


এখনকার আধুনিক বাঙালি প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথ পড়ে না, রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনে না। শোনে না মানে শোনে, কিন্তু শোনে না। শুনবে কেন? রবীন্দ্রনাথ তো অপ্রাসঙ্গিক! ইর্রেলেভেন্ট্! বাড়িতে যখন লোক আসে, মানে মাসি-পিসি মামা-জ্যাঠা, তখন বাবা-মা হয়তো কখনো কখনো রবীন্দ্রসঙ্গীত চালায়। সেটা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, একটা আবহ বানানোর উদ্দেশ্যে। তাঁরাও গানটা শোনেন বলে মনে হয় না। কিছু চেনা-চেনা কথা আস্তে আস্তে ঘরের পেছনে কিছু চেনা-চেনা সুরের সাথে ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে। সেটা পরিচিতির প্রাণহীন স্বস্তি। মাথা ঘামানো দূরের কথা, বোধ বা অনুভূতিরও কোনো প্রয়োজন নেই।
আশি বছরেরও আগে রবীন্দ্রনাথ মারা গেছেন। মরে প্রমাণ করেছিলেন যে তিনি মরেননি। তারপর কখন যে তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যু হল, আমরা কেউ টের পাইনি। হবারই কথা। একজন মানুষ কতদিন বাঁচবেন? ন্যায্য সময় পেরিয়ে গেছে বহুযুগ আগে। তুমি আপত্তি করে বলতে পারো, “কিন্তু আমরা তো এখনো তাঁর বানানো ভাষায় কথা বলি!” কিন্তু সেটা বলা কি ঠিক হবে? আমাদের তো এখন “বাংলাটা ঠিক আসে না।”
তবু।
এখনো, মাঝে মাঝে, সত্যিকারের অবসরের মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথ তোমাকে অবাক করতে পারেন। যদি দিনটা ভালো হয়।
প্রাঙ্গণে মোর শিরীষশাখায় ফাগুন মাসে
কী উচ্ছ্বাসে
ক্লান্তিবিহীন ফুল ফোটানোর খেলা।
ক্ষান্তকূজন শান্তবিজন সন্ধ্যাবেলা
প্রত্যহ সেই ফুল্ল শিরীষ প্রশ্ন শুধায় আমায় দেখি,
'এসেছে কি-- এসেছে কি।'
ভৈরবী রাগের গান। সাতষট্টি বছর বয়সে লেখা। লিখেছিলেন চৌরঙ্গীতে কোথাও বসে। বা হয়তো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। ওনার পক্ষে সব সম্ভব।
সুর বাদ দাও। ছন্দ বাদ দাও। অনুপ্রাস অলংকার (ক্ষান্তকূজন শান্তবিজন) সব বাদ যাক, সে আমার যতই কষ্ট হোক্। যতই বাদ দিতে যাও না কেন, মাধুরীটা রয়ে যাবে। লাইনের বাইরে, লাইনের ভেতরে সব মিল বাদ দাও (ক্লান্তিবিহীন ক্ষান্তকূজন)। শব্দ চয়ন বাদ দাও (ফুল্ল)। শুধু সার কথাটা শোনো।
একটা শিরিষ গাছে ফুল ধরেছে। অনেক ফুল। হাওয়ায় নড়ছে। মাসটা ফাল্গুন। সময়টা সন্ধে।
শুধু তাই নয়, মনে হচ্ছে গাছটা বা ফুলগুলো যেন কারুর অপেক্ষায় আছে। সারা দিন ধরে শিরিষ বসে আছে কারো জন্য। দিনের শেষেও সেই প্রতীক্ষার শেষ হয়নি। আরো মনে হচ্ছে যে শিরিষ জিজ্ঞেস করছে, “সে কি এসেছে?”
কে? কে এসেছে? কার আসার কথা?
আর বছরেই এমনি দিনেই ফাগুন মাসে
কী উচ্ছ্বাসে
নাচের মাতন লাগল শিরীষ-ডালে
স্বর্গপুরের কোন্ নূপুরের তালে।
প্রত্যহ সেই চঞ্চল প্রাণ শুধিয়েছিল, শুনাও দেখি
'আসে নি কি-- আসে নি কি।'
হুম্।
শিরিষ আগেও এ রকম করেছিল। যেন স্বর্গের কোনো অদৃশ্য অপ্সরার নূপুরের তালে নেচেছিল, দুলেছিল। তখনো রোজ তার একই প্রশ্ন ছিল – হয় আশা-ভরা “সে কি এসেছে?” নয়তো হতাশা-মেশানো “না কি আসেনি?”
কিন্তু কে সেই জন? কার অপেক্ষায় এত চঞ্চল তোমার শিরিষ?
আবার কখন এমনি দিনেই ফাগুন মাসে
কী আশ্বাসে
ডালগুলি তার রইবে শ্রবণ পেতে
অলখ জনের চরণ-শব্দে মেতে।
প্রত্যহ তার মর্মরস্বর বলবে আমায় কী বিশ্বাসে,
'সে কি আসে-- সে কি আসে।'
তুমি বুঝতে পারছ যে ভবিষ্যতেও সেই একই ব্যাপার ঘটতে চলেছে। কিন্তু ‘উচ্ছ্বাস’-এর বদলে এবার ‘আশ্বাস’-এর কথা হচ্ছে, ‘বিশ্বাস’-এর কথা হচ্ছে। যাকে দেখা যায় না, তেমন কারুর পায়ের শব্দ শুনবে বলে, শিরিষ বসে থাকবে। কান তো নেই যে পাতবে, তাই ডাল মেলে থাকবে শুনতে পাবার আশায়। আর সেই এক প্রশ্ন করবে, “সে কি আসছে? সে কি আসবে?”
প্রশ্ন জানাই পুষ্পবিভোর ফাগুন মাসে
কী আশ্বাসে,
'হায় গো আমার ভাগ্য-রাতের তারা,
নিমেষ-গণন হয় নি কি মোর সারা।'
প্রত্যহ বয় প্রাঙ্গণময় বনের বাতাস এলোমেলো--
'সে কি এল-- সে কি এল।'
এ কি?!
হঠাৎ দেখছি প্রশ্নটা আর শিরিষ করছে না। করছো তুমি নিজে। কোনো এক অপ্রতিরোধ্য আশা নিয়ে তুমি বসে আছো সে আসবে বলে। কে সে? তোমার অবিরত অপেক্ষার জন্য তুমি তোমার ভাগ্যের কাছে আক্ষেপ করছো। যেন সময় গুণে তোমার জীবন কেটে যাচ্ছে কারো প্রতীক্ষায়। চারপাশে মুকুল-ঝরানো তোমার-সম্বন্ধে-উদাস হাওয়া ঘুরে বেড়াচ্ছে। তুমি শুধু বাঁধা আছো একটা আমরণ অনিশ্চিত আশার আলিঙ্গনে।
মাসটা কি ফাল্গুন? সময়টা কি সন্ধে?
গান বা কবিতার প্রসঙ্গে ঠিক প্রশ্নটা হল, “সে কি এসেছে / আসবে?” কিম্বা হয়তো ওটা আদৌ কোনো প্রশ্নই নয়। হয়তো ওটা একটা আশার অভিব্যক্তি।
“সে কে?” এই প্রশ্নটা ভুল। না, ঠিক ভুল হয়তো নয়। প্রশ্নটা ব্যক্তিগত।
বাঙালি কবির এই গানের চব্বিশ বছর পর, আইরিশ নাট্যকার স্যামুয়েল বেকেট “Waiting for Godot” নামে একটা নাটক লিখেছিলেন (প্রথমে ফরাসীতে লিখে, পরে ইংরিজিতে অনুবাদ করেন)। নাটকটাতে স্টেজে প্রথম থেকে শেষ অবধি কয়েকটা ভবঘুরে-গোছের লোক ‘গোডো’ নামক কারুর জন্য অপেক্ষারত। তারা অপেক্ষা করছে আর নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছে। ব্যস, এই নিয়ে নাটক। এই ‘অ্যাবসার্ড’ নাটকটার অন্তত দুটো বাংলা অনুবাদ আছে। কোনো এক সাংবাদিক নাকি বেকেটকে জিগ্যেস করেছিলেন, “গোডো কে?” বেকেট উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি কি ছাই জানি নাকি!”
অমিত রায় থাকলে বেকেটকে প্রশংসা করে বলত তীরের মত, বর্শার ফলার মত, কাঁটার মত। রবি ঠাকুরকে পরিহাস করে বলত ফুলের মত, চাঁদের মত। বেকেট যদি হন খোঁচাওয়ালা কোণওয়ালা গথিক গির্জা, আমাদের রবি ঠাকুর হলেন মন্দিরের নিটোল মণ্ডপ।
কিসের লাগি সদাই জাগি?
কাহার কাছে কী ধন মাগি?
তাকাই কেন পথের পানে?
আমিই জানি, মনই জানে।
বর্তমান কালে রবীন্দ্রনাথ হয়তো আর প্রযোজ্য নন, হয়তো তিনি অবান্তর। কিন্তু তুমি কি কারো / কিছুর অপেক্ষায় বেঁচে আছো? তুমি কি তার পরিচয় জানো?