• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০২ | এপ্রিল ২০২৬ | রম্যরচনা
    Share
  • পুরো ফিশি ব্যাপার : প্রিতম মুখোপাধ্যায়

    নারীবাদীদের কাছে মার্জনা চেয়ে দুরুদুরু বক্ষে প্রথমেই অপ্রিয় সত্য কথাটুকু বলে দিতে চাই। সবিনয়ে জানাই যে প্রত্যেক মহিলাই নিশ্চিতভাবে মনে করেন যে তার অমিত বিচক্ষণ পিতৃদেবটির মতো বাজার বিশেষজ্ঞ এই মর্ত্যভূমে আর কেউ হতে পারেন না। বিবাহিত মহিলাগণ আরো চরমপন্থী, তারা এবিষয়ে একশো শতাংশ নিশ্চিত যে বাজার করার ব্যাপারে তার পতিদেবতাটি একেবারেই ঢ্যাঁড়শ। আনাজ বাজারের ক্ষেত্রে তবু পতিদেবটিকে গ্রেস দিয়ে পাস করানো যেতে পারে কিন্তু মাছের বাজারের সিলেবাসে তিনি একটি অকম্মার ঢেঁকি। ডাহা ফেল-মারা ছাত্র। অনেক বিবাহিত মহিলা এই আফশোস নিয়ে দীর্ঘ দাম্পত্যজীবন কাটান যে বাপের বাড়ি থেকে চলে আসার পর বাকি জীবনে সাধের মৎস্য ভক্ষণ অতৃপ্তই রয়ে গেল।

    পিতাই হোন বা পতি ইহা স্বতঃসিদ্ধ, যে-বাঙালি মাছের বাজারে মাথা গলায়নি তার ইহজন্ম বৃথা। সত্যি বলতে কী সেইসমস্ত নিরামিষ বাজার করিয়েরা প্রকৃত অর্থেই অভাগা কারণ মাছের বাজারের ঢক্কানিনাদের সঙ্গে পরিচিত না হলে বাজার করার আনন্দটাই কেমন যেন পানসে। তারা জানতেই পারলেন না যে আমিষের বাজার নিরামিষ বাজারের মতো একেবারেই মুখচোরা নয়। মাছের বাজারের সদম্ভ বজ্রনিনাদ শোনা যাবে সে তল্লাটে পা রাখার আগে থেকেই। নানান চিৎকার হুল্লোড়ে ভরা বাজারের বাতাস আর তার সঙ্গে বমি উদ্রেক করা আধপচা আঁশটে গন্ধ।

    কোন অদৃশ্য কারণে কে জানে সব্জি বাজারের বিক্রেতারা ছাপোষা বাঙালি মধ্যবিত্তের মতো বেশ ভদ্র সভ্য আর বিনীতভাবে তাদের কাজ-কারবার চালিয়ে যেতে চায়। আর তার পাশে মাছের বাজারে চলে ধুন্ধুমার গলা-ফাটাফাটি। এমন একটা হৈহৈরৈরৈ আর্তনাদ যে মনে হবে এই বুঝি বেঁধে গেল লঙ্কাকাণ্ড। গলা ফুলিয়ে ঘোষণা করছে তার মাছের শ্রেষ্ঠত্ব। এক-এক বিক্রেতার এক-একরকম বিশেষত্ব। কলকাত্তাইয়া খাস ঘটি ভাষায় যাকে বলা হয় কাটাপোনা—সেই মাছের বিকিকিনি সবচেয়ে বেশি। মাথামোটা কাতলা তুলনায় উচ্চকুলশীল, তার অধস্তন রুই। পেটরোগা আপামর বাঙালির সবচেয়ে মনপসন্দ চারারুই। যার চলতি নাম চারাপোনা। চারাবাটারও কদর কম নয়। কিছুদিন আগেও তেলাপিয়ার দর ভালই ছিল কিন্তু এখন তার বাজার পড়তির দিকে। আসল তেলাপিয়ার জেরক্স খেতে খেতে এই বঙ্গবাসীর পেটে চড়া পড়ে গেছে।

    কিন্তু মাছের বাজারের রুস্তম হলেন সেই সব বিক্রেতারা যাদের মেনকোর্সে পাওয়া যায় কমসে কম পাঁচ কেজির রুই-কাতলা আর তার পাশাপাশি চিংড়ি, পাবদা, পার্শে, ভেটকি এমন নানান কিসিমের মাছ। এর মধ্যে সবচেয়ে অভিজাত হল ভেটকির ফিলে। যে সব কারবারিরা ফিলে রাখেন তাদের রোয়াবই আলাদা। বাঁধা খদ্দেরদের সঙ্গে একরকম মাখোমাখো ব্যবহার আর আনকোরাদের সঙ্গে নিক্তি মাপা কাজের কথার বাইরে কোনও খেজুরে আলাপ নেই।

    সব মাছের ‘টি আর পি’ একরকম হওয়ার কোনও চান্স নেই সে তো জানা কথা কিন্তু ঘটিদের মাছ চর্চায় তোপসে আর গুলের কদর অনেকটা বেশি। জামাই ভোজনের জন্য তোপসে মাছের বড়া তো মাস্ট। অন্য সময়েও তোপসে মাছ নিয়ে বেশ আদেখলেপনা চলে বাজারে। বেশটি করে হলুদ রং মাখানো বড়বড় তোপসে বারো-পনেরোশ কেজি দরে ঝপাঝপ বিক্রি হয়ে যায়। একইরকম বাজার জমানো খেলোয়াড় হল জ্যান্ত গুলে মাছ। কে যেন কবে রটিয়ে দিয়েছিল যে জ্যান্ত গুলে খেলে রক্ত বাড়ে, তারপর থেকে অ্যালাপ্যথি অর্দ্ধবিশ্বাসী মানুষদের কাছে কুলেখাড়া আর গুলে হয়ে উঠেছে মুক্তিদাতা। হায় এম বি বি এস, এম ডি ডাক্তারগণ -- তোমাদের বিশ্বজয়ের এখনও অনেক বাকি।

    এতক্ষণ কথা হচ্ছিল ঘটিদের মাছের বাজার নিয়ে। বাঙাল বাজারের হালচাল কিন্তু একেবারে আলাদা। সে বাজারের হদিশ পেতে গেলে যেতে হবে উত্তরবাংলা। সেখানে বাজার আলো করে বসে আছে আড়, বোয়াল আর চিতল। ভেটকির মতো আড় মাছের ফ্রাই-ও একইরকম অভিজাত। আর জ্যান্ত মাছের বাজারে খলবল করছে নানান সাইজের শোল আর কৈ।

    মরা-আধমরাদের ছেড়ে এবার নজর ফেলা যাক জ্যান্ত ছানাপোনাদের দিকে। জলজ্যান্তদের বাজারটা মোটামুটি একচেটিয়া দখলে রেখেছে মেয়েরা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বলেই বোধহয় এইসব মেছুনিদের স্থান নির্ধারিত বাজারের এককোণে। জ্যান্তমাছের বাজারে সিঙি আর মাগুরের কদর সবচেয়ে বেশি। ভাবার কোনও কারণ নেই যে সিঙি মাছের ঝোল শুধুমাত্র রুগীদের পথ্য, এখন ঝোলঝাল সবেতেই সিঙি মাগুর গড়গড়িয়ে চলছে। তেমন ভাল জাতের মাগুর হলে তো কথাই নেই – কষিয়ে রান্না করলে মাংসকেও হার মানাবে। তবে সিঙি-মাগুর যতই দরের হোক বিয়েবাড়ির ভোজে এখনও তারা অপাংক্তেয়।

    মাছের পাশে কিন্তু বেশ বিনীতভাবে জায়গা করে নিয়েছে গেঁড়ি আর শামুকের হতদরিদ্র বাজার। চুনো মাছের প্রতি বাঙালির ভালবাসাও কিছু কম নয়। চকচকে মৌরলা, পুঁটি কী আমুদে দেখলে এখনও হামলে পড়ি আমরা। এরই পাশে অন্যদিকে কলার তুলে নিজের জায়গা আদায় করে নিয়েছে কাঁকড়া। একটু বড় মাপের দুই দাঁড়াওলা মাদী কাঁকড়ার দাম শুনলে চোখ কপালে উঠবে। পাঁঠার মাংসের এককাঠি ওপর দিয়ে যায় তার নজরানা।

    তবে প্রকৃতি যেমন বসন্তে জেগে ওঠে মাছের বাজার তেমনই পুলকে নেচে ওঠে ইলিশের আগমনে। আকাশে বাদলা মেঘের আনাগোনার অনেক আগে থেকেই বাজার দখল করে নেয় খোকা ইলিশ আর হিমঘর থেকে সদ্য মুক্তি পাওয়া গতবছরের মাছ। ঘাঘু বাজার করিয়েরা কিন্তু হিমঘরের মাছের দিকে ফিরেও তাকায় না। এটা জানা যে রূপে যতই ভোলাক না সে, গুণে অশ্বডিম্ব। বর্ষার প্রায় মাঝামাঝি থেকে আসতে শুরু করে আসল ইলিশ। যেমন রূপ তেমন গুণ। খেয়ে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার পরও গন্ধ লেগে থাকবে। ইলিশের তেল দিয়ে ভাজামাছ থেকে আরম্ভ করে যে কতরকমের ঝাল ঝোল অম্বল হতে পারে ঠিক নেই। এ নিয়ে একটা নব মৎস্যপুরাণ লেখা যেতে পারে।

    অবশ্য মাছের বাজারের এই রমরমা, এই সাবেকি চেহারা কিন্তু দ্রুত পাল্টাতে শুরু করেছে। কর্পোরেট হাওয়া থেকে বাঁচার কোনও উপায় নেই। মলমুখী হালআমলের জনতা এখন দেখতে পাচ্ছে ঝাঁ-চকচকে মাছের বাজার। কোনও ক্যাওড়া ক্যাচকেচি নেই দুর্গন্ধ নেই, সবই দৃষ্টিনন্দন। গ্লাভস পরা হাতের নিপুণ অস্ত্রোপচারে ছাড়ানো হচ্ছে আঁশ, খণ্ডিত হচ্ছে মাছ – তারপর ওজন হয়ে ঢুকে পড়ছে সুদৃশ্য মোড়কে। মাছের সেই আদি অকৃত্রিম বেবি প্লাস্টিক ব্যাগের দিন শেষ।

    মাছের বাজারের এমন টিপটপ চেহারা বাংলার বাইরে দেখা গেছে অনেক আগেই। দিল্লীর চিত্তরঞ্জন পার্কের মাছের বাজার সত্যিই অনবদ্য। গণিকাপল্লীর মতো দিনের বেলা সে বাজারের চেহারা একেবারে সাদামাটা কিন্তু রাতে পুরো ঝলমলে। সারিবদ্ধ ঝুলন্ত বৈদ্যুতিক আলোর তলায় উদ্যত বঁটির পাশে নানান কেরামতিতে জমে উঠেছে বিক্রয়-বাসর। মাছের রুপালী আঁশ থেকে ছলকে উঠছে হীরকদ্যুতি। না কিনলেও সে সব মাছের রূপ দেখলেই মন ভরে যায়।

    শুধু দিল্লীই নয়, বাংলার বাইরে সব বড় শহরের মাছবাজারের চেহারাই এমনই ধোপদুরস্ত এমনই দিলখুশ। আসলে বাংলায় গেঁড়ে বসা সাবেক বাঙালিরা বেশ ট্রাডিশনপন্থী। উল্টে ফেলে পাল্টে দেব – এমন মানসিকতার বাঙালি সম্ভবত নকশাল ব্যর্থতার পর থেকে ক্ষীয়মান হতে শুরু করেছে। সেই কারণেই বাংলার মেছুনি আর জেলে-পুরুষদের সামাজিক থেকে অর্থনৈতিক হাল আজও একই থেকে গেল। তাদের ছেঁড়া গেঞ্জি আর কৃশকায় চেহারা আরো প্রকট করে তুলেছে পেশাগত বিপন্নতার চেহারা।

    আমাদের এই অলিগলি আর তস্যগলির ভূগোলে মাছবাজার আজ আর এক জায়গায় বসে নেই। বাজার ছড়িয়ে পড়েছে শহরের আনাচে-কানাচে। এমনকী এই হোম ডেলিভারির যুগে ট্রলিবাহিত বাজারের মাছ হয়ে পড়েছে দুয়ারে মাছ। ফ্ল্যাটবাড়ির চারতলা থেকে ঝুপ করে নেমে আসছে দড়িবাঁধা মাছের ব্যাগ, ভেতরে হিসেবমতো টাকা। চারতলা নিচের রাস্তা থেকে কানকো ফাঁক করে বিক্রেতা দেখাচ্ছে তার মাছের শ্রেষ্ঠত্ব। মোবাইলে জুম করে স্মার্ট বৌদি পরীক্ষা করে নিচ্ছে সে দাবীর সত্যতা। বারান্দার বৌদি কানকোর রূপ দেখেই মোহিত। হুকুম জারি করছেন, ‘দিয়ে দাও চারপাঁচশো। পেটি যেন মোটা হয়। তেলচর্বি দেবে না।’

    ফ্ল্যাট সভ্যতায় এসে জিলিপি সন্দেশের মতো অনেক পুরোনো অভ্যেস ছাড়তে হয়েছে বাঙালিকে। আনাজের বড় ব্যাগের মধ্যে মাছের ছোট ব্যাগ পুরে হাত দোলাতে দোলাতে মাছের বাজারে গিয়ে আধকুঁজো হয়ে সব মৃতদেহের কানকো উল্টে আর পেট টিপেটিপে মাছ কেনার দিন আজ জায়গা পেয়েছে স্মৃতির ঝাঁপিতে। ছোটখাটো চুনোপুঁটি বিক্রেতার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বড় মাছ এসে গিলে খাচ্ছে ছোটমাছকে। কর্পোরেট কৃতীরা এখন আর মাছের বাজারে যায় না। বস্তুত কোনও বাজারেই যাওয়ার মতো ফুরফুরে সময়ই থাকে না তাদের হাতঘড়িতে। আবার অন্যদিকে মাছ বিক্রেতার টিপটপ দু-চাকার ছেলেরা এখন আর অত গাধার খাটুনি খাটতে রাজি নয়। নতুন দুনিয়ায় অনেক কম খাটনিতে বেশি কামাইয়ের হরেক রাস্তা খুলে গেছে।

    আর কয়েক দশক পরে বাজারের রাস্তায় মাছের বাজার খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। হতাশা দিয়ে শেষ করা উচিত নয়, তাই শেষপাতে কিঞ্চিৎ অম্লমধুর তথ্য জানানো যাক।

    এক অবাঙালি নিরামিষাশী ডাক্তার তার কাছে উপদেশ নিতে আসা এক হৃদরুগীকে বোঝাচ্ছিলেন কেমন হওয়া উচিত রুগীর খাদ্যতালিকা। ডাক্তারবাবু বললেন, মুরগীর ডিম খেতে পারেন সপ্তায় একটা আর যদি কুসুম বাদ দিয়ে সাদা অংশটুকু খান তাহলে সপ্তায় দুটো। উপদেশ মন দিয়ে শুনতে শুনতে রুগী ফস করে জিজ্ঞেস করলেন, আর যদি মাছের ডিম হয়, কতটা খাব? প্রশ্ন শুনে বায়োলজি পড়া নিরামিষাশী ডাক্তারবাবু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, মাছের আবার ডিম হয় না কি!

    এবার শোনাই এক চৌকস গৃহিণীর সদুপদেশ। কাটা মাছ (চলতি কথায় ‘কাটা পোনা’) কিনতে গেলে মুড়োর তলার মাছ নিলে ডাহা লস। কানকোর তলায় থাকা বড় কাঁটাটি তার বোকাসোকা পতিদেবকে ঠিক গছিয়ে দেবে ধূর্ত বিক্রেতা। আবার লেজের ওপরের অংশে মারাত্মক কাঁটা, খাওয়ার সময় ভীষ্মের শরশয্যার অবস্থা হবে গলদেশের। কাজেই কাটা মাছের মাঝের অংশ থেকে নিতে হবে পেটি ও গাদা। পেটিগুলো কাটা হবে লম্বামম্বি আয়তকার। বাজারের মাছওলা এতরকম উপদেশ মেনে চৌকস গৃহিণীর গোবেচারা পতিদেবটিকে শেষপর্যন্ত সন্তুষ্ট করবেন কিনা বলা শক্ত।

    একেবারে শেষে জানাই চা-দোকানের এক বাজার বিশেষজ্ঞের সুচিন্তিত মতামত। ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে উনি বেশ গম্ভীরভাবে বলেছিলেন, ‘ডিম পেড়ে পেড়ে মেয়ে মাছেরা অ্যানিমিক হয়ে যায়। তাই সবসময় মেল মানে পুরুষ রুইকাতলা নেওয়া উচিত।’ কিন্তু পুরুষ মাছ চিনব কেমন করে, তার উত্তরে জানিয়েছিলেন, ‘এটা খুবই সহজ। আগে একটা মেয়ে মাছ খুঁজে বার করতে হবে। সেই মাছটার পেছন পেছন যে বদমাসগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে সেগুলোই ব্যাটাছেলে।’ বাক্য শেষ করেই ভাঁড় ফেলে দিয়ে অকুস্থল থেকে বিদায় নিয়েছিলেন সেই মহামানব। যাচ্চলে, এ তো সেই ঘুরেফিরে আমড়াতলার মোড়ে এসে দাঁড়ালাম।

    দুর্ভাগ্যবশত গুগুল জ্যাঠার ঝুলি খুঁজেও এই দুরূহ প্রশ্নের কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। মাছের লিঙ্গ বিষয়ক খাসখবর অজ্ঞাতই থেকে গেল। আমাদের প্রাক্তন মৎস্যমন্ত্রী কিরণময় নন্দ এখানে থাকলে হয়তো বলে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তো এখন মাছের স্বর্গরাজ্য ছেড়ে চলে গেছেন হাফ-নিরামিষ উত্তরপ্রদেশে।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments