


(১)
কলিংবেলের আওয়াজ হতে না হতেই ভিতর থেকে খনখনে গলায় কিছু বাছাই করা বিশেষণ ঠিকরে আসতে লাগল।
—কোন অলপ্পেয়ে মুখপোড়া, হতচ্ছাড়া? রোজ রোজ বেল বাজিয়ে পালিয়ে যায়!
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আগন্তুক এমন অভ্যর্থনা আশা করেনি। সে তখন ভাবতে শুরু করেছে চলে যাবে, না কি দাঁড়াবে। সদর দরজাটা খানিকটা ফাঁক করে এক বৃদ্ধা মুখখানা বের করে তাকে দেখে এত্তখানি জিভ কেটে ভাঙা দাঁতগুলো বের করে একটুখানি হেসে বললেন, “কিছু মনে করো না মা, আসলে রোজই আমাদের দরজার বেলটা কেউ বাজিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। তাই ভেবেছিলাম, আজকেও বুঝি...। তুমি কে মা?
—আমি সঞ্জনা। সঞ্জয় ক’দিন অফিসে যায়নি তো, ফোনে খবর নিয়ে জানলাম ওর জ্বর হয়েছে। তাই দেখতে এলাম।
—এসো মা, ভেতরে এসো। এসে খুব ভালো করেছ মা। একাটি থাকি, তার উপর ছেলেটার জ্বর... তাও দিন পাঁচেক হ’ল। ওই ঘরে সঞ্জু আছে...যাও না…যাও।
(২)
—কেমন আছো?
—তুমি আবার কষ্ট করে এলে কেন? ভাইরাল ফিভার। ছোঁয়া লেগে গেলে মুশকিল। আমি আর দু’ একদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে যাব।
—তোমাকে না দেখে থাকতে পারছিলাম না গো!
—বুঝেছি।
—তোমার জন্য কয়েকটা আপেল, ডালিম আর একটা প্যাকেট হরলিক্স এনেছি। এই টেবিলে রাখব?
—রাখো। এসব আবার আনার কী দরকার ছিল?
-দরকার আছে কি নেই – সেটা আমি বুঝব।
সঞ্জনা ব্যাগ থেকে জিনিসগুলো বের করে টেবিলে রাখল।
সঞ্জয় মশারি সরিয়ে একটু উঠে বসার চেষ্টা করল। কিন্তু শরীর বড় দুর্বল।
—আরে তুমি শোও, শোও। উঠতে হবে না।
সঞ্জনা সঞ্জয়ের হাত ধরে শুইয়ে দিল।
(৩)
আজ সঞ্জয় অফিস যাবে। শরীর একটু দুর্বল ঠিকই। তবু যেতে তো হবেই। প্রায় আট-ন’দিন বাদে আজ সে অফিস যাচ্ছে।
টেবিলের উপর ভাতের থালাটা রেখে সঞ্জয়ের মা মনোরমা দেবী ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, সেদিন যে মেয়েটি আমাদের ফ্ল্যাটে এসেছিল তার কী যেন নাম? সঞ্জনা না? বেশ সুন্দর দেখতে। কোথায় বাড়ি রে ওদের?”
—ওদের বাড়ি বেলুড়মঠের কাছে। আমাদের অফিসে চাকরি করে।
—অ। তা মেয়েটার তো বিয়ে থা হয়নি। মেয়েটাকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। ওর বাবা-মার সঙ্গে একবার কথা বলে দেখ না। যদি তোর সঙ্গে বিয়েটা দেয়।
সঞ্জয় একটু লজ্জা পেল।
—তুমি যে কী বলো না মা। ওরা অনেক ধনী। প্রচুর টাকা পয়সা আছে। আমার মতো সাধারণ মাইনের চাকুরে ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবে কেন?
(৪)
এর কিছুদিন বাদেই হঠাৎ একদিন রাত্রি দশটা নাগাদ সঞ্জনার ফোন এল। সঞ্জয়ের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। সে একটা গল্পের বই নিয়ে নিজের ঘরে বিছানায় আধশোয়া হয়ে পড়ছিল। এটা ওর বহুদিনের অভ্যাস। পাশের ঘরে ঘুমোচ্ছিল তার মা। ঠিক সেই সময় মোবাইল ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল ঘরের টেবিলের উপর।
সঞ্জনার গলায় ঈষৎ উত্তেজনা। দু’একটা সাধারণ কথার পর সে আসল কথাটা পাড়ল। তার মা-বাবা ও দাদা মিলে তার জন্য একজন পাত্র ঠিক করে ফেলেছে। সামনের রোববার তাকে তারা দেখতে আসবে।
সঞ্জয় ঈষৎ হেসে বলল, “এতো খুব ভালো কথা।”
সঞ্জনা একটু চুপ করে থেকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “তুমি কিছু বলবে না? তোমার কিছু বলার নেই?”
—আমি আর কী বলব? তোমাদের সঙ্গে আমার আর্থিক অবস্থার কোন মিল নেই। আমি খুব সাধারণ চাকরি করি। সে তুমি জানো। তোমার শখ-আহ্লাদ কিছুই পূরণ করতে পারব না। শুধু শুধু তোমায় কষ্ট দিয়ে কী লাভ?
—তার মানে তুমি কিছু করবে না তাই তো?
—আমি কী করব সঞ্জনা? তোমার বাড়ির লোকজন আমাদের সম্পর্ক মেনে নেবেন না। আমি প্রোপোজাল নিয়ে গেলে তাঁরা আমাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবেন। জেদ কোরো না। বাড়ির লোকজনের কথায় রাজি হয়ে যাও।
হঠাৎ একটা ফোঁপানির আওয়াজ। তারপরেই ফোনটা কেটে গেল। বারবার চেষ্টা করেও আর ফোন ধরল না সঞ্জনা। দুশ্চিন্তায় সারা রাত ঘুম হলো না সঞ্জয়ের।
(৫)
পরের দিন সঞ্জনা অফিসে এল না। তার পরের দিনও না। তার পরের দিনেও না। সঞ্জয় এবারে বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। রিসেপশনের ম্যাডামকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল সে শরীর ভালো নেই বলে ছুটি নিয়েছে।
তৃতীয় দিন সকালে সে সোজা সঞ্জনাদের বাড়ির সামনে গিয়ে উপস্থিত হল। বাড়ির সামনে কিছু লোক ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে দেখে সে ভয়ানক ঘাবড়ে গেল। কাঁপা কাঁপা গলায় একজনকে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? এখানে এত ভিড় কেন?”
লোকগুলো ওর দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রয়েছে। একজন শুধু বলল, “উকিলবাবু এখনও চেম্বার খোলেননি, তাই।”
এতক্ষণে সঞ্জয় লক্ষ করল গেটের বাইরে পাথরের ফলকে বড় বড় করে লেখা রয়েছে – “মিঃ অবনী পাল, এ্যাডভোকেট, হাইকোর্ট, কলকাতা।”
সঞ্জনার বাবা হাইকোর্টের এ্যাডভোকেট সেটা সঞ্জয় শুনেছিল – কিন্তু তাঁর বাড়ির সামনে রোজ সকালে এত ভিড় হয় সেটা তার জানা ছিল না।
একজন লোক জিজ্ঞেস করল, “দাদাও কি ক্লায়েন্ট না কি?”
—না না, আমি একটা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে…
—তাহলে আপনি ওই পাশের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে যান না।
সঞ্জয় দেখল বাঁদিকে সিমেন্টের সরু রাস্তা পাঁচিলের পাশ দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেছে। সেটা দিয়ে একটু এগোলেই সামনে একটা কোলাপসিবল গেটের ভেতরে সুন্দর পালিশ করা কাঠের দরজা। কোলাপসিবল গেট ও দরজা খোলাই ছিল। সঞ্জয় হাতের মৃদু চাপ দিতে দরজাটা পুরো খুলে গেল। দরজার আওয়াজে এক ভদ্রমহিলা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “কাকে চাই?”
—সঞ্জনাকে।
ভদ্রমহিলা কিছু না বলে দ্রুত ঢুকে গেলেন পাশের একটি ঘরে। সঞ্জয় শুনতে পেল তিনি কাকে যেন বললেন, “মাসীমা, একটু বাইরে আসুন, কে যেন দিদিভাইকে খুঁজছে।”
—কে আবার এই অসময়ে এল? বলতে বলতে একজন ভদ্রমহিলা ঘরের বাইরে এসেই ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
সঞ্জয় হাত তুলে নমস্কার করে বলল, “আমি সঞ্জনার সঙ্গে দেখা করতে চাই। ওকে একটু ডেকে দেবেন?”
—কে আপনি? ওর সঙ্গে কী দরকার?
(৬)
ঠিক সেই সময় সঞ্জনাকে সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ দেখা গেল।
—ও আমাদের অফিসে চাকরি করে মা। আমি ওকে চিনি।
—চিনতেই পারো। কিন্তু অফিসের বন্ধু এখানে কেন? কী জানি বাবা, আজকালকার ছেলেমেয়েদের আমি ঠিক বুঝতে পারি না। যা কথা বলার এখানে দাঁড়িয়ে বলো।
সঞ্জনা সঞ্জয়কে বলল, “আমি আর অফিসে যাব না। আমার বিয়ের ঠিক হয়ে গেছে।”
—তবে তুমি যে সেদিন ফোনে বলেছিলে…
—সেসব কথা ভুলে যাও। পাত্র মস্তবড় সরকারী অফিসার। আমি খুব সুখেই থাকব। তুমি আসতে পারো।
অপমানিত সঞ্জয় আর কোন কথা না বলে মাথা নীচু করে বেরিয়ে এল সঞ্জনাদের বাড়ি থেকে।
পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো জিজ্ঞেস করল, “ও দাদা, উকিল বাবুর সঙ্গে দেখা হলো?”
সঞ্জয় কোন উত্তর না দিয়ে হনহন করে হাঁটতে লাগল।
পিছন থেকে কারো মন্তব্য ভেসে এল – “অদ্ভুত লোক!”
(৭)
সঞ্জনার বিয়ের কার্ডও পেয়েছিল সঞ্জয়। বলাবাহুল্য, যাবে না বলেই ঠিক করেছিল। অফিসে এই নিয়ে হাসাহাসি কম হয়নি। স্বপনদা জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কী হে সঞ্জয়, তোমাকে সঞ্জনা নেমন্তন্ন করেনি? তুমি তো ওর বেস্ট ফ্রেন্ড! ও হো, আমারই তো ভুল, তোমায় বোধহয় স্পেশাল নেমন্তন্ন করেছে!”
সুযোগ পেলে কাটা জায়গায় নুনের ছিটে দিতে কে আর ছাড়ে?
অফিসে নানা জনে নানাভাবে কথা শুনিয়েছে। গুন গুন করেছে, কানাকানি করেছে। বলেছে, “বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়াতে গিয়েছিল!” সঞ্জয় কোন রিঅ্যাক্ট করেনি। সে মনের সব কষ্ট চেপে রেখে নিজের কাজ করে গেছে। একটু-আধটু ভুলত্রুটি হলেও ওর বস্ মহেন্দ্র মেটা কিচ্ছুটি বলেননি। নিজের প্রখর বুদ্ধি দিয়ে তিনিও আন্দাজ করতে পেরেছেন ছেলেটার মনের মধ্যে কী তোলপাড় চলছে।
(৮)
নির্দিষ্ট দিনে অফিস কলিগরা সারাদিন ধরে শুধু একটাই আলোচনা করতে লাগল—-আজ সঞ্জনার বিয়েতে গিয়ে কী মজাটাই না হবে। আর সেটা শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে লাগল সঞ্জয়কে। সবাই জানে সঞ্জয় নিশ্চয়ই যাবে না। কাজেই ওকে কষ্ট দিয়ে মজা দেখার মধ্যে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ উপভোগ করা যাক। নির্মলা হেসে হেসে বলতে লাগল, “আমাকে সঞ্জনা ফোন করেছিল। জিজ্ঞেস করলাম কী করছিস? বলল, শ্বশুরবাড়ি থেকে এত তত্ত্ব পাঠিয়েছে যে কোথায় রাখবে জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না।”
অনিন্দিতা বলল, “ওদের আজকের মেনুতে ইলিশ পাতুরি আছে। আমি আবার ইলিশ পাতুরি দেখলে পুরো ফিদা হয়ে যাই। সঞ্জনাকে বলেছি, আমার বরের জন্য একটু প্যাক করে দিতে।”
সঞ্জয় কোন কথাই বলছে না। নিজের মনে কম্পিউটারে একটা স্টেটমেন্টের এক্সেল চার্ট টাইপ করে যাচ্ছে।
স্বপন ব্যঙ্গ করে বলল, “আমি হলে প্রেমিকার বিয়ের দিন এত উদাসীন থাকতে পারতাম না। বুকের ভেতর থেকে ভালোবাসতে জানতে হয়।”
সবাই মুখ টিপে টিপে হাসতে লাগল। বোঝাই গেল কথাটা কাকে বলা হচ্ছে।
ঠিক সেই সময় মহেন্দ্র মেটা গাড়ি থেকে নেমে অফিসে ঢুকে সোজা সঞ্জয়ের কাছে গিয়ে বললেন, “তুমি এখনই আমাদের সোনারপুর সাইটে চলে যাও। ওখানে কিছু লোকাল পলিটিক্যাল নেতা ঝামেলা করছে। তুমি তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখ ওরা কী চাইছে। সন্ধ্যে ছ’টার মধ্যে আমায় রিপোর্ট করবে। এখনই বেরিয়ে পড়ো, কুইক। যা পেন্ডিং আছে, থাক। কালকে করবে।”
সঞ্জয় যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সঙ্গে সঙ্গে ল্যাপটপ শাটডাউন করে বেরিয়ে পড়ল।
বাকিরা মুখ বাঁকিয়ে বলল, “তেল মারা পাবলিক!”
(৯)
সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ অফিসে ফিরল সঞ্জয়। অফিসের সকলে তার অনেক আগেই বিয়েবাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়ে গেছে।
মহেন্দ্র মেটা ওর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সমস্ত রিপোর্ট ও কথোপকথনের পূর্ণ বিবরণ দেওয়ার পর সঞ্জয় তাঁর চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসছিল। মহেন্দ্র মেটা হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, “সবাই সঞ্জনার বিয়েতে গেছে, তুমি যাবে না?”
বস্ও বুঝি ঠাট্টা করছেন – এই ভেবে তার চোখে জল এল। পিছন ফিরে দরজা খুলে বেরিয়ে আসছিল সঞ্জয়, হঠাৎ কাঁধের উপর একটা নির্ভরযোগ্য হাতের চাপ অনুভব করল।
—জীবনটা এত সহজে ভেঙে পড়ার জন্য নয়, মাই ব্রাদার। তোমাকে অনেক অনেক উপরে উঠতে হবে। যেখানে কেউ সহজে তোমার নাগাল পাবে না।”
মহেন্দ্র মেটা এসে ওর পিছনে দাঁড়িয়েছেন।
—চলো, আমরা বেরিয়ে পড়ি।
—কোথায়?
-সঞ্জনার বিয়েতে যেতে হবে তো?
—কিন্তু আমি তো রেডি হয়ে আসিনি স্যার।
—তোমার শার্টটা তো বেশ ভালোই। আর চকচকে হলেই সেটা দামি হবে এমন কোন কথা নেই। এসো আমার সঙ্গে।
(১০)
বিয়েবাড়িতে সঞ্জয়কে দেখে সবাই অবাক। এমনকি সঞ্জয় যখন সঞ্জনাকে লাল গোলাপের তোড়া আর একটা খাম গিফট হিসেবে দিল, তখন সঞ্জনাও কয়েক মুহূর্তের জন্য হাত বাড়াতে ভুলে গিয়েছিল। লাল বেনারসী, গা-ভর্তি সোনার গয়না, সোনালী ওড়না আর কোন এক দক্ষ বিউটিশিয়ানের মেকআপে সঞ্জনাকে অপরূপ দেখাচ্ছে। কিন্তু সবার চোখ সঞ্জয়ের দিকেই। মহেন্দ্র মেটার সঙ্গে এতটা ক্লোজনেস কেউ যেন মন থেকে মেনে নিতে পারছে না। দু’জনে একই গাড়ি থেকে নেমেছে। খাবারের প্লেট নিয়ে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করতে করতে খাবার খাচ্ছে – মহেন্দ্র মেটার কোন খাবার পছন্দ হলে সঞ্জয়কেও নিতে বলছেন – এসবগুলো অফিসের অন্য কলিগদের সহ্য হচ্ছে না একেবারেই। তারা বলাবলি করছে, “এত তেল দেবার জন্যই…, ছি ছি। আমরা পারব না বাবা।”
(১১)
সঞ্জয়ের রকমসকম দেখে সঞ্জনাও যে আশ্চর্য হয়ে গেছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তাহলে কি সঞ্জনার প্রতি ওর কোন দুর্বলতাই ছিল না? সবটাই অভিনয়? পানপাতা দিয়ে মুখ ঢেকে পিঁড়িতে উঠে সাতপাক ঘুরতে যাওয়ার আগে সঞ্জয়কে আড়চোখে দেখে গেল সে। ওর বর সৌরভ অনেক ভালো হয়েছে। মোটা রোজগেরে সরকারী চাকুরে। সঞ্জয়ের মত পাতি বেসরকারী চাকরি নয়। শুধু কি তাই? সৌরভদের বাড়িঘর দেখলে যে কেউ চমকে যাবে। ভবানীপুরের বনেদি পরিবার। সৌরভের বাবা সঞ্জনার বাবার বিশেষ পরিচিত। বন্ধুদের কাছে ভাবী শ্বশুরবাড়ির কথা এত বলেছে যে এক বান্ধবী তো বলেই ফেলল, “বাব্বা, এ তো দেখি গাছে না উঠতেই এক কাঁদি। সবাই শ্বশুরবাড়ি যায়, বিয়ের আগে থেকে কেউ এত সুনাম করে না।”
কথাটা সঞ্জনার কানে আসতে সে জিভে একটু লাগাম দিয়েছে। তবে মনে মনে ভেবেছে, “বেঁচে গেছি বাবা। ভাগ্যিস ভুল করে ওই সঞ্জয়ের মত ছেলেকে বিয়ে করিনি, তাহলে ওই নর্থ ২৪ পরগনার দু’কামরার ছোট্ট ফ্ল্যাটে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে হোত।”
(১২)
মাত্র সাত দিনেই হাঁপিয়ে উঠেছে সঞ্জনা। এমন একটা মানুষের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে যে কোনও বিষয়ে তার সঙ্গে মিল নেই। সঞ্জনার যদি ঘরোয়া রান্না পছন্দ হয় তো সৌরভের রেস্টুরেন্টের খানা পছন্দ, সঞ্জনার যদি গান শুনতে ইচ্ছে করে তাহলেই সৌরভ খবরের চ্যানেলে ঘুরিয়ে দেয়। সঞ্জনা শাড়ি পরলে সৌরভের তাকে আনস্মার্ট মনে হয়। সঞ্জনা বই পড়লে সৌরভের মনে হয় তাকে সে ইগনোর করছে। সঞ্জনা নিজের হাতে খাবার সার্ভ না করলে সৌরভ মনে করে তার কথায় সঞ্জনার রাগ হয়েছে বলেই সে এরকম করছে। দুজনের খিটিমিটি লেগেই আছে।
অষ্টমঙ্গলায় এসে সঞ্জনা চুপিচুপি বলল তার মাকে। মা মেয়েকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “পুরুষ মানুষ অমনই হয়। দেখিস না তোর বাবাকে? সারাক্ষণ শুধু খিটিমিটি করে।”
বন্ধুদের হেসে হেসে বলতে হয় বর কত ভালো, কতটা এ্যাডজাস্ট করে, শ্বশুরবাড়ির লোকজন কত ভালো ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা এর সম্পূর্ণ ভিন্ন।
(১৩)
বিয়ের পাকা দেখার দিনেই সঞ্জনার শ্বশুরমশাই বলেছিলেন, “আমাদের বাড়ির মেয়েরা কেউ কখনও চাকরি করেনি। আশা করি তুমিও পরিবারের সম্মানার্থে সেই ঐতিহ্য মেনে চলবে।” বলাবাহুল্য, সেইখানেই ফুলস্টপ পড়ে গেল সঞ্জনার চাকরিজীবনে।
সারা দিন তার কাটে রান্নার তদারকি আর ঘর গোছানোর নির্দেশ দিয়ে। তারপর দুপুর বেলা শাশুড়ির মত নাক ডাকিয়ে ঘুম আসে না বলে উত্তরের বারান্দায় বসে বসে দেখে রাস্তা দিয়ে লোকজনের আনাগোনা।
সন্ধ্যে হয়ে এলেই তার মন খারাপ হয়ে যায়। একটু পরেই বাড়ি ফিরে আসবেন শ্বশুরমশাই। এসেই বলবেন, “বৌমা, আজ রাতে একটু খাসির মাংস রান্না করো তো। আমি হারুকে বাজারে পাঠিয়েছি। নীলার মাকে দিয়ে রাঁধাবে না। তুমি নিজে রান্না করবে। আর হ্যাঁ, তোমাদের ওই প্রেশার কুকার ব্যবহার করবে না। কড়াইতে কষবে ভালো করে। ঝালটা একটু বেশি দিও। লঙ্কা শীলে বেটে নেবে। মিক্সিতে নয়।”
সঞ্জনা জানে এই মাংসের জোগাড় করতে আর রান্না করতে তার রাত্রি ন’টা, সাড়ে ন’টা বেজে যাবে। তারপর বাড়ি ফিরবে সৌরভ। সে ঘরে ঢুকেই ডাক দেবে সঞ্জনাকে। তার গা থেকে কোট খুলে নিতে হবে, পা থেকে মোজা খুলে দিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে দিতে হবে চায়ের কাপ। চুমুক দিয়ে যদি দেখে চিনি একটু বেশি তাহলে ভয়ানক রেগে যাবে। এরপর সৌরভ ফ্রেশ হয়ে টি. ভি. দেখবে, তখন শ্বশুরমশাইকে খেতে দিতে হবে। তিনি একঘন্টা ধরে খাবেন, সামনে সঞ্জনাকে বসে থাকতে হবে। মাঝে মাঝে এটা-ওটা চাইবেন। শাশুড়ি রান্নাঘর থেকে একটা করে গরম রুটি এনে শ্বশুরের প্লেটে দেবেন।
শাশুড়ি প্রথম দিনেই বলে দিয়েছেন, “এ বাড়িতে পুরুষ মানুষের সঙ্গে মেয়েদের বসে খাওয়ার রেয়াজ নেই। তোমার শ্বশুরমশাইয়ের খাওয়া হয়ে গেলে খোকা খেতে বসবে। তারপর তুমি আর আমি খেতে বসব।”
(১৪)
আজকের দিনেও এমন সেকেলে মনোভাবাপন্ন মানুষজন আছে সঞ্জনার বৌদি তা বিশ্বাস করতেও চায় না। বন্ধুদের সঙ্গে সঞ্জনা এসব কথা শেয়ার করতে পারে না, ফলে নিজে নিজে হাঁপিয়ে উঠে।
সঞ্জনার বাবা-মায়ের বক্তব্য হ’ল মেয়েরা সংসার করার জন্যই জন্মেছে। তাদের আবার নিজস্বতা কী? পড়াশোনা শিখে অফিসে চাকরি করার থেকে সংসারের জোয়াল টানা অনেক ভালো।
সঞ্জনার কষ্ট একমাত্র বোঝে তার দাদা। যার চিন্তাভাবনাতে কিছুটা আধুনিকতার আলো আছে।
সঞ্জনা একদিন কাঁদতে কাঁদতে তার দাদাকে বলেছে, “যদি শুধু সারাদিন বাড়িতে থেকে সংসারই করব, তাহলে আমায় লেখাপড়া শেখালি কেন?”
সন্দীপ ধরা গলায় বলে, “কী করব বল? বাবা যে দুম করে ওদের পাকা কথা দিয়ে দেবেন, বুঝতেই পারিনি আমরা।”
(১৫)
—এ কি বৌমা, শাড়িটাড়ি পরে কোথায় বেরোচ্ছ?
—আমি একটু শপিং মলে যাচ্ছি মা।
—তুমি কি পাগল হয়েছ? একা একা এ বাড়ির মেয়েদের বেরোনোর নিয়ম নেই। আগে খোকা আসুক, তারপরে বেরোবে।
সঞ্জনা জানে সৌরভ অফিস থেকে বেরিয়ে ক্লাবে যায়, গল্ফ খেলে, ড্রিংকস করে – তারপর রাত ন’টার সময় বাড়ি আসে। তখন তার বেরোনোর কোন প্রশ্নই নেই। কোন কোন দিন ড্রাইভারের কাঁধে ভর দিয়ে বাড়ি ঢোকে সে। এই নিয়ে শ্বশুর-শাশুড়ি কিচ্ছু বলেন না। “সোনার আংটি বাঁকা হলে ক্ষতি নেই”।
সঞ্জনাদের আর্থিক অবস্থা যথেষ্ট ভালো হলেও তার বাবা, দাদাদের কোনওরকম নেশা করতে দেখেনি সঞ্জনা, শুধু বইয়ের নেশা ছিল দুজনেরই। সঞ্জনা আর তার বৌদির জন্য প্রতি মাসে বেশ কয়েকটি করে পত্রিকা নেওয়া হোত। কিন্তু তার শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ বাড়িতে কেউ বই পড়ে না, যদিও প্রত্যেকে নিজেদের ভীষণ শিক্ষিত বলে দাবি করেন। তাদের নানারকম সুখাদ্যের ফরমায়েশ ছাড়া আর কোনও কথা নেই। তাও আবার তা বাড়ির বৌয়ের হাতে রান্না হতে হবে।
(১৬)
ক্রমশ সঞ্জনা আপ্রাণ চেষ্টা করে নিজেকে শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে মানিয়ে নেবার। কিন্তু ইচ্ছার বিরুদ্ধে চেষ্টাটা তাকে যেন শিলে পিষতে থাকে। শরীর রুগ্ন হয়, কন্ঠার হাড় বেরিয়ে আসে।
বিয়ের পর সৌরভ কোথাও তাকে বেড়াতে নিয়ে যায়নি কখনো, এমনকি অষ্টমঙ্গলার দিন বিকেলে সেই যে সঞ্জনাদের বাড়ি থেকে বৌকে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে, মাস ছ’য়েক আর সেদিকে যায়নি। কোথাও যাওয়ার কথা বললেই বলে, “অফিসে কাজ আছে।”
সৌরভ যে সঞ্জনাকে অ্যাভয়েড করছে সেটা সে স্পষ্ট বুঝতে পারে। নতুন বৌয়ের দিকে পিছন ফিরে শুয়ে থাকে রাতে। সঞ্জনা দুঃখ পায়। কেন এই অবহেলা তার কারণ খোঁজার চেষ্টা করে সে।
ঘরে একটা বুকশেল্ফ-কাম-রাইটিং টেবিল আছে। তার দু’টো ড্রয়ার। একটা সঞ্জনার, আর একটা সৌরভের। সৌরভ সব সময় নিজের ড্রয়ারে চাবি দিয়ে রাখে। সঞ্জনা কোনওদিন এই নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলেনি। অবশ্য এই বাড়িতে সে কার্যত ভয়েসলেস।
আজ সৌরভ ড্রয়ারে চাবি দিতে ভুলে গেছে। চাবি ড্রয়ারের সঙ্গেই ঝুলছে। সঞ্জনা একবার ভাবল ড্রয়ারটা খুলবে না। কিন্তু এক অদম্য কৌতূহল তাকে যেন চুম্বকের মত আকর্ষণ করতে লাগল। অবশেষে ড্রয়ারটা খোলার আগে দরজায় ছিটকিনি আটকে দিল। অবশ্য এখন সৌরভ বাড়িতে নেই। এই দুপুরবেলাটা তার একেবারে নিজস্ব।
(১৭)
ড্রয়ার খুলতেই বেরিয়ে পড়ল কয়েকটা ডায়েরি, কিছু পুরোনো চিঠি, আর বেশ কিছু গ্রিটিংস কার্ড, টাকা-পয়সা। সঞ্জনা টাকা-পয়সা ছুঁয়েও দেখল না। সে প্রথমেই একটা চিঠি খুলল। চিঠির শেষে লেখা আছে “ইতি – তোমার কণা”। চিঠিগুলোর ছত্রে ছত্রে কাউকে নিবিড় করে পাওয়ার আশা, বিরহ, অভিমান, অনুযোগ এবং শেষ চিঠিতে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে না পেলে আত্মহত্যার জন্য হুমকি পর্যন্ত।
সৌরভের ডায়েরিগুলো খুলে দেখল দিনলিপি খুব নিয়ম মেনে লেখা। চিঠির সঙ্গে ডায়েরির তারিখ মিলিয়ে লেখাটা পড়তে গিয়ে সঞ্জনা চমকে উঠল। তাদের বিয়ের কয়েক দিন আগেই মেয়েটা আচমকা বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। সে কথা সৌরভ নিজের হাতে লিখে রেখেছে। সে লিখেছে, “বাবা আমার কথা বিন্দুমাত্র কেয়ার করলেন না। ওরা গরীব বলে কণার সঙ্গে আমার বিয়ে দিলেন না। অথচ তার মত মেয়ে হয় না। কিন্তু বাবার চাপে বাধ্য হয়ে আমায় সঞ্জনার সঙ্গে বিয়েতে সম্মতি দিতে হ’ল। নাহলে বলেছেন সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করবেন আমায়।"
পরের দিনে লেখা “কণাকে ডায়মন্ড হারবার এলাকায় নদীর পাশে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কাগজে লিখেছে। টিভি নিউজেও দেখিয়েছে। ওকে খুন করা হয়েছে। কিন্তু ওখানে গেল কী করে? রাস্তাঘাট বিশেষ তো কিছু চিনত না।”
(১৮)
সঞ্জনা ডায়েরির পাতা ওল্টাতে গিয়ে তৎক্ষণাৎ ফোন করল তার দাদাকে – গলাটা কাঁপছে, “আমি তোকে কিছু কথা বলতে চাই। খুব গোপনে।”
—হাইকোর্ট পাড়ায় চলে আসতে পারবি?
—দেখছি।
দুপুরবেলা কেউ কোথাও নেই। বাড়ির দরোয়ান বৌদিমনিকে একা বেরতে দেখে ছুটে এল, “পারমিশন নেই ম্যাডাম।”
ওর হাতে একশো টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়ে বলল, “কাজ সেরে ফিরে আসছি। সন্ধ্যের আগেই চলে আসব। কেউ কিছু জানে না। বলারও দরকার নেই।”
—কিন্তু কেউ জানতে পারলে ম্যাডাম আমার নোকরি চলে যাবে।
—কেউ জানতে পারবে না। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো।
(১৯)
ট্যাক্সি দ্রুত ছুটছে কিরণ শঙ্কর রায় রোডে হেস্টিংস চেম্বারের দিকে। জ্যাম নেই রাস্তায়, তবুও সিগন্যালে দাঁড়িয়ে পড়লেই ঘাম জমছে সঞ্জনার কপালে।
ছোট্ট চেম্বারে রুচির ছাপ স্পষ্ট। ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। টেবিলের দু’দিকে দুজন বসে আছে। একজন সঞ্জনা, অপর জন তার নিজের দাদা, টেবিলের উপর রাখা রয়েছে কিছু চিঠি আর ডায়েরি।
দুঁদে ক্রিমিনাল ল’ইয়ার সন্দীপ পাল চিঠি ও ডায়েরির বয়ান দেখে মুহূর্তে বুঝে নিল ঘটনার গুরুত্ব। সৌরভ নিজের দোষ লুকোতেই সেই মেয়েটির মৃত্যুর ঘটনার কথা কৌশলে ডায়েরির পাতায় অন্যভাবে বর্ণনা করেছে কিনা সেটাও ভাবা দরকার।
ডায়েরি আর চিঠিগুলো পড়ার পর চশমাটা খুলে সন্দীপ সঞ্জনাকে জিজ্ঞেস করল, “এখন তুই কী করতে চাইছিস?”
—আমি এই সম্পর্কে আরো খোঁজখবর করতে চাই।
—তুই কি পাগল হয়ে গেছিস?
—না দাদা, আমি অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করতেও পারব না। দরকার হলে আমি ডিভোর্সের মামলা করব।
সন্দীপ তার এই একরোখা বোনটাকে বিলক্ষণ চেনে।
—ঠিক আছে । তুই এখন বাড়ি যা। আমাকে ভাবতে দে একটু।
(২০)
সঞ্জনা বাড়ি ফিরতেই শাশুড়ি সামনে এসে দাঁড়ায়।
—বৌমা, কোথায় গিয়েছিলে না বলে?
—বাপের বাড়ি।
—সেখানে যে তুমি যাওনি সে খবর আমি নিয়েছি ফোন করে। কোথায় গিয়েছিলে সেটা বোলো ঠিক করে।
—আমি দাদার কাছে গিয়েছিলাম, তাঁর চেম্বারে।
—কেন?
—সেটা যথাসময়ে আপনারা জানতে পারবেন।
—ও, এমন কথা যা আমাকে বলা যাবে না? তা তোমার কোন দাদার কাছে গিয়েছিলে শুনি?
—আমার নিজের দাদা।
—কেন, টাকাপয়সা ধার করতে?
—না, অন্য কারণ ছিল।
—এমন দরকার যে বাড়িতে গিয়ে বলা যায় না? তার চেম্বারে গিয়ে বলতে হয়? এমন বেয়াড়া মেয়েছেলে আগে কখনো দেখিনি।
—কী বললেন? আমি বেয়াড়া? আর আপনার ছেলে কী? ধোয়া তুলসী পাতা?
—যতবড় মুখ নয়, তত বড়ো কথা? আমার ছেলে বেয়াড়া? আজ সৌরভ আসুক বাড়িতে।
(২১)
রাতে সৌরভ বাড়ি ফিরতেই তার মা তাকে সঞ্জনার স্বেচ্ছাচারিতার গল্প শুনিয়ে চোখের জল মুছতে লাগলেন বার বার।
সঞ্জনা ঘরেই শুয়ে ছিল। সন্ধ্যাবেলা থেকে তার মাথার যন্ত্রণা হচ্ছে।
সৌরভ ঘরে ঢুকে প্রথমে দরজাটা লক করল। সেই আওয়াজে সঞ্জনা মুখ ঘুরিয়ে দেখল যে সৌরভ দরজা বন্ধ করে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। কী বলবে তা বুঝতে পেরে সঞ্জনার বুক ঢিপ ঢিপ করতে রইল।
সৌরভ কোন ভণিতা না করে জিজ্ঞেস করল, “তুমি মাকে বলেছ যে আমি বেয়াড়া?”
—রাগের মাথায় বলেছি।
—রাগের মাথায় তুমি যা খুশি তাই বলবে?
—তোমার মা আমাকে যা খুশি তাই বলবেন, আর আমাকে চুপ করে সহ্য করতে হবে?
—উনি তোমার গুরুজন।
—গুরুজন হতে হলেও যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।
—মুখ সামলে কথা বলবে। কোথায় অভিসারে গিয়েছিলে দুপুরবেলা?
—অভিসারে নয়। আমি আমার দাদার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম।
—কেন? সেটা তো তোমাদের বাড়িতেই হতে পারত।
—নিশ্চয়ই কোন কারণ ছিল তাই।
—সে কারণটা আমাকে বলা যেতে পারে কি?
—না।
—ঠিক আছে। সেটা আমি সন্দীপকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেব। এখন আমার আর তোমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। যাও, রান্নাঘরে যাও।
(২২)
পরের দিন সকালে সঞ্জনা ড্রাইভারকে বলল, “গাড়ি বের করো।”
পিছনে পিছনে ছুটে এল বাড়ির কাজের মেয়ে এবং বারান্দায় শাশুড়ি।
শাশুড়ি চেঁচিয়ে বলল, “কোথায় যাচ্ছ শুনি?”
—বাপের বাড়ি।
—কেন? হঠাৎ বাপের বাড়ি যেতে হবে কেন?
—আমার ইচ্ছা।
—ও আজকাল তোমার ইচ্ছাগুলো খুব শক্তিশালী হয়ে গেছে দেখছি! আমি না বললে যাওয়া হবে না। যখন তখন বাপের বাড়ি যাওয়া আমি পছন্দ করি না।
সঞ্জনা কোন কথার উত্তর না দিয়ে ট্রলি নিয়ে সোজা বেরিয়ে এল রাস্তায়।
ঠিক তখনই সন্দীপের গাড়ি এসে থামল সেখানে।
—উঠে আয়। আমি জানতাম এরকম কিছু একটা ঘটবে।
(২৩)
সৌরভের বাবা সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সংবাদপত্রের পাতা উল্টে খবরটা দেখতে পেয়েই হাত থেকে আছড়ে ফেললেন মেঝেতে।
আবার সেই মেয়েটাকে নিয়ে লেখা। পৃথিবীতে আর যেন কেউ মরে না। ওই মেয়েটাকে নিয়ে এত বাড়াবাড়ির কী আছে? কাগজওলাদের যেন আর কাজ নেই। পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত কত কিছু ঘটে যাচ্ছে। আর ওরা পড়ে আছে কিছু বস্তাপচা রেপ কেস আর খুনের ঘটনা নিয়ে।
চটাস করে কিছু একটা পড়ার শব্দে সৌরভের মা ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে বললেন, “কী হল?”
সৌরভের বাবা কোন উত্তর না দিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।
একটা ফোন করতে হবে। কিন্তু বাড়ি থেকে না। সৌরভের বাবা চটপট রেডি হতে লাগলেন ফ্যাক্টরিতে যাওয়ার জন্য।
(২৪)
সন্দীপ লক্ষ করছিল সঞ্জনা কিছুই খাচ্ছে না।
—কী হ’ল তোর? খাচ্ছিস না কেন?
—খেতে ইচ্ছে করছে না দাদা।
—শোন এত আপসেট হোস না। সবার কপালে কি সুখ লেখা থাকে? তাছাড়া তুই নিজেও সৌরভের শাস্তি চাইছিস। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চাইছিস। তোকে তো অনেক শক্ত হতেই হবে।
—কিন্তু দাদা, মা আর বৌদি বোধহয় ব্যাপারটা সমর্থন করছে না। এ বাড়িতে আসার পর থেকেই দেখছি তুই ছাড়া আর কেউ আমার সঙ্গে ভালো করে কথা পর্যন্ত বলছে না।
—মেয়েরা চিরাচরিত রীতিকেই নিয়ম বলে মেনে নেয়। তার বিরোধিতা করলেই তাদের চোখে অপরাধী।
—কিন্তু বাবা? তিনিও আমার ব্যাপারে আশ্চর্যজনকভাবে নীরব।
—হয়ত লাভক্ষতি, ঠিক-ভুলের হিসাবটা সঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না – তাই।
সঞ্জনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “দাদা, আমি একটা চাকরি করব।”
সন্দীপ মাথা নেড়ে সায় দিল তাতে। সে বুঝতে পারছিল সঞ্জনার মনের অবস্থা। বাড়িতে চুপচাপ বসে থাকলে পাগল হয়ে যাবে মেয়েটা।
(২৫)
অফিস থেকে বাড়ি ফিরে সৌরভ প্রথমেই তার ঘরে গিয়ে ড্রয়ারের চাবি খুলে পাগলের মত খুঁজতে লাগল ডায়েরি আর চিঠিপত্র। যা সন্দেহ করেছিল ঠিক তাই। বেশ কয়েকটি চিঠি ও একটা ডায়েরি উধাও।
সৌরভের সারা শরীর গা ঘামে ভিজে গেছে। তাহলে এটা সঞ্জনারই কাজ। কিন্তু চাবি পেল কোথায়? সেটা তো সব সময় তার নিজের কাছেই থাকে। ওহো, একদিন ভুল করে চাবিটা ড্রয়ারে ঝুলিয়ে রেখে সে চলে গিয়েছিল। সেই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়েছিল সঞ্জনা।
সৌরভের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে। সেও মামলা করবে সঞ্জনার বিরুদ্ধে। মানহানির মামলা। না, না, চুরির অভিযোগ আনবে, চরিত্রহীনতা প্রমাণ করবে তার বিরুদ্ধে। দেখবে কেমন করে সে পরিচিত মহলে, সমাজের সামনে মুখ দেখায়।
ফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করল সে। বাবার বন্ধু ব্যারিস্টার আঙ্কেলকে।
(২৬)
ব্যারিস্টার আঙ্কেল আকাশ থেকে পড়লেন।
—বৌমা বাপের বাড়ি চলে গেছে? কেন? কী হয়েছিল?
—আপনাকে আমি সব পরে বলব আঙ্কেল। এখন শুধু বলুন কীভাবে আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি।
—তাই তো, বেশ মুশকিলে ফেললে। এই ক’দিন তো আমি খুব ব্যস্ত থাকব। তুমি কালকে রাতে আসতে পারবে?
—পারব। কখন যাব বলুন?
—এই ধরো রাত ন’টা – সাড়ে ন’টা। আর হ্যাঁ, ডিনার কিন্তু এখানেই খাবে। খেতে খেতে তোমার ব্যাপারে আলোচনা করব কেমন?
—থ্যাঙ্কু আঙ্কেল।
—মেনশন নট।
সৌরভ আবার ড্রয়ারটা খুলল। কী কী হারিয়েছে তার একটা লিস্ট করা দরকার।
(২৭)
ব্যারিস্টার মিত্র ডিনারের পর নিজের লাইব্রেরীতে গিয়ে বসলেন অন্যান্য দিনের মতোই। কিন্তু সৌরভ যা বলে গেল সেই কথাগুলোই ঘুরপাক খাচ্ছে তাঁর মগজের মধ্যে। কেসটা জটিল। সৌরভ বলল বিয়ের আগে একটা মেয়ের সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব ছিল। কিন্তু মেয়েটার চরিত্র ভালো ছিল না। সেটা জানতে পেরে সে আর তাকে বিয়ে করেনি। মেয়েটা একদিন বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। মেয়েটা হারিয়ে যাওয়ার পর বাড়ির লোক থানায় ডায়েরি করেছিল ঠিকই, কিন্তু অন্তঃসত্ত্বা মেয়েটা মার্ডার হওয়ার পর তারা খুব বেশি হৈচৈ করেনি। সেটা কি লজ্জায় না ভয়ে? নাকি কেউ তাদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল? সৌরভ বলছে মেয়েটির সঙ্গে ওর শুধুমাত্র বন্ধুত্ব ছিল। কিন্তু মেয়েটা খুন হলো কেন? মেয়েটার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পেছনে দায়ী কে? সৌরভ নয় তো? সে কি নিজের দোষ ঢাকতেই তড়িঘড়ি তাঁর কাছে এল? এই কেসের সঙ্গে সৌরভের কি কোন একটা সংযোগ রয়েছে? সৌরভের কথা অনুযায়ী যদি সঞ্জনা কোন চিঠি বা ডায়েরি সরিয়ে থাকে তাহলে কী তার উদ্দেশ্য? নিজের স্বামীকে সে বিপদে ফেলতে চাইছে কেন?
মেয়েটি মানে সঞ্জনা কি তবে বিবাহিত জীবনে সুখী ছিল না? কিন্তু কেন? সৌরভের বক্তব্য স্বামী-স্ত্রীর স্বাভাবিক সম্পর্ক ছিল তাদের মধ্যে। কিন্তু সেটা সত্যি বলে মনে হচ্ছে না। তাহলে সঞ্জনা হঠাৎ তাকে ছেড়ে চলে যাবে কেন? কেনই বা সঞ্জনা সৌরভের বিরূদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করতে চাইবে? কোথাও একটা গন্ডগোল আছে বলে মনে হচ্ছে।
(২৮)
সারা বাড়ি ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু সঞ্জনার চোখে ঘুম নেই। সে আজ তার ছোটবেলার অ্যালবাম খুলে বসেছে। তখন সে আর তার দাদা সন্দীপ বেশ ছোট। সিমুরালিতে তাদের সেই ছোট্ট বাড়ির সামনে বাগানে পেয়ারা গাছের ডালে একটা দোলনা বাঁধা ছিল। পাড়ার অনেক বাচ্চা সেই দোলনাতে দোল খেতে আসত। একটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে প্রায় রোজই আসত। তার মা আদর করে তাকে ডাকত ‘কণা’ বলে। কণার বাঁ-গালে একটা ছোট্ট তিল ছিল। কোজাগরী লক্ষ্মীপূজোর দিনে বাড়িতে বাড়িতে পূজো ও প্রসাদ বিতরণ করা হতো। এই সেই লক্ষ্মীপূজোর দিনেরই একটা ছবি। কণার বাবা তাঁর শখের ক্যামেরাতে তুলেছিলেন। ছোট্ট দুটি মেয়ে ফ্রক পরে একে অপরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। পিছনে সঞ্জনাদের বাগানের দোলনাটা দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট।
সঞ্জনার বাবার উপার্জন একটু বাড়তেই বেলুড়মঠের কাছে বাড়ি তৈরি করে চলে আসে তারা। কণার বাবাও স্ত্রী আর ছেলে-মেয়েকে নিয়ে কর্মসূত্রে অন্য কোথাও চলে গিয়েছিলেন সিমুরালি ছেড়ে। বহু বছর আর কোন যোগাযোগ ছিল না।
(২৯)
সঞ্জনা নিয়মিত টিভিতে নিউজ দেখে। এটা তার বহুদিনের অভ্যাস। যেদিন নিউজ চ্যানেলে ডায়মন্ড হারবারের কাছে একটা অল্পবয়সী মেয়ের মৃতদেহ উদ্ধারের খবর দেখানো হয়েছিল, ঝাপসা দেহের পাশে ইনসেটে তার মুখের ছবি দেখে চমকে উঠেছিল সঞ্জনা। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চেহারা পাল্টে গেলেও মুখ-চোখের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। এমনকি বামগালের সেই তিলটা পর্যন্ত স্পষ্ট।
সৌরভের ডায়েরির মধ্যেও ঠিক একই রকম ছবি দেখতে পেয়েছিল সে।
কিন্তু সৌরভের বাবা বিয়েতে সম্মতি দেননি বলেই কি তাদের বিয়ে হয়নি? নাকি এর পিছনে অন্য কোন কারণ ছিল?
ঘটনা যাই হোক নিজের ছেলেবেলার বান্ধবীর জীবন নিয়ে যারা এভাবে ছিনিমিনি খেলেছে তাদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত সঞ্জনার শান্তি নেই।
(৩০)
সঞ্জনার বাবা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন মেয়ে যদি স্বেচ্ছায় স্বামী-সংসার ছেড়ে আসে তবে তাতে তাঁর কোন সায় নেই। একজন আইনজ্ঞ পিতা কীভাবে সেই পুরোনো সংস্কারের বশবর্তী হয়ে নিজের মেয়েকে অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করতে বলেন সেটাই ভাবতে পারে না সঞ্জনা। তাকে মানসিকভাবে আরও শক্ত হতে হবে। সে কিছুতেই কোন অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করবে না।
সঞ্জনা আবার চাকরি খোঁজা শুরু করে। কিন্তু হয় তার মনের মতো হয় না, নাহলে তার কাজ কোম্পানির পছন্দ হয় না —এভাবেই চলতে থাকে বেশ কিছু দিন।
বাড়িতে কেউ তার সঙ্গে ভালো করে কথা বলে না একমাত্র সন্দীপ ছাড়া। তাই সঞ্জনা সারাদিন নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে থাকে। অনলাইনে একটা নতুন কোর্স করার চেষ্টা করে —'কন্টেন্ট রাইটিং কোর্স'। ইন্সটিটিউট দাবি করেছে ছ'মাসের এই কোর্স করলে তারাই জব দেখে দেবে।
(৩১)
লালবাজারে স্মৃতিকণা সরকারের মার্ডার কেসের তদন্তকারী অফিসার রঞ্জন বসু তাঁর নিজের টেবিলের উপর ফাইলটা খুলে বসেছেন। ফাইলের কাগজপত্র পড়ছেন আর একটা ডায়েরিতে নোট করছেন —
তেইশ বছরের তরুণী মেয়েটা বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছিল ৫ই ডিসেম্বর। ৬ই ডিসেম্বর মেয়েটির বাবা ও ভাই থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন। ৭ই ডিসেম্বর মেয়েটির মৃতদেহ পাওয়া যায় ডায়মন্ড হারবারে নদী-সংলগ্ন এলাকায়। পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট বলছে খুনিরা প্রথমে ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে খুন করে। আবার গুলিও করা হয়েছে মৃত্যুকে নিশ্চিত করার জন্য। মেয়েটির বাঁ-দিকের পাঁজর ভেদ করে গুলিটা বেরিয়ে যায়। একজন মাঝি ৭ই ডিসেম্বর ভোরবেলা দেহটা দেখতে পেয়ে লোকাল থানায় খবর দিলে পুলিশ আসে। মেয়েটির বাবা থানায় এসে দেহ সনাক্ত করেন। কিন্তু তিনি মেয়ের কোন শত্রু থাকতে পারে বলে বিশ্বাস করেন না। এমনকি মেয়ের কারও সঙ্গে প্রেম ছিল কি না তাও জানেন না। পুলিশ তদন্তে নেমে প্রথমে গ্রেপ্তার করেছিল তিনজনকে যারা ঐ এলাকায় ভাড়াটে গুন্ডা হিসেবে কুখ্যাত। কিন্তু তারা কেউ অপরাধের মাস্টার মাইন্ড নয়। অন্য কোথাও মেয়েটিকে খুন করে ডায়মন্ড হারবারের নদীর ধারে ফেলে দেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশের অনুমান। লোকগুলো স্বীকার করেছিল যে তারা গাড়ি থেকে বডি নামিয়ে নদীর ধারে ঝোপের মধ্যে ফেলে আসে। তাদের কাছে একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এসেছিল। কাজের নির্দেশ। কাজটা করলে মোটা টাকা পাবে। এর বেশি তারা কিছু জানে না। ফোনের নির্দেশমতো নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দেখে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে একটা মেয়ের বডি শোওয়ানো আছে। গাড়িতে ড্রাইভার পর্যন্ত ছিল না।
কিন্তু কার নির্দেশে তারা সেই কাজ করেছিল তা এখনও স্পষ্ট নয়। আসল অপরাধী আজও ধরা পড়েনি। ভাড়াটিয়া খুনিদের বিরুদ্ধে লোয়ার কোর্ট কারাদণ্ড দিলেও পুলিশি তদন্তের ভার ন্যস্ত হয়েছে লালবাজারের দায়িত্বশীল অফিসারের উপর। আসল অপরাধীকে খুঁজে বের করতে হবে।
বেহালা থেকে মেয়েটি কার সঙ্গে কীভাবে ডায়মন্ড হারবারে গিয়েছিল সেটা নিয়েই ধন্দ। মেয়েটির কলেজে একটু খোঁজ নিতে হবে।
(৩২)
প্লেন ড্রেসে পুলিশ অফিসার যখন কলেজ প্রিন্সিপালের মুখোমুখি হলেন তখন প্রিন্সিপাল মহোদয়া খুব ভেবেচিন্তে উত্তর দিচ্ছিলেন তাঁর প্রতিটি প্রশ্নের।
—উনি কি ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী ছিলেন?
—হ্যাঁ।
—কী নিয়ে অনার্স করছিলেন?
—ফিলোজফি।
—পড়াশোনায় কেমন ছিলেন?
-বেশ ভালো।
—সবার সঙ্গে মিশতেন?
—হ্যাঁ। বেশ মিশুকে ছিল।
—কলেজে ওঁর কোন ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা বান্ধবী ছিলেন কি?
—ঠিক বলতে পারছি না। তবে বিদিশা নামে একটি মেয়ের সঙ্গে রোজ বাড়ি ফিরতে দেখা যেত।
—বিদিশার সঙ্গে কি একটু কথা বলা যেতে পারে?
—ফাইনাল পরীক্ষা তো হয়ে গেছে। তাই আর কলেজে আসছে না। তবে আপনি বললে তাকে কলেজে ডেকে পাঠাতে পারি।
—না না। কলেজে ডাকতে হবে না। বরং ওর বাড়ির ঠিকানা আর ফোন নম্বর দিন। আমি ওঁর বাড়ি গিয়ে দেখা করব।
—ঠিক আছে।
(৩৩)
রঞ্জন বসু পরের দিন দুপুরে বিদিশার বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন। কলিংবেলটা বাজাতেই বিদিশা নিজেই দরজা খুলল। রঞ্জন দেখল বাড়ির পোশাকের উপর একটা স্টোল জড়িয়ে মেয়েটি দরজা খুলেছে। আর তাতেই যেন মেয়েটিকে বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে।
একজন অপরিচিত ভদ্রলোককে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেয়েটি বেশ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল —
—কাকে চাই?
—শ্রীমতী বিদিশা মুখার্জি কি এই বাড়িতেই থাকেন?
—আমিই বিদিশা মুখার্জি।
—আমি রঞ্জন বসু। লালবাজার থেকে আসছি। এই হলো আমার আইডেন্টিটি কার্ড। আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই।
পুলিশের লোক দেখে মেয়েটি এমনিতেই ঘাবড়ে গেছে। তাই ঢোক গিলে বলল —
—কী জানতে চান?
—আমি কি একটু ভেতরে বসতে পারি?
—হ্যাঁ আসুন। খুব অনিচ্ছাসত্ত্বেও বলতে হলো বিদিশাকে।
বারান্দা থেকে উঠে ছোট্ট একটা বসার ঘর। খুব রুচিসম্মতভাবে সাজানো।
—বসুন। একটা সোফা দেখিয়ে দিল বিদিশা। রঞ্জন বসু আরাম করে বসলেন। বিদিশা ফ্যান চালিয়ে দিল।
—আপনি স্মৃতিকণা সরকার বলে কাউকে চিনতেন?
—হ্যাঁ। আমার সঙ্গে কলেজে পড়ত। আমি তো যা জানি সব বলেছি পুলিশকে।
—হ্যাঁ বলেছেন। কিন্তু তাও আরও কিছু জানতে চাই আপনার কাছে।
—স্মৃতিকণার সঙ্গে কোনও ছেলেকে মেলামেশা করতে দেখেছেন কি?
—হ্যাঁ। মানে মাঝে মাঝে দেখতাম একটা ছেলের গাড়ি চেপে ও চলে যেত। তবে কলেজ থেকে বেরিয়ে অনেকটা দূরে গিয়ে তার গাড়িতে উঠত।
—কী গাড়ি?
—সুইফট বোধহয়।
—কী কালার?
—ব্ল্যাক।
—গাড়ির নম্বরটা কখনও খেয়াল করেছেন কি?
—না। তবে শেষে বোধহয় সিক্স জিরো।
—ছেলেটির ব্যাপারে আপনাকে কখনও কিছু বলেছে?
—হ্যাঁ। মনে পড়ছে একবার বলেছিল, ওর প্রেমিক সরকারি চাকরি করে। আর ছেলেটার বাবা ওর সঙ্গে ছেলেটির সম্পর্ক মেনে নিতে পারছেন না।
—আর কিছু বলেনি?
—বলেছিল ওরা রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করবে।
—ধন্যবাদ। আপনার ইনফরমেশন অনেক কাজ দেবে বলে মনে হচ্ছে।
রঞ্জন বসু উঠে পড়লেন সোফা ছেড়ে।
(৩৪)
ম্যারেজ রেজিস্টার বিকাশ ভট্টাচার্য সমস্ত রেকর্ড ঘেঁটে একটা ফর্ম বের করলেন।
—স্যার, এই দেখুন। এইটা শ্রীমতী স্মৃতিকণা সরকারের সই, আর এটা হচ্ছে শ্রীযুক্ত সৌরভ দত্তের সই। মানে ওঁরা বিয়ের নোটিশ দিয়েছিলেন স্যার। বিয়েটা আর হয়নি।
—বিয়েটা হয়নি কেন?
—তা তো জানি না। এরকম অনেকেই নোটিশ দিয়ে আর বিয়ে করতে আসে না। আমরা ফোন করি। ফোন না ধরলে নির্দিষ্ট তারিখ অবধি অপেক্ষা করি তারপর নোটিশটা ডিসপোস অফ ফাইলে চলে যায়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
—হুম। আপনি এই নোটিশের একটা কপি আমাকে দিতে পারেন?
—নিশ্চই। এই পটল, এদিকে আয়। এটার একটা জেরক্স করে স্যারকে দে।
পটল ছেলেটির নামটা সার্থক বলে মনে হলো রঞ্জন বসুর। বছর তিরিশ বয়সের ছেলেটির মাথা ও পায়ের দিকের তুলনায় মধ্যপ্রদেশটি বেশ স্ফীত। রঞ্জন বসু মনে মনে হাসলেন। ছেলেটি অতি দ্রুত নোটিশের এক কপি জেরক্স নিয়ে এসে রঞ্জন বসুর সামনে টেবিলের উপর রাখল।
(৩৫)
ম্যারেজ রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বেরিয়ে রঞ্জন বসু একটা গাড়ি মেরামতের সার্ভিস সেন্টারে গিয়ে হাজির হলেন। সেখানে ম্যানেজারকে নিজের পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন —
—আচ্ছা বলতে পারেন এই নম্বরের গাড়িটি কখনো সার্ভিস করেছেন কিনা?
—হ্যাঁ। অনেকবার। তবে শেষ চার পাঁচ মাস আর আসেনি আমাদের সার্ভিস সেন্টারে। কে যেন বলেছিল গাড়ির মালিক গাড়িটা বিক্রি করে দিয়েছে।
—কে নিয়ে আসত গাড়িটা?
—ড্রাইভার নিয়ে আসত।
—তার ফোন নম্বর আছে?
—না স্যার। অত খেয়াল রাখা যায় না।
—গাড়িটা কার নামে ছিল?
—রেকর্ড চেক করে বলছি স্যার।
একটা ছেলে রেকর্ড চেক করে বলল—
—স্যার, এই গাড়িটা ছিল মনোরমা দত্তের নামে।
—ঠিক আছে। অনেক ধন্যবাদ।
(৩৬)
রাধেশ্যাম ছপ্পরওয়াল গদি থেকে বেরিয়ে অপরিচিত ভদ্রলোককে মোটা চশমার কাঁচের ভেতর থেকে ভালো করে জরিপ করলেন।
—আমার সঙ্গে কোথা আছে? কী কোথা বলবেন? বিজনেসের কোথা?
—না। কয়েকটা দরকারি কথা।
—দোরকারি কোথা? কী দোরকারি? আমার কিন্তু য্যাদা টাইম নাই।
—আমিও বেশি সময় নেব না। শুধু কয়েকটা প্রশ্ন করব।
—আপনার পোরিচয়?
রঞ্জন বসু তাঁর আইডেন্টিটি কার্ডটা দেখালেন। সেটা দেখে রাধেশ্যামবাবুর মুখের চেহারাটা পুরো পাল্টে গেল।
—ইধর আসেন স্যার। আমার চেম্বারে আসেন।
ছোট্ট একটা ঘর। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত। ভেতরে বেশ ভালোই ঠান্ডা। গদি আঁটা তিনটি চেয়ার। কাঁচের টেবিলের ওপাশে একটা, সেটা রাধেশ্যামবাবুর। আর বাকি দুটো টেবিলের এপাশে। ভেতরে ধূপ-ধুনো-কর্পূর ও রজনীগন্ধা মিশ্রিত একটা সুগন্ধ। রাধেশ্যামবাবুর বাঁদিকে দেওয়ালের ধার ঘেঁষে আর একটা ছোট্ট টেবিলের উপর শ্বেত পাথরের গণেশের মূর্তি। মূর্তির গলায় একটা রজনীগন্ধার মালা। সুগন্ধটা আসছে সেদিক থেকেই।
রাধেশ্যামবাবু চেয়ারে বসে একটা বেল টিপলেন। সঙ্গে সঙ্গে একটা লোক দরজা ঠেলে মুখ বাড়ালো।
—দো গ্লাস সরবত লাও।
—না না। আমি সরবত-টরবত খাব না।
—কী যে বলেন স্যার! হামার গদিতে এসেছেন, আর সরবত খাবেন না সে কি হয়? এক গ্লাস পী লীজিয়ে স্যার! প্লীজ।
সরবতের গ্লাস এসে গেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বেশ ভালো হবে। রঞ্জন একটু চুমুক দিয়ে দেখল দারুণ খেতে। মোটা করে জ্বাল দেওয়া দুধকে বরফ মিশিয়ে ঠান্ডা করে তাতে খোয়া ক্ষীর, লাল চেরি ও কাজুবাদাম এবং কিশমিশ মেশানো হয়েছে।
—হাঁ বলিয়ে আপ ক্যায়া বোলনা চাহতে হ্যায়?
—এই নম্বরের গাড়িটা আপনি কিনেছেন?
—হাঁ লিয়েছি। সুইফট গাড়ি। এক বাঙ্গালী বাবুর কাছ থেকে।
—কতদিন আগে?
—চার মাহিনা আগে। কেনো স্যার? কুছু প্রবলেম আছে? হামি কিন্তু জানি না স্যার। হামি পুরো টাকা মিটিয়ে দিয়েছি। আর রেজিস্ট্রেশনে নাম চেঞ্জ ভি করিয়ে লিয়েছি।
—আপনাকে কে বিক্রি করেছিল গাড়িটা?
—ঐ যে ভবানীপুরে দত্তবাবু আছেন না? বড়া বিজনেসম্যান।
—গাড়িটা ওনার স্ত্রীর নামে ছিল তাই তো?
—হাঁ স্যার।
—গাড়িতে কোন প্রবলেম ছিল? গাড়িটা বিক্রি করলেন কেন?
—না না। প্রবলেম কুছু ছিল না। আরে বড়লোকের খেয়াল মোশাই। গাড়ি কেনো বিক্রি করলেন জানি না।
—আপনি তো বাংলাটা খুব ভালো বলেন।
রাধেশ্যামবাবু খুশি হলেন।
—আরে কী বলেন স্যার। আমি তো এখানেই জন্মেছি। আমার পিতাজি মুঙ্গের থেকে এসেছিলেন।
রঞ্জন রাস্তায় বেরিয়ে এল। এপ্রিলের শেষ। বেশ গরম লাগছে।
(৩৭)
রঞ্জন হিসাব করে দেখলেন স্মৃতিকণা খুন হয়েছিল সাড়ে চার মাস আগে। তার মানে গাড়ি বিক্রির সঙ্গে এই খুনের কোন সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে। আরও খোঁজ খবর নিতে হবে।
ভেহিকেল ডিপার্টমেন্টে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য হিমেশ নেওয়ারকে ফোন করলেন। গাড়ির পূর্বতন চালককে খুঁজে বের করতেও হবে। রঞ্জন একজনকে ফোন করে বললেন,
—রুবেল, ভবানীপুরে রাজশেখর দত্তের বাড়ির ড্রাইভারদের ব্যাপারে খোঁজ নাও। কেউ কয়েক মাসের মধ্যে কাজ ছেড়েছে কি না সেটাও জেনে বলবে।
—হ্যাঁ স্যার। আর স্যার ঐ কেসটা মানে ডায়মন্ড হারবারে মেয়েটার বডি পাওয়া গেল... ওনার বাবা ও ভাইয়ের খোঁজ পেয়েছি স্যার। এখন অন্য জায়গায় আছে।
—কোথায় আছে?
—বেলেঘাটা বিল্ডিং মোড়ের কাছে একটা বাড়িতে। বোধহয় কোন আত্মীয়ের বাড়িতে হবে। ঐ মেয়েটা মারা যেতে ওরা শক পেয়েছে খুব।
—হুম। বুঝেছি। ওদের উপরেও নজর রেখো। কেউ ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে কি না সেটা দেখো।
(৩৮)
সঞ্জনা শ্বশুড়বাড়ি ছেড়ে চলে আসার পর সৌরভরা তার সঙ্গে আর কোন যোগাযোগ রাখেনি। সৌরভ তার বিরুদ্ধে চারিত্রিক দোষ দিয়ে ডিভোর্সের মামলা দায়ের করতে চেয়েছিল। কিন্তু ব্যারিস্টার মিত্র বারণ করেছেন। তিনি আপোষে মিটিয়ে নিতে বলেছেন। সৌরভরা সেই চেষ্টাই করেছে।
রাজশেখর দত্ত নিজের ব্যবসা নিয়ে মশগুল। বাড়িতে তাঁকে প্রায় দেখতেই পাওয়া যায় না। ছেলের সঙ্গে যাতে দেখা না হয় তিনি সর্বদাই সে চেষ্টা করেন।
মনোরমা নিজের সংসারের কাজ নিয়ে আগের থেকে আরো বেশি ব্যস্ত থাকেন। আজকাল সৌরভের সঙ্গে মা ও ছেলের কথোপকথন খুব কম হয়।
সৌরভের মদ্যপান ও ক্লাবে সময় কাটানোর পরিমাণ আরও বেড়েছে। আজকাল সে আর ডায়েরিও লেখে না।
(৩৯)
রুবেল ফোন করে রঞ্জন বসুকে বলল—
—স্যার, দত্তবাবুরা প্রায় চার মাস আগে একটা ড্রাইভারকে ছাড়িয়ে দিয়েছে। সে কোথায় গেছে তা কেউ জানে না। দত্তবাবুরা নাকি সবাইকে বলেছে সে দেশে চলে গেছে।
—লোকটার নাম কী? দেশ কোথায় সেটা খোঁজ নাও।
—বাড়ির দারোয়ান আর ড্রাইভারেরা কেউ কিছু বলতে চাইছে না।
—সেই জন্যই তো তোমাকে দায়িত্ব দিয়েছি। মুখ খোলাতে হবে।
—ঠিক আছে স্যার। দেখছি।
—দেখছি নয় রুবেল। এটা তোমাকে করতেই হবে। দরকার হলে খোঁজ খবর নিয়ে তুমি সেই ড্রাইভারের বাড়ি চলে যাও।
—আচ্ছা স্যার।
(৪০)
সৌরভ রাতে বাড়ি ফিরে দেখল তার টেবিলের উপর একটা খাম পড়ে আছে। কোর্টের সমন। আগামী ৩০শে মে তাকে কোর্টে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে। সৌরভ সঙ্গে সঙ্গে ব্যারিস্টার মিত্রকে ফোন করল। তিনি বললেন,
—খামসমেত নোটিশটা নিয়ে আমার কাছে চলে এসো।
সৌরভ সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল। গাড়িতে ব্যারিস্টার মিত্রের বাড়ি পৌঁছতে মিনিট চারেক সময় লাগে। তিনি নিজের লাইব্রেরিতে বসে চুরুট টানতে টানতে কোন একটা ব্রিফ পড়ছিলেন। সৌরভকে দেখে বললেন,
—এসো এসো। বসো। কফি খাবে?
—খেতে পারি।
—এই রামু, দু'কাপ কফি দিয়ে যা তো।
তারপর ব্যারিস্টার মিত্র বললেন,
—মনে হচ্ছে এই মার্ডার কেসে তোমাকে ওরা সাসপেক্ট হিসেবে ডেকেছে। যেতে তো তোমাকে হবেই। কিন্তু খুব ভেবেচিন্তে উত্তর দেবে। আর পুরো ঘটনাটা আমাকে খুলে বললে একটু সুবিধা হয়।
(৪১)
হাইকোর্টে স্মৃতিকণা হত্যা মামলার সাক্ষী গ্রহণ পর্ব শুরু হয়েছে। প্রথম সাক্ষী একজন দোকানদার যিনি ৪ঠা ডিসেম্বর বিকেলে স্মৃতিকণাকে রবীন্দ্র সরোবরের সামনে থেকে একটা গাড়িতে উঠতে দেখেছিলেন। তাঁর এই জন্য স্মৃতিকণাকে মনে আছে কারণ সে তাঁর দোকানে গিয়ে মোবাইল রিচার্জ করতে চেয়েছিল। তিনি তিনশো পঁচিশ টাকার একটা প্ল্যান রিচার্জ করে দিয়েছিলেন। সরকারি আইনজীবী তাঁকে প্রশ্ন করেন,
—যে গাড়িতে আপনি স্মৃতিকণা সরকারকে উঠতে দেখেছিলেন সেটা কী গাড়ি ছিল বলে আপনার ধারণা?
—মনে হচ্ছে সুইফট।
—কী রঙের গাড়ি ছিল?
—কালো।
—গাড়ির নম্বরটা কি আপনার খেয়াল আছে?
—না।
—গাড়িতে ক'জন ছিল?
—শুধু ড্রাইভার।
—স্মৃতিকণা সরকার গাড়িতে উঠে সামনের সিটে বসে ছিলেন না কি পিছনের সিটে?
—পিছনের।
—ঠিক আছে। আপনি যেতে পারেন।
তারপর জাজের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন,
—মাননীয় ধর্মাবতার, উনি যে মোবাইল ফোনটার কথা বললেন সেটা কিন্তু স্মৃতিকণা সরকারের বডির আশেপাশে কোথাও পাওয়া যায়নি।
—লোকেশন ট্রাক করা হয়েছে?
—হ্যাঁ ধর্মাবতার। এই যে সেই রিপোর্ট।
—জমা দিন।
(৪২)
এর ঠিক পরেই সৌরভকে ডাকা হল। বাদী পক্ষের আইনজীবী জিজ্ঞেস করলেন,
—আচ্ছা সৌরভবাবু আপনাদের বাড়িতে তো স্মৃতিকণা সরকারের যাতায়াত ছিল তাই না?
—মাত্র একবার এসেছিল।
—তিনি কি আপনাদের কোন আত্মীয়া?
—না। বন্ধু।
—বন্ধু? কার বন্ধু?
—আমার।
-তা কীভাবে আপনাদের বন্ধুত্ব হয়েছিল? যদি একটু বলেন।
—বইমেলাতে।
—কোন বইমেলাতে?
—২০১৯-এর কলকাতা বইমেলাতে।
—আপনি বই পড়তে খুব ভালোবাসেন বুঝি?
—আগে সময় পেতাম।
—ও আচ্ছা। আর স্মৃতিকণা? তিনিও বই পড়তে খুব ভালবাসতেন?
—জানি না। তবে বই পড়তে খুব ভালো না বাসলেও অনেকেই বইমেলাতে যায়।
—আপনার বান্ধবী বই পড়তে ভালবাসতেন কি না আপনি জানেন না? তবে মাঝে মাঝে তাঁকে কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসে দেখা যেত। সঙ্গে বোধহয় আপনিও থাকতেন। কি ভুল বললাম?
—দু’-একবার গিয়েছি।
—আচ্ছা। তা কফি হাউসের সেই বান্ধবীকে নিয়ে মাঝে মাঝে আপনি তো লং ড্রাইভেও যেতেন, তাই না?
—নো, নেভার!
—কিন্তু রেকর্ড তো অন্যরকম কথা বলছে সৌরভবাবু। আপনি ১০ই অক্টোবর স্মৃতিকণা সরকারকে সঙ্গে নিয়ে দীঘা গিয়েছিলেন। যে হোটেলে আপনারা উঠেছিলেন সেই হোটেলের রেজিস্টারে আপনার সই রয়েছে। সেখানে স্মৃতিকণা সরকারের পরিচয় দিয়েছেন নিজের স্ত্রী হিসেবে। সেই হোটেলে আপনাদের আধার কার্ডের কপিও জমা করেছিলেন। মনে পড়ছে নিশ্চয়ই?
ঠিক সেই সময়ে ব্যারিস্টার মিত্র বলেন,
—অবজেকশন ইয়োর অনার। আমার মক্কেলকে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে। তাকে দিয়ে জোর করে মিথ্যে অভিযোগ স্বীকার করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
—অবজেকশন ওভার রুলড। প্লিজ প্রসিড।
বাদী পক্ষের আইনজীবী আরও জেরা করতে লাগলেন সৌরভকে।
—সৌরভবাবু, স্মৃতিকণা সরকারের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে তিনি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। আপনি এ ব্যাপারে কিছু জানেন কি?
—না, আমি জানি না। তবে এটুকু জানি যে ওর চারিত্রিক দোষ ছিল। আর আমিও সে কারণেই ওর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা বন্ধ করে দিই।
—ওনার চারিত্রিক দোষের কথা জানতে পেরে যোগাযোগ রাখা বন্ধ করে দেন না কি নিজের দোষ স্বীকার করতে ভয় পেয়ে যোগাযোগ রাখতে চাইছিলেন না?
ব্যারিস্টার মিত্র আবার বলে উঠলেন,
—অবজেকশন ইয়োর অনার। এভাবে কাউকে দিয়ে জোর করে কোন মিথ্যা অভিযোগ স্বীকার করিয়ে নেওয়া যায় না।
—অবজেকশন ওভাররুলড।
বাদী পক্ষের আইনজীবী আবার বলতে থাকেন —
—কী হলো সৌরভবাবু? আপনাকে স্মৃতিকণা সরকার কি বলেছিলেন তাঁর কুমারী মাতৃত্বের কথা?
—না, আমি এ ব্যাপারে কিছু জানি না।
—মাননীয় ধর্মাবতার, সৌরভবাবু মিথ্যা কথা বলছেন। উনি জানতেন ওনার বান্ধবী আই মিন স্মৃতিকণা সরকার অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছেন এবং তার প্রমাণ মিলেছে এই চিঠি থেকে। সম্ভবত এটিই তাঁর শেষ চিঠি। চিঠিটা কোর্টে প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা হলো।
সৌরভের বুক ঢিপ ঢিপ করছে! এটা কোন চিঠি? স্মৃতিকণা তাকে লিখেছিল? সে চিঠি উকিলবাবু পেলেন কী করে?
(৪৩)
আবার প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হল।
—সৌরভবাবু, আপনি যে গাড়ি করে মাঝে মাঝে ভ্রমণে যেতেন সেটার শেষ চার ডিজিট কি সেভেন ফোর সিক্স জিরো?
—হ্যাঁ।
—হঠাৎ সেই গাড়িটা আপনারা বিক্রি করে দিলেন কেন?
—আমি ঠিক জানি না। এ ব্যাপারে আমার বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে গাড়িটা খুব ডিস্টার্ব করছিল। অনেকবার সার্ভিস সেন্টারে পাঠানো হচ্ছিল।
—ঐ গাড়ির পরিবর্তে আর কোন নতুন গাড়ি কিনেছেন?
—না। এখনও পর্যন্ত কেনা হয়নি।
—তাহলে আপনাদের অসুবিধা হচ্ছে না?
—না। আমাদের আরও দুটি গাড়ি আছে।
—তা আপনাদের ড্রাইভারের সংখ্যাও নিশ্চয়ই তিনজন? মানে আগের গাড়ির ড্রাইভার সমেত?
ব্যারিস্টার মিত্র বলে উঠলেন,
—অবজেকশন ইয়োর অনার। এগুলো কী ধরনের আবোল তাবোল প্রশ্ন হচ্ছে বুঝতে পারছি না।
—অবজেকশন ওভাররুলড। মিঃ বন্দ্যোপাধ্যায় আপনি আপনার প্রশ্ন করে যেতে পারেন।
—ধন্যবাদ ধর্মাবতার।
বাদী পক্ষের আইনজীবী সৌরভকে জিজ্ঞেস করলেন,
—কী হলো সৌরভবাবু? আপনাদের ড্রাইভারের সংখ্যা ক'জন?
—আমি বুঝতে পারছি না এই কেসের সঙ্গে আমাদের ড্রাইভারের সংখ্যার কী সম্পর্ক।
—আছে সৌরভবাবু, আছে। আর সে জন্যই তো জিজ্ঞেস করছি।
—আপাতত দু'জন।
—দু'জন কেন? আপনাদের তিনটি গাড়ি ছিল আর দুজন ড্রাইভার?
—একজন ছেড়ে চলে গেছে।
—কেন? টাকাপয়সা নিয়ে কোন সমস্যা?
—সেটা আমি ঠিক জানি না। বাবা জানেন।
—গাড়ি চড়েন আপনি আর ড্রাইভার কেন চাকরি ছাড়ল সেটা জানা নেই আপনার? আশ্চর্য! তা ড্রাইভারের নাম এবং সে কোথায় থাকে এটা জানেন তো?
—ড্রাইভারের নাম রাজেশ। বোধহয় বিহারে বাড়ি।
—বোধহয় কেন বলছেন? ড্রাইভার নিয়োগের সময় আপনারা কোন ডকুমেন্টারি প্রুভ নেন না?
—হ্যাঁ। তবে সে সব আমার কাছে থাকে না।
—আচ্ছা। ঠিক আছে। আপনি এখন যেতে পারেন।
(৪৪)
ঠিক সেইসময়ে পুলিশ রাজেশকে নিয়ে কোর্টরুমে প্রবেশ করল। রাজেশকে বিহারের পাটনা থেকে ধরে আনা হয়েছে। তাকে উইটনেস বক্সে তোলা হলো। বাদী পক্ষের আইনজীবী তাকে জিজ্ঞেস করলেন,
—তোমার নাম কী?
—রাজেশ সিং।
—তুমি বেহালাতে মিঃ রাজশেখর দত্তের বাড়িতে ড্রাইভারের চাকরি করতে?
লোকটা চুপ করে আছে দেখে তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,
—কী হলো? উত্তর দাও। তুমি কি মিঃ রাজশেখর দত্তের বাড়িতে গাড়ি চালাতে?
—হ্যাঁ।
—কতদিন কাজ করেছ?
—পাঁচ বছর।
—হঠাৎ করে চাকরি ছাড়লে কেন?
-বাবু ছাড়িয়ে দিয়েছেন।
—কেন? তুমি কি কোন দোষ করেছিলে?
—না। আমি শুধু মাইনে বাড়াতে বলেছিলাম। তাতেই বাবু রেগে গিয়ে আমাকে গালি দেন। আমি কাজ ছেড়ে দিই।
—এইমাত্র তুমি বললে তোমাকে বাবু ছাড়িয়ে দিয়েছেন। আবার এখন বলছ তুমি নিজে ছেড়ে দিয়েছ —কোনটা ঠিক?
—আমি ছেড়ে দিয়েছি।
—তুমি বাবুর কোন গাড়ি চালাতে?
-সুইফট গাড়ি।
—ব্ল্যাক কালার?
—হ্যাঁ।
—গাড়ির লাস্ট ডিজিট সিক্স জিরো?
—হ্যাঁ।
—লাস্ট কবে গাড়িটা চালিয়েছিলে?
—মনে নেই।
—সেকি! কতদিন আগে কাজ ছেড়েছ?
—চার মাহিনা হো গ্যয়া।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
—ইয়োর মেমরি ইজ টু পুওর টু রিমেম্বর! মাত্র চার মাস আগের কথা মনে পড়ছে না?
—নেহি।
—লাস্ট যে দিন গাড়ি চালিয়েছিলে কে উঠেছিলেন তোমার গাড়িতে?
—মেরে কো কুছ ইয়াদ নেহি। হো সকতা সৌরভবাবু কো কহিপে লেকে গ্যয়া।
—ঠিক আছে । তুমি এখন যেতে পারো।
পুলিশ রাজেশকে ইন্টারোগেশনের জন্য নিয়ে গেল।
(৪৫)
সৌরভ বাইরে বেরিয়ে কাউকে মোবাইলে ফোন করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সে ফোন ধরছিল না। রঞ্জন বসু নিঃশব্দে তার পিছনে এসে দাঁড়ালেন। সৌরভ ভীষণভাবে অধৈর্য হয়ে উঠেছে। ফোনটা কে যেন ধরল না। শেষে রেগে গিয়ে সৌরভ নিজের গাড়ির দিকে রওনা দিল।
রঞ্জন বসু কাকে যেন ফোনে বললেন,
—ঐ লোকটাকে ফলো করো। হ্যাঁ হ্যাঁ, ব্লু স্ট্রাইপ শার্ট, কালো প্যান্ট। ব্যাকব্রাশ চুল।
সৌরভ বাড়ি ফিরতেই মনোরমা এগিয়ে এলেন। উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
—কোর্টে কী হলো রে?
—পরিস্থিতি ভালো না মা। হয়তো পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে!
—ওমা, কেন?
—পুলিশ সন্দেহ করছে মেয়েটাকে আমি বোধহয় খুন করেছি।
—সেকি!
—হ্যাঁ মা। আমাদের সেই ড্রাইভারটাকে বিহার থেকে ধরে এনেছে।
—কে? রাজেশ?
—হ্যাঁ।
—সে কী বলেছে?
—সে এখনও কিছু বলেনি। তবে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেছে। ইন্টারোগেট করবে। ওর বয়ানটা খুব ভাইটাল। যদি বেফাঁস কিছু একটা বলে বসে মুশকিল হয়ে যাবে।
—এসব ষড়যন্ত্র খোকা। বৌমাই করাচ্ছে বোধহয়। ঐ মেয়ে মহা শয়তান! আমাদের সংসারটা ছারখার করে দিতে চাইছে।
—মা, উত্তেজিত হয়ো না। তোমার শরীর খারাপ করবে। একটু শান্ত হও। বাবা বাড়ি ফিরুক। একটা কিছু উপায় বের করতেই হবে। আমি বাবাকে ফোন করছি।
(৪৬)
বেলেঘাটা বিল্ডিং মোড়ের কাছে একটা ছোটখাট একতলা বাড়িতে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে খাটের উপর বসে কিছুটা উদ্ভ্রান্তের মতো তাকিয়ে ছিলেন দরজার দিকে। একটি অল্পবয়সী ছেলে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তিনি পাগলের মতো জিজ্ঞেস করলেন,
—খোকন, বাড়ি এলি? ওদের শাস্তি হবে বাবা? যারা আমার কণা মাকে মেরেছে? ওদের শাস্তি হবে তো রে? কোর্টের জজ কী বলল রে?
পাশের ঘর থেকে একজন বয়স্কা বিধবা ভদ্রমহিলা ঘরে ঢুকে বললেন,
—দাদা, খোকনকে আগে একটু বিশ্রাম নিতে দাও। সকাল থেকে বড্ড ধকল গেছে ওর। আগে ওকে মুখহাত ধুয়ে কিছু খেতে দাও। পরে সব শুনোক্ষন।
ঠিক তখনই ঘরের ভেতরে জনা পাঁচেক লোক হুড়হুড়িয়ে ঢুকে পড়ল। ভদ্রমহিলা ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন,
—কে তোমরা?
লোকগুলোর মধ্যে একজন খোকন নামে ছেলেটার কলার চেপে ধরল।
—কালকের মধ্যে মামলা তুলে নিবি। নাহলে তোর লাস ফেলে দেব!
খোকন-সহ বাকিরাও তখন ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে। ভদ্রমহিলা দু'হাত জড়ো করলেন,
—আমি কথা দিচ্ছি বাবা মামলা তুলে নেব। শুধু ওকে কিছু করো না। ছেড়ে দাও।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে প্রচুর পুলিশ ঢুকে পড়ল ঘরের ভেতর। সামনেই রিভলভার হাতে রঞ্জন বসু। তার সঙ্গে অনেকজন সশস্ত্র পুলিশ। লোকগুলো মাথার উপর দু'হাত তুলে দিয়েছে। রঞ্জন বসুর নির্দেশে কয়েকজন পুলিশ লোকগুলোর কাছ থেকে অস্ত্রশস্ত্র কেড়ে নিল। তারপর তাদের হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিল।
(৪৭)
ঘন অন্ধকারে ঘরের মধ্যে একা বসে আছে সৌরভ। দুশ্চিন্তায় তার রাতের ঘুম উধাও হয়ে গেছে। যদিও ব্যারিস্টার কাকু আশ্বাস দিয়েছেন কেসটাকে সামলে নেবেন তিনি। কিন্তু সমস্যা তো বেড়েই চলেছে। সৌরভের হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছে। সঞ্জনার সঙ্গে বিয়ের আগেই সে কেন স্মৃতিকণার চিঠিগুলো ছিঁড়ে ফেলল না। ডায়েরি আর চিঠিগুলোর জন্যই সে আজকে বেকায়দায় পড়ে গেছে।
সৌরভ শুধু চিন্তা করছে তার কী অপরাধ ছিল? স্মৃতিকণা অন্তঃসত্ত্বা জানতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে সে তার বাবাকে জানিয়েছিল যে সে স্মৃতিকণাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু সৌরভের বাবা বলেছিলেন, “প্রেম আর বিয়ে এক জিনিস নয়। মেয়েটিকে বরং কিছু টাকাপয়সা দিয়ে বিদায় করো।”
—তার টাকাপয়সার লোভ নেই বাবা। সে আমাকে ভালবাসে।
—ওরকম ভালবাসা আমি অনেক দেখেছি। সে বড় গাছে নৌকা বাঁধার চেষ্টা করছে। তার এই সম্পত্তির উপর লোভ আছে বলেই সে তোমার সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় করছে।
মরিয়া হয়ে উঠে সৌরভ –
—বাবা সে এখন অন্তঃসত্ত্বা!
—কি? কী বললে? ছি ছি ছিঃ। আমি তোমার কাছ থেকে এরকমটা আশা করিনি। এই মুহূর্তে চলে যাও আমার সামনে থেকে।
সৌরভ বেরিয়ে আসে বাবার চেম্বার থেকে।
(৪৮)
পরের দিন সকালে পূর্ব পরিকল্পনা মতো সৌরভ লাইব্রেরীতে যায়, যেখানে তারা প্রায়ই যেত। কিন্তু সেখানে গিয়ে খুঁজে পায় না স্মৃতিকণাকে। কিছুক্ষণ পরে স্মৃতিকণার ভাই খোকন এসে একটা চিঠি দেয় সৌরভের হাতে। বলে, “দিদি আজ আসতে পারল না। ও কোথায় যেন যাবে।”
সৌরভ চিন্তা করতে থাকে। সেদিনই তার স্মৃতিকণার সঙ্গে কোথাও চলে যাওয়ার ব্যাপারে প্রোগ্রাম করবার ইচ্ছা ছিল। কারণ সে ভাল করেই জানে ওর বাবা এই বিয়ে মানবে না কিছুতেই। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে চিঠিটা খোলে সৌরভ।
চিঠিতে স্মৃতিকণা বার বার করে অনুরোধ করেছে সৌরভ যেন তার বাবাকে একটু বোঝায়। তিনি যেন ওদের বিয়েটা মেনে নেন। সেটাই স্মৃতিকণার শেষ চিঠি।
কিন্তু সৌরভের সঙ্গে দেখা না করে স্মৃতিকণা কোথায় গিয়েছিল? তারপর ডায়মন্ড হারবারে তার বডি পাওয়া গেল কীভাবে? সেটা নিয়ে আজও ধন্দে রয়েছে সে।
কিন্তু মামলা যেভাবে এগোচ্ছে তাতে ক্রমশ সৌরভের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সে শংকা ব্যারিস্টার মিত্রও উড়িয়ে দিতে পারছেন না। সবচেয়ে বড় চিন্তা রাজেশ কনফেশনে কী বলবে তার উপরে অনেক কিছুই নির্ভর করছে। সৌরভের শরীর ঘামে ভিজে উঠল। সিগারেটটা হাত থেকে মেঝেতে খসে পড়ল। স্লিপার দিয়ে নিভিয়ে দিল সে।
(৪৯)
বিনিদ্র রজনী কাটিয়ে সৌরভ সকালে ব্রেকফাস্টের সময় দেখল তার বাবা খুব গম্ভীর মুখে টেবিলে বসে আছেন। সাধারণত তাঁকে ব্রেকফাস্টের সময় টেবিলে দেখা যায় না। তিনি খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে মর্নিং ওয়াক সেরে বাড়ি ফিরে চা খান। তারপর স্নান সেরে ছাদের উপর ঠাকুরঘরে গিয়ে ঘন্টাখানেক পূজো-অর্চনা করে দোতলার খাবার ঘরে ভাত খেতে বসেন। খাওয়া সেরে সারাদিনের মতো ফ্যাক্টরীতে চলে যান। কিন্তু আজকে সম্ভবত সৌরভের সঙ্গে কথা বলার জন্যই তিনি ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসে আছেন। সৌরভ তাঁর উল্টো দিকের চেয়ারে বসল। সৌরভ নিজেই কথা বলল—
—গুড মর্নিং বাবা।
—মর্নিং।
রাজশেখর দত্ত এবার ছেলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
—আজ কি তুমি কোর্টে যাচ্ছ?
—হ্যাঁ। যেতে তো হবেই।
—মিত্র বলছিল কেসটা তোমার এগেনস্টে চলে যেতে পারে —কথাটা কি ঠিক?
—হ্যাঁ। বাদীপক্ষের উকিল যেভাবে জেরা করছে রাজেশকে, হয়তো কেসটা আমাদের এগেনস্টে যেতে পারে।
—টাকা খরচ করো। রাজেশকে টাকা দিয়ে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দাও। আর অন্য জায়গায় খরচ করতে হলেও করো।
—সে উপায় আর নেই বাবা। রাজেশ এখন পুলিশের হেফাজতে।
—ঠিক আছে । আজ কোর্টে আমিও যাব তোমার সঙ্গে। আমি তৈরি হয়ে নিচ্ছি।
রাজশেখর দত্ত কম কথার লোক। তিনি কথা শেষ করেই উঠে চলে গেলেন।
(৫০)
কোর্টে আজ ভীষণ ভিড়। সৌরভ লক্ষ করল আজ সঞ্জনা এবং তার দাদাও উপস্থিত রয়েছে কোর্ট রুমে। সৌরভ সঞ্জনার দিকে একবার তাকিয়েই মুখ ঘুরিয়ে নিল। স্মৃতিকণার বাবা এবং ভাইও এসেছে। সৌরভ সবচেয়ে অবাক হলো যখন দেখল সঞ্জনার বাবা কোর্টের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে নিজের মেয়ের দিকেও একবারের জন্য না তাকিয়ে সোজা অ্যাডভোকেটদের জন্য নির্দিষ্ট সিটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। রঞ্জন বসুর সঙ্গে একদল পুলিশ অফিসারকে রাজেশ সমেত আরও কয়েকজনকে নিয়ে ঢুকতে দেখা গেল। জজসাহেব সিটে বসতেই ব্যারিস্টার মিত্র সৌরভের পক্ষে সওয়াল করতে শুরু করলেন কিন্তু বাদীপক্ষের আইনজীবীর হাবভাবের মধ্যে একটা আলাদা রকমের কনফিডেন্স দেখা গেল।
ব্যারিস্টার মিত্র বললেন,
—আমার মক্কেল একজন সম্মানীয় ব্যক্তি। তিনি যথেষ্ট জ্ঞানীগুণী এবং সমাজে তাঁর ও তাঁর পিতার খুবই সুনাম আছে এবং তা নষ্ট করার জন্য চক্রান্ত চলছে। তাই তাঁকে বার বার এই কোর্টে ডেকে আনা হচ্ছে যদিও এই কেসের সঙ্গে তাঁর বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। মহামান্য ধর্মাবতার—কারো সঙ্গে কারো পরিচিতি বা বন্ধুত্ব থাকার মানেই সে তাকে খুন করতে পারে এমন ভাবনাটা নিতান্ত বালকসুলভ।
এবার বাদীপক্ষের আইনজীবী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
—আমার লার্নেড ফ্রেন্ডকে জানাতে চাই যে শুধুমাত্র বালকসুলভ সন্দেহের বশবর্তী হয়েই তাঁর সম্মানীয় মক্কেলকে এখানে ডেকে আনা হয়নি। তিনি
যে অন্যায় করেছেন তার যথেষ্ট প্রমাণ আছে এবং একে একে তা মাননীয় ধর্মাবতারের সামনে পেশ করা হবে। একটু ধৈর্য ধরুন।
ব্যারিস্টার মিত্র চিৎকার করে উঠে বললেন,
—সমস্ত মিথ্যা। মিথ্যে প্রমাণ দাখিলের চেষ্টা চলছে। আমার মক্কেলকে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে মাননীয় ধর্মাবতার।
ধর্মাবতার বললেন,
—আগে প্রমাণ দাখিল হোক। তারপর ভেবে দেখা হবে যে সেটা ভুল না ঠিক।
বাদীপক্ষের আইনজীবী একটি আংটি ও তার বিল প্রমাণ হিসেবে দাখিল করলেন।
—মহামান্য আদালত, এই আংটি স্মৃতিকণা সরকারের বাড়ি থেকে পাওয়া গেছে। সঙ্গে এই বিলটিও যেখানে সৌরভবাবুর নাম রয়েছে। বিলের তারিখ ৯ই অক্টোবর। অর্থাৎ যেদিন সৌরভবাবু স্মৃতিকণা সরকারকে নিয়ে দীঘা বেড়াতে যান ঠিক তার আগের দিন এই আংটি কিনেছিলেন সৌরভবাবু। কি সৌরভবাবু ঠিক বললাম তো?
সৌরভ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। ব্যারিস্টার মিত্র উঠে একবার বিলটি দেখার চেষ্টা করলেন।
(৫১)
ঠিক সেই সময়ে রাজেশকে নিয়ে পুলিশ কোর্টরুমে প্রবেশ করল। তাকে উইটনেস বক্সে তোলা হলো। সে উঠতেই বাদী ও বিবাদী পক্ষের দু'জন আইনজীবীই এগিয়ে এলেন।
প্রথমে বাদী পক্ষের আইনজীবী রাজেশকে জিজ্ঞেস করলেন,
—তুমি সেদিন বলেছিলে তোমার গাড়িতে শেষ দিন কে উঠেছিল তোমার মনে পড়ছে না। আজকে কি মনে পড়ছে?
রাজেশ আমতা আমতা করছে দেখে বাদীপক্ষের আইনজীবী বললেন,
—দেখো, মাননীয় ধর্মাবতারের সামনে ভুল বললে কিন্তু মারাত্মক অপরাধ হবে। তোমার জেল, জরিমানা কেউ আটকাতে পারবে না।
এবার লোকটা একটু যেন থমকে গেল। তারপর বলল,
—উস দিন এক ম্যাডাম গয়ি থি।
—এক ম্যাডাম? বাঙ্গালী না অবাঙ্গালী?
—বাঙ্গালী।
—ম্যাডামের নাম জানো? কোথা থেকে গাড়িতে উঠেছিলেন?
—নাম মালুম নেহি। লেকিন ম্যাডাম কো রবিন্দর সরোবর সে উঠায়া থা।
—কে তোমাকে ম্যাডামকে গাড়িতে তুলতে বলেছিলেন? সৌরভবাবু?
—হাঁ।
—কোথায় নিয়ে যেতে বলেছিলেন?
—ফ্যাক্টরী মে।
—ফ্যাক্টরী? কোন ফ্যাক্টরী? কোথায় সেটা?
—উনকা পিতাজি কা। সোনারপুর মে।
—সোনারপুরে ফ্যাক্টরীতে কেন?
—মুঝে মালুম নেহি।
—এই ছবিটা দেখো। ম্যাডামকে কি এই রকম দেখতে ছিল?
—হাঁ হাঁ।
বাদীপক্ষের আইনজীবী বললেন,
—তুমি ম্যাডামকে সোনারপুরে ফ্যাক্টরীতে ক'টার সময় নিয়ে গিয়েছিলে? দেখো, সঠিক তথ্য দিলে হয়ত তোমার শাস্তি নাও হতে পারে।
—শাম কো। সাত কা আশপাশ।
—ফ্যাক্টরিতে যাবার পর তুমি কোথায় গেলে?
—ম্যায় তো বাহার মে থে। গাড়ি মে। লেকিন এক আদমি আকে মুঝে বোলা গাড়ি রাখকে চলা যাইয়ে।
—সে বলল আর অমনি তুমি গাড়ি রেখে চলে গেলে?
—উও বাবু কা আদমি হ্যায়।
—সেই লোকটাকে তুমি দেখলে চিনতে পারবে?
—হাঁ, জরুর।
পুলিশ কয়েকজন লোককে কোর্টরুমে নিয়ে এল। বাদীপক্ষের আইনজীবী জিজ্ঞেস করলেন,
—দেখো তো এদের মধ্যে সেই লোকটা আছে কি না?
—হাঁ হ্যায়। উও।
—মাননীয় ধর্মাবতার, এই লোকগুলো ভয় দেখিয়ে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিতে স্মৃতিকণা সরকারের আত্মীয়ার বাড়িতে গিয়ে হামলা করেছিল। পুলিশ সময় মতো না গিয়ে পৌঁছলে কোন একটা বড়সড় বিপদের সম্ভাবনা ছিল।
—কে পাঠিয়েছিল এদের?
—হুজুর আমাদের মাফ করে দিন! লোকগুলো হাতজোড় করল।
—তোমাদের পাঠিয়েছিল কে?
—ফোনে কথা হয়েছিল। কে বলেছিল জানি না হুজুর!
—মিথ্যে কথা বলো না। মাননীয় ধর্মাবতারের সামনে সব সত্যি কথা বলবে। ধমকে উঠলেন বাদী পক্ষের উকিল।
লোকটা আমতা আমতা করে বলল,
—সত্যিই জানি না হুজুর। বিশ্বাস করুন!
বিচারক বললেন,
—ওদের মোবাইল চেক করে দেখুন কোন ফোন থেকে কল এসেছিল।
রঞ্জন বসু একটা কল লিস্ট বিবাদী পক্ষের আইনজীবীর হাতে দিলেন।
—হুজুর, এই যে সেই কল লিস্ট।
—এই ফোনে ফোন করে দেখেছেন?
রঞ্জন বসু উত্তর দিলেন,
—হ্যাঁ হুজুর। ফোনটা সুইচ অফ। তবে আমরা ইনভেস্টিগেট করে দেখেছি সিমকার্ডটা মিস স্মৃতিকণা সরকারের নামে।
—সেকি! মৃতার ফোন থেকে কে কল করেছিল?
—সেটাই তো ইনভেস্টিগেট করেছি আমরা। টাওয়ার লোকেশন বলছে সেটা ভবানীপুরের যে এলাকা থেকে সেখানেই সৌরভবাবুর বাড়ি।
সবার নজর এখন সৌরভের দিকে। তাকে বেশ ঘামতে দেখা যাচ্ছে। ব্যারিস্টার মিত্র রাজশেখর দত্তের কানে কানে কিছু বললেন। এবারে রাজশেখর দত্তকেও কিছুটা বিচলিত বলে মনে হলো। তিনি বোধহয় কোন একটা আলোচনার জন্য বিচারকের কাছে সময় প্রার্থনা করতে বললেন।
কিন্তু বিচারক সময় নষ্ট না করে বললেন,
—ঘটনা পরম্পরা সৌরভবাবুর দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করছে। অতএব এই মামলায় তাঁকে আমি পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিলাম। পরবর্তী শুনানির দিন রিপোর্ট জমা দিতে হবে। কোর্ট ইজ অ্যাডজোর্নড টু-ডে।
(৫২)
বিচারপতি কোর্টরুম থেকে বেরিয়ে যেতেই চারদিকে একটা গুঞ্জন ধ্বনি শোনা গেল। সৌরভকে নিয়ে পুলিশেরা রঞ্জন বসুর সঙ্গে চলে গেল। রাজশেখর দত্ত ব্যারিস্টার মিত্রের সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন।
সঞ্জনা শুনতে পেল অনেকেই বলাবলি করছে,
—বড়লোকের বাড়িতে এরকম কেচ্ছাকাহিনী থাকে। তা বলে ধর্ষণ করে খুন? ছিঃ ছিঃ ছিঃ।
কে একজন বলল,
—আরে ঐ তো সৌরভ দত্তের স্ত্রী হেঁটে যাচ্ছে!
—সঙ্গের লোকটা বোধহয় ওর ল' ইয়ার।
—আরে স্বামীকে বাঁচাতে হবে তো!
—উঁহু, তুমি কিচ্ছু জানো না। ডিভোর্স হয়ে গেছে। ডিভোর্স।
—ঠিকই করেছে। ঐরকম স্বামীর সঙ্গে কেউ থাকতে পারে?
সঞ্জনা আর দাঁড়াল না। সে দ্রুত পায়ে সন্দীপের সঙ্গে কোর্টরুমের বাইরে আসতেই তাদের পিতার মুখোমুখি হলো। কিন্তু তিনি কোন কথা বললেন না। শুধু ঘাড় হেঁট করে এগিয়ে গেলেন।
সঞ্জনা সন্দীপের সঙ্গে গাড়িতে উঠল। সন্দীপ গাড়িতে স্টার্ট দিল। সঞ্জনা জানালার বাইরে তাকিয়ে বসে ছিল। স্ট্র্যান্ড রোড ধরে ছুটছে গাড়ি। লাল সিঁদুরের টিপের মতো সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সঞ্জনার চোখ দুটো হঠাৎ জলে ভরে গেল।
—সঞ্জু?
—হ্যাঁ, বল দাদা।
সঞ্জনা তাড়াতাড়ি চোখ মুছে নিল।
—কী ভাবছিস?
—দাদা, ওর কি ফাঁসি হতে পারে?
—এখনও তো ও অপরাধী বলে প্রমাণ হয়নি।
—কিন্তু সন্দেহের তীর তো ওর দিকেই যাচ্ছে।
—সন্দেহ এক জিনিস আর প্রমাণ অন্য জিনিস।
—তাহলে বলছ যে সৌরভ ছাড়া পেলেও পেতে পারে?
—১০০%।
সন্দীপ কি তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে? সঞ্জনা আর ভাবতে পারছে না। হয়ত সৌরভ অপরাধ করেছে আবার নাও করে থাকতে পারে, তাহলে?
(৫৩)
ব্যারিস্টার মিত্র কোর্ট থেকে বাড়ি ফিরে পোশাক পরিবর্তন করে এক কাপ ব্ল্যাক কফি নিয়ে বসলেন। সৌরভের ব্রিফটাই তাঁর সামনে টেবিলের উপরে রাখা আছে। ঠিক তখনই বাড়ির কাজের লোক সনাতন এসে জানাল—
—দত্তবাবু এসেছেন।
—ভেতরে নিয়ে এসো।
রাজশেখর দত্ত তাঁর চেম্বারে ঢুকলেন।
ব্যারিস্টার মিত্র জিজ্ঞেস করলেন,
—কফি খাবে?
—আনতে বলো।
—সনাতন, আর একটা ব্ল্যাক কফি দিতে বলো। আর আমার চুরুটের বাক্সটা একটু দাও তো।
সনাতন টেবিলের ড্রয়ার খুলে চুরুটের বাক্স দিয়ে কফির জন্য বলতে গেল।
ব্যারিস্টার মিত্র মিস্টার দত্তকে জিজ্ঞেস করলেন,
—চুরুট নেবে?
—দাও।
চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে রাজশেখর দত্ত জিজ্ঞেস করলেন,
—কেসটা কোনদিকে গড়াচ্ছে বলে মনে হচ্ছে?
রাজশেখর দত্ত বললেন,
—সৌরভ মেন সাসপেক্ট হয়ে যাচ্ছে।
—তাহলে?
—প্রমাণগুলো যাতে ওর বিরুদ্ধে না যায় সে চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু অলরেডি যে ক'টা প্রমাণ দাখিল হয়েছে সবই ওর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছে।
—সৌরভকে বাঁচাতেই হবে!
—আমি তো সেই চেষ্টাই করছি। তুমি এত চিন্তা করো না।
—ঠিক আছে। আমি এখন উঠি। তবে মনে রেখো, যত টাকা খরচ হয় হোক, সৌরভকে বেকসুর খালাস করতেই হবে।
—ঠিক আছে । আমি দেখছি।
(৫৪)
সঞ্জয় অফিসে ঢুকতেই মহেন্দ্র মেটা তাকে চেম্বারে ঢেকে পাঠালেন। সঞ্জয় চেম্বারে ঢুকতেই তিনি ওর নতুন বানানো স্যুটের প্রশংসা করলেন।
—বাহ, সুন্দর দেখতে লাগছে তোমাকে! নতুন বানিয়েছ স্যুটটা?
—হ্যাঁ স্যার।
—বসো, বসো। প্রথমেই তোমাকে একটা সুখবর দিই। কোম্পানি তোমাকে একটা হ্যাচব্যাক গাড়ি দিচ্ছে। গাড়ির তেলের টাকা ও ড্রাইভারের মাইনে আপাতত কোম্পানিই দেবে। তবে তুমি যদি ড্রাইভিং শিখে নিতে পারো তাহলে আরও ভাল হয়।
—আমি ড্রাইভিং শিখে নেব স্যার। আজই কোনও কার ট্রেনিং সেন্টারের সঙ্গে কথা বলছি।
-গুড। ভেরি গুড। আর শোনো, আমাদের নতুন প্রোজেক্ট ফাইলটা স্বপনবাবুর থেকে নিয়ে নাও। একটু স্টাডি করো। আমি আগামীকাল সকালের মধ্যে তোমার থেকে ল্যান্ডের ডিটেইলস সহ ফিউচার প্রোজেক্টের সুবিধা-অসুবিধা এবং কত টাকা স্কোয়ার ফিট হতে পারে তার একটা নোট চাইছি। তাহলে কালকের ডাইরেক্টরস মিটিং-এ আমার আলোচনা করতে সুবিধা হবে।
সঞ্জয় "ওকে স্যার।" বলে বেরিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছিল। মহেন্দ্র মেটা হঠাৎ বললেন,
—সঞ্জয়, তুমি কি সঞ্জনার খবর জানো?
—না স্যার।
—সঞ্জনা এখন ডিভোর্সী। ওর হাসব্যান্ড একটা রেপ এন্ড মার্ডার কেসে সাসপেক্ট হয়ে এখন পুলিশের হেফাজতে।
—সে কি!
—হ্যাঁ। আমি গতকালই খবর পেলাম। আমাকে আমাদের ল'ইয়ার বাগচীবাবু বললেন।
সঞ্জয় আর দাঁড়াল না। তার মনটা ভয়ানক ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। সঞ্জনার কোনও ক্ষতি সে চায়নি, স্বপ্নেও না।
(৫৫)
রঞ্জন বসু মন দিয়ে রিপোর্ট দেখছেন। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে লেখা মৃত্যুর সময় সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ এবং মৃতদেহ পাওয়া গেছে সোনারপুর এলাকায় একটা লেকের ধারে। আর সৌরভের টাওয়ার লোকেশন বলছে ঐ সময়ে সে ভবানীপুর এলাকায় ছিল। অবশ্য একাধিক ফোন থাকতে পারে। রেপ কেসে যা কিছু মিলিয়ে দেখা হয় তাও সৌরভের সঙ্গে মিলছে না। তাহলে আসল অপরাধী কে? কার নির্দেশেই বা অপরাধী একাজ করেছিল? অথবা ভিক্টিমের উপরে কি তার কোন পুরোনো রাগ ছিল? নাহ, কিছুতেই হিসাব মিলছে না। ড্রাইভারটাকে আর একবার জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। আর ঐ লোকগুলোকেও যারা ভিক্টিমের আত্মীয়ের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ছিল।
রঞ্জন বসু চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন রাত ন'টা বাজে। ইস, গিন্নি আজ বেজায় চটে যাবে! তাড়াতাড়ি ফিরতে বলেছিল। আজ তাঁদের বিবাহবার্ষিকী। কত বছর হলো যেন? রঞ্জন বসু নিজের মনেই হেসে ফেললেন। তাঁর ড্রাইভার হরেন বেঞ্চে বসে ছিল। তাঁকে দেখে টপ করে মোবাইল ফোনটা পকেটে ভরে জিজ্ঞেস করল,
—স্যার, গাড়ি আনব?
—হ্যাঁ, তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো। আর কোন একটা শাড়ির দোকানের সামনে... না থাক, কেক আর মিষ্টি নেব। যখন বলব তখন গাড়ি থামাবে।
—আচ্ছা স্যার।
হরেন মুহূর্তে যেন মিলিয়ে গেল। গাড়ি নিয়ে আসতে তার মিনিট দুয়েকের বেশি লাগল না।
গাড়িতে বসতে না বসতেই রুবেল ফোন করল।
—স্যার, খবর আছে!
—কাল সকালে আমার কাছে চলে এসো।
—আচ্ছা স্যার। তাহলে এখন রাখি?
—তুমি এখন কোথায় আছো?
—স্যার আমি বি. বি. গাঙ্গুলি স্ট্রিটে আছি।
—দাঁড়াও। আমি ওদিকে যাচ্ছি।
তারপরে হরেনকে বললেন,
—বি. বি. গাঙ্গুলি স্ট্রিটে চলো।
—স্যার, বাড়ি যাবেন না?
—যা বলছি তাই করো।
—আচ্ছা স্যার।
(৫৬)
কেবিনের ভেতরটা আলো আঁধারি। টেবিলে মুখোমুখি দুটো লোক বসে আছে। রুবেল সুড়ুৎ করে চা-টা শেষ করে বলে,
—তাহলে স্যার, এবার আমি উঠি?
—হুঁ।
—রুবেলের কথা যদি ঠিক হয় তাহলে সন্দেহের তীর অন্য দিকে ঘুরে যাবে। কিন্তু প্রমাণ চাই তো?
আগামীকাল সকালে একবার ফাইল নিয়ে বসতে হবে। তারপর এক জায়গায় যেতে হবে।
রঞ্জন বসু চায়ের দাম মিটিয়ে বেরিয়ে এলেন।
ইস, অনেকটা দেরি হয়ে গেল। এখন যদি কেক, মিষ্টি আর ফ্লাওয়ার বোকে কিংবা শাড়ি নিয়ে বাড়ি ঢোকেন স্ত্রী রাগের চোটে কী শুনিয়ে দেবে তার ঠিক নেই। গাড়িতে উঠে রঞ্জন সিটে গা এলিয়ে দিলেন। বড্ড ক্লান্ত লাগছে!
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন খেয়াল নেই। হরেনের ডাকে ঘুম ভাঙ্গল।
—স্যার, বাড়ি এসে গেছে।
—ওহ। ঠিক আছে। আমার ব্যাগ আমি নিজেই নিয়ে যাচ্ছি। তোমাকে আর উপরে গিয়ে দিয়ে আসতে হবে না। অনেক দেরি হয়ে গেল তোমার!
হরেন "ঠিক আছে স্যার" বলে পিছন ফিরে মুখ টিপে হাসল। আসলে স্যার আজ বৌদির কাছে ঝাড় খাবে! তাই তাকে দোতলায় ব্যাগ পৌঁছে দিতে বারণ করল।
(৫৭)
আজ সৌরভের পক্ষে কোর্টে ব্যারিস্টার মিত্র যা সাবমিশন করলেন তা ধোপে টিকবে বলে মনে হলো না সন্দীপের। সঞ্জনা আজ কোর্টে আসেনি। সৌরভের সাজা শুনতে ভাল লাগবে না তার। যদি সব তথ্য-প্রমাণ সৌরভের বিপরীতে যায় তাহলে মাননীয় বিচারক তার বিরুদ্ধে কোনও কড়া সাজা শোনাবেন এটাই সকলের ধারণা। সঞ্জনা এখনও মন থেকে মেনে নিতে পারছে না যে সৌরভ এমন একটা ঘৃণ্য অপরাধ করতে পারে।
আজকে সঞ্জনার বাবাও এজলাসে উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন সৌরভের বাবা রাজশেখর দত্ত। কিন্তু রাজশেখর দত্তকে ভীষণ বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। কাঠগড়াতে দাঁড়ানো সৌরভকে ভয়ানক রকম হতাশ আর অস্থির দেখাচ্ছিল।
রঞ্জন বসুকে এজলাসে প্রবেশ করতে এবং বাদীপক্ষের আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেল। তিনি তাঁর কথা শুনে ঘন ঘন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতে লাগলেন।
ঠিক সেই সময়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে এজলাসে প্রবেশ করতে দেখা গেল সৌরভের মাকে। সঙ্গে বোধহয় বাড়ির কোন কাজের লোক। রাজশেখর দত্ত চমকে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর নীচু গলায় প্রশ্ন করলেন,
—তুমি এখানে কেন?
সৌরভের মা সেকথার কোন উত্তর না দিয়ে সোজা জজসাহেবের সামনে গিয়ে বললেন,
—হুজুর, আমি কিছু কথা বলতে চাই।
ব্যারিস্টার মিত্র তড়িঘড়ি ছুটে গেলেন সৌরভের মাকে থামানোর জন্য কিন্তু কোনও ফল হলো না। জজসাহেবের সম্মতি নিয়ে তিনি ততক্ষণে উইটনেস বক্সে উঠে পড়েছেন এবং বলতে শুরু করেছেন —
—মাননীয় ধর্মাবতার, এই সমস্ত ঘটনার জন্য আমি দায়ী। সম্পূর্ণভাবে আমি দায়ী এবং আমার ছেলে সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাই আমার বয়ান রেকর্ডের ব্যবস্থা করা হোক।
—আপনি বলুন কী বলতে চান। নির্ভয়ে বলুন।
জজসাহেবের নির্দেশে সৌরভের মা তাঁর বক্তব্য বলতে শুরু করলেন।
—মাননীয় ধর্মাবতার সেই দিনটা ছিল ৫ই ডিসেম্বর। আমি স্মৃতিকণাকে একজনের মাধ্যমে খবর পাঠিয়ে ছিলাম সে যেন এসে রবীন্দ্রসরোবরে আমার সঙ্গে দেখা করে। কারণ আমি আমার ছেলের ডায়েরি পড়ে জানতে পেরেছিলাম যে স্মৃতিকণা অন্তঃসত্ত্বা! আমি লোকলজ্জার ভয়ে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম। আর আমি এটাও জানতাম যে আমার স্বামী কিছুতেই এই সম্পর্ক মেনে নেবেন না। তাই স্মৃতিকণাকে আমি অ্যাবরশান করানোর প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু সে মেয়ে কিছুতেই তা মেনে নিতে রাজি হলো না। তখন বাধ্য হয়ে সৌরভের সঙ্গে দেখা করানোর নাম করে তাকে গাড়িতে করে আমাদের সোনারপুরের ফ্যাক্টরীতে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখি। যদি সে ভয় পেয়ে মুচলেকা দিতে এবং অ্যাবরশান করাতে রাজি হয়। কিন্তু সারা রাত আটকে থাকার পরেও সে একটুও দমল না। ৬ই ডিসেম্বর সকালে আবার গিয়ে হাজির হই সোনারপুরের ফ্যাক্টরীতে। তাকে জোর করতেই সে বার বার কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল যে সে আমার ছেলেকে ভালবাসে। আর তার সন্তানের পিতা আমার ছেলে! আমি তাকে সজোরে একটা চড় মারি এবং সে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। আমি আর আমার স্বামী ভয় পেয়ে যাই। নাকের কাছে হাত নিয়ে গিয়ে আমার মনে হয় সে আর নিঃশ্বাস ফেলছে না! তখন আরও ভয় পেয়ে যাই। আমাকে বাঁচানোর জন্য আমার স্বামী তার ফ্যাক্টরীর একজন বিশ্বস্ত লোককে বলে বডিটা নদীর ধারে ফেলে আসতে। কিন্তু মৃত্যুর পর তাকে কেউ রেপ করেছিল কিনা আমার জানা নেই। হুজুর, আমার ছেলে নির্দোষ। ওকে ছেড়ে দিন! আমাকে সাজা দিন। সব দোষ আমার।
জজসাহেব রঞ্জন বসুর দিকে তাকালেন। রঞ্জন বসু বললেন,
—হ্যাঁ হুজুর। উনি যা বলছেন তা ঠিক। তবে সৌরভবাবু রাজেশকে ছাড়িয়ে দিয়েছিলেন বলেই রাজেশ সেই রাগে বলেছিল সৌরভবাবুই স্মৃতিকণা সরকারকে রবীন্দ্র সরোবর থেকে সোনারপুরের ফ্যাক্টরীতে নিয়ে যেতে বলেছিল। যাতে সৌরভবাবু এই কেসে দোষী সাব্যস্ত হয়। রাজেশ পরে কনফেস করেছে। এই সেই রিপোর্ট।
—যিনি স্মৃতিকণার মোবাইল রিচার্জ করে দিয়েছিলেন তিনি বলেছিলেন স্মৃতিকণা একা ছিলেন গাড়িতে। এবং রাজেশও প্রথমে সে কথাই বলেছিল।
রঞ্জন বসু বললেন,
—হ্যাঁ হুজুর। প্রথমে স্মৃতিকণা একাই উঠেছিলেন গাড়িতে। তার একটু পরে উঠেছিলেন মনোরমা দত্ত। তাই প্রথমে যে দোকানদার মোবাইল রিচার্জ করেছিলেন তিনি স্মৃতিকণাকে একাই দেখেছিলেন। আর রাজেশ টাকার লোভে এবং চাকরি বাঁচানোর তাগিদে মিথ্যা বলেছিল। যদিও স্মৃতিকণা সরকারকে সে সোনারপুরের ফ্যাক্টরীতে তার বাবার নির্দেশে নিয়ে গিয়েছিল জানতে পেরেই সৌরভবাবুর সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয় এবং সৌরভবাবুই তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে।
—স্মৃতিকণার মোবাইল ফোন থেকেই তাঁর ভাইকে মামলা তুলে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
—সেটা করেছিল রাজশেখর দত্তের লোকজন যাদের আমরা আগেই ধরেছি। কনফেস করেছে তারাও।
—বেশ। মনোরমা দত্তকে পুলিশি হেফাজত ও সমস্ত রেকর্ড করা বয়ান এবং রিপোর্ট কোর্টে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে আজকের মতো মামলা স্থগিত রাখা হলো।
(৫৮)
রঞ্জন বসু সদলবলে কোর্ট ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ল রাজশেখর দত্ত ব্যারিস্টার মিত্রকে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছেন আর তিনি সবেগে মাথা নেড়ে বলছেন,
—এটা হতে পারে না। আমাকে আগে জানানো উচিত ছিল। এটা আপনারা ঠিক করলেন না।
রঞ্জন বসুকে দেখে রাজশেখর দত্ত থেমে গেলেন। ব্যারিস্টার মিত্রও সেই সুযোগে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।
রাজশেখর দত্ত একটু হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন তারপর নিজের গাড়ির দরজা খুলে উঠে পড়লেন।
আজ স্মৃতিকণার ভাই ও পিসি কোর্টে এসেছিল। তারা রঞ্জন বসুর দিকে এগিয়ে গেল।
সন্দীপ একবার তার ক্রিমিনাল ল'ইয়ার বন্ধু শিবশঙ্করের চেম্বারে গেল। প্রথিতযশা শিবশঙ্কর ঐ এজলাসে অন্য একটা মামলার জন্য উপস্থিত ছিল। সে সমস্ত মামলাটা নিরীক্ষণ করেছে। তার সঙ্গে একটু আলোচনা করার সুযোগ সন্দীপ ছাড়তে চাইল না। শিবশঙ্কর বলল,
—মামলাটা জটিল। এটা হতে পারে মনোরমা দত্ত সৌরভকে বাঁচাতে চাইছেন। সৌরভ তাঁর একমাত্র সন্তান। তাই তার অপরাধ ঢাকতে চাইছেন। আর সেটা খুব স্বাভাবিক। আবার এটাও হতে পারে তিনি সত্যিই স্মৃতিকণাকে খুন করেছেন এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে এবং সেটাও সৌরভকে বাঁচানোর জন্যে। কিংবা এর পিছনে অন্য কোনও কারণও থাকতে পারে। তবে...
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই শিবশঙ্করের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। শিবশঙ্কর ফোনটা ধরার আগে বলল,
—এক মিনিট ভাই।
ক্লায়েন্ট নিজেই ফোন করেছে। শিবশঙ্কর মন দিয়ে শুনল তার কথাগুলো। তারপর বলল,
—সমস্ত ডকুমেন্ট নিয়ে আমার চেম্বারে চলে আসুন। এখন একবার আসতে পারেন? আমি অবশ্য রাত্রি ন'টা পর্যন্ত আছি এখানে। এখনই আসছেন? আচ্ছা, আসুন।
ফোনটা কেটে দিয়ে বলল,
—এটা কার ফোন ছিল বলতো?
—তোমার নতুন ক্লায়েন্টের।
—সেটা কে? এইমাত্র যাদের আলোচনা হচ্ছিল সেই রাজশেখর দত্ত।
—তাহলে আমি এখন উঠি ভাই। আমাকে দেখলে তোমার ক্লায়েন্ট খুশি হবেন না।
—কেন?
—উনি আমার বোনের শ্বশুরমশাই। তবে আমার বোন এখন ডিভোর্সী।
—সেকি! যার বিয়েতে আমি নিমন্ত্রিত ছিলাম?
—হ্যাঁ ভাই । আমার ঐ একটাই বোন!
—তাহলে এই কেসটা কি আমার নেওয়া উচিত হবে?
—নিশ্চয়ই। তুমি একজন প্রফেশনাল ক্রিমিনাল ল'ইয়ার। তোমার তো এসব বাছাই করা চলবে না ভাই। আমি চলি। পরে তোমার সঙ্গে কথা হবে।
—আচ্ছা।
সন্দীপ তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল শিবশঙ্করের চেম্বার ছেড়ে।
(৫৯)
রঞ্জন বসু আজ সদলবলে রাজশেখর দত্তের সোনারপুরের ফ্যাক্টরীতে গিয়েছেন মনোরমা দত্তের বয়ান অনুযায়ী তদন্ত করতে। কিন্তু এতদিন পরে আর কী কী এভিডেন্স পাওয়া যেতে পারে? হয়তো পুরোটাই সাজানো ব্যাপার। আবার নাও হতে পারে। কিন্তু স্মৃতিকণা খুন হলেন কীভাবে? আর কে তাকে খুন করেছিল সেটা এখনো ধোঁয়াশা। যদিও মনোরমা দত্ত নিজের মুখে স্বীকার করছেন যে খুনটা তিনি নিজে করেছেন —কিন্তু সেটা কি সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য? তিনি কি খুনের মোটিভ নিয়েই স্মৃতিকণাকে গাড়িতে তুলে সোনারপুরের ফ্যাক্টরীতে নিয়ে গিয়েছিলেন? নাহলে তাকে নিজেদের বাড়িতে বা অন্য কোথাও ডেকে কথা বলেননি কেন? একজন মহিলার চড়েই স্মৃতিকণার মৃত্যু হয়েছিল? কিন্তু পোস্টমর্টেম রিপোর্টে পরিষ্কার লেখা আছে তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করে খুন করা হয়েছিল। রেপ করাও হয়েছিল? তাহলে? মনোরমা দত্তের বক্তব্য তিনি রেপের কথা জানেন না।
এসব নানা ধরনের প্রশ্ন রঞ্জন বসুর মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। গাড়ি ক্রমশ এগোচ্ছে বাসন্তী হাইওয়ের দিকে।
হঠাৎ রুবেলের ফোন এল।
—স্যার, একটা লোককে পেয়েছি স্যার। মনে হচ্ছে এ এই কেসটার ব্যাপারে কিছু জানে। আপনি না আসা পর্যন্ত একে আটকে রাখার চেষ্টা করছি।
—হ্যাঁ হ্যাঁ। অবশ্যই। ওকে চা-টা খাওয়াও। আমি যাচ্ছি।
—ওক্কে স্যার।
রুবেল মাঝে মধ্যে খুব স্মার্ট হয়ে উঠার চেষ্টা করে। ও যে একসময় ছিনতাইকারী ছিল তা এখন আর বোঝার উপায় নেই। একবার বেচারা ধরা পড়ে পাবলিকের মার খেয়ে মরে যেত। রঞ্জন বসু ওকে সেই অবস্থা থেকে বাঁচিয়েছিলেন বলে রুবেল তাঁর জন্য এত কিছু করে। অবশ্য তার জন্যে সে টাকাও পায় নাহলে তারই বা চলবে কী করে?
(৬০)
সোনারপুরে পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। যাতে পুলিশ বলে লোকে সন্দেহ করতে না পারে তার জন্য প্লেন ড্রেস এবং একটু মেকআপ রঞ্জন বসু ও তার সঙ্গীর চেহারা সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। রুবেল দূর থেকে রঞ্জন বসুকে দেখেই প্রথমে একটু থমকালো। তারপর তার ঠোঁটের কোণে সামান্য একটু হাসি ঝিলিক দিয়েই মিলিয়ে গেল। সে চায়ের দোকানের সামনের বেঞ্চ থেকে উঠে পড়ে দাম মিটিয়ে লোকটাকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে দিল।
রঞ্জন বসু একবারও রুবেলের দিকে তাকালেন না। চা-দোকানিকে জিজ্ঞেস করলেন—
—দাদা, মুখার্জিবাবুদের বাড়িটা কোন দিকে?
—মুখার্জিবাবু? মানে,বসন্তবাবুর কথা বলছেন?
—হ্যাঁ।
—ঐ তো সামনেই। এই রাস্তাটা ধরে চলে যান। প্রথমে ডান দিকে ঘুরবেন, তারপর বাঁ-দিকে ঘুরে স্কুলের কাছে।
রঞ্জন বসু এগিয়ে চললেন তাঁর সঙ্গীর সঙ্গে।
একজন খরিদ্দার দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল,
—ইনি কে হ'ন মুখার্জিবাবুদের?
—কে জানে! কোন আত্মীয় হতে পারে। আবার আজকাল ওনার মেয়ের বিয়ের দেখাশোনার জন্যেও লোকজন আসছে। কে অত খবর রাখছে?
রঞ্জন বসু তাঁর সঙ্গীকে নিয়ে রুবেলের থেকে অনেকটা দূরত্ব বজায় রেখে হেঁটে চললেন। রাস্তা কোথাও সরু হয়ে গলিপথ ধরেছে, আবার একটু চওড়া হয়েছে, আবার সরু হয়ে গলির বাঁকে মিলিয়ে গেছে । তবে ছোট ছোট বাড়িঘর আর সবুজ মাঠ, গাছগাছালি যেন কোন বইয়ের পাতায় ছবির মতো বাংলার পূর্ণ গ্রামীণ চিত্র।
এবার রুবেল আর তার সঙ্গী লোকটার সঙ্গে দূরত্ব কমে আসছে। রুবেল ভারী গল্প জমিয়েছে লোকটার সঙ্গে। তাই পিছনে কে বা কারা আসছে লক্ষ্যও করছে না। প্রায় রাজশেখর দত্তের ফ্যাক্টরীর কাছাকাছি এসে গেছে তারা। আর ঠিক তখনই লোকটা একবার পিছনে তাকাল। কী একটা আঁচ করেছে মনে হচ্ছে। লোকটা এবার "আসি ভাই" বলে দ্রুত চলে যাওয়ার চেষ্টা করতেই রুবেল তার হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। ঐ রোগা, সাধারণ চেহারাতেও তার হাত ধরার কায়দা দেখে কব্জির জোর মালুম হয়। রঞ্জন বসু আর তার সঙ্গী অফিসার ছুটে গিয়ে লোকটার সামনে দাঁড়ালেন।
—পালানোর চেষ্টা করো না। বরং যা যা প্রশ্ন করব তার ঠিক ঠিক জবাব দিলেই ইনাম মিলতে পারে।
লোকটা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল —
—বলুন, কী জানতে চান?
—এই মেয়েটাকে চেনেন?
স্মৃতিকণার ছবি দেখালেন রঞ্জনবাবু।
—ন না, মানে কখনও দেখিনি তো...
লোকটা তোতলাচ্ছে।
—ঠিক করে দেখে বলো। ভুল বললে ফাটকে পুরে দেব। সেখানে ধোলাই দিলে বেরিয়ে আসবে সব সত্যি কথা!
—আ-আ-মি সত্যি জানি না।
—একদম মিথ্যে বলবে না!
এবার লোকটা মরিয়া।
—বলছি তো আমি জানি না।
—ঠিক আছে। একে ভ্যানে তোলো। থানায় গিয়ে দেখছি এর কী ব্যবস্থা করতে হয়।
—না না। আমাকে ভ্যানে তুলবেন না। আমি বলছি, বলছি… কিন্তু এখানে না।
—ঠিক আছে। চলো। কোথায় যেতে চাও?
—ওদিকে একটা বাড়ি আছে। কেউ থাকে না।
লোকটা আঙুল তুলে দেখাল।
—বেশ। চলো, সেখানেই যাই। তবে কোনরকম চালাকির চেষ্টা করো না।
লোকটা বড় করে জিভ কাটল। বলল,
—মায়ের দিব্যি!
—থাক। আর মায়ের দিব্যি টিব্যি দিও না!
লোকটার সঙ্গে রঞ্জন বসু আর তাঁর অ্যাসিস্টেন্ট বাড়িটার জং ধরা মরচে পড়া গেট খুলে ভেতরে ঢুকলেন। রুবেল বাইরে পাহারায় রইল।
(৬১)
লোকটা বিড়ির ধোঁয়া ছেড়ে একটু গলাখাঁকারি দিয়ে বলল,
—বাবু, আপনেরা হলেন গিয়ে শহুরে মানুষ। গাঁ-গঞ্জের ব্যাপারটা একটু আলাদা। কোন বাড়িতে একটা ডবকা মেয়ে মানুষ যাতায়াত করলে ঠিক খবর ছড়িয়ে পড়ে।
রঞ্জন বসু একটু ধমকের সুরে বললেন,
—গল্প নয়। একদম সত্যি ঘটনাটা বলো।
—বলতেছি, বলতেছি। এট্টুন সুখটান টো লিয়ে লিতে দিন।
লোকটা অর্থাৎ গৌর যা বলল, তার সারমর্ম হচ্ছে স্মৃতিকণা নামে মেয়েটা অনেকবার এসেছে দত্তবাবুদের ফ্যাক্টরী সংলগ্ন বাগানবাড়িতে। এই লোকটা ঐ বাড়ির কেয়ারটেকার কাম মালী। বড়বাবু না থাকলে প্রায়ই ছোটবাবু মানে সৌরভবাবুর সঙ্গে আসত মেয়েটা। মেয়েটিকে দেখতে খুব সুন্দর ছিল। সবাই ভেবেছিল সৌরভবাবুর সঙ্গেই তার বিয়ে হবে। কিন্তু একদিন কী হলো কে জানে! মেয়েটা সৌরভবাবুর গাড়ি থেকে একা এসে নামল। বড়বাবু বাঘের মতো পায়চারি করছিলেন দোতলার বারান্দায়। মেয়েটা থরথর করে কাঁপছিল। বড়বাবুর হুকুমে গৌর দোতলার একটা ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল স্মৃতিকণাকে। বন্ধ দরজার ভিতর থেকে মাঝে মাঝে প্রবল ধমকানির শব্দ শুনতে পেয়েছে সে। কিন্তু কী কী কথা হয়েছে সঠিকভাবে তা জানে না সে।
গৌরকে আরো চেপে ধরলেন রঞ্জনবাবু। সে এবার আমতা আমতা করে সব কথাই বলে ফেলল।
স্মৃতিকণাকে বড়বাবু কী বলছেন সে কথা শোনার কৌতূহল চাপতে পারেনি সে। ভেতরে দিকের দরজায় কান লাগিয়ে সে শোনার চেষ্টা করেছিল।
বড়বাবু মেয়েটিকে বলছিলেন,
—সৌরভকে তুমি ভুলে যাও।
স্মৃতিকণা প্রথমে কোন উত্তর দিলে না। তারপর ধীরে ধীরে দৃঢ় কন্ঠে বলল,
—আমি সৌরভকে ভালোবাসি। তাকে ছাড়া আমি বাঁচব না! আমার পেটের সন্তান তারই।
—আমার ছেলে একটা ভুল করে ফেলেছে ঠিকই কিন্তু আমি সেটা শুধরে নিতে চাই। তুমি অ্যাবরশন করিয়ে নাও। সব খরচ আমার।
—আমি অ্যাবরশন করাব না। আমি সৌরভের সন্তানের মা হতে চাই।
এবার ঘরের ভিতর একটা বজ্রপাত হলো মনে হলো।
—খবরদার! আমার ছেলে তোমার মতো বেশ্যাকে বিয়ে করতে পারবে না। কিছুতেই না। আমি তা হতেও দেব না।
—মুখ সামলে কথা বলুন। কাকে আপনি ‘বেশ্যা’ বলছেন? আপনার ছেলে আমাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমার গর্ভে সন্তান এনেছে। আমি তার মুখ থেকে শুনতে চাই যে সে এই সন্তান চায় না।
—বিরজু! এই খচ্চর মেয়েটাকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে নদীতে ফেলে দিয়ে আয়!
গৌর একটু দম নিয়ে বলল,
—বিরজু বড়বাবুর হুকুমে পৃথিবীর যে কোনও রকমের খারাপ কাজ করতে পারে স্যার। ও কাউকে খুন করে অনেকদিন জেলেও ছিল। তারপর জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বড়বাবুর ফ্যাক্টরীতে কাজ করত। ওর ভয়ে সব শ্রমিকরা কম টাকায় মুখ বুজে ন’-দশ ঘন্টা কাজ করতে বাধ্য হতো।
সেই বিরজু মেয়েটার হাত-মুখ বেঁধে কোথায় যেন নিয়ে যায় সৌরভবাবুর গাড়িতে করেই।
রঞ্জন বসুর নির্দেশে গৌরকে পুলিশের গাড়িতে তোলা হলো। সে একমাত্র আই উইটনেস।
(৬২)
আজকে যেন কোর্ট চত্বরে লোক আর ধরছে না। সকলেই এই ইন্টারেস্টিং মামলার রায় শোনার জন্য ব্যাকুল। সঞ্জয়ও তার কোম্পানি থেকে ছুটি নিয়ে এসেছে এই মামলার রায় শুনবে বলে।
রঞ্জন বসুর সঙ্গে গৌরও এসেছে। উইটনেস বক্সে উঠে সে সমস্ত পূর্ববর্ণিত ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছে এবং সেই বর্ণনা শোনার পর মাননীয় আদালত রাজশেখর দত্ত এবং বিরজুসহ আরো কয়েক জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছে। সৌরভ মাথা নীচু করে বসেছিল সর্বক্ষণ। মনোরমা দত্ত সারাক্ষণ কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছেন। সঞ্জনার বাবা, দাদা এমনকি সঞ্জনার মা এবং বৌদি পর্যন্ত আদালতে এসেছে।
আজ সঞ্জনার চোখেও জল এল অন্য কারণে। তার ছোট্টবেলার বান্ধবী আজ সঠিক বিচার পেল! স্মৃতিকণার আত্মার শান্তি হবে।
আদালতের রায় শোনার পর সবাই যখন বেরিয়ে আসছে তখন কোর্টরুমের সামনে সঞ্জয়ের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল সঞ্জনার। সে অত্যন্ত অবাক হয়ে গেল। সঞ্জয় নিজেই মুখে হাসি টেনে বলল,
—আমি মিঃ বাগচীর সঙ্গে কোর্টে এসেছিলাম অফিসের একটা মামলার ব্যাপারে। ওনার কাছেই শুনলাম এই মামলাটার কথা। আজকে রায়দান হবে শুনে কৌতূহলে না এসে থাকতে পারিনি।
বহুদিন পর সঞ্জয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ায় সঞ্জনারও খুব ভালো লাগছিল। ঠোঁট চাপা হাসি ক্রমশ দু’গালে ছড়িয়ে পড়ল। সে বলল,
—অনেকদিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হলো। খুব ভালো লাগছে তোমাকে দেখে! অনেক কথা আছে তোমার সঙ্গে। একটু সময় আছে হাতে? চলো না, কোন একটা কফিশপে গিয়ে একটু বসি।
—তা একটু আছে।
—একটু থাকলেই চলবে।
(সমাপ্ত)