনের কৃত্য করাতে হবে। সাধারণভাবে কাশ্মীরে বিতস্তা নদীতেই এই কাজ হয়। কিন্তু ক্ষেমগুপ্তের ইচ্ছে ছিল তাঁর অস্থি যেন বারাণসীতেই বিসর্জন হয়। তাই ফল্গুন বড় ছেলে কর্দমরাজকে রাজার অস্থি নিয়ে বারাণসী যাবার জন্য বলতে বাধ্য হয়েছে, যাকে তাকে এই দায়িত্ব দেওয়া যায় না। সুদীর্ঘ পথের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও সৈন্য দিয়ে কর্দমরাজের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হয়েছে, দুচার দিনেই সে বেরিয়ে যাবে, গঙ্গায় অস্থি বিসর্জন করে ফিরবে। কর্দমরাজের যেতে আসতে অন্তত তিনচার মাস। এদিকে কন্যা চন্দ্রলেখাকে রানি করার পেছনে তার যে পরিকল্পনা ছিল, সেটা ভেস্তে গেছে। দিদ্দা চিতার সামনে থেকে পালাল, কিন্তু সদ্যোতরুণী চন্দ্রলেখা চিতায় ঝাঁপ দিল। সহমরণের জন্য সে কেন ব্যাকুল হল? মাত্র ছ’মাস সে তার বিয়ে হয়েছিল, তাও তখন ক্ষেমগুপ্ত আদ্ধেক দিন বনে জঙ্গলে শেয়াল শিকারে থাকত। দিদ্দাকে বিয়ে করে যেমন টানা ছ’সাত বছর ক্ষেমগুপ্ত কেমন স্ত্রীর বশীভূত হয়ে ছিল, চন্দ্রলেখা তাকে সেরকম একটুও প্রভাবিত করতে পারেনি। মেয়েটা কি হতাশাগ্রস্ত ছিল? দিদ্দাকে শ্মশানে নেবার জন্য চন্দ্রলেখাকে ফল্গুন আগে থেকে মানা করেনি। ভেবেছিল, দিদ্দা ও তার আর আর সতিনরা চিতায় ওঠার পর সে চন্দ্রলেখাকে নিবৃত্ত করে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। তবুও বোকা মেয়েটা তড়িঘড়ি চিতায় ঝাঁপাল, পুড়ে মরল! যাক, আর কী করা যাবে। বুকটা পুড়ছে আর কী। নিজের রচিত ফাঁদে নিজেই পড়লাম, ফল্গুন অনুশোচনা করছিল। ছেলের অনুপস্থিতির সেই কয়েকমাস সময় রাজধানীতে কাটাতে ভয়ও আছে, সে দিদ্দার শত্রু বলে চিহ্নিত হয়ে গেছে। কর্দমরাজ ফিরে এলে ইতিকর্তব্য স্থির করা যাবে। এখানে দিদ্দার নির্দেশে নরবাহন দ্বারপতি হয়েও প্রধান অমাত্যের কাজ সামলাচ্ছে। আপাতত কাজের ছলে খুব তাড়াতাড়ি সব গুছিয়ে নিজের অধীন সৈন্যদল, পরিচারক ও ভাণ্ডার নিয়ে শ্রীনগরী থেকে দূরে পর্ণোৎসে চলে যাওয়াই ভাল যতদিন না ছেলে ফিরে আসে। ফল্গুন মনে মনে কথাটা স্থির করল, তবে মনের ভাব কাউকে জানাল না। মনখারাপের অজুহাতে রাজসভাতেও অনুপস্থিত রইল।

    রাজমাতা ও রাজার অভিভাবিকা হিসেবে দিদ্দা অমাত্যদের প্রাসাদে নিজের কক্ষে ডেকে রাজকার্যের জন্য পরামর্শ নিতেন। তিনি জানতেন, তাঁকে খুব সাবধানে চলতে হবে, তাঁর অভিজ্ঞতা কম, তাই সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেবার আগে বড় বড় অমাত্যদের প্রত্যেককে আলাদা ভাবে ডেকে তাদের মত চাইতেন, কারণ এদের মধ্যে কে শত্রু কে বন্ধু তিনি জানেন না। তাঁর অভিজ্ঞতা বাড়ছিল, তিনি বুঝতে পারছিলেন, তিনি নারী বলে অমাত্যেরা তাঁকে পুতুলের মত ব্যবহার করতে চায়, তাদের অভিমত তাঁর নামে চালাতে চায়। রাজা যখন বেঁচে ছিলেন, তখন তারা সামনাসামনি তাঁকে তাচ্ছিল্য করতে পারত না। তবে তখন শাসনের ব্যাপারে তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকাও বিশেষ ছিল না। রাজা তাঁকে কোনো বিষয়ে পরামর্শ চাইলে তিনি সেই বিষয়ে চিন্তা করে উত্তর দিতেন। এখন অমাত্যেরা কথায় কথায় বলে, ‘রাজমাতা, আপনি জানেন না’, ‘আপনি বিষয় বুঝতে পারছেন না‌’ ‘আমার কথা শুনুন’, বলে তাঁর অভিমত না শুনে নিজেরাই সিদ্ধান্ত দেয়। আবার প্রেমের অভিনয় করে তাঁর বিশেষ প্রিয় হবার আকাঙ্ক্ষাও আছে কারো কারো। কিন্তু তিনি ফাঁদে পা দেবেন না। ফল্গুনকে তিনি চিনতে পেরেছিলেন। এবার অন্যদের চিনে নিতে হবে।

    ফল্গুনকে অনেকদিন হল দেখা যাচ্ছে না। দিদ্দা জানতেন সে পর্ণোৎসে গিয়েছে, তার ছেলে কর্দমরাজ বারাণসী যাবে মৃত রাজার অস্থি বিসর্জন দিতে, তাই ছেলেকে কিছু সৈন্য ও যথেষ্ট রাহা খরচ দিয়ে পার্বত্য পথে কিছুটা এগিয়ে দিয়ে সে ফিরে আসবে, এই কথা সে বলে গিয়েছে। এতদিনে তার ফিরবার কথা। দিদ্দা অমাত্য কম্পনপতি রক্ককে ফল্গুনের বার্তা নিয়ে তাঁকে জানাতে বললেন।

    খোঁজ নিয়ে গিয়ে রক্ক দেখল, ফল্গুন এখনো ফেরেনি, তার বাড়ি বন্ধ, কেউ নেই। শুধু দুজন ভৃত্য বাইরে ছিল, তারা বলল, প্রভু সেই যে পর্ণোৎস গিয়েছিলেন, তারপর তাঁর পরিজনেরা সবাই ধীরে ধীরে চলে গেছেন। কেউ এখনো ফেরেননি। বাড়িতে কেউ নেই।

    বাড়ি সম্পদশূন্য বলেই রক্কর মনে হল। এমন কী তার রক্ষী সৈন্যদল যারা থাকত, তাদেরও কেউ নেই, তাদের আবাসও বন্ধ। শুধু দুজন ভৃত্যের উপর নির্ভর করে কেউ ধনসম্পদ ভর্তি ভাণ্ডার ছেড়ে চলে যায় না। বহুদিনের অমাত্য হিসেবে ফল্গুনের ধনের কমতি নেই।

    দীর্ঘদিনের অমাত্য বৃদ্ধ রক্ক ফল্গুনকে সন্দেহের চোখে দেখত। সে দিদ্দাকে বলল, দেবী, ফল্গুন অন্যান্য সামন্তদের সঙ্গে মিলিত হয়ে শক্তি বাড়িয়ে নিশ্চয় রাজ্য আক্রমণ করতে আসবে, না হলে সে তার সমস্ত সৈন্য ও ভাণ্ডার নিয়ে পর্ণোৎস চলে গেছে কেন?

    দিদ্দা ভাবলেন, ফল্গুন তাঁকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, এখন তার বিদ্রোহ অসম্ভব কিছু নাও হতে পারে। তিনি রক্ককে নির্দেশ দিলেন, তুমি পর্ণোৎসে গিয়ে বারাহক্ষেত্রে শিবির করে খবর নাও। তোমার অধীনে যে যষ্টিধারী সৈন্যদল আছে, তাদের নিয়ে যাবে। ফল্গুনকে খবর দেবে, সে যেন সেখানে গিয়ে অস্ত্রসমর্পণ করে। না এলে যুদ্ধ করে ধরে আনবে। আর অস্ত্র জমা দিলে তাকে দেবতার সামনে প্রতিজ্ঞা করতে হবে সে রাজাজ্ঞা ছাড়া অস্ত্র ধরবে না। তাহলেই সে মুক্ত অবস্থায় পর্ণোৎসে থাকতে পারে।

    রক্ক সাহসী এবং বিশ্বস্ত ছিল, তবে তার নিষ্ঠুরতার জন্যও কুখ্যাত ছিল। পর্ণোৎসের বারাহক্ষেত্র তীর্থে বহু রাজাই নিজের শেষ দিনের অপেক্ষা করতে যেতেন, ক্ষেমগুপ্ত যেমন গিয়েছিলেন। রক্ক ফল্গুনকে সেখানে আহবান করায় সে ভয় পেল। আপাতত তার কিছু সৈন্য ও অর্থ আছে। যতদিন অর্থ আছে, ততদিন সৈন্য থাকবে, কিন্তু এই জায়গাটি তার নিজভূমি নয়। ক্ষতি হলে এখানে থেকে সেই ক্ষতি পূরণের উপায় নেই, তাই বিভূঁইয়ে লড়াইয়ে না যাওয়াই ভাল। ছেলে বারাণসী যাওয়ায় তার বল কমে গেছে। এইসব চিন্তা করে সে রক্কের সঙ্গে দেখা করতে গেল। রক্ককে বলল, সখা রক্ক, আমরা বহুদিন একসঙ্গে রাজসেবা করেছি, তুমি জান। আমি এমন কী করেছি যে আজ রাজমাতার কোপে পতিত হতে হচ্ছে? আমি তো রাজ্যের উন্নতির জন্য সর্বদা সচেষ্ট আছি। রক্ক বলল, ফল্গুন, তুমি আগে প্রধান অমাত্য ছিলে, কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর বালক রাজা ও রাজমাতার প্রতি শত্রুর মত আচরণ করেছ। তুমি যদি বিশ্বস্ত হতে, অসন্দিগ্ধ হতে, একেবারে সপরিবার সপার্ষদ রাজধানী ত্যাগ করতে না। শুধু তাই নয়, সঙ্গে তোমার সৈন্যদল এবং সমস্ত অর্থভাণ্ডারও তুমি নিয়ে চলে এসেছ, এর তাৎপর্য কী? এরপর রাজমাতা তোমাকে বিশ্বাস করেন কী করে? তাই তাঁর আদেশ, অস্ত্রত্যাগ ত্যাগ করলে তোমাকে পর্ণোৎসে থাকতে দেওয়া হবে, বিষ্ণুবরাহের পাদমূলে অস্ত্র সমর্পণ করে প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে আজ থেকে রাজাজ্ঞা ব্যতিরেকে অস্ত্র ধরবে না। অন্যথায় এখানেই অচিরে দেবতার পাদমূলে সহচরবৃন্দ সহ তোমার বিশ্বাসঘাতক শরীর যষ্টির আঘাতে ধূলোয় লুটাবে, মনে রেখো।

    ফল্গুন তাকিয়ে দেখল, তার চারদিকে রক্কর সৈন্যরা লাঠি উঁচিয়ে রয়েছে। প্রত্যেকের কোমরে ছোরাও গোঁজা রয়েছে, সে বুঝতে পারল। চোখের জল ফেলে ফল্গুন বিষ্ণুবরাহের প্রতিমার পাদমূলে প্রতিজ্ঞা করে অস্ত্রসমর্পণ করল। রাজদ্রোহের সম্ভাবনা দূর হল, ফল্গুন সদলবলে প্রাণ বাঁচাল। তবে আপাতত তার শ্রীনগরীতে ফেরার পথ রইল না। পর্ণোৎস ছেড়ে আর কোথাও যেন সে না যায় এই আদেশ আরো একবার দিয়ে রক্ক রাজধানীতে ফিরল।



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments