• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০১ | জানুয়ারি ২০২৬ | রম্যরচনা
    Share
  • রকবাজির কোলাজ: কোলকাতা ও ছত্তিশগড় (৪) : রঞ্জন রায়

    (ছত্তিশগড় পর্ব ২)

    রায়সাহেব! রায়বাহাদুর!

    আজ আড্ডা বসেছে বন্ধুবর গজ্জু শেঠের নির্মীয়মান হোটেলের লবিতে। এরা সবাই একই পাড়ার পুরনো বন্ধু, সুখে-দুঃখে এ ওর পাশে দাঁড়িয়েছে। একেবারে সেই প্রকৃত বন্ধুর শাস্ত্রীয় সংজ্ঞা মেনে, সেই পাঠশালায় পড়া সুভাষিতাবলীর শ্লোক:

    “উৎসবে ব্যসনে চৈব দুর্ভিক্ষে রাষ্ট্রবিপ্লবে, রাজদ্বারে শ্মশানে যঃতিষ্ঠতি সবান্ধবঃ।”

    উৎসব তো বুঝলাম, ব্যসন? ধরুন দীপাবলীর রাতে জুয়োখেলা। এরা সবাই জানে যে সেদিন দিনভর রাতভর খেলতে হয়—রামি। কে বলেছে? আরে, ভবিষ্যপুরাণে লেখা আছে। কে লিখেছে? সেটাও জান না? পাঁচ হাজার বছর আগে ব্যাসদেব লিখেছেন। তুমি পড়েছ?

    আমি কোত্থেকে? সংস্কৃতে বরাবর গ্রেস মার্কস দিয়ে পাশ করানো হয়েছে। কে করিয়েছে? আরে আমাদের তাউজি, মানে গজ্জু শেঠের জেঠু। স্কুলটার বিল্ডিং যে ওনারই দান করা জমিতে দাঁড়িয়ে। ব্যস্‌ এইটুকুই?

    না, কখনও তিনজনকে ঠেসে রাজদূত মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে রাজপথে চালিয়ে অথবা লালবাতি অগ্রাহ্য করে কেস খেলে সেগুলো ধামাচাপা দেয়া।

    কে দেয়? কেন বিসস্যু ভাইয়া! অজয়ের মামাতো দাদা! উনি একটি থানার ওসি বটেন। বিশাল শরীর, মুখে বসন্তের দাগ। সবাই সমঝে চলে। কোন ট্রাফিক থানায় ওনার একটা ফোনই যথেষ্ট। নাঃ এগুলো ছেলেমানুষি দুষ্টুমি, এগুলোকে ব্যসন বলা যায় কি? অন্য কিছু? নারীঘটিত?

    জানতাম, এইসবই হবে। ঘুরে ফিরে সেই মেয়েমানুষ নিয়ে কেচ্ছার রসালো গল্প। এখন সবাই সিনিয়র, ঘরে বৌ, ছেলেমেয়েরা কেজি স্কুলে যাচ্ছে। এসব যদি পাঁচকান হয়? তাহলে ইজ্জতে গ্যামাক্সিন!

    আহা, হামাম মেঁ সব নাঙ্গা। স্নানঘরে সবাই নির্বস্ত্র। আমার কি ভয় নেই? কোথায় কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোবে কে জানে! তাই আর ভ্যান্তারা না করে বলে ফেল।

    তাহলে একটা পুরনো ঘটনা বলি। একেবারে ব্যসনে-রাজদ্বারে সব একবারে হয়ে যাবে। মানা ক্যাম্প থেকে একটি বাঙালি পরিবার বিলাসপুরের সদরবাজার এলাকায় একটি বাড়িতে ভাড়ায় থাকতে এল। ভদ্রলোক পেশায় চাঁদসী ডাক্তার। এসে একটা দোকানঘর নিয়ে নাগমাতা দাওয়াখানা খুললেন।

    ওনার চিকিৎসার স্টাইল ছিল একদম আলাদা। রোগী এলে রোগ শুনে নিয়ে বলতেন-–কতকা পৈসা ধরে হস? মানে ট্যাঁকে কত টাকা? তারপর দরাদরি। শেষে দু’শো বা তিনশো টাকায় রফা হোল। মানে উনি রোগ সারিয়ে দেবেন এত টাকায়। আদ্দেক আগাম, বাকি সেরে গেলে।

    সাইন বোর্ডে ফণাতোলা সাপ, আর বুক ফুলিয়ে বিজ্ঞাপন—বিনা ছুরিকাঁচিতে অর্শ ও ভগন্দরের চিকিৎসা হয়। কিন্তু ভদ্রলোক করেন অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা, মায় দরকার হলে ফোঁড়া কাটতে ছুরি কাঁচি। আহা, একটা আর এম পি বা রেজিস্টার্ড মেডিক্যাল প্র্যাক্টিশনার-এর নম্বরও বাগিয়েছেন। এতে একটা শর্ত থাকে, সীমার বাইরে গিয়ে ওষুধ দিলে এবং তাতে কোন কেস খারাপ হলে লাইসেন্স বাতিল! মানুষের প্রাণ নিয়ে কথা!

    তা ওনার দাওয়াখানায় গরীব মানুষ এবং গাঁয়ের লোকের ভিড় জমে। ওদের বাঙ্গালী ডাগদর সাহেবের প্রতি অগাধ আস্থা। ফলে উনি একজন রোগীর বুকে স্টেথো লাগিয়ে অন্যজনের অসুখের ফিরিস্তি শোনেন এবং কলম তুলে খসখস করে আরেকজনের প্রেসক্রিপশন লেখেন।

    ফের ভাট বকছ! কাজের কথায় এসো।

    দেখা গেল স্কুল কলেজের সময় ওদের বাড়ি থেকে এক এক করে পাঁচজন ডানাকাটা পরী বেরোয়। ছেলেছোকরাদের মুখে সা-রে-গা-মা-পা! কিন্তু অজয়দের অনুমান সত্যি প্রমাণিত করে তারপর একটা ন্যালাক্যাবলা গোছের ভাই বের হয়। সে আইটিআইতে মেশিনিস্ট হবার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হয়েছে।

    ছোকরার দল ভাইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতালো, তাকে গোলবাজারের ফুচকা আর আলুকাবলি খাওয়ালো—কিন্তু সেসব অপাত্রে দান। অগত্যা ছোকরাগুলো নিজেদের মধ্যে পাঁচ বোনকে ভাগাভাগি করে নিয়ে মন কা লাড্ডু খেতে লাগল।

    --অ্যাই, ‘রে’ কিন্তু আমার। তোরা আজ থেকে ওকে নাম ধরে বলবি না, ভাবী বলবি, বড়জোর ‘রে’ ভাবী। হা-হা-হো-হো!

    এইভাবে কলেজগামিনী ‘সা’ বাদে বাকিরা এদের মানসে স্বয়ংবরা হলেন। কিন্তু মন কে লাড্ডু খেয়ে কতদিন চলে! এবার সুধীর অর্থাৎ যার মানস-প্রেমিকা পঞ্চদশী ‘মা’--সে মরিয়া হয়ে একটা দুঃসাহসিক কাণ্ড করে বসল।

    বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে রাস্তায় একা পেয়ে ‘মা’র দু’গালে দুই চুমো! শীতের সকালে কোন একটা মেয়েলি ব্রত উপলক্ষ্যে মেয়েটি অরপা নদীতে জল সইতে, নাকি পুজোর বাসি ফুল বেলপাতা বিসর্জন দিতে যাচ্ছিল।

    আমরা বলেছিলাম—হিম্মতে বান্দা, মদতে খোদা! যে সাহস করে, স্বয়ং ভগবান তার সহায় হন।

    আমরা ওকে গরম চা আর ঘুগনি খেতে দিয়ে থরথর বুকে শুধোই—তুই করে ফেললি! আচ্ছা, ভাবী কী বলল?

    সুধীর হেসে বলল- ওম্মা, কী অসভ্য! বঙ্গালি মেঁ বোলী!

    তবে মেয়েটি ঠিক একা ছিল না। একটু পেছনে আসছিল ওর সেই ভাই। একে কুয়াশা, তায় সুধীর হুডি পরে ছিল। ছেলেটার সন্দেহ হলেও পুলিশের কাছে জোর দিয়ে বলতে পারেনি। হ্যাঁ, মেয়ের বাবা সেই চাঁদসী ডাক্তার থানায় গিয়েছিলেন।

    আমরা জানি না পঞ্চদশী আদৌ সুধীরকে কী বলেছিল। কিন্তু এটা সত্যি যে ও উল্টোদিকে ঘুরে এক দৌড়ে বাড়ি চলে এসেছিল এবং মাকে বলে দিয়েছিল। মা ছেলেকে জিজ্ঞেস করে ব্যাপারটা ভালো করে জেনে মেয়েকে দুই চড় কষালেন এবং চুলের মুঠো ধরে ঝাঁকিয়ে বললেন—মুখপুড়ি!

    তারপর ডাক্তারবাবুকে বললেন থানায় না যেতে। এতে হবে না কিছুই, খালি মেয়েটার বদনাম হবে। কিন্তু ডাক্তারবাবু বাঙাল! আর উনি অযাচিত ভাবে পেয়ে গেছেন আই-উইটনেস, যে দিব্যি গেলে বলেছে—থানায় বা আদালতে ও টস্‌ সে মস্‌ হবে না। সাক্ষী দেবে, বখাটে ছেলেগুলোকে ঘানি টানিয়ে ছাড়বে।

    উনি নিজের চোখে ঘটনাটি দেখেছেন। মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছিলেন—ডাক্তারের পরামর্শ মেনে।

    যেখানে ঘটনা ঘটেছিল তার পাশেই ওনার, মানে হিটুমল ঘিটুমল সিন্ধি শেঠের বাড়ি। ওনাদের ট্রান্সপোর্টের বড় ব্যবসা, ওনার এই লক্ষ্মীছাড়া ছেলেগুলোর উপর পুরনো রাগ ছিল। ওদের মধ্যে হিরো দেখতে অজয় ওনার মেয়েকে জ্বালিয়েছিল। তাই আদরের মেয়েকে বেশ দূরে বিয়ে দিয়েছেন।

    থানায় এফ আই আর হোল। সুধীর একদিন লক আপে রইল। কিন্তু বন্ধুরা লেগে পড়ল। পলিটিক্যাল সাপোর্ট ও উকিল জোগাড় হোল। সুধীর বাড়ি এসে মুষড়ে পড়েছিল। কারণ আদালতে কেস উঠেছে। চার্জশিট ফাইল হয়েছে। চার্জ ফ্রেম করার আগের দিন সবার টেনশন। যদি আদালতে ট্রান্সপোর্ট মালিক হিটুমল সাক্ষী দেয় তাহলে সুধীরের জেল কাস্টডি হবে। মামলা চলবে এবং জামিন পেতে সমস্যা হবে।

    ফিল্ডে নামল বন্ধু অজয়। সন্ধ্যেবেলা একটা ফোলিও ব্যাগ হাতে নিয়ে গেল ট্রাকমালিকের বাড়ি। আধঘন্টা পরে গম্ভীর মুখে ঠেকে ফিরে এল। তারপর সুধীরের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল--ঘাবড়াও মৎ! আমাদের দোস্ত জেলে যাবে না।

    গোপন রহস্যটা কী সেটা ফাঁস হোল না। তবে পরের দিন কাঠগড়ায় উঠে হিটুমল বলল— হ্যাঁ, জঘন্য ঘটনাটি আমার চোখের সামনেই ঘটেছে। এরকম বদমাসদের মোড়ের মাথায় দাঁড় করিয়ে জুতোপেটা করা উচিত। পুলিশ অপরাধীকে খুঁজে বের করুক। তবে ঘন কুয়াশায় কারও মুখ চেনা কঠিন ছিল। তায় অপরাধী হুডি পরে এসে দুষ্কর্মটি করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পালিয়ে গেল। এই ছেলেটিই সেই বদমাশ কিনা তা নিশ্চিত করে বলতে পারব না।

    কেস কেঁচে গেল। তবে আমরা নিজেদের মধ্যে কসম খেলাম যে মেয়েদের নিয়ে অমন বাজি ধরা বা অ্যাডভেঞ্চার করা-–এসব আমাদের জন্যে বাকি জীবন আউট অফ সিলেবাস হয়ে থাকবে। একটি মেয়ের সম্মানের প্রশ্ন—আমাদের অনেকের বাড়িতেই বোন আছে। তখন কেন যে ওদের মুখ মনে পড়েনি।

    পরের বছর পঞ্চকন্যার পিতা এই শহর ছেড়ে অন্য কোন ছোট শহরে গিয়ে ডেরা বাঁধলেন। দুটো কারণ। না, এর কোনটাতেই আমাদের হাত ছিল না।

    এক, কিছু ভাল হাসপাতাল এবং এম ডি ডাক্তারের আগমনে ওনার পশারে ভাটার টান।

    দুই, বাঙালির জবরদস্তি হিন্দি বলতে গিয়ে গুছিয়ে ছড়িয়ে ফেলা।

    হয়েছে কি, উনি এক রোগিণীর জিভ দেখতে চাইলেন। কিন্তু ‘জিভ দিখাও’ না বলে হিন্দি ফলাতে গিয়ে বললেন ‘জোবান দিখাও’। এখন কথ্য হিন্দিতে মেয়েদের ‘জোবন’ বা ‘জোবনা’ বলতে বোঝায় স্তন। বিশ্বাস না হয় চটুল ভোজপুরি গীত শুনে দেখবেন!

    ওনার দোকানে হামলা হল। উনি হাতে এবং মাথায় আঘাত পেলেন। আমরা খবর পেয়ে দৌড়ে গিয়ে উন্মত্ত জনতাকে কোনরকমে ঠেকালাম। সুধীর ওনাকে শরীর দিয়ে আড়াল করে বাঁচাতে গিয়ে পায়ে এবং পিঠে বেশ কিছু চোট পেল। এরপর ওনার বিলাসপুর থেকে চলে যাওয়া ছাড়া অন্য কোন বিকল্প ছিল না। আমাদের জন্য ‘বৃন্দাবন অন্ধকার’।

    এবার বাকি তিনটে। শ্মশানকে বিলাসপুরে মিষ্টি করে বলা হয় ‘মধুবন’। বিশ্বাস করুন, এমন মিষ্টি মিষ্টি নাম দিলে শ্মশানযাত্রার বীভৎসতা অনেকখানি কমানো যায়। যেমন বর্তমান সময়কে “অমৃতকাল” বলায় আমাদের একেবারে ‘কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো’ হয়ে রোজকার শুধু দিনযাপনের শুধু প্রাণধারণের গ্লানি অনেকটা সহনীয় হয়েছে। এমন কি চিতায় ওঠার সময় মৃতদেহের সূক্ষ্ম শরীর এটা জেনে তৃপ্তি পায় যে তাকে ‘মধুবনে’ নিয়ে আসা হয়েছে।

    শহরের দুই প্রান্তে দুটো সরকারি মধুবন রয়েছে। আমাদের বন্ধুদের পরিবার তো বটেই, শহরের চেনাজানার কারও মৃত্যুসংবাদ পেলে আমরা দল বেঁধে হাজির হয়ে যাই। চালি বাঁধা, কফনের কাপড় ও ফুল আনা, অগুরু ছিটিয়ে দেয়া, মধুবনে আগেভাগে পৌঁছে একটা চিতা বুক করা, কাঠ কিনে সাজিয়ে ফেলা যাতে আগুন চটপট লাগে, এবং সবশেষে শবের খুলি ফাটানোর লাঠি এবং জলের হাঁড়ির বন্দোবস্ত করা। তা ছাড়া ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে ডোমের রেজিস্টারে এন্ট্রি করিয়ে নেয়া—এসবও আছে।

    আমি আর সুধীর ভাল করে চালি বাঁধতে পারি। সুমন চিতা সাজানোয় ওস্তাদ, অজয় জুগাড়মেন্টে, আর শওকত ভাই চিতা জ্বলে শেষ হলে মৃত ব্যক্তির সম্বন্ধে একটি নাতিদীর্ঘ লেকচার দেয়ায়। সবাই শ্রদ্ধার সঙ্গে শোনে। পরিবারের লোকজন নতুন করে জানতে পারে যে তাদের বাবা অথবা কাকু অথবা পিসি এঁরা কত ভাল লোক ছিলেন! আফশোস, বেঁচে থাকতে কেন টের পাওয়া যায়নি?

    অবশ্য আমি জানি সুমনের ওটা সেটপিস লেকচার। খালি প্রত্যেকবার মৃতের নামগোত্র বদলে দিয়ে বলে।

    বুঝতেই পারছেন, বিলাসপুর শবযাত্রায় কোলকাতার তুলনায় একযুগ পিছিয়ে আছে। এখানে শবযাত্রায় কাঁধ দেয়া পুণ্যের কাজ। রাস্তা দিয়ে কোন হিন্দুর শবযাত্রা যাক বা মুসলমানের কফিন, সমস্ত পদযাত্রী এবং গাড়িঘোড়া থেমে যাবে এবং এভাবে নীরব হয়ে শ্রদ্ধা প্রকাশ করবে।

    আর কাঁধে বইতে অন্তত ছয় থেকে আটজন লাগে। কয়েক মিনিট চলার পরই কাঁধ বদলাতে হয়। একজন এসে নীরবে আপনার কাঁধে টোকা দিয়ে চালির নীচে ঢুকে কাঁধ লাগায়। আর সূর্য ডুবলে কেউ শ্মশানে যায় না। বিকেলে মারা গেলে আপনাকে ঘরে শুইয়ে রাখা হবে। পরের দিন সকাল বেলায় চালিতে ওঠার সৌভাগ্য হবে। তাই রাত্তিরে পিলি চমকানো “বল হরি! হরি বোল!” এর বদলে দিনের বেলা মৃদু কন্ঠে বলা হয় “রাম নাম—সত্য হ্যায়; সবকা এহী --গৎ হ্যায়”।

    বাকি রইল—দুর্ভিক্ষে রাষ্ট্রবিপ্লবে। সেরে দিচ্ছি।

    হয়ত জোয়ান বেকার ছেলেকে বাবা বললেন ‘না কোঈ কাম কা, না কাজ কা--দুশমন আনাজ কা’ অর্থাৎ ব্যাটা কোন কাজের নয়, শুধু অন্নধ্বংস হয়। এরপর একদিন বলা হল—বেরিয়ে যা! নিজের পথ দেখ। আমি আর টানতে পারব না। তখন সেই ছেলে পথে নেমে বুঝতে পারে দুর্ভিক্ষ কী জিনিস মামু।

    বন্ধুরা জানে, বাবা ক’দিন পরেই খবর পাঠাবে-–বাছা, যেখানেই থাক ফিরিয়া আইস। কেহ তোমাকে কিছু কহিবে না। তোমার মাতা ঠাকুরাণী অন্নজল ত্যাগ করিয়াছেন। টাকাপয়সার দরকার হইলে সত্বর জানাও।

    কাজেই সেই gestation period -- হিন্দিতে লেখা ইকনমিকসের পাঠ্য বইয়ে যার প্রতিশব্দ ‘গর্ভাবস্থা’—সময়ে বন্ধুরা থাকাখাওয়ার ব্যবস্থা করে, টিউশনি খুঁজে দেয়। এতদিন কেন খোঁজেনি কে জানে! আর বন্ধুকে সাহস জোগায়—মাথা উঁচু করে থাক। কোন পাপ করিসনি। তুই কোন চাকরি পাসনি সেটা তো সরকারের দোষ। গোটা দেশেরই এই হাল।

    এবার রাজদ্বারে।

    ইন্দিরাজী এমার্জেন্সি ঘোষণা করলেন। ব্যাপক ধরপাকড়। সাধারণ উর্দি পরা সেপাই পর্যন্ত কালেক্টরের রোব দেখিয়ে কথা বলত। এদের মধ্যে আমাদের দু’জন জয়প্রকাশ নারায়ণের নাম নিয়ে স্থানীয় স্কুল ও কলেজে মিছিল বের করায় গ্রেফতার হল। ব্যস্‌ এদের পুরো গ্রুপটাই ইন্দিরা ও এমার্জেন্সি তথা নসবন্দী বিরোধী হয়ে গেল। নানান গোপন কাজকর্ম, যেমন ইস্তেহার ছড়িয়ে দেয়া, গোপন শেল্টারের বন্দোবস্ত, --এসবে ভিড়ে গেল। তারপর একদিন পুলিসের হুড়ো খেয়ে বিলাসপুর ছেড়ে দূরে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিল। একজন তো একটি সরকারি হেলথ সেন্টারে ডাক্তার মামাতো দাদার কম্পাউন্ডার সেজে ছিল।

    যাহোক, দু’বছর পরে এমার্জেন্সি উঠে গেলে ফের ঘরের ছেলে ঘরে। কিন্তু ততদিনে প্রায় সবার মোহভঙ্গ হয়েছে। কেউ কথা রাখেনি যে! প্রায় সবাই সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে আগের মত কেউ কংগ্রেস সমর্থক, কেউ সমাজবাদী কেউ বিজেপি হয়ে গেল। কিন্তু বন্ধুত্বের নাড়ি কাটেনি। তাই আজ সবাই হাজির হয়েছে গজ্জু শেঠের ডাকে।

    প্রাথমিক কুশলমঙ্গলের আদান-প্রদান হলে গজ্জু হোটেলের বেয়ারাকে দিয়ে সবার সামনে ধোঁয়া-ওঠা কফির কাপ এবং একটি প্লেটে বেশ কিছু পানের খিলি সাজিয়ে দিল।

    সবাই বুঝল, কিছু একটা মতলব আছে।

    গজ্জু মিচকি হেসে হাতটাত কচলে বলল—দোস্ত, তোদের ডেকেছি বড় ফাঁপরে পড়ে। একটু সাহায্য চাই। জানি, তোরা না করবি না।

    সবার চোখে প্রশ্ন: কী কেস? আয়করের রেড? নাকি সেল ট্যাক্স? আবগারি নয় তো! এই আদ্দেক তৈরি হোটেলে কেউ গাঁজাটাজা লুকিয়ে রেখে ধরা পড়েছে?

    গজ্জু মিটিমিটি হাসে আর মাথা নেড়ে।

    তাহলে? ন্যাকামি না করে ঝেড়ে কাশো দিকি!

    আমার রায়সাহেব খেতাব চাই!

    মানে? কথাটা ঠিক বুঝতে পারছি না।

    এতে না বোঝার কী আছে? যেমন রায়সাহেব বনোয়ারিলাল আছেন না! অরপা নদীর ওপারে সরকন্ডা পাড়ায়—বিশাল কোঠি। বেশ কয়েকবার বিধায়ক হয়েছিলেন?

    --তাতে তোর কী? উনি বিলাসপুরের বিধায়ক নন, কাঠগোরা আদিবাসী এলাকার। আর গত দুটো ইলেকশনে গোহারা হেরেছেন। আর দাঁড়াবেন না। অনেক বয়স।

    তোর কিসে ইল্লি হচ্ছে? তুই দাঁড়াতে চাস? তাহলে কিন্তু ভিটেমাটি চাটি হবে, বলে দিলাম। এই যে হোটেল বানিয়েছিস, এখনও পুরো হয়নি। ব্যবসা শুরু হতে অন্তত আরও চার মাস—সেটা ভেবেছিস?

    --ধুস্‌ যত আহাম্মকের দল! ইলেকশানে দাঁড়াব কেন? আমি মাড়োয়ারি বানিয়া, আমার কাজ ওয়ান টু কা ফোর করা। আমরা মাড়োয়ারিরা হলাম লক্ষ্মীপুত্র, ধুলোমুঠি করে টাকা বানানোর মন্তর জানি। কিন্তু সম্মান? ভেবে দ্যাখ, এই শহরে পয়সাওলা মাড়োয়ারি অনেক আছে। বনোয়ারিলালও মাড়োয়ারি। কিন্তু গোটা জেলায় উনিই একমাত্র রায়সাহেব।

    ওনার তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে। কোনদিন মুখে গঙ্গাজল দিতে হবে কে জানে! এখন আমি যদি রায়সাহেব হয়ে যাই আমার নাম হবে রায়সাহেব গজানন মাহেশ্বরী। নেমপ্লেটে, লেটার প্যাডে সব জায়গায় লেখা হবে – রায়সাহেব গজানন শেঠজী। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে আমি হব বিশিষ্ট অতিথি। এই শহরের একমাত্র রায়সাহেব। আমাকে নিয়ে কত লোককথা, দন্তকথা তৈরি হবে। লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়বে।

    আচ্ছা, তোদের ছেলেমেয়েরা যখন এটা জেনে বড় হবে যে তাদের বাবার বন্ধু একজন রায়সাহেব, তোদের গর্ব হবে না? আর তোদের গিন্নিরা?

    --হুঁঃ , মুঙ্গেরীলাল কী হসীন স্বপ্নে! আমাদের গজ্জুলালের মধুর স্বপ্ন! এইসব পাগলামি শোনাতে আমাদের ডেকেছিস?

    কেন? পাগলামি কেন? গজ্জু গম্ভীর হয়।

    --এই জন্যে যে ওটা আর সম্ভব নয়। ওইসব রায়সাহেব, রায়বাহাদুর উপাধি ইংরেজ সরকার দিত চামচাগিরিতে খুশি হয়ে। ১৯৪৭ সালে ওরা বিলেত চলে গেছে আর নতুন করে ওইসব টাইটেল দেয়া বন্ধ হয়ে গেছে। স্বাধীন দেশে ভারত সরকার দেয় পদ্ম পুরস্কার।

    তাহলে তোরা আমায় হেল্প করবি না? এই তোদের আসলি চেহারা? আমি তাহলে কমলী বাঈকে কী করে মুখ দেখাব?

    গজ্জুর চেহারা বদলে যায়, যেন এক্ষুনি কেঁদে ফেলবে।

    আমরা শশব্যস্ত হয়ে বলি--খুলে বল দিকি, কী কেস আর কে ওই কমলী বাঈ?

    ও নাক টানে, তারপর বলে—তোরা তো জানিস আমি গান ভালোবাসি, শস্তা ফিল্মি গান নয় –পাক্কি গানা। কম সে কম সায়গল সাহেবের মত। তাই মুজরো শুনতে শনিবার রাতে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে মুঙ্গেলীর রামলাল সাউয়ের পাড়ায় যাই। সেখানে আমার পছন্দ কমলী বাঈয়ের গানা।

    সেদিন ঠুংরি শোনার পর কিমাম দেয়া পান চিবুচ্ছি, কমলীর মা শরবতের গেলাস এগিয়ে দিয়ে বলল--খালি পয়সা ছড়ালেই বড়মানুষ হওয়া যায় না। লোকে যারে বড় বলে--! যেমন রায়বাহাদুর বা রায়সাহেব। হমেঁ বাত লগ গয়ী। বললাম—এ আর কি! আমিও চাইলে রায়সাহেব হতে পারি।

    --হয়ে দেখাও শেঠ।

    কমলী হেসে বলল—আমার শেঠজি ফালতু ডিং মারে না। পারবে না শেঠ?

    এই হোল কিসসা। আমাকে রায়সাহেব টাইটেল পাইয়ে দে।

    --ওরে গোমুখ্যু! তোর জন্যে বিলেত থেকে ইংরেজ ধরে আনতে হবে? এর চেয়ে ষাঁড়ের দুধ আনার আবদার করলে পারতি।

    গোমুখ্যু আমি নই, তোরা। কে লালমুখো সায়েবের হাত থেকে মানপত্র চায়? আমি স্বাধীন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকের থেকে মানপত্র নেব। বিলাসপুরের একনম্বর নাগরিক কে? মেয়র সতীশ উপাধ্যায়। উনি আবার সেরা উকিল। থাকেন জুনী লাইন এলাকায়, সুমনদের পাড়ায়। সুমনের কাকামণি ওনার দাবা খেলার বন্ধু এবং উকিল। তোরা ওনার ইলেকশনে খুব খেটেছিলি। ওনাকে রাজি করা। বেশি ঝামেলা করতে বলছি না।

    মধ্যনগরী দুর্গাপূজা চৌকে একটা স্টেজ বানিয়ে আমাকে মঞ্চে তুলে ওনার হাত থেকে মানপত্র পাইয়ে দে। তাতে লেখা থাকবে-–বিশিষ্ট সমাজসেবী গজানন মাহেশ্বরীকে তাঁর সেবা ও উন্নয়ন কার্যের জন্য নাগরিক কমিটির তরফ থেকে ‘রায়সাহেব’ উপাধি দেয়া হচ্ছে। তাতে ওনার সাইন থাকবে। এরপর ফুলমালা—যাকে বলে চন্দন! বন্দন! অভিনন্দন!

    ছোটখাটো বক্তৃতা ও চায় নাস্তা। প্রেস আসবে, ফটো তুলবে। পরের দিন সব লোক্যাল পেপারে পেছনের পাতায় বড় করে মানপত্র দেবার ছবি ও খবর ছাপা হবে, সঙ্গে আমার ইন্টারভিউ। সব খরচা আমার। আমি নেমপ্লেট অর্ডার দিয়ে দিয়েছি। সেই সার্টিফিকেট নিয়ে মুজরো শুনতে যাব, কমলীকে দেখাব। এই সহজ কাজটা তোরা পারবি নে?

    আমরা কোরাসে বলি—আমেন!

    (চলবে)



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments