


দক্ষিণের বারান্দা; — মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায় ; প্রকাশক— সিগনেট প্রেস; কলকাতা ৭০০০০৯; প্রথম প্রকাশ— নব পর্যায়ের সিগনেট প্রথম সংস্করণ জানুয়ারি ২০১৩; ISBN: 978-93-5040-177-4মোহনলালের কুশলী কলমে ঝরঝরে গদ্যে জোড়াসাঁকোর পাঁচ নম্বর বাড়ির গোল বাগান, ফোয়ারার ধার, নিচের দালান, কাছারি ঘর পেরিয়ে আমরা সোজা পৌঁছে যাই উপরের দক্ষিণের বারান্দায়। এখানেই আমাদের সাথে পরিচয় ঘটে গগন, অবন এবং সমরের। এই তিন দাদামশাইয়ের স্নেহ-প্রশ্রয়ে সিক্ত হয়ে বেড়ে উঠছে মোহনলালের শৈশব।
বাংলা তথা ভারতবর্ষের ইতিহাসের ওঠাপড়ার সন্ধিক্ষণে, নিজস্বতা বজায় রেখে নতুনকে সাদরে গ্রহণ করেছিল যে গুটিকয়েক বিশিষ্ট বাঙালি পরিবার, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরপরিবার ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। যা কিছু নতুন, যা কিছু অভিনব, যা কিছু রুচি-স্নাত, যা কিছু মৌলিক — তাকে গ্রহনে ও আত্তীকরণে, এই পরিবারের কোনোরকম কার্পণ্য ছিল না। নতুন জীবনের উল্লাসে, নতুন প্রয়াসে, নব উদ্যমে, নতুন প্রতিভার উন্মেষে বাঙালি সমাজজীবনে উনিশ শতকের গোড়া থেকেই সমাজ মন্থনের যে অমৃত লাভ ঘটেছিল সেই অমৃতের ভান্ডার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। আর এই অমৃতের ধারা বহমান ছিল দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের পাঁচ ও ছয় নম্বর বাড়িতে। পাঁচ নম্বর বাড়িটির দক্ষিণের বারান্দায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথের প্রতিভা বিচ্ছুরণে এবং তাঁদের মৌলিক ভাবনা ও উদ্যোগকে সামিল করে যে অত্যুজ্জ্বল ইতিহাস রচিত হয়েছিল, নাতি মোহনলালের কলমে সেই বর্ণময় সময়ের আলোমাখা আখ্যান ‘দক্ষিণের বারান্দা’র ছত্রে ছত্রে ধরা রয়েছে।
দক্ষিণের বারান্দা গ্রন্থটিতে লেখক মোহনলাল তাঁর দাদামশাই অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে এক রূপসায়রের শৈশবে ভেসে বেড়ানোর স্বপ্নময় স্মৃতির বর্ণনা দিয়েছেন। আহা, এমন শৈশব যে কোনো শিশুর কাছেই চিরকালীন সম্পদ! যে শিশুর শৈশব ও কৈশোর অবনীন্দ্রনাথের মতো দাদামশাইয়ের ছোয়ায় বেড়ে ওঠে, সেই শিশু যে প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছেও বারে বারে শৈশবেই খুঁজে পাবে তাঁর পরশপাথর তা মোহনলালের স্মৃতিকথন থেকে স্পষ্ট। দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের পাঁচ নম্বর বাড়িটি ছিল দ্বারকানাথের বৈঠকখানা বাড়ি। গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ, এবং অবনীন্দ্রনাথ — এই তিন ভাই ও তাঁদের পরিবার পরবর্তীকালে এই বাড়িতে বসবাস করতে শুরু করেন। গগনেন্দ্র এবং অবনীন্দ্র অসামান্য প্রতিভাবলে ভারতীয় শিল্পে এক নবযুগের সূচনা করেছিলেন, এ কথা আমাদের সকলেরই জানা। পাঁচ নম্বর বাড়ির দক্ষিণের বারান্দার এঁরাই হলেন প্রধান কুশীলব। গগনেন্দ্র ও অবনীন্দ্র এই বারান্দায় বসে ছবি আঁকতেন আর সমরেন্দ্র ডুবে থাকতেন সাহিত্য সাধনায়। তিনটি আরামকেদারা ছিল তিন জনের শিল্পসাধনার আখড়া আর এই দক্ষিণের বারান্দাতেই ছিল তাদের অবস্থান। অভ্যাগত অতিথিদের আপ্যায়ন, গল্প, আড্ডা মজলিস হত এই ‘বারান্দার ছায়াতলে’। মোহনলালের কলমে উঠে এসেছে সেই প্রাণচঞ্চল দক্ষিণের বারান্দার ছবি। তাঁর কথায়, “যাঁরা দেখেছেন সে বাড়ির জনস্রোত, যাঁরা এসেছিলেন দক্ষিণের বারান্দার ছায়াতলে, তাঁদের মধ্যে বহু ব্যক্তিই আজ জীবিত। …মনে রাখার মতো অনেক কিছুই ঘটে গেছে এই সেদিনও ঐ পাঁচ নম্বর বাড়ির দক্ষিণের বারান্দায়।”
মোহনলাল ছিলেন অবনীন্দ্রনাথের মেজমেয়ে করুণার সন্তান। মাতৃহারা মোহনলাল ছেলেবেলা থেকেই দাদামশাইয়ের আদর ও প্রশ্রয়ের ছায়ায় একটু বেশিই শীতল হয়েছিলেন। আসলে এই বাড়ি ও পরিবার যে কোনো শৈশবেরই বেড়ে ওঠার মায়ামাখা আশ্রয়। এ বাড়ির বড়রা বাড়তি শাসনের ধারধারতেন না, ছোটরা যে কোনো প্রাত্যহিক কাজকেও চড়ুইভাতির উল্লাসে উপভোগ করত। ছোটদের ছেলেমানুষি উস্কে দিতে দাদামশাই অবনীন্দ্রনাথের জুড়ি মেলা ভার। কখনো তিনি কচিকাঁচাদের দিয়ে রাতে দেখা স্বপ্ন, গল্পের আকারে লিখিয়ে নিয়ে স্বপ্নমোড়ক তৈরি করিয়েছেন, কখনো ‘দেয়ালা’ নামের ছোটদের পত্রিকা প্রকাশে উৎসাহ দিয়েছেন, কখনো যাত্রাপালার দল তৈরি করে ছোটদের সামিল করেছেন সেই যাত্রাপালায়। আবার কখনো কুড়িয়ে পাওয়া ছোটখাটো বস্তু যত্ন করে রাখতে উৎসাহ দিয়েছেন ছোটদের। কোনো কোনো সময় অবনীন্দ্রনাথ ছোটদের মধ্যে হীরে পাওয়ার বাসনা জাগিয়ে তুলে, তাদের নানা আকারের নুড়ি পাথর সংগ্রহে ব্যস্ত রেখেছেন। এমনই বহু আজব ও মজার ঘটনার বিবরণ রয়েছে মোহনলালের এই অম্লমধুর স্মৃতিকথায়। তিনি দাদামশাই সম্পর্কে লিখেছেন,” ভাঙ্গা জিনিস নিয়ে মূর্তি করতেন, পুতুল সাজাতেন আর তাদের নিয়ে বসে থাকতেন ঘন্টার পর ঘন্টা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতেন সকালের আলোয়, সন্ধ্যার আলোয়। এটা ওটা জুড়ে দিতেন, হয়তো কিছু চেঁচে ফেলতেন, খেলতেন নানারকম ভাবে।”
মোহনলালের বয়স বাড়ে, বয়স বাড়ে বাড়িটিরও, বাড়ে আর্থিক অনিশ্চয়তা, নিস্প্রভ হয়ে আসে আভিজাত্য এবং জৌলুস। শেষপর্যন্ত একদিন বিক্রি করে দেওয়া হয় বাড়িটি। স্মৃতিকথার শুরুতে এই ঐতিহ্যবাহী বাড়ি বিক্রির সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মোহনলাল। শৈশবস্মৃতি ঘেরা পাঁচ নম্বর বাড়ির কালের গর্ভে মিলিয়ে যাওয়া করুণ ভাবে আঘাত করেছে তাঁকে। উপসংহারে মোহনলালের এই আঘাত তীব্র হাহাকারে আন্দোলিত করে পাঠক হৃদয়কেও।
বাড়ির তিনতলা থেকে সমরেন্দ্র পরিবারসহ অন্যত্র চলে যাওয়ার পর, ফাঁকা ঘর ও বারান্দায় অবনঠাকুর নাতি মোহনলালের সঙ্গে দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করেন অজস্র কালো পিঁপড়েদের দেওয়াল জুড়ে নেমে আসা, শূন্য ঘর ছেড়ে তারাও যেন চলে যাচ্ছে অন্য কোনো জায়গায় খাবারের খোঁজে। সে এক মর্মান্তিক দৃশ্যকল্প।
‘দক্ষিণের বারান্দা’ গ্রন্থটির মধ্যমণি হলেন দাদামশাই অবনীন্দ্রনাথ। অবনঠাকুরের চরিত্রের ভিতর যে এক চিরকিশোর আজীবন বাসা বেঁধেছিল, আর তিনি যে অনায়াস দক্ষতায় ছেলেমানুষদের সমবয়সী হতে পারতেন, তাঁর গুরুগম্ভীর ব্যক্তিত্বের মাঝে যে হঠাৎ হঠাৎ ঝলক দিত এক কাঁচা বয়সের শিশু, তা মোহনলালের কলমে যতটা বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে তেমনটি বোধহয় আর কখনো হয়নি। অবনীন্দ্রনাথের এই শিশুভোলানাথ সত্ত্বাকে জাগিয়ে রাখতে নাতি মোহনলালের ভৃমিকাও ছিল অনেকখানি। তিনি ছিলেন দাদামশাইয়ের নয়নের মণি ও সারাক্ষণের সঙ্গী। সাদা বুলবুলি দেখে সেটিকে ধরতে নাতিকে সঙ্গে নিয়ে ফাঁদ পাতা হোক বা মোহনের শখ মেটাতে বাড়ির ছোটদের দিয়ে নাটক করানোর প্রস্তুতিই হোক, সকল কাজের কাজী দাদামশাই শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ। স্মৃতিচারণিক মোহনলালের ভাষ্য, রাতারাতি দাদামশাই লিখে ফেললেন নাটক ‘এসপার ওসপার’। যাত্রাপালার মতো ছেলেদের দিয়ে অভিনয় করানো হলো সে নাটক। সব্বাইকে দিলেন একটা করে পার্ট। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ফরাসে পা গুটিয়ে বসে দেখলেন সেই যাত্রাপালা এবং প্রতিক্রিয়া দিলেন… ‘অবন ছাড়া এমনটি আর কেউ করতে পারত না’।
অবনীন্দ্রনাথের জীবনযাত্রা রীতিমতো ঈর্ষণীয়। ছিলেন চিত্রকর। বিশ্বজোড়া তাঁর খ্যাতি। অথচ একসময় ৮ থেকে ১০ বছর কোনো ছবিই আঁকলেন না। তুলির মতোই ঐশ্বরিক তাঁর লেখনী। লিখেছেন বেশকিছু ক্লাসিক কাহিনি। এমনকী ছোটদের যাত্রাপালাও। রাঁধুনি হবার শখ মেটাতে একসময় শুরু করেছেন রান্না শেখা। জোড়াসাঁকোর সেই টানা বারান্দায়, লাইব্রেরি ঘরে, গোলবাগানের ফোয়ারার ধারে, চালাঘরের লতায় ঢাকা সামারহাউজে দাদু ও নাতি, দুই অসমবয়সী বন্ধুর রূপ, রস, ও সুরে ভরা আনন্দনিকেতনের সাক্ষী হয়ে রয়েছে মোহনলালের এই স্মৃতিকথন।
দাদামশাই অবন তাঁর রঙের বাক্সকে বলতেন অক্ষয় তূণ। কারন তার রঙ কখনো ক্ষয় হত না। এই প্রসঙ্গে মোহনলালের স্মৃতিচারণ, “ছেলেবেলায় আমরা অবাক হয়ে দেখতুম, দাদামশাই কতো ছবি আঁকেন কিন্তু তাঁর রঙ ফুরোয় না। ছেলেবেলায় আমরা সত্যি বিশ্বাস করতুম দাদামশাইয়ের রঙের বাক্স হল অক্ষয় তূণ।”
দাদু অবন্দ্রীনাথের যখন যে আজব খেয়াল মাথায় এসেছে, তাতেই মাতিয়ে দিয়েছেন বাড়ির ছোটদের। বাজারে কোনো নতুন খেলনা এলেই তা কিনে ফেলা চাই। লাঠির ফলা দিয়ে নানা আকারের নুড়ী খুঁজে খুঁজে জমানোর মতো তাঁর সব বিচিত্র খেয়াল। খেয়াল চাপলো জাপানি কায়দায় বাগান সাজানোর, তো মেতে উঠলেন বনসাই-তে। এক জাপানি কার্পেন্টার ডেকে, লাইব্রেরি ঘরের আসবাব সাজালেন জাপানি কায়দায়, মাদুর ও পাটি দিয়ে মুড়ে দিলেন সে ঘরের মেঝে। এক অসামান্য নিরাভরণ ও সরলসুন্দর শিল্প সুষমার ছটা বহন করতো তাঁর লাইব্রেরি ঘর। বড়ো বড়ো লাটবেলাট ও জ্ঞানী গুণীজনদের পদচারণায় মুখরিত হত সেই ঘর। লাইব্রেরি ঘরের পূব দিকের দেওয়ালে ফোটালেন একটি গোল জানালা আর তার ঠিক বাইরে থাকা শিশু গাছটির ডালপালাগুলি এমনভাবে ছাঁটালেন যাতে দুটি ডালের মধ্যে দিয়ে প্রভাতের সূর্য আর গোধূলির চাঁদকে আকাশের বুকে উঠতে দেখা যায়। মোহনলাল লিখেছেন, “ইতিমধ্যে জাপান থেকে টবে লাগানো তিন তিনটি বামন গাছ এসে গেল, কাসাহারার তৈরি পূব মুখো গোল জানালার ধারে চমৎকার মানালো তাদের। বনসাই আর দু বাহু মেলা শিশু গাছ, এর পিছনে দিয়ে সোনার থালায় মতো চন্দ্রোদয় দেখলেন দাদামশাইরা।”
অবনীন্দ্রনাথের জীবন ছকবাঁধা গতে এগোয়নি কখনো। ছোটদের সঙ্গে ভূতধরা অভিযানে মেতেছেন, তৈরি করেছেন স্বদেশী রঙ, আবার বাড়িতেই লবন তৈরি করে শিশু ও কিশোরদের সাথে লবনআইন ভঙ্গের কাজে সামিল হয়েছেন। মুক্ত পাখির মতো ভেসেছেন আপন ভাবনার খেয়ালী খেলায়। নাতি মোহনলালকে সঙ্গী করে দার্জিলিং ভ্রমনকালে কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ দেখে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন শিশুর মতো। মোহনলাল লিখেছেন, “ঘন গাছের আড়ালে খানিকটা ফাঁক। তারই মধ্যে দিয়ে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া। ঠিক যেন ফ্রেমে আঁটা একখানি ছবি। বরফের রং তখনো পাঙাশ, যেন মৃতের মতো। আমাদের চোখের সামনে কুয়াশা আস্তে আস্তে ভোরের হাওয়ায় সরে যাচ্ছে। খানিক পরেই হঠাৎ কোথা থেকে আলো এসে পড়লো বরফের চূড়ায়। তারপর মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যেতে থাকলো বরফের চেহারা। আকাশের চেহারা। জেগে উঠতে থাকলো পৃথিবী। রঙের আর আলোর ঢেউ বয়ে গেল চারিদিকে। আর সেই গাছপালার ফ্রেমে আঁকা কাঞ্চনজঙ্ঘার স্থিরচিত্র যেন কথা কয়ে উঠলো কলকল করে। দুজনে চুপটি করে অনেকক্ষণ ধরে দেখলুম।”
এই স্মৃতিকথায় কত্তাবাবা রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ এসেছে বারকয়েক। রবিকার স্নেহধন্য ভাইপোদের প্রতি ছিল কবির অগাধ ভালোবাসা। ঘরের মানুষ রবিকা যখন বিশ্বের দরবারে নাম, যশ কুড়িয়ে ফিরে এলেন তখন তার ভাইপোরা এক স্বকীয় হৃদয়গ্রাহী উপায়ে জানিয়েছিলেন তাঁদের প্রণাম। আবাহন সঙ্গীত নয়, বক্তৃতা নয়, এক অভিনব মৌলিক কায়দায় অভিনন্দিত করা হয়েছিল কবিকে। আর এই উদ্যোগ ছিল অবনীন্দ্রনাথের মৌলিক ভাবনার ফসল। সেই উদ্যোগের বর্ণনা দিতে গিয়ে মোহনলাল লিখেছেন, “তখন আমরা খুব ছোট। একদিন সকাল বেলা উঠে দক্ষিণের বারান্দায় গেছি, দেখি মার্বেলের টেবিলের উপর কতগুলো গোল গোল অস্বচ্ছ কাঁচের শিশিতে পদ্মের কুঁড়ি বসানো। মুখর বর্ষনের পর সকালের প্রথম আলোর স্নিগ্ধতায় বারান্দার কোণে সারি বন্দী করে রাখা পদ্মের কুঁড়িগুলি জ্বলজ্বল করছিল। দাদামশাইরা বসেছিলেন তার সামনে। শুনলুম ছোটদের সকলকে ডাকতে পাঠানো হয়েছে। যতগুলি শিশি ততগুলি ছেলেমেয়ে প্রয়োজন। একটি করে পদ্মের কুঁড়ি বসিয়ে দিতে ফাঁকা শিশির রঙ আর তার আকৃতির সঙ্গে এমন খাসা মানালো যে, স্ফটিকের ফুলদানিতে অমনটি হতো কিনা সন্দেহ। একদল ছেলেমেয়ে এই নিয়ে সারি বেঁধে বেরুল প্রভাত সূর্যের আলোয় পাঁচ নম্বর বাড়ি থেকে ছয় নম্বর বাড়ির দিকে। যাঁরা পাঠালেন এই অর্ঘ্য তাঁরা রইলেন পিছনে। এগিয়ে গেল দেবদূতের দল। সিঁড়ি বেয়ে ঘুরে ঘুরে উঠলো তারা তিনতলায়, পশ্চিমের ঘরে যেখানে তাঁর রচনা কোলে নিয়ে বসেছিলেন কবি। অর্ঘ্যগুলি ঐখানে নামিয়ে দিয়ে দেবদূতেরা কবিকে প্রণাম করে নিঃশব্দে ফিরে গেল। শুনেছিলাম কত্তাবাবা নাকি এটা ভারি পছন্দ করেছিলেন।” মোহনলালের চমৎকার গদ্যে ঠাকুরবাড়ির দক্ষিণের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাদামশাই অবনীন্দ্রনাথের এই আশ্চর্য জীবনযাপনের শরিক হয় পাঠককুলও।
মোহনলালের স্মৃতিকথায় ধরা আছে বিষাদমাখা বাইশে শ্রাবনের কথাও। সেই দিন অবনীন্দ্রনাথ বসেছিলেন পাঁচ নম্বর বাড়ির উত্তরের বারান্দায়, ছয় নম্বর বাড়ির দিকে তাকিয়ে। দু-বাড়ির মাঝের জমিতে অগন্য মানুষ তখন রুদ্ধ নিশ্বাসে অপেক্ষা করছে একরাশ উৎকন্ঠা নিয়ে। মোহনলাল লিখেছেন, “অনেকক্ষণ বসে থেকে দাদামশাই উঠলেন। স্নান করলেন, ভাত খেলেন। বেতের চেয়ারে বসে পান মুখে দিতে যাবেন সেই সময় খবর এল রবি অস্ত গেছেন। পান খাওয়া হল না। তারপর একটুকরো কাগজ আর রঙ নিয়ে এঁকে ফেললেন অগণিত জনসমুদ্রের মাথায় রবীন্দ্রনাথের শেষ যাত্রা।”
এই স্মৃতিকথা উপভোগ করতে হয় রসিয়ে রসিয়ে, সময় নিয়ে। তাড়াহুড়ো করলে রসসুধা বঞ্চিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। বড়ো আদুরে এক ছেলেমানুষির স্মৃতিগাথা ‘দক্ষিণের বারান্দা’।
রাজকাহিনী, ক্ষীরের পুতুল, নালক, বুড়ো আংলার মতো গল্প লেখা, অমন সুন্দর ছবি-গল্পের ছন্দ মেলানো মানুষটিকে মোহনলাল পাঠকেরর কাছে বড়ো আপন বানিয়ে দিলেন তাঁর কথকতার অতুলনীয় ঢং-এ। এই বই হাতে নিলে, পাতা ওল্টালে মনের মধ্যে এক নরম পেলব অনুভূতির জন্ম হয়। সিগনেট প্রেসের এ এক অবিস্মরণীয় ছাপানো বই। যেমন চমৎকার কাগজ, তেমন ফুটফুটে ছাপা আর তেমন সুবিধাজনক বইটির আকার। প্রচ্ছদে পাঁচ নম্বর বাড়ির দক্ষিণের বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে রয়েছেন অবনীন্দ্রনাথ। বৃদ্ধ, অশক্ত, অসহায় উদাসীনতা তাঁর দৃষ্টিতে। জানি না সত্যিই কি তাই!!! নাকি পাঠক হিসেবে এ আমার অনুভব?
পাঠ শেষে পাঁচ নম্বর জোড়াসাঁকোর বাড়ি থেকে অবনীন্দ্রনাথের পরিবারের বিদায় বুকে বাজে। শতাব্দীর মহাপ্রলয়ের ভাঙন ঠাকুর বাড়িকেও এড়ায়নি। উপসংহারে জোড়াসাঁকোর পাট চুকিয়ে মোহনলালের পরিবার যখন বরানগরের গুপ্ত নিবাসের পথ ধরে, পাঠক মনে তখন ঘনিয়ে ওঠে মনখারাপের কালোমেঘ।
বিষণ্ণতার হাহাকারে স্মৃতিচারণের যতি টানলেও মোহনলালের রসিক মন ও তাঁর স্বাদু লেখনীর ছোয়ায় এই বই আদতে অত্যন্ত সুখপাঠ্য এবং নিঃসন্দেহে জোড়াসাঁকোর পাঁচ নম্বর বাড়ির ইতিহাসের এক বিশ্বস্ত দলিল। ‘দক্ষিণের বারান্দা’ স্মৃতিকথা প্রিয় বাঙালি পাঠকের পাঠ্য তালিকার এক আবশ্যিক দুর্লভ সংযোজন।