• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০২ | এপ্রিল ২০২৬ | প্রবন্ধ
    Share
  • কবি বিষ্ণু দে-র শব্দচেতনা : সুমিতা চক্রবর্তী

    যে কবিরা রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও সচেতন ভাবে রবীন্দ্রনাথের কাব্যভাষা থেকে এবং অনেক সময় তাঁর কাব্য-ভাবনা থেকেও বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রধান নাম যে দুজনের—তাঁরা হলেন জীবনাননন্দ দাশ এবং বিষ্ণু দে। দুই কবিই এমন সব শব্দ কবিতায় প্রয়োগ করতেন যেগুলি নিয়ে তাঁদের সমকালেও অনেকের অনেক প্রশ্ন ছিল। এই কবিদের প্রত্যেকেরই জন্ম-শতবর্ষ অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও এই দুজনের কবিতার সব শব্দ সম্পর্কেই পাঠকদের সব প্রশ্নের নিরসন হয়েছে –- এমন কথা বলা যায় না। এই নিবন্ধে কবি বিষ্ণু দে-র জীবনপঞ্জি লিপিবদ্ধ করা নিষ্প্রয়োজন। অতি সংক্ষেপে যে কয়েকটি কথা বলে শুরু করা যেতে পারে তা হল — জন্ম ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে। অত্যন্ত সুশিক্ষিত পারিবারিক পরিমণ্ডলে তরুণ বয়স থেকেই সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা, দর্শন, সমাজ-ভাবনা, লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন পরিসরে অবাধ গতিবিধি ছিল তাঁর। সেই বিচরণ ছিল আন্তর্জাতিক। তিনি ভালোবাসতেন সাহিত্য। যখন থেকে কবিতা লিখতে শুরু করেছেন তখন থেকেই কবিতার ভাবনা, ভাব এবং রূপ নির্মাণ বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি ছিল বিশ্বব্যাপ্ত। প্রথম কবিতা-সংকলন ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে। শেষ সংকলন ‘আমার হৃদয়ে বাঁচো’ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৮১-তে। মধ্যবর্তী প্রায় পাঁচ দশকে প্রকাশিত হয়েছে আরও পনেরোটি কবিতা-সংকলন।

    এই নিবন্ধের প্রাসঙ্গিকতায় যে-কথাটি বলবার, তা হল প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কোনো সময়েই যে ভাবনাটিকে তিনি মনের মধ্যে স্থান দেননি—সেটি হল, পাঠক তাঁর কবিতার ভাষা তথা কবিতায় প্রযুক্ত শব্দের অর্থ বুঝতে পারবেন কিনা।

    পাঠকেরা অনেক শব্দেরই মানে বুঝতে পারতেন না। স্বয়ং বুদ্ধদেব বসু এই প্রশ্ন তাঁকে করেছিলেন । -- “‘ক্রতুকৃতম’, ‘অপাপবিদ্ধমস্নাবির’, ‘সোৎপ্রাসপাশ’, ‘অলাতচক্র’ (এমন আরো আছে) এইসব শব্দ ব্যবহার করে সত্যি লাভটা কোথায়? আমি নিজে কথাগুলোর জমকালো আওয়াজ শুনেই খুশি, শারীরিক আলস্য অভিধান দেখার বিঘ্ন, তাছাড়া সাধারণ অভিধানে হয়তো সব পাওয়াও যাবে না। ... পাঠকের স্বচ্ছন্দ উপভোগকে এমন করে নির্যাতিত ও নষ্ট করবার আমি তো কোনো কারণ দেখিনে।” (কবিতা, চৈত্র, ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ)।

    বুদ্ধদেব বসুর বাক্যগুলি বিষ্ণু দে-র আত্মস্থতাকে কিছুমাত্র ক্ষুন্ন করেনি তার প্রমাণ বুদ্ধদেব বসুর এই চিঠির উত্তরে বিষ্ণু দে-র মন্তব্য। তিনি বলেছিলেন--যে দুরূহতার জন্ম পাঠকের আলস্যে সে সম্পর্কে তাঁর কিছুই বলবার নেই । বুদ্ধদেব বসু পূর্বোক্ত পত্রেই বিষ্ণু দে-র কাব্য-ভাষা সম্পর্কে আরও একটি আপত্তি জানিয়েছিলেন ।--

    “আধুনিক কবিতার সাধনা মুখের ভাষা ও কাব্যের ভাষাকে কাছাকাছি আনবার; আপনার কি মনে হয় ন্যায়ের পরিভাষা কি ম্যমির মতো মৃত ও প্রাচীন সংস্কৃত শব্দের স্থান আছে সেখানে?” (কবিতা, চৈত্র, ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ)। এই আপত্তির জবাবে বিষ্ণু দে-র শানিত-সরস এবং সঙ্গত প্রতিযুক্তি উদ্ধারযোগ্য – “মা কালী বিষয়ে উচ্ছ্বাস করলে যদি আপনি আপত্তি করেন যে আজ সমাজে কালী আর সত্য নয়, আর রামপ্রসাদী কবি বা দিলীপবাবু যদি জবাব দেন, আলবৎ সত্য, তাহলে আপনি নৃতাত্ত্বিক সংখ্যাগণিতের ভরসা নিতে পারেন বা সংক্ষেপে বলতে পারেন যে আপনার মতে সত্য নয় বা সত্য হওয়া উচিত নয়।” (কবিতা, বৈশাখ, ১৩৪৫ বঙ্গাব্দ)।

    নিবন্ধের এই প্রাথমিক অংশ আর দীর্ঘ করতে চাই না। বিষ্ণু দে-র নিজস্ব অভিমত স্পষ্টই বোঝা যায়। তা হল, কবি নিজের কবিতার রূপ নির্মাণে নিজের উপলব্ধি, অধ্যয়ন ও মননজাত যে কোনো শব্দ গ্রহণ করবেন। সে-বিষয়ে পাঠকেরা কে কী বলছেন, অথবা পাঠকের কাছে তাঁর কবিতার শব্দ-প্রয়োগ সুবোধ্য হবে কী না – সে বিষয়ে তিনি ভাবেন না। এই বিষয়টিকে তিনি কোনো প্রশ্রয়ই দেন না। মনে হয় এই বিতর্কের আমরা এখানেই অবসান ঘটাতে পারি। একজন কবির কবিতা পড়তে গেলে প্রাথমিকভাবে কবির শর্তেই তা পাঠ করতে হবে। একালের সমালোচকের দৃষ্টিকোণও অস্বীকার করবার নয়। প্রত্যেক লেখাই প্রতিটি পাঠকের কাছে নিজস্ব ভাবনার আলোয় ভিন্ন ভিন্ন তাৎপর্যে মণ্ডিত হয়। কিন্তু যে-দিক থেকেই ভাষা-শিল্পকে দেখা যাক – সেই ভাষার শব্দগুলিকে বাতিল করে দিয়ে সেই ভাষা-শিল্প পাঠ করা সম্ভব নয়। অতএব সরাসরি চলে আসা যাক বিষ্ণু দে-র কবিতার শব্দের মুখোমুখি।

    প্রথমেই যা চমত্কৃত করে তা হল বিষ্ণু দে-র শব্দ চয়নের সুবিস্তৃত উত্সস্থল। একটু সারণীভুক্ত করে দেখা যাক।

    ১. শিক্ষিত বাঙালির শিষ্ট ভাষায় ব্যবহৃত প্রচলিত তৎসম ও মার্জিত তদ্ভব শব্দ।

    ২. সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও কথ্য-চলিত শব্দ, যেগুলি সাধারণত লেখ্য-ভাষায় ব্যবহৃত হয় না।

    ৩. শিক্ষিত বাঙালির শিষ্ট ভাষায় ব্যবহৃত বিদেশি শব্দ। সেগুলি ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান এবং অন্য যে-কোনো ভাষা থেকেও গৃহীত হতে পারে।

    ৪. সাধারণভাবে অপ্রচলিত তৎসম শব্দ যেগুলি সংস্কৃত কাব্যে ও শাস্ত্রে পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে এই ধরনের শব্দকে তিনি সন্ধি এবং সমাসের সাহায্যে একটু নতুন রূপও দিয়ে থাকেন।

    ৫. বিশ্বের জ্ঞান-ভাণ্ডার থেকে আহৃত শব্দ। সেই জ্ঞান-ভাণ্ডারের অন্তর্গত হতে পারে বিভিন্ন বিষয়। যেমন – দর্শন, ইতিহাস, নৃ-তত্ত্ব, লোকসংস্কৃতি, ভারতীয় ও পাশ্চাত্য পুরাণ ও মহাকাব্য, সঙ্গীত-শাস্ত্র, বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা, রাষ্ট্রনীতি এবং সংস্কৃতির যে-কোনো দিক। সর্বোপরি আছে বহু-সংখ্যক নাম-শব্দ। অর্থাৎ প্রপার নাউন। এই নাম-শব্দগুলি হতে পারে ব্যক্তি-নাম, স্থান-নাম, যে-কোনো বস্তু বা বিষয়ের নাম। এই বিভাগের বৈচিত্র্য বহু-ব্যাপ্ত। একটি মাত্র দিকের অনুসরণে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক।

    ১. বিষ্ণু দে-র কবিতায় ব্যক্তি-নাম:

    ১. ০১: ভারতীয় মহাকাব্য ও পুরাণ –
    উর্বশী, উলুপী, কপিল, দক্ষজা, ধন্বন্তরি, নহুষ, চন্দ্রাপীড়, জরৎকারী, ভদ্রা, মহাশ্বেতা, মহীদাস, যযাতি।

    ১. ০২: পাশ্চাত্য মহাকাব্য ও পুরাণ –
    অয়রিডিকে, অরফিউস, আন্দ্রমিদা, আর্টেমিস, আথেনে, ইনিয়াস, ইফিজেনি, ওরায়ন, ক্যাসান্ড্রা, ক্রেসিডা, ট্রয়লাস, ডায়না, ডানায়ে, টাইরেসিয়াস, বীলজেবব, ভেনাস, পেনেলোপি, প্যান্ডার, প্রসার্পিনা, প্রিয়াম, য়ুলিসিস, ল্যাজারাস, লুসিফার, হেক্টর, হেডিস, হেরড।

    ১. ০৩: ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রনৈতিক ব্যক্তি-নাম –
    কান্ট, কুবলাই খান, ট্রুম্যান, তানাকা সান, মার্শাল টিটো (তিতো), দিউগাশভিলি (স্টালিন-এর নাম), নিটশে, নিরো, ক্লাইভ, ক্লিওপেট্রা, খ্রুশ্চেফ, চার্চিল, জুডাস, বেন লিন্ডসে, মাউন্টব্যাটেন, মেদিচি, রথচাইল্ড, সক্রেটিস, স্যান্ডো, ডায়ার, ডার্বি।

    ১. ০৪: শিল্পী, সাহিত্যিক, দর্শনবিদদের নাম –
    অডেন, আরাগঁ, আলি আকবর, আশিষ বর্মন, উত্রিল্লো, এডগার অ্যালান পো, এমার্সন, ওয়র্ডসওয়র্থ, করবেট, কামাক্ষীপ্রসাদ, ডরোথি ওয়র্ডস্ওয়র্থ, দ্য ভিঞ্চি, দের‍্যাঁ, দেবীপ্রসাদ, ধূর্জটিপ্রসাদ, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলরতন, কোলরিজ, ক্লাইভ, গোপাল ঘোষ, গোবর গুহ, গোর্কি, গ্যালাহাদ, গ্রাৎসিয়া, গ্লুক, চঞ্চল চট্টোপাধ্যায়, জগদীশচন্দ্র বসু, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, বিল আর্চার, বুদ্ধদেব বসু, হেনরি বেটিস, বিঠোফেন, ব্রাঁকুসি, ভ্যালেরি, মণীন্দ্র রায়, মোৎসার্ট, মাতিস, নেরুদা, পাউন্ড, পিকাসো, পিসারো, পেটার, শুবার্ট, বার্ট্রান্ড রাসেল, বতিচেল্লি, বাখ, বালা সরস্বতী, মিলটন, রুক্মিণী দেবী, বার্নার্ড শ, শোপ্যাঁ, শ্লেগেল, সেজান, হামফ্রি হাউস, হাইনরিখ মান, হীরেন বাবু, হেগেল, হ্বোলডরলিন, হ্যারিয়েট, হ্ব্যাগনার।

    প্রতিটি তালিকাতেই আরও বহু নাম যুক্ত হতে পারে। ব্যক্তি-নাম ছাড়া বিভিন্ন বিষয় এবং বস্তু; সেই সঙ্গে প্রকৃতি ও সৌরজগৎ থেকে গৃহীত বিভিন্ন শব্দ। তাদের মধ্যে সাধারণ বিশেষ্য অর্থাৎ ‘কমন নাউন’ই বেশি; তবে কোথাও কোথাও ‘প্রপার নাউন’ এসেছে।

    প্রথমেই ঋণ স্বীকার করব আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত তিন খণ্ড ‘বিষ্ণু দে-র কবিতা সমগ্র’ –এর দুই সম্পাদক কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও অধ্যাপক পবিত্র সরকারের কাছে। তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে। এই খণ্ডের শেষে বিষ্ণু দে-র কবিতায় ব্যবহৃত শব্দাবলির একটি অতি শ্রমসাধ্য তালিকা প্রস্তুত করে দিয়েছেন দুই সম্পাদক। কিন্তু সেই তালিকায় শব্দ এবং কোথাও কোথাও বাক্যাংশ অন্তর্ভুক্ত হলেও যে-কবিতাটিতে সেই শব্দ বা বাক্যাংশের প্রয়োগ ঘটেছে এবং সেখানে কবিতার ভাববস্তুর সঙ্গে সেই শব্দ বা বাক্যাংশের সংযোগে কীভাবে সেই প্রয়োগ প্রকৃত তাৎপর্যে মণ্ডিত হয়ে উঠেছে তার ব্যাখ্যা দেবার অবকাশ ছিল না। সেই ভাবে যদি বিষ্ণু দে-র কবিতার (এবং জীবনানন্দেরও) শব্দ-প্রয়োগ-অভিধান প্রস্তুত করা যায় তা অন্তত পাঁচশো পৃষ্ঠার একটি গ্রন্থ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বর্তমান নিবন্ধে সেই কাজটিতে হাত দিতে চাই। একটি নিবন্ধের পরিসরে সেই প্রয়াসের পরিকল্পনা করাও হাস্যকর। সেজন্যই যদি ধারাবাহিকভাবে এক একটি লিখনে নির্দিষ্ট একটি দিককে গ্রহণ করা যায় তাহলে হয়তো এই পরিকল্পনাকে কিছুটা রূপ দেওয়া সম্ভব। ‘পরবাস’ পত্রিকার প্রশ্রয়ে একটি দিক নিয়ে কিছু আলোচনার সূত্রপাত করা গেল। সেই দিকটি হল পাশ্চাত্য মহাকাব্য ও পুরা-কথা অর্থাৎ মিথোলজি থেকে গৃহীত ব্যক্তি-নাম।

    দুটি বহু-পরিচিত কবিতার দৃষ্টান্ত দিয়ে শুরু করছি।

    ক্রেসিডা

    নাম-শব্দ ‘ক্রেসিডা’। ক্রেসিডা কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় ১৩৪৩ বঙ্গাব্দের (১৯৩৬ খ্রি) আষাঢ় সংখ্যায়। তখন নাম ছিল ‘মৃত্যু, প্রেম ও মহাকাল’। ‘চোরাবালি’ সংকলনে কবিতাটি ‘ক্রেসিডা’ নামে অন্তর্ভুক্ত হয়। এই সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল ‘ভারতী ভবন’ থেকে ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে। ‘নাভানা’ থেকে প্রকাশিত বিষ্ণু দে-র ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’য় ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে কবিতাটি গৃহীত হয়। সব শেষে ১৯৬০-এ ‘সিগনেট প্রেস’ থেকে প্রকাশিত ‘চোরাবালি’র নতুন সংস্করণে কবিতাটিকে পাওয়া যায়। প্রতিটি সংস্করণেই কিছু কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। আমরা এখানে ‘ক্রেসিডা’--এই নাম শব্দটির ব্যাখ্যায় এবং শব্দটি কীভাবে কবিতায় বিশেষ ব্যঞ্জনাবাহক হয়ে উঠেছে তার বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ থাকব। এখানে গৃহীত হয়েছে ১৯৬০-এ প্রকাশিত সর্বশেষ সংস্করণ।

    ‘ক্রেসিডা’ ট্রয় রাজ্যের রাজ-পুরোহিতের কন্যা। কবিতাটির কল্পিত কাল-প্রেক্ষাপট হল ‘ইলিয়াড’ কাব্যে বর্ণিত ট্রয় ও গ্রিস-এর যুদ্ধের সময়। এই ক্রেসিডা ছিল ট্রয়-এর রাজা প্রিয়াম-এর কনিষ্ঠ পুত্র ট্রয়লাস-এর প্রণয়িনী। কিন্তু সেই যুগে যুদ্ধের কালে মাঝে মাঝেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হত যে, সেই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পাবার জন্য দুই বিরোধী পক্ষের মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আপোস করতে বাধ্য থাকত একটি পক্ষ। এই ভাবে এক বিপন্ন মুহূর্তে গ্রিক বীর ডায়োমিডিস-কে সন্তুষ্ট করবার জন্য এক যুদ্ধ-বন্দির মুক্তির বিনিময়ে উপহার দিতে হয়েছিল ক্রেসিডা নামের সেই নারীকে। প্রথমেই গ্রিক পুরাকথার এই নারীর অসহায় পরিস্থিতি আমাদের বুঝতে হবে। স্বদেশে তার যথেষ্ট সম্মান ছিল। রাজপুরোহিতের কন্যা, রাজপুত্রের প্রণয়িনী। তবু যুদ্ধকালের সন্ত্রাস সাধারণ মানুষের জীবনকে যেভাবে বিপর্যস্ত করে দেয় তার মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত হল ক্রেসিডা। তাকে চলে যেতে হল ডায়োমিডিস-এর শিবিরে ভোগ্যা নারী হিসেবে।

    তারপরে একটু পটপরিবর্তন ঘটল। বীর ডায়োমিডিস ক্রেসিডার প্রতি কোনো নিপীড়ন করেনি। ক্রমে সহায়বিহীন ক্রেসিডা ডায়োমিডিস-এর অনুরাগিনী হয়ে উঠল। পুরাকথায় এটুকুই ব্যক্ত হয়েছে। কিন্তু এই কথাবৃত্ত অবলম্বনে পরবর্তীকালে নির্মিত হয়েছে অন্তত তিনটি সাহিত্য-কৃতি। চতুর্দশ শতাব্দীর ইংরেজ কবি জিওফ্রে চসার (১৩৪৩-১৪১০) লিখেছেন ‘ট্রয়লাস অ্যান্ড ক্রেসিড’ নামের কাব্য। শেক্সপিয়র (১৫৬৪-১৬১৬) লিখেছেন ‘ট্রয়লাস অ্যান্ড ক্রেসিডা’ নামের নাটক। তার কিছুকাল আগে স্কটল্যান্ড-এর কবি রবার্ট হেনরিসন (১৪৬০-১৫০০) লিখেছিলেন ‘দ্য টেস্টামেন্ট অব ক্রেসিড’ নামের একটি দীর্ঘ কবিতা। এক একজনের লেখায় ফুটে উঠেছে নায়িকার কিছু কিছু স্বতন্ত্র চেহারা। কিন্তু তিনটি লেখাতেই মূল কথা প্রায় একই থেকে যায় যে, মহাযুদ্ধের অনিশ্চয়তায় মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রেমের রক্ষণশীল ধারণা এবং একনিষ্ঠার নীতি পরিহার করে জীবন-বাসনার তীব্রতর আকাঙক্ষায় অন্য পুরুষকে গ্রহণ করেছিল ক্রেসিডা। হয়তো বাঁচবার আকাঙক্ষায়, হয়তো মনেরও টানে।

    এখানে একটি কথা খুবই তাৎপর্যময়। চসার, হেনরিসন এবং শেক্সপিয়র –- এই তিন কবিই ক্রেসিডাকে প্রেম-সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতিনীরূপে প্রত্যক্ষ করেছেন। কিন্তু তাঁদের কারোরই লেখায় এই সত্যটি ফুটে ওঠেনি যে, ক্রেসিডাকে যুদ্ধের প্রয়োজনে শত্রু-শিবিরে সমর্পণ করতে দ্বিধা করেনি তার স্বদেশের রাজতন্ত্র। সেখানে ক্রেসিডাকে ব্যবহার করা হয়েছিল বলির পশুর মতোই। স্বদেশের এই মেয়েটিকে রক্ষা করবার কোনো ভাবনাই ছিল না ট্রয়-এর বীরদের। রাজপুরোহিত তাঁর কন্যাকে রক্ষা করতে পারেননি বা করেননি; ট্রয়লাসও তার প্রণয়িনীকে রক্ষা করতে অসমর্থ ছিল। তারপর যখন একাকি ক্রেসিডা গ্রিক শিবিরে ডায়োমিডিসকে ভালোবেসেছে তখন কিন্তু তাকে প্রেমের ক্ষেত্রে বিশ্বাসহন্ত্রী বলে চিহ্নিত করতে কোনো কবিরই বাধেনি। এভাবে মানব-সভ্যতার পুরুষতান্ত্রিক চিন্তন-জগৎকেও অনুভব করা যায়।

    কিন্তু ক্রেসিডা-কেন্দ্রিক কাব্যধারার এ-যাবৎ শেষ নিদর্শনরূপে যদি বিষ্ণু দে-র ক্রেসিডাকে গ্রহণ করি তাহলে মনোভঙ্গির পার্থক্য লক্ষ করব। বিষ্ণু দে-র কবিতাটি রচিত হয়েছে বিংশ শতাব্দীর চতুর্থ দশকে। যদিও নারীবাদের ঢেউ তখনও আছড়ে পড়েনি আমাদের মনন-জগতে; তবু নারী সম্পর্কে ধারণার কিছু বিবর্তন তো ঘটেইছে। ‘ক্রেসিডা’ কবিতার কথক-স্বর কবি বিষ্ণু দে অর্পণ করেছেন ট্রয়লাস-এর ভাষায়। ট্রয়লাস-এর সংলাপে ক্রেসিডাকে হারানোর কষ্ট আছে। কিন্তু ক্রেসিডাকে দোষারোপ সে করেনি। অপর পক্ষে যুদ্ধকালীন বিপর্যয়ের সময়কে স্মরণ করেছে ট্রয়লাস, সেই সঙ্গে নিজের অসহায়তাকেও স্বীকার করেছে সে। ডায়োমিডিস-এর প্রতি ক্রেসিডার অনুরাগ তাকে কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু সেখানেও ক্রেসিডাকে কোনো কিছুর জন্য দায়ী না করে তার ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে মহাকালের নির্মোহ গতি; যেখানে মানুষের ধারণাজাত প্রেম, বিশ্বাস, একনিষ্ঠা ইত্যাদির বেড়া ভেঙে প্রাণধর্ম প্রবাহিত হয়ে চলে। সেখানে স্মৃতি যদিও মনের মধ্যে বিঁধে থাকে তবু প্রাণের যাত্রা থাকে অপ্রতিহত। সেই প্রগতি-পথে ক্রেসিডা এবং ট্রয়লাস–দুজনেই অভিযাত্রী। আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, বিষ্ণু দে-র ‘ক্রেসিডা’ কবিতাটি বিংশ শতাব্দীর বাস্তবতাকে এবং ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে সাঙ্গীকৃত করেছে যথাযথভাবে।

    কবিতাটিতে যে-সব অংশে ক্রেসিডার উল্লেখ আছে সেই অংশগুলি উদ্ধৃত করা হল। —

    'ক্রেসিডা! তোমার থমকানো চোখে চমকায় বরাভয়।
    তোমার বাহুতে অনন্ত-স্মৃতি ক্রতুকৃতমের শেষ।
    তোমাতেই করি মত্ত মরণে জয়।'
                                                                                         (চতুর্থ স্তবক)
    কবিতাটি মোটের উপর সুপরিসর। একটি নির্দিষ্ট কাল-খণ্ডের মধ্যে সময়-প্রসৃতিকে ধরা হয়েছে। এই স্তবকে ক্রেসিডার সঙ্গে প্রেমের আনন্দ-অনুভবে নিমগ্ন ট্রয়লাস।
    'লাল মেঘে ঠেলে নীল মেঘ, নীলে ধোঁয়া মেঘেদের ভিড়
    মেঘে-মেঘে আজ কালো কল্কির দিন হল একাকার।
    বিদ্যুৎ নেভে ঈশানবিষাণে, বজ্রও দিশাহারা
    এলোমেলো পাখা ঝাপটি তবুও ওড়ে কথা ক্রেসিডার।'
                                                                                         (অষ্টম স্তবক)
    এই স্তবকে যুদ্ধের বিপর্যস্ত পরিস্থিতি বর্ণিত হয়েছে। এসে গেছে কালো কল্কির দিন। ঈশান অর্থাৎ প্রলয়-দেবতার তূর্য-ধ্বনিতে নিভে গেছে বিদ্যুৎ। আবার ঈশান শব্দে ঈশান কোণের ঝড়ের মেঘেরও ইঙ্গিত আছে। স্তবকের শেষ দুটি পঙক্তি যেন ক্রেসিডার অসহায় মিনতির ভাষারূপ। তাকে যেতে হবে শত্রু-শিবিরে। সে যেতে চায় না। ঝড়ে বিপন্ন পাখির মতো সে অসহায়।
    'জানি, জানি, এই অলাতচক্রে চক্রমণ।
    সোৎপ্রাসপাশে বলিনাকো তাই কথা।
    ক্রেসিডা! আমার প্রচণ্ড আকুলতা –
    জিজীবিষু প্রজাপতি বিভ্রমণ।'
                                                                                         (পঞ্চদশ স্তবক)
    এই স্তবকে ব্যক্ত হয়েছে ক্রেসিডাকে হারিয়ে ট্রয়লাস-এর মানসিক যন্ত্রণা। তখন ক্রেসিডা গ্রিক শিবিরে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
    'দুঃস্বপ্নেও প্রেম করেনি এ আশা।
    শত্রুশিবিরে কুমারীর নত চোখে, মুখে, সারা শরীরে নগ্ন ভাষা!
    হে গ্রীক নাগর! ট্রয়কে হারালে আজই!'
                                                                                         (ঊনবিংশ স্তবক)
    উদ্ধৃত পঙক্তিগুলিতে প্রতিফলিত হয়েছে আরও কিছুকাল পরের ঘটনা। ট্রয়লাস জেনেছে যে, ক্রেসিডা হৃদয় দান করেছে গ্রিক বীরকে। এখানে ব্যক্ত হয়েছে তার কষ্ট; গভীর হতাশায় সে ভেবেছে, ট্রয়-কন্যার হৃদয় জিতে নিয়েছে গ্রিক পুরুষ। এখানেই যেন ট্রয়-এর পরাজয় সম্পূর্ণ হল। এই স্তবকে ক্রেসিডার নাম নেই, কিন্তু ক্রেসিডা-ই উদ্দিষ্ট।
    'বিজয়ী রাজার দানসত্রের শ্রাবণপ্লাবনে ভাসে
    পুরজন যত গৃহহীন যত বুভুক্ষু ভিক্ষুক।
    হায়েনার হাসি আসে স্মৃতিপটে – বেহিসাবী ক্রেসিডা সে।'
                                                                                         (পঞ্চবিংশ স্তবক)
    এই স্তবক কবিতার অন্তিম স্তবকের ঠিক আগে সংস্থাপিত। মনে হয়, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। স্থাপিত হয়েছে বিজয়ী পক্ষের অধিকার। ম্রিয়মাণ ট্রয়লাস। সে বেহিসাবি ক্রেসিডার কথা ভাবে। এই বেহিসাব কিন্তু ট্রয়লাস-এর যুক্তিতে বেহিসাব। প্রকৃত পক্ষে ক্রেসিডা তার জীবনের দুর্ভাগ্যের দিন অতিক্রম করে নিজের প্রাণের শক্তিতে বাঁচবার মন্ত্র গ্রহণ করেছে। এক দিক থেকে এই কবিতায় জয় হয়েছে ক্রেসিডার। যে-কবিতার আদি নাম ছিল ‘মৃত্যু, প্রেম ও মহাকাল’ – তার পরিবর্তে ‘ক্রেসিডা’ নামটির প্রতীকী ব্যঞ্জনা অনেকটাই বেশি।

    শেষ কথা হিসেবে বলা যায়, পূর্ব-উল্লিখিত কবিতা সমগ্র-এর তৃতীয় খণ্ডের শব্দ-পঞ্জিতে ক্রেসিডা সম্পর্কে যা লেখা হয়েছিল সেখানে ক্রেসিডার বিশ্বাসঘাতকতার উল্লেখ আছে; কিন্তু ক্রেসিডার প্রতি তার স্বদেশ যে অন্যায় করেছিল তার উল্লেখ নেই। সেই অংশটি উদ্ধৃত হল। —

    “ক্রেসিডা – ইউরোপের মধ্যযুগীয় পুরাণে – চসারের ট্রয়লাস এবং ক্রেসিডে, এবং শেক্সপিয়রের ট্রয়লাস ও ক্রেসিডার এক ট্রোজান কন্যা – যে প্রেমিক ট্রয়লাসের প্রতি বিশ্বাসঘাতিনী হয়েছিল।”
    অয়রিডিকে

    পাশ্চাত্য পুরা-কথা থেকে আর এক নারীর নাম ব্যবহৃত হয়েছে বিষ্ণু দে-র ‘অয়রিডিকে’ কবিতায়। কবিতার কেন্দ্রীয় নারী-চরিত্র অয়রিডিকে (‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত’ কবিতা-গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত, প্রকাশ ১৯৬৩)।

    এই নারীর নাম ইংরেজিতে উচ্চারিত হয় ‘ইউরিডাইস’ অথবা ‘ইউরিডিস’ রূপে – রোমান হরফে যাকে লেখা হয় ‘Eurydice’--তার কথাই এখানে বলা হয়েছে। শব্দটির প্রকৃত উচ্চারণ (যেহেতু মূল কাহিনিটি গ্রিক পুরাণ থেকেই নেওয়া) নির্দেশ করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু – ‘ইউরিদিকে’। শিশিরকুমার দাশ অবশ্য জানিয়েছেন – প্রকৃত উচ্চারণ হবে ‘এউরুদিকে’। বিষ্ণু দে ‘অয়রিডিকে’ শব্দটি ব্যবহার করলেন কেন? এর উত্তর পেতে সাহায্য করে জার্মান কবিতার একটি অসম্পূর্ণ পঙক্তি – যেটি লেখা আছে কবিতার শিরোনাম ও উত্সর্গ-বাক্যের ঠিক পরেই। ‘অয়রিডিকে’ হল জার্মান উচ্চারণ। এখানে এ তথ্যও জানা দরকার যে, কবিতাটি উত্সর্গ করা হয়েছে সত্যজিৎ রায়কে। জার্মান কবিতা-পঙক্তিটি হল – “Triumph sei Amor, und alles, was da lebet,…”।

    এখন প্রশ্ন হল, কবিতার শিরোনামের পরেই বন্ধনীভুক্ত রয়েছে ‘সত্যজিৎ রায়কে’ শব্দ দুটি; তারপরেই উদ্ধৃত হয়েছে জার্মান কবিতা-পঙক্তি। কিন্তু এর তাত্পর্য কী? এ-বিষয়ে বিভিন্ন সূত্র থেকে এবং বিষ্ণু দে-র পত্নী শ্রীমতী প্রণতি দে-র কাছ থেকে যা শুনেছিলাম তার সারসংক্ষেপ উদ্ধৃত করি। –

    Christoph Willibald Gluck (১৭১৪-১৭৮৭) ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দের জার্মান সুরশিল্পী। তাঁর রচিত একটি ওপেরার নাম ‘Orfeoed Euridice’ অর্থাৎ অর্ফিয়ুস ও ইউরিডাইস। গ্রিক পুরাণের এই দুই নারী-পুরুষের মনোহারী প্রেমকথাটি এই ওপেরার উপজীব্য। সত্যজিৎ রায়ের সংগ্রহে ছিল এই রেকর্ডটি, যেটি এককালে বারবার শুনেছিলেন বিষ্ণু দে ও সত্যজিৎ রায় উভয়েই। সেই বন্ধুত্ব ও সহিতত্বের স্মৃতি এই উত্সর্গে, আর সেই রেকর্ডধৃত ওপেরাটির অনুভাবনা ঐ জার্মান উচ্চারণে এবং ঐ অসম্পূর্ণ জার্মান পঙক্তিটিতে। গ্লুক-এর রচিত ওপেরাটির তৃতীয় অংকের দ্বিতীয় দৃশ্য –- স্থান : ভালোবাসার দেবতার মন্দির। সেখানে অর্ফিয়ুস-এর উক্তি – “Triumph sei Amor, und alles, was da lebet, Schmuck der SchonheitGotteraltar.”। বাক্যটির যথাযথ ইংরেজি অনুবাদ – “Triumph be Amor (God of Love), and everything that there lives adorn the divine altar of beauty.”।

    এরপর আমরা অর্ফিয়ুস এবং ইউরিডাইস-এর মিথোলজিকল পরিচয় জেনে নেব। বিষ্ণু দে-র অনুসরণে ‘অয়রিডিকে’ অভিধাই উল্লিখিত হবে। পুরাকথায় অর্ফিয়ুস-এর নাম আছে বহুবার। অনেক লেখকের রচনাতেই, কোথাও সংক্ষিপ্ত এবং কোথাও বিস্তৃতভাবে অর্ফিযুস এবং তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহের উল্লেখ পাওয়া যায়। মোটের উপর কেন্দ্রীয় যে আখ্যান গড়ে উঠেছে অর্ফিয়ুস এবং অয়রিডিকে-কে নিয়ে সেটি বিবৃত হল। --

    থ্রেস-এর রাজপুত্র অর্ধ-দেবতা অর্ফিয়ুস। তার মা মহাকাব্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কালিওপি বা অন্য কোনো কলা-দেবী(muse)। সাধারণত গ্রিক দেবতা ও অর্ধদেবতারা বীর, অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন, কামুক, চতুর, ঈর্ষাপরায়ণ ও নিষ্ঠুর। কিন্তু অর্ফিয়ুস-এর প্রধান পরিচয় –- সে শিল্পী, সুরসাধক। তার বীণার (lyre) সুরে মুগ্ধ বনের পশুপাখি, বৃক্ষলতা, নদী-পাথর। অর্ফিয়ুস-এর আর এক পরিচয় – সে প্রেমিক। ইউরিডাইস (এউরুদিকে বা এখানে অয়রিডিকে) নামে এক তরুণীকে বিবাহ করবার পরেই ইউরিডাইস সর্পাঘাতে প্রাণ হারায়। পত্নীর সন্ধানে ও তার পুনর্জীবন-প্রাপ্তির প্রার্থনা নিয়ে অর্ফিয়ুস চলে আসে পাতালে, প্রেতলোকের অধীশ্বর হেডিস ও তাঁর রানি পের্সিফোনির কাছে। অর্ফিয়ুস-এর বীণাধ্বনি শুনে মুগ্ধ হেডিস ইউরিডাইস-এর প্রাণ ফিরিয়ে দিলেন। কিন্তু শর্ত হল যে, পাতালের সীমা অতিক্রম না করা পর্যন্ত অর্ফিয়ুস পিছন ফিরে তাকে দেখতে পাবে না। শেষ মুহূর্তে ধৈর্য হারিয়ে অর্ফিয়ুস ফিরে তাকায় ও দ্বিতীয়বার হারিয়ে যায় ইউরিডাইস চিরকালের জন্য। এরপর যে-পথ দিয়ে অর্ফিয়ুস ফিরে আসছিল সে-পথের দুধারের বনদেবীরা হিংস্র হয়ে উঠে খণ্ড খণ্ড করে ফেলল অর্ফিয়ুসকে। এই হিংস্রতার কারণ সম্ভবত এই যে, অর্ফিয়ুস-এর চপলতার ফলে একটি প্রেম সফল হতে পারল না। হয়তো গোপনে তারা কামনা করেছিল অর্ফিয়ুসকে – সেই কামনার অতৃপ্তি মিশেছিল এই ক্ষোভে। মৃত্যুর পর অর্ফিয়ুস-এর মাথাটি গান গাইতে গাইতে নদীস্রোতে ভেসে চলে যায়। মতান্তরে ইউরিডাইস-এর দ্বিতীয় অন্তর্ধানের পর অর্ফিয়ুস আত্মহত্যা করে। এই কাহিনিটি বহু দেশের বহু কবি, ভাস্কর ও চিত্রশিল্পীর অবলম্বন হয়েছে।

    বিষ্ণু দে-র ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত’ (১৯৬৩) সংকলনের অন্যতম কবিতা ‘অয়রিডিকে’। কবিতার শিরোনামের সঙ্গে প্রদত্ত গ্লুক রচিত জার্মান ওপেরা-র পঙক্তি-সম্পর্কিত ব্যাখ্যা দেওয়া হল। সেই সঙ্গে বন্ধনীভুক্ত আছে দুটি শব্দ – ‘সত্যজিৎ রায়-কে’। কেন এই উত্সর্গ তারও ব্যাখ্যা আগেই দেওয়া হয়েছে। এখন আমরা সরাসরি কবিতাটির মধ্যে প্রবেশ করতে পারি। আট স্তবকের কবিতা, কিন্তু স্তবকগুলির পঙক্তি-সংখ্যা সমান নয় – যথাক্রমে ছয়, পাঁচ, পাঁচ, ছয়, চার, পাঁচ, পাঁচ, আট। এই আটটি স্তবকের শেষে কিছুটা স্পেস দিয়ে আছে কবিতার শেষ পঙক্তি। ছয় মাত্রার কলাবৃত্ত ছন্দের কাঠামো ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু সব স্তবকে পঙক্তি-সংখ্যা যেমন সমান নয়, তেমনই প্রতিটি পঙক্তির পর্ব-সংখ্যাও সমান নয়।

    খুব বড়ো মাপের কবিতা নয়। কিন্তু কবিতার ভাববস্তু অনুভব করতে গেলে সুচিন্তিত অনুধাবন প্রয়োজন। আমরা প্রতিটি স্তবক অনুসরণে এই কবিতার সঙ্গে ‘অয়রিডিকে’ নাম-শব্দ এবং সেই নামের অধিকারিণী নারীর সম্পর্ক বোঝবার চেষ্টা করব।

    স্তবক ১

    'এ কোন কবির নরক জীবনযাত্রায়?
    পর্বে পর্বে পথে পথে ঘরে বাইরে চলেছে নাট্য,
    মরণ রঙ্গে এবং নিজের মনে তো চলে না শাঠ্য,
    নানারূপে তাই নরকের দিনরাত্রি
    পদে পদে দেখি কবির ছন্দে, দৈনন্দিন যাত্রী
    নরকের পথে গান করে চলি মৃত্যুঞ্জয় মাত্রায়।'
    প্রথম স্তবকের কথক কবি স্বয়ং। তিনি উত্তম পুরুষের বাচনে স্তবকের শেষ দুই পঙক্তিতে বলেছেন যে, তিনি এক দৈনন্দিন যাত্রী, যিনি নরকের পথে কবির ছন্দে গান গেয়ে চলেন মৃত্যুঞ্জয় অস্তিত্বের দিকে। কাজেই কবিতাটি মৃত্যুর বাস্তবতা-অতিক্রান্ত মৃত্যুঞ্জয়তার ব্যঞ্জনাকে ধারণ করেছে। এই স্তবকে কোনো নাম-শব্দ নেই। কিন্তু কবি-কথক নিজের চতুর্দিকে যে জীবনযাত্রাকে অনুভব করেছেন তাকে তুলনা করেছেন নরকের দিনরাত্রির সঙ্গে। গ্রিক পুরাকথার অনুষঙ্গবাহিত কবিতাটির সঙ্গে ছয়-এর দশকের ভারত তথা বঙ্গদেশের বিপন্ন সময়-সংকটকে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রথমেই।

    স্তবক ২

    'তুমিও বন্ধু নরকেই করো হৃদয়ের অভিযান?
    অধিষ্ঠাত্রী প্রেয়সী কি তবে রইবে আঁধারে লীন?
    পাখিদের সুরে পল্লবতানে প্রকৃতির সম্মান
    তুমিও খোয়াবে , হে সুরস্রষ্টা পরাজিত ম্রিয়মাণ?
    মৌন মুরলী, থেকে যাবে মূক তোমারই রুদ্রবীণ?'
    দ্বিতীয় স্তবকের প্রথমেই কবি ‘তুমি’ এবং ‘বন্ধু’ সম্বোধনে যে মধ্যম পুরুষকে পাঠকের সামনে দাঁড় করিয়েছেন সে হল অর্ফিয়ুস। মূল কাহিনিতে অয়রিডিকে যখন অর্ফিয়ুসকে অনুসরণ করে আসছিল, তখন অর্ফিয়ুস ফিরে তাকাবার ফলে সে আবার নরকে অন্তর্হিত হয়। কবি অর্ফিয়ুসকে প্রশ্ন করছেন – সে কি তার প্রিয়াকে এই অন্ধকারেই রেখে যাবে? এখানে স্তবকের শেষ পঙক্তির দুটি শব্দ লক্ষ করি – মুরলী এবং রুদ্রবীণ। গ্রিক পুরাকথায় বলা হয়েছে যে, অর্ফিয়ুসের সুর-যন্ত্রটি হল তন্ত্রীবাদ্য (লায়ার বা হার্প)। এখানে বিষ্ণু দে রুদ্রবীণ ব্যবহার করলেও সেই সঙ্গে মুরলী বা বাঁশি শব্দটিও প্রয়োগ করেছেন। আমাদের মনে পড়ে, ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুল ইসলামও লিখেছিলেন – ‘আমি আরফিয়াসের বাঁশরী’। মনে হতে পারে যে, এদেশের রাধা-কৃষ্ণ প্রেমকথার অনুষঙ্গেই মুরলী বা বাঁশি শব্দটি এসেছে। কিছুটা তেমন হওয়া সম্ভব। কিন্তু গ্রিক মিথোলজি নিয়ে যে-সব ভাস্কর্য ও চিত্রকলা রচিত হয়েছে তার দু-একটিতে বংশীবাদক অর্ফিয়ুস-এর মূর্তিও দেখা যায়।

    স্তবক ৩

    'নরকে কি শেষে রেখে যাবে একা জীবনের সঙ্গীকে?
    দুর্গম পথে ক্ষুরধার প্রেম কাঁদবে চতুর্দিকে
    সারা জীবনের প্রেমের কবরে অগোচরে নিঃসীমে?
    কালের আদেশ বিদেহী অন্ধ হিমে
    বাঁচবে না বুঝি আবেগে অধীর তোমার অয়রিডিকে?'
    তৃতীয় স্তবকে পুনরক্ত হয়েছে দ্বিতীয় স্তবকেরই আবেদন। এই স্তবকের শেষ পঙক্তিতে প্রথম এসেছে অয়রিডিকে-র নাম।

    স্তবক ৪

    'তোমার দু’পাশে কারা তোলে হাতছানি?
    কাদের কান্না তোমার এ পরাজয়ে?
    মানব-প্রেয়সী মাত্রেই ইন্দ্রাণী,
    মনসিজ ঐ বলে নাকি বরাভয়ে?
    দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হে সখা সত্যবান,
    নরকে তোমার প্রেমের কলিতে মরণও যুক্তপাণি।'
    চতুর্থ স্তবকে অর্ফিয়ুস ও অয়রিডিকে-র পরিবর্তে ভারতীয় পুরাণে সত্যবানের কথাবৃত্ত উপস্থাপিত। দুটি আখ্যানের মিল আছে। মদ্র দেশের রাজা অশ্বপতির কন্যা সাবিত্রী শাল-দেশের রাজপুত্র সত্যবানকে পতিত্বে বরণ করেছিলেন। এক বছরের মধ্যেই সত্যবানের মৃত্যু হবে জেনেও তিনি ছিলেন অবিচলিত। বত্সরান্তে যমরাজ সত্যবানের প্রাণ নিয়ে যেতে এলে সাবিত্রী তাঁর অনুগমন করেন। তাঁকে নিবৃত্ত করতে না পেরে যমরাজ সত্যবানের প্রাণ ফিরিয়ে দেন। এই স্তবকে সত্যবানের নাম আছে। কিন্তু অর্ফিয়ুস বা অয়রিডিকে কারোরই উল্লেখ নেই। যদিও স্তবকের প্রথম দুই পঙক্তিতে অর্ফিয়ুস-এর ব্যর্থতায় শোকাহত অরণ্য-অপ্সরাদের ইঙ্গিত আছে। এই স্তবকে কবি-কথক অর্ফিয়ুসকেই যেন সত্যবান সম্বোধন করেছেন। এখানে ভারতীয় পুরাণ-কাহিনির মতোই অর্ফিয়ুস-এর প্রার্থনায় মৃত্যু-দেবতা হেডিস অয়রিডিকে-র প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। সেই প্রসঙ্গের উল্লেখ দেখা যায়।

    স্তবক ৫

    'কঠিন পণের আঁধারে তোমার অভিযান,
    মধ্যদিনেও দেখবে না তুমি আপন সাবিত্রীকে,
    সদ্যোত্থিত প্রিয়াকে দেবে না বাহুডোর,
    দেখবে না চেয়ে সে প্রিয় মুখের সুখঘোর?'
    এই পঞ্চম স্তবকেও, যদিও গ্রিক পুরাকথার চরিত্র-নামের উল্লেখ নেই, কিন্তু এই স্তবকে কবি সম্বোধন করেছেন সরাসরি অর্ফিয়ুসকে। অয়রিডিকে-কে ফিরিয়ে আনবার জন্য কঠিন প্রতিজ্ঞা করতে হয়েছে অর্ফিয়ুসকে। নরক থেকে প্রত্যাবর্তনের পথে সে একবারও তার প্রণয়িনীকে ফিরে দেখবে না, তাকে কাছে পাবে না। কবি বিষ্ণু দে যেন হেডিস-এর এই অনুশাসনে অনুভব করেছেন অন্যায় পীড়ন। এই স্তবকে সাবিত্রী নামের উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই উল্লেখের উদ্দিষ্ট নারী সাবিত্রী নয়, অয়রিডিকে।

    স্তবক ৬

    'অসিধার প্রেমে কঠিন শপথে চলো বীর,
    নরকের বিধিনিষেধ স্নায়ুতে অস্থির,
    অথচ হৃদয় আকুল আদরে আবেশে,
    তবুও যাত্রা প্রেমের অমোঘ আদেশে।
    অভিমানে ব্রত ভাঙবে কি শেষে তোমারই অয়রিডিকে?'
    এই স্তবকে নতুন কোনো দিক-নির্দেশ নেই। শেষ পঙক্তিতে অয়রিডিকে নামের প্রয়োগ আছে। আমরা লক্ষ করি অর্ফিয়ুস-এর নাম একবারও এই কবিতায় উচ্চারিত না হলেও এই কবিতা কিন্তু অবলম্বন করেছে প্রধানত অর্ফিয়ুসকেই। অয়রিডিকে অর্ফিয়ুস-এর প্রাণপ্রতিমা; কিন্তু এই কবিতায় অর্ফিয়ুস-এরই সক্রিয়তা বেশি। গ্রিক মিথোলজি-র মূল আখ্যানেও তাই-ই আছে। এখানে কবি যেন অনুভব করেন, নরকের বিধি-নিষেধ অন্যায়ভাবে আরোপিত হয়েছে মানুষের প্রতি। অর্ফিয়ুসকে গ্রহণ করতে হবে প্রেমের অসিধার ব্রত। এই ব্রতের তাত্পর্য হল–প্রণয়ী ও প্রণয়িনী অত্যন্ত সন্নিকটে থাকলেও তারা পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হতে পারবে না। এই ব্রত উদযাপনে আসবে পরিত্রাণ।

    স্তবক ৭

    'তুমি যে প্রতীক, তোমার প্রেয়সী প্রতিমা
    আমাদের মনে মন্দির দিকে দিকে,
    মূর্ছিত নত আঁধারে আপাত গতপ্রাণ
    অথচ অমর সহিষ্ণু সেই পাতাল-তীর্ণ মহিমা
    আমাদেরই জেনো জীবনমরণে প্রতীকে।'
    এই স্তবকে অনুভব করা যায় যে, অর্ফিয়ুস–অয়রিডিকে-র এই কথাবৃত্ত পুরাকথার কাল-পরিধি উত্তীর্ণ হয়ে এসে উপনীত হয়েছে সেই বর্তমানে, যেখানে দাঁড়িয়ে কথক-কবি উচ্চারণ করেছেন তাঁর কাব্যভাষা। প্রেম-অনুভব চিরকালীন। এবং প্রেম-অনুভবের কোনো স্থানিক পরিসীমাও থাকে না। অর্ফিয়ুস-অয়রিডিকে-র দেশ-কাল; সাবিত্রী-সত্যবানের দেশ-কাল এবং বর্তমানের বাঙালি কবির উপলব্ধির মুহূর্ত একই হৃদয়ের বন্ধনে অবিচ্ছিন্ন। সেই প্রেমের বিশুদ্ধতম রূপ সহিষ্ণুতা এবং মৃত্যু-উত্তীর্ণ মহিমায় সমুজ্জ্বল। কবি বিষ্ণু দে ছয়-এর দশকের পশ্চিমবঙ্গের জীবনধারার বাতাবরণে দাঁড়িয়ে এই সর্বজয়ী প্রেমের স্তোত্র রচনা করেছেন। সেই প্রেমকে তিনি বলেছেন – ‘আমাদেরই যেন জীবনমরণে প্রতীকে’। এই স্তবকে প্রেমের প্রতীক অর্ফিয়ুস, আর অয়রিডিকে হল পাতাল-তীর্ণ মহিমার প্রতীকী অবয়ব। এই প্রতীক ব্যাখ্যা করে দেওয়াতে কবিতার কোনো ক্ষতি হয়নি; বরং সমকালের সঙ্গে ঘটেছে প্রত্যক্ষ সংবেদনার সম্মিলন।

    স্তবক ৮

    'আশেপাশে একি নানা বেশে নানা কংকাল!
    ভাগ্যহতের পরীক্ষা কতকাল?
    কোথায় লুকাল তোমার অয়রিডিকে?
    ছিঁড়ে দাও ভাঙো নরকের মায়াজাল,
    তোমার মাথুর সংগীতে দেব সবাই দোহারে তাল
    তোমার প্রেমের উজ্জীবনেই প্রাণ পাই ঠেকে শিখে:
    যার চোখে আহা আমাদের প্রাণ পায় প্রাণ
    তাকাবে না সেই প্রেয়সীরও চোখে প্রেমিকে!'
    এই অষ্টম স্তবককেই কবিতার শেষ স্তবক বলা যায়। এর পরে আর একটি মাত্র পঙক্তি আছে উপসংহারের উচ্চারণে।

    অষ্টম স্তবকের শুরুতেই কবি সরাসরি চলে এসেছেন তাঁর সমকালের পশ্চিমবঙ্গে। সেখানে কোনো সুশৃঙ্খল সমাজ নেই, নাগরিকেরা দুর্ভাগ্য-পীড়িত; চারিদিকে যেন বিস্তীর্ণ নরক। অয়রিডিকে অর্থাৎ ‘পাতাল-তীর্ণ’ মহিমা আছে গোপনীয়তায় অবরুদ্ধ।

    স্তবকের শেষ পাঁচ পঙক্তিতে কবি অর্ফিয়ুসকে সম্বোধন করেছেন। প্রার্থনা জানিয়েছেন, যেন তার প্রেমের শক্তিতে ভেঙে যায় নরকের মায়াজাল। আজকের মানুষ হয়ে উঠুক অর্ফিয়ুস-এর সঙ্গী।

    শেষ পঙক্তি

    আমাদের মরঅলকায় আজ বাঁচুক অয়রিডিকে।। শেষ পঙক্তিতে কবির উপলব্ধির আর কোনো নতুন উন্মোচন নেই। তিনি জানিয়েছেন এক সর্বাতিশায়ী প্রার্থনা। সেই প্রার্থনা হল – বর্তমানের মারণ-আক্রান্ত জীবনে জেগে উঠুক মৃত্যু-উত্তীর্ণ প্রেম — যার প্রতীক অয়রিডিকে।

    গ্রিক পুরা-কথা থেকে গৃহীত দুটি মাত্র ব্যক্তি-নামকে বিষ্ণু দে নিজের কবিতায় যেভাবে প্রয়োগ করেছেন তা আমরা বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করলাম। এই দুটি কবিতার সূত্রেই ট্রয়লাস এবং অর্ফিয়ুস চরিত্র দুটিকেও অনেকটাই ব্যাখ্যা করা গেল। আরও অনেক পাশ্চাত্য মিথোলজির চরিত্র এমনই বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে। পরবর্তী কোনো সংখ্যায়, পাঠকের আগ্রহ থাকলে, তার সন্ধান করা যাবে।

    -----------------------------------------------------------
    * অরফিউস সম্পর্কে মিথোলজিতে বহু ধরনের উল্লেখ আছে। সর্বাধিক কৌতূহল-উদ্দীপক তথ্য হল—অনেকেই মনে করেছেন যে, অরফিউস ছিলেন ঐতিহাসিক ব্যক্তি। তিনি ছিলেন কবি ও গীতিকার, সুরশিল্পী, যাদুকর এবং ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। একমাত্র অ্যারিস্টটল তাঁর ঐতিহাসিকতা স্বীকার করেননি, কিন্তু তিনি ছাড়া অনেকেরই মতে হোমার-এর কয়েক প্রজন্ম পূর্বে অরফিউস-এর ব্যক্তি-অস্তিত্ব ছিল। অরফিউস-ইউরিডাইস সংক্রান্ত কথাবৃত্ত সর্বাধিক প্রচলিত হলেও আরও অনেক কথাবৃত্তের সঙ্গেই তাঁর সংযোগের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন, জেসন-এর সঙ্গে স্বর্ণমেষ-লোম উদ্ধার করবার সমুদ্র যাত্রায় তিনি সঙ্গী ছিলেন।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments