• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০১ | জানুয়ারি ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share
  • সুব্রামানিয়ান চন্দ্রশেখর : এক মহাজীবনের আলেখ্য : ভুবন মুরমু

    নোবেলজয়ী সুব্রামানিয়ান চন্দ্রশেখর; — সাধন চট্টোপাধ্যায় এবং তপেন্দ্রকুমার পাল; প্রকাশক— লালমাটি; প্রচ্ছদ- ??; প্রথম প্রকাশ— ??; ISBN: ??

    সুব্রামানিয়ান চন্দ্রশেখর (সংক্ষেপে চন্দ্রশেখর) নামটির সঙ্গে ওয়াকিবহাল মহলের পরিচয় আছে। আর যাঁরা কমপিটিটিভ পরীক্ষার কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স বা জেনারেল নলেজ রপ্ত করেছেন তাঁরা জানেন চন্দ্রশেখর হলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক মার্কিন বিজ্ঞানী যিনি ১৯৮৩ সালে নোবেল পুরস্কার পান। এইটুকুমাত্র চেনাজানায় বোঝা যায় বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানীদের সম্পর্কে আমাদের আগ্রহ। সম্প্রতি লালমাটি থেকে প্রকাশিত সাহিত্যিক সাধন চট্টোপাধ্যায় এবং তপেন্দ্রকুমার পালের নোবেলজয়ী সুব্রামানিয়ান চন্দ্রশেখর বইটি আমাদের কাছে একটা বিরল সুযোগ যার মাধ্যমে মাতৃভাষায় একজন ভারতীয় বিজ্ঞানীর ‘মহাজীবন’এর কথা আমরা আস্বাদ করতে পারি।

    এমনিতে বিজ্ঞানীদের জীবনকথা পাঠে আমাদের মধ্যে অনীহা কিংবা আলস্য কাজ করে। আমরা ধরেই নিই বিজ্ঞান বিষয়টি যেমন জটিল, বিজ্ঞানীদের জীবনকথাও তেমন জটিল। কিন্তু তেমন তো নয়? একজন বিজ্ঞানী তাঁর পরিবেশ-প্রতিবেশ থেকেই শিক্ষালাভ করেন আর তিনি যা চর্চা করেন তা মানবকল্যাণের জন্যই। পাঠে অনীহার এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে গেলে বিবিক্ত বইটি হাতে তুলে নেওয়া উচিত।

    চন্দ্রশেখরের জন্ম এক তামিল ব্রাহ্মণ পরিবারে। যে পরিবার মাত্র দু’পুরুষ আগে চাষবাস আর যজমানি ছেড়ে ইংরাজি শিক্ষাকে আপন করে নিয়েছিল। চন্দ্রশেখরের কাকা (বাবার পরের ভাই) বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী সি ভি রমন প্রথম অশ্বেতাঙ্গ বিজ্ঞানী যিনি নোবেল পুরষ্কার পান। চন্দ্রের কলেজ জীবন কেটেছে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজে, তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে তিনি যোগ দেন। সেখান থেকেই তাঁর ডক্টরেট হওয়া। চন্দ্রশেখর মহাকাশ পদার্থবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করলেও একই সঙ্গে তিনি তাঁর সময়কালে বিশ্বের অন্যতম অগ্রগণ্য তাত্ত্বিক পদার্থবিদ এবং গণিতজ্ঞও ছিলেন। ট্রিনিটি থেকে তিনি অধ্যাপক হিসেবে চিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং বাকি জীবন সেখানেই থেকে যান। তবে যে কারণে তাঁকে ১৯৮৩ সালে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়, সেই গবেষণাটি তিনি মাত্র কুড়ি বছর বয়েসে ইংল্যান্ডে পড়াশুনার সময় লেখেন।

    বইটির লেখকেরা তাঁদের লেখা শুরু করেছেন কতকগুলো জ্ঞাত বিষয়কে সামনে রেখে। যেমন চন্দ্রশেখরের ভারতে না ফেরা, তাঁর ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক, তাঁর প্রকাশিত বই এবং পেপারের বর্ণনা, তাঁর কাজের মূল্যায়ন, রামানুজন এবং রমনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করে। বিজ্ঞানের ছাত্র না হয়েও যে কেউ এই অংশটিতে আকর্ষণ বোধ করবেন। এরপরে লেখকেরা চলে গেছেন বিস্তৃত আলোচনায়। এখানে পর্যায় ভাগে আলোচনা করা হয়েছে চন্দ্রশেখরের বংশের কথা। বিশেষ করে তাঁর ঠাকুরদা, বাবা এবং কাকা রমনের কথা এসেছে। শৈশবের কথা, কলেজ জীবন, মায়ের কথা আর এসেছে সেই সময়কালে (অর্থাৎ ১৯১০-১৯৩০ সাল) মাদ্রাজের বিজ্ঞানশিক্ষার পরিবেশ।

    স্কলারশিপ নিয়ে ১৯৩০ সালে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে তিনি বিলেত যাত্রা করেন, তারপর থেকে আমৃত্যু (১৯৯৫ সাল) তিনি পরবাসে থেকে যান। এর ফলে তাঁর জীবনের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগুপিছু সময়কার ইউরোপ এবং আমেরিকার পদার্থবিজ্ঞানের আবহাওয়া মিশে গেছে। যে কারণে ১৯৪০’এর দশকের শুরুতে আমেরিকার ম্যানহাটন প্রজেক্টে (পরমাণু বোমা তৈরির প্রকল্প) চন্দ্রশেখরের যোগদানের একটা সুযোগও এসে যায়।

    চন্দ্রশেখর বিজ্ঞানের দুরূহ বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। ১৯৩০-৪০ এর দশকে মহাকাশ পদার্থবিজ্ঞান ছিল প্রায় ভ্রূণ অবস্থায়। চন্দ্রশেখরের মতো হাতে গোনা কয়েক জন বিজ্ঞানী মহাকাশ পদার্থবিজ্ঞানকে কেবল জনপ্রিয় করেননি, এর উন্নতিতে প্রচুর অবদান রেখে গেছেন। তাঁর নামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চন্দ্রশেখর লিমিট তেমনই একটি প্রসিদ্ধ গাণিতিক সীমা। আমাদের মহাবিশ্বের শুরুর সময় (অর্থাৎ বিগ ব্যাং) যেদিন বিজ্ঞান নির্ধারণ করতে পারল সেদিন থেকেই আকাশের লক্ষ্য-কোটি নক্ষত্রের মৃত্যু নিয়েও শুরু হয় গবেষণা। কারণ প্রতিটা বস্তুর শুরু থাকলে তার শেষ বা লয় থাকবেই। আর সেভাবেই মহাকাশ পদার্থবিদেরা উচ্চক্ষমতাশালী অবজ়ারভেটারি থেকে হাতে-কলমে যেমন ফলিত মহাকাশ পদার্থবিদ্যা চর্চা করছেন, তেমনই গণিত শাস্ত্র ও পদার্থবিদ্যার অন্য মাধ্যমের সহায়তায় তাত্ত্বিক মহাকাশ পদার্থবিজ্ঞানীরা মহাকাশ বিজ্ঞান চর্চায় যুগান্তর এনেছেন ১৯৩০-৫০’এর দশকে। চন্দ্রশেখর তাত্ত্বিক মহাকাশ পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর অবদানের জন্য পেয়েছেন বিশ্বের সেরা সম্মানগুলো।

    দেশে থাকতেই চন্দ্রশেখর গণিতজ্ঞ রামানুজনকে তাঁর গুরু মেনেছিলেন। আর তাঁর গুরুর মতোই তাঁর স্বপ্ন ছিল ইংল্যান্ডে নিজের প্রতিভার পূরণ সদ্ব্যবহার। কুড়ি বছর বয়সে দেশ ছেড়ে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যে চন্দ্রশেখরের মা মারা যান। বাবার বিশেষ ইচ্ছা ছিল ছেলে ডক্টরেট পেয়ে দেশে ফিরে সরকারি উচ্চপদে যোগ দিন। কিন্তু ক্রমাগত জ্ঞানের পিপাসা আর নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার প্রবল চাওয়ায় ট্রিনিটিতে পাঠ শেষ করেও তিনি দেশে ফিরতে পারেননি। এ নিয়ে চন্দ্রশেখরের নিজস্ব মত ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন ভারতে তাঁর কাজের পরিবেশ নেই। এ দেশে গবেষণার সুযোগ খুবই হতাশজনক। এ নিয়ে পিতা-পুত্রের মধ্যে সম্পর্কের টান-পোড়েনও বইতে বিস্তৃতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি তাঁর আপন কাকা সি ভি রমনের সঙ্গে তাঁর এবং তাঁর মায়ের সম্পর্ক, যা চন্দ্রশেখরের কাছে ছিল পীড়াদায়ক সেসবও খুঁটিনাটি উঠে এসেছে এই বইতে।

    চন্দ্রশেখর নিজে যেমন একজন জগতসেরা বিজ্ঞানী ছিলেন, ঠিক তেমনই তিনি তাঁর ছাত্রদের তৈরি করেছিলেন। পাশপাশি একজন ব্যস্ত বিজ্ঞানী হয়েও টানা কুড়ি বছর চিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নালের সম্পাদনা করেছেন। প্রায় মুমূর্ষু এই পত্রিকাটিকে চন্দ্রশেখর কেবল বাঁচিয়ে দেননি, বরং নিরলস পরিশ্রম ও উদ্ভাবনী শক্তিতে পৃথিবীর অন্যতম সেরা বিজ্ঞান পত্রিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়ে ছিলেন। একজন এশীয় হয়েও আমেরিকা, বিশেষত চিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অবদানের কারণেই ব্যতিক্রমভাবেই চন্দ্রশেখরকে ১৯৫২ সালে সস্ত্রীক আমেরিকার নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। ১৯৬৮ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে।

    এই বইতে চন্দ্রশেখরের জীবনের প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা গল্পের মতো করে বর্ণনা করেছেন লেখকেরা। এর ফলে এক মহাজীবনের জীবনকথা পড়তে গিয়ে কোথাও হোঁচট খেতে হয় না। বইয়ের সিংহভাগ যে সময়কার, সে সময়কার ইউরোপ ও আমেরিকার বিজ্ঞানীদের কথা এমনভাবে উঠে এসেছে যে তাঁরাও চন্দ্রশেখরের মতো আমাদের ঘরের মানুষ হয়ে উঠেছেন। এরই পাশাপাশি শেষের দিকে চন্দ্রশেখরের প্রথম যে গবেষণাটি বিজ্ঞানীদের আশ্চর্য করে, সেই নক্ষত্রদের মৃত্যু নিয়ে আলোচনাটি সহজবোধ্য ভাষায় লেখকেরা বুঝিয়েছেন। পাশপাশি চন্দ্রশেখরের কৈশোরের প্রথম বিজ্ঞান আলোচনাটির মূল ইংরাজিতে বইতে ছাপা হয়েছে। এ দুটি পড়লে বোঝা যায় জ্ঞানের কোন স্তরে বিরাজ করতেন সুব্রামানিয়ান চন্দ্রশেখর। চারশো বত্রিশ পৃষ্ঠার এই বইটিতে চন্দ্রশেখরের যাবতীয় কাজের তালিকার পাশাপাশি আরও বাইশটি বইয়ের তালিকা দেওয়া হয়েছে, যেখান থেকে আগ্রহী পাঠক আরও বিস্তারিত জানতে পারবেন। এক অর্থে অতি প্রয়োজনীয় এই বইটা নিজেই হয়ে উঠেছে বাংলা ভাষায় লেখা বিজ্ঞানীদের জীবনকথার অন্যতম গুরুত্বপূরণ কাজ।

    তবে বইটির নির্মাণের ক্ষেত্রে লেখকেরা যেহেতু চন্দ্রশেখরের লিখিত ডায়রি কিংবা স্মৃতিকথাকে আকর হিসেবে ব্যবহার করেছেন, সেহেতু এই বইয়ের নায়ক চন্দ্রশেখর দোষ-ত্রুটি মুক্ত একজন মানুষ কিংবা অতিমানুষ হিসেবেই উঠে এসেছেন। তাঁর দেশে না ফিরে আমেরিকার নাগরিকত্ব নেওয়ার যে বিতর্ক কিংবা তাঁর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা ও ব্রিটিশদের সমর্থন বা ১৯৫০’এর দশকে সোভিয়েত রাশিয়া নিয়ে তাঁর নেতিবাচক মূল্যায়ন এসবে চন্দ্রশেখরের বিরোধী মতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি অর্থাৎ আবেগের একদেশদর্শিতার মধ্যে দিয়ে চন্দ্রশেখরের ব্যক্তিপুজোর আয়োজন কোথাও কোথাও চোখে পড়ে। আর একটি কথা এমন একটি বইয়ের প্রুফ সংশোধনে আরও দায়িত্ববান হওয়া উচিত ছিল। প্রায় প্রতিটি পৃষ্ঠার বানান ভুল পাঠের সময় চক্ষুপীড়ার যথেষ্ট কারণ হয়ে ওঠে।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments