


আমেরিকার জাতীয় পাখি--বল্ড ঈগল, ওমাহা, নেব্রাস্কা।
জীবজন্তুদের মধ্যে পাখিরাই একমাত্র প্রাণী (কিছু পোকামাকড় ও বাদুড় ছাড়া) যারা মাটিতে, জলে, এমনকি শূন্যেও অনায়াসে বিচরণ করতে পারে। পাখিদের এই উড়ান ক্ষমতা যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে আনন্দ ও প্রেরণা জুগিয়েছে। শিকার করে খাওয়া ছাড়াও প্রাগৈতিহাসিক গুহাবাসী মানুষ দেয়ালে যত্ন করে পাখির ছবি এঁকে রেখেছে। আমরা সবাই পাখি দেখতে ভালবাসি। তাদের পালকের রঙ, মধুর স্বর, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, হাজার মাইল নির্ভুল ওড়া, সর্বোপরি ফুড়ুৎ করে উড়ে যাওয়ার ক্ষমতা আমাদের মুগ্ধ করে।
মধ্যযুগে চীন ও মিশরে জ্যোতিষীরা পাখিদের ওড়া নিয়ে ভবিষ্যৎ গণনা করার চেষ্টা করেছেন। মিশরে আইবিস পাখিদের দেবতা বলে মানা হতো। ভারতে দেবতা না হলেও দেবতার বাহন রূপে আমরা ময়ূর, সারস, প্যাঁচা ইত্যাদি দেখি। কিন্তু পাখি নিয়ে কোনরকম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যয়ন শুরু হতে আমাদের ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

প্রাগৈতিহাসিক গুহার দেয়ালে পাখি আঁকা
পক্ষীবিজ্ঞান বা ornithology নামটাই শুরু হয়েছিল ১৮১৯ সালে। গোড়ার দিকে ব্রিটিশ ও আমেরিকান বিজ্ঞানীরাই এই বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। আমেরিকান পক্ষীবিদ জন অডুবন-এর নাম সবার পরিচিত। উনিশ শ' শতাব্দীর প্রথম দিকে ইনি প্রচুর আমেরিকান পাখির রঙিন ছবি নিজের হাতে এঁকেছিলেন।
১৯০৫ সালে এঁর নামেই জাতীয় পক্ষী সংরক্ষণ সংস্থা National Audubon Society-র পত্তন হয়।

অডুবন-এর হাতে আঁকা ছবি
সব মিলিয়ে, প্রমাণ সাইজের ৪৮৯ প্রজাতির (species) পাখির ছবি আঁকা সহজ কাজ নয়। সেই সময় দূরবীন আর ক্যামেরা ছিল সেকেলে ধরনের। ভালো করে পর্যবেক্ষণ করার জন্য গুলি করে পাখিদের মারা হতো এবং মরা পাখিদের গাছের ডালপালা দিয়ে সাজানো হতো যাতে জীবন্ত দেখায়। তার-ই ছবি আঁকা হতো। সে যুগে বড়ো বড়ো বিজ্ঞানীরা শিকার করে মারা নানারকম পাখির দেহ সংগ্রহ করতেন। মিউজিয়ামেও হাজার হাজার মরদেহ, পাখির ডিম ও বাসা সংরক্ষিত দেখা যায়।

মিউজিয়ামে সংরক্ষিত মৃত পাখি
ক্রমশ বৈজ্ঞানিক ভাবে পাখিদের নাম দেওয়া শুরু হয়। ১৯১৫ সালে আমেরিকায় কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পক্ষীবিদ্যার বিভাগ শুরু হয়। অচিরেই সেটা বিশ্ববিখ্যাত হয়ে ওঠে এবং ইন্টারনেট শুরু হওয়ার পর ২০০২ সালে পৃথিবীজোড়া ই-বার্ড চালু হয়। এখন এটা হাজার হাজার পক্ষীগবেষক ও পক্ষীপ্রেমী সাধারণ লোকদের জন্য অপরিহার্য তথ্যভাণ্ডার। ১৯৪০ সালে জেমস ফিশারের লেখা বই 'Watching Birds’ যা প্রথম সাধারণ দর্শকদের পাখি দেখার আনন্দের সঙ্গে পরিচয় করায়, সেই সঙ্গে শুরু হয় পাখি সম্বন্ধে 'নাগরিক বিজ্ঞান' বা citizen science. এই সেদিন, ১৯৭০ সালে শুরু হয় American Bird Assocition.
পাখিদের সঙ্গে আমার পরিচয় ঠিক তিরিশ বছর আগে ও একেবারেই কাকতালীয় ভাবে। এর আগে আমি ঐ কাক-শালিক-চড়ুই ছাড়া আর কোনও পাখি চিনতাম না। আমেরিকায় থাকার দরুন এখানকার পাখিদের সঙ্গেই প্রথম মুলাকাত, পরে ভারতীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ। আমার এক আমেরিকান ছাত্র শিকারি ছেলে। পাখি শিকারে ওস্তাদ। কিন্তু বয়সের সঙ্গে হয়তো একটু অহিংসা ভাব জন্মাচ্ছিল, তাই বন্দুকের বদলে দূরবীন শুরু করলো। শিকারিদের পাখি সম্বন্ধে জ্ঞান প্রচুর। ছেলেটা আমাকে শেখাত পাখিদের নামধাম আর কীভাবে চট করে চেনা যায়। ও-ই আমাকে প্রথম পাখি দেখার ট্রিপে নিয়ে যায়--৫০০ মাইল দূরে, নেব্রাস্কার পশ্চিম কোণে বালিয়াড়ির রাজ্যে। সেই থেকে শুরু, তারপর স্থানীয় বার্ডিং ক্লাব-এ যোগ দিয়ে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়িয়েছি পাখির খোঁজে। ওদের মাসিক জার্নালে লিখেছি, আর মিটিঙে লেকচার দিয়েছি, আর ঘরের কাজ ফেলে বাগানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দূরবীন আর ক্যামেরা কোলে 'সময় নষ্ট' করেছি।
আমার দেশেবিদেশে বেড়ানো আর ছবি তোলার সঙ্গে পাখি দেখার শখ একেবারে রাজযোটক। নব্বইয়ের দশকে পাখি দেখার ট্রিপ বা গাইডের এত প্রচলতা ছিল না। নিজেই গাইড বই কিনতাম আর ছবি দেখে দেখে নতুন জায়গায় নতুন পাখিদের চিনে নিতাম। সেটা যে কী আনন্দের ব্যাপার তা বলে বোঝানো যায় না। অনেকটা রোগী দেখে চট করে এক নতুন, অদেখা রোগের নিদান বলে দেওয়ার মতই। (এই নিয়ে আমি একটা ডাক্তারি পেপার-ও লিখেছিলাম।)
দূরদেশের পাখির গাইড বই দুর্লভ আর ভীষণ দামিও। ম্যাডাগাস্কারে আমার গাইড বেচারার কাছে কোন বই ছিল না অথচ একমাত্র বইটার লেখক তার সাহায্যেই বইটা লিখতে পেরেছিলেন। আমি ফিরবার সময় আমার দামি কপিটা ওকে দিয়ে আসি। আমার হয়তো আর কখনো ফেরা হবে না কিন্তু ঐ ছেলেটা বইটার অনেক ভালো ব্যবহার করতে পেরেছিল। গাইড বই ছাড়া অবশ্য পাখি দেখাটা বিশেষ ব্যয়সাপেক্ষ নয়, কিন্তু চেনার পরে স্বভাবতই ইচ্ছা হয় ছবি তোলবার। অতএব কিনতে হবে ডিজিটাল ক্যামেরা, শক্তিশালী (এবং দামি) লেন্স, তেপায়া খুঁটি, ইত্যাদি, ইত্যাদি। লিস্টের তো শেষ নেই, কিন্তু বাজেটের শেষ আছে, তাই ইচ্ছার লাগামে রাশ টানতে হয়।
নিজস্ব যন্ত্রপাতি ছাড়াও পক্ষীবিজ্ঞানের জগতে প্রচুর প্রযুক্তিগত উন্নতি হয়েছে। এখন আর আপনার মা-দিদিমার বার্ড-ওয়াচিং নেই। আগেকার দিনে পাখিদের পায়ে ছোট্ট আংটি পরিয়ে ছেড়ে দেওয়া হতো, কোথায় কতদূর যায় সেই সব তথ্যাদি সংগ্রহের জন্য, আজকাল জি পি এস মনিটরের সাহায্যে সারা পৃথিবীতে পাখিদের মাইগ্রেশন মাপজোক করা যায়। কর্নেল ইউনিভারসিটির ই-বার্ড প্রোগ্রামের কথা আগেই বলেছি। সারা পৃথিবীর পক্ষীদর্শকরা কম্পিউটারের মাধ্যমে তাঁদের নিজস্ব লিস্ট ও ছবি জমা দেন, অন্যের সঙ্গে শেয়ার করেন, এভাবে সারা বিশ্বের পাখিই নয়, সমস্ত প্রাকৃতিক পরিবেশের একটা ম্যাপ রেকর্ড হয়ে যায়। প্রাণী সংরক্ষণের জন্যও এসব তথ্য অত্যন্ত দরকারি। এছাড়াও কর্নেলের বৈজ্ঞানিকেরা সেলফোনের জন্য 'মারলিন' (merlin) নামে একটি ফ্রি অ্যাপ উপহার দিয়েছেন, যা দিয়ে পৃথিবীর যে কোন দেশের যে কোন জায়গার পাখিদের নাম, ধাম, কীভাবে চেনা যায় সব তথ্য দেওয়া আছে। এখন আর ভারী, দামি গাইড বই টেনে নিয়ে যাওয়ার দরকার পড়ে না। মারলিন-এ পাখির গান রেকর্ড করে চিনে নেওয়ার ব্যবস্থা পর্যন্ত আছে।
গত শতাব্দীতেও কিন্তু ছবিটা একেবারে অন্যরকম ছিল। আমি যখন নব্বুইয়ে পাখি দেখতে শুরু করি--সেকেলে SLR ক্যামেরা, আর মোটা মোটা গাইড বই নিয়ে বনেজঙ্গলে ঘোরাঘুরি করি, খাতাকলমে পাখির লিস্ট বানাই, তখনো এদেশে পাখি দেখার হবি নিয়ে গোড়া থেকেই বেশ একটা ট্র্যাডিশন ছিল। পাখির ক্লাব, সাময়িক পত্রিকা, প্রদর্শনী, বক্তৃতা এ সবই হতো। ভারতে কিন্তু নব্বুইয়ের গোড়ায় এসব কিছুই ছিল না। থাকলেও চট করে তাদের ঠিকানা পাওয়া মুশকিল ছিল। একটা ভালো গাইড বই পর্যন্ত খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মনে আছে, আমার দুঃখের কাহিনী শুনে আমার এক ভাইপো লন্ডন থেকে সালিম আলি-র বই কিনে আমায় পাঠিয়েছিল। তাই দিয়েই আমার ভারতীয় পাখিদের সঙ্গে প্রথম পরিচয়।
গুগল ঘেঁটে দেখি ভারতে প্রথম পাখির গণনা শুরু হয় উনিশ-শ শতাব্দীর মাঝামাঝি। টি সি জর্ডন ও ব্রায়ান হজসন নামক দুই ব্রিটিশ বৈজ্ঞানিক প্রথম কাজ শুরু করেন। একশ বছর পরে আসল কাজ --গণনা, নামকরণ, ও পাখিদের স্বভাব, আচরণ -- সব তথ্য সংগ্রহ করার কাজে অগ্রণী হলেন সালিম আলি, ভারতীয় পক্ষীবিদ্যার জনক। তাঁর লেখা ও ছবিওয়ালা বই 'The Book of Indian Birds’ ভারতীয় পাখির প্রথম গাইড। তিনিই ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ পক্ষীউদ্যান ভরতপুর-এর সংরক্ষণের উদ্যোগী এবং কেরালা ও গোয়ায় তাঁর নামে দুটি অভয় উদ্যান আছে, পক্ষীপ্রেমিদের কাছে পরম প্রিয়।

সালিম আলি
এখন তো ইন্টারনেটে ভারতের সব শহরের পাখি দেখার সাইটের ছড়াছড়ি। পাখি দেখার ক্লাব, ট্রিপ, গাইড, বই ইত্যাদিও প্রচুর পাবেন। কেরালায় বোধ হয় সব থেকে বেশি পক্ষীপ্রেমির দল, কিন্তু পাখির প্রজাতির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি আমাদের পশ্চিম বঙ্গে! অন্তত ই-বার্ড-এর পরিসংখ্যান তো তাই বলে। সারা পৃথিবীতে প্রায় দশ হাজার প্রজাতি (species) পাখি। খুব উদ্যমী পাখিবিশারদও চার-পাঁচ হাজারের বেশি দেখে উঠতে পারেন না। ইদানীং আমেরিকায় নানারকম আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, কে পুরো এক বছরে বা একদিন চব্বিশ ঘণ্টায় সব থেকে বেশি পাখি দেখে উঠতে পারেন। এগুলি ক্রমশই খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
গোড়া থেকেই পাখি দেখার দলে দেখবেন অধিকাংশই পুরুষ দর্শক। তিরিশ বছর আগে আমি যখন পাখির প্রেমে পড়ি আমাদের দলে শুধু শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানরাই ছিল। আমিই একমাত্র ব্যতিক্রম। তবে দলে ছিলেন অনেক মহিলাও। ইদানীং অনেক কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানরাও দলে যোগ দিচ্ছেন। সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে একজন কৃষ্ণাঙ্গ পক্ষীপ্রেমির হেনস্থা নিয়ে খুব লেখালেখি হয়েছিল। সেই সময় আমি হয়তো এখানে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গী ভারতীয় পক্ষীপ্রেমি মেয়ে। কিন্তু তার জন্য কোনো জায়গায়, কোনো দেশে আমাকে কোনরকম খারাপ অবস্থায় পড়তে হয়নি। বরং সব জায়গায় আমি আশাতীতভাবে সাহায্য পেয়েছি। ইজিপ্ট থেকে অস্ট্রেলিয়া, আলাস্কা থেকে দক্ষিণ মেরু, সব জায়গাতে আমি বাইনোকুলার আর ক্যামেরা নিয়ে গাইড ছাড়াই ঘুরে বেড়িয়েছি। উড়িষ্যায় লোকেরা আমাকে আমেরিকান স্পাই ভেবেছিল কিন্তু কোনরকম দুর্ব্যবহার করেনি। এমনকি পোর্টো রিকোতে পুলিশ ভুল করে বেআইনি প্রবেশকারী বেশ্যা ভেবে ধরার পরেও প্রচুর মাফ চেয়ে ছেড়ে দেয়। সব দেশেই পক্ষীপ্রেমিরা একে অন্যকে সবরকম সাহায্য করে থাকেন। এটা আমাদের একটা অলিখিত নিয়ম। আমিও আমার বিদ্যাটা আগামী প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের শিখিয়ে দিচ্ছি। আমার এক হাই স্কুল ছাত্রী ইতিমধ্যেই নিজের স্কুলের বার্ড গ্রুপের লিডার হয়ে গেছে, লেখালেখিও করছে বেশ।
সব জায়গায় পাখি দেখা সহজ নয়। রেন ফরেস্টের ঘন জঙ্গলে পাখির ডাক খুব শোনা যায় কিন্তু লতাপাতা ভেদ করে দেখা খুব মুশকিল। যারা পক্ষীপ্রেমি নন অনেক সময়ে তাঁরা বাঘ বা সিংহের আশায় বসে থেকে বোর হয়ে যান, আমার কিন্তু সময় কাটে পাখি দেখার আনন্দে। কখনো হতাশ বা বোর হতে হয়নি। হরিণ তো চেনা প্রাণী কিন্তু তার পিঠে বসা পাখিটার জাত ও নাম নিয়ে ঘণ্টা খানেক সময় সহজেই কাটাতে পারি। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে পাখি দেখা ও চেনার কাজটা অনেক সহজ ও কম ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে গেছে, এর ফলে অনেক নতুন সদস্য দলে যোগ দিয়েছেন। এটা অবশ্যই উৎসাহের খবর। দেশে দেশে এই হবির জনপ্রিয়তা বাড়ছে আর সেই সঙ্গে, ইন্টারনেটে পাখি দেখার সাই, ট্রিপ, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, ট্যুর, গাইডদের গ্রুপ, সারা দুনিয়া জুড়ে একটা পুরো ইকো-ট্যুর ইনডাসট্রি গড়ে উঠেছে।

হরিণের পিঠে পাখি

পক্ষীপ্রেমির দল --কোনো দুর্লভ পাখির আশায়
কোভিড অতিমারির সময় এই পাখি দেখার হবিটা খুব কাজে এসেছিল। সব জায়গা বন্ধ ও শুনশান কিন্তু পাখিদের পোয়া বারো। খালি পার্কগুলোতে পাখি দেখার প্রকৃষ্ট সুযোগ। সারাদিন ঘরে বসে থাকার চেয়ে অনেক ভালো, আর বন্ধুদের সঙ্গে নিতে পারেন, তবে অবশ্যই মাস্ক পরে ও ছয় ফুট দূরত্ব রেখে। পাখি সম্বন্ধে গবেষণার অনেক সুযোগ আছে। আর্থ ওয়াচ-এর মত আন্তর্জাতিক সংস্থায় সাধারণ লোকেরাও ফিল্ড রিসার্চে যোগ দিতে পারেন। আমিও পোর্টো রিকোয় পাখি নিয়ে কিছু কাজ করেছিলাম--অনেক নতুন টেকনোলজি শিখেছিলাম, কিন্তু ওসব কাজের জন্য চাই সুস্থ সবল শরীর। বুড়ো বয়সে কষ্ট বেশি।

কোভিড বার্ডিং --ছাত্রীর সঙ্গে, ছয় ফুট দূরত্ব রেখে।

বাচ্চা পাখি নিয়ে গবেষণা --পোর্টো রিকো

বন্য পাখিদের দানাপানি খাওয়ানো
তিরিশ বছরে আমার পাখি দেখার হবিটাও কিছু বদলেছে। প্রথম প্রথম বিদেশ বিভূঁইয়ে প্রফেশনাল গাইড পাওয়া মুশকিল ছিল (এখন একেবারেই নয়), আমিও একা একাই দূরবীন আর বই হাতে পাখি খুঁজতে বেশি আনন্দ পাই। নিজে নিজে একটা আনকোরা নতুন পাখি চিনে নেবার মধ্যে কৃতিত্ব আছে, গাইড হাত ধরে দেখিয়ে দিলে বা নাম বলে দিলে সেই আনন্দটা পাওয়া যায় না। এটা অবশ্য আমার নিজস্ব মত। তবে কোন কোন জায়গায় গাইড বিশেষ জরুরী। দুর্গম, বিপজ্জনক জায়গায় গেলে বা হাতে বেশি সময় না থাকলে গাইডের সাহায্য নিতেই হয়। আর গাইড সঙ্গে নিলে বেশি খরচ সত্ত্বেও নির্ঝঞ্ঝাটে, নিরাপদে অনেক বেশি পাখিও দেখা যায়। আমি শুধু দুই দেশে পুরো গাইড সঞ্চালিত প্যাকেজ ট্রিপ নিয়েছি-- পাপুয়া-নিউগিনি ও কোস্টারিকায়। অন্য সব জায়গায় শুধু সাময়িক ভাবেই গাইডের সাহায্য নিয়েছি। আজকাল সবাই গাইড নিয়ে চলেন, বিশেষ করে বিদেশে বা অচেনা জায়গায়।
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমি আরও কিছু শর্টকাট নিতে বাধ্য হয়েছি। আগের মতো পায়ে হেঁটে বনেবাদাড়ে বেড়াতে পারি না তাই আমার নতুন স্টাইল-- car birding -- বা গাড়িতে চড়ে পাখি দেখা। আমার মতে গাড়িতে বসে পাখিদের বেশ কাছাকাছি আসা যায় যা পায়ে হেঁটে অনেক সময় সম্ভব নয়। গাড়িটা এক রকম ব্লাইনড-এর কাজ করে। আর, বরফ কাদার মধ্যে গাড়িই সুবিধার। ইদানীং আরেকটা বয়সোচিত ট্রেনড -- বসে বসে পাখি দেখা। অনেক সময় চুপ করে এক জায়গায় কিছুক্ষণ বসে থাকলে দেখবেন পাখিরা আপনা আপনিই কাছে চলে আসে। ব্যস, পাখি দেখা হল, ছবিও তুললেন আর হাঁটুর ব্যথাটাও বাগড়া দিল না।
পনেরো বছর আগে 'পরবাসে' যেমন লিখেছিলাম -- পাখি দেখার কতো মজা। কোনো অদৃশ্য পাখির স্বর শুনে বনবাদাড় ভেঙে তার খোঁজ করা ও এক পলক দেখেই তাকে চিনে নেওয়ার মধ্যে একটা চ্যালেঞ্জ আছে, যে কোনো শিকারীই সেটা বুঝবেন। পাখি দেখাও এরকম শিকার। শুধু তীর ধনুক বা গুলিগোলার দরকার নেই। একেবারেই অহিংস শিকার। আর শুধু তাদের চেনা বা নাম জানাই নয়, তাদের প্রকৃতি, স্বভাব, খাবার, বাসাবাঁধা, সবই নির্ভর করে চারপাশে প্রাকৃতিক জগতের ওপর। পাখি চেনা মানে গাছপালা চেনা, ঋতু বদলের প্রভাব শেখা, পোকামাকড়, আবহাওয়া, পারিবেশিক দূষণ এ সবই জ্ঞানের আওতায় পড়ে। প্রত্যেক পাখিপ্রেমী স্বাভাবিকভাবেই প্রকৃতিপ্রেমী।
সব দেশেই পাখি দেখার জনপ্রিয়তা বেড়ে চলেছে। হবেই তো। আমরা সবাই বুড়ো হচ্ছি, লাফঝাঁপ আর পোষায় না। পাখি দেখা বেশ শান্তিপূর্ণ, বেশি কায়িক পরিশ্রমের দরকার নেই। একটা বাইনকুলার আর সেল ফোনে মারলিন নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। শহরে, গাঁয়ে, শীতে, গ্রীষ্মে, দিনে, রাতে, সঙ্গীবিহীন বা সঙ্গীসমেত, যে কোনো জায়গায়, সময়ে, অবস্থায় আপনি পাখির খোঁজে মগ্ন হতে পারে। হালকা ব্যায়ামে, প্রাকৃতিক আবহাওয়ায় সময় কাটাতে এর চেয়ে ভালো হবি আর কীই বা হতে পারে? ধীরেসুস্থে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার এই তো প্রকৃষ্ট উপায়।