

পৃথিবীর পথে পথে – ভ্রমণ কাহিনি সংকলন; চম্পাকলি আইয়ুব; দে'জ পাবলিশিং, কলকাতা; ২০২৫চারটি পরিচ্ছেদের বিন্যাস কালানুক্রমিক বা ভৌগোলিক পরিপ্রেক্ষিত অনুসারে নয়, জায়গাগুলির চরিত্র অনুযায়ী সাজানো। পরিচ্ছেদের নামগুলি কাব্যিক, সুন্দর। কেবলমাত্র দ্রষ্টব্য বা জ্ঞাতব্য জিনিসই নয়, তার সঙ্গে গাড়ির চালক, সহযাত্রী, খাবারের দোকানে আলাপ হওয়া মানুষজন ইত্যাদিদের সঙ্গে কথাবার্তার চমৎকার বর্ণনা আর বৈজ্ঞানিক মন নিয়ে তার বিশ্লেষণ বইটিকে সমৃদ্ধ করেছে।
ইজরাইলের ঐতিহাসিক শহর মাসাদ দিয়ে প্রথম পরিচ্ছেদ ‘সাতটি অমরাবতী’ শুরু হয়েছে। এই শহরের ইতিহাস আর রাজনীতির কথার সঙ্গে আছে যাত্রাপথের নানা সুন্দর দৃশ্যের বর্ণনা আর মানুষের কথা। সমুদ্রতলের নীচে অবস্থিত কোনো জায়গায় যে জলের স্ফুটনাংক বেশি হয়ে যায় সেটা লেখিকার স্বামী মনে করিয়ে দেন।
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে বিধ্বস্ত পম্পেই নগরী ভ্রমণের কথায় ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক তথ্যের বিশদ বর্ণনার সঙ্গে মানুষের মজার কথা এসে যায় সহজেই। পায়ের চোট লেখিকাকে বাধা দিতে পারেনি।
পরের প্রবন্ধটির শীর্ষক ‘দুটি মহাদেশের চুম্বনরেখায়ঃ ইস্তানবুল’। দুই মহাদেশে আর ইতিহাসের একেক পর্যায়ে একেক জাতি আর সংস্কৃতির প্রভাব এই শহরের স্থাপত্যে, সংস্কৃতি আর মানুষে। চম্পাকলির লেখনীতে এই চরিত্রটি সুন্দর ধরা পড়েছে। শীর্ষকটি যথার্থ।
পরের কাহিনি বুদাপেস্ট ভ্রমণের। নদীর দুই তীরের দুটি শহর মিলিয়ে এই শহরের নির্মাণ। বর্ণনার ছত্রে ছত্রে ঐতিহাসিক স্থাপত্যের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা এসে যায়। স্থানীয় শব্দ বা নামগুলির সঠিক উচ্চারণের নির্দেশ দিয়েছেন লেখিকা। এই প্রয়োজনীয় ধারাটি বইটির একাধিক প্রবন্ধে লক্ষ্য করা যায়।
হিল্ডেসহাইম-এর গল্পে পুরোনো ইতিহাস, সাম্প্রতিকতর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর শহরের বর্তমান সৌন্দর্য আর বিন্যাসের কথা এসে পড়ে। ফুলে রঙিন এই শহরে লেখিকার নামটিও যে একটি ফুলের থেকে নেওয়া সেটা জেনে স্থানীয় মানুষের খুশি হবার কথাটা বাদ যায়নি।
‘জার্মানীর গহনার বাক্সঃ ড্রেসডেন’ প্রবন্ধে শিল্প ইতিহাস রাজনীতির প্রসংগ এসেছে। সব ছাড়িয়ে শিল্পের কথাটাই হয়ে উঠেছে প্রধান। বর্ণনায় শধু মুগ্ধতা নয়, খুঁটিনাটি নানা বিষয়ের প্রতি নজর আর একটা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসু মনের স্বাক্ষর রয়েছে।
ভিয়েনা শহর ভ্রমণের কথায় লেখিকা ইতিহাসকে রেখেছেন শহরের সাংস্কৃতিক চরিত্রটির গুণগ্রাহিতার দ্বারা সম্পৃক্ত করে। তথ্যগুলি কখনই রসহীন হয়ে ওঠে না।
এই গুণটি গ্রন্থটির একটি সম্পদ। এটি সত্যিই ইংরিজিতে যাকে বলে ‘unputdownable’ কিন্তু আমি মাঝে মাঝেই নামিয়ে রেখেছি কয়েকটা বর্ণনা বা তথ্য আবার একবার দেখে নেবার জন্য অথবা নিজে চিন্তা করে সম্পূর্ণ রসগ্রহণের জন্য।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ‘আরও দূর অন্ধকারে’:
প্রথমে প্রাগৈতিহাসিক যুগের গুহাচিত্রের কথা--ভারতবর্ষের মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত ভীমবেটকা পাহাড়ে। এই প্রবন্ধটি লোককথা, মহাকাব্যের উল্লেখ, ইতিহাস, বিশদ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ আর গুহাচিত্রগুলির শৈল্পিক গুণের আলোচনায় সমৃদ্ধ।
নানান সুন্দর দ্রব্যের সমাহারের মধ্যেও পাঠকের মনে কোনো একটি বা দুটি বিশেষ প্রিয় হয়ে ওঠে। ‘সূর্য-সন্তানদের দেশঃ পেরু’ প্রবন্ধটি আমার সেই বিশেষ ভালো লাগার প্রবন্ধ। ২৩ পাতার এই প্রবন্ধে পেরু দেশটাকে প্রায় চষে ফেলে ঘোরা আর পদে পদে তা উপভোগ করার চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। প্রকৃতির নানান বৈচিত্র্যে সাজানো দেশটা - সমুদ্র, পাহাড়, নদী, জঙ্গল, মরুভূমি সবই রয়েছে। সে দেশের খাদ্য, মাছ ডুবিয়ে রাখা পানীয়, ইনকা সভ্যতার নিদর্শন মাচু পিচু, তাদের সংস্কৃতি, পোষাক, ‘কেচুয়া’ ভাষা, স্পেন দেশ থেকে আসা ধনলোভীদের ঔপনিবেশিকতা, বর্তমান রাজনীতি কোনো কিছুই চম্পাকলির দৃষ্টি এড়ায়নি এবং তিনি সেসব গভীরভাবে বুঝতে চেষ্টা করেছেন। তিনি জীববিদ্যার বিজ্ঞানী তাই জীবজন্তু আর পাখির প্রতি তাঁর আগ্রহ স্বাভাবিক। আর আছে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আড্ডার কথা।
পরের পরিচ্ছেদঃ অপরূপ সেই আলোকধারা। যে কোন ভ্রমণেরই একটা প্রস্তুতি এবং আশংকার দিক থাকে। লেখিকা সেগুলিকে বাদ দিয়ে যাননি বলেই আমার মতো পাঠক বেশ একটা একাত্মতা বোধ করে।
এই পরিচ্ছেদে দুটি ভ্রমণের গল্প: ‘অপরূপ সেই আলোকধারা’-তে আইসল্যাণ্ড ভ্রমণের কথা আর ‘ফিয়র্ডের দেশ নরওয়ে’-র। যোগসূত্রটি অবশ্যই উত্তর মেরুবলয়ের সেই জাদুকরী আলো ‘অরোরা বোরিয়ালিস’ কিন্তু প্রবন্ধ দুটির স্বাদ একেবারে আলাদা। এই আলো নিত্যনৈমিত্তিক সূর্যোদয় সূর্যাস্তের মতো নয় যে বাঁধাধরা সময়ে দেখা যাবে। কাজেই আইসল্যাণ্ডের ভাষায় ‘অরোরা শিকার’-এ অনিশ্চয়তা থাকে। জানতে পারি যে এই ছোট্ট দ্বীপটিতে পৃথিবীর প্রথম পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানকার ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের বিবরণ অবাক করে। ভূতাত্ত্বিক বিভাজনের স্পষ্ট নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। এখানকার আধুনিক জীবন, ফুটবল, খাওয়াদাওয়ার বৈচিত্র্য সব এসে পড়ে কাহিনির মধ্যে। আর অবশ্যই আছে সেই অপরূপ আলো দেখার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা।
নরওয়ের ভৌগোলিক চেহারা একেবারেই অন্যরকম। সেখানকার ভাষা, জনজীবন, দর্শনীয় মিউজিয়াম আর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের বর্ণনায় এই কাহিনিটি সমৃদ্ধ। লেখিকার সযত্ন নিরীক্ষণে এটি প্রাণ পেয়েছে।
চতূর্থ পরিচ্ছেদ--অচেনা প্রান্তরঃ চেনা মানুষ। সাতটি বিভিন্ন স্বাদের প্রবন্ধ এর অন্তর্গত।
বিভিন্ন দেশ, শহর আর সমাজের বৈশিষ্ট্যগুলি চিনে নেওয়া আর চিনিয়ে দেবার অসাধারণ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন লেখিকা।
প্রথম লেখাটি ‘বনবিবির দেশ সুন্দরবনে’। প্রকৃত এবং মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রবহমান রীতি আচার ইত্যাদি নানা কথা নিখুঁতভাবে বোনা হয়েছে। ইংরেজ হ্যামিল্টন সাহেবের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ এবং গান্ধীর যোগাযোগের কথা এসে পড়ে। সেখানে গবেষণা আর উন্নয়ন প্রকল্পগুলি বর্ণিত হয়েছে যুক্তিবাদী মন নিয়ে। এই ব-দ্বীপের সঙ্গে লেখিকার আত্মিক যোগটা প্রোথিত হয় শেষ বাক্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘মানুষ বড়ো কাঁদছে’ কবিতার উল্লেখে। এই আবেগ অন্য কোনো প্রবন্ধে নেই, সেটাই স্বাভাবিক।
‘উগান্ডার জলে জঙ্গলে’ প্রবন্ধটি দীর্ঘ এবং ছয়টি পর্বে বিভক্ত। বিভিন্ন যানবাহন, সাইকেলকে যে স্থানীয় ভষায় ‘বো্ডা ডোডা’ বলে, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের সমাহার, স্থানীয় খাবার, মানুষের জীবনযাপনের ধরন, পোষাক আর রীতিনীতি ইত্যাদি বিচিত্র বিষয় ধরা পড়েছে লেখিকার কলমে। অবশ্যই নীল নদ, জলপ্রপাত আর পাহাড়ের কথা এবং সবচেয়ে প্রধান উৎসাহের বিষয় জঙ্গল হ্রদ আর বন্য প্রাণী আর পাখি। লেখিকা বলেছেন যে এই ভ্রমণটির সময়ে তিনি বরিষ্ঠ নাগরিকের পর্যায়ভুক্ত কিন্তু চুটিয়ে ঘোরার, দেখার আর বোঝবার আনন্দ ফুটে উঠেছে লেখাটি জুড়ে, কোথাও খামতি নেই।
‘চেনা দ্বীপের অচেনা প্রান্তরে’ ভ্রমণ আয়ারল্যান্ড-এর স্বাধীন অংশের ডাবলিন শহর থেকে শুরু। বিভিন্ন শহর আর গীর্জা দেখেছেন লেখিকা আর তাঁর মনের ভাব, চিন্তা ও সংগৃহীত তথ্য লিপিবদ্ধ করে একটি মনোগ্রাহী ছবি এঁকেছেন। একটি পাহাড়ের আকৃতি দেখে মনে মনে নাম দিলেন ‘নন্দী’।
প্রবন্ধের শেষে আসে ব্রিটেনের ব্রিস্টল শহরে কথা এবং তার সঙ্গে ভারতবর্ষের যোগসূত্রের ইঙ্গিত।
‘দুই মোহনার ধারে’ নিউকাসল আর ব্রিটেনের উত্তরে বেরিক শহরের কথা। প্রচলিত ইংরিজি প্রবাদ বাক্য দিয়ে লেখার শুরু যাতে পাঠক নিউকাসল-এর সঙ্গে একটা যোগসূত্র পায়। শহর দুটির নানারকম দ্রষ্টব্যস্থল আর সৌন্দর্য বর্ণিত হয়েছে অত্যন্ত যত্নসহকারে। শৈশবের ‘রবিন্সন বার্লি’- কারখানা দেখে উৎসাহিত হন চম্পাকলি। এই ধরনের উল্লেখগুলি বাঙালি পাঠককে ধরে রাখবে। ভ্রমণকারীর চোখ দিয়ে দেখা ইতিহাস আর সংস্কৃতির এই দলিল অবশ্যই পাঠককে ভাবতে বাধ্য করবে ‘একবার দেখতে পেলে বেশ হোত।’
‘বিমোহিনী স্লোভানিয়া’ প্রবন্ধের শুরুতেই আছে যুগোস্লাভিয়া-র আমলে ইটালি থেকে সীমান্ত পেরিয়ে একটা গুহা দেখতে যাবার ব্যর্থ প্রয়াসের গল্প। তারপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে আবার স্লোভানিয়া ভ্রমণের নানা কথা। প্রথমেই একটি ট্রেন যাত্রার মজার বিবরণ। এই প্রবন্ধে দ্রষ্টব্যস্থান, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, ইতিহাস, ধর্মীয় চরিত্র আর রাজনৈতিক প্রসংগগুলি ঘুরে ফিরে এসেছে। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আদান-প্রদানের নানা কথা পাঠকের মন টেনে রাখে।
লেখিকা জার্মানীতে অনেকটা সময় কাটিয়েছেন এবং খুব মন দিয়ে, ভালোবেসে সব দেখেছেন। ‘আমার দেখা জার্মানী’ প্রবন্ধে সেই ভালোবাসা পরিষ্কার ফুটে ওঠে, এখানে তিনি কেবলমাত্র বহিরাগত ভ্রমণকারী নন। প্রবন্ধটি অনেকগুলি ছোটো ছোটো অংশে বিভাজিত। গয়টিংগেন শহর আর সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয় আর জ্ঞানের চর্চার বিশদ বর্ণনা লেখাটিকে ভারি করেনি বরং সুখপাঠ্য করে তুলেছে। সহজেই চেনা যায় যে জ্ঞানচর্চা ওই শহরের সংস্কৃতি। নোবেল পুরস্কারে ভূষিত বহু বৈজ্ঞানিক, বিশিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বহু আবিষ্কারের ইতিহাস, নোবেল যুগের অনেক আগের জ্ঞানীগুণী মানুষের সঙ্গে যুক্ত নানা কথায় এই প্রবন্ধটি সম্পৃক্ত। অবাক হয়ে পড়তে হয়। গায়ে কাঁটা দেয়। গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়ের অনুচ্ছেদটির আকর্ষণ বিশেষ। যাঁদের ছোটদের গল্পের জন্য সকলেই চিনি তাঁরা যে ভাষাতত্ত্বের প্রথম যুগে অসাধারণ সব কাজ করেছেন এবং জার্মান ভাষার ব্যাকরণ রচনা করেছেন এবং বহু লোককথা সংগ্রহ করেছেন সে সব খবর পড়তে পড়তে রোমাঞ্চ হয়। চম্পাকলি গভীর অনুসন্ধান করে এবং ভালোবাসায় এই দুই ভাইয়ের সম্বন্ধে লিখেছেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার রাজনৈতিক আলোচনা আর নানা রীতি রেওয়াজের কথা এসে পড়ে। লেখিকার মনোগ্রাহী বর্ণনায় ধরা পড়ে জীবজন্তুর কথা, গ্রামীণ সৌন্দর্য এবং ওই শহরের কাছে-পিঠে অন্যান্য জায়গার খবর। শেষ অনুচ্ছেদটিতে আছে হ্যানোভার শহরের মনোরম বৃত্তান্ত।
গল্পের মতো করে বলা এমন মনোগ্রাহী আর নানা বিষয়ে চোখ খুলে দেবার মত বই বিরল। লেখার গুণে খুব গভীর তথ্যগুলিও পাঠকের মনঃসংযোগ বিঘ্নিত করে না বরং ধরে রাখে। নানা বিষয়ে আগ্রহী একটি পরিবারের বেড়াতে যাবার স্বাভাবিক সুরটি এই লেখাগুলিকে সুন্দর করেছে।
পরবর্তী সংস্করণের সময় মুদ্রিত ছবিগুলির সঙ্গে আলোচনার যোগসূত্র রক্ষার ব্যাপারটা খেয়াল করা দরকার। বইটি লেখিকার স্বামী পূষন্ আইয়ুবের তোলা চমৎকার আলোকচিত্রে এবং মানচিত্রে সজ্জিত। ছাপার সুবিধার জন্য ছবিগুলি একসঙ্গে একটি ফর্মায় রাখা হয়েছে। ছবিগুলিতে সংখ্যা বসিয়ে আলোচনার যথাস্থানে সেই সংখ্যাগুলির উল্লেখ থাকলে পাঠকের রসগ্রহণের সুবিধা হবে।