


|| ১ ||
মার্ক্সের জন্য শ্রদ্ধা / ঈমান মিরসাল
দোকানের অতিআলোকিত শো-কেসে
থৈ থৈ করছে নারীর সংক্ষিপ্ত অন্তর্বাস
আর আমি মাৰ্ক্সের কথা না ভেবে
এক মুহূর্ত থাকতে পারি না।
আমার যৌন সঙ্গীরা অনেক বিষয়ে আলাদা,
প্রত্যেকেই কিন্তু
মার্ক্সকে গভীর শ্রদ্ধা করে।
আমার শরীরের গর্ভে ন্যাকড়ার যে পুতুলটাকে লুকিয়ে রেখেছি,
তার গায়ে আমি তাদেরকে
বিভিন্ন পরিমাণে থাবা বসাতে দিই।
হে মার্ক্স
হে মার্ক্স
তোমায় ক্ষমা করতে পারব না কোনদিন।
|| ২ ||
রাষ্ট্র / ঈমান মিরসাল
একটাই মাথা: সেখান থেকে নির্দেশ যায় তাদের হৃৎপিণ্ডে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গে, এবং জননেন্দ্রিয়ের দিকে – এক জাতীয় সেনাবাহিনী, যার প্রতিটি সৈনিক এক একটি মস্তকহীন চরিত্র – এবং এই প্রজন্মে আর কোন প্রয়োজন নেই পাবলিক লাইব্রেরিগুলিকে পুড়িয়ে ফেলার এবং স্থানীয় রেডিও স্টেশন থেকে যতসব বিকৃতরুচির সংগীতকে নির্বাসিত করার, তার সেরা এবং উজ্জ্বলতম ব্যক্তিগুলি স্ব-ইচ্ছায় পথচারীদের একটি নিপুণ তালিকা নির্মাণ করে, যাতে রাষ্ট্র খেয়াল রাখতে পারে প্রতিটি নাগরিক যেন যথাসময়ে তার আয়কর দিতে বাধ্য হয়, তার সঙ্গে সঙ্গে পাবলিক পেচ্ছাপখানায় থেকে রাস্তার মোড়ে মোড়ে উচ্চঃস্বরে বাজে জাতীয় সংগীত এবং সম্মানিত বিরোধীদলের নেতারা তাদের পতাকাতলে সমবেত হয়ে নতুন একটি লিমিটেড লায়াবিলিটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে সাধারণ মানুষদের অজ্ঞতা ও কুসংস্কার থেকে মুক্তি দেবার জন্য এবং একই সময়ে তুমি দোতলার বারান্দা থেকে ভয়ে ভয়ে নীচে তাকাও, দেখতে থাকো নিবিড় অন্ধকারে ঢাকা পথঘাট আর আতঙ্কে চিবিয়ে ফেল নিজের হাতের নখগুলি।
|| ৩ ||
দুটি কবিতা দিয়ে আমাদের পাঠের সূচনা: কবির নাম ঈমান মিরসাল, জন্ম নভেম্বর ৩০, ১৯৬৬ সাল মিশরে, রাজধানী কায়রো থেকে ১১১ কিমি উত্তরে নীল নদীর বদ্বীপে মিট’আদলান নাম একটি ছোট্ট মফস্বল শহরে, জনসংখ্যা সাড়ে চার হাজার। তিনি মনসৌরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ. এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. এবং পি.এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সমসময়ে আরব সমাজে আশা জাগে যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও একনায়কতন্ত্রী নেতাদের পতন ঘটবে এবং প্যালেস্টাইনের পরাধীন মানুষদের মুক্তির আন্দোলন সফল হবে। কায়রোতে হোসনি মুবারকের (১৯২৮-২০২০) রাজত্ব তখন দ্বিতীয় দশকে, তিনি মুখে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আধুনিকীকরণের বুলি কপচান, কিন্তু দেশ চালান কঠোর মিলিটারি শাসনে। ইরাকে সাদ্দাম হোসেন (১৯৩৭-২০০৬), লিবিয়াতে মুয়াম্মর গদ্দাফি (১৯৪২-২০১১), এঁরাও ওই একই পথ অনুসরণ করে চলেছিলেন। এই সময়েই ঈমান কবিতা লেখা শুরু করেন।
তৃতীয় বিশ্বে নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিয়ে সমস্যা ও আন্দোলন চলেছে বহুকাল। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে যৌন নিপীড়ন, গৃহকর্মের অসম বিভাজন, এবং সন্তান পালনের দায়িত্বের বিষয়গুলি নারীবাদী চিন্তাভাবনার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ২০০৮ সালে নারীবাদী লেখিকা রেবেকা সলনিট (১৯৬১– ) লস এঞ্জেলিস টাইম্স সংবাদপত্রে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, যার নাম “পুরুষেরা কীভাবে সবকিছু ব্যাখ্যা করে: কোন তথ্য না জেনেই”; সেটি ভীষণ জনপ্রিয় হয় এবং কিছুদিন পরে মিরিয়াম-ওয়েবস্টার এর কালজয়ী অভিধানে একটি নতুন শব্দের আবির্ভাব ঘটে “ম্যান্সপ্লেইন” (“mansplain”), যার অর্থ: mansplain (v.) "to explain, as a man to a woman, in a way that she feels insults or ignores her intelligence and experience in the matter,"। কিন্তু তার অনেক বছর আগেই ঈমান একটি কবিতায় লিখেছিলেন, “পুরুষটি সিদ্ধান্ত নেয়, সে আমায় বুঝিয়ে দেবে, প্রেম কাকে বলে।”
ঈমানের মেয়েবেলা কেটেছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কঠোর সামনে ও নিরাপত্তায়, কিন্তু ১৯৮০ এর দশাব্দে মনসৌরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠনপাঠনের সময়ে তিনি “বিন্ত আল-আর্দ” (“ধরিত্রীর কন্যা”) নামক নারীবাদী সাময়িকপত্রের যুগ্ম-সম্পাদকের ভূমিকা নিয়েছিলেন। তাঁর কৈশোরক কবিতাবলীর কিছু কিছু প্রকাশিত হয়েছিল এই কাগজে। কিন্তু প্রথম থেকেই তিনি খুঁজে নিয়েছেন তাঁর নিজের কণ্ঠস্বর, উজাড় করে দিয়েছেন তাঁর গভীর গোপন ব্যক্তিগত ভাবনা: যৌন আনুগত্যহীনতা, মানসিক বিকার, আরো অনেক কুৎসিত অভিজ্ঞতা – এবং তা আরব জগতে ও তার বাইরেও অন্য নারীদের অনুভবের সঙ্গে প্রতিধ্বনিত হয়। তিনি অনুভব করেন প্রেম ও বন্ধুত্বের টানাপড়েন এবং তার সখীদের সঙ্গে পারস্পরিক নির্ভরতা ও সংহতি, তাঁর কবিতা তাঁর নিজের কথাই বলে, বিশেষ করে তার দুঃসাধ্য এবং লজ্জাজনক অংশগুলি। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত তিনি এই কাগজটির সম্পাদনা করেছিলেন।
১৯৯৮ সালে তিনি আমেরিকায় আসেন, প্রথমে ম্যাসাচুসেটস প্রদেশের বস্টন শহরে এবং তারপরে অভিবাসী হয়ে উত্তরে, কানাডায়। সেখানকার আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি আরবী ভাষা ও সাহিত্য এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপকের পদে কাজ করছেন দু দু দশকেরও বেশি সময়। তিনি বাস করেন আলবার্টা প্রদেশের এডমন্টন শহর তাঁর স্বামী নৃকুল-সংগীতবিদ (এথনো-মুজিকোলজিস্ট) মাইকেল ফ্রিসকফ এবং তাঁদের দুই পুত্র মুরাদ এবং জোসেফ এর সঙ্গে। মুরাদ এখন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে চেতনা-বিজ্ঞানের (কগনিটিভ সায়েন্স) ছাত্র।
১৯৯৫ সালে কায়রো থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ, যার নামটি আরবী ভাষা থেকে বাংলা করলে দাঁড়াবে “অন্ধ গলিটি নাচ শেখার পক্ষে ভাল”। তার দুবছর পরে ১৯৯৭ সালে “যতক্ষণ পারো হেঁটে যাও। দুটি গ্রন্থই মিশরের পুরুষশাসিত কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী সমাজে অস্বস্তি ও ক্রোধের সৃষ্টি করে। উপরে উল্লিখিত “মার্ক্সের জন্য শ্রদ্ধা” এবং “রাষ্ট্র” কবিতাদুটি এই সময়ের রচনা। এক তরুণীর ব্যক্তিগত গড়ে ওঠা এবং কবি হিশেবে বীজ থেকে চারাগাছ হওয়ার বিবরণ ও পথচলা, তাঁর ব্যক্তিগত এবং সাহিত্যিক শিক্ষার কাহিনি। মিশরী সাহিত্যের যাঁরা গৃহরক্ষী, যাঁরা উদারতা, মানবতা ও শিল্পীর স্বাধীনতার রঙ্গিন পালক টুপিতে লাগিয়ে পেখম তুলে ঘুরে বেড়ান, তাঁরা কিন্তু মিরসালের প্রতিবাদী ভঙ্গিতে রাজনীতির গন্ধ পেয়েছিলেন। কিছু কিছু কবিতা তাঁদের গায়ে কাঁটার মতন বিঁধেছেও। আরবী ভাষার কবিরা সাধারণতঃ পুরুষের প্রতারণা, নারীর অবক্ষয় ও আত্মহনন এবং আত্মবিরাগ নিয়ে কবিতা লেখেন না। তাঁর মানে এই নয় যে মধ্যপ্রাচ্যে এই বিষয়গুলির অস্তিত্ব নেই – সেগুলি রয়েছে তাঁদের চোখের সামনেই; কিন্তু কবিতায় তাদের চিনে নিতে গেলেই সমস্যা।
তাঁর আগের প্রজন্মের আরবী নারী বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গেও মিরসালের সম্পর্কে ছিল অভ্যাস এবং শীতলতা। “আমিনা” কবিতাটি তার একটি উদাহরণ। ১৯৯২ সালে মিশরী নারীবাদী লেখকদের একটি সংস্থার পক্ষ থেকে প্রতিনিধিদল গিয়েছিল বাগদাদে, প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের পর সেখানকার নারীবাদীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের জন্য। সেখানে হোটেলে তাঁর সঙ্গে একই কক্ষে কয়েকদিন ছিলেন তাঁর মেন্টর আমিনা রশিদ, মিশরের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর নাতনী, তিনি অল্পবয়সে নিষিদ্ধ বামপন্থী রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলে, লেখাপড়া করেছেন সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং পরে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরাসি ভাষার অধ্যাপক হয়েছিলেন। মিরসালের কবিতায় অগ্রজার প্রতি শ্রদ্ধা ও সমীহ সত্ত্বেও বামপন্থী অভিজাত কসমোপোলিটানের সঙ্গে শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, প্রথাবিরোধী নারীর তফাৎটিও গভীরভাবে বিদ্যমান:
“তুমি আমার মায়ের চেয়ে কুড়ি বছরের বড় ,
কিন্তু পরে থাকো রঙচঙে পোশাক
মাথার একটি চুলও পাকে নি।
হে আমার নিখুঁত বান্ধবী,
তুমি এখনই বিদায় নাও না কেন?
তাহলে আমি তোমার রূপালী স্যুটকেসে
সন্তর্পণে ঢুকে পড়তে পারি, আর
পরে দেখতে পারি তোমার সুরুচিপূর্ণ পরিচ্ছদগুলি।
তুমি এখনই বিদায় নাও না কেন, যাতে
এই ঘরের পুরো অক্সিজেনে
আমি নিঃশ্বাস নিতে পারি।”
যেখানে পুরুষশাসিত সমাজে নারীর সঙ্গে নারীর সহধর্মিতার বদলে এই তরুণী লেখেন:
“তুমি কেন ভয় না দেখাতে চেয়েও
ভয় দেখাও আমাকে?”,
বুঝতে পারা যায় তাঁর নিজস্বতা। কবিতাটি শেষ হয় এইভাবে:
“বাথরুমে তোমার টুথব্রাশের সামনে দাঁড়িয়ে আমি ভাবি
আর্দ্র এবং খুব চেনা।”
ভেজা টুথব্রাশের সামনে দাঁড়িয়ে অগ্রজা ও অনুজার অস্তিত্বের সংগ্রাম চলতে থাকে।
১৯৯৮ সালে নৃকুল-সঙ্গীতবিদ মাইকেল ফ্রিসকফ এর সঙ্গে বিবাহসূত্রে তিনি দেশ ছেড়ে পশ্চিমে আসেন এবং অধ্যাপনা এবং দুই সন্তানকে মানুষ করার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যান। তৃতীয় কাব্যগ্রন্থটি (যার নামের বাংলা করলে দাঁড়াবে, “বিকল্প ভূগোল”) প্রকাশিত হয় প্রায় এক দশক পরে ২০০৬ সালে। এবং সাম্প্রতিকতম চতুর্থ কবিতার বইটির (যার নামের বাংলা ভাষান্তর “আমি ঘরে ফেরার আশা ছেড়ে দিয়েছি”) প্রকাশ ২০১৩ সালে। এই চারটি গ্রন্থ থেকে নির্বাচিত কবিতার ইংরেজি অনুবাদের সংকলন “চৌকাঠ”।
মার্কিন সাহিত্য সমালোচক, প্রবন্ধিক, অনুবাদক রবিন ক্রেসওয়েল এর জন্ম ১৯৭৭ সালে। তিনি ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যের ডক্টরেট করেছেন ২০১১ সালে। বর্তমানে তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপনা করেন এবং তিনি “ফারার, স্ট্রস এবং জিরো” প্রকাশনা সংস্থার প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থের অন্যতম সম্পাদক। তাঁর পি.এইচ.ডি সন্দর্ভের বিষয় ‘বেইরুট শহরের আধুনিক কবি ও কবিতা’। আলোচ্য গ্রন্থটির তিনি ইংরেজি অনুবাদক; এ ছাড়াও তিনি নিয়মিত অনুবাদ করেন মধ্যপ্রাচ্যের সাহিত্যিকদের রচিত কবিতা ও গদ্যের।
ওপরে উল্লিখিত কবিতার বইগুলি ছাড়াও আরবী ভাষায় গদ্য লেখেন ঈমান মিরসাল। তাঁর একটি প্রবন্ধ সংকলনের নাম “কী করে জোড়া লাগে: মাতৃত্ব এবং তার প্রেতাত্মা” (ইংরেজি অনুবাদ: রবিন মোগার) স্টার্নবার্গ প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালে। এই গ্রন্থে তিনি মাতৃত্বের বিশ্লেষণ করেছেন দুভাবে: একদিকে কবিতার সঙ্গে তাঁর মায়ের তর্কবিতর্কবহুল সম্পর্কের টানাপড়েন এবং অন্যদিকে তাঁর নিজের সন্তানধারণের এবং সন্তানপালনের মিশেল। গাছের ডালে বসে রয়েছে একটি পাখি এবং তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে জানালার পাশে বসে রঙ্গিন সুতোর সীবনশিল্পে কাপড়ের ওপরে পাখিটার ছবি ফুটির তুলছেন কবির মা: “It is not aesthetic vision or skill that summons my mother’s presence in this canvas, but the slight punctum the bird gives me. I get nothing of this sort from our studio portrait. The bird’s eyes are always looking at me, as though they belong to her.” কবির যখন সাত বছর বয়েস, তখন তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়, শাহজাহানের মমতাজের মতন সন্তানের পর সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে। কবির নিজের দুই পুত্র, তাদের একজন ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল বারো বছর বয়েসে, মৃত্যুর দুয়ার থেকে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়। দেশত্যাগের চৌকাঠ আর মাতৃত্বের চৌকাঠ পেরোনোর সংঘাত আর অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যের ভিত্তি গড়েছে।
অকালপ্রয়াত এনায়েত আল-জায়াত (১৯৩৬-১৯৬৩) আধুনিক মিশরের প্রথম উল্লেখযোগ্য লেখিকা; ব্যক্তিগত জীবনে নিঃসঙ্গ এবং অবসন্ন এই লেখিকা মাত্র ২৬ বছর বয়েসে নিজের জীবনহরণ করেন। তার একমাত্র উপন্যাস “প্রেম ও নৈঃশব্দ্য” প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পরে ১৯৬৭ সালে। (এই প্রসঙ্গে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম কবিতার বইয়ের নামটি মনে আসে।) তাঁর মৃত্যু নিয়ে হৈচৈ চলে কিছুদিন, একটি চলচ্চিত্র এবং একটি বেতার নাটক নির্মিত হয় তাঁর জীবনযাপন নিয়ে তাঁর পর সবাই তাঁকে ভুলে যায় চার দশকের বেশি। কিন্তু ২০১৯ সালে বইটির পুনঃপ্রকাশ এবং ঈমান “আল-জায়াতের পদচিহ্ন ধরে” নামে একটি বই লেখেন তাঁর জীবনের করুণ কাহিনি এবং তাঁর আত্মহত্যার ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ করে। পরবর্তী তিন বছরে এই জনপ্রিয় বইটির পরপর তিনটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে মিশরে, তবে ইংরেজিতে অনুবাদ হয় নি এখনও।
২০১৬ সালে তিনি সদ্যপ্রয়াত সার্বিয়ান-মার্কিন কবি চার্লস সিমিক (১৯৩৮-২০২৩) এর কবিতা আরবী ভাষায় অনুবাদ করেছেন।
|| ৪ ||
যে কবরটা আমি খুঁড়বো এবার / ঈমান মিরসাল
হাতে একটা মরা পাখি নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম সেদিন, এবার পেছনের বাগানে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে, যে খুদে কবরটা আমি খুঁড়বো এখন।
ধুয়েছি তার পালকগুলো, তাতে রক্তের দাগ নেই, ছড়ানো ডানাদুটো, এবং একফোঁটা শিশির তার ঠোঁটে (আত্মার সংহত নির্যাস কি?) যাতে মনে হয় প্রাণহানির পরেও সে অনেক দিন আকাশে উড়েছে।
ঈশ্বর আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন তার পতনের মুহূর্তটিকে, গুরুভার ও কোণাকুণি, ঠিক আমার সামনে।
আমি নিজে অনেক দিন আগে নিজের দেশ ছেড়েছি, যাতে এই অরণ্য এসে হাঁটতে পারি, হাতে একটা মরা পাখি নিয়ে, তার ঝাঁকের কেউ একবার লক্ষও করে নি যে সে নিখোঁজ।
বাড়িতে এসেছি তার দাফনের জন্যে, এই মুহূর্তটি পূতপবিত্র হতে পারত, কিন্তু আমার পায়ে একজোড়া নোংরা স্নিকার!
|| ৫ ||
সদর দরজার একটি বিশেষ অংশ ‘চৌকাঠ’, মেঝের ওপরে প্রলম্বিত সরু কাঠের টুকরো। যে কাঠের ওপর দিয়ে পা ফেলে ঢুকতে হবে গৃহে, অথবা বেরোতে হবে গৃহের থেকে। এক জগৎ থেকে অন্য জগতে প্রবেশে চাবিকাঠি, বিশেষ করে রক্ষণশীল সমাজে, যেখানে অন্দর ও বাহিরকে এক করে দেওয়া দেওয়ার থেকে মানুষ এখনো অনেকটাই দূরে। ইংরেজিতে প্রকাশিত কবির এই প্রথম কাব্যগ্রন্থে দুই জগতের মেলামেশা এবং সংঘর্ষ।
যে নারীকে তার নারীত্বের জন্যই মিছিলের এক কোণে সরে দাঁড়াতে হয়, তার কাছে একাকিত্ব এবং প্রতারণা কবিতার অস্ত্র হয়ে ওঠে। চৌকাঠ বেরিয়ে বাইরের জগতে প্রবেশের আগেই তাঁকে অস্ত্র, বর্ম, তীর, শিরস্ত্রাণ: সব পরে নিতে হয়, সেখানে নারী সর্বদা সমাজের প্রখর প্রহরায়। যেমন “মোলাকাত” নামের এই কবিতায়:
“চোখ খোলা রেখে
ধ্বংসের দিকে হেঁটে যাই আমরা
এতটুকু দ্বিধা ছাড়াই।
ভীতি থেকে যে শক্তির জন্ম, তার সাহায্যে
যে কাঁটাগুলি বিঁধে রয়েছে আমাদের সৌহার্দ্যের গায়ে,
সেগুলি এক এক করে তুলে ফেলি,
আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস:
অনূদিত উপন্যাসগুলি নান্দনিক যুক্তিতর্ক দিয়ে
সমর্থন যোগাবে আমাদের অসতীপনাকে।”
কোন উপন্যাসগুলোর কথা লিখছেন তিনি? বইয়ের অন্যত্র মিলান কুন্দেরার (১৯২৯–২০২৩ ) উল্লেখ রয়েছে, আরও আছে লরেন্স ডারেল (১৯১২-১৯৯০) এর কথা: যাঁর চারটি বিবাহ, অনেকগুলি বিবাহ-বহির্ভূত প্রেম এবং মিশরের পটভূমিকায় লেখা চারটি উপন্যাস “দি আলেকজান্দ্রিয়া কোয়ার্টেট” যার প্রথমটির নাম “জাস্টিন” (প্রকাশ ১৯৫৭):
“সখি, তুই কি ‘জাস্টিন’ বইটা পড়েছিস?
শিগগির পড়ে নে!”
আর একটি কবিতার অতিসরল নামকরণ, “প্রেম”: আরব কবিতার ডালভাত এই বিষয়,
“তুমি যদি আরব কবি হও,
এই বিষয় নিয়ে কিছু না কিছু লিখেছো তুমি।
দীর্ঘকাল তুমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলে
বুদ্ধিলোপের ঊষর মরুভূমিতে…..”
কবিতাটির বুদ্ধিদীপ্ত এবং স্পর্ধিত সমাপ্তি:
“গভীর রাতের শূন্য ডিগ্রি তাপমাত্রায়
সে শিস দিতে দিতে মরুভূমির বালিতে হাঁটে
এমন কোনো মরমিয়া গানের সুর:
তুমি হলে আমি আর আমি হলাম তুমি।”
পুরুষ কবিরা শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে প্রেমের কবিতা লিখেছেন, এক নেশার থেকে অন্য নেশায় মদ্যপের পা ফেলার মতন, একজন নারীই সেখানে তার প্রখর মননশীলতায় যোগ করতে পারেন “রিয়ালিটি চেক”, যেমন তিনি তাঁর পুরানো শহর, পুরানো সমাজ আর পুরানো প্রেমিকদের ছেঁটে ফেলে অজানার দিকে এগিয়ে যান, নতুন অভিযাত্রায়, পুরানো নিগড়ের চৌকাঠের ওপরে পা দিয়ে।
এই কাব্যগ্রন্থের পাতায় পাতায় খুঁজে পাওয়া যাবে সেই সম্পূর্ণ নারীকে, হৃদয় ও মনন, শরীর ও যৌনতা, খোলামেলা অথচ চতুর, একই সঙ্গে সাহসী এবং লাজুক, সব মিলিয়ে নান্দনিক আবেদনে টইটম্বুর। আরও একটি কবিতা দিয়ে শেষ করি এই পাঠ-প্রতিক্রিয়ার নিবন্ধ।
|| ৬ ||
পুরুষ যখন আমাকে বোঝায়: প্রেম কাকে বলে / ঈমান মিরসাল
একদিন এক পুরুষ সিদ্ধান্ত নেয়, আমাকে বুঝিয়ে বলবে প্রেম কাকে বলে।
বাইরে তখন ছায়া ঘনিয়েছে, সে একের পর এক শার্টের বোতাম লাগায়, বিষণ্ণ আলো নেচে বেড়ায় কক্ষের কোণে কোণে। তার অর্ধেকটা অস্তিত্ব রয়েছে এই ঘরে, মুভি শেষ হওয়ার মুখে যখন আলো কমে আসে পর্দায় এবং মানুষজন এক্জিট চিহ্নের দিকে এগোতে থাকে, ঠিক সেই রকম। পোশাক পরে নেওয়ার পরে তার চশমা কানে শক্ত করে এঁটে নিয়ে সে বিছানার কাছে এসে আমায় সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দেয় ‘প্রেম’।
সেই আধো অন্ধকার ঘরে তার মৃদু কণ্ঠস্বর: “আসলে প্রেম হল এক সন্ধান, খুঁজে বেড়ানো, ….” আমি রতিক্লান্ত চোখ খুলে দেখি একদল কোনকিসতাদরা স্বর্ণের খোঁজে ঘুরে বেড়ায় চিলের প্রত্যন্ত অরণ্যে: ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত এবং অসহায়; আর পাথরের পিছনে লুকিয়ে থাকা ভূমিজ ইন্ডিয়ান উপজাতির এক মানুষ ভয়ে কাঁপে।
আর যখন সে বলে, “প্রেম হল চরম তৃপ্তির অনুভূতি তার সাথে, ….” আমি শুনতে পাই সুরেলা কণ্ঠে গান গাইছেন এলা ফিটসজেরাল্ড এবং আমি একতাল কালো চকলেটের সামনে দাঁড়িয়ে আঙ্গুল দিয়ে সেটা ছুঁয়ে দেখছি।
আবার সে বলে, “যে ঘটনাটা ঘটছে, সেটা …..” আমার কল্পনায় তখন আর কিছুর অস্তিত্ব নেই।
এই পুরুষটিকে আমি আর কোনদিন নিজের চক্ষে দেখব না, তাকে জিগ্যেস করতেও পারব না, প্রেম মানে নিজের হাতঘড়িটাকে বিছানার পাশে ফেলে যাওয়া কি না।
গ্রন্থটির খুঁটিনাটি:
[“The Threshold” – by Iman Mersal; Translated from The Arabic by Robyn Creswell; Publisher: Farrar, Straus and Giroux; 2022; ISBN: 978-0374-604-271; Cover design: Juna Hume Clark; xvii + 107 pages; Originally published in Arabic in 2013 in Cairo by Dar Sharqiyat and in Beirut by Dar al-Tanweer.]