


১
রোজ বিকেল পাঁচটা নাগাদ আবহাওয়া একেবারে খারাপ না থাকলে রঞ্জনা হাঁটতে বেরোয়। ওদের ব্লকের চারপাশে এক চক্কর ঘুরে আসতে ওর সময় লাগে মোটামুটি আধ ঘণ্টা। বাড়ি ঢোকার আগে ও ডাকবাক্সটি খুলে চিঠিগুলো বার করে নেয়। বেশিরভাগই বাজে বিজ্ঞাপন, আধুনিক ভাষায় জাঙ্ক মেইল, অবিলম্বেই তাদের জায়গা হয় রিসাইক্লিং বিনে। দরকারি কিছু থাকলে তারা কিচেন কাউন্টারের ওপর অপেক্ষা করবে, যতক্ষণ না ইন্দ্রাশিস বাড়ি ফেরে। ও কখন বাড়ি ফিরবে সেটা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে ওর ক্লায়েন্টদের ওপর নির্ভরশীল, সুতরাং সে সময়টা সন্ধ্যে সাতটাও হতে পারে, রাত দশটাও হতে পারে। রঞ্জনা তার অনেক আগেই ডিনার রেডি করে রাখে কেননা কনি ঠিক সাড়ে ছটা থেকে সাতটার মধ্যে ওর ওপরের ঘর থেকে নামত, ডিনার খেয়ে আবার ওখানেই ফিরে যেত ঝটপট। শুধু ওইটুকু সময়ের জন্য ও মোবাইলের পর্দা থেকে চক্ষু সরাত, কপাল ভালো থাকলে দু-চারটে কথাবার্তাও হয়ে যেত কখনো-সখনো। কনি অর্থাৎ ওদের একটিমাত্র কন্যা কনীনিকা, বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে ভোরবেলার মায়াবী রোদ্দুরের মতন স্নিগ্ধ উজ্জ্বল এক অষ্টাদশী। কিন্তু ওর মনের বাসা ওর বাবা-মায়ের জগৎ থেকে বহুদূরে, কীরকম যেন অন্য এক গ্রহের বাসিন্দা, যেমন দেখা যেত সেই স্টার ওয়ার সিনেমাটায়। সে ঠিক ছ’মাস হলো কলেজে চলে গেছে, ওদের শহর থেকে মাত্র হাজার মাইল দূরে শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে। দিনের পরে দিন কেটে যাবে, ওই মুখটা অন্তত দু-মিনিটের জন্য হলেও প্রতিদিন দেখতে পাবে না রঞ্জনা। অথচ মেয়ে যে শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশিপ নিয়ে ভর্তি হয়েছে, এটা রঞ্জনা এবং ইন্দ্রাশিসের বাঙালি সমাজে মহা গর্বের বিষয়।
এই দেশ কাজ করিয়ে করিয়ে মানুষকে নিংড়ে নেয়। যেমন ইন্দ্রাশিস, সেই টগবগে যুবকটি এখন যেন এক যন্ত্রমানব। এই টেকনোলজি কেনাবেচার জগতে ও কি আদতে মানুষ, নাকি স্রেফ একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা? কিন্তু এসব ভেবে লাভটাই বা কি? যতদিন শেয়ারের দাম ঠিকঠাক, মাসে মাসে এই বিশাল বাড়িটার মর্টগেজ দেওয়া চালু, ততদিন ধরে নেয়া উচিত যে সব ঠিক আছে। যতক্ষণ বি-এম-ডব্লিউ গাড়িটা হাইওয়ে বেয়ে ছুটবে, উইকএন্ডে স্থানীয় গসিপ, সেলফি আর সিঙ্গল মল্ট হুইস্কির স্রোত বইবে, ততক্ষণ সপ্তাহের বাকি পাঁচদিনের জন্য সক্কলে এখানে সুভদ্র রোবট। যতদিন দেওয়ালজোড়া টেলিভিশন এবং মুঠোর মধ্যে জীবন্ত টেলিফোন থাকবে, বছরে দু’-চার হপ্তা দুনিয়ার নানান প্রান্তে সাজিয়ে রাখা প্রেক্ষাপটে চক্ষু ধাঁধানো রিসর্ট এবং প্রমোদতরণীরা থাকবে, ততদিন নওজোয়ানের দল সাইবার শ্রমিক হবার জন্য এইচ-ওয়ান ভিসার লাইনে দাঁড়াবে। গ্রীন কার্ড মিলে গেলেই তাদের ছেলেমেয়েরা প্রথম পৃথিবীর বাসিন্দা, যদিও সেখানকার অল্পবয়েসীদের মধ্যে আত্মহনন এবং অবসাদের এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে এই দশকেই। এই অদ্ভুত নব-বুর্জোয়া জীবনযাপনের জন্য ওই অলীক নিরাপত্তাই সবচেয়ে তাগড়া অজুহাত এবং ঠিক ওইভাবেই নাগরিক রূপকথারা তৈরি হয় এবং বেড়ে ওঠে, ঠিক যেমন রঞ্জনার ব্যাকইয়ার্ডে বিরাট ওই উইপিং উইলো গাছটি। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে রঞ্জনা প্রতিদিন দেখতে পায় সেই গাছ, যাকে ও একদিন শিশু অবস্থায় নিজের হাতে মাটিতে পুঁতেছিল, রক্ষা করেছিল ঝড় এবং খরার কবল থেকে। সে এখন শিকড় নামিয়ে বিপুল হয়ে উঠেছে, নুয়ে পড়া ক্রন্দসী তার ডালপালায় আকাশ আচ্ছন্ন করে। এখন তার শিকড়গুলো রঞ্জনাদের বাড়ির ভিতের ভেতরেই হানা দিচ্ছে, কিছুদিন বাদে ওটাকে কেটে ফেলা ছাড়া উপায় থাকবে না, অথবা ও নিজে থেকেই যথেষ্ট জল না পেয়ে মরে যাবে।
খামগুলোকে কিচেন কাউন্টারের ওপরে ফেলে রেখে ও রান্না বসাতে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময় অন্যরকম একটা চিঠি ওর দৃষ্টি টেনে নিল। একগাদা জাঙ্ক মেইলের পানাপুকুরে ঠিক যেন শালুক ফুলের মতন ফুটে আছে গোলাপি রঙের অন্যরকম একটা খাম, তার ওপরে রঞ্জনার নাম-ঠিকানা নীল কালিতে নিখুঁত ক্যালিগ্রাফিক কায়দায় লেখা। সবচেয়ে মজার ব্যাপার এই যে ফিরতি ঠিকানার জায়গায় রয়েছে শুধু একটা লাল গোলাপ ফুলের ছবি।
রঞ্জনা জানে যে সারাক্ষণ ইংরেজি বলতে আর শুনতে বাধ্য হয়ে প্রতিদিন কয়েকটা করে বাংলা কথা হারিয়ে যায়। ও কয়েক সেকেন্ড মনের মধ্যে হাতড়ে বেড়ালো তারপর শব্দটা যেন ব্যাঙের মতন লাফিয়ে উঠল মগ্নচেতনায়। ফিরতি ঠিকানা নেই মানে এটা হচ্ছে উড়ো চিঠি! আধ মিনিট ভেবেচিন্তে দেখল রঞ্জনা, একবার মনে হলো চিঠিটা ফেলেই দেয় কিন্তু ওই হাতের লেখা আর ওই কালচে গোলাপ ওকে কাবু করে ফেলল । স্মৃতির কোন অন্ধকার থেকে সিগন্যাল চলে এল কে জানে, ও ঝপাং করে খুলেই ফেলল চিঠিটা। অনেক বছর পরে ও মাঝে মাঝেই সংগোপনে এই মুহূর্তটার কথা ভেবে আরেকবার নতুন করে হতবাক হয়ে যাবে। সামান্য একটা আঙুলের নড়াচড়ায় কেমন করে একটা গোটা জীবন বদলে যায়।
রঞ্জনা, এই অদ্ভুত চিঠি তুমি হয়তো জাঙ্ক মেইলের গাদায় ফেলে দেবে, তাও একটা চান্স নিয়ে দেখছি। জানা কথা যে আমাকে তুমি ভুলে গেছ। জীবনের এই অদ্ভুত জেলখানায় টিঁকে থাকবার একমাত্র উপায় বিস্মরণ, সোজা কথায় দুঃখগুলো বেমালুম ভুলে যাওয়া। কোনো বদ উদ্দেশ্য নিয়ে এই চিঠি লেখা নয়, এ চিঠির জবাব দেওয়ার কোনো দায় নেই তোমার। এ নিতান্তই একপেশে উদ্ভট, শুধু একজন বিদায়ী মানুষের ফিরে দেখার পাগলামি। একদিন আমার জীবনে তুমি খুবই বাস্তব ছিলে, কিন্তু সে কথা তুমি জানতে না। আমরা দুজন একটি গাঁয়ে বাস করতাম, ওইটুকুই ছিল আমার সুখ। আমি তোমাকে দেখতে পেতাম কিন্তু তুমি আমাকে দেখতে পেতে না। আজকাল মানুষ হাজার হাজার মেসেজ পাঠায় কিন্তু চিঠি কেউ লেখে বলে জানি না। তাই মনে হলো দিনান্তের এই অবসরটুকু চিঠি লিখেই কাটাই। তোমাকে হয়তো বিব্রত করলাম, তাই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আজকের মতন নাহয় এইটুকুই রইল--
ইতি,
জে
অনেকটা প্যাপিরাসের মতন মোটা খসখসে কাগজ, তার ওপরে মুক্তোর মতন গোটা গোটা বাংলা অক্ষরে চিঠি লেখা। কাগজটার মধ্যে একটা অদ্ভুত বুনো গন্ধ আছে, সম্ভবত ন্যাপথালিন--নাকি গরম মশলা, কে জানে? রঞ্জনা বেশ খানিকক্ষণ হতভম্ব হয়ে ওটার দিকে তাকিয়ে থাকল। ব্যাপারটা শুধু অপ্রত্যাশিত নয়, মোটামুটি অবাস্তব কেননা এইরকম বাংলা ভাষায়, কাগজে কলমে চিঠি লিখতে ও শেষবার দেখেছে যখন বিদেশে আসার পরে ওর মায়ের কাছ থেকে প্রথম চিঠিগুলো পেয়েছিল। সেটা ছিল ২০০০ সাল, ইন্টারনেট তখনো সতেরো বছরের নাদান ছোকরা, গুগুলের বয়েস মাত্র দু’বছর, ফেসবুক পয়দা হতে তখনও চার বছর দেরি আছে। ১৯৯৩ সালের আগে পাবলিক এই মহাসুরের সঙ্গে পরিচিত হয়নি, সোশ্যাল মিডিয়া চালু তো হয়ে গেছে কিন্তু তখনও সে পুরোদস্তুর সর্বত্র বিরাজমান পরমেশ্বর হয়ে ওঠেনি। তখনও অবধি কিছু মানুষ হাতে চিঠি লিখত, বিনা নিমন্ত্রণে বন্ধুর বাড়ির দরজায় টোকা দিত। মোবাইল ফোন তখনও মানবজীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি আবেগ এবং অবস্থানকে চটজলদি বাজারে বিক্রি করে দিতে পারত না। মাত্র দুই দশকের মধ্যে ব্যক্তিগত শব্দটা ডিকশনারি থেকে পুরোপুরি মুছে গেল। এখন সব অলীক, সব কিছু হাতের নাগালে, বায়ুভূত নিরাশ্রয়, নিরালম্ব, নিরাবয়ব।
জে এমন একটা সাধারণ অক্ষর তাই যে কেউই জে হতে পারে, ও কিছুতেই কিছু মনে করতে পারছে না। অনেক নাম আর মুখ ওর মনের গোলকধাঁধাঁয় ঘুরছে, এই নতুন রহস্যের সামনে দাঁড়িয়ে অনেক দিন বাদে ওর রক্তচলাচল দ্রুত হয়ে উঠেছে, মনের গভীরে কোথায় যেন একটা হতচ্ছাড়া পুরনো জং ধরা লোহার দরজা হাজার ঠেলাতেও খুলছে না কিছুতেই।
মনের দরজা বন্ধ থাকলেও গ্যারেজের দরজা খোলার আওয়াজ ওর সংবিৎ ফিরল। ইন্দ্রাশিস বাড়ি ফিরেছে, এবারে ওরা ডিনার খাবে, তারপর দ্যাবা-দেবী বসে যাবে যে যার ফোন কিংবা ল্যাপটপ নিয়ে, তারপর ভাগ্যক্রমে ইন্দ্রর কাজ না থাকলে নেটফ্লিক্সে একটা দুটো সিরিয়াল। কী সর্বনাশ, খাবারটাও গরম করা হয়নি, পুরো দেড়ঘণ্টা ধরে ও কীরকম যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। মেয়েটা যতদিন বাড়ি ছিল, হাইস্কুলের সেই কয়েক বছর শুধু এই খাবার সময়টাতেই দেখা হতো ওদের। আরো পুরনো হয়ে যাওয়া বছরগুলোর দিকে তাকালে আবছা কুয়াশার মধ্য থেকে উঁকি দেয় নানারঙের ভালোবাসা দিয়ে আঁকা ছোট্ট একটা ফুটফুটে মেয়ের মুখ। এই দেশের যৌবন বাইরে থেকে যেমন উদ্ধত আর নিষ্ঠুর, ভেতরে ভেতরে ততটাই বিপন্ন। আচ্ছা, অল্পবয়েসে ও নিজেও কি এরকম ছিল? ফর্সা রঙ, ছাঁচে ফেলা সুন্দর মুখ, ঢেউ খেলানো চুল, দুর্দান্ত ফিগার আর চমৎকার গানের গলার জন্য ওর ভেতরেও কি জমা হয়েছিল অহংকার? না বুঝে কার মনে ব্যথা দিয়েছে, কে কখন আঁখিজলে ভেসেছে কে জানে? মা, বাবা, বন্ধু কিংবা বান্ধবী, যেই হোক না কেন, তাদের গল্পরা এখন গভীর রাতের অন্ধকারে। রঞ্জনা নিজেও যেমন আজকে এই পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে এসে চুপি চুপি একলা সেই অদ্ভুত অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। এই সবের মধ্যে কোত্থেকে এই উড়ো চিঠি এসে হাজির।
২
“বৃতি শোন, আমি না কিছুদিন ধরে অদ্ভুত সব চিঠি পাচ্ছি। আজ লাঞ্চে আসতে পারবি, তোকে দেখাব। আই নিড সাম অ্যাডভাইস,” রঞ্জনা প্রায় ফিসফিস করে কথা বলছে যদিও বাড়ি এখন বিলকুল ফাঁকা। ও এখানকার পাবলিক স্কুলের সাইন্স শিক্ষিকা, এখন গরমকাল, স্কুল বন্ধ তাই স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও ছুটি। ইন্দ্র কখন বাড়ি ফিরবে তার কোনো ঠিক নেই। শেষ বিকেলের আলো কাঁচের জানলা দিয়ে উপচে পড়ে ওর রান্নাঘর ভাসিয়ে দিচ্ছে। অবশ্য রান্নাঘর বলতে যে ছবিটা মনে আসে তার সঙ্গে এই প্রশস্ত এলাকাটির মিল নেই কোথাও। কাঁচের জানলা ঘেরা একটা বিরাট খোলা জায়গা, তার একদিকে ডাইনিং রুম অন্যদিকে বৈঠকখানা, মাঝখানে গ্রানাইট পাথরের কিচেন আইল্যান্ড, যেখানে দুটো লোককে দিব্যি পাশাপাশি শুইয়ে রাখা যায়। আপাতত অবশ্য তার ওপরে একজোড়া চিঠি পাশাপাশি শুয়ে আছে, আর এক কোনায় মুঠোফোন নিয়ে নার্ভাস মুখে দাঁড়িয়ে আছে রঞ্জনা। ওপ্রান্ত থেকে বৃতির হাসিটা জলতরঙ্গের মতন বেজে উঠল , সে আর থামতেই চায় না। এই তল্লাটে সামাজিকভাবে অনেক বাঙালির সাথে মিশতে হয় কিন্তু একমাত্র বৃতির সঙ্গেই ও সখী পাতিয়েছে, কেননা ওরা একই কলেজের ছাত্রী ছিল একসময়। বয়সে কয়েক বছরের ছোটো হলেও রঞ্জনাকে ও দিদি বলে না, তুই-তোকারি করে অক্লেশেই।
“এ তো দারুণ রোম্যান্টিক ব্যাপার রে! শিগগির প্লীজ, চিঠিগুলো পড়ে শোনা।”
“ইয়ার্কি মারিস না বৃতি। আচ্ছা জে নামে কাউকে মনে আছে তোর?”
“দেখ, তোর পেছনে যেসব দাদারা লাইন মারত তাদের হিসেব দিতে গেলে তো মোটামুটি একটা বই লেখা হয়ে যাবে কিন্তু যদ্দুর মনে পড়ে জে মানে জয়, জয়ন্ত বা জয়দীপ, এরকম তো ডজনখানেক আছে। সখী হে, তোমার চোখের তীরধনুকে কে যে কোথায় শহিদ হয়ে গেছে তার হিসেব জানেন চিত্রগুপ্ত। তুই এক কাজ কর, চিঠিগুলো স্ক্যান করে পিডিএফ ফাইল আমায় পাঠিয়ে দে, আমিও একটু চেখে দেখি।” বৃতি রীতিমতন উত্তেজিত।
“হাসির কথা নয় রে, আমার কিন্তু রীতিমতন ভয় করছে। ফেসবুক হলে ব্লক করে দিতে পারতাম, কিন্তু হাতে লেখা উড়ো চিঠি--” রঞ্জনার গলাটা অসহায় শোনালো।
“স্রেফ ছিঁড়ে ফেলে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যেত। কিন্তু বাইশ বছর বিবাহিত জীবনের পর এমন অভাবিত রোম্যান্টিক সুড়সুড়ি, এর উত্তেজনাই আলাদা। সখী আমি যে তোমাকে হাড্ডিতে হাড্ডিতে চিনি,” ওদিক থেকে একটা নকল দীর্ঘশ্বাস ভেসে এল।
“আচ্ছা একটা কথা বল তো? আমার কি ইন্দ্রকে বলা উচিত? তুই হলে কী করতিস?”
“ও ইয়া, আমি হলে তো শুভকে সঙ্গে সঙ্গে পড়ে শোনাতাম এবং তার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন থ্রেট থাকত। দেখো বয়েস হয়েছে বলে ভেবো না যে আমার চার্ম কিছু কমে গেছে। হুঁ-হুঁ বাবা দেখে রাখো, তুমি উড়লে আমিও উড়তে পারি,” বৃতি এমন গলায় কথাগুলো বলল যে রঞ্জনাও ওর সঙ্গে না হেসে পারল না। পরক্ষণেই ওর মনে আবার সেই অদ্ভুত দোলাচল- একদিকে কী করা উচিত অন্যদিকে কী করতে ইচ্ছে করে। ও সত্যিই জানে না ইন্দ্র ব্যাপারটাকে কেমনভাবে নেবে, কেননা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের সূত্রটা সত্যিসত্যিই হারিয়ে গেছে ওদের। ইন্দ্র ক্লায়েন্টের খোঁজে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়, রোজ গভীর রাত্তির অবধি কাজ করে। উইকএন্ড ফাঁকা থাকলে সকালে টেনিস খেলে, দুপুরে ঘুমায়, বিকেল থেকে আমেরিকান ফুটবল দেখা থেকে শুরু করে রাত্তিরে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে পোকার খেলে গল্প শেষ। বছরের পর বছর ধরে চলেছে এই এক ক্লান্তিকর রুটিন অথচ স্বামী হিসেবে ওকে কেউ খারাপ বলতে পারবে না, রঞ্জনা তো নয়ই। পার্টি না থাকলে ইন্দ্র মদ অবধি খায় না, অতি ভদ্র ব্যবহার, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা রোজকার করে, যা দেওয়া হয় তাই সোনামুখ করে খায়, খেলাধুলো ভালোবাসে, কারো সাতে-পাঁচে থাকে না। তবুও কোথায় যেন এ সংসারের তার কেটে গেছে, সেটা হয়তো রঞ্জনারই দোষ। নাঃ, আজ রাত্তিরেই ও ইন্দ্রকে দেখাবে চিঠিগুলো। যা হয় হোক, একলা একলা এই সব উল্টোপাল্টা আবেগের টানাটানি আর ও নিতে পারছে না।
গ্যারেজ খোলার শব্দ না? রঞ্জনা এমন চমকে উঠল যে হাত থেকে চায়ের কাপটা পালিশ করা ওক কাঠের মেঝেতে ছিটকে পড়ে চুরমার। ঠিক সেই সময় গ্যারেজের দরজা খুলে ঘরে ঢুকছে ইন্দ্রাশিস। রঞ্জনা যেন হাইওয়ের মধ্যিখানে হেডলাইটে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া হরিণী।
“রুনু তোমার খালি পা, একদম নড়াচড়া কোরো না। আমি দেখছি--”
নিজের ডাকনামটা শুনেও যেন ও চমকে উঠল। ওর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, সরি কথাটাও ঠিক করে বেরোচ্ছে না।
“আরে ঠিক আছে। অ্যাক্সিডেন্ট।” ইন্দ্র খুব ক্যাজুয়ালি ট্রে আর ডাস্টার দিয়ে পটাপট পোর্সেলিনের টুকরোগুলো পরিষ্কার করে ফেলল, তারপর বসে গেল ওর ফোন নিয়ে। কে জানে কোন চুলোয় ক্রিকেট ম্যাচ হচ্ছে, ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়া, ওইখানেই আপাতত ওর সমস্ত মনোযোগ।
ঘন্টা তিনেক বাদে ডিনার শেষ করে ওরা বিছানায়। প্রকাণ্ড কিং সাইজ বিছানায় দুই প্রান্তে দুটি প্রাণী, দুটো-চারটের বদলে গুনে গুনে বারোটা বালিশ এবং সম্মুখে আটান্ন ইঞ্চি এক রাক্ষুসে টেলিভিশন। যখন চলতে থাকে, বোস কোম্পানির সারাউন্ড সাউন্ডের দাপটে পিলে চমকে যায়। আজ অবশ্য কোনও শব্দ নেই, ইন্দ্র বোধহয় খেলা দেখতে দেখতে হাঁপিয়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ার প্ল্যান করছে। এদিকে রঞ্জনার ভেতরে ছটফটানি বেড়েই চলেছে, চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়া এখন ওর পক্ষে অসম্ভব। সন্ধ্যাবেলায় ও বেশ কয়েকবার একটা ক্যাজুয়াল কথাবার্তা শুরু করতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু ইন্দ্র পুরোপুরি ওর খেলার জগতে। এবারে ও মরিয়া হয়ে উঠল।
“ইন্দ্র শুনছো? একটা কথা আছে--”
“কাল শুনব, এখন আমার ঘুম পাচ্ছে রুনু,” একটা হাই মিশিয়ে জবাব দিল ইন্দ্র। রঞ্জনা জানে আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে লোকটার নাক ডাকতে থাকবে। কথা না বললেই ল্যাঠা চুকে যায় কিন্তু আজকে ও মরিয়া!
“আমাকে একটা লোক চিঠি লিখছে। রোম্যান্টিক চিঠি।”
“ব্লক করে দাও।” প্রায় ঘুমন্ত অবস্থায় ইন্দ্র বিড়বিড় করল। রঞ্জনার ইচ্ছে হলো লোকটার চুলের মুঠি ধরে আচ্ছাসে ঝাঁকিয়ে দেয়।
“লোকটা ডাকে চিঠি পাঠাচ্ছে উইদাউট রিটার্ন অ্যাড্রেস,” প্রায় চিৎকার করে বলল ও।
এতক্ষণ বাদে অনিচ্ছায় ঘুমচোখে এপাশ ফিরল ইন্দ্র। তারপরে হঠাৎ কী মনে করে একলাফে উঠে পড়ল বিছানা থেকে, দপ করে জ্বলে উঠল টেবিলল্যাম্প।
“দেখি দেখি চিঠিগুলো দেখি,” ইন্দ্রর দু’চোখে উত্তেজনা।
কাঁপা হাতে দুটো খাম এগিয়ে দিল রঞ্জনা। ওর বুকের ভেতরে জংলি ড্রাম বাজছে।
ইন্দ্র খামগুলো উল্টে-পাল্টে দেখতে থাকল, ওর মুখের ভাব দুর্বোধ্য। রঞ্জনা মরিয়া হয়ে ডিফেন্সিভ নাকি অফেন্সিভ স্ট্রাটেজি নেবে ভাবছে। সরি ইন্দ্র, আমার উচিত ছিল আগেই তোমাকে বলা। তোমার বুঝি আমার কথা শোনার জন্য সময় আছে? আমি এইরকম কোনো লোককে চিনি না, ও কী করে আমার ঠিকানা পেল তাও জানি না। ওকে ইন্দ্র, কেউ একজন এইরকম সুন্দর বাংলায় আমাকে চিঠি লিখছে, তার জন্য আমি দায়ী নই, রাইট? তুমি কি জীবনে কোনোদিন আমাকে চিঠি লিখেছ? আজকাল তো আমার দিকে তাকিয়েই দেখো না, শুধু অফিস, ট্যুর আর স্পোর্টস নিয়ে আছ!
এইসব কথার একটাও বলতে হলো না। ভীষণ সিরিয়াস গলায় ইন্দ্র তার বক্তব্য রেখেছে এবং তা শুনে হাসবে কি কাঁদবে বুঝতে না পেরে রঞ্জনা এখন সাময়িকভাবে বোবা।
“রুনু, এ নির্ঘাত কোনো সাইকোপ্যাথের কাজ! তোমাকে স্টক করছে, তারপর সুযোগ বুঝে একদিন স্রেফ ফালাফালা। দাঁড়াও কাল সকালেই পুলিশে খবর দেব। ওরে বাবা, সকাল সাতটায় আবার কল আছে, ক্লায়েন্ট সিঙ্গাপুরে। যত সব উটকো ঝামেলা। ভয় পেও না, ঘুমিয়ে পড়ো এখন।”
রঞ্জনার গালে একটা ঠোকর দিয়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছে ইন্দ্র, একটু বাদেই ওর নাক ডাকা শুরু হয়ে যাবে। ঠিক এই সময়টা জানলা দিয়ে একফালি জ্যোৎস্না চুরি করে সেঁধিয়ে যায় এক-একদিন। বাইরে রাস্তার আলো আর বিরাট বিরাট বাড়িগুলোর চতুর্দিকে ল্যান্ডস্কেপ লাইটিং একজোট হয়ে কড়া পাহারা বসিয়েছে, জ্যোৎস্নার সেখানে প্রবেশ নিষেধ। শুধু রঞ্জনার শোবার ঘরে আবছা স্মৃতির মতন এককোনায় শুয়ে থাকে জ্যোৎস্না। ওইদিকে তাকিয়ে ভূতগ্রস্তের মতন রঞ্জনার সারা শরীর শক্ত হয়ে যায়, যেন চুপিচুপি ওর রক্ত চুষে খাচ্ছে কোনো ভ্যাম্পায়ার। ওর মাথার মধ্যে দুটো মানুষ ঝগড়া করতে থাকে, যতক্ষণ না অন্ধকার হালকা হয়ে শুকতারা গুটি গুটি পায়ে এসে হাজির হয়েছে।
৩
“শোনো আজ সন্ধ্যাবেলা শুভ আর বৃতিকে আসতে বলেছি। চিন্তাভাবনা করে এর একটা বিহিত করতে হবে। পুলিশ তো পাত্তাই দিল না কিন্তু আমার বাপু ভয় যাচ্ছে না।”
ইন্দ্রর গলার মধ্যে একরাশ দুশ্চিন্তা। ও চিঠিগুলো ভালো করে পড়েও দেখেনি। ওর মনে কি ঈর্ষা বলে কিছু নেই, শুধু ওর সংসারের ক্ষতি হতে পারে তাই নিয়ে ওর যাবতীয় চিন্তা? এই সংসারটাকে ও একটা ধ্রুবক বলে ধরে নিয়েছে যেমন নাকি জি ফোর্স, যা কস্মিনকালেও বদলাবে না। নারী হিসাবে রঞ্জনাকে ও কি আর ভালোবাসে না, নাকি কোনদিনই বাসেনি, নাকি ওটাই ওর কাছে ভালোবাসা, ওই কমফর্ট জোন ঠিকঠাক রাখতে ও খেটে চলেছে দিনরাত। বইতে পড়া যতগুলো অবৈধ প্রেমের কথা জানা আছে, মাদাম বোভারি থেকে আনা কারেনিনা হয়ে চারুলতা আর বিমলা, সবকটাকে ও খতিয়ে দেখল। এরা সবাই অন্তত তার প্রেমিকটিকে চিনত, ছুঁতে পারত, রঞ্জনার ভাগ্যে তাও নেই। ওর আছে শুধু এক আশ্চর্য বাগান, সেখানে কথাগুলো সব গাছ আর কবিতারা ফুল। সেই বাগানের সবুজ অন্ধকারে পেছনে যে আছে সে কি পুরুষ না নারী নাকি স্রেফ রোবট, এটা কি প্র্যাঙ্ক নাকি হাহাকার, নাকি কোনো আধপাগলা অধ্যাপকের সাইকোলজিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট? কিছুই জানা নেই তবুও কথাগুলো বুকের মধ্যে এমন ঢেউ তোলে কেন? আচ্ছা, রঞ্জনা কি ডিপ্রেসড, কনি কলেজে চলে যাবার জন্য শূন্যতায় ভুগছে? নাঃ, এই শূন্যতা শুরু হয়েছিল তারও অনেক আগে বিশেষ একটা দিনে, ঠিক যেমন করে স্ট্রোক কিংবা হার্ট-অ্যাটাক হয়।
সেটা ছিল ওর বাবার মৃত্যুদিন, ইন্দ্রাশিস ট্যুরে গেছে, কনি তার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সকাল থেকেই হাওয়া, কোথায় গেছে তাও বলে যায়নি। বাপ আর মেয়ে দুজনেই অকারণে ফোন করলে বিরক্ত হয়। সেটাও ছিল গরমের ছুটি কাজেই স্কুল বন্ধ, রঞ্জনা ওর পর্চের ঠিক এই জায়গাটাতেই বসে কফি খাচ্ছিল। সামনের মেপল গাছটার ডালপালায় একজোড়া মহাব্যস্ত কার্ডিনাল পাখি বাসা বানানোর জায়গা খুঁজছিল। রঞ্জনার মনে হয়েছিল কে যেন একটা কাচের জার দিয়ে ওকে চাপা দিয়েছে, এখন থেকে শেষদিন অবধি আর কিছুই হবে না। নিঁখুত, শৃঙ্খলাময় অথচ নিষ্প্রাণ এক মানবমিছিলে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলতে হবে রঞ্জনাকে। এই নিয়মের সঙ্গে লড়তে যাওয়া আর দেওয়ালে মাথা কুটে মরা একই গল্প। তখন থেকে ও যেখানে যায়, কাচের জারটাও ওর সঙ্গে সঙ্গে যায়, কেউ কিচ্ছুটি টের পায় না। বাইরে গরম ঠান্ডা যাই হোক না কেন, কাচের ঢাকনার মধ্যে উত্তাপ নিয়ন্ত্রিত থাকে ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
রঞ্জনা ঠিক করল চিঠিগুলো আর কাউকে দেখাবে না, যদিও প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে তারা আসছে। কবিতাগুলো পড়তে পড়তে মুখস্থ হয়ে গেছে তবুও হাতে লেখা এই বাংলা অক্ষরগুলোর মধ্যে কী যে অমোঘ আকর্ষণ--
দুইচোখে তোর বৃষ্টিলেখা, রাতের ধারাপাত,
পথ খুঁজেছিস অন্ধকারে, বাড়িয়ে আছিস হাত?
পথের শেষে জ্বলছে ধুনি, মন পোড়ানো আঁচ,
আনমনা তোর উড়ছে ছবি, ছড়িয়ে আছে কাচ।
কাচ তুলেছিস অসাবধানে, শ্বেতপাথরে ছাপ,
আঙুল বেয়ে রক্তধারা, স্মৃতির অভিশাপ
সব ভুলে তোর উড়ছে ছবি, যেমনি কাটা ঘুড়ি
লাটাই সুতো রইল পড়ে, ভাবের ঘরে চুরি।
আকাশটা এতক্ষণ বোধহয় মেঘ করে ছিল নাকি রোদ্দুর ছিল আগাগোড়াই, শুধু ও দেখতে পায়নি। যাই হোক কবিতাটা পড়তে পড়তে ওর মনে হলো কোত্থেকে যেন অনেকটা রোদ্দুর পর্চের ওপরে এসে পড়েছে এবং কী অদ্ভুত কাণ্ড যে রোদের উত্তাপটা টের পাচ্ছে রঞ্জনা। কাচের জারটা কি বরফের মতন গলে গেল এই রোদ্দুরে? ও নিজেকে সামলে নিয়ে প্রায় উড়তে উড়তে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। বৃতিরা আসছে, তার আগে সবকিছু ঠিক করে রাখতে হবে, দেরি হয়ে গেছে এমনিতেই।
বৃতির বর শুভজিৎ স্বভাবে ইন্দ্রর ঠিক উল্টো। ভীষণ কথা বলতে ভালোবাসে, যে-কোনো পার্টিতে ওর গলা আর হাসি সবার ওপরে শোনা যাবেই যাবে। ওরা দুজনে একই মালটিন্যাশনাল ওষুধ কোম্পানিতে কাজ করে তাই ওদের মধ্যে দেখাশুনাও অনেক বেশি, মনে হয় সখ্যতাও বেশি। সে কথা বৃতিকে বলতে গেলে ও হেসে উড়িয়ে দেয়। এমন ভালো বন্ধু না হলে রঞ্জনা ওকে খুব জোর হিংসে করত।
বসার ঘরে এখন শুভ হুইস্কির গ্লাস হাতে নিয়ে পুরো বৃত্তান্তটা খতিয়ে দেখছে। ইন্দ্র মোটামুটি শ্রোতা কিন্তু তাই বলে শুভর সঙ্গে একমত নয় মোটেই। ও বিচার করে দেখেছে যে প্রথম চিঠিটা এসেছিল উত্তর আমেরিকা বঙ্গ সম্মেলন শেষ হবার এক হপ্তার মধ্যে, পোস্টমার্ক এই নিউ জার্সি শহরেই।
“ওই কনফারেন্সের রেজিস্ট্রেশন ডাটাবেস থেকে কেউ একজন ঠিকানাটা হাতিয়েছে। বারো ভূতের কারবার, শালা ওখানে ডাটা সেফটি বলে থোড়াই কিছু আছে। এই লোক রঞ্জনাকে চেনে, কমবয়েসে ওর কাছ থেকে দিলে চোট পেয়েছিল। সম্ভবত পাগলাটে টাইপের কিংবা গাঁজাখোর, নাহলে উড়ো চিঠি না পাঠিয়ে ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে আলগা ফ্লার্টিং দিয়ে শুরু করত, যেমন সবাই করে।” শুভ বলল।
“সেটাই তো তখন থেকে বলে যাচ্ছি, লোকটা সাইকো এবং ডেঞ্জারাস, এদিকে পুলিশ বলছে প্র্যাঙ্ক। ভাবছি একটা বন্দুক কিনব--” ইন্দ্র উত্তেজিত হয়ে উঠেছে।
“তুই যে প্লেনে বিজনেস ক্লাসে বসে এন্তার থ্রিলার দেখছিস এটা বুঝতে পারছি।” শুভ হতাশভাবে হুইস্কির গ্লাসে একটা লম্বা চুমুক মারল।
“দাঁড়াও, আমি কাবাবগুলো নিয়ে আসি,” রঞ্জনা টুক করে উঠে রান্নাঘরে চলে গেল।
“দয়া করে বন্দুক কিনিস না। তোর-আমার বাপের জন্মে কেউ বন্দুক ধরেনি, ওসব আমাদের রক্তে নেই। মাঝখান দিয়ে সেমসাইড হয়ে যাবে।” শুভ বলল অনেকটা ধর্মগুরুদের কায়দায়।
“তাহলে করবটা কী? একটা প্রেডেটর বাড়ির আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর আমি তো অর্ধেক সময় ট্রিপে থাকি, বাড়িতে রুনু একলা। নেবারদের মধ্যে একটা সাদা, আরেকটা কালো, নামটা শুধু জানি, কেউ কাউকে চিনি না। হ্যাঁ, আলার্ম সিস্টেম আছে কিন্তু ও মাঝে মাঝেই ওটা সেট করতে ভুলে যায়।” ইন্দ্রর উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ নেই।
“তোর মাথাটা গেছে। এই আমি শুভ দত্ত হলপ করে বলে দিচ্ছি যে এ লোক ক্রিমিন্যাল নয়। ওই লেখার পেছন থেকে বাংলা সাহিত্য পড়া, অতিশয় পোঁদপাকা এবং প্যাথলজিক্যালি রোম্যান্টিক ছোকরা উঁকি মারছে। তুই চুপচাপ বসে থাক আর টেক কেয়ার অফ রুনু। তুই এরকম চাপ নিলে ও বেকার নিজেকে গিল্টি ভাববে।” শুভর গলায় এবার ধমকের সুর।
“বাংলা সাহিত্য পড়েছে মানে সে ক্রিমিন্যাল হতে পারে না। কী যুক্তি তোর মাইরি!” এবার ইন্দ্র হাল ছেড়ে দিল।
দুই বন্ধু কেউই টের পায়নি যে বৃতি নিঃশব্দে কখন উঠে রান্নাঘরের দিকে চলে গেছে।
“দেখা দেখা, বাকি চিঠিগুলো দেখা শিগগির। বলতে বলতে নতুন চিঠিটা প্রায় ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিয়েছে বৃতি। অফিশিয়ালি মাত্র দুটো চিঠি এসেছে, বাকি চিঠিদের অস্তিত্ব শুধু ওদের দুজনের মধ্যে।
“এ জিনিস এতদিন গা ঢাকা দিয়ে কোথায় ছিল রে? আমি তো ঘায়েল হয়ে গেলাম! এই শোন, তোকে না আমার হিংসে হচ্ছে, বুঝলি? শুভ রাতদিন বকবক করে, জীবনে এমন কবিতা আধখানাও যদি লিখতে পারত--” কবিতাগুলো পড়তে পড়তে বৃতি নিজেই নিজের মুখ চেপে ধরেছে, চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসে বুঝি।
দুই সখী নিজেদের সামলে নিয়ে আবার লিভিংরুমে এসে বসল । গরম গরম কাবাব আর শিঙাড়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সবাই। মনে মনে শুভকে ধন্যবাদ জানাল রঞ্জনা। ও যেহেতু সারাক্ষণ দরাজ গলায় বক্তব্য রেখে যায় তাই একজনের নৈঃশব্দ্য আরেকজনের নজরে আসে না।
ডিনার শেষ, দুই বন্ধুতে মিলে খেলা দেখতে বসে গেছে। ইন্দ্র শেষ অবধি একটু স্বস্তি পেয়েছে মনে হয়, সেটার কারণ হুইস্কি না শুভর লেকচার সেটা অবশ্য হলপ করে বলা মুশকিল। ওদিকে রান্নাঘরে সাবান জলে ডোবানো প্লেট, গ্লাস, কাঁটা, চামচ সব ফটাফট করে ডিসওয়াশারে পুরছে ওদের বউরা। কয়েক মিনিট বাদে যন্ত্রটার ভেতর থেকে একটা খুব হালকা জলপ্রপাতের মতন শব্দ শোনা যাবে, তার মানে ওটা চালু হয়ে গেছে। হাতটা মুছতে মুছতে রঞ্জনার দিকে এক ঝলক তাকাল বৃতি, কিছু একটা তরল ইয়ার্কি ওর মুখে এসে গিয়েও আটকে গেল। রঞ্জনার মুখের ওপরে বিপন্নতার কালো মেঘ জমেছে, থেকে থেকে চমকে উঠছে উত্তেজনার বিদ্যুৎ।
“রুনু, কী হয়েছে রে? ওই লোকটা কি--” বৃতির কথা শেষ হবার আগেই নিঃশব্দে আরেকটা নতুন চিঠি ওর দিকে এগিয়ে দিল রঞ্জনা।
“এই চিঠিটা দ্যাখ।”
আমার পঁচিশ বছরের জন্মদিনে তুমি অনায়াসে একজন অপরিচিত মানুষকে বিয়ে করে পালিয়ে গেলে আমেরিকায়। তখন থেকে শুরু করে আজ পঞ্চাশ বছর বয়েস অবধি একটানা শুধু ছায়ার সাথে কুস্তি করার গল্প। ক্ষমতার নেশায় পাগল হয়ে, ভুলের পরে ভুল, অপরাধের পরে অপরাধ করে যাবার ইতিহাস। কিন্তু তবুও এই পৃথিবীর কোথাও তুমি আছো, তোমাকে শেষ অবধি খুঁজে পেয়েছি! কোন এক অদ্ভুত দুঃসাহসে আজ সকালে তোমার সঙ্গে একবার দেখা করার ইচ্ছে হলো। শুধু একবার, খোলা রেস্টুরেন্টে একবার চোখের দেখা। যদি এ অসম্ভব না হয়, যদি হাজার সংশয় উপেক্ষা করে সত্যিই এগিয়ে আসো তাহলে তুমি আমাকে ধন্য করবে। আমি ঠিক এই মুহূর্তে তোমার কাছাকাছিই আছি কিন্তু নাম-ঠিকানা দিতে ভরসা হচ্ছে না এখনও। যদি সত্যিই দেখা করতে চাও তাহলে তোমার ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচারটি লুকিয়ে না রেখে সেখানে একটা তাজা লাল গোলাপ ফুল রেখে দাও। যদি রাখো তাহলে জানব তুমি সত্যিই আমার পরিচয় জানতে চাও। যদি না রাখো তবে এইখানেই বিদায়। নিজের অসুস্থ জীবন থেকে তোমার সুস্থ জীবনে অশান্তির আগুন লাগাতে চাই না।
একান্ত তোমার
জে
“এবার আমি কী করব বৃতি? আমার কী করা উচিত? আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না রে--”
“চুপ কর। উচিত বলে কিছু আছে নাকি? কী করতে তোর মন চাইছে সেটা আগে বোঝ আর কাল লাঞ্চে আমার সঙ্গে দেখা কর। ভালোই হয়েছে, পেটের মধ্যে একটা প্রশ্ন অনেকদিন ধরে জ্বালাচ্ছে, এই ধাক্কায় তারও সমাধান হয়ে যাবে। জাস্ট রিল্যাক্স।”
“কই গো চলো। রাত একটা বেজে গেল তো--” লিভিংরুম থেকে শুভ্রর বাজখাঁই এবং জড়ানো গলা শোনা গেল।
“যাই রে, গাড়িটা দেখছি আমাকেই চালাতে হবে। বাই দা ওয়ে এই চার সপ্তাহে তোর বেশ খানিকটা ওজন কমেছে কিন্ত। সত্যি বলতে কি বেশ দেখাচ্ছে তোকে। তোর সেই পুরনো গ্লো ফিরে এসেছে আবার,” ওর মার্কামারা মুখ টেপা হাসিটা ছুঁড়ে দিয়ে বৃতির প্রস্থান।
ইন্দ্রাশিস এখন বেশ কিছুটা মাতাল, ও পত্রপাঠ ওপরে গিয়ে লেপের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। রঞ্জনা এটা-সেটা গুছিয়ে রেখে যখন ওপরে গেল, ততক্ষণে জানলা দিয়ে সেই সিঁধ-কাটা জ্যোৎস্নার ফালিটা নাইটস্ট্যান্ডের ওপর এসে পড়েছে। রুপোলি রঙের ওর ম্যাকবুকের ঢাকনাটা জ্বলজ্বল করছে সেই আলোয়।
৪
চিঠি আসা বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় মাস দুয়েক হতে চলল, ইন্দ্র এতদিনে একটু ভরসা পেয়ে ট্যুরে যাবার কথা ভাবছে আবার। সবাই মোটামুটি নিশ্চিন্ত যে এটা কোনো পাগলা লোকের প্র্যাঙ্ক, সাইকো হলে এত সহজে হাল ছেড়ে দিত না। কিন্তু সমস্যা থেকেই গেছে এবং সেটা রঞ্জনার স্বাস্থ্যসংক্রান্ত। মাইগ্রেনে ও আগেও ভুগত কিন্তু এখন সেটা বাড়াবাড়ির দিকে চলেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ও বিছানা থেকে মাথা তুলতে পারে না, ব্যথাটা মাথা থেকে ঘাড়ে ছড়িয়ে পড়ে, সেখান থেকে ডান হাতে। প্রাইমারি ডাক্তার থেকে নিউরোলজিস্ট অবধি গড়িয়েছে, তারা গুচ্ছের পরীক্ষা করে দেখেছে, ওষুধ দিয়েছে একগাদা, কিন্তু সুরাহা হয়নি কিছুই। শুভর মতে এটা পোস্ট ট্রম্যাটিক স্ট্রেস ডিসর্ডার, এবং ওই সাইকো স্টকারের ভয় দেখানোটাই এর আদত কারণ। ওদিকে আবার মানসিক অসুখের কথা একটুখানি তুলেছো কি, রঞ্জনা ফুঁসে উঠবে, “তোমরা কী ভাবছ, আমি নাটক করছি নাকি আমার মাথা খারাপ হয়েছে?” সুতরাং ইন্দ্রর ট্যুর পিছিয়ে যাছে ক্রমাগত। থিয়োরিটা যে ও মোটামুটি মেনে নিয়েছে, এবং মনে মনে অনুতপ্ত সেটা ওর আচরণ দেখেই বোঝা যায়। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছে, সন্ধ্যাবেলা অফিসের কাজ নিয়ে বসছে না, টেলিভিশনে খেলার বদলে বাংলা ছবি চলছে এবং সবথেকে তাজ্জব ব্যপার, মাঝেসাঝে রান্নাও করে ফেলছে দু’-একটা পদ। বাইরে থেকে নিয়মিত বাঙালি খাবার আনানোর ব্যবস্থা করেছে যাতে অসুস্থ শরীরে রঞ্জনাকে রান্না করতে না হয়। এর মধ্যে কনি এসে এক সপ্তাহ থাকার প্ল্যান করছে--সেই ফাঁকে ও ট্যুরের হাঙ্গামাটা মিটিয়ে আসতে চায়।
সেদিন সন্ধ্যাবেলা পর্চে বসে বৃতির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছিল রঞ্জনা। গরমকাল দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, কয়েক হপ্তার মধ্যে স্কুল খুলে যাবে, মেপল গাছের পাতায় রঙ ধরবে, শিরশিরে হাওয়া বইতে শুরু করবে সন্ধ্যাবেলায়। রঞ্জনার স্কুলও খুলে যাবে, কিন্তু কাজে ফিরে যেতে পারবে কি ও?
“সব ঠিক হয়ে যাবে রে রুনু। জাস্ট মাথাটা শান্ত করে ফেল তুই। ভেবে দেখ, যে এইরকমভাবে উড়ো চিঠি পাঠিয়ে প্রেম নিবেদন করে, তারপর বেমক্কা চুপ করে যায়, সে সত্যিই সন্দেহজনক। এই পুরো চ্যাপ্টারটা ডিলিট করে দেওয়াই ভালো।”
“ও বলেছিল লাল গোলাপের ছবি রেখে দিতে। তাই তো রেখেছিলাম, কিন্তু দেখা করার বদলে ও চুপ করে গেল কেন? আমার কি কোনও ভুল হয়েছিল?” রঞ্জনার গলায় অতল অবসাদ।
“সখী তুই তো মরেছিস রে। আচ্ছা এই বয়সে কেউ অদেখা, অচেনা লোকের প্রেমে পড়ে! এ তো কেষ্টঠাকুরের প্রেমে পড়ার মতন কাণ্ড। মানছি তোর সঙ্গে ইন্দ্রর সম্পর্কটা একটু শুকিয়ে গেছিল। মানছি ও অনেকটা সময় বাড়ির বাইরে থাকে, মানছি মেয়ের সঙ্গে তোর মতের মিল হয় না, মনের যোগাযোগও আলগা হয়ে আসছে, এই স-অ-ব মেনে নিচ্ছি। সব সত্ত্বেও এটা বুঝতে পারিস না ইন্দ্র তোর কতখানি খেয়াল রাখে, হি রিয়ালি কেয়ারস--”
“খেয়াল রাখে আর কেয়ার নেয়? হ্যাঁ, খুব কেয়ার নেয়, কিন্তু কোথায় একটা বিরাট খামতি হাঁ করে থাকে। কেউ বিশ্বাস করবে না, এইভাবেই তো এতগুলো দিন কেটে গেল। যা হোক মেয়েটা ছিল একটা জয়েন্ট প্রজেক্ট, সেটাও তো ফুরিয়ে গেল দেখতে দেখতে,” রঞ্জনা হাঁপাচ্ছে।
“শান্ত হ’ প্লীজ। দেখ ইম্যাজিনেশন বল রোম্যান্টিসিজম বল, এগুলো সবার আসে না। যাদের আসে, সেই সঙ্গে তাদের নানা রকম ব্যাগেজও চলে আসে। শিল্পী সাহিত্যিকদের ব্যক্তিগত জীবনগুলো কেমন, তার খবর তুই আমার থেকে বেশি রাখিস। রুনু, রুনু, হ্যালো--”
কেউ উত্তর দিচ্ছে না। এক মিনিট, দু’ মিনিট, তিন, চার। এবার বৃতির ভয় করতে শুরু করল। সত্যিই যদি এসব কোনও উন্মাদ পারভার্টের কাণ্ড হয়। একবার ভাবল শুভকে ফোন করবে, কিন্তু শুভর এখন জরুরি মিটিং চলছে, ওর ফোন বন্ধ। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কোনোরকমে ব্যাগ আর চাবিটা তুলে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল বৃতি।
বৃতি গাড়িটা পার্ক করে আগে বাড়ির চারপাশটা ঘুরে নিল একবার। রোদ্দুরে ঝিমোচ্ছে শান্ত শহরতলি, দুপুরবেলাটা এখানে পাখি আর কাঠবিড়ালিদের রাজত্ব। দরজা জানলা সব আস্ত আছে, জোর করে ঢোকার চিহ্ন নেই, অন্য কোনও গাড়িও দেখা যাচ্ছে না কোথাও।
খানিকটা ভরসা করে সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল বৃতি। কলিংবেলে আঙুল ছোঁয়ানোর আগেই ও বুঝতে পারল দরজাটা খোলা। আরো একবার ইতস্তত করল ও, একবার মনে হোল পুলিশ ডাকাই উচিত কাজ হবে। কিন্তু পুলিশ আসতে আসতে যদি কিছু হয়ে যায়? এটা মনে হবার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ থেকে পেপার স্প্রেটা বার করে নিয়ে, দরজা ঠেলে ঢুকেই পড়ল বৃতি। ঢুকতে না ঢুকতেই একটা গানের সুর ওর কানে ভেসে এল--আরো কিছুক্ষণ না হয় বসিও পাশে, আরো যদি কিছু কথা থাকে তাই বলো। শরত-আকাশ হেরো ম্লান হয়ে আসে, বাষ্প আভাসে দিগন্ত ছলোছলো।
রঞ্জনার গলা। বিরাট একটা শ্বাস ছেড়ে পেপার স্প্রে ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলল বৃতি। সাইকো কিলার রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে চাইছে, এটা মেনে নেয়া সত্যিই অসম্ভব। তাহলে কি, তাহলে কি সশরীরে জে এসে হাজির হলো নাকি, ইন্দ্র সকালে বেরিয়ে গেছে, কনির ফ্লাইট অনেক রাত্রে নামবে। সুবর্ণ সুযোগ আর কাকে বলে! কিন্তু রুনু, ওর প্রিয়সখী রুনু, ওর কাছ থেকে কথাটা লুকিয়ে রাখল? বৃতির কি চুপচাপ চলে যাওয়া উচিত?
গানটা ওপরের বেডরুম থেকে আসছে। চুম্বকের টানের মতন সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল বৃতি, বারো আনা কৌতূহলের সঙ্গে চার আনা অভিমান মিশিয়ে উঁকি মারল ঘরের দরজায়।
বিরাট কিং-বেডটা এলোমেলো অবস্থায়, তার ওপরে বসে বসে গাইছে একলা রঞ্জনা। ভরাট সুরেলা গলার সেই গানের বিষাদময় মূর্ছনা ঘুরপাক খাচ্ছে ঘরের হাওয়ায়। ওর হাতে ধরা একটা চিঠি, ওর দৃষ্টি চলে গেছে তেপান্তরের মাঠে।
“রুনু!”
রঞ্জনা ফিরে তাকাল, এক হাতে কপাল থেকে অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে হাসল একটুখানি। বৃতিকে দেখে একটুও অবাক হয়নি ও কেননা এই সময় বৃতি যে আসবেই, এটা জানা কথা।
“বোস। তোকে ফোন করে আসতে বলব ভাবছিলাম, দেখ তুই এমনিতেই এসে গেছিস--” রঞ্জনার গলায় তেপান্তরের ধু-ধু শূন্যতা। কোনো প্রশ্ন না করে চিঠিটা তুলে নিল বৃতি। ছোট্ট চিঠি, সঙ্গে কোনো কবিতাও নেই।
তোমার ফেসবুক প্রোফাইল বদলায়নি তাই বুঝতে পারছি যে তুমি আমাকে অবাঞ্ছিত বলে মনে করো। আমার কোনো নালিশ, কোনো অভিমান নেই কেননা এখন তুমি না জানলেও তোমার কাছ থেকে যা পেয়েছি তাই আমার জীবনের একমাত্র সত্যিকারের প্রাপ্তি, সততার আলোয় উজ্জ্বল।
তোমার অজানা প্রেমিক,
জে
রঞ্জনার সামনে ওর ম্যাকবুকটা খোলা, রঞ্জনা চ্যাটার্জির ফেসবুক প্রোফাইলে রক্তলাল একটি গোলাপ। কয়েক মিনিট কেউ কোনো কথা বলল না, দুই সখী একে অপরের হাত ধরে বসে রইল। বৃতির মাথার ভেতরে একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
“জানিস আমি স্যুটকেস অবধি গুছিয়ে রেখেছিলাম, পাসপোর্ট, চেকবুক, কিছু জামাকাপড় ব্যস। গয়নাগাঁটি, টাকাপয়সা কিচ্ছু নিইনি। আমি ভেবেছিলাম জীবনটাকে নতুন করে শুরু করব। লোকটা কি আমার সঙ্গে খেলছে? তাই যদি হয় তবে সে কী নিষ্ঠুর খেলা, বল?”
“ট্রাজেডি অফ এররস। হাউ সিম্পল অ্যান্ড হাউ স্টুপিড অফ মি যে এতদিন এটা বুঝতে পারিনি।” বিরাট একটা নিঃশ্বাসের সঙ্গে কথাগুলো বেরিয়ে এল, তারপরেই উদ্ভটভাবে হাসতে শুরু করল বৃতি। রঞ্জনা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল সখীর দিকে। ওর চোখের ভেতর থেকে প্রশ্নের তীরগুলো ছুটে আসতে থাকল অনর্গল কিন্তু মুখ থেকে একটা কথাও বেরোল না। বৃতি ল্যাপটপটা টেনে নিয়ে দ্রুতহাতে সার্চ করল-- রঞ্জনা চ্যাটার্জি, তারপর কয়েক মিনিট ধরে দমবন্ধ নীরবতা।
“এই দ্যাখ! রঞ্জনা চ্যাটার্জি, সাইন্স কলেজের মেয়ে, তোরই বয়েস, এই শহরেরই অন্যপ্রান্তে থাকে, অন্য দুর্গাপুজোয় যায়। প্রোফাইল পিকচারে বুদ্ধের মুখ, তোরই মতন চুপচাপ আর নন-কনফ্রন্টেশন্যাল। সত্যি কথা বলতে কি, ওর সোশ্যাল মিডিয়া কমিউনিকেশন প্যাটার্ন, যা দেখে লোকের স্বভাব আন্দাজ করা যায়, অনেকটাই তোর মতন। পাগলা জে ভুল রঞ্জনাকে পাকড়েছে। আরে আরে দেখিস, মুর্ছো যাস না যেন।”
রঞ্জনার ঠোঁট সাদা হয়ে গেছে, হাত কাঁপছে থরথর করে। বৃতি ওর বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরল এবার। ওর কাঁধের ওপর মুখ রেখে চিৎকার করে কেঁদে ফেলল রঞ্জনা।
“সবটাই একটা ভুল! এত কবিতা, এত ফিলিংস, এমন উচ্ছ্বাস সব অন্য কারো জন্য। আর তার ওপরে ভরসা করে আমি সংসার ছাড়তে যাচ্ছিলাম। ইন্দ্র আর কনিকে এতবড়ো আঘাত দিতে চলেছিলাম। বৃতি আমি পাগল হয়ে গেছি, শুধু পাগল নয় একটা ইডিয়ট, একটা ভিলেন।” গুমরানোর ফাঁকে ফাঁকে বৃষ্টিধারার মতন কথাগুলো ঝরে পড়তে থাকল, বৃতি প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে রইল বন্ধুকে।
“শোন রুনু, প্লীজ আমার কথাটা ভালো করে শোন। ভুলটা তুই করিসনি, ও করেছিল, কিন্তু ফীলিংস আর যা যা বলছিস, সেগুলো ষোলো আনা খাঁটি, যাকে বলে চব্বিশ ক্যারেট সোনা। প্রেমে পড়লে যদি পাগলই না হবে তাহলে ও হাঙ্গামায় দরকার কি? আপনা হাত জগন্নাথ, ইন্টারনেট রসের ভাণ্ডার, বিয়ে-বাচ্চা এখনও চালু আছে কেননা অনেকদিনের অভ্যাস। কয়েক জেনারেশন বাদে সভ্যজগৎ থেকে ওটাও উঠে যাবে দেখে নিস। তুই যা পেয়েছিস প্রেমের দেবতার কাছ থেকে পেয়েছিস, ওটা তোর খুব দরকার ছিল রে। আর কাঁদিস না এবারে ওঠ।”
“তুই আমাকে জাজ করছিস, না? বুদ্ধু আর গালিবল ভাবছিস, না আমাকে?” প্রাণপণে নাকের জল টানতে টানতে রঞ্জনা বলল।
“একদম না। বলেছিলাম না আই এনভি ইউ। এরকম দুঃখ সব আনন্দের থেকে বেশি রে। ভালোবাসা একটা স্বর্গীয় জিনিস, সবার কপালে জোটে না। ওর মধ্যে কোনো নিয়মকানুন, লজিক, মর্যালিটির ফালতু চাপ নেই বলেই তো ওটা খাঁটি জিনিস, অ্যাবসলিউটলি লিবেরাটিং, তাইজন্যই তো এত সাহিত্য, এত গান আর ছবি। শোন চিঠিগুলো যত্ন করে রেখে দিস, কাউকে দেখাস না, পরে দুই সখীতে মিলে তারিয়ে তারিয়ে পড়ব। নাটক শেষ হয়ে গেছে এবারে জনতা সবাই যে যার রিয়ালিটিতে ফেরত চলো। শোন, আমি না শুভর জন্য ডিস্ট্রেস সিগন্যাল রেখে অফিস কেটে এসেছি। এই দ্যাখ ওর ফোন আসছে। যাইরে আমি--” বলতে বলতে ঝড়ের মতন বেরিয়ে গেল বৃতি।
হঠাৎ কোত্থেকে এক টুকরো মেঘ ভেসে এল, দুপুরবেলার খর রোদ্দুরটা ঝিমিয়ে এল যেন একটুখানি। প্রেমের দেবতা সেই ফাঁকে রঞ্জনার হৃদয় থেকে তাঁর বাণটি তুলে নিয়ে গেলেন। একটু লাগল বটে, কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে ঠিক বৃতির মতোই শব্দ করে হেসে উঠল রঞ্জনা।
কনি আসছে, ওর জন্যে রান্না করতে হবে, তারপর এয়ারপোর্ট থেকে ওকে পিকআপ। মেয়েটা প্রায় অচেনা হয়ে গেছিল, দেখা যাক এই কদিনে একটু কাছাকাছি আসা যায় কিনা। ঠিক চার দিন পরে ইন্দ্র ফেরত আসবে, ওর চিন্তিত মুখ সঙ্গে করে। গাছটা শুকিয়ে গেছে, জলটল দিলে হয়তো আবার চাঙ্গা হয়ে উঠবে। এই মুহূর্তে ওর মনটা পালকের থেকেও হালকা। পাগলা জে তার রঞ্জনাকে খুঁজে পেল কিনা তাই নিয়ে ওর আর কোনো মাথাব্যথা নেই।