• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০১ | জানুয়ারি ২০২৬ | স্মৃতি
    Share
  • আমাদের যাদবপুর আর যাদবপুরের আমরা (২) : সুনন্দন চক্রবর্তী
    পর্ব ১ | পর্ব ২



    যেদিন ভরতি হতে এসেছিলাম দেখেছিলাম ছাত্রদের অনেকগুলো ক্লাব আছে— সিনে ক্লাব, ড্রামা ক্লাব, ডিবেটিং সোসাইটি, আর্ট অ্যান্ড লিটারারি সোসাইটি, ফোটোগ্রাফিক ক্লাব, মাউন্টেনিয়ারিং ক্লাব, মিউজিক ক্লাব ইত্যাদি। প্রতি ক্লাবের সদস্যপদের জন্যে অতিরিক্ত পাঁচ টাকা। এর মধ্যে মিউজিক ক্লাবের দশ হাতের মধ্যেও যাওয়ার প্রশ্ন নেই। ভরতির টাকা বাদে দেখা গেল তিনটে ক্লাবের সদস্য হওয়া যাবে। সিনে ক্লাব, ডিবেটিং সোসাইটি আর শিল্পসাহিত্য সংসদের সদস্য হয়ে গেলাম।

    তখনও ক্লাবগুলোর আলাদা ঘর ছিল না। একদিন একটা সাইক্লোস্টাইল করা নোটিস পেলাম আমাদের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক দেবব্রত মুখোপাধ্যায়-এর ঘরে শিল্পসাহিত্য সংসদের প্রথম বৈঠক। বিকেলের ম্লান আলোয় সেখানে নির্মল আর আমি পৌঁছে দেখলাম অবিন্যস্ত চুল, কালো ফ্রেমের পুরু চশমা একমুখ অগোছালো দাড়ির এক তরুণ— নিরুপম চক্রবর্তী। নিরুপমদা আমাদের দু-বছর আগের ধাতুবিদ্যার ছাত্র। তবে নিরুপমদার আসল ধাতু কবিতা। পরে সে দেশ-বিদেশের বহু সম্মান অর্জন করবে, নানা বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করবে, কিন্তু তার প্রথম প্রেম থেকে যাবে বাংলা কবিতা। বউদি— অনুমান করছি— হাসিমুখে সারাজীবন দ্বিতীয়। গতবার আমার টুটাফাটা স্মৃতির কারণে নিরুপমদার লেখা নিয়ে একটা বড়ো ভুল করেছিলাম। ‘গণ্ডার’ নিরুপমদার অনুবাদ নয়, ওই নাটক যাদবপুরে মঞ্চস্থ হয়েছিল নিরুপমদার পরিচালনায়। নিরুপমদাই শুধরে দিয়েছে আর সেই নাটকের নিরুপম বর্ণনা দিয়েছে, আপনারা পড়ে নেবেন। আমরা শিল্পসাহিত্য সংসদের যে প্রথম পত্রিকা পাই তাতে নিরুপমদা লিখেছিল ‘রাজপুত্তুর তোমায় দিলাম/ কৌটো ভরা বিষণ্ণতা’। বাংলা কবিতা তখন বিষাদ আর বারুদে সমাকীর্ণ। জেলে খুন হয়ে যাওয়া তিমিরকে নিয়ে কবিতা লিখছেন শঙ্খ ঘোষ। আমাদের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অগ্রজ ধূর্জটি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন— ‘প্রেমের কবি রক্ত লেখো, রক্তে বড় জ্বালা।’ আমাদের অজ্ঞাত, হয়তো অন্তর্নিহিত কোনো রক্তের জ্বালার কারণে তিনি আত্মহননের পথে যান। তাঁর, আমি যদ্দুর জানি, একটিই প্রকাশিত কবিতার বই— ‘কেন জলশব্দে প্ররোচিত হলে মালবিকা’--- আমাদের বেশ প্রিয় ছিল। আর্কিটেকচার পড়তে পড়তে ছেড়ে দেওয়া কমল সাহা-র একটা কবিতার বই ছিল— ‘মেঘময়ূর ও অন্যান্য কবিতা’। সেসব কবিতার মধ্যে ‘ঘুম জড়ানো চোখের পাতায় গল্প বলো, গল্প বলো/ বরিশালের গল্প মানে/ হালুম-ঝুলুম পরণকথা/ কলকাতাতে গল্প মানে/ লেকের ছায়ায় বাদামভাজা/ গল্প মানে মশার কামড়, সিগার-টানা রাত্রিযাপন’--- এইসব ছত্র তখন আমাদের মুখে-মুখে ঘুরত। আমি জানি নাভ এই বইগুলো সব হারিয়ে গেছে কি না। আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আর নেই। বইয়ের কি কোনো সমাধিস্থল আছে? সেখানে কি মৃত বই-দের সমাধিপ্রস্তরের তলায় ফুল রেখে আসা যায়?

    আমাদের মধ্যে তখন কবিতা পড়ে না বা কবিতা লেখে না এমন কেউ ছিল না। দৈনন্দিন কথাবার্তায় গদ্য এসে পড়লে আমরা হতচকিত হয়ে যেতাম। কয়েক বছর আমাদের এমন ঘনঘোর কবিতার ঘোরের মধ্যে কেটেছিল। তার মধ্যে আবার এক অপরূপ সমাপতন। আমাদের প্রথম বর্ষের প্রথম ক্লাস— ঘরে ঢুকলেন ছিপছপে দীর্ঘাঙ্গী এক তরুণী, কোনো বিশেষ ভনিতা ছাড়াই পড়াতে শুরু করলেন ‘দ্য ইভ অভ সেন্ট এগনেস’। তরুণী-র নাম মালিনী ভট্টাচার্য। নিঃশ্বাসও জমে যাচ্ছে এমন এক রাতে প্রাচীন এক কেল্লার আলোআঁধারি অলিন্দে মাদেলেইন আর পরফিরিও-র রুদ্ধশ্বাস ঘনীভূত অমর প্রেমকথা আমাদের ভূতগ্রস্ত করে ফেলল। পরম সৌভাগ্য যে আমাদের বিভাগের— না, শুধু আমাদের কেন, বাংলা এবং তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগেরও— যে-সাহিত্যপাঠের চলন ছিল তাতে তীক্ষ্ণতা আর সংরাগ মিলেমিশে থাকত।

    কবিতা, গল্প, নাটক ছাড়াও যাদবপুর আমাদের দিয়েছিল সিনেমা। তখন যাদবপুর যে বার্ষিক চলচ্চিত্র উৎসব করত সে একটা ঘটনা। স্নাতক হতে হতেই দেখে ফেলেছিলাম ‘বাইসাইকেল থিভস’, ‘ইভান দ্য টেরিবল’, ‘লা স্ত্রাদা’, ‘ব্রেথলেস’, ‘রুলস অফ দ্য গেম’, ‘দ্য ইনোসেন্ট সোরসারার্স’, ‘সোলারিস’, ‘ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’, ‘জাব্রিস্কি পয়েন্ট’, ‘দ্য সেভেন্থ সিল’, ‘ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ’, ‘মেমোরিজ অফ আন্ডারডেভলপমেন্ট’, ‘দ্য ক্লোজলি গার্ডেড ট্রেন’, ‘বেল দ্য জুর’, ‘দ্য থ্রোন অফ ব্লাড’, ‘হাঙ্গারিয়ান র্যাপসডি’(??), ‘মেফিস্টো’, ‘দ্য হার্ড’, ‘আওয়ারস অফ দ্য ফারনেসেস’, ‘সেড্ডো’। কোনো চলচ্চিত্রবিদ্যার সিলেবাস ছিল না। কিন্তু আমরা দেখে ফেলছিলাম নব্যবাস্তবতা-র ছবিগুলো, ফরাসি নবতরঙ্গ বা ন্যুভেল ভাগ চলচ্চিত্র আন্দোলনের মণিমুক্তারাজি, আইজেনস্টাইন আর তাঁর অনুগামীদের করা নতুন ভাবনা আর জীবনের ছবিগুলো আর লাতিন আমেরিকার বুলেটবিদ্ধ চলচ্ছবি, ইউরোপ, এশিয়া, আর আফ্রিকার ফিল্ম মায়েস্ত্রোদের কাজগুলো।

    আমি এলেম নতুন দেশে। নতুন-নতুন বই, নতুন-নতুন সিনেমা, নতুন-নতুন গান। এবং নতুন-নতুন বন্ধু। কিন্তু যে-জিনিসটা সব থেকে নতুন তা হল শিক্ষকেরা। আমাদের স্কুলে মাস্টারমশাইদের ভীতিপ্রদ হওয়াই ছিল দস্তুর। অল্প কিছু ব্যতিক্রম। এখানে ক্লাসের বাইরে এবং ভিতরে শিক্ষকেরা সহৃদয়, স্নেহশীল এবং ছাত্রদের জন্যে তাঁদের অবারিত দ্বার। যাদবপুরে শিক্ষকদের কোনো একটা বড়ো ঘর ছিল না। প্রায় প্রত্যেকের একেকটা ছোটো-ছোটো খুপরি, দু-একটা ঘর আকারে বড়ো, সেগুলোতে দু-জন বা তিন জন দখলদার।

    আমদের তিন জন বা চার জন করে টিউটোরিয়াল গ্রুপ করে একেক মাস্টারমশাই বা দিদিমণির জিম্মায় সেই খুপরিতে নিবিড়পাঠের আয়োজন। আমাদের একটা চার জনের দলের দায়িত্ব পেলেন ডক্টর শীলা লাহিড়ীচৌধুরি। এই ডাকসাইটে সুন্দরী বিদুষীর উচ্চারণ যাকে বলে অক্সোনিয়ন। একটা হালকা হাসি মুখে নিয়ে তিনি যখন ইংরেজির মেশিনগান চালু করতেন আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা মুখে তাকিয়ে থাকতাম আর আমার সহপাঠিনিরা ততোধিক দ্রুততায় তা লিপিবদ্ধ করে ফেলত। মাসচারেক সপ্তাহে দিন দুই এই বিড়ম্বনা চলার পর একদিন সবিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম বেশ কিছু শব্দ ধরতে পারছি। শীলাদিও তীক্ষ্ণ নজর রেখেছিলেন। যখন বুঝলেন বুড়বক-টা একটু-আধটু বুঝতে পারছে তখন অবশেষে ওঁর মুখ থেকে দু-একটা বাংলা বাক্য নির্গত হল।

    শীলাদি কলকাতার অভিজাত অংশের বাসিন্দা। কিন্তু উদ্বাস্তু কলোনি থেকে আসা একটি প্রায় ইংরেজি না-জানা ছেলেকেও অকারণ স্নেহ আর প্রশ্রয় দিয়ে যতদূর শেখানো যায় তার চেষ্টা করেছিলেন। আফশোস এই যে শীলাদি জীবিত থাকতে তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ নষ্ট করেছি বার বার।

    আমাদের সময়ের সারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব থেকে প্রিয় শিক্ষক রণজয় কার্লেকার—- তোতোদা। তোতোদা শীলাদির সম্পর্কে একটা গল্প বলেছিলেন। ’৭০ বা ’৭১ সাল। যাদবপুরের বাইরে বা ভিতরে বোমা— তখন যাকে বলা হত পেটো–– নিতান্ত নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। তোতোদা শীলাদির সঙ্গে চলেছেন অরবিন্দ ভবনের দিকে। লাইব্রেরি ছাড়িয়ে মাঠের কোনায় পা দেওয়া মাত্র কাছেই কোথাও একটা পেটোর আওয়াজ। চারদিকে চঞ্চলতা। আরও দু-একটা পেটো ফাটল। তোতোদা বলছেন ওঁর সমস্ত শরীর জ্যা-মুক্ত তীরের মতো অরবিন্দ ভবনের দিকে ছুট দেওয়ার জন্যে উন্মুখ। কিন্তু শীলাদি নির্বিকার। তাঁর সুবিখ্যাত হাই হিলের খুট-খুট ছন্দ বিন্দুমাত্র ত্বরান্বিত হচ্ছে না। শীলাদি জানেন এই মরজগতের মালিন্য তাঁকে স্পর্শ করতে পারবে না। আর তোতোদা বলেছেন এরপরের পঞ্চাশ গজ তাঁর জীবনের দীর্ঘতম পথ।

    কে যেন বলেছিল ধিক সেই সময় যখন বীরেদের প্রয়োজন হয়। আমাদের মৃদুভাষী শিক্ষকেরা অনেকেই সেই দুঃসময়ে আশ্চর্য স্থির সাহসের সব কাজ করেছেন। তোতোদার কথা তো বিস্তারিত ভাবে কখনো বলতে হবেই। উনি যে ব্যারিকেডের প্রথম পাহারা সে তো স্বতঃসিদ্ধ। কিন্তু ধরা যাক অধ্যাপক দেবব্রত মুখোপাধ্যায়। অত্যন্ত মৃদুস্বরে কথা বলতেন। তখনকার বামপন্থার সমর্থক ছিলেন না। জরুরি অবস্থার কালে শিল্পসাহিত্য সংসদের পত্রিকার একটি সংখ্যায় শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন— ‘শব্দ কোরো না, নড়ো না বাচ্চা, চুপ’ কবিতাটি। শাসকদলের ছাত্রনেতারা একটু দেরিতে বুঝতে পারে এটি খুব সম্ভবত জরুরি অবস্থাকে ঠেস দিয়ে লেখা। শঙ্খবাবুর সঙ্গে সাহিত্যিক বিতর্কে জড়ানোর দিকে না গিয়ে তারা সঞ্জয় মুখোপাধায়ের করা ‘ম্যাস্কুলাঁ-ফেমিনা’-র চিত্রনাট্যের অনুবাদটি অশ্লীল এই অভিযোগ আনে। দেবব্রতবাবু উভয়পক্ষের কুশীলবদেরই বিলক্ষণ চিনতেন এবং তাঁর কাজের কী পরিণতি হতে পারে জেনেও ঘোষণা করেন এই চিত্রনাট্য এই প্রথম যে অনূদিত হয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হল এজন্য তিনি গর্বিত। ফলে বিতর্কটির অচিরেই সমাপ্তি ঘটে। এমন সব তখন আকছার হত।



    অলংকরণ (Artwork) : ছবিঃ ইন্টারনেট থেকে নেওয়া
  • পর্ব ১ | পর্ব ২
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments