• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০১ | জানুয়ারি ২০২৬ | স্মৃতি
    Share
  • পোড়োবাড়ি, উইশবোন আর প্রকৃতির জীবেরা : মৌসুমী ভট্টাচার্য্য


    লোকে বলে ‘কানা দামোদর’। মানে দামোদরের এক লিকলিকে শাখা নদ আর কি। সে যেন দুহাতে আগলে রেখেছে আমাদের বাহুল্যহীন গ্রামটাকে। দেবীপুর। হাওড়া জেলার উদয়নারায়ণপুর ব্লকের এক ছোট্ট জনপদ। আমার শৈশবে সে গ্রামে ‘নেই’-এর তালিকাটি ছিল বেশ দীর্ঘ। নেই পাকা রাস্তা, নেই ইলেক্ট্রিসিটি, হাই-স্কুল নেই, নেই কোনও দোকান-বাজার, ব্যাঙ্ক-পোস্ট অফিস এসব তো দূর অস্ত। ‘নেই’-এর কথা থাক। বরং যা ছিল, সেই ঐশ্বর্যের আভাস দিই! গ্রাম জুড়ে সবুজের ঢেউ, উর্বর ক্ষেত, টলটলে দিঘি, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির ওড়া-উড়ি, আর প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য! এসবের মধ্যেই আমার বেড়ে ওঠা। যে বাড়িতে আমার জন্ম এবং একটু জ্ঞানগম্যি হওয়া, সেই বাড়িটা ছিল একরকম পোড়োবাড়ি। চারপাশে ভাঙাচোরা পাঁচিল। পলেস্তারা খসা দেয়াল থেকে উঁকি দেয় পাতলা ইটের গায়ে শৌখিন কারুকাজ। ইতি-উতি ইটের ঢিবি, এক কোণে ঢেঁকিশালের ভগ্নাংশ। তাদের গায়ে কার্পেটের মতো সবুজ শ্যাওলা। আঙুল দিয়ে খুঁটে সেই শ্যাওলার আড়াল থেকে দেয়ালকে মুক্ত করা আমার নিষ্কর্মা ছোটবেলার মজার খেলা ছিল। সামনের চলন আর উঠোনটুকু বাদ দিলে চারপাশে আগাছা আর লতাপাতার দাপট। এই পোড়োবাড়ির চত্বরে আমাদের আগে থেকেই বাস করে নানা প্রজাতির সাপ, বিছে আর হরেক পোকামাকড়। এই না-মানুষী বাসিন্দাদের সঙ্গে মাঝেমাঝেই সাক্ষাৎ হতো আমাদের।

    আমি তখনও স্কুলে ভর্তি হইনি। দোরে বসে একদিন নিজের মনে শ্লেটে আঁকিবুকি কাটছি। বাপী হঠাৎ হ্যাঁচকা মেরে টেনে কোলে তুলে নিল আমায়। আমি উঠে আসতেই দেখা গেল আমার কাছ ঘেঁষে হেঁটে বেড়াচ্ছে ইয়াব্বড় এক তেঁতুলে বিছে। আমাকে উঠে আসতে বললে হয়তো আমি তার গায়ে হাত দিয়ে ফেলতাম। তাই বাপী সেই সময়টুকু না দিয়ে নিজেই আমায় তুলে নিয়েছে। এর পর বাপী মাকে বলল, “শিগিগিরি ভারী কিছু একটা দাও তো”। মা বলল, “ওকে মারবে কেন! ছেড়ে দাও না। ও আপনিই চলে যাবে। ও তো আমার সন্তানের ক্ষতি করেনি। আহা, প্রকৃতির জীব!” বাপী আর কথা বাড়ায় না। মেনে নেয়। আমাকে সে কামড়ালে কী ভয়ঙ্কর কাণ্ড হতো আলোচনা সেই দিকে গড়ায়। বছর চারেক বয়সের সেই মুহূর্তটা এতকাল আমার স্মৃতিতে বেঁচে আছে। থেকে যাবে বাকি জীবনও। ‘আহা প্রকৃতির জীব’ শব্দ তিনটি সেই আমার প্রথম বার শোনা। তারপর মা’র মুখে এ কথা বার বার শুনেছি। শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। মা নিজেও জানে না আমার হৃদয়ে ওরা কীভাবে গেঁথে গেছে। কী গভীর জীবনবোধে জারিত এই শব্দবন্ধটি। সেই শৈশব থেকে আজও তাই কোন জীব-জন্তু পোকা-মাকড় গাছগাছালি আক্রান্ত হতে দেখলেই মায়া হয়। কানে বাজে, ‘আহা প্রকৃতির জীব’! আমি ভাবি, এই শব্দ তিনটি যদি সব মা তার সন্তানদের মনে গেঁথে দিতে পারেন, তবে হয়তো এ পৃথিবীর চেহারাটাই বদলে যাবে।


    আমার মা’র কাছে ল্যান্ডমার্ক মানেই গাছ। মা যখন তার ছোটবেলার গল্প বলত, বন্ধুদের বাড়ি, খেলার মাঠ, মন্দির, পুকুর পাড়, সবকিছুকেই চেনাতো কোনো না কোনো গাছ দিয়ে। ‘গাব গাছের পাশে’, ‘কনক চাঁপার নীচে’, ‘করঞ্জার ডালে’, ‘বৈঁচি ঝোপের ধারে’ এসব শুনতে শুনতেই আমার বড় হওয়া।

    মামাবাড়ির গ্রামের সব গাছকেই যেন মা চিনত। তাই ছোটবেলাতেই মা’র কথার অলিগলিতে ঘুরতে ঘুরতে সেই সব গাছেদের সঙ্গে আমারও পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। মা এত গাছের নাম জানত এবং এত সচ্ছন্দে তাদের নাম উচ্চারণ করত, মনে হতো, তারাও মা’র বন্ধু।

    শুধু গাছ না, সামান্য পোকা-মাকড়দের জন্যেও মা’র মনে অসীম মমত্ব দেখেছি। আমি তখন ক্লাস সিক্স। একদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে দেখি মা কেমন উদাস হয়ে উঠোনের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। একি! ঘর দোর অগোছালো! রোজকার মতো কাজ সেরে মা গল্পের বই নিয়ে বসেনি! কী হলো! শরীর খারাপ? মা বলল, “না রে, অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখছিলাম এতক্ষণ!” এক গুবরে পোকা তার মৃত সঙ্গীকে সমাধিস্থ করতে আমাদের মাটির উঠোনের মাঝখানে গর্ত খুঁড়ছে। একটু করে গর্ত খোঁড়ে, হাতে-পায়ে মাটি সরায়, আর নিজেই সেই গর্তে ঢুকে জরিপ করে, তার সঙ্গী সেখানে আঁটবে কিনা। অনেকক্ষণ ধরে চলতে থাকে খনন কার্য। যখন গর্তের আয়তন মাপ মতো হলো, তখন পাশে রাখা মৃত সঙ্গীর দেহটি টেনে এনে গর্তস্থ করে শুরু হল তার ওপর মাটি চাপা দেওয়ার কাজ। আশপাশে জড়ো হওয়া সব ঝুরো মাটি ফিনফিনে হাতে টেনে এনে বুজিয়ে দিল সমাধির গহ্বর। এর পর সেই সমাধির ছোট্ট স্তূপের ওপর বসে নিজের শরীরের পিছনের অংশ মাটিতে ঠুকে ঠুকে উঠোনের সঙ্গে প্রায়-সমতল করে দিল সে। এবার তার কাজ শেষ। ছেড়ে যেতে হবে প্রিয়জনটিকে। ভোঁ ভোঁ শব্দে বার তিনেক সমাধিকে প্রদক্ষিণ করে উড়ে গেল স্বজনহারা গুবরে পোকাটি। মা’র এই নিখুঁত বর্ণনায় আমি যেন দেখতে পেলাম সেই শেষকৃত্যের দৃশ্য। বুঝলাম, কেন মা উদাস। মনটা ভার হয়ে গেল আমারও। সঙ্গীর প্রতি কী অসীম মমত্ব ওইটুকু এক পোকার! আর অপার বিস্ময়ে সেই অকিঞ্চিৎকর জীবের অপার্থিব ভালবাসার সাক্ষী হয়ে থাকল আমার মা, সারা দুপুর জেগে। এবং জেগে রইল সেই কাহিনী তার সেদিনের স্কুলপড়ুয়া মেয়ের মনে; আজও, চার দশক পেরিয়ে, হয়তো অনন্তকালের জন্যে।

    ছোটবেলায় দেখতাম ঝড় বৃষ্টির পরে বাপী আমাদের পুকুর পাড়ে জঙ্গলের ধারে একবার ঘুরে আসত। অনেক সময় ঝড়ে গাছের বাসা থেকে পাখির ছানা পড়ে যেত। বাপী তাকে তুলে আনত। ঝুড়িতে বিছানা পেতে তাকে দুধ, বিস্কুটের গুঁড়ো এসব খাওয়ানোর চেষ্টা চলত। দাদার আর আমার আনন্দ তখন দেখে কে! দু একদিন একটু ধাতস্থ করে বাপী সেই পাখির ছানাকে ঝুড়ি সমেত পাঁচিলের ওপর রেখে দিত। দূর থেকে নজরে রাখত ওর মা বাবা ওকে নিতে আসছে কিনা। পাখিরাও তো লোকালয়ের হাল-হকিকত চেনে। তারা ঠিক চলে আসত ছানাকে নিতে। মাঝে মাঝে দেখতাম পাখিরা দল বেঁধে এসেছে ছানাকে উদ্ধার করতে। ছানাকে ফিরে পেয়ে কিচিরমিচির আওয়াজে বাড়ি ভরিয়ে দিত। তারপর তাকে নিয়ে উড়ে চলে যেত। আমি আর দাদা অবশ্য খুব চাইতাম ওকে কেউ নিতে না আসুক। আমরা তাহলে ওকে পুষবো। পড়ে যাওয়া পাখির ছানাকে উদ্ধার করতে গিয়ে তার মা বাবার রোষের মুখেও পড়তে হয়েছে বাপীকে একদিন। মনে আছে, শত্রু ভেবে বাপীর মাথায় ঠুকরে দিয়ে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল এক মা-পাখি। সন্তানের জন্যে বাবা মা-রা কী-না করে! ‘প্রকৃতির জীব’দের ধর্মই যে তাই!

    আমাদের বাড়ি থেকে বেরোতেই দরজার পাশে ছিল এক মস্ত বড় শিউলি গাছ। আমার শৈশবের চোখ বলেই হয়তো তাকে মস্ত বড় মনে হতো। শরৎ এলেই সে গাছ ফুলে ভরে যেত। সেসময় আমাদের বাড়িতে ঢোকার পথটা সকালবেলা একেবারে সাদা হয়ে থাকত ঝরে পড়া শিউলি ফুলে। ফুল বাঁচিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে পা ফেলতাম। কখনো বা ঝুড়ি ভরে তুলে আনতাম মাটি থেকে। রাশি রাশি ফুলের সঙ্গে শিউলি গাছে ছিল শুঁয়োপোকার পাহাড়। আমাদের বাড়িতেও তাদের অবাধ বিচরণ। মেঝেতে, উঠোনে, বিছানায়, কোথায় নয়! শুধু আমাদের না, পাড়ার সকলের বাড়িতেই তাই। আর সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেতাম আমরা, পাড়ার ছোটোরা। তাই বলে আমাদের পাড়ার বড়রা গাছটা কেটে দেওয়ার কথা কল্পনাও করেননি কোনদিন। কারণ গ্রামের মানুষেরা প্রকৃতিকে মেনে নিয়ে, মানিয়ে নিয়ে জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিল। আজ আমার শহর জীবনে এই বোধটির বড় আকাল দেখি। শুধুমাত্র শুঁয়োপোকা হতে পারে এই অনুমানেই গত বছর আমার বারান্দার পাশের শিউলি গাছটিকে নির্মমভাবে কেটে ফেললেন আমার এক গাছ-বিদ্বেষী প্রতিবেশী। খেয়াল করবেন, আজকাল শুঁয়োপোকাও বিশেষ দেখা যায় না৷ ওরাও হয়তো অচিরেই বিপন্ন জীবের তালিকায় স্থান পাবে!


    অচেনা গাছপালাকে চিনতে চায় আমার মন। বরাবরই। যে গাছের নাম কেউ বলতে পারে না, ছোটবেলায় তাকে নিজের মনেই একটা নাম দিয়ে দিতাম। যেমন, ঝোপঝাড় ঢেকে দেওয়া লতানে ‘মাইকানিয়া’ আমার কাছে ‘কপি ফুল’। বর্ষায় হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ‘রেইন লিলি’কে আমি ডাকতাম ‘পেঁয়াজ ফুল’ বলে। আমাদের বাড়ির সামনে স্বর্ণচাঁপা গাছের তলায় ‘বল লিলি’ ফুটত। আমি ভাবতাম ওর নাম ‘ভুঁই চাঁপা’। এমন আরো কত যে গাছপালার ডাকনাম জড়ো হয়েছিল আমার গোপন অভিধানে! তখন তো গাছেদের পরিচয় জানা আজকের মতো সহজ ছিল না! গাছেদের নামকরণেরও যে বিজ্ঞান আছে, তা-ই বা কে জানত!

    তখন ক্লাস ফাইভ-এ পড়ি। আমার স্কুলের পাশের স্কুলে বাপী পড়াত। আমার স্কুল ছুটি হয়ে গেলে বাপীর কাছে চলে আসতাম। এক সাথে বাড়ি ফিরতাম। বাপীর স্কুলের পাঁচিলের ওপরের ভাঙা অংশে একদিন এক ছোট গাছ চোখে পড়ল। ওপর থেকে ঝুঁকে পড়েছে তার দুটো ডাল। কী অপূর্ব ফুল ফুটেছে সেই আগাছায়! কদিন আগেই দাদা পড়ছিল শুনেছি “প্রাচীরের ছিদ্রে এক নামগোত্রহীন, ফুটিয়াছে ছোটো ফুল অতিশয় দীন!” এ তো ঠিক কবিতার মতোই। তবে দীন নয়। কী রূপ তার! গাঢ় নীল রঙের চৌকোমতো পাপড়ির কোলে উজ্জ্বল হলুদ রঙের ভেলভেট! পাতাগুলো খাঁজ কাটা কাটা, আর গাছের ডালপালা প্রায় স্বচ্ছ, ভিতরে যেন জলের প্রবাহ দেখা যায়! আকারে মেরে কেটে এক ফুট। নাম-গোত্রহীন ওই একরত্তি গাছ সারাদিন আমার মন জুড়ে থাকে, আমায় পাগল করে। কেউ যার খবর রাখে না, তাকায় না যার দিকে, সেই গাছকে দেখার জন্যে আমি স্কুল ছুটির পর দৌড়ে আসি। ক’দিন এমন দেখা সাক্ষাতের পর মনে হলো ওকে পাঁচিলের ফাটল থেকে তুলে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আমি যত্ন করে বাগানে লাগাব। সে ছিল আমার নাগালের একটু উঁচুতে। স্কুলের মালী কাকুকে অনেক সাধ্যসাধনা করে রাজি করালাম। তিনি মই লাগিয়ে পাঁচিল থেকে তুলে আমার হাতে দিলেন সেই সাত রাজার ধন মানিককে। আমি মহানন্দে তাকে এনে বাগানে বসালাম। দিনে রাতে আমি তো চোখে হারা। দু-তিন দিন বেশ তাজা ছিল সে। কিন্তু তারপরই শুকিয়ে যেতে শুরু করল। দেখতে দেখতে পুরোটাই শুকিয়ে মরে গেল আমার সেই নয়নের মণি আগাছা। শুকনো গাছটার দিকে তাকিয়ে দুচোখ জলে ভরে আসত; অনেক কষ্টে চেপে রাখতাম, কেউ দেখলে যদি হাসে। রাতে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতাম আমার সেই নাম না-জানা গাছের শোকে। অপরাধী মনে হতো নিজেকে। ওকে পাঁচিলে থাকতে দিলেই হতো। ফুল সমেত গাছকে যে ওভাবে উপড়ে এনে লাগাতে নেই, সে কথা যদি জানতাম তখন! দিন যায়, শোক কমে। কিন্তু চোখে লেগে থাকে সেই অপূর্ব শোভা! মাঝে বয়ে গেছে প্রায় দু’দশক। সেদিনের স্কুল পড়ুয়া আমি তখন শহরবাসী, কলেজে পড়াই। কলেজের জাতীয় সেবা প্রকল্পের কাজে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে যেতে হয়েছিল কয়েকদিন। মিশনের বাগানে হঠাৎই আবিষ্কার করলাম আমার সেই হারানিধিকে। আনন্দে আত্মহারা আমি। হাতের মোবাইল ফোনে গুচ্ছখানেক ছবি তুলে আনলাম। জানলাম ওর নাম ‘টরেনিয়া’, ডাক নাম ‘উইশবোন’। এমন বাহারি ফুল কেমন করে যে ওই গ্রামের স্কুলের পাঁচিলের ফাটলে আশ্রয় নিয়েছিল কে জানে! আসলে সে যতটা না ইটের ফাটলে, তার চেয়ে বেশি শিকড় ছড়িয়ে ছিল আমার কৈশোর জুড়ে। উইশবোন! এক পলকা মরশুমি গাছ, কিংবা আগাছা, যে আমায় মুগ্ধ করে, পাগল করে, কাঁদায়, আবার ফিরে এসে চমকে দেয়!

    জীবনের নানা ধাপে নানা জন আমায় প্রকৃতির হাত ধরিয়ে দিয়েছেন। ক্লাস টু-তে পড়ার সময় এক প্রতিযোগিতার মঞ্চে আমার আবৃত্তি করা শুনে আমাকে তাঁর নাটকের দলে টানেন একদম অচেনা এক মানুষ। অসিত দাস। পেশায় জীবন বিজ্ঞানের শিক্ষক। পরিবেশ সচেতন অসিত কাকু নিজে স্ক্রিপ্ট লিখে স্কুলের ছেলেমেয়েদের দিয়ে নাটিকা তৈরি করতেন আকাশবাণীর জন্যে। বেশিরভাগ নাটিকার কেন্দ্রীয় চরিত্রে থাকত এক জিজ্ঞাসু শিশু যার চোখ দিয়ে পরিবেশের অন্তরঙ্গ রূপ, কিংবা বিপন্নতার ছবি ফুটে উঠত। কখনও বা সেই শিশুই প্রকৃতির ভূমিকায়। সেই শিশুর চরিত্রে অভিনয় করতাম আমি। যন্ত্রণাকাতর বিপন্ন প্রকৃতির ভূমিকায় অভিনয় করতে করতে সে যন্ত্রণা যেন আমার নিজের যন্ত্রণা হয়ে উঠত। চারপাশের প্রকৃতিকে নিবিড়ভাবে চিনিয়েছিলেন কাকু তাঁর নাটকগুলোর মধ্যে দিয়ে। বহু নাটক, বহু চরিত্র, বহু বার্তা। পরিবেশের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার বোধ ওই ছোট্টবেলাতেই অঙ্কুরিত করেছিলেন তিনি আমার মনে। তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

    আমাদের ছোটবেলায় ক্রীড়া ও যুবকল্যা্ণ দপ্তরের উদ্যোগে ব্লক স্তরে বিজ্ঞান-বক্তৃতা প্রতিযোগিতা বা ‘সায়েন্স সেমিনার’-এর আয়োজন হতো প্রতি বছর। পরিবেশ-এর কোন না কো্ন দিক আলোচনার বিষয় হিসেবে নির্ধারিত থাকত। বাপী নিজে ইংরেজির শিক্ষক হয়েও কী অসাধারণ তথ্যসমৃদ্ধ ও বিশ্লেষণমূলক স্ক্রিপ্ট লিখে দিত। কে বলবে বাপী বিজ্ঞানের ছাত্র নয়! সঙ্গে এঁকে দিত সাযুজ্যপুর্ণ সব পোস্টার। আমি সেগুলো উপস্থাপন করে প্রাইজ আনতাম। প্রাইজটা আসলে বাপীরই। এই সেমিনারগুলো ছিল কিশোর মনকে পরিবেশ সচেতন করে তোলার মস্ত বড় হাতিয়ার। আমার কাছে সেগুলো ছিল সিলেবাসের বাইরে জীবন ও জগৎকে চেনবার ঘুলঘুলি।


    এর পর গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসা পড়াশোনার জন্যে। গ্রাম ছেড়ে এলেও পরিবেশ-ভাবনা আমায় ছেড়ে যায় না। আমার দিদি তখন ‘ইকোলজি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ছে। দিদির কাছে প্রথম দেখলাম ‘ডাউন টু আর্থ’ পত্রিকা। আমার সামনে পরিবেশ-চিন্তার নতুন দিগন্ত খুলে গেল যেন। সদ্য ভূমিষ্ঠ সে পত্রিকা তখনও খুব একটা সহজলভ্য বা বহুলপঠিত ছিল না। ‘ডাউন টু আর্থ’-এর বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পরিবেশ-রাজনীতি এবং কর্পোরেট-সরকার স্বার্থকামী জোটের নানা পরিবেশ-অবান্ধব নীতির নগ্নরূপ বিশ্লেষণ করে দেখায়। তথাকথিত উন্নয়নের ধারণার সঙ্গে জল-জঙ্গল-জীবন-জীবিকার সংঘাত দ্ব্যর্থহীনভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরে সাদা-কালোর আঁচড়ে। নয়ের দশকের গোড়ায় সেসব বিষয় জনসমক্ষে আনার তাগিদ বা সাহস দেখায়নি বোধ হয় আর কোনো পত্রিকা। এ পত্রিকা নির্মোহভাবে দেখতে শেখায়, ভাবতে শেখায়, আকৃষ্ট করে, বলা ভাল, নেশা ধরায়। পরিবেশ কর্মী ও সমাজ-চিন্তক সুনীতা নারায়ণের হাত ধরে যা আজও গলা তুলে প্রতিবাদ ও জনসচেতনতার লক্ষ্যে অবিচল।

    আমার সৌভাগ্য, আমি কর্মসূত্রে উইলিয়াম কেরীর রেখে যাওয়া উনিশ শতকের ইতিহাসের সঙ্গে নগণ্যভাবে হলেও যুক্ত। কেরী সাহেবের বহুমুখী কর্মকাণ্ডের মধ্যে ছিল তাঁর পরিবেশ প্রেম এবং আরো স্পষ্ট করে বললে, উদ্ভিদ-প্রেম। তিনি নিজে একজন শখের বটানিস্ট। সেই শখ এতটাই গভীর ও আন্তরিক, যে তাঁর কথা বিজ্ঞানী উইলিয়াম রক্সবার্গ গুরুত্ব দিয়ে শুনতেন, তাঁর সাথে গাছপালা নিয়ে চিঠিপত্রের আদান প্রদান হতো! শ্রীরামপুরে উইলিয়াম কেরী একসময় বটানিক্যাল গার্ডেন গড়ে তোলেন রক্সবার্গের সহায়তায়। শ্রীরামপুর কলেজে শিক্ষকতার সুবাদে এই ইতিহাস আমায় আবিষ্ট করে। সবুজে ঘেরা কলেজের বিচিত্র সব গাছপালা আমায় নতুন করে উৎসাহিত করে। পেয়ে বসে গাছপালা চেনার নেশা। সহকর্মী ভাই এবং তুখোড় ট্যাক্সোনমিস্ট সুমন আমার সেই নেশায় ধুঁয়ো দেয়; উস্কে দেয় আরেক সহকর্মী ভাই সন্দীপ। এসব ভালবাসার ঋণ শোধ হবার নয়। উৎসাহের আতিশয্যে, বাণিজ্যের ছাত্রী হয়ে কলেজের গাছপালাগুলোর অপটু এক ডকুমেন্টেশনও করে ফেলি। সেটি প্রকাশনার যাবতীয় দায়ভার বহন করে কলেজ কর্তৃপক্ষ আমায় কৃতজ্ঞ করেছে। তবে নিজের মনে রয়ে গেছে অনধিকার চর্চার কুন্ঠা।

    নিজের অজান্তেই প্রকৃতির পাঠশালায় আমায় একদিন ভর্তি করে দিয়েছিল আমার অদৃষ্ট। জ্ঞান হওয়া ইস্তক সেই সবুজ চালাঘরে আমি যেন নামতা পড়ে চলেছি। গুরুমশাই বদলায়। বদলায় প্রকৃতির পাঠক্রম। শুধু বদলায় না এই নাছোড় পড়ুয়ার মুগ্ধতা। প্রকৃতির অঝোর ধারাপাতের নীচে দাঁড়িয়ে অপলক দেখতে ইচ্ছে করে তার রূপ। চলাচলের পথে চোখ চলে যায় গাছগাছালির দিকে; তা সে সবুজ হোক কিংবা ধুলোমলিন। কখনো মন আনন্দে নেচে ওঠে, “দেখে যেন মনে হয়, চিনি উহারে!” কখনো-বা অস্থিরতা, চিনি না তো! গাছের মনে গাছ দাঁড়িয়ে থাকে, উদাসীন। আলাপ জমানোর অজুহাত খুঁজি। জীবনভর।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments