

রাহুলের ডায়েরি থেকে; ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত; পরবাস; ২০২৩; ISBN: 978-1-946582-26-3,আমার দৃঢ় প্রত্যয় –সমস্ত গদ্যলেখক মনের মধ্যে একটি সার্থক উপন্যাস লেখার আকাঙ্ক্ষা পুষে রাখেন।
বলতে বাধ্য হচ্ছি—উনি প্রথম থেকেই এ বিষয়ে সিদ্ধিপ্রাপ্ত। অর্থাৎ একাধারে টি-২০ এবং টেস্ট ম্যাচ খেলার ক্ষমতা ধরেন।
উপন্যাসের কাজ কী? মানে, কী অর্থে ছোটগল্প, বড়গল্প (নভেলা) এবং উপন্যাস স্বতন্ত্র?
কোথায় পড়েছিলাম মনে নেই, কিন্তু একটি সংজ্ঞা আমার খুব মনে ধরেছিল।
ছোটগল্প জীবনের কোন একটি অংশের উপর উজ্বল তীব্র আলো ফেলে। বড়গল্প হোল সমগ্র বা বৃহৎ মানবজীবনের উপর ফ্যাকাশে আলো। আর উপন্যাস? বৃহত্তর জীবনের উপর উজ্বল আলোর ফোকাস। আমি এর সংগে যোগ করতে চাই –স্থান-কাল-সমাজের ছবি ও একটি অন্তর্দ্বন্দ্ব। নইলে উপন্যাস খবরের কাগজের রিপোর্ট হয়ে যাবে, খুব ভালো হলে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম—হোক তীক্ষ্ণ অনুসন্ধান, তবু জার্নালিজম তো বটে!
এতসব কথা মাথায় ভিড় করে এল ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত মশাইয়ের “রাহুলের ডায়েরি থেকে” উপন্যাস পড়ে।
স্থান রাজধানী দিল্লি, তার উপকন্ঠ, আনাচ কানাচ। কুশীলবেরা মুখ্যত বাঙালি সমাজ, যাদের আগের প্রজন্ম স্বাধীনতার পর কোন না কোন যোগাযোগে কোলকাতা বা বঙ্গদেশ ছেড়ে দেশের রাজধানীতে ধীরে ধীরে শেকড় গেড়েছে। অর্থাৎ মূল পাত্র-পাত্রী জন্মেছে সত্তরের দশকে, বা ষাটের শেষে।
এদের মূল কর্মকাণ্ড জুড়ে আছে স্কুল এবং দিল্লি ইউনিভার্সিটির এলিট কলেজ, যেমন সেন্ট স্টিফেন্স, মিরান্ডা হাউস ইত্যাদি এবং প্রত্যাশিত ভাবেই এদের সংলগ্ন ক্যাফেটেরিয়া।
সময়কে চিহ্নিত করা কঠিন নয়। ভি পি সিং-এর এগারো মাসের প্রধানমন্ত্রীত্ব এবং মণ্ডল কমিশন বিরোধী আন্দোলনের সময় এরা কলেজের ছাত্র। এর বেশ কয়েক বছর আগে কোলকাতার ছেলেমেয়েরা দেখেছে নকশাল আন্দোলন। আর দিল্লির বৃহত্তর ছাত্রসমাজ হিন্দি বলয়ের অন্যান্য শহরের বিদ্যায়তনের মত নিজেদের সেঁকেছে সংরক্ষণ বিরোধী আগুনের আঁচে।
লেখক সম্ভবত সেই সময়ের দিল্লি এবং ছাত্রসমাজকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। কলমের সামান্য আঁচড়ে কিছু ডিটেইলসে ফুটে উঠেছে পরিবেশ এবং চরিত্রগুলো।
কিন্তু এইখানেই শেষ হয়ে গেলে উপন্যাসটি—যেমন আগে বলেছি—ভালো সেই সময়ের দলিল বা জার্নালিজম হয়ে যেত। এইখানেই ইন্দ্রনীলের মুন্সিয়ানা। তিনি মূল চরিত্র রাহুলের পলাশের জন্য পাগলকরা প্রেমের বর্ণনায় --যা শুরু থেকেই ব্যর্থ হবার কপাললিখন ধারণ করে রয়েছে—মেলোড্রামার লোভ এড়িয়ে গেছেন। আর ক্রমশ সেই আঘাত রাহুলকে নিয়ে যায় নিজের জীবনের ও সত্তার অর্থ খোঁজায়। প্রেমের সংজ্ঞার তালাশে।
অসাধারণ সমাপ্তির কথা ফাঁস করে দিয়ে স্পয়লার হব না। তবে যাঁরা পড়েননি তাঁদের বলি—এক কথায় ভাষার ও বর্ণনার সৌকর্যে আন-পুটডাউনেবল।
কিন্তু কিছু কিছু শব্দবন্ধ এবং ইমেজ ও লেখকের গূঢ় মন্তব্যের উল্লেখ না করে পারছি না।
যেমন, ছুরিতে দুই কলেজের ছাত্রের পেট ফাঁসার পর—
বাজে বকিস না। নিয়ে গেছে বাড়া হিন্দু রাও হসপিটালে। ভরতি হতে হতেই প্রাণ বেরিয়ে যাবে। তারপর মুচি এসে লাশ সেলাই করে দিয়ে বলবে বকশিস দাও। (পৃঃ ৫০)
তখন আমি আর বনমালী একসঙ্গে কুসঙ্গে মিশছি। দুজনে দুজনকে চোখে চোখে রাখি। পাছে পতনের পথে একজন আরেকজনকে পিছু ফেলে এগিয়ে যায়।” (পৃঃ ৫৯)
[রাহুল যদি] মার্ডার হয়? লাশ ভয়ে ছোঁবে না শ্যামলী। কিন্তু দূর থেকে তার জ্বলন্ত চিতার সামনে দাঁড়িয়ে হয়ত ক্ষমা চাইবে বিড়বিড় করে। (পৃঃ ১০৮)
[হরিদ্বারে হর কী পৌড়ীর কাছে হাঁটতে হাঁটতে রাহুল ভাবে] শুনেছি এখানে মেলায় অনেক ষোলো সতেরো কুড়ি বছর বয়েসি যুবতী, একটু নতুন বা পুরনো, গ্রাম্য বৌ-ঝিরা হারিয়ে যায় ফি বছর। (পৃঃ ১১৪)
--- দিল্লিতে কমলা রঙের রোদে বাহিত হয়ে কয়েকশো চিঠি গিয়ে পড়ল লম্বা গলার মোরগের মত ডাকবাক্সগুলিতে। (পৃঃ ১৩৯)
ইন্দ্রনীলের আরেকটি উপন্যাস শিগগির পড়ে ফেলব।