

শিখা—বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের মুখপত্র—সম্পা. আবুল আহসান চৌধুরী; পাঠক সমাবেশ, ঢাকা-১২০৫, বাংলাদেশ; প্রথম প্রকাশঃ অক্টোবর ২০২৫; ISBN 978-984-696-009-9
সাইজে অক্টেভোর চেয়েও একটু বড় (১০ X ৭ ১/২ ইঞ্চ), দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ, চমৎকার ছাপাই-বাঁধাই, পৃথুল-কলেবর (পৃ ৭৫৩)—এমন একটি বই হাতে তুলে নিলেই পড়তে ইচ্ছা করে, উপরন্তু যদি তা হয় ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের মুখপত্র’!
সেটা কী?
বলছি।
তবে প্রথমেই উল্লেখ থাক্, এটি একটি অধুনালুপ্ত প্রধান বাংলা পত্রিকার পূর্ণ-সংকলন। ফিরে দেখা। পুনঃপাঠ।
***
আধুনিক বঙ্গদেশে সংবাদ-সাময়িকীর ইতিহাসটা কম দীর্ঘ নয়। শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন প্রথম প্রকাশ করল ‘দিগ্দর্শন’ (মাসিক) পত্রিকা, এপ্রিল ১৮১৮-তে। পরের মাসে তাঁরাই বের করতে শুরু করেন ‘সমাচার দর্পণ’ (সাপ্তাহিক), মে ১৮১৮।
১৮১৮-তেই কলকাতা থেকে সাপ্তাহিক ‘বাঙ্গাল গেজেটি’ প্রকাশ করেন গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য। এর পরে ১৮২০-র দশকেই ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রক্ষণশীল ‘সমাচার চন্দ্রিকা’ ও নব্যপন্থী রামমোহনের ‘সম্বাদ কৌমুদী’-র টক্কর কম উপভোগ করেনি বাংলার পাঠককুল। অতঃপর গুপ্তকবির ‘সংবাদ প্রভাকর’ (১৮৩১), ইয়ং বেঙ্গলীদের ‘জ্ঞানান্বেষণ’ (১৮৩১), ঠাকুরবাড়ির ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’ (১৮৪৩), বিদ্যাসাগরের ‘সোমপ্রকাশ’ (১৮৫৮) এসে পড়লে বাংলা সাংবাদিকতা প্রবল গতিতে এগোতে থাকল।
কিন্তু এ’সবই তো হিন্দুদের ব্যাপারস্যাপার। বঙ্গীয় জনসংখ্যার অর্ধভাগ যে মুসলমান, তাঁদের কথা কোথায়, তাঁদের প্রতিনিধিত্ব কোথায়?
অভিমানে হোক্, রাজ্য হারিয়ে দিশেহারা হোক্ বা মূলে-ফিরতের তাগিদে হোক্— ভারত তথা বাংলার মুসলমান কিন্তু ১৮৬০-এর দশকের আগে ইউরোপীয় শিক্ষার প্রতি তেমনভাবে আকৃষ্ট হননি। প্রথম দিককার যে সব ইসলামী-বাঙালি পত্রিকার নাম পাওয়া যায়, সেই ‘বালারঞ্জিকা’ (বরিশাল, ১৮৭৩) বা ‘আখবারে এসলামীয়া’ (করটীয়া, ১৮৮৪), বা ‘মুসলমানবন্ধু’ (কলকাতা, ১৮৮৪) কিন্তু তেমন জনপ্রিয় বা দীর্ঘজীবী হয়নি।
এইখানে অন্নদাশংকরের ‘বাংলার রেনেসাঁস’ রচনাটি স্মরণ করি। উনি ‘শ্রীরামপুর মিশন প্রেস’, রামমোহন ও ‘হিন্দু কলেজ’-কেন্দ্রিক বাংলার প্রথম-তথা-আদি নবজাগরণের থেকে ঢাকা-কেন্দ্রিক দ্বিতীয়-তথা-মুসলিম নবজাগরণকে পৃথক করেছেন, কারণ আদি-নবজাগরণটিতে মুসলমানগণ একেবারেই বাদ পড়ে গিয়েছিলেন। এই মুসলিম-নবজাগরণের কালটি ১৯২০-র দশকে। ঢাকায়।
***
১৯২৬ খ্রি. মুক্তচিন্তা প্রসারের তাগিদে ঢাকায় ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর প্রতিষ্ঠা ছিল একটি স্বাগত-পদক্ষেপ, যে সংগঠনের ঘোষিত মূলমন্ত্রই ছিলঃ ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ ‘শিখা’-পত্রিকা ছিল এই সমাজেরই বার্ষিক মুখপত্র, যার নামটিই মাত্র শোনা ছিল কিন্তু চোখে দেখিনি, কারণ কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগার বা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ লাইব্রেরিতে এর কোনো সংখ্যা উপলব্ধ নয়। আমার ঢাকার বন্ধুরাও সেখানে খুঁজে পাননি।
সম্প্রতি এ’হেন ‘শিখা’ পত্রিকার এক অখণ্ড সংস্করণ বের করে সম্পাদক এবং প্রকাশক মহাশয় অশেষ কৃতজ্ঞতার পাত্র হয়েছেন আমাদের । মুখবন্ধে চৌধুরী সাহেব লিখেছেন কী অশেষ ক্লেশে অরিজিন্যাল পত্রিকাগুলি উনি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন। পত্রিকার সর্বশেষ সংখ্যাটি পেতে দীর্ঘ বারো বৎসর অপেক্ষা করতে হয়েছে—তবু পারফেকশনের তাগিদে সেই প্রতীক্ষা সয়ে নিয়েছেন তিনি। অভিনন্দন!
***
বার্ষিক ‘শিখা’ পত্রিকার মোট পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিলঃ ১৯২৭-৩১ খ্রি. বর্তমান অখণ্ড-সংস্করণটিতে সেগুলি হুবহু পুনর্মুদ্রিত হয়েছে facsimile রূপে । এতে একটা সুবিধা হয়েছে—ঠিক কী ফন্ট সেকালে ব্যবহৃত হয়েছিল পত্রিকাটিতে, কী প্রকার প্যারা-বিভাগ ও পেজ-মেকাপ করা হত—তার হাতে-হাজির নমুনা পাওয়া গেল, এবং যতিচিহ্ন ও অন্যচিহ্নাদির ব্যবহারের (উদা. টাকা-আনা-পাই-এর চিহ্ন)। একটি দীর্ঘ ভূমিকা লিখেছেন সম্পাদক মহাশয়, যেটি সে সময়ের চিত্রটিকে বুঝতে সম্যক সাহায্য করে।
যেমন, ‘শিখা’ পত্রিকা যে বেশিদিন চলতে পারেনি, তুলনায় ‘মোহম্মদী’ বা ‘সওগাত’ পত্রিকা সুদীর্ঘদিন চলেছিল, তার কারণ হিসেবে শিখার সোজা-সাপটা উন্মুক্ততার কথা বিশেষভাবে বলা হয়েছে, যেটা সেকালে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না ঢাকার রক্ষণশীল সমাজ। যেমন, ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর অধিবেশনে স্টেজে উঠে গান গাইতেন সম্পাদক কাজী মোতাহার হোসেনের বালিকা কন্যা সনজীদা খাতুন, বা, দশম অধিবেশনের সভাপতি হয়েছিলেন কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র ইত্যাদি ।
‘যুগপুরুষ’ মোহম্মদ আকরম খাঁ-র রক্ষণশীল ‘মোহম্মদী’ পত্রিকার সঙ্গে প্রবল বিরোধিতা বাধে আর এক প্রধান প্রগতিশীল মুসলিম পত্রিকা ‘সওগাত’-এর, বিরোধিতা বাধে এই ‘শিখা’ পত্রিকার সঙ্গেও। বিষয়ঃ ছবি ছাপা। কলকাতায় বসে নাসিরুদ্দীন সাহেব তো তাঁর ‘সওগাত’-এর হেডিঙে ‘সচিত্র’ লিখেই রেখেছিলেন (পরবাস গ্র স সংখ্যা ৯০. https://www.parabaas.com/article.php?id=7767) আর নারীপুরুষের ছবি ছেপে ছেপে ছয়লাপ করে দিয়েছিলেন! এই ‘শিখা’ পত্রিকায় কোনো মানুষজনের ছবি ছাপা হয়নি বটে কিন্তু প্রচ্ছদশীর্ষে যে বৃক্ষ, মসজিদ ইত্যাদির ছবি ছাপা হতো তারও মনগড়া কুব্যাখ্যা করে গোঁড়ারা। তা নিয়েই বিরোধ।
তবে, নির্ভীকভাবে সোজা সাপটা মত প্রকাশে কার্পণ্য করেনি শিখা। জনৈক যুবক শামসুল হুদা লেখেন,
দেড় হাজার বছর আগে খেজুরের পাতার ঘরে বসে আরবদেশের মেষপালক ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কয়েকজন লোক যেসব বিধিব্যবস্থা দিয়ে গেছেন, তা বর্তমানকালে সেকেলে হয়ে পড়েছে, অতএব তা এখন বর্জন করলে ক্ষতি নেই। হয়ত মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এখনকার মানুষ ওসবের চেয়ে উতকৃষ্টতর নিয়ম ও ঐতিহ্যের অধিকারী হয়েছে।
সেকালের ঢাকার গোঁড়া মুসলিম সমাজ যে এই চাঁচাছোলা মতপ্রকাশে খুশি হবে না, বলা বাহুল্য। সম্পাদক আবুল হোসেন ও কাজী আবদুল ওদুদের উপর ফতোয়া জারী হয়, তাঁদের মুচলেখা দিয়ে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল। ভাষাচার্য ডঃ মুহম্মদ শাহীদুল্লাহ্ সাহেবের মতো মানুষ মধ্যস্থতা করতে এসেও অপমানিত হন।
***
‘শিখা’ পত্রিকার পাঁচটি বার্ষিক সংখ্যাই এখানে হুবহু পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। সঙ্গে উপরি পাওনা ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর বার্ষিক সভার কার্যবিবরণীর প্রতিলিপি। একটা যুগ ও সমাজ-সাহিত্যকে সম্যক বুঝতে এর চাইতে উপযুক্ত পদ্ধতি আর কী হতে পারে?
সংখ্যাগুলির সূচীপত্রে চোখ বুলানো এক চমৎকার অভিজ্ঞতা, যেখানে, ধরুন, কাজী নজরুল লেখেন ‘নুতনের গান’, গণিতজ্ঞা ফাজিলতুন্নেসা লেখেন আধুনিক নারীশিক্ষা নিয়ে, আবার বাঙলার পীরপূজা নিয়েও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এ’পত্রিকা ছিল প্রধানত প্রবন্ধেরই পত্রিকা, এবং যথেষ্ট গুরুগম্ভীর ও বিতর্কিত বিষয় নিয়েই লেখা হয়েছে প্রবন্ধাবলী। যেমন, তৃতীয় সংখ্যায় ‘ইসলাম ও শরীরচর্চ্চা’ প্রবন্ধে সুরা আনফাল এর উপযুক্ত আয়াত উদ্ধৃত করে সপক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়েছে (মুদ্রণপ্রমাদে ‘আনকাল’ ছাপা হয়ে গিয়েছে)। আবার, ‘হুর পরী…স্বর্গীয় কাম-শিহরণ’ নিয়ে খোঁচা দেবারও বিরাম নেই। সাধে কি আর কাঠ-মোল্লারা ‘শিখা’-র উপরে খাপ্পা ছিল?
সংকলনটি কালেক্টর’স আইটেম।
পড়ুন, পড়ে আনন্দ পাবেন।
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা—পরিমল ভট্টাচার্য.; অবভাস, কলকাতা-৯, প্রথম প্রকাশঃ জানুয়ারি, ২০২৫;
ISBN 978-93-80732-68-8
“But I am young, O Rustum; and the strong Are not always victorious. I am of Persian blood, And thou art Rustum, whom I have sought so long.”
— Matthew Arnold, Sohrab and Rustum
...কিন্তু আমাদের আজকের এই আখ্যানের নায়কের তো কোনো বনেদী পারসীক রক্তের উত্তরাধিকারের গর্ব ছিল না, বরং সে এই সাড়ে ছয়শত পৃষ্ঠাব্যাপী ক্লাসিকটির সারা অঙ্গ জুড়ে মাথা চাপড়ে গেছে না-জানি-সে-কোন্ অবন ঠাকুরের আঁকা চতুর্ভুজা ‘ভারতমাতা’-র এজলাসে...যে ‘মি-লেডি’ শেষাবধি তার সাতশ’ বছরের মাতুলবংশের বঙ্গীয়ধারা মেনে নিলেন না সিলেট-আগত ‘বিদেশী’ বলে দাগড়ে দিলেন তাকে— তারও মীমাংসা হল না, যদিও বঙ্গসাহিত্যের আঙিনায় পাকাপাকি এক আসন করে নিল এই হাওয়াতাঁতি।
সেই দেড় হাজার বছর আগে মহাকবি ফিরদৌসীর কলমে পারসীক-বীর সোহরাব যেমন খুঁজে ফিরেছে বাপ রুস্তমকে, আজকের ভারতবর্ষের নব্য-নাগরিকত্ব আইনের ফাঁদে পড়ে আজকের বাপ্পাদিত্যেরা খুঁজে চলেছে তার পিতা বা মাতার পূর্ব-পূর্বজদের— সেই সেনরাজাদের কালে কান্যকুব্জ নগরী থেকে যাঁদের বঙ্গদেশে পদার্পণ।
কিন্তু হাওয়াতাঁতিরা? তাঁরা কে বা কারা?
তিনটি নদী দিয়ে বাঁধা বেণী—যার দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি, যমুনা ও সরস্বতী আজ অপ্রত্যক্ষ হয়েছেন—গঙ্গাতীরবর্তী সেই ত্রিবেণীর অদূরস্থ নদীবেষ্টিত এক ভূখণ্ড, আকাশ থেকে দেখলে মনে হবে যেন এক পূর্ণ মৎস্য শোয়ানো আছে,—এককালে ছিল দক্ষিণবঙ্গের এক প্রধান বন্দর: সপ্তগ্রাম। লোকমুখে ‘সাতগাঁ’।
অষ্টম শতক থেকে ক্রমে ক্রমে আদিবঙ্গের তাম্রলিপ্তি বন্দরের অধোগতির সাথে সাথে হুগলীজেলার সাতগাঁর রমরমা! সুলতানী ও মোগল আমলে, পরে বিশেষত পর্তুগিজদের হাতে সাতগাঁ (এবং হুগলী) হয়ে উঠল এক প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র, যে সব গল্প পরিমলের এই অতীব সুখপাঠ্য ও গতিময় উপন্যাসে সজীব হয়ে জেগে উঠেছে। বঙ্গ-ইতিহাসের পর্তুগিজ অধ্যায় সাধারণত উপেক্ষিত থাকে বঙ্গসাহিত্যে, যে ফাঁকটা ভরেছে এই উপন্যাসে।
কিন্তু এ’গল্পের আসল নায়ক-নায়িকারা তো এক প্রাচীন কোবরেজ-বংশ, যার আদিপুরুষ রামাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ দিল্লি-আগত লুটেরা দরপ খানের, যিনি ততদিনে সাতগাঁর আলো-হাওয়ায় বাঙালি হয়ে পড়েছেন, এ’দেশেই বাস।
কিন্তু হাওয়াতাঁতিরা?
কে হাওয়ায় হাওয়ায় বুনল তাঁত? কে তার রংরেজ?
সে বা তারা তো সেই ফরাসি-পর্তুগিজ সংস্কৃতি প্রভাবিত সাতগাঁর ম্যাওবিড়ালের গীর্জের ঘন্টাধ্বনি শোনে, তাদের ঘরে এক তিনশ’ বছর বয়সী কাকাতুয়া-এন্টনী পর্তুগালীভাষায় মুখখিস্তি করে। আবার যেখানে নবতিপর শাকম্ভরী পিসিমার গঙ্গাযাত্রা হয়। সাতশত বৎসর পূর্বের আদিরামের থেকে প্রতিষ্ঠা হলেও সময় এখানে থেমে গেছে, যেখানে এই সেদিনও মার্টিন কোম্পানীর ডিসকার্ডেড এক ট্রেন ঝিক্ ঝিক্ করে চলত, আর ইস্টেশনে অপেক্ষা করত একটি পালকি। এ’বংশের এক প্রাচীন লক্ষণা ঠাকুমা সতী হয়েছিলেন, যার সত্যাসত্য যাঁচতে শ্রীরামপুর থেকে এলেন স্বয়ং উইলিয়ম কেরি। ওড়িশা থেকে পাওয়া এক প্রায়-অজ্ঞাতভাষার পাঠোদ্ধার করতে ‘ইউনুস অক্সফোর্ডি’ উপনামে চলে আসেন স্বয়ং স্যর উইলিয়ম জোন্স….
আব্ব্যুলিশ! লেখক কিন্তু গপ্পের গোড়াতেই ঘোষিয়ে দিয়েছেন,
এটি একটি কল্পকাহিনি। এখানে বর্ণিত সকল নদী, মধ্যবর্তী জনস্থান, জাহাজঘাটা, ঘড়িঘর, গির্জা, ট্যাভার্ন, আদালত, মানুষ, পাখি, বিগ্রহ, শিয়ালের ডাক, জোনাকির মিটমিটে আলো, মার্টিনস রেলের চাকায় কেরেস্তান-গোরস্তান ধ্বনির অস্তিত্ব কেবলমাত্র এই বইয়ের দুই মলাটের মাঝেই রয়েছে,….কিন্তু এই মানের ও এই ব্যপ্তির উপন্যাস গত তিরিশ বছরে বাংলাসাহিত্যে লেখা হয়নি।
তার আগেও কি হয়েছিল?
এ’ উপন্যাস পড়তে পড়তে অনেকবার মনে হয়েছে ‘ইছামতী’ পড়ছি। ঐতিহাসিকতার ঘনঘটায় কখনও আবার আসে বঙ্কিমী ঝংকার! বস্তুত, পরিমলের এই হাওয়াতাঁতিরা বঙ্গীয় উপন্যাসধারার দেড়শ’ বছরের প্রয়াসের নির্যাস!
***
ইতিহাস তো হলো।
এই উপন্যাসের ভাষাভঙ্গিমার কথায় মনে পড়ে ‘উপমা কালিদাসস্য, ভারবেরর্থগৌরবম্’ ইত্যাদি। বস্তুত, পাতায় পাতায় এত এত সুপ্রযুক্ত উপমার প্রাচুর্য যে শুধু তাই নিয়েই একটা নিবন্ধ লেখা যেতে পারে।
আর চরিত্র চিত্রণ?
এন্টনী কাকাতুয়ার মতো হার্লে ডেভিডসনের জবরদস্ত্ বাইকটাও কি উপন্যাসের এক প্রিয় চরিত্র নয়? বা কলার ভেলায় ভেসে আসা সাপে-কাটা কিশোরী মান্দাসী, যার কোমরে পর্তুগালী দাস-ব্যবসায়ী কোম্পানীর ত্রিভুজাকৃতি সিলমোহর! স্বাধীনতাসংগ্রামী-টার্নড-কম্যুনিস্ট হেমন্তমামার প্রসঙ্গে বরোদা থেকে লুকিয়ে সাতগাঁয়ে চলে আসছেন অরবিন্দ ঘোষ, তখনও ‘ঋষি’ হননি।
আর কত বলব? বলতে বলতে ঝাঁপি যে আর ফুরোবে না!
***
দার্জিলিং নিয়ে, তিব্বত নিয়ে, ওড়িশার আদিবাসীদের নিয়ে অতি অতি মনোজ্ঞ লিখন পরিমলের কলম থেকে বেরিয়েছে আগে, কিন্তু উপন্যাস?
প্রায় ষাট বছর বয়সে পৌঁছে প্রথম উপন্যাস লিখে এতখানি মাতাতে আর কে পেরেছেন, জানি না। এত বড় ক্যানভাসে বাংলা উপন্যাসও সম্ভবত আগে লেখা হয়নি।
এ’ উপন্যাস না পড়লে আধুনিক বাংলাসাহিত্যের পাঠ অপূর্ণ থেকে যাবে।
পুনঃ প্রথম পাতায় লেখাঃ
“ষষ্ঠীঠাকরুণ বানরের চোখে হাত বোলালেন, বানরের দিব্যচক্ষু হল।”
—অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘ক্ষীরের পুতুল’
কোনো গ্রন্থের উৎসর্গপত্রী দেখে এতোটা অনির্বচনীয় আনন্দ আগে কখনও পাইনি।
|| অলবড্ডে পোজার এলেন বঙ্গদেশে ! ||
থ্রি মেন ইন এ বোট-- জেরোম কে জেরোম; ভাষান্তরঃ অভীক মোহন দত্ত; অন্তরীপ পাবলিকেশন, শ্রীরামপুর, হুগলি’ প্রথম প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর, ২০২৫;
ISBN 978-81-987258-7-5
‘ভালগেট’ কাকে বলে?
ভালগেট হলো চতুর্থ শতাব্দীতে করা বাইবেলের প্রথম লাতিন অনুবাদ, হিব্রু বাইবেলের তুলনায় যা ক্রমশ সমগ্র ইউরোপে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গুরুগম্ভীর যে প্রখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক মানুষটি এই যুগান্তকারী অনুবাদটি করেছিলেন তিনি স্ট্রাইডনবাসী সাধু জেরোম, কে জানত যে ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে সমনামী এক রসসাহিত্যকার ইংরেজি-পাঠকদের আনন্দরসে ভরিয়ে দেবেন, ভরিয়ে রাখবেন আজ প্রায় দেড়শ’ বছর ধরে!
হাস্যরস পরিবেশনে ‘কমেডি’-র জন্ম তো হয়েছিল খ্রিস্টজন্মেরও ছ’-সাতশ’ বছর আগের গ্রীসদেশে। কিন্তু সে তো নাটকের অঙ্গ, চাক্ষুষ করবার বিষয়। কিন্তু, কেবলমাত্র পৃষ্ঠার উপরে অক্ষরের আঁকিবুকি টেনে মানুষের কাছে হাস্যরসের আনন্দ পৌঁছে দেওয়া কঠিনতর কাজ, যে কাজে স্টাফোর্ডশায়ারবাসী এক গরীবঘরের সন্তান জেরোম-ক্লাপকা-জেরোম সফল, অতি সফল—হ্যাঁ, গত প্রায় দেড়শ’ বছর ধরে!
জেরোম কত বড়ো হাস্যরসকার ছিলেন, তাঁর রচনায় বক্রোক্তি বা ব্যঙ্গোক্তির আধিক্য ছিল না সরল ভঙ্গিতে হাস্যরসের পরিবেশনার, ভিক্টোরিয়ান সমাজকে তিনি খেলাচ্ছলে কাটাছেঁড়া করেছেন কি না—এ’সব ইঙ্গরেজী-সাহিত্যসমালোচকদিগের কাজ, বর্তমান গ্র.স.-কারের নহে। সে বেচারি মাতৃভাষায় বিশ্বসাহিত্যের এক শ্রেষ্ঠ রচনার অনুবাদ হাতে পেয়ে উৎফুল্ল, এবং পড়ে আরও!
নেট-তথা-বইপাড়া ঢুঁড়ে ঢুঁড়ে দেখি হরর-থ্রিলার-গোয়েন্দাগল্পের যত যত বঙ্গানুবাদ পাওয়া যায়, হাস্যরসাশ্রিত কাহিনির মোটেই তা পাওয়া যায় না। আরে বাবা, বিশ্বসাহিত্যে মজার গল্পের লেখক এসেছেন কয়জনা, বলুন তো? পি জি ওডহাউজের বঙ্গানুবাদ চোখে পড়েনি, মার্ক টোয়েনের টম সইয়ার/হাকলবেরির বঙ্গানুবাদ হয়েছে কিন্তু মজাদার ভ্রমণকাহিনী The Innocents Abroad-এর হয়নি। আর, রবার্ট বার বা ব্যারী পেইনের মতো রসরচনাকারীর নাম তো আমরা বাংলা পাঠকেরা শুনিইনি, হিব্রুতে শোলম আলেহমের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম।
তাই এখানে অভীক যখন লেখেন,
অবিশ্যি, একটা কথা অদ্ভুত হলেও সত্যি। আজ পর্যন্ত এই কিসিমের যে-ক’টা রোগের হ্যান্ডবিল আমি পড়ে উঠতে পেরেছি, দেখেছি সবক’টা রোগই আমার আছে।…শরীরে যে সব অনুভূতি হচ্ছে তা আমার হাতের ওই হ্যান্ডবিলের রোগলক্ষণের লিস্টির সঙ্গে ছত্রে ছত্রে মিলে যায়। মাইরি বলছি।
‘মাইরি বলছি’? চোখ কচলে নিয়ে আরেকবার পড়ি।
দেখি তো অরিজিনালে ঠিক কী লিখেছিলেন প্রোটাগনিস্ট ‘জে’-সাহেব। পেঙ্গুইনের পপুলার ক্লাসিকখানা পেড়ে নিই। সেই ইস্কুল-পাঠ্যে পড়া ছিল আঙ্কল পোজারের কাণ্ডকারখানা!
***
কোনো কালোত্তীর্ণ অনুবাদকে মূলের আক্ষরিক-দাস হলে চলে না। যে ভাষায় অনুবাদ হচ্ছে তার নাড়িটা বুঝতে হবে। সেটা সঠিক বুঝেই অনুবাদক ফর্ম্যাট ভাঙেন, প্যারা ভাঙেন, ‘কিসিম’ বা ‘মাইরি’-র মতো শব্দ ঢোকান। কারণ আজকের বাঙালি পাঠক এই ভাষাই বুঝবেন, এতেই সড়গড়। ভুললে চলবে না, বয়সে জেরোম সাহেব (১৮৫৯ - ১৯২৭ খ্রি.) রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক। তা বলে ২০২৫-এ’ দাঁড়িয়ে রাবীন্দ্রিক বাংলায় জেরোমের বঙ্গানুবাদ চলে না।
তন্ময় হয়ে পড়তে পড়তে চলে গেছি শেষের দিক পানে—সেই যে সারে কাউন্টির ম্যাগনা কার্টা দ্বীপে (দ্বাদশ অধ্যায়)। সই-টা ঠিক কোথায় বসে করা হয়েছিল, রানিমীড জলাভূমির এ’তীরে না ও’তীরে, তা নিয়ে একটু মজা করেছেন ‘জে’-সাহেব মূল লেখায়, আমাদের অনুবাদকার দেখি রানিমীডের নামটাই উহ্য রেখেছেন এ’স্থলে । না, তাহাতে রসহানি কিছু ঘটে নাই, কারণ এই জলাভূমির নামটার সঙ্গে আমাদের বাঙালি পাঠকের বিশেষ লেনাদেনা নাই, না-ই বা থাকল তার নামটা এখানে (আগে তো একবার বলেছেন এর কথা)? লেখার গতির স্বার্থে এতটুকু স্বাধীনতা অবশ্যই গ্রাহ্য, যেখানে, বিশেষ করে রকম রকমের ফুটনোটে কোথাও উইলিয়ম গিলবার্টের অপেরা, কোথাও ‘দ্য ব্লু পোস্ট’ পানশালার পরিচিতি বা আবার কোথাও হেনলি নৌ-প্রতিযোগিতার কথা বলে বলে চলে গিয়েছেন অনুবাদক। এ’গুলি পড়তে পাওয়া তো উপরি। বড় আনন্দের।
***
বাংলা রসসাহিত্যের চিত্ররূপায়ণে যেমন পরশুরামের যতীন সেন বা শিব্রামের শৈল চক্রবর্তী, জেরোমের ‘থ্রি মেন…’ তেমনই কালজয়ী হতো না আলফ্রেড ফ্রেড্রিক্সের (১৮৩৫-১৯২৭) ইলাস্ট্রেশন বিনা। এই বাংলা-এডিশনে সেই অসাধারণ চিত্রগুলি রাখা হয়েছে যা প্রকাশনাটির মান বাড়ায়। তন্ময় হয়ে দেখতে হয় ছবিগুলি। শুধু ছবি দেখেই একটা বেলা কাটিয়ে দেওয়া যায়। অরিজিনাল থেকে নদীর যাত্রাপথের ম্যাপটিও এখানে রাখা হয়েছে। আঙ্কল পোজারের সেই দেওয়ালে ছবি টাঙানোর গপ্প তো জগৎবিখ্যাত, বহু শিল্পী তার ছবি এঁকেছেন। এখানে সুবিনয় দাশের তুলিতে দেখে ভালো লাগল।
***
বাংলাভাষায় অনুবাদসাহিত্য যে বড়ই পুষ্ট এমনটা বলা চলে না। যেটুকু উচ্চমানের কাজ হয়েছে তা ননীভৌমিক-অরুণসোম-কামাক্ষীপ্রসাদের কলমে রুশসাহিত্যের। হ্যাঁ, অদ্রীশ বর্ধনের সাই-ফি অনুবাদের কথাও অবশ্যই বলতে হবে। সেই ধারায় বর্তমান সংযোজনটি অবশ্যই একটা বড় স্টেপ! এমন সুন্দর ও গতিময় বঙ্গানুবাদ কমই পড়তে পাওয়া যায়। জগাই-মাধাইয়ের জীবনালেখ্য নিঠুর হে (দুই খণ্ডে) উপন্যাস লিখে সাড়া ফেলেছিলেন এই নবীন লেখক। তিনি যে এমন সমর সেন-সম বঙ্গানুবাদক সেটা কে জানত?
এই ছেলেটা অনেক দূর যাবে।
দশে দশ!
|| উদাসী হাওয়ার পথে পথে মুকুলগুলি ঝরে ||
India’s First Radicals—Young Bengal and the British Empire--Rosinka Chaudhuri; Penguin Viking, Gurugram 122002. First published: 2025.
ISBN 978-0-143-47430-2
বইটি খুলে প্রথমেই এর তারিফ-পত্রে চোখ চলে গিয়েছিল, যেখানে স্বনামধন্য অধ্যা. ব্রায়ান হ্যাচার শুধু যে ডিরোজিয়ানদের মুক্তচিন্তার তারিফ করেছেন তা-ই নয়, তারা যে এক স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছিল যা দূরে দূরে ছড়িয়ে পড়ে—সেটাও বলেছেন। মনে পড়ে গেল, পাঁচ বছর আগে উনিই রোসিঙ্কার ডিরোজিও-বন্দনাকে ‘উদ্দেশ্যতাড়িত’ বলেছিলেন যখন বর্তমান লেখিকা ‘রুইন্স অব্ রাজমহল’ কবিতাটিকে হেনরির ভারতপ্রেমের পরাকাষ্ঠা মেনেছিলেন (‘Hinduism Before Reform’, 2020, page 39).
বস্তুত, হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও ও তাঁর ‘ইয়ং বেঙ্গলী’-ছাত্রদলকে নিয়ে নানান ব্র্যান্ডের ঐতিহাসিকগণ—সে কম্যুনিস্ট থেকে নিম্নবর্গীয়—নানান প্রকার মূল্যায়ন করে গেছেন, এখনও করে চলেছেন—ডিরোজিয়ানরা যথেষ্ট জনমুখী ছিলেন না, ছিলেন গজদন্তমিনারবাসী উচ্চবর্ণীয় হিন্দু মাত্র ইত্যাদি ইত্যাদি।
বর্তমান লেখিকা এই প্রেক্ষিতেই ইয়াং-বেঙ্গলীদের দেখেছেন। এবং খোলা চোখে, মুক্ত মনে।
**
দেহরাদুনে কর্মরত রাধানাথ শিকদার যখন সার্ভের কুলিদের প্রতি নির্মম আচরণের জন্যে বৃটিশ কর্তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন—সেটা কি যথেষ্ট বৈপ্লবিক কার্য ছিল না? সেই প্রথম কোনো নেটিভ ভারতীয় এক সাহেবের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা করল (১৮৪৩ খ্রি.)!
বা, উনিই যখন বৃদ্ধ বয়সে বাংলায় ফিরে এসে সাথী-ডিরোজিয়ান ‘টেকচাঁদ’-প্যারীচাঁদের সাথে চলিতভাষায় প্রথম এক নারী-পত্রিকা চালু করলেন—সেটাই বা কী কম বৈপ্লবিক কাজ ছিল (১৮৫৪ খ্রি.)?
বা, সংস্কৃত কলেজ গৃহে এক আলোচনাসভায় ডিরোজিয়ান দক্ষিণারঞ্জন যখন কোম্পানির পুলিশকে ঝেড়ে কাপড় পরাচ্ছেন (৮ ফেব্রু, ১৮৪৩), প্রবল আপত্তিতে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন হিন্দুকালজের অধ্যক্ষ ডেভিড রিচার্ডসন সাহেব! ‘সরকারী ভবনে দাঁড়িয়ে সরকারের সমালোচনা রাজদ্রোহিতার সামিল’ ! ধমকে তাঁকে বসিয়ে দিলেন সভাপতি তারাচাঁদ চক্রবর্তী, হিন্দুকালেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্র। এই দৃঢ়চেত আচরণ আগে-বা-পরে আর কে করতে পেরেছেন, ডিরোজিয়ান ‘ইয়ং বেঙ্গলী’-রা ছাড়া? রোসিঙ্কার চোখে তাই তাঁরা কেবল সমাজ-সংস্কারক নন, পাক্কা র্যাডিকাল!
***
আবার, এই সময়-সময়েই জুসেপি মাৎসিনির হাতে ‘ইয়ং ইতালী’-আন্দোলনের শুরুয়াৎ হচ্ছে মার্সেই বন্দরে (১৮৩১ খ্রি.), যদিও সেটা গোড়া থেকেই এক রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল, যেটা কলকাতার ‘ইয়ং বেঙ্গলী’-আন্দোলন ছিল না (এবং, সে সময়ে এঁরা পরস্পরের খবর রাখত বলেও প্রত্যয় হয় না)। ডিরোজিয়ানদের আন্দোলনটা মূলত ছিল সামাজিক, যদিও তাদের বিতর্কসভা SAGK (‘Society for the Acquisition of General Knowledge’)-কে রোসিঙ্কা চিহ্নিত করেছেন প্রথম ভারতীয় পলিটিক্যাল পার্টি ‘বেঙ্গল বৃটিশ ইণ্ডিয়ান সোসাইটি’-র পূর্বসূরী হিসেবে (যাতে একটু ‘কিন্তু-কিন্তু’ রাখি)। তবে, ডিরোজিয়ানদের প্রভাব যে ভারতের অন্যত্রও পড়েছিল তা জানি লেখিকার সঙ্গে অধ্যা. দীনয়ার পটেলের আলোচনায়, যিনি ১৮৬০-এর দশকে বম্বের এলফিনস্টোন কলেজের ডিরোজিও-সম শিক্ষক জাভেদকরের অবদানের উল্লেখ করেন।
প্রসঙ্গত, ১৮৪০-এর দশকের ‘ইয়াং আয়ারল্যাণ্ড’ আন্দোলন বা, বিংশ শতাব্দীর গোড়ার ‘ইয়াং তুর্ক’ আন্দোলনও তুলনীয়।
***
ডিরোজিয়ানদের কোনো নাড়ির যোগ ছিল না গ্রামীণ ভারতের সঙ্গে এবং কৃষকদের অবস্থার প্রতি এই নাগরিক-আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ উদাসীন—এমত অভিযোগ আজও ওঠে। গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়টিই লেখিকা রেখেছেন ‘ভূমি’-র উপরে, যেখানে যেমন তিতুমীরের ‘বাঁশের কেল্লা’ এসেছে, তেমনি বিনয় ঘোষ-অশোক সেনের মতো ঐতিহাসিকদেরও উল্লেখ রয়েছে। বিতর্কিত বিষয়। ১৮৪২-১৮৪৬-এ লেখা প্যাঁরীচাঁদ মিত্রের কৃষক-বান্ধব প্রবন্ধাবলীর কথাও এসেছে। এ’বিতর্কের সহজ নিরসন সম্ভব নয়।
***
ঊনবিংশ শতকের গোড়ার দিকপানে স্বল্পজীবী এক উদাসী কবি হাওয়ার হিল্লোল তুলে এসে পড়েছিলেন শহর কলকেতায়। কয়েক বছর নূতন এক কালেজে পড়িয়ে গিয়েছিলেন তাঁর প্রায়-সমবয়সী ছাত্রদের—মুকুল ধরিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন তাদের মনে মনে। সে মুকুলগুলি ঝরে পড়ে গিয়েছিল না প্রস্ফুটিত হয়েছিল স্বাদু সহকার-রূপে—তার অনুধাবনে এই গ্রন্থ অবশ্যপাঠ্য।
‘যখন যাব চলে ওরা ফুটবে তোমার কোলে’।
বঙ্গীয় নবজাগরণের ইতিহাসচর্চা এই বই ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যেত।