

ঝাল লজেন — স্মরণজিৎ চক্রবর্তী ; প্রচ্ছদ- রৌদ্র মিত্র; প্রকাশক- আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা; প্রথম প্রকাশ- এপ্রিল, ২০২৪; ISBN: 978-93-5425-474-1 আষাঢ়ের মেঘের মতো জমা হয় স্মৃতি। জীবন সরে সরে যায়। সময়ের দাপট এড়াতে পারে না কেউ। তার বিপ্রতীপে শুধু জমতে থাকে স্মৃতির ঝাপটানি। সেই স্মৃতি জমতে জমতে ঝরে পড়ে কখনও কখনও লেখকের কলম থেকে। ‘ঝাল লজেন’ তেমনই, বিনি সুতোর মালায় গাঁথা সময়যাপন।
স্মরণজিৎ চক্রবর্তী কলম ধরেছেন তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতির ঝাঁপি খুলে। তাঁর ছোটবেলা কেটেছে বাটানগরের ‘পাশের ছোট্ট মফস্সল নঙ্গীতে’। নঙ্গীর সর্দার পাড়ায় তাঁদের সাদা দোতলা বাড়ির পাশেই ছিল উঠোন, আর সেই উঠোনের গা ঘেঁসেই ‘সবুজ জলের পুকুর’। আর ছিল একটা খোলা, ঝকঝকে আকাশ। যেখানে ধনুক হাতে ধরা কালপুরুষের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়তেন লেখক। ‘ঝাল লজেন’ লেখকের সেই ফেলে আসা দিনগুলিরই যাপননামা। দুই পর্বে বিভক্ত এই বই— প্রথম পর্বে ২২টি আর দ্বিতীয় পর্বে ১১টি লেখায় রয়েছে লেখকের আশৈশবের সঞ্চিত মুহূর্তরা। সবশেষে ‘শেষটুকু: ঝাল লজেন’ নামের উপসংহার নিয়ে সাজানো এই ব্যক্তিগত স্মৃতিকথন।
স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর ‘ঝাল লজেন’ শুধু আত্মজৈবনিক স্মৃতিচারণ নয়, বরং আশি ও নব্বই দশকের এক গোটা প্রজন্মের শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের নস্টালজিয়াকে ছুঁয়ে দেখা। এটি এমন একটি বই, যেখানে সময় যেন নিজেই এক চরিত্র হয়ে উঠে আসে— স্মৃতির ধুলোমাখা পাতা থেকে জেগে ওঠে টেপ রেকর্ডার, পাড়ার ফুটবল মাঠ, পাড়ার দুর্গাপুজো, ফুচকা, প্রেমপত্র, আর হেমন্তের হাওয়ায় ভেসে আসা পুরনো গানের সুর। ‘ঝাল লজেন’ অতীতের সরণি দিয়ে হেঁটে যাওয়া নানান টুকরো স্মৃতির মালা। বেদনা ও ভালোবাসার এক অনাবিল আলিঙ্গন।
লেখকের প্রতিটি স্মৃতি যেন এক-একটি ছোট গল্পের মতো গড়ে ওঠে— যেখানে দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্রতম ঘটনাও আবেগ, রসিকতা ও অন্তর্দৃষ্টির মিশেলে অনন্য। এই বইয়ে ধরা আছে আশি ও নব্বই দশকের মফস্বল জীবনের গল্প। তার ফ্রিজ, টিভি আর অ্যান্টেনার কথা। সাথে আছে সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের কলকাতার স্মৃতিও— কলকাতার ট্রাম, ট্রেন, রেস্তোরাঁ আর রাস্তাঘাটের জলছবি। আরও ছড়িয়ে আছে শৈশবের সরলতা, যৌবনের স্বপ্ন, পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা। প্রথম পর্বে লেখার নামকরণগুলি মিশে আছে জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন মুহূর্তের সঙ্গে, যেমন রবিবার, সকালবেলা, লোডশেডিং, ছাদ, ছোটবেলার স্কুল, গরমের ছুটি, আরও কত কী। লেখক শুনিয়েছেন সেসময়ের খেলাধুলোর উন্মাদনার গল্প, যে ফুটবলের সাথে বাঙালির নাড়ির যোগ, উত্তরাধিকার সূত্রে সেই ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাও সঞ্চারিত হয়েছে লেখকের মধ্যে। তাই লেখায় উঠে এসেছে তাঁর প্রিয় ফুটবল খেলোয়াড় কৃষাণু দের কথা। আবার কোথাও শুনিয়েছেন তাঁদের বাড়িতে প্রথম ঠান্ডা মেশিন আসার কথা, সাথে তাঁর মায়ের পরম শিক্ষা— ‘…কোনও কিছুর সঙ্গেই এত অ্যাটাচমেন্ট ভাল নয়। অত মনে নিতে নেই কিছু। যত এমন করে কেউ আঁকড়ে, আটকে থাকবে তাকে তত কষ্ট পেতে হবে!’— যে কথাটি লেখকের মনের ফাঁক দিয়ে গলে পড়ে হারিয়ে যায়নি। কোথাও গল্প এগিয়েছে লেখকের রবীন্দ্র জয়ন্তী পালনের স্মৃতি মেদুরতায় আবার কখনও মন মজেছে সেসময়ের নেমন্তন্ন বাড়ির কথায়। দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে লেখকের কলকাতায় কাটানো কৈশোরের কথা। ‘দূরে কোথাও’-তে শুনিয়েছেন কর্নাটকের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের গল্প, ‘লেখালেখি ও কলেজ স্ট্রিট’-এ প্রথম লেখা ছাপার কথা। এই সব নিয়েই লেখকের জীবনের এই ‘ঝাল লজেন’। আর এই ‘ঝাল লজেন’-এর মধ্যে দিয়ে অমরত্ব লাভ করলো এমন বহু মানুষ যাঁরা সহজ জীবনের কথা বলতেন, যাঁরা অনাড়ম্বরের মধ্যেও বেঁচে থাকার আনন্দ জানতেন।
স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর এই বই বর্তমানে দাঁড়িয়ে অতীতকে মনে করায়। আর জাগিয়ে তোলে এক মনকেমন করা উপলব্ধি, যেখান থেকে লেখকের আক্ষেপ মিলে যায় পাঠকের চেতনায়—
‘আসলে যা যায়, তা তো আর ফেরে না। তাও আমাদের সেই জীবনের, যেসব সামান্য জিনিসেই আমরা খুশি হয়ে উঠতাম, প্রাপ্তির পূর্ণতায় ভরে উঠতাম, সেসব কথাগুলো এখন মনে পড়ে। মাঞ্জা-ঘুড়ির বিকেল, নারকেলপাতা দিয়ে বানানো হাত ঘড়ির বিকেল, সবাই মিলে খেলা করার সেই বিকেল আজও যেন ভেসে আসে কোন এক আশ্চর্য সময় থেকে! সেই সময় যখন আমাদের কিচ্ছু ছিল না তবু আনন্দ ছিল অফুরান! সেই সময়, যখন নকুলদানার মিষ্টি স্বাদে ভরে থাকত বড় ক্ষুদ্র আর বড় সাধারণ আমাদের সুখের পৃথিবী।’আসলে কোনও আত্মচরিতই সময় ও সমাজকে বাদ দিয়ে নয়। ‘ঝাল লজেন’ এক স্মৃতিকথার আড়ালে একটি সময়, একটি সমাজের বীক্ষণ— যে-সমাজ জাত-পাতের বেড়াবন্দি, অথচ যে-সমাজে সহজে কাউকে অপর করে দেওয়ার রেওয়াজ নেই। বরং পাশের মানুষকে আপনার করে ভাবতে চাওয়াই এই সমাজের শিক্ষা। যতটা পাশে দাঁড়াতে পারলে মানুষ, মানুষ হয়ে থাকতে পারে। লেখকের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসে মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের মানসিকতা, পারিবারিক গঠন, শিক্ষার পরিবেশ, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আবহ— সব মিলিয়ে এক বিস্তৃত প্রেক্ষাপট। এই বই একজন মানুষের অন্তর্লোকের যাত্রাও যা পাঠককে ভাবায়, হাসায়, কখনও বা চোখ ভিজিয়ে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং নিজের অতীতের দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করে। যে সময়ে জীবনটা ছিল একটু ধীর, একটু কম যান্ত্রিক, আর একটু বেশি হৃদয়ছোঁয়া।
বইটি শেষ করার পর মনে হয়, এক ঝলক টাটকা বাতাস বয়ে গেল। যে বাতাস অরণ্যের ফিসফিসানির মতো পরিচিত, ঝর্নার জলের মতো আপন, চলে যাওয়া শেষ ট্রেনের মতো মনকেমন করা। সহজ, সাবলীল, অথচ আবেগপ্রবণ নাগরিক গদ্যে বুনে যাওয়া জীবনের গল্পগুলি এগোতে এগোতে যে শুধু লেখকের জীবন বা তাঁর দ্বন্দ্ব-টানাপোড়েন ফুটিয়ে তোলে তা-ই নয়, বরং তার পাশাপাশি সেই সময়ের ছবিও আঁকতে আঁকতে যায়। বইয়ের প্রতিটি গদ্যে রয়েছে লেখকের হৃদয়ের উষ্ণতা, যার মাধ্যমে তিনি নিজের জীবনের টুকরো টুকরো অনুভব— সুখ-দুঃখ, সাফল্য-ব্যর্থতা, আনন্দ-বেদনা, ভুল-অভিমান, মনকেমন, বিস্ময় পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন— এ যেন আপনজনের মুখে শোনা পুরনো দিনের গল্প। বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠায় তিনি খণ্ড খণ্ড চিত্রের মাধ্যমে এক দৃশ্যপট তৈরি করেছেন। এই দৃশ্যপট চিত্র হয়েও যেন শুধুই চিত্র নয়; সেগুলি চিত্রের নির্জীবত্ব কাটিয়ে সজীবত্বে উদ্ভাসিত।
বইটির আরেক আকর্ষণ, রৌদ্র মিত্র-এর মনকাড়া প্রচ্ছদ। যত্ন আর ভাবনার ছাপ এই বইয়ের পাতায় পাতায়। গদ্যের শেষে ছবিও একেবারে গল্পের মতো। যেন লেখাটিকে দেখা যায়, ছোঁয়া যায়। অনেক স্মৃতি আমাদের নিজেদের বাড়ির উঠোন কিংবা মফস্বলের রাস্তাঘাটের মতোই পরিচিত। এই বই পাঠককে মনে করায় জীবনের মজার রংগুলো চলে গিয়ে জীবন এখন হয়ে উঠেছে সাদা-কালো। আর এখন আমরাও যেন সবাই আনন্দের থেকে, ভালোবাসার থেকে বহুদূরে বেঁচে থাকা একা একা কিছু মানুষজন মাত্র। আমরা হাঁটছি, চলছি এই সময়ে, কিন্তু সারাক্ষণই ফিরতে চাইছি ফেলে আসা সময়ে। কিন্তু এই বই আমাদের এও জানান দেয় ঝাল লজেনের মতো জীবনের আনন্দকেও ভাগ করে নিলে তার স্বাদ বেড়ে যায় হাজার হাজার গুণ।
স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর ‘ঝাল লজেন’ ফুটে উঠেছে স্মৃতির সমস্ত রোদ্দুর জুড়ে। আর ঝরে পড়েছে শিউলি আর বকুল হয়ে আমাদের মনের ওপরে। পাঠকের হাতে তুলে দেওয়া এ এক অনন্য অঞ্জলি।