


একেবারে ঠিক ধরে ফেলেছেন পাঠিকা, এই উপাখ্যানের অকুস্থল সেই আমাদের অতিপরিচিত অথচ অধুনাবিস্মৃত "গঞ্জংশন" মধুপুর। কি আর প্রশংসা করবো আপনাদের বুদ্ধিমত্তার।
আট/ন' নম্বর আর এগারো/বারো নম্বর কুণ্ডু বাংলোর মাঝে বিস্তৃত ফাঁকা জমির ঠিক মধ্যিখানে ছিলো একটি বড়সড় ইঁট ও কাঠের ঢিপি। যার নাম আদর করে দুনিয়া দিয়েছিলো দশ নম্বর। এর উত্তর দিকটায়, সাতাশ/আটাশ আর ঊনত্রিশ/ত্রিশ নম্বর বাংলো দুটোর মাঝখানে ছিলো একটি খেলাধুলোর মাঠ। এলাকাটায় ছিলো পাহারাদারের ছড়াছড়ি - দশ নম্বরে সজাগ থাকতো একটি শংখচূড় দম্পতি, নিরীহ অহিংস টাইপের। আমবাগানের ইজারাদার মেওয়ালালের রামছাগলগুলো তাদেরই আশেপাশে ঘাসপাতা আর গোয়াল-নটের শাক নির্ভয়ে খেয়ে বেড়াতো, সেই "বাস্তুসাপেরা" তাদের কিছু বলতো না। আর মাঠের দিকে দণ্ডায়মান ছিলো অতি বৃদ্ধ এক বীজের বেলগাছ - তল্লাটের ওয়ান অ্যান্ড ওনলি। স্বাভাবিক ভাবেই ব্রহ্মদৈত্যতে ভর্তি।
বিহারের কোনো এক বিখ্যাত ভূমিকম্পের সময়ে নাকি নির্মায়মাণ দশ নং কুণ্ডু বাংলো ভেঙে পড়ে। আর সে ওঠেনি। (এখন ঐ ঠিকানায় ঝাড়খণ্ড বিদ্যুৎ কোম্পানির মধুপুর দপ্তর।)
হ্যাঁ যা বলছিলাম, ওই মাঠটিতে খেলা হতো। আমাদের ব্যাট বল খেলা। প্রায় ক্রিকেটেরই মতো, তা আমরা কেউ কেউ লিখতাম কৃকেট, পুরোনো টেনিস বল দিয়ে খেলা হতো কিনা! "লাস্ট ম্যান ব্যাটিং"-ও ছিলো। ইঁটের উইকেট। অনেকেই বুঝতে পারবেন।
একদিন অমনি খেলা চলছে, মেয়েরা গোমড়া মুখে দেখছে, বেলগাছে আর দশ নম্বরে যাঁরা থাকতেন তাঁরাও হয়তো দেখছেন, হঠাৎ কয়েকজন আদিবাসী আর দেহাতী ছেলে ন' নম্বরের গাব গাছটার তলায় এসে দাঁড়ালো - একজনের হাবভাব সর্দার সর্দার।
আমরা অকারণেই একটু উত্তেজিত হয়ে উঠে হুল্লোড় আরো বাড়ালাম। এরই মধ্যে একজন আউট গোছের হলো। চিরাচরিত ঝগড়াটাও মুহূর্তের মধ্যে শুরু হয়ে গেল - আউট না নট আউট।
মিনিট কয়েক বচসাটা দেখার পর আমাদের দিকে এগিয়ে এলো আগন্তুকদের সর্দার।
- বাবুসকল, ওটা মোটেই আউট ছিলো না।
- আউট ছিলো না মানে? বললেই হলো? একেবারে স্ট্রেট বল, ইচ্ছে করে পা বাড়িয়ে আটকেছে।
- সেটা তুমি ঠিকই বলেছো বাবু, কিন্তু বলটা উইকেটের অন্ততঃ আধ হাত উপর দিয়ে বেরিয়ে যেতো যে? ইঁটে তো লাগতো না?
আবার নানাপ্রকার চেঁচামেচি। শেষ পর্য্যন্ত সাব্যস্ত হলো যে (১) ওটা আউট ছিলো না এবং (২) ওই সর্দার ছোকরা ভালোই আম্পায়ার হবে বলে মনে হচ্ছে - ওকে আম্পায়ার বানালে পক্ষপাতিত্বের কোনো অভিযোগ আর উঠবে না। অতএব আমি (কেন না ব্যাটটা আমার) - এই তোর নাম কি রে? খেলতে পারিস?
ততক্ষণে সবাই দেহাতী আর আদিবাসী স্টাইলে তুই-য়ের পর্য্যায়ে এসে গেছে।
- খেলি রে আমরা। রোজই খেলি তো। আমাদের গাঁয়ের মাঠ তোদের এই মাঠের চেয়ে অনেক বড়। বল আছে রে। তবে ব্যাট আমাদের ঘাটের মিস্তিরির তৈরী।
- আর কোন গাঁ থেকে আসছিস রে তোরা? ঘাট বললি যে, সেটা কোথায় রে?
- না রে বাবু, আমাদের গাঁ হলো কালিসঘাট। বাইরের লোকেরা অনেকে গীর্জাঘাটও বলে বটেক। আর হু-উ-ই ছোঁড়াটার বাপ আমাদের মিস্তিরি, হাঁ। আমাদের ব্যাটটা বানিয়েছে। তো তুদের ব্যাট অনেক ভালো রে।
- শোন, আমরা বাড়ি যাচ্ছি, ভাত খেতে। একটু পরেই ফিরে আসবো খেলতে। দুপুরে তুই আম্পায়ার থাকবি, বুঝলি?
- আমরাও ঘুরে আসছি। এদের খেলতে লিবি না?
- দুপুরে সবাই আয় তো, দেখা যাবে।
ঘণ্টা খানেক পরে ফিরে এসে আমার খেয়াল হলো - আরে ওদের নাম কি? আবার নাম জিগ্যেস করে জানা গেল যে সর্দার লছুর নেতৃত্বে আমাদের খেলা দেখতে এসেছে এই কাছের গীর্জাঘাট থেকে ভোলা, পিট্টু, মারু, জোসেফ প্রভৃতি।
খেলায় ওরা ভালোই ছিলো, আসতোও হপ্তায় দু তিন দিন। লছুটা হয়ে গেল পার্মানেন্ট আম্পায়ার, ক্রিকেটের আইন কানুন ও জানতোও অনেক। তাই ঝগড়াঝাঁটিও প্রায় থেমেই গেল।
মনে আছে, মাস দুয়েক বেশ সুন্দর ক্রিকেট খেলা হয়েছিলো। ওদের দলটা সকাল সকালই এসে পড়তো। একটু পরে হেলতে দুলতে আমরা আসতাম, তার পর আন্দাজ একটা থেকে দুটো মতন লাঞ্চ, তারপর আবার চারটে সাড়ে চারটে পর্য্যন্ত খেলা। বড়রা, মেয়েরা প্রায়ই দাঁড়িয়ে দেখতেন। একদিন :
- এই তোদের গীর্জাঘাট গাঁ-টা কোথায় রে?
- আরে হাটিয়ায় লোকেরা কালিসঘাট বলে যেটাকে, ওটাই আমাদের গীর্জাঘাট। এলাকাটার পুরনো নাম গীর্জাঘাটই ছিলো রে।
তা ওরা গীর্জাঘাট থেকে খেলতে আসতো, ওই গীর্জাঘাটেই দুপুরে ভাত খেতে যেতো, আবার ফিরে বিকেলে খেলতো। আমাদের পাড়ার অনেকের সঙ্গে পরিচয়ও হয়ে গেল ওদের।
কটা মাস কাটলো। তার পর ওরা একদিন দুপুরে ভাত খেতে বাড়ী গিয়ে আর ফিরলো না।
আমি কিছূদিন হাটবারে বোকার মতো মুখ করে চেনা অচেনা দেহাতীদের কাছে খো়জ করে বেড়ালাম গীর্জাঘাটটা কোথায়। একজন বৃদ্ধ বললো
- দাদা, ঘাট যখন বলছো তখন পাথরোলেই হবে, আমাদের জয়ন্তীতে তো কোথাও ঘাট বলা হয় না।
প্রসঙ্গতঃ আপনাদের জানিয়ে রাখি, মধুপুরের উত্তরে ও দক্ষিণে যথাক্রমে পাথরোল ও জয়ন্তী নদী পশ্চিম থেকে পূর্বে প্রবাহিতা। ওরা দুটিতে আবার শহরের পূর্বদিকে উত্তর থেকে দক্ষিণে ভাগীরথী-মুখো
অজয় নদে গিয়ে পড়ে। অধুনা সিকটিয়া ব্যারেজ হচ্ছে জয়ন্তী-অজয়ের সঙ্গমস্থল - অনেকে সেখানে পিকনিক বা বনভোজন বা চড়ুইভাতি করতে যান।
আর পাথরোল নদী? তার পুলিনেই তো পাথরোল গ্ৰাম, যেখানকার ৺কালীমন্দির জাগ্ৰত এবং বিখ্যাত। সে নদীর কি হলো? সপত্নী জয়ন্তীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সেও তো নাগর অজয়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো, কিন্তু কোথায়? সেটাই বলি এবার।
বছর ছয়েক কেটে গেছে। কলকাতায় কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি তখন। কলেজ প্রায়ই বন্ধ। গেলাম ক'দিনের জন্য মধুপুরে। ঠিক করা হলো জন কয়েক বন্ধু মিলে সাইকেলে পাথরোল ঘুরে আসা হবে। দীপকের (আগে নাম ছিলো ঘোঁতন) মা বলে দিলেন - ওরে তোদের মেসোমশায়ের নামে আড়াই আধুলির পুজো দিয়ে আসিস, এই নে; "মধুকুল্য" ।
কালীবাড়িতে কাজকর্ম সেরে আমাদের মনে হলো নদীটাও অনেকদিন দেখা হয়নি। যা কথা তাই কাজ, চলো আরো খানেকটা মেঠো রাস্তা ঠেঙিয়ে পাথরোল নদী।
প্রায় পৌঁছে একটা ঢিবির ওপর বসা হলো। পাশেই পাথরোল-অজয় সঙ্গম, একটু দূরেই অজয় চিকচিক করছে, পাথরোলের পাড়ে একটা ইঁটের পাহাড়, এইসব দেখছি মুড়ি আর নারকোল চিবুতে চিবুতে।
- আরে আমাদের ব্যাটওয়ালা বোবুয়াভাইয়া যে! কেতো বচ্ছর পর মিলছি! বেড়াতে এসেছিস? কিমন আছিস রে? বাকী অন্যরা? কিরকেট খেলচিস এখুনো?
হঠাৎ আবির্ভূত হয়ে এক গাল হেসে হাঁপাতে হাঁপাতে এক গাদা প্রশ্ন করে ফেললো লছু আম্পায়ার। আমাদের দুয়েকজন ওকে চিনতেও পারলো সহজেই। কুশল বিনিময়ের পর জিগ্যেস করলাম
- তা তুই এইদিকে চলে এসেছিস নাকি? গীর্জাঘাট না কোথায় থাকিস বলেছিলি?
- আরে এই তো গীর্জাঘাট। ওইখানে খন্ডহরটার পাশে ঘাটের কয়েকটা ধাপ এখনো দেখা যায়। আগে কটা নীলের চাষ, কারখানা, কুঠি, গীর্জা সব ছিলো রে এইখানে। পরে হুল হলো, সব পুড়ে ঝুড়ে গেল, কত লোক মরলো। ঘাটটাকে কেউ বলতো কালিসঘাট, কেউ বলতো গীর্জাঘাট।
- তা তোর বাড়ী কোথায়? কিছু তো দেখছি না?
- আরে ওই ঢিবিটার ওপারে। এই শোন, আমাকে এখন একটু যেতে হবে। এক দিন সবাই মিলে চলে আসবো। ঠিক আছে?
- বিলকুল। আচ্ছা আয়। আসিস কিন্তু।
... ... ...
বাড়ী (১৫নং কুণ্ডু বাংলো, মধুপুর, এস পি, ই আই আর) ফিরে ভূগোলের মানচিত্র ও জ্যামিতির যন্ত্রপাতি ঘেঁটে বার করলাম যে আমাদের এলাকা থেকে ওই হতভাগাদের কালিসঘাট না গীর্জাঘাট পাক্কা সাড়ে ষোলো কিলোমিটার। ভাবলে এখনো মাথাটা ঘুরে যায়!
সকালে আসা, দুপুরে খেতে ফেরা, ফের আসা আর সন্ধ্যায় ফেরা!
লছুরা আর আসেনি।