


লক্ষ করা দরকার, এই প্রতিশব্দের আসরে তৎসম শব্দ –যেমন, পদ্মের জায়গায় কমল পঙ্কজ ইত্যাদি স্থান পেয়েছে, তেমনই স্থান পেয়েছে তদ্ভব শব্দ – যেমন, বাতাসের জায়গায় বায়। তেমনই স্থান পায় বিদেশি শব্দ – বাতাসের জায়গায় হাওয়া, বিদ্যালয়ের জায়গায় স্কুল কিংবা ইশকুল, বিচারালয়ের জায়গায় আদালত কিংবা কোর্ট। যে কোন সজীব ভাষায় বিদেশি শব্দের এই আত্তীকরণের নিদর্শন মিলবে। ১৯৮০ সালে জার্মানিতে বাসে ট্রামে ট্রেনে ফারসাইন (Fahrschein) দিতে দেখেছি, ২০০০ সালে গিয়ে দেখা গেল টিকেট (Ticket) দেওয়া হচ্ছে। ফের্নস্প্রেসেরের (Fernsprescher) জায়গা নিয়েছে টেলেফোন (Telefon)।
এখানে বলা দরকার, টিকিট বা টেলিফোন বাংলাভাষায় কোন প্রতিশব্দ নয় – এগুলো সরাসরি ইংরেজি থেকে আগত বিদেশি শব্দ, বরং চেষ্টা হয়েছে এগুলোর বাংলা প্রতিশব্দ তৈরি করার। টেলিফোনের প্রতিশব্দ করা হয়েছে দূরভাষ (ভুল ‘দূরাভাষ’ বিরল নয়), যদিও তার ব্যবহার ব্যাপক হতে পারে নি। টিকিটের জন্য তেমন কোন প্রচেষ্টা চোখে পড়ে নি, হলেও গ্রাহ্য হত না। সম্প্রতি জনপ্রিয় ফেসবুকের (facebook) বাংলা হিসাবে একজন প্রস্তাব করেছেন ‘বদনবহি’। বলা বাহুল্য, বাজারে এর চলার সম্ভাবনা কম। মনে পড়ে গেল, এককালে কিছু ইংরেজি শব্দের দুষ্পাচ্য হিন্দি প্রতিশব্দ করার কেন্দ্রীয় প্রয়াসকে ব্যঙ্গ করে বলা হত নেকটাইয়ের প্রতিশব্দ ‘কণ্ঠলেঙ্গুটি’, বাসস্ট্যান্ড ‘ভোঁ ভোঁ আড্ডা’, রেল স্টেশন ‘ঝিকঝিক ঠান্ডিঘর’—যদিও সরকারের তরফ থেকে এমন কোন প্রস্তাব ছিল না।
পলাশির যুদ্ধের অনেক আগে থেকেই ইংরেজ বণিক আর বাঙালি ব্যবসায়ীদের পণ্য বিনিময়ের সাথে সাথে ভাষার বিনিময় হয়েছে। কোম্পানির শাসন কায়েম হওয়ার পর তার বৃদ্ধিলাভ ঘটেছে। অনেক ইংরেজি শব্দ বাংলাভাষায় প্রবেশ করেছে যেগুলোর ঠিক প্রতিশব্দ বাংলাভাষায় ছিল না। ইংরেজের আগে বাংলায় এসেছে পোর্তুগিজরা। তাই বাংলাভাষায় স্বচ্ছন্দ প্রবেশাধিকার পেয়েছে অনেক পোর্তুগিজ শব্দ – গির্জা চাবি জানালা কেদারা শায়া বালতি। ইংরেজি শব্দের অনুপ্রবেশ অষ্টাদশ আর উনবিংশ শতাব্দীতে ছিল আরো অবাধ।
এই প্রবণতাকে প্রতিহত করতে রবীন্দ্রনাথ সচেষ্ট হয়েছিলেন। শান্তিনিকেতন পত্রিকার আষাঢ় ১৩২৬ সংখ্যায় তাঁর এই উদ্যমের ব্যাখ্যা করে লিখলেন –
সকল প্রকার আলোচনাতেই আমরা এমন অনেক কথা পাই যাহা ইংরেজি ভাষায় সুপ্রচলিত, অথচ যাহার ঠিক প্রতিশব্দ বাংলায় নাই। ইহা লইয়া আমাদের পদে পদেই বাধা। আজিকার দিনে সে সকল কথার প্রয়োজন উপেক্ষা করার জো নাই। এইজন্য শান্তিনিকেতন-পত্রে আমরা মাঝে মাঝে এ সম্বন্ধে আলোচনা করিব। আমরা প্রতিশব্দ বানাইবার চেষ্টা করিব—তাহা যে সাহিত্যে চলিবে এমন দাবী করিব না, কেবল তাহার যাচাই করিতে ইচ্ছা করি, আমি চাই আমাদের ছাত্র ও অধ্যাপকেরা এ সময়ে কিছু ভাবিবেন।
তিনি আলোচনা আর বিতর্কের সূত্রপাত করেছিলেন ‘নেশন’ (nation) শব্দটি নিয়ে। নেশনের বাংলা প্রতিশব্দ হিসাবে প্রচলিত ‘জাতি’ শব্দটি তাঁর মনঃপূত ছিল না। কেন না, তাঁর মতে –
আমাদের ভাষায় জাতি শব্দ একদিকে অধিকতর ব্যাপক, অন্যদিকে অধিকতর সংকীর্ণ। আমরা বলি পুরুষজাতি স্ত্রীজাতি মনুষ্যজাতি পশুজাতি ইত্যাদি। আবার ব্রাহ্মণ শূদ্রের ভেদও জাতিভেদ।
তাই তিনি জাতি সম্পর্কিত ইংরেজি শব্দগুলির প্রতিশব্দের একটা খসড়া পেশ করছিলেন –

শান্তিনিকেতনের পরবর্তী সংখ্যায় তিনি জানাচ্ছেন এই ব্যাপারে কারোর কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায় নি, এবং তার সঙ্গে লিখছেন –
আমি নিজেই বলিয়াছি ‘নেশন’ কথাটাকে তর্জমা না করিয়া ব্যবহার করাই ভাল। ওটা নিতান্তই ইংরাজী অর্থাৎ ঐ শব্দের দ্বারা যে অর্থ প্রকাশ করা হয়, সে অর্থ ইহার আগে আমরা ব্যবহার করি নাই।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর পরবর্তী কালের রচনায় নেশন ব্যবহার করেছেন, কিন্ত সাধারণ্যে শব্দটি আদৃত হয় নি। নেশনের প্রতিশব্দ হিসাবে অধিজাতি চলে নি, জাতি চলেছে এবং চলছে অপ্রতিহতভাবে। ন্যাশনালের বাংলা হিসাবে চলছে জাতীয় কিংবা রাষ্ট্রীয়, ন্যাশনালিজম জাতীয়তাবাদ। ‘জনগণমন’ আমাদের জাতীয় সঙ্গীত কিংবা রাষ্ট্রীয় গীত। জাতীয়তাবাদের জায়গায় কিন্তু রাষ্ট্রীয়তাবাদ প্রচলিত নয়। রেসের (race) প্রতিশব্দ হিসাবে প্রবংশ গৃহীত হয় নি, চলছে প্রজাতি কিংবা সম্প্রদায় – মানব প্রজাতি, মানব সম্প্রদায়। রেসিয়াল কনফ্লিক্টকে (racial conflict) কিন্তু প্রজাতিক সংঘর্ষ না-বলে বলা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ। কাস্ট-এর (caste) প্রতিশব্দ হিসাবে জাতি সগৌরবে বহাল, কথ্যে জাত –তফসিলি জাতি, জাতপাত। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কমলাকান্তের জোবানবন্দীতে’ উকিলের ‘কী জাতি’ প্রশ্নের উত্তরে কমলাকান্তের জিজ্ঞাসা ‘আমি কি একটা জাতি?’। অপ্রতিভ উকিল জানতে চান তিনি কোন জাতীয় বা কোন বর্ণ, কমলাকান্তের উত্তর ‘হিন্দু জাতীয়, ঘোরতর কৃষ্ণবর্ণ’। উকিল তখন মরিয়া হয়ে জিজ্ঞাসা করেন ‘তোমার কি জাত আছে?’, কমলাকান্তের উত্তর ‘মারে কে?’ দেখা যাচ্ছে caste –এর প্রতিশব্দ হিসাবে জাতি বঙ্কিমের মনঃপূত ছিল না, বর্ণও নয়, বরং জাত তাঁর কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য ছিল। বঙ্কিম থেকে রবীন্দ্রনাথ পেরিয়ে মনুর বিধানের বর্ণ আজও বহাল – উচ্চবর্ণ, নিম্নবর্ণ।
স্পিসিজের (species) জন্য রবীন্দ্র-প্রস্তাবিত উপজাতি চলে নি –চলছে প্রজাতি, জীববিদ্যায় কখনো প্রজাতি কখনো জাতি, শ্রেণি, কুল, বর্গ। রেসের (race) প্রতিশব্দ হিসাবে প্রজাতির স্থান প্রায় পাকা, তেমনই tribe-এর প্রতিশব্দ উপজাতি কিংবা জনজাতি –যেমন, scheduled tribe তফসিলি উপজাতি কিংবা জনজাতি। জেনাসের (genus) ) প্রতিশব্দ হিসাবে মহাজাতি গৃহীত হয় নি, জীববিদ্যায় এর প্রতিশব্দ বর্গ বা গণ।
নেশনের (nation) ক্ষেত্রে যেমন তেমনই নাতিবিস্তৃত আলোচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর যুক্তি দিয়ে আরও কয়েকটি ইংরেজি শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ প্রস্তাবের বিষয়ে। শব্দগুলি হল originality/original, sympathy, culture, genetics, compulsory, optional, report, residential. Originality-র প্রচলিত বাংলা প্রতিশব্দ ‘মৌলিকতা’ তাঁর পছন্দ হয় নি। তিনি লিখছেন –
মৌলিক বলিলে সাধারণতঃ বুঝায় মূলসম্বন্ধীয় – ইংরাজিতে radical বলিতে যাহা বুঝায়। যথা radical change = মৌলিক পরিবর্তন। আপনাতেই যাহার মূল, তাহাকে মৌলিক বলিলে কেমন বেখাপ শোনায়। বরং নিজমূলক বলিলে চলে।
Originality-র প্রতিশব্দ হিসাবে তিনি আরও দুটি শব্দের প্রস্তাব রেখেছেন – স্বকীয়তা আর মৌলিন্য। মৌলিন্যের সপক্ষে তাঁর যুক্তি কুলীন থেকে যেমন কৌলীন্য, তেমনই মূল থেকে মৌলিন্য। বিধুশেখর শাস্ত্রী তাঁকে জানিয়েছিলেন কুলীন শব্দ ব্যাকরণের যে বিশেষ নিয়মে উৎপন্ন মূলীন শব্দে সে নিয়ম খাটে না। রবীন্দ্রনাথ শব্দটিকে প্রত্যাহার করেছিলেন এই মন্তব্য করে –
ভুল পুরাতন হইয়া গেলে বৈধ হইয়া ওঠে, নূতন ভুলের কৌলীন্য নাই বলিয়াই ভাষায় তাহা পঙ্ক্তি পায় না।
বিধুশেখর শান্তিনিকেতন-পত্রে আলোচনা প্রসঙ্গে Originality-র প্রতিশব্দরূপে ‘অপূর্বতা’ শব্দের ব্যবহারের প্রস্তাব করেন। রবীন্দ্রনাথের সেটা যথার্থ মনে হয় নি। তাঁর মতে –
‘অপূর্ব সৌন্দর্য ‘ বলিতে আমরা ‘original beauty’ বুঝি না। যদি বলা হয় কবিতাটি অপূর্ব তাহা হইলে আমরা বুঝি তাহার একটি রমণীয়তা আছে, কিন্তু তাহা যে original এমন বুঝি না।
তাঁর প্রস্তাব, অপূর্ব = strange, আদিম = original. উদাহরণ হিসাবে লেখেন অপূর্ব সৌন্দর্য =
আদিম সৌন্দর্য =original beauty, কিন্তু the original Ganges হবে আদি গঙ্গা, the original ancestor আদি পুরুষ – এসব ক্ষেত্রে আদিম খাটবে না।
Sympathy-র বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ চলিত ভাষার শরণাপন্ন হয়েছেন। যদিও আমরা দেখতে পাই অধিকাংশ প্রতিশব্দের ক্ষেত্রে তাঁকে সংস্কৃত এবং সংস্কৃত-ঘেঁষা বাংলা সাধুভাষার আশ্রয় নিতে হয়েছে, sympathy-র জন্য তিনি সুপারিশ করেছেন ‘দরদ’ শব্দটি। তাঁর বক্তব্য – -
‘আমার পরে তাহার sympathy নাই’ ইহার সহজ বাংলা ‘আমার পরে তাহার দরদ নাই’, কিন্তু চলিত বাংলাকে অপাংক্তেয় ঠিক করিয়াছি বলিয়া ক্লাশে বা সাহিত্যে ইহার গতিবিধি বন্ধ। এইজন্য সহানুভূতি বলিয়া একটা বিকট শব্দ জোর করিয়া বানাইতে হইয়াছে। দরদ কথাটি ঘর-গড়া নয়, ইহা সজীব, এইজন্য ইহার ব্যবহারের বৈচিত্র্য আছে। আমরা বলি ওস্তাদজি দরদ দিয়া গান করেন। ইংরাজীতে এস্থলে sympathy শব্দের ব্যবহার আছে – কিন্তু সহানুভূতি দিয়া গান করেন বলিলে
মনে হয় ওস্তাদজি গানের প্রতি বিষম একটা অত্যাচার করেন। যেখানে দরদ শব্দ খাপ খায় না, ণ সেখানে আমি ‘সমবেদনা’ শব্দ ব্যবহার করি, পারৎপক্ষে ‘সহানুভূতি’ ব্যবহার করি না।
এখানেই রবীন্দ্রনাথ থেমে থাকেন নি। তিনি বলছেন ‘এই প্রস্তাবে আমার সহানুভূতি আছে’ চলছে কিন্তু চলতে পারে না, কেন না ‘প্রস্তাবের অনুভূতি নাই, সুতরাং তাহার সহিত সহানুভূতি চলে না।’ Sympathy-র বিশেষণ sympathetic-এর বাংলা তর্জমা ‘সহানুভৌতিক’ ‘সহানুভূতিশীল’ বা ‘সহানুভূতিমান’ তাঁর মতে ‘ভাষায় যেন খাপ খায় না’। তৎসত্ত্বেও সহানুভূতিশীল এখন বাংলাভাষায় পাকাপোক্ত স্থান করে নিয়েছে। Sympathy-র বাংলা প্রতিশব্দ হিসাবে তিনি একটি সংস্কৃত শব্দ নিয়ে এসেছেন ‘অনুকম্পা’ এবং এর বিশেষণ ‘অনুকম্পায়ী’ – এ দুটোই বাংলাভাষায় এখন পরিচিত শব্দ।
Compulsory education-এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘বাধ্যতামূলক শিক্ষা’ তাঁর মতে ‘নতুন সংঘটিত শব্দের মধ্যে কদর্যতায় শ্রেষ্ঠত্বলাভ করেছে’, কেন না ‘বিদ্যাদান বা বিদ্যালাভ হচ্ছে শিক্ষার মূলে –তার প্রণালীতেই কমপালসন’। তিনি প্রস্তাব করছেন ‘ঐচ্ছিক (optional) শব্দটা সংস্কৃতে পেয়েছি। তারি বিপরীতে ‘আবশ্যিক’ চলে কিনা পণ্ডিতদের জিজ্ঞাসা করি’। আমরা দেখতে পাচ্ছি ঐচ্ছিক আর আবশ্যিক এই দুটো শব্দই এখন চলছে, যদিও বাধ্যতামূলককে স্থানচ্যুত করা যায় নি।
‘প্রতিবেদন’ এখন বাংলাভাষায় নিত্যব্যবহার্য শব্দ। আমরা ভুলে যাই এই শব্দটির প্রবর্তক রবীন্দ্রনাথ।
তিনি লিখছেন –
একদিন ‘রিপোর্ট’ কথাটার বাংলা করবার প্রয়োজন হয়েছিল। সেটাকে বানাবার চেষ্টা করা গেল, কোনোটাই মনে লাগল না। হঠাৎ মনে পড়ল কাদম্বরীতে আছে ‘প্রতিবেদন’ –আর ভাবনা রইল না। ‘প্রতিবেদন, প্রতিবেদিত, প্রতিবেদক’ –যেমন করেই ব্যবহার করো, কানে বা মনে কোথাও বাধে না।
তেমনই আর একটি অতিপ্রচলিত শব্দ ‘প্রতিষ্ঠান’ রবীন্দ্রনাথের উদ্ভাবিত। তিনি লিখছেন – -
প্রতিষ্ঠান শব্দটি আমাকে বানাইতে হইল। ইংরাজী কথাটা institution। ইহার কোন বাংলা প্রচলিত প্রতিশব্দ পাইলাম না। যে -প্রথা কোন একটা বিশেষ ব্যবস্থাকে অবলম্বন করিয়া দেশে প্রতিষ্ঠালাভ করিয়া যায়, তাহাকে প্রতিষ্ঠান বলিতে দোষ দেখি না।
তখন ব্রিটিশ শাসনকালে রাজনৈতিক নেতাদের ‘ইনটার্ন ‘(intern) করা হত। সংবাদপত্রে এই শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ হিসাবে ‘অন্তরীণ’ ব্যবহৃত হচ্ছে। এ শব্দটিতে রবীন্দ্রনাথের আপত্তি ছিল। তিনি লিখছেন – -
কিছুকাল পূর্বে যখন ভারতশাসন কর্তারা ইন্টার্ন শুরু করলেন, তখন খবরের কাগজে তাড়াতাড়ি একটা শব্দ সৃষ্টি হয়ে গেল –অন্তরীণ। শব্দ সাদৃশ্য ছাড়া এর মধ্যে আর কোন যুক্তি নেই। বিশেষণে এটা কী হোতে পারে, তাও কেউ ভাবলেন না। Exterment কে তবে কি বলতে হবে ‘বহিরীণ’?
বলা বাহুল্য, অন্তরীণ কায়েম হয়েছে, বহিরীণ হয় নি। তাঁর প্রস্তাবিত ‘অন্তরায়িত’ ‘বহিরায়ণ’ ‘বহিরায়িত’ শব্দগুলি চলে নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সংবাদপত্রের সৃষ্ট আরও কিছু কিছু প্রতিশব্দ বাংলাভাষায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে – -যেমন, ধোঁয়াশা (smog), হিমঘর (cold storage), উড়ালপুল (flyover), পাতালরেল (metro rail)।
‘শব্দচয়ন’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ যে ৪০৫ টি প্রতিশব্দের তালিকা দিয়েছেন তাদের মধ্যে অল্প কয়েকটি বাদে সবগুলোই তৎসম শব্দজাত। তিনি লিখছেন –
সংস্কৃত শব্দভাণ্ডারে আমি কিছুদিন সন্ধানের কাজ করেছিলাম। যা সংগ্রহ করতে পেরেছি তা শ্রীযুক্ত সুনীতিকুমারের প্ররোচনায় প্রকাশ করবার পর তার হাতে অর্পণ করলুম। অন্তত এর অনেকগুলি শব্দ বাংলা লেখকদের কাজে লাগবে বলে আমার বিশ্বাস।
সংস্কৃত বহুল এই সব শব্দের গুরুভার তাদের স্বচ্ছন্দ ব্যবহারে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের স্থান নিয়েছে লঘুতর কিছু শব্দ –যদিও সর্বত্র নয় – নয় তো সরাসরি ইংরেজি শব্দ। কয়েকটি নিদর্শন নিচের সারণিতে প্রদর্শিত হলঃ


তালিকা দীর্ঘায়িত করা যায়, কিন্তু অলমিতি। তালিকাটি দেখে একটা প্রশ্ন জাগে, রবীন্দ্রনাথ কি সিরিয়াসলি (এটাই তো এখন বাংলায় চালু প্রতিশব্দ। ‘ঐকান্তিকভাবে’ না হোক ‘সত্যি সত্যি’ তো ব্যবহার করা যায়!) ভেবেছিলেন এগুলো সাধারণ্যে গ্রহণযোগ্য হবে, নাকি এটা ছিল তাঁর কাছে নিছক শব্দচয়নের খেলা? কেন না, তাঁর নিজের বিপুল রচনার মধ্যে এগুলোর দেখা মেলে কদাচিৎ।
রবীন্দ্রনাথ প্রস্তাবিত প্রতিশব্দের তালিকাভুক্ত অনেক শব্দই যেমন গৃহীত হয় নি, তেমনই বেশ কিছু শব্দ আজকের বাংলাভাষায় কথা বা লেখায় স্থান করে নিয়েছে। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া গেলঃ
charred—অঙ্গারিত, over-population- - অতিপ্রজন, apathy – অনীহা,, technique – আঙ্গিক
condoling/sympathetic – অনুকম্পায়ী, accidental – - আপতিক, resident – আবাসিক
deficiency—ঊনতা, optional – ঐচ্ছিক, tradition – ঐতিহ্য, popular – জনপ্রিয়
simultaneous—তৎকালিক, die-hard—দুর্মর, negative—নঞর্থক, copy – প্রতিলিপি,
progressive –প্রাগ্রসর, grandiloquence – বাগাড়ম্বর, dispensary –ভেষজালয়, cousin – ভ্রাতৃব্য
accurate –যথাযথ, elegant – রোচিষ্ণূ, loose—শিথিল, artisan –শিল্পজীবী, solo – একক সঙ্গীত
misogynist –স্ত্রীদ্বেষী, self-sufficient—স্বয়ম্ভর, collector-general – সমাহর্তা
বিজ্ঞান রবীন্দ্রনাথের বিচরণ ক্ষেত্র না-হলেও কয়েকটি বৈজ্ঞানিক পরিভাষার বাংলা প্রতিশব্দ নির্মাণে তিনি উদ্যোগী হয়েছেন। জেনেটিকসের (Genetics) বাংলা প্রতিশব্দ হিসাবে তাঁর প্রস্তাবিত প্রজনতত্ত্ব মান্যতা পেয়েছে, কিন্তু ইউজেনিক্সের (eugenics) প্রতিশব্দ সৌজাত্যবিদ্যার সে সৌভাগ্য হয় নি। হেরিডিটির (heredity) প্রতিশব্দ বংশানুগতি এবং অ্যাডাপ্টেশনের (adaptation) প্রতিশব্দ অভিযোজনও মান্যতা পেয়েছে। কোন একজনের ব্যবহৃত সেন্ট্রিপেটাল (centripetal) আর সেন্ট্রিফিউগাল (centrifugal) ফোর্সের (force) বাংলা প্রতিশব্দ কেন্দ্রাপসারিণী ও কেন্দ্রাপগামিনী শক্তির জায়গায় তিনি সংক্ষিপ্ত কেন্দ্রানুগ আর কেন্দ্রাতিগ শক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব রেখেছেন। কেন্দ্রাতিগ চালু হলেও কেন্দ্রানুগ হয় নি, সেখানে কেন্দ্রাভিগ চলছে। রবীন্দ্রনাথ ‘ফোর্স’ অর্থে ‘শক্তি’ শব্দ ব্যবহার করেছেন, এখনকার বাংলায় সেটা ‘বল’, আর এনার্জি (energy) বোঝাতে শক্তি।
পরবর্তী সময়ে রচিত ‘বিশ্ব পরিচয়ে’ রবীন্দ্রনাথ নতুন প্রতিশব্দ নির্মাণে খুব বেশি প্রয়াসী হন নি। গ্রাভিটেশনের (gravitation) প্রতিশব্দ মহাকর্ষ না বলে তাঁর প্রস্তাব ভারাবর্তন। শব্দটি চালু হয় নি। বায়ুমণ্ডলের ট্রোপোস্ফিয়ার (troposphere) আর স্ট্রাটোস্ফিয়ারের (stratosphere) জন্য প্রস্তাবিত যথাক্রমে ক্ষুব্ধস্তর আর স্তব্ধস্তরেরও পরিণতি তাই। আলট্রাভায়োলেট রে (ultraviolet ray) আর ইনফ্রারেড রে (infrared ray) –-এদের প্রতিশব্দ হিসাবে তিনি ব্যবহার করেছেন ‘বেগনি-পারের আলো’ আর ‘লাল-উজানি আলো’, কিন্তু এদের প্রচার হয় নি – চলছে অতিবেগুনি রশ্মি আর অবলোহিত রশ্মি।
তথ্য সূত্রঃ
রবীন্দ্র রচনাবলী, জন্ম শতবার্ষিক সংস্করণ, পঞ্চদশ খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ১৩৭৩