

ঈশ্বর-পৃথিবী-ভালোবাসা; — সঞ্জয় ঘোষ; প্রকাশক— আখরকথা; প্রচ্ছদ- কহলিল জিব্রান; প্রথম প্রকাশ— শ্রাবণ, ১৪৩২; ISBN: 978-93-49880-19-1বোস্টনের উদ্বাস্তু বস্তিতে জীবন শুরু খলিলের, সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন কিন্তু হেরে যাননি, রীতিমত অধ্যয়ন ও শিক্ষানবিশীর পাঠ শেষে নিজেকে দক্ষ চিত্রকর হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর ছবি প্যারিসের বিখ্যাত গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়েছে। কহলিলের ছবিতে রদ্যাঁর প্রভাব আছে, তিনি রদ্যাঁর পোর্টেটও করেছিলেন অথচ দুজনের মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল না। আধুনিক চিত্রকলায় কিউবিজম ধারাকে কহলিল সহজ ভাবে মেনে নিতে পারেননি, সারাজীবন আঁকড়ে থেকেছেন সিম্বলিজমকে। শিল্পী হিসেবে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের পথের মিলনবিন্দুতে, তিনি যেন প্রাচ্যেরও না পাশ্চাত্যেরও না। রবীন্দ্রনাথের ছবিও প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সীমা অতিক্রম করে বিশ্ব শিল্পজগতে সুনির্দিষ্ট স্থান করে নিয়েছিল। বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘ছবির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ পরম্পরাকে স্বীকার করেন নি।’
১৯২৩ সালে প্রকাশিত জিব্রানের ‘দ্য প্রফেট’ গ্রন্থটি সারা বিশ্বের পাঠক সমাজের কাছে আদৃত হলেও সমালোচকরা এই বইকে সেভাবে মান্যতা দেননি। যদিও পরবর্তী সময়ে তাঁর কাব্য সারা পৃথিবীর কাছে এক নতুন ভাষা নিয়ে সাড়া জাগিয়েছে, যে ভাষায় প্রেম, ঈশ্বর ও আধ্যাত্মিকতা মিলেমিশে একাকার। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ মূলত কবি ও সাহিত্যিক হয়েও জীবনের প্রান্তসময়ে ছবির ব্যাকরণের বাইরে চিত্রকলায় এক ব্যতিক্রমী স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য পত্তন করেছিলেন, অবনীন্দ্রনাথের ভাষায় যা ‘ভলকানিক ইরাপশন’। চিত্রশিল্পী হিসেবে রবীন্দ্রনাথের পদধ্বনি শোনা যায় ‘পূরবী’র পাণ্ডুলিপিতে, আবিষ্কারক একজন বিদেশিনী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, যদিও ‘মালতী পুঁথি’ ও ‘রক্তকরবী’র পাণ্ডুলিপির কাটাকুটির মধ্যে দিয়ে নির্মিত চিত্রভাষ কবিগুরুর চিত্রশিল্পের প্রথম পদক্ষেপ। মনে রাখতে হবে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সাহচর্যেই রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রথম প্রদর্শনী হয় প্যারিসে যার জগৎ জোড়া খ্যাতি সুবিদিত। নতুন দিগন্তের উদ্ভাস।
আলোচ্য গ্রন্থটিতে ছয়টি নাতিদীর্ঘ অধ্যায়ে লেখক সঞ্জয় ঘোষ বিধৃত করেছেন রবীন্দ্রনাথ ও কহলিল জিব্রানের সৃষ্টি-প্রেম ও দর্শনের সাদৃশ্যের কথা। তিনি উল্লেখ করেছেন কহলিল জিব্রানের জীবনে একাধিক নারীর আগমনের কথা। প্রথমে এসেছেন জিব্রানের আঁকার ও লেখার প্রেরণাদাত্রী হিসেবে কেমব্রিজের মহিলা কবি পিবডি, জিব্রানের শিল্পী হয়ে ওঠার পথে যার অবদান কম নেই। পিবডির দেওয়া গোপন নামই জিব্রান তাঁর বিখ্যাত বই ‘দ্য প্রফেট’-এর টাইটেল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। পিবডির সঙ্গে বিচ্ছেদের পর গাট্রুড বেরির সঙ্গে সম্পর্ক এবং তারপর এমিন মিশেল নামের একজন উঠতি নায়িকার সঙ্গে জিব্রানের প্রেম, সে প্রেমও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, অবশেষে মেরি হ্যাসকেল আসেন জিব্রানের জীবনে। দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে এক প্লেটোনিক প্রেম যে প্রেম শান্ত দীঘির মতো, নিস্তরঙ্গ অথচ গভীর। কহলিল ও হাসকেলের দীর্ঘ প্রেমজীবনের অসামান্য দলিল উভয়ের মধ্যের চিঠিপত্র— সংকলিত হয়েছে একটি গ্রন্থে Beloved Prophet : the love letters of Khalil Jibran and Mary Haskel and her private journal। এইসব চিঠির মধ্যেই আছে পারস্পরিক প্রেমের এক অন্যতর অনুভূতি। মেরি হাসকেল মনে করতেন তাঁর দায়িত্বই হল জিব্রানের সৃষ্টিসত্তা আর শিল্পীমনকে প্রেরণা জোগানো। এক্ষেত্রে অনেকটা সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের জীবনে কাদম্বরীর ভূমিকা। কাদম্বরীই রবীন্দ্রনাথের কৈশোর বয়েসের উচ্ছ্বসিত কাব্যতরণীর পালে হাওয়া তুলে পূর্ণতার কূলের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের জীবনও নারীশূন্য নয়। জীবনের বিভিন্ন সময় এসেছে রানু, কাদম্বরী, ওকাম্পো। এছাড়া, বোম্বাই-এ আত্মারাম পাণ্ডুরঙ্গের কন্যা আনার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের হৃদ্যতার কথা আমরা জানি। আনাকে রবীন্দ্রনাথ নলিনী নামটিও উপহার দেন। যে আনা তরখড় রবীন্দ্রনাথের গান শুনে মন্তব্য করেছিলেন, ‘কবি তোমার গান শুনলে আমি বোধ হয় আমার মরণ দিনের থেকেও প্রাণ পেয়ে জেগে উঠতে পারি।’ রবীন্দ্রনাথের জীবনের প্রথম প্রেমিকা আনা তরখড়ের মৃত্যু হয় মাত্র ছত্রিশ বছর বয়েসে। আনার মৃত্যুর আগের দিন কবি সাজাদপুর থেকে ইন্দিরা দেবীকে যে চিঠি লেখেন তাতে দেখা যায় মৃত্যুচিন্তা কবিমানসকে আচ্ছন্ন করে আছে। কহলিল জিব্রান তাঁর প্রথম প্রেমিকার মৃত্যুর অনেক পরে লিখছেন, ‘আজ এত বছর পরে আমার কাছে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। শুধু সেই সুন্দর স্বপ্নগুলো আর যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতিগুলো ছাড়া। অদৃশ্য ডানা ঝাপটানো শব্দ আমার হৃৎপিণ্ডকে বেদনায় ভরে তুলছে আর আমার দু-চোখ ভরে তুলছে কান্নায় আর বিষাদে।’ রবীন্দ্রনাথের ভালোবাসার বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে আছে তাঁর ‘প্রেম’ ও ‘পূজা’ পর্যায়ের গানে। রবীন্দ্রনাথ ‘পূজার গান’ ও ‘প্রেমের গান’ যেন রেশমি সুতোয় বাঁধা মুক্তির গান। কহলিলের কবিতায় সেই সুরের অনুররণ। ‘দ্য প্রফেট’’-এ জিব্রান ‘বিবাহ’ নিয়ে লিখেছেন— ‘তোমরা একই সঙ্গে জন্মেছ, / একই সঙ্গে সব কিছুর জন্যে থাকবে/ যখন মৃত্যু তার সাদা ডানা বিছোবে তোমার / দিনরাতের ওপরে/ তোমরা দুজনে একসঙ্গে থাকবে/ ঈশ্বরের নীরব স্মৃতির মধ্যে’। রবীন্দ্রনাথও তাঁর গানের মধ্যেই রেখে গেছেন সেই অনন্ত মিলনের স্পর্শ ‘তোমায় আমায় মিলন হবে ব’লে আলোয় আকাশ ভরা/ তোমায় আমায় মিলন হবে ব’লে ফুল্ল শ্যামল ধরা’। জিব্রানের ছবি এবং কবিতা বৌদ্ধিক অভ্যাস নয়, তা যেন আধ্যাত্মিক জগৎকে ছোঁয়ার চেষ্টা। এখানেই তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মিল। তাঁরা দুজনেই বিশ্বাস করতেন, ‘শিল্প হচ্ছে প্রকৃতি থেকে অসীমের দিকে যাত্রা।’ রবীন্দ্রনাথ যখন ভাষার রাজ্য ছেড়ে নিঃশব্দে প্রবেশ করছেন রঙ ও রেখার রাজ্যে, এক অনাবিষ্কৃত ভূখণ্ডে পা রাখছেন তিনি, তখনই তিনি অনুভব করেছেন সীমার মধ্যে অসীমকে স্পর্শ করার অনির্বচনীয় আনন্দ।
লেখক সঞ্জয় ঘোষ একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা জানিয়েছেন, জিব্রানের চিত্রকলার উত্তরসূরি সমসাময়িক সময়ে পাওয়া যায় না। তবে পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ শিল্পী ফ্রান্সিস বেকনের ছবিতে কিংবা বাংলাদেশের শিল্পী বর্তমানে প্যারিস নিবাসী সাহাবুদ্দিনের ছবিতে জিব্রানের শিল্পভঙ্গির দূরবর্তী ছায়া লক্ষ্য করা যায়। জিব্রানের ছবির উত্তরসূরির অন্বেষণ বড় জরুরি।
গ্রন্থটির অসামান্য সম্পদ রবীন্দ্রনাথ ও কহলিল জিব্রানের তুলিতে মোট আটটি ছবি। কহলিল জিব্রানের আঁকা প্রচ্ছদচিত্র বইটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। দু’এক জায়গায় সামান্য মুদ্রণ প্রমাদ ব্যতিরেকে, ‘আখরকথা’র এই গ্রন্থ বাংলাসাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন। আগামী দিনে এই বিষয়ে আরও বড় পরিসরে একটি গ্রন্থ প্রয়োজনীয় বলে আমার মনে হয়।