• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০১ | জানুয়ারি ২০২৬ | প্রবন্ধ
    Share
  • প্রতিবাদী হরপ্রসাদ : দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

    এ বছর তাঁর জন্মের একশ বাহাত্তর বছর পুরো হল। পঁচিশ বছর করে এক প্রজন্ম ধরলে মোটামুটি সাত পুরুষ আগে তাঁর জন্ম। লোকে বলে প্রজন্মান্তরে সমাজ পালটায়। চর্মচক্ষে যা ধরা পড়ে, তাতে আমাদের এখনকার দিশি সমাজও সেই ‘পরিবর্তন’-এর পক্ষে সাক্ষ্য দেয় বইকি। গাছতলায় পাঠশালার জায়গায় চ্যাটজিপিটির কাছে অঙ্কভূগোল শেখা…গরুর গাড়ির বদলে এরোপ্লেনে সকালে দিল্লি বিকেলে কলকাতা পরদিন নিউ জার্সি… ছুটি পড়লে পেনেটির বাগানবাড়ির বদলে ফোর্ট র‍্যাডিসন আর আরেকটু পয়সা থাকলে ফুকেট… পরিবর্তন তো বটেই।

    কিন্তু আর একটু কাছ থেকে দেখলে ধরা পড়ে, চামড়াটা বাদে ভেতরে বিশেষ কিছু বদলায়নি। সমাজের অন্দরমহলের সত্যগুলো একইরকম থেকে গিয়েছে।

    সমাজের ভেতরকার এই অপরিবর্তনীয় সত্যিগুলোকে যে বুদ্ধিজীবী চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন তাঁর কাজগুলো তাই সাত পুরুষ পরেও সময়োপযোগী থেকে যায়। যেমন রয়ে গিয়েছে হরপ্রসাদের কিছু কিছু কাজ। এ প্রবন্ধে সেই শ্রেণীর কিছু কাজ নিয়ে বলবার চেষ্টা করব।

    প্রথমেই মেয়েদের বিষয়ে তাঁর অবস্থান, দর্শন এবং সৃষ্টির বিষয়ে কিছু কথা। মূলত তিনটে উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা বোঝাতে চাইব। এর মধ্যে দুখানা প্রবন্ধ, আর একখানা উপন্যাস।

    ক: ভারত মহিলা

    সেটা ১৮৭৪ সাল। হোলকারের মহারাজা এলেন কেশব সেনকে সঙ্গে নিয়ে সংস্কৃত কলেজ দেখতে। এসে ছাত্রদের জন্য একখানা ‘সেরা প্রবন্ধকার’ পুরস্কার ঘোষণা করলেন তিনি। প্রবন্ধের বিষয় ঠিক করে দিলেন তাঁর সফরসঙ্গী, সুবিখ্যাত মানুষ কেশব সেন। বিষয়টা এইরকম- ‘প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থে নারীচরিত্রের উচ্চতম আদর্শ।’

    হঠাৎ এই নারীচরিত্রের আদর্শ নিয়ে কেশব সেন হেন সমাজপতির এই ব্যস্ত হয়ে ওঠবার পটভূমিটা একটু খুঁটিয় দেখা দরকার। ‘আদর্শ’ এমনিতে খুবই ভালো জিনিস তাতে সন্দেহ নেই। তবে সমাজপতিদের হাতে এই শব্দটা সর্বদাই একটা শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে ওঠে। মানুষের আচরণবিধির ওপর নীতিপুলিশি নিয়ন্ত্রণ জারি করবার অস্ত্র তা। ধর্ম, জাত, অর্থনীতি ও লিঙ্গ… এদের ভিত্তিতে সমাজটাকে হরেক টুকরোয় ভেঙে, তার প্রত্যেকটির এক এক সেট ‘আদর্শ’বিধি গড়ে দেন সমাজপতিরা। সেই ‘আদর্শ’-রাই টুকরোগুলোর সামাজিক ও বৌদ্ধিক অবস্থান, তাদের কর্তব্য-অকর্তব্য, পাপ-পুণ্য এইসব নির্ধারিত করে দেয়।

    সে সময় বাংলায় বদলের ঢেউ নেমেছে। ঔপনিবেশিকতার শেকলের গা চুঁইয়ে খানিক পশ্চিমী আলোও এসে পড়েছে তার অন্দরে। তার প্রভাবে এখানকার সমাজে মেয়েদের অবস্থানে কিছু বদলের সূচনা ঘটছিল তখন। তারা পড়তে যাচ্ছিল। রান্নাঘর, ঠাকুরঘর ও বিছানার অনিঃশেষ বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসছিল। শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য-সহ সমাজের নানান ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে তাদের সম-অংশীদারিত্বের দাবিও জোরদার হচ্ছিল ক্রমশ। ফলত, নিউটনীয় নিয়মে এই বদলের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল একটা প্রতিরোধও গড়ে উঠছিল সমাজে। রক্ষণশীল সমাজের প্রতিভূদের নিয়ে তৈরি সেই প্রতিরোধের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মেয়েদের স্বাধীনতার এই প্রসারকে যথাসম্ভব সঙ্কুচিত রাখা।

    এই সময়েরই ফসল ছিলেন কেশব সেন। সমাজ সংস্কারক ছিলেন তিনি। স্ত্রীশিক্ষার পক্ষপাতীও ছিলেন। তবে ব্যাপার হল, তাঁর কাছে আদর্শ স্ত্রীশিক্ষা ছিল ভালো স্ত্রী ও মা হবার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম শিক্ষাটুকু। তার অতিরিক্ত কিছু নয়। ১৮৭৪-এ সেই কলেজ ভ্রমণের চার বছর বাদে নিজের মেয়ের বাল্যবিবাহও দিয়েছিলেন তিনি। কাজেই, নারীচরিত্রের উচ্চতম আদর্শ বলতে তিনি ঠিক কেমনটা ভাবতেন সে বিষয়ে একটা আন্দাজ লাগানো যেতেই পারে: অন্দরমহলের ঘেরাটোপে বাঁধা বিনিপয়সার শ্রমিকই থেকে যাবে সে; কেবল সামান্য শিক্ষা দিয়ে বন্দিশালার একটা খুপরি জানালা খুলে রেখে দেয়া হবে তার সামনে, এই যা। এই প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এহেন ‘আদর্শ নারী’র সপক্ষে পুরোনোকালের প্রিসিডেন্স খোঁজানোই হয়তো তাঁর উদ্দেশ্য ছিল।

    হরপ্রসাদ তখন সেখানে ছাত্র। প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়ে তিনি এই ‘ভারত মহিলা‘ নামের প্রবন্ধটা লেখেন। তাতে রেফারেন্স হিসেবে বেদ, পুরাণ, মনুস্মৃতি কিছুই বাদ রাখলেন না। অজস্র দিশি ক্লাসিক থেকে খুঁটে খুঁটে প্রথমে তুলে আনলেন বেশ কিছু নিরীক্ষণ। সেসব ক্লাসিকের এক সেট হল পুরাণ-পূর্ব যুগের, আর অন্য এক সেট হল পুরাণের যুগের।

    তা, প্রাক্‌ পুরাণ যুগের ভারতীয় এই সাহিত্যদের থেকে সে সময়কার মেয়েদের সামাজিক ও বৌদ্ধিক অবস্থানের বিষয়ে কী কী তথ্য তিনি তুলে আনলেন? প্রবন্ধটা থেকে কয়েকটা উদ্ধৃতি দিলে সেটা পরিষ্কার হবে।

    ১। যদিও স্ত্রীলোকের রক্ষার জন্য ঋষিরা ব্যগ্র, কিন্তু তাহা বলিয়া স্ত্রীলোক যে অবরোধে থাকিতেন তাহার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। সীতা রামের সহিত বনগমন করিয়াছিলেন। ব্রাহ্মণকন্যারা তো কখনই অবরুদ্ধ ছিলেন না ও থাকিতেন না। মহাভারতীয় দেবযানী উপাখ্যান পাঠ করিলেই তাহা হৃদয়ঙ্গম হইবে।

    এবং এর পরেই বোমা বিস্ফোরণ-

    কাব্যগ্রন্থসকলে যে শুদ্ধান্ত, অন্তঃপুর, অবরোধ ইত্যাদি শব্দপ্রয়োগ দেখা যায় তাহাতে এই বোধ হয় যে ক্ষত্রিয় রাজাদিগের গৃহিণীরাই অবরোধবর্ত্তিনী ছিলেন। যাহারা ৭০০/৮০০ বিবাহ করিবে তাহাদের অবরোধ প্রয়োজনীয় হইয়া উঠে।

    ২। কোথাও বা রিভার্স লজিকের নিপুণ প্রয়োগ-

    যাজ্ঞবল্ক্য লিখিয়াছেন, “স্বামী বিদেশে গেলে স্ত্রী পরের বাটি যাইবে না, কোনো সমাজ বা উৎসবস্থলে উপস্থিত হইবে না, ক্রীড়া করিবে না, হাস্য করিবে না এবং শরীর সংস্কার করিবে না। অতএব স্বামী গৃহে থাকিলে স্ত্রী সর্বত্র গতায়াত করিতে পারিবে তাহাতে সন্দেহ নাই।

    পুরোনো ভারতে ‘আদর্শ’ নারীদের উন্নততর কোয়ালিটি অব লাইফ-এর সপক্ষে এইভাবে তথ্যপ্রমাণ হাজির করবার পর ছাত্র হরপ্রসাদ পরের ধাপে গেলেন। পুরোনো ভারতে মেয়েদের সৃজনশীলতা ও উঁচু বৌদ্ধিক স্তরের উদাহরণ তুলে আনলেন থরে থরে-

    বললেন বিশ্বদেবীর রচিত গঙ্গা বাক্যাবলী নামক একখানি স্মৃতি সংগ্রহের কথা, উল্লিখিত হল লক্ষ্মীদেবীর লেখা মিতাক্ষরার টীকার প্রসঙ্গ। আলোচিত হলেন উদয়ানাচার্যের গণিতজ্ঞ কন্যা লীলাবতী। স্মরণ করা হল শঙ্করাচার্য ও মণ্ডনমিশ্রের তর্কযুদ্ধে সারসদেবীর মধ্যস্থতার ভূমিকাকে। কাব্যশাস্ত্রে কালিদাসের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উদাহরণ টানলেন কর্ণাট রাজমহিষীর। এরপর, ১২০৫ সালে সঙ্কলিত সদুক্তিকর্ণামৃত গ্রন্থে ভাবদেবী, চণ্ডালবিদ্যা, সাটোপা, শিলা, ভট্টারিকা ইত্যাদি ন’জন মহিলা কবির কথা স্মরণ করালেন পাঠককে। খুব সংক্ষেপে, উদাহরণ দিয়ে দিয়ে স্মৃতি, ন্যায়, কাব্য, গণিত… জ্ঞানচর্চার এই চার ধারায় পুরোনো ভারতে পুরুষের সমধর্মা হিসেবে মেয়েদের প্রতিষ্ঠা করে দিলেন তিনি। স্ত্রী ও মা হওয়া ছাড়াও পুরোনো ভারতের ‘আদর্শ’ নারীকে ব্যক্তিমানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেন পুরুষের সমস্তরীয় হিসেবে।

    আর তারপর ব্যাস সংহিতা উদ্ধৃত করে একটা ধারালো প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন-

    ব্যাস সংহিতা পাঠ করিয়া বরং মনে হয় যে স্ত্রীলোক যদি দেওয়ান হইতে দাসী পর্য্যন্ত সকলের কার্য্যই করিল, পুরুষের কার্য্য কী?
    এরপর বন্দুকের নলটা তিনি ঘুরিয়ে ধরলেন, পরবর্তীকালের সৃষ্টি পুরাণের দিকে। প্রথমে ব্যঙ্গ করে বললেন,

    সভ্যজাতীয় লোকেরা স্ত্রীলোকের প্রতি যেরূপ সদ্ব্যবহার করিয়া থাকেন, আমাদের পূর্ব্বপিতামহগণও তাঁহাদিগের প্রতি সেইরূপ ব্যবহার করিতেন। তবে যে নানাস্থানে দেখা যায় “স্ত্রীলোক অতি হেয় পদার্থ উহার সঙ্গ সর্ব্বদা পরিত্যাগ করিবে,” “হৃদয়ে ক্ষুরধারাভা মুখে মধুরভাষিণী স্ত্রীর অন্ত পুরাণাদিতেও পাইয়া যায় না” (ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ) এ সকল সংসারবিরাগী যোগী প্রভৃতি লোকের উক্তি, তাঁহাদিগের মন অন্যদিকে আসক্ত। স্রীলোক পাছে তাঁহাদিগকে…
    ইত্যাদি ইত্যাদি।

    এরপর যুক্তি দিয়ে বললেন,

    পুরাণ অনেক পরের লেখা; পুরাণ রচনাসময়ে আর্যগণের সে তেজস্বীতা ও সেরূপ চরিত্রের ঔন্নত্য ছিল না। পুরাণ সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম আচার ব্যবহারের প্রকাশেই অধিক পটু। ঋষিরা যেখানে বলিয়াছেন ব্রহ্মচর্য্য করিবে, পুরাণ সেখানে ব্রহ্মচর্য্যের যত নিয়ম পাইলেন তাহা ত দিলেনই, তাহার পর আবার কতকগুলি লৌকিক আচারও তাহার মধ্যে প্রবেশ করাইয়া দিলেন… এইরূপ ব্রহ্মচর্য্যের টীকা করিতে গিয়া স্কন্দপুরাণে বৈধব্য আচরণ যে কীরূপ শোচনীয় ব্যাপার করিয়া তুলিয়াছেন যাঁহারা সে পুরাণ পাঠ করিয়াছেন তাঁহারা তাহা বিলক্ষণ অবগত আছেন। পতিসেবা ঋষিদিগের ব্যবস্থা। পুরাণ তাহার বিশেষ করিতে গিয়া যে কত আগরম বাগরম লিখিয়াছেন তাহা বলিয়া উঠিতে পারি না।

    কেশববাবু বা তাঁর সমধর্মা সমাজপতিরা আদর্শ নারীর একটা ভিক্টোরিয়ান স্টিরিওটাইপের সপক্ষে প্রমাণ চেয়েছিলেন। ভালো মা ও স্ত্রী হবার যোগ্যতাই সেই আদর্শের মাপকাঠি। অথচ প্রাচীন সংস্কৃত শাস্ত্র ঘেঁটে হরপ্রসাদ তখনকার যে আদর্শ নারীদের খুঁজে আনলেন তাঁরা শিক্ষিত, সৃজনশীল, স্বাধীনচেতা; আপন আলোয় উজ্বল সেই মহিলারা নিজেদের দায়িত্ব নিতে সক্ষম। অবস্থাভেদে তাঁদের ধীশক্তির সামনে পুরুষের ধীশক্তি নতজানু হয়। এবং তারপর, অপেক্ষাকৃত আধুনিককালের পুরাণে মেয়েদের অবনমনের ছবিটা এঁকে, তার সঙ্গে উনিশ শতকের বাঙালি মেয়েদের করুণ অবস্থার মিলটুকু দেখিয়ে প্রমাণ করে দিলেন, মেয়েদের অবহেলিত যে বর্তমান, সেইটি নেহাতই অর্বাচীন; প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থেরা আদর্শ নারী বলতে পূর্ণ স্বাধীন, সৃষ্টিশীল পুরুষের তুল্যমূল্য ব্যক্তিত্বই বুঝত।

    বাংলার গভর্নর টেম্পল সাহেবের হাত থেকে এ প্রবন্ধের জন্য পুরস্কারটা হরপ্রসাদই পেয়েছিলেন বলা বাহুল্য। সেটা ১৮৭৬ সাল, বঙ্গাব্দের হিসেবে ১২৮৩। তবে মুশকিল দেখা দিল অন্যত্র। প্রবন্ধটা ছাপবার জন্য হরপ্রসাদ প্রথমে গিয়ছিলেন সুবিখ্যাত পত্রিকা আর্য্যদর্শনএর সম্পাদক শ্রীযোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণের কাছে।

    আর্য্যদর্শন সে সময় বেজায় প্রাগ্রসর বাংলা মাসিকপত্র। তার সেই ১৮৭৬ সালের সম্মিলিত সূচীপত্রে দেখছি রয়েছে ‘আলোক বিশ্লেষী যন্ত্র ও জ্যোতিষ’, ‘তড়িৎবিজ্ঞানের ইতিবৃত্ত’, ‘গ্রীক ও হিন্দু্‌’, ‘ইয়ুনানী নাট্যপ্রণালী’ হেন সব লেখা। রয়েছে ‘জাতীয় চরিত্র’ নামের এক জ্বালাময়ী জাতীয়তাবাদী লেখা। এক কথায়, বিজ্ঞান, ইতিহাস, জাতীয়তাবাদ, সমাজতত্ত্ব এই সমস্ত দিক নিয়েই আধুনিক ও উদার মানসিকতার পরাকাষ্ঠা সে পত্রিকা।

    কিন্তু এহেন ‘উদার’ পত্রিকার সম্পাদক ‘ভারত মহিলা’ ছাপতে অস্বীকার করলেন। করলেন নীতিগত কারণে। আসলে সমাজতত্ত্ব, ইতিহাস, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে ‘এসে’ লিখতে বসলে শিক্ষিত বাঙালি যতটা আধুনিক, নিজের অন্তঃপুরের ব্যাপারে সে আধুনিকতার ছিটেফোঁটাও তার থাকে না। তাই, সেই একই বছরে এহেন আর্য্যদর্শনে কপালকুণ্ডলার সমালোচনা করতে গিয়ে তার আর সব ইনটারপ্রিটেশন ছেড়ে আদর্শ ভারতীয় নারীর মহিমাকীর্তন করা হয়েছিল উচ্চকণ্ঠে- যে নারী যেকোনো পরিস্থিতিতেই কোমলা ও সতীনের জন্য নিজের অধিকার ছেড়ে দিয়ে মহান হতে বেজায় ব্যস্ত। একটু উদ্ধৃতি দেয়া যাক-

    তান্ত্রিকের নিদারুণ ক্রিয়াকলাপই তাহার আদর্শস্থানীয়। তথাপি নারীহৃদয় নির্দয়-সহবাসেও নিতান্ত কঠোর হইতে পারে নাই। তথাপি কপালকুণ্ডলার হৃদয় কুসুম সুকুমার ছিল। তাহার কোমল দয়াপূর্ণ হৃদয় নবকুমারের জন্য ব্যথিত হইল। তিনি সপত্নীর হিতার্থ পৃথিবীর সকল সুখই পরিত্যাগ করিলেন। তিনি এই দয়া ব্যবহার কোথায় শিখিলেন। (প্রবন্ধ- কপালকুণ্ডলা। লেখক ‘শ্রী পূ’। আর্য্যদর্শন; জৈষ্ঠ্য ১২৮৩।)

    সতীনকে সসম্মানে সবকিছু ছেড়ে দেয়াকে কেমন উদ্বাহু প্রশংসাই না করা হল!

    বাহিরবাড়িতে প্রাগ্রসর, আর অন্দরমহলে রক্ষণশীল- আমাদের এই যে চিরন্তন দ্বিচারী চরিত্র- তার পক্ষে ভারত মহিলা-র মতো প্রবন্ধ হজম করা যে সমস্যা হবে, তা তো বলাই বাহুল্য।

    সে প্রবন্ধ শেষমেশ ছেপে বের হয় বঙ্কিমচন্দ্রের বঙ্গদর্শন পত্রিকায়। এবং সেইসঙ্গেই বাংলা সাহিত্যের আসরে নিজের জায়গাটি করে নেন হরপ্রসাদ। সেই মুহূর্তে বাংলা সাহিত্যের তীর্থক্ষেত্র নৈহাটি শহরেরই বাসিন্দা তাঁরা দুজন- বঙ্কিমচন্দ্র ও হরপ্রসাদ। ফলে একে অন্যের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে এরপর বিলম্ব হয়নি তাঁদের। হরপ্রসাদের ভাষায়, ‘তিনি আমাকে একেবারে আপন করিয়া লইতে চাহেন।’

    তবে এই ‘আপন করিয়া লইতে চাহেন’ ভাবটিও টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল এরপর। পড়েছিল ১২৮৯ সালে, হরপ্রসাদেরই আর এক সাহিত্যকর্মের জন্য। এবারে তার কথা।


    খ: তিষ্যরক্ষিতা

    ১২৮৯ সালে কাঞ্চনমালা উপন্যাস লিখলেন হরপ্রসাদ। সঞ্জীবচন্দ্র তখন বঙ্গদর্শনের সম্পাদক। ধারাবাহিকভাবে উপন্যাসটা বঙ্গদর্শনে বের হওয়া শুরু করলে বঙ্কিমচন্দ্র নাকি অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছিলেন লেখাটা নিয়ে। (সূত্র সাহিত্যের সৃষ্টি-- সত্যজিত চৌধুরী) তবে সঞ্জীবচন্দ্র তাতে উপন্যাসের প্রকাশ আটকাননি। কিন্তু, এরপর, বঙ্কিমচন্দ্রের জীবৎকালে কাঞ্চনমালা বই হিসেবে বাজারে আসেনি। এসেছিল একেবারে তাঁর মৃত্যুর বেশ কিছুকাল বাদে।

    কিন্তু প্রশ্ন হল, কাঞ্চনমালা নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের বিরক্তির কারণটা কী? কী এমন ছিল এই উপন্যাসে, যা সাহিত্যসম্রাটকে বিরক্ত করে তুলেছিল? এবারে সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক।

    এর কেন্দ্রে ছিলেন কাঞ্চনমালা-র অন্যতম নারীচরিত্র তিষ্যরক্ষিতা। নিম্নকুলোদ্ভব এই রূপবতী তার রূপ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বুদ্ধির জোরে অশোকের মহিষী হয়। সৎ ছেলে কুণালের চোখদুটি মুগ্ধ করেছিল তাকে। কুণালকে কামনা করেছিল তিষ্যরক্ষিতা। যৌনতা উদ্দীপক একটা ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি করে সেখানে তাকে ডেকে এনে সরাসরি অনাবৃত শরীর তাকে নিবেদন করেছিল। তারপর প্রত্যাখ্যাত হয়ে হিংস্র প্রতিশোধ নেয় সে কুণালের ওপরে।

    গল্প এরপর চলেছিল কুণালকে ঘিরে, তার চরিত্রের দৃঢ়তা, ক্ষমাশীলতা, তার দাম্পত্যজীবনের সিদ্ধিলাভের কাহিনিকে নিয়ে। তবু, তিষ্যরক্ষিতা কিন্তু উজ্জ্বল ও একাকী দাঁড়িয়ে রইলেন উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের উঠোনে। সঙ্গীহীন। না। হরপ্রসাদ তিষ্যরক্ষিতাকে গ্লোরিফাই করেননি। আবার, এহেন ‘অপরাধে’ তাকে হেঁটোয় কাঁটা মাথায় কাঁটা দিয়ে কবরে পাঠিয়ে ধর্মের সুসংস্থাপনও করেননি। তিষ্যরক্ষিতা উন্মাদ হয়েছিল শেষমেশ, কিন্তু তা নেহাতই ঘটনাক্রমের পরিণতি, ধর্মরাজের সচেতন বজ্রাঘাত হিসেবে তাকে দেখাননি হরপ্রসাদ।

    তিষ্যরক্ষিতাকে গড়তে গিয়ে, কপিবুক সতীত্ব বা চরিত্রবল ইত্যাদি থেকে সরে এসে রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে দোষগুণ, পাপপুণ্য এই সবকিছুতে পুরুষের তুল্যমূল্য একটা নারীচরিত্র এঁকে দিয়েছিলেন হরপ্রসাদ। এহেন পুরুষচরিত্র কল্পনা করা সে সময়ের সাহিত্যে অন্যায় কিছু ছিল না। শিবঠাকুর মোহিনীকে দেখে উন্মত্ত হয়ে ধাওয়া করবেন এবং তাতে তাঁর ধর্মপত্নী মা দুর্গা কিচ্ছুটি মনে করবেন না, সেটা অ্যাক্সেপ্টেড রিয়েলিটি ছিল। কিন্তু কোনো নারীচরিত্র নিজের জৈব ইন্সটিংকটকে অবদমন না করে তাকে সগৌরব স্বীকৃতি দিচ্ছে এহেন ছবি আঁকবার দুঃসাহস উনিশ শতকের বাংলায় কেউ করছেন সেটা চমকে দেয়।

    এর আগের বছর, মানে ১৮৭৫ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চন্দ্রশেখর লিখেছেন। অসাধারণ সেই উপন্যাসে, অন্ধ প্রকৃতির আসনটা দখল করেছে শৈবলিনী। ইনসেস্টুয়াস সম্পর্ক এতেও রয়েছে। প্রেমিক নায়িকার সম্পর্কে জ্ঞাতি। ইনস্টিংকটের প্রবল তাড়নায় শৈবলিনী যেকোনো মূল্যে তার প্রেমিকের কাছে এগিয়ে যেতে চায়, আর তারপর গভীরতর ও আদিমতর অন্য কোনো ইনস্টিংকটের তাড়নায় বারংবার সেই প্রেমিককেই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় সে।

    তবে এ-কাহিনির শেষে এসে সমাজবিধির কাছে আত্মসমর্পণ করলেন বঙ্কিমচন্দ্র। প্রেমিককে আত্মহত্যা করিয়ে পণ্ডিত স্বামীর শুকনো সংসারে বাধ্য স্ত্রী হিসেবে শৈবলিনীকে ফেরৎ পাঠিয়ে দিলেন। তিষ্যরক্ষিতা যেরকম অলজ্জ ও উদ্দামভাবে নিজের ইন্সটিংক্টের প্রতি অবিচল থেকেছিল, শৈবলিনীকে সেরকম শক্তি দেবার ক্ষমতা বঙ্কিমচন্দ্রের হয়নি। হয়নি সম্ভবত সে সময়ের সামাজিক কন্ডিশনিং-এর জন্য। তাছাড়া বঙ্কিমচন্দ্র কলম ধরেছিলেন ‘দেশ বা মনুষ্যজাতির মঙ্গলসাধনের জন্য।’ (এ প্রসঙ্গে বাংলা ১২৯১ সালে প্রচার পত্রিকায় লেখকদের প্রতি তাঁর উপদেশ স্মর্তব্য) ফলে দেশকালের রীতি মেনে চরিত্রকে জাজ করা তাঁর সাহিত্যের সচেতন বৈশিষ্ট্য ও কর্তব্য ছিল। কোনটা উচিত আর কোনটা নয় সে বিষয়ে মতামত তাঁর বুনে দেয়া থাকত লেখার শরীরেও। কিন্তু তাঁর থেকে বেশ খানিক ছোটো হরপ্রসাদ তিষ্যরক্ষিতাকে গড়তে বসে তার ভালোমন্দ এহেন পথে জাজ করত বসেননি। সমসময়ের কন্ডিশনিং ও রীতিনীতিকে উপেক্ষা করে নারীচরিত্রের গভীরে ডুব দিয়ে তার সম্ভাব্য অন্যরূপটিকে তুলে এনে, সময়ের চাইতে অনেক পা এগিয়ে থাকা এক নৈর্ব্যক্তিকতায় সাহিত্যিক হিসেবে নিজের কর্তব্য সুচারুভাবে পালন করেছিলেন।

    সাহিত্যমূল্যের দিক থেকে কপালকুণ্ডলা বা চন্দ্রশেখর হয়তো তুলনায় অনেক উচ্চমার্গের কাজ কিন্তু কাঞ্চনমালা -র তিষ্যরক্ষিতার সৃষ্টিতে নারীচরিত্রের ইন্সটিংকটকে অনবদমিত করে দেখবার যে পরীক্ষা হরপ্রসাদ করেছেন, তাঁর সময়ের প্রেক্ষিতে সে পরীক্ষা তুলনাবিহীন বললেও কম বলা হয়।

    হরপ্রসাদের একটা মন্তব্যে এ বিষয়ে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার হবে–

    যখন বঙ্কিমচন্দ্র সৌন্দর্যসৃষ্টিকে লোকশিক্ষার দাসী করিতে উদ্যত হইলেন, আমি তাহাতে রাজি হই নাই।… সৌন্দর্যসৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে ধর্মপ্রচার করিয়া দুই জিনিসই নষ্ট করা, দুটা জিনিসকেই পারমিতা প্রাপ্ত হইতে না দেওয়া বিশেষ দোষের হইবে। কিন্তু বঙ্কিমবাবু আমাকে ওভাররুল করিলেন।


    গ: প্রকৃত প্রণয় ও বিবাহ

    বৈপ্লবিক চিন্তাভাবনায় পথিকৃৎ হরপ্রসাদের আরেকটা প্রবন্ধের উল্লেখ করে এ পর্বের ইতি টানব। এখানেও পত্রিকার নাম আর্য্যদর্শন। সম্পাদক সেই যোগেন্দ্রনাথ। লেখক হরপ্রসাদ। সাল ১২৮৪। প্রবন্ধের বিষয় ‘প্রকৃত প্রণয় ও বিবাহ’। বক্তব্য আরো বৈপ্লবিক। ‘প্রণয়ীযুগল যদি উভয়েই স্বাধীন হয়, কেহ কাহারো কোনো অধীনতা স্বীকার না করে, উভয়ে আপন ইচ্ছায় উভয়কে ভালোবাসে, কেবল ভালোবাসা ভিন্ন ভালোবাসার আর কোনো পার্থিব কারণ না থাকে, ক্রমে সে ভালোবাসা ঘনতর হইয়া আসে। সেই বিশুদ্ধ প্রণয়, সেইখানেই প্রণয়ের সর্বোতমুখী শ্রীবৃদ্ধি।… পবিত্র, বিশুদ্ধ, নির্মল, উৎকৃষ্ট স্বর্গীয় প্রণয়ের উপর সমাজের প্রধান অত্যাচার বিবাহপ্রথা প্রচলন।’

    নারীপুরুষের বিবাহবন্ধনহীন ভালোবাসার স্বীকৃতির যে যুগে আজ একুশ শতকে আমরা বাস করছি, তার চিন্তা ও তার পক্ষে সওয়াল উঠে এল উনিশ শতকের সাহিত্যিকের কলমে। এ স্বীকৃতি দিতে খোদ লাবণ্যও সাহস পায়নি। রোজগেরে যুবকের সাতপাকের নিরাপদ আশ্রয়ে তাকে গস্ত করে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন খোদ রবীন্দ্রনাথও। এইখানেই হরপ্রসাদ ব্যতিক্রমী। এতটাই ব্যতিক্রমী যে তাঁর স্বল্প, কিন্তু অতীব শক্তিশালী সাহিত্যকীর্তি বাংলার গভীরে ততটা শেকড়ই ছড়াতে পারল না কখনও। আমরা তাঁর সাহিত্যকীর্তিকে স্বীকার করেছি বইকি, কিন্তু করেছি একরকম বাধ্য হয়ে; তাকে হৃদয়ে নিইনি। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলতেই তাই আপামর শিক্ষিত বাঙালি একযোগে চিৎকার করে ওঠে ‘চর্যাপদ আবিষ্কার’। কাঞ্চনমালা, ভারত মহিলা, প্রকৃত প্রণয় ও বিবাহ—এই নামগুলো বিশেষ উচ্চারিত হয় না।

    এ প্রবন্ধ যোগেন্দ্রনাথ ছেপেছিলেন বটে, কিন্তু সম্পাদকীয় মন্তব্যে জুড়ে দিয়েছিলেন একটা রাইডার- ‘আমরা এ প্রস্তাবের শেষ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করি না।’

    একুশ শতকের ২৫ বছর চলে গেল। তথাপি, আজও এদেশে মেয়েদের ‘আদর্শ’ ডিফাইন করবার জন্য উঠেপড়ে লাগতে দেখা যাচ্ছে এদেশের সমাজপতিদের। চিন্তার, পেশার বা সঙ্গী নির্বাচনের স্বাধীনতার মূল্য চোকাতে যত্র-তত্র বাপভাইয়ের হাতে তরুণীদের অনার কিলিং-এর খবর ভারতের খবরকাগজে সুলভ হয়ে উঠছে। কাজ বা কোনো অনুষ্ঠানের শেষে মধ্যরাতে পথে বেরোবার অপরাধে, গায়ে পড়ে জোর করে প্রেম নিবেদন অস্বীকার করে ক্লাস টেনের কিশোরীর আরও পড়তে চাওয়ার অপরাধে, দুর্নীতির প্রতিবাদে গলা উঁচু করবার অপরাধে- ধর্ষণ, খুন, শ্লীলতাহানি, আ্যসিড ছোঁড়া এসব মোটেই দুর্লভ নয়। আর সেসব ঘটবার পর মন্ত্রী সান্ত্রী বিচারপতিদের মুখে হামেশাই শোনা যাচ্ছে, প্রোভোকেটিভ পোশাক কেন পরে, কেন মেয়ে হয়ে রাত্তিরে পথে বেরোয়, বিয়ে করে সন্তান তৈরিই তো মেয়েদের মোক্ষ ইত্যাদি ইত্যাদি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে মাঝে মাঝেই মেয়েদের পোশাকের ওপর শিক্ষিকা/ছাত্রী নির্বিশেষে নানান নিষেধাজ্ঞা আসা শুরু হয়েছ সভ্যতাভব্যতার নামে।

    ফলে, সব মিলিয়ে, হরপ্রসাদের এই লেখাগুলো আজও যে কেবল জরুরি রয়ে গেল তাই নয়, আরো বেশি করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে তারা এখন। সেটা লজ্জার হলেও কঠোর সত্য।

    ***

    দ্বিতীয় যে অপরিবর্তনীয় সমস্যাটির দিকে আঙুল তুলে গিয়েছেন তিনি তা হল আমাদের মাতৃভাষার একটা কঠিন রোগ।

    যে সময়ে হরপ্রসাদ লিখছেন, সে সময়টা বাংলা গদ্যসাহিত্যের ভাষা ঠিক কোন চেহারা নেবে সে নিয়ে বিদ্বান মহলে বেশ হুলুস্থুল দশা চলছিল। তার একদিকে ছিলেন সংস্কৃতপন্থীরা। এঁরা হচ্ছেন সে সময়ের নব্য মধ্যবিত্তশ্রেণীর মানুষজন।

    ইউরোপে এনলাইটনমেন্টের যুগে সংস্কৃতির ধারক ও বাহক যে মিডল ক্লাসের সৃষ্টি হয়েছিল, তাঁরা উঠে এসেছিলেন তাঁদের নিজস্ব বুর্জোয়া সামাজিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই। ফলে নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে তাঁরা যে রূপটা দিচ্ছিলেন তার শেকড় তাঁদের নিজস্ব চালু সংস্কৃতির মধ্যেই পোঁতা ছিল। কিন্তু বাংলায় যে মধ্যবিত্তশ্রেণী তখন উঠে এসে ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চার পত্তন করছে তাদের উত্থানটা ছিল মূলত ব্রিটিশদের সহযোগী কম্প্রাদর বুর্জোয়িসি হিসেবে। নিজস্ব অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বীজ থেকে সে মধ্যবিত্তের জন্ম হয়নি বলে সে বীজের ওপর তার ভরসা বা শ্রদ্ধা কোনোটাই ছিল না। ফলে, শিক্ষা, আদর্শ, জীবনযাত্রা ইত্যাদি আর দশটা বিষয়ের মতো বাংলা গদ্যের কাঠামো নির্মাণেও সে তার চালু সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে কোনো একটা বিজাতীয় অথরিটির সন্ধান করেছিল। তার ভোকাবিউলারির জন্য সে হাত পাতছিল সংস্কৃতর কাছে, আর বাক্যের ও ব্যাকরণের কাঠামোর জন্য সে ইংরিজি ভাষার ওপর ভর দিচ্ছিল। ফলে এই দুই মিলে যে হাঁসজারু ভাষাটির জন্ম হচ্ছিল, সে ভাষার সঙ্গে সাধারণ বাঙালির আলোকবর্ষ পরিমাণ দূরত্ব। সভাসমিতিতে ও এলিটজনপাঠ্য পত্রিকায় সেই অবোধ্য ভাষা আপন গৌরবে বিদ্যমান থাকছিল।

    এই অবস্থায় শাস্ত্রী মশাই ১২৮৮ সালে বঙ্গদর্শনে সত্যিকথাটাকে নেহাত সিধেসিধিই বলে দিলেন- “লিখিত বাংগালা ও কথিত বাংগালায় এত তফাৎ হইয়া পড়িয়াছে যে দুইটিকে এক ভাষা বলিয়া বোধ হয় না। দেশের অধিকাংশ লোকই লিখিত ভাষা বুঝিতে পারে না।”

    বাঙালির মুখের ভাষাকে সাহিত্যে নিয়ে আসবার অন্যতম অ্যাডভোকেট অধ্যাপক শ্যামচরণ গাঙ্গুলির শিষ্য হরপ্রসাদও জায়মান বাংলা গদ্যভাষার সংস্কৃত-নির্ভরতার কুফলটার দিকে আঙুল তুলেছিলেন এই বলে যে, ‘গ্রন্থকারদিগের বাঙ্গালা বাঙ্গালা নহে।’

    তবে কোন বাংলা ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করব? এ বিষয়ে শাস্ত্রী মশাইয়ের দু’একটি তীর্যক উক্তি এক উপযুক্ত পথনির্দেশ করেছিল। যেমন- “একজন সেদিন বড়ো রাস্তাকে রাজমার্গ ও বাঁশ লইয়া যাওয়াকে বংশ পরিচালনা লিখিয়া বড়োই বিপদগ্রস্ত হইয়াছিল,” কিংবা “বাংগালার আকাশে তারা মাপিবার যন্ত্রঘর ছিল না। যখন কলিকাতায় সে ঘর হইল, পণ্ডিতমহাশয়েরা তাহার তর্জমা করিলেন পর্যবেক্ষণিকা। কথাটা একে ত’ চোয়াল ভাঙ্গা তাহাতে আবার সংস্কৃত-শুদ্ধ কি না সে বিষয়েও সন্দেহ। হিন্দুস্থানী গারোয়ানেরা অতশত বুঝে না- তাহারা উহার নাম রাখিল তারা ঘর। মোটামুটি উহার উদ্দেশ্য বুঝাইয়া দিল, কথাটী শুনিতেও মিষ্ট। তবে চালাইতে দোষ কী?”

    তাঁর বক্তব্য, বাংলা কথা দিয়ে নতুন কথা গড়ো। না পারলে অসমিয়া, উড়িয়া, হিন্দি খুঁজে শব্দ নিয়ে এসো। তাতেও না কুলোলে যে ভাষার শব্দ হিসেবে তাকে শুনেছি সেইটেকেই অবিকৃতভাবে নিয়ে নাও। যেমন বাতাবি লেবু।

    এক কথায়, যে গদ্যভাষা পণ্ডিতির দোষে দুষ্ট নয়, যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাহিত্যের সেতুবন্ধন ঘটাতে সক্ষম সে ভাষার পক্ষে ব্রিফ ধরেছিলেন হরপ্রসাদ। এবং, মনে রাখতে হবে খোদ বিদ্যাসাগর মশাই তখন বিধান হেঁকেছেন, সংস্কৃত কলেজের ছাত্ররা ইংরিজি সাহিত্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হলে তবেই তারা আলোকপ্রাপ্ত বাংলা সাহিত্যের দক্ষতম স্রষ্টা হয়ে উঠতে পারবে। একদিকে সংস্কৃত, অন্যদিকে ইংরিজি- এই দুই ক্রাচে ভর দিয়ে এক বকচ্ছপ বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গড়ে তোলবার সে দেশব্যাপী প্রচেষ্টার মাঝখানে দাঁড়িয়ে শাস্ত্রীমশাই নিজস্ব মতে অটল থেকে তখন বাংলা ভাষার ইন্ডিজেনাস রূপটির সন্ধানে মজেছেন, “ভট্টাচার্য্য ও কথকদিগের মধ্যে যে ভাষা প্রচলিত ছিল তাহা এখনও কতক কতক নির্ণীত হইতে পারে।”

    এ বিষয়ে যে দিক্‌নির্দেশ তিনি দিলেন তার সারকথা এইরকম- সংস্কৃতর সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক অনেক দূরের। দুই ভাষার গতি দুরকম। বাংলাকে সংস্কৃতর দিকে চালানোর চেষ্টা মানে গঙ্গাকে হিমালয়ের দিকে উজানে বইয়ে নেবার চেষ্টা।

    এর পাশাপাশি আরেকটা অসম্ভব মূল্যবান কথা বলে দিলেন তিনি- সাতশো বছর ধরে মুসলমানদের সঙ্গে একত্রবাসে বাংলাভাষা তাঁদের সংস্কৃতির যা যা আত্তীকরণ করে ফেলেছে তা তার হাড়েমজ্জায় মিশে আছে। তাকে বের করে দেবার চেষ্টাটা ভুল।

    এবং শেষতক তাঁর সিদ্ধান্ত-

    আমি বলি, যাহা চলতি যাহা সকলে বুঝে তাহাই চালাও। যাহা চলতি নয় তাহাকে আনিও না। যাহা চলতি তাহা ইংরাজিই হউক, পারসিই হউক, সংস্কৃতই হউক- চলুক। তাহাকে বদলাইয়া শুদ্ধ সংস্কৃত করিবার দরকার নাই।

    ভাষা মানুষে মানুষে সেতুবন্ধন করে। কিন্তু সে সময় কথ্য আর লিখিত বাংলায় যে বিপুল দূরত্ব গড়ে উঠেছিল, তাতে মুষ্টিমেয় এলিট ও সাধারণ মানুষের যোগসূত্রটাই গিয়েছিল ভেঙে। ঠিক এই জায়গাটাতেই রোগের চিকিৎসা করতে চেয়েছিলেন হরপ্রসাদ। এলিট বাঙালির সঙ্গে সাধারণ্যের সেতুবন্ধনের কথা বলেছিলেন তিনি। ইংরিজি, বা সংস্কৃতনির্ভর বাংলা সে সেতুর ভিত হতে পারে না। সে সেতুর ভিত হবে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা। এই ছিল তাঁর তত্ত্ব ও বিশ্বাস। তাকে স্বীকার করেই হরপ্রসাদের সাহিত্যচর্চা চলেছিল।

    আজ, একুশ শতকে এসে, অনেক পথ পেরিয়ে ইংলিশ মিডিয়মশিক্ষিত নাগরিক জেন জি-র বাংলাভাষায় দেখি সে নবতম মার্কিন স্ল্যাংকে সে তার প্রাত্যহিক ভাষায় প্রয়োগ করে নিজের আধুনিকত্বের পরাকাষ্ঠা দেখালেও ‘নচল্লা দেখলে পিত্তি জ্বলে যায়’ বা ‘সুহাগের কুসুম কাইল্লাজিরা’ শুনলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলোতে যে গল্পগুলো লিখি, সেখানে অতিপ্রচলিতদের সামান্য বাইরের চলিত শব্দবন্ধ প্রয়োগ করলে পাঠকের কাছ থেকে প্রশ্ন ভেসে আসে, “এর মানে কী?” কখনো কখনো এমনকি সম্পাদক বা অভিজ্ঞ প্রুফরিডারও সে প্রশ্ন করে বসেন। ট্রেনে বাসে শহুরে মধ্যবিত্তের সন্তানদের আলাপচারির মিশ্র হিংবাংলিশের দিকে অবোধের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে গ্রাম থেকে কাজ করতে শহরে আসা কোনো তরুণী। আর, এইসব দেখতে দেখতে টের পাই, হরপ্রসাদ অরণ্যে রোদন করে গিয়েছিলেন। বাংলার নিজস্ব ভাষা এখনো এলিটে সাধারণে কোনো সেতুবন্ধন করতে পারেনি। এখনো এই দুই শ্রেণীর একের ভাষা অন্যে বোঝে না। আমরা এখনো আসলে মানসিকতায় হরপ্রসাদের সময়ের এলিট বাঙালির জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছি। সযত্নে দূরে ঠেলে রেখেছি হরপ্রসাদের আদর্শগুলোকে। বাংলা ভাষার মূল সমস্যা নিয়ে তাঁর কথাগুলো একই রকম সত্যি ও একই রকম উপেক্ষিত রয়ে গিয়েছে।

    ভদ্রলোক চিরটা কাল একাই থেকে গেলেন।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments