


হারিয়ে যাওয়া দিন; — বীণা দে; অনুলিখন: অঞ্জলি বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশক— প্যাপিরাস, কলকাতা; প্রচ্ছদ- দেবব্রত ঘোষ; প্রথম প্রকাশ— জানুয়ারি, ২০১২; ISBN: 978-81-908360-3-6অঞ্জলি বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যখন বীণা দেবীর পরিচয় হল তখন বীণা দেবী অসুস্থ, চোখে দেখেন না। বাক্যালাপের সময় অঞ্জলি বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি খানাকুল কৃষ্ণনগর শুনে তিনি অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত হয়ে জানালেন যে তিনি খানাকুলের রাধানগরের রামমোহন রায়ের বংশের মেয়ে। নিজের বৈচিত্র্যময় জীবনের কাহিনী “ঝরে পড়া ফুলের মতো” অনর্গল বলে চললেন বীণা। ঘটনাবহুল জীবনের কথা শুনতে শুনতে অঞ্জলি দেবী বীণা দেকে আত্মজীবনী লিখতে বলেন। ব্যথিত মুখে বীণা জানালেন, তিনি কিছু লিখেছেন কিন্তু আরো অনেক লেখার আছে, জানাবার আছে। অশক্ত শরীর ও ক্ষীণ দৃষ্টির জন্য তা সম্ভব হয়ে উঠছে না। স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে অঞ্জলি দেবী অনুলিখনের দায়িত্ব নিলেন এবং তখনই বোলপুর থেকে টেপ রেকর্ডার ও ক্যাসেট কিনে বীণা দেবীর কাছে দিয়ে গেলেন। সময় সুযোগ মতো আত্মকাহিনী ক্যাসেটে বন্দী করলেন বীণা, ফলস্বরূপ আমরা পেলাম এক অনবদ্য ও চিত্তাকর্ষক জীবনকাহিনি।
হুগলি খানাকুল অঞ্চলের রাধানগর গ্রামের বিখ্যাত রায় পরিবারের গগনচন্দ্র রায় ও মন্দাকিনী দেবীর কন্যা বীণা। তাঁর জন্ম ১৯০৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারি এবং প্রয়াণ ১৯৯৯-এর ২ ফেব্রুয়ারি। অনেক ভাইবোনের মধ্যে একাদশতম কন্যা তিনি। পুলিশকর্মী বাবার ছিল বদলির চাকরি। ফলে অল্প বয়স থেকেই বিভিন্ন স্থানে তাঁরা বসবাস করেছেন। কখনো শ্রীরামপুর, কখনো বা পুরী, ভুবনেশ্বর, কখনো কলকাতায় আলিপুর, ব্যারাকপুর, যশোর ইত্যাদি জায়গায়। স্মৃতিশক্তি প্রখর থাকায় বীণা যতটুকু পড়ে সবই মনে রাখতে পারে। ভাইবোনেদের মধ্যে মুখে মুখে ছড়া তৈরি করার গুণ ছিল। পড়ায় আগ্রহ থাকার জন্য হাতের কাছে যা পাওয়া যেত, তাই পড়ে ফেলত বীণা, বুঝুক বা না বুঝুক। বাড়িতে রামায়ণ, মহাভারত থেকে আরম্ভ করে দারোগার দপ্তর, নীলবসনা সুন্দরী, বঙ্কিম-রমেশচন্দ্র রচনাবলী, বসুমতী সাহিত্য মন্দির থেকে প্রকাশিত বই--- সবই পড়া হয়ে গেছে বীণার। সুপাঠ্য, অপাঠ্য, কুপাঠ্য যা বই হাতের কাছে পেত সবই সে পড়ে ফেলত। অল্প বয়সেই বাংলা অনুবাদে অভিজ্ঞান শকুন্তলম, রত্নাবলী, নাগানন্দ, প্রিয়দর্শিকা, মৃচ্ছকটিক— এইসব সংস্কৃত নাটক পড়া হয়ে গেল। তবে পড়ায় প্রবল আগ্রহ থাকলেও বয়স ন বছর হয়ে যাওয়ার পর বীণার স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ হয়ে গেল এবং তার বাবা গৌরীদানের তোড়জোড় শুরু করলেন। রামপুরহাট স্টেশনের কাছে মলুটি গ্রামের চট্টোপাধ্যায় বংশের কুড়ি বছর বয়সী কলকাতার সিটি কলেজে আই এ পড়া ছেলের সঙ্গে সম্বন্ধ করে বালিকা কন্যার বিয়ে হয়ে গেল। কন্যার শ্বশুরমশাই সাহিত্যপ্রেমী। পড়ুয়া স্বামী বধূর পছন্দ জেনেছে -- সে বই পড়তে আর ছবি দেখতে ভালোবাসে। প্রবাসী, ভারতী, যমুনা পত্রিকায় শিল্পীদের আঁকা ছবির মধ্যে কিছু কিছু ছবি কন্যার মাথায় চিরস্থায়ী হয়ে গেছে। তার মধ্যে আছে শিল্পী মুকুল দের পেন্সিলে আঁকা ‘ঠিক দুপুরের আরাম’ (পরে অবশ্য জানা গেছে এই ছবিটি নন্দলাল বসুর আঁকা)। গভীর আগ্রহে গগনেন্দ্র, অবনীন্দ্রনাথ ও সুনয়নী দেবীর আঁকা ছবি দেখত সে। কবিতা পড়ে এবং শান্তিনিকেতনের কথা শুনে অজান্তেই মনে মনে রবীন্দ্রনাথের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জেগে ওঠে, শান্তিনিকেতন এবং রবীন্দ্রনাথকে দর্শনের বাসনা জন্মায়। নানা বাধা বিঘ্ন, দুঃখ-শোকের মধ্যে দিন কাটিয়েও ছোটবেলার সুপ্ত ইচ্ছেগুলো কী করে যে তার জীবনে বাস্তব রূপ গ্রহণ করল তা এক আশ্চর্যের বিষয়।
পুরো বইটা পড়ে মনে হল যেন কোন এক চিত্রনাট্যকার যা রচনা করেছেন তা যেন বীণাদেবীর জীবনে সেইভাবে ঘটনাগুলো পরপর ঘটে যাচ্ছে, ‘যেন রাম না জন্মাতেই রামায়ণ’। বালিকা বধূ আর তরুণ পড়ুয়া স্বামীর মধ্যে মনের মিল হল খুব, প্রেম জমে উঠল। বিয়ের পরে বধূ শ্রীরামপুরে পিত্রালয়ে। স্বামী আই-এ পাশ করে উত্তরপাড়া কলেজে বি-এ পড়তে ভর্তি হল, যাতে মাঝে মধ্যে শ্বশুরালয়ে গিয়ে বালিকা বধূকে চোখে দেখতে পায়। বিয়ের দু বছরের মধ্যে দুজনের ভিতর চিঠি এবং বই ও ছবির বইয়ের আদান প্রদান হয়েছে। বধূ ছবি দেখতে পছন্দ করে বলে তার স্বামী বধূকে উপহার দিয়েছে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় প্রকাশিত ছবির অ্যালবাম, ‘Chatterjee’s Picture Album’। ইতিমধ্যে বধূ বয়ঃপ্রাপ্ত হলে উভয়কুলের বাবা মায়ের ইচ্ছানুসারে পতি সহযোগে দ্বিতীয়বার কন্যা চলল রামপুরহাটের মলুটি গ্রামের শ্বশুরবাড়িতে। ট্রেনে এক দম্পতির সঙ্গে পরিচয় হল। কথায় কথায় জানা গেল সদ্য পরিচিত ভদ্রলোক হলেন শিল্পী অসিত হালদার, যাঁর আঁকা ছবি বীণা দেখেছে ভারতী পত্রিকায় ও রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের ছবির আ্যালবামে। বীণা অতীব কৌতূহলী হয়ে উঠল। আরো জানল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিল্পী অসিত হালদারের দাদামশাই। মুকুল দে, নন্দলাল বসু, অসিত হালদার-- সকলেই অবনীন্দ্রনাথের ছাত্র। সেই সময় শিল্পী মুকুল দে অজন্তায় গেছেন আঁকার ব্যাপারে। অসিতবাবুরা বোলপুর স্টেশনে নেমে গেলেন শান্তিনিকেতনে দাদামশাইয়ের কাছে যাবেন বলে। বীণার তৃষিত মন চলে গেল না দেখা শান্তিনিকেতন আর আরাধ্য দেবতা রবীন্দ্রনাথের কাছে। ভাগ্যের এমন খেলা যে, ভবিষ্যতে সেই শিল্পী মুকুল দে এবং শান্তিনিকেতন, রবীন্দ্রনাথ, ঠাকুর পরিবারের গণ্যমান্য লোকজন বীণার একান্ত কাছের হয়ে যাবেন।
এক দুর্দান্ত উপন্যাসের উপাদানে পূর্ণ বীণা দেবীর জীবন, ভালো পরিচালক উপন্যাসটিকে সুন্দরভাবে চলচ্চিত্রায়িতও করতে পারবেন। এই আত্মকথনে শুধু যে ঘরোয়া কথা প্রকাশ পেয়েছে তা নয়, বীণা দেবীর সময়কার সমাজ, গ্রামের আচার বিচার, বৈধব্যের কষ্ট, মেয়েদের অশিক্ষা, কুসংস্কার, চিকিৎসা সম্পর্কিত অজ্ঞানতা, জ্যোতিষ শাস্ত্রে অন্ধ বিশ্বাস, সে সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ছেলেমেয়েদের স্বদেশী চেতনা ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি চমৎকার ফুটে উঠেছে।
শ্বশুরবাড়িতে বীণা আনন্দেই ছিল। ননদ, দেওর এবং পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে ভালোই দিন কাটত তার। বরের এনে দেওয়া বই, শ্বশুরের লেখা বই ‘মলুটি রাজবংশ’, আরও নানা বই পড়ে সে সময় কাটাত। ছুটিতে বর বাড়ি এলেও শ্বশুরের কড়া নির্দেশ-- পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত বর-কনে একসঙ্গে থাকতে পারবে না। কিন্তু ‘বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো’-- ছেলে ছুটিতে বি-এ পরীক্ষার পড়া করতে এসেছিল, সে কলকাতায় ফিরে যাবার দেড় মাসের মাথায় বৌমার ‘এম-এ পাশের’ লক্ষণ ফুটে উঠল। সন্তানসম্ভবা হলে বীণাকে পিত্রালয়ে পাঠানো হল। অল্প বয়সেই কন্যার জন্ম দিল সে। কিন্তু ভাগ্য প্রতিকূল, অনভিজ্ঞ বাবা মায়ের ভালোবাসার কন্যাটি আটমাস বয়সে পিঠে কারবাঙ্কল হয়ে মা ডাক ডাকার আগেই অকালে ইহলোক ত্যাগ করল। সন্তানহারা হয়ে দম্পতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হল, যতদিন তারা উপযুক্ত বাবা-মা না হতে পারছে, ততদিন ব্রহ্মচর্য পালন করবে। বীণার কলেজ পড়ুয়া বর এম-এ পড়বে বলে স্থির করে শেষ পর্যন্ত গান্ধীজির ডাকা অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বীণার শ্বশুরমশাইয়ের ইচ্ছে ছিল বড় ছেলে বি-এ পাশ করে সংসারের হাল ধরবে, তা না করে ছেলে আরও পড়তে চাইল বউয়ের আগ্রহে। এখন আবার স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দিয়ে দেশোদ্ধার করতে নেমেছে। বীণার এবারও কপাল পুড়ল। ভালোবাসার মানুষটি দেশপ্রেমের জোয়ারে ভেসে গিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করল। নিজের বিদায়ক্ষণ উপস্থিত জেনে প্রিয়তমা পত্নীর হাত ধরে জানাল যে, সে বীণার জীবনে পূর্ণতা আনতে পারল না, সন্তান হল কিন্তু মা ডাক শোনার সৌভাগ্য হল না বীণার। স্বামী শরদিন্দু তার শেষ ইচ্ছা জানিয়ে গেল-- সে চলে গেলেও বীণা যেন অন্য কাউকে বিয়ে করে সুখী হয়, জীবনে পরিপূর্ণতা পায়।
কিছুকাল বৈধব্য-যন্ত্রণা সহ্য করে কালক্রমে সত্যিই বীণার জীবনে এমন একজন পুরুষের আবির্ভাব হল যিনি শৈশবে বীণার মনোজগতে অজান্তেই ছাপ ফেলেছিলেন। ‘প্রবাসী’, ‘ভারতী’র পাতায় যাঁর আঁকায় মুগ্ধ হয়েছিল বীণা, সেই স্বনামধন্য শিল্পী মুকুল দে-ই হয়ে গেলেন বীণার স্বামী। মুকুল দে যখন বীণাকে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন, দ্বিধাগ্রস্ত বীণার চোখে পরলোকগত স্বামীর মুখ ভেসে উঠল, সেই সঙ্গে মৃত্যুকালে স্বামীর শেষ ইচ্ছার কথা-- “তুমি জীবনে পরিপূর্ণতা পেলে আমার আত্মা শান্তি পাবে” মনে পড়ল।
বীণা দেবী নিজে কবি ছিলেন, তাঁর বেশ কিছু কবিতা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। শ্বশুরবাড়ির গ্রাম মলুটিতে থাকার সময় ‘তর্পণ’ পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। মলাটের উপর সোনার জলে লেখা, “শরদিন্দু স্মৃতিরঞ্জিত তর্পণ, সম্পাদিকা শ্রী বীণাপাণি দেবী, প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, কার্তিক ১৩৩২, মলুটি অন্তঃপুর শরদিন্দু স্মৃতি সমিতি হইতে শ্রী দুর্গেশনন্দিনী দেবী কর্তৃক প্রকাশিত”। বীণা দেবী স্বামী শরদিন্দুর স্মৃতিতে ‘শরদিন্দু স্মৃতি সমিতি’ গঠন করলেন, যার প্রধান ছিলেন জ্যাঠতুতো বড় জা দুর্গেশনন্দিনী দেবী। বাড়ির কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে ‘অন্তঃপুর মহিলা সমিতি’ গঠন করেন বীণা, এই সমিতিতে চরকা কাটা, সেলাই, রামায়ণ, মহাভারত, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা পড়া ও শোনা হত। ধীরে ধীরে গ্রামের মহিলারা, বিশেষত অল্পবয়সী ও বর্ষীয়সী বিধবারা সমিতির সদস্য হলেন। গ্রামের মহিলাদের বিশেষত গর্ভবতী মেয়েদের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত অজ্ঞানতার জন্য অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হত, আঁতুড় ঘরেই অনেকে মারা যেত। এসব দেখে বীণা দেবী গ্রামের মেয়েদের উন্নতি করার কথা মনে রেখে ধাত্রীবিদ্যা শিখতেও শুরু করেছিলেন। ইত্যবসরে শিল্পী মুকুল দের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং বিবাহ। তারপর তাঁর জীবনের মোড় ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে গেল। শৈশবের বইতে দেখা ছবিগুলো চর্মচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হল, প্রাণের সম্পর্ক স্থাপিত হল কল্পলোকের শিল্পীর সঙ্গে। যিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে, তিনিই হলেন দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী। বীণা দেবীর জীবনের আরাধ্য দেবতা রবীন্দ্রনাথ এবং স্বপ্নের শান্তিনিকেতন-- দুইয়েরই দুর্লভ দর্শন মিলল এই জীবনেই।
শুরু হল বীণা দেবীর নতুন জীবন। বীণা যখন সব হারিয়ে পুরীতে মা বাবার কাছে ছিলেন, সে সময় সমুদ্রতীরে একটি পরিবারের সঙ্গে পরিচয় হয়। এক বর্ষীয়সী মহিলা তার দুই মেয়ে, এক ছেলেকে নিয়ে কিছুদিন পুরীতে ছিলেন। মহিলা হলেন শিল্পী মুকুল দের জননী। দুই মেয়ের মধ্যে একজনের নাম রানী যিনি পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেক্রেটারি অনিল চন্দকে বিয়ে করেছিলেন। রানীর দাদাই হলেন মুকুল দে। রানীর দৌত্যে মুকুল দে বীণা দেবীর সঙ্গে পরিচিত হন এবং বীণাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। রাণী চন্দও একজন সুলেখিকা ও শিল্পী। বীণা দেবীও অঙ্কন শিক্ষা শুরু করলেন। নিজে শিল্পী হওয়ার চাইতে শিল্পীর ঘরণী হয়ে তাঁর শিল্পকর্মে এবং শিল্প প্রদর্শনীর কাজে সহায়তা করায় বেশি মন দিলেন। যথাকালে কন্যা মঞ্জরীর জন্ম (মঞ্জরী উকিল ২০০৪-এ মারা গেলেন, মায়ের লেখা বই ছাপার অক্ষরে দেখে যেতে পারলেন না) হল। বীণা দেবীর অপূর্ণ মাতৃত্ব পূর্ণতা পেল, মেয়ের মুখে মা ডাক শুনলেন তিনি। বীণার মনে হল যেন তাঁর জীবন পরিপূর্ণতা লাভ করল, তাঁর প্রয়াত প্রথম স্বামীর মনোবাসনা পূর্ণ হল। স্বামী মুকুল দের সঙ্গে শ্রীলঙ্কা, লন্ডন, আমেরিকা ভ্রমণ করলেন তিনি, বিখ্যাত লোকেদের সংস্পর্শে এলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রথীন্দ্রনাথ, ইন্দিরা দেবী এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্নেহধন্যা হলেন। ভারতেও বিভিন্ন স্থানে (পুরী, ভুবনেশ্বর, সুন্দরবন, দিল্লি, শান্তিনিকেতন) বসবাস করলেন। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ও গান্ধীজির সাক্ষাৎ পেলেন। জীবনসায়াহ্নে শান্তিনিকেতন বসবাস করলেন, আশ্রমের নানা গঠনমূলক কাজে নিজেকে যুক্ত করতে পারলেন।
‘হারিয়ে যাওয়া দিন’ শুধুমাত্র এক নারীর সব হারিয়ে নতুন করে পাওয়ার ব্যক্তিগত কথন নয়, এই গ্রন্থে আমরা বিংশ শতাব্দীর অবিভক্ত ভারত, বিভক্ত ভারত, আমেরিকার জীবন ও সেই সময়ের সমাজের একটা পরিপূর্ণ চিত্র পাই। ব্যক্তি জীবনের মধ্য দিয়ে পল্লী সমাজ, নাগরিক সমাজ, শিল্পীর মনস্তত্ত্ব, মানব-মানবীর প্রেম খুব সুন্দর ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বইটিতে সংযোজিত হয়েছে অনেক কিছু-- ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে লেখা বীণা দের চিঠি, লন্ডন, আমেরিকার অভিজ্ঞতা নিয়ে চিঠি। তাছাড়া কন্যা মঞ্জরীর জন্য লেখা অনেক ছড়া, কবিতা এবং “তর্পণ” পত্রিকার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে লেখা প্রবন্ধও বইতে যুক্ত হয়েছে, তার বেশিরভাগই মহিলাদের উন্নয়ন সম্পর্কিত। মহিলাদের লেখাপড়া শেখার প্রয়োজনীয়তা, বিধবা মহিলা শিক্ষয়িত্রী হলে কেন ভালো হয়, শিক্ষা কীরকম হলে মেয়েদের তথা পরিবার ও সমাজের মঙ্গল হয়, মেয়েদের প্রাথমিকভাবে সেবামূলক কাজ শেখা, সংসারকে সুশৃঙ্খল রাখার জন্য সব ধরণের কাজ শিখে রাখার প্রয়োজন, চারুকলা, শিল্পকলা ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে ছিল তাঁর প্রবন্ধ। বীণা দের দ্বিতীয় বার বিয়ের সিদ্ধান্ত সমাজের চোখে গ্রহণীয় ছিল না। একে চট্টোপাধ্যায় বংশের বিধবা, তায় আবার ব্রাহ্মণ কায়স্থ পরিবারে বিয়ে! ঘোর কলি! বিয়ে বন্ধের যথেষ্ট হুমকি দেওয়া হয়। পিতৃকুল রাজি থাকলেও এ বিয়েতে বীণার শ্বশুরকুলের ঘোর আপত্তি ছিল। বিয়ে আটকানো না গেলেও সমাজের চোখ রাঙানি থামে নি। শৈলসুতা নামধারী কোন এক লেখিকা ‘পরিণয়ে প্রগতি’ নামে এক বইয়ে প্রেমজ এবং অসবর্ণ বিবাহের পাত্রপাত্রী দের তিরস্কার করেই ক্ষান্ত হন নি, তিনি খুঁজে খুঁজে সে সময়কার এই ধরনের বিবাহের পাত্রপাত্রী দের নামের তালিকাও রচনা করেছেন, তাদের মধ্যে তৎকালীন অনেক নামীদামী লেখক, সাহিত্যিক ও আছেন। “পরিণয়ে প্রগতি” বইয়ের পূর্বাভাষও অনুলেখিকা গ্রন্থে সংযোজিত করেছেন, সেই অসবর্ণ বিবাহের পাত্রপাত্রীদের নামের তালিকা সহ। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একাত্তরতম জন্মোৎসবে যে প্রশস্তিপত্র লেখা হয়েছিল তাতে বীণা দের লিখিত কবিতা আছে:- “অবনীন্দ্র জয়ন্তী”। কবিতার কয়েক ছত্র উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না;
“বিশ্বরূপের হে প্রিয় পূজারি!বইটিতে আরও মূল্যবান কিছু তথ্য আছে যা শিল্পীদের কাছে ঐতিহাসিক দলিল। ১৯৩৩ সালে পুরীতে অনুষ্ঠিত মুকুল দের চিত্র প্রদর্শনীতে যে সুন্দর ক্যাটালগ প্রকাশিত হয়েছিল সেটিই বইয়ের পরিশিষ্ট অংশে দেওয়া আছে।এই প্রদর্শনী উপলক্ষ্যে বীণা দে ‘অভিনব চিত্র- শিল্প প্রদর্শনী’ নামে একটি দীর্ঘ কবিতা লেখেন। মজা হচ্ছে কবিতায় ছবি সংক্রান্ত যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে পরিষ্কার করে বোঝা যাচ্ছে কোন ছবির কথা তিনি বোঝাতে চাইছেন। বইটির আরেকটি বিশেষত্ব হল বীণা দের কথনে যে সব অপ্রচলিত বা প্রাচীন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে পাঠকের বোধগম্যতার জন্য অঞ্জলি বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রী হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ ও সংসদের বাংলা অভিধান থেকে অর্থ জেনে বইয়ের শেষে সেগুলি যুক্ত করেছেন। বইয়ের প্রত্যেক অধ্যায়র শেষে রয়েছে মুকুল দের প্রথম দিকের কাজ ‘বাউল গায়ক’-এর ছবি। ‘হারিয়ে যাওয়া দিন’ বইটি একটি মূল্যবান সংগ্রহ হয়ে রইল অনুলেখিকার প্রচুর খাটাখাটনি করে লেখার জন্য। লেখা ও সম্পাদনা এত চমৎকার যে বীণা দেবীর পুরো জীবন, ব্যক্তিত্ব ও তৎকালীন সমাজ পাঠকের চোখের সম্মুখে জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে। সমগ্র বইতে কঠোর পরিশ্রম ও নিপুণ হাতের ছাপ রয়েছে।
শিল্পী -শ্রেষ্ঠ তুমি!
অবনী মাঝারে উজলি ধরিলে
ভারত মাতৃভূমি।
সার্থক তব নাম।
সত্যিই তুমি অবনী-ইন্দ্র! পুরালে মনস্কাম”
২০০২ সালে মুকুল দে ও বীণা দের শান্তিনিকেতনের বাসভবন “চিত্রলেখা” র একাংশে ‘মুকুল দে আর্কাইভস’ গড়ে ওঠে। মুকুল দে আর্কাইভসের পক্ষ থেকে দে দম্পতির দৌহিত্র সত্যশ্রী উকিলের আন্তরিক সাহায্য “হারিয়ে যাওয়া দিন” বইটির প্রকাশ বাস্তবায়িত করে। প্যাপিরাস থেকে বইটি ২০১২-র জানুয়ারিতে প্রথম প্রকাশিত হয়, পরের বছর ২০১৩-র এপ্রিলে বইটির দ্বিতীয় মুদ্রণ করা হয়।