



চিন্ময় দাশ ওরফে চিনু ফ্ল্যাটের ব্যালকনির থেকে নিচে তাকিয়ে। মেয়েটা মোটামুটি এই সময়েই পাস করে।
চিনুকে পাড়ার লোক একডাকে চেনে। সবাই সাক্ষাতে হাত কচলায় কিন্তু আড়ালে বলে, ব্যাটা শয়তানের দোসর। বাঘে ছুঁলে আঠেরো ঘা, চিনু ছুঁলে ছত্রিশ।
এককালে পার্টিরা গুণ্ডা পুষত। আজকাল গুণ্ডারাই পার্টি পোষে। তাদের সম্মিলিত বাহুবল ঠিক করে কে মসনদে বসবে। পশ্চিমবঙ্গের পার্টিগুলি অবশ্য একবার গদিতে বসলে চট করে না ওঠার কিছু দুর্ধর্ষ আঠা আবিষ্কার করে ফেলেছে। সেটা বোধহয় বাহুবলী সহ বিভিন্ন প্রচ্ছন্ন শক্তির সঙ্গে ‘তু তু ম্যায় ম্যায়’ নির্ভুলভাবে খেলায় দক্ষতা।
এখন চিনু যে মেয়েটির অপেক্ষায়, সে সম্প্রতি পাড়ায় একটা ফ্ল্যাটে পিজিতে এসেছে। বোধহয় কোনো অফিসে পি-আরে কাজ করে। অফিস সেরে সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ ফেরে। চিনু এখন কিছুদিন রেকি করবে, তারপর দেখে-বুঝে অ্যাকশন প্ল্যান।
সীতুদা অবশ্য সাবধান করেছিল, “দ্যাখ চিনু, তুই আবার মেয়ে কেসে ফাঁসলে আমি সামলাতে পারব না। পাবলিক এমনিতেই তেতে আছে, এখন মা-বোনেদের গায়ে হাত উঠলে ফেটে পড়বে। ভোট অব্দি পৌঁছোবে না, তার আগেই গণধোলাই চালু হয়ে যাবে।”
“আর যদি নিজের ক্যালিতে মেয়ে পটাতে পারি?”
“পটাবি, তোর এই থোবড়া দেখিয়ে?” সীতুদা হেসে ফেলেছিল।
“থোবড়া নয় গো, ক্ষমতা!” চিনু বুক ঠুকে বলেছিল, “ওটা ক্ষমতার ‘পার্কস’।”
“যা করিস, বুঝেশুনে। মনে রাখিস, মেয়েরা আমাদের পার্টির ভোট ব্যাঙ্ক।”
চিনু হেসে চলে এসেছিল। সীতুদা জানে না, চিনুর হাতে আছে তার মৃত্যুবাণ। অর্থাৎ কিছু হাওয়ালা লেনদেনের কাগজপত্র আর অ্যান্টি-গ্রুপের নেতাই শিকদারের সুপারি দেওয়ার অকাট্য প্রমাণ। লোকটা কোনোদিন বিপদে পড়ে চিনুকে ছুঁড়ে ফেলতে চাইলে ওসব কাজে লাগবে।
সে অবশ্য বুঝেশুনেই কাজ করে অর্থাৎ ‘কাজকম্মো’গুলোর ভিডিও করে রাখে। সেসব চাউর হবার ভয়ে মেয়েগুলো চুপ করে থাকে, আবার বিছানায় ডাকলে চলেও আসে।
তবে সীতুদার কথা তার স্মৃতিতে উস্কে দিয়েছে একটা নাম, স্নিগ্ধা সাহা। তার নিখুঁত ক্যারিয়ারে এক ফোঁটা কালির দাগ। স্নিগ্ধা, একটি নরম, মিষ্টি মেয়ে। কিন্তু অমন জিনিস দেখলেই যে চিনুর ওপর খোপরি গরম হয়ে যায়। কোনোমতে মুদি বাপ আর ব্লাউজ সেলাই মায়ের উঞ্ছবৃত্তি করে বড় হতে হতে এম-পি সীতেশ ঘোষের নজরে পড়া ছেলেটার যে ঐ রুপোর চামচ মুখে জম্মানো আতুপুতু মেয়েদের দেখলেই তছনছ করে দিতে ইচ্ছে করে! জিগরি দোস্ত কেষ্ট কতবার বলেছে, “গুরু, এ তোমার একটা রোগ। চিকিচ্ছে করিয়ে সারাও, নইলে বিপদে পড়বে।” কিন্তু কোন নেশাড়ুই বা উপদেশ শুনে নেশা ছেড়েছে!
খুনখারাবি অবশ্য চিনুর ‘এ’-প্ল্যানে থাকে না। শুধু স্নিগ্ধার কেসে সেটা হয়ে গেল। ঐ অবস্থায় মেয়েরা ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে। কিন্তু ঐ স্যাম্পলটা আঁচড়ে, কামড়ে, চেঁচিয়ে এমন বাওয়াল করেছিল যে তাকে চুপ করিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। এমন বিপদ আপদের জন্য ‘বি’-প্ল্যান চিনুর তৈরিই থাকে। তাই কোনো অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির দ্বারা ধর্ষিত হবার পর স্নিগ্ধা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে, এটা প্রমাণ করতে পুলিশের অসুবিধে হয়নি। এ নিয়ে পাড়ার ফিসফিসানিটা গুঞ্জনে পরিণত হয়েছিল কিন্তু সীতুদার চেষ্টায় সেটা ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল। পুলিশ চিনুকে একবার থানায় ডেকে পাঠিয়েছিল, ব্যস।
তবু কেন জানি আজ নামটা চিনুর স্মৃতিতে ভেসে উঠল। অশুভ সঙ্কেত?
চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়। পুলিশ হাজতে বসে চিনু কথাটা ভাবছিল।
মৈত্রী না মৈত্রেয়ী কী যেন নাম মেয়েটার, তাকে তোলার কাজটা ছক বেঁধেই এগোচ্ছিল। প্রথমে একদিন প্রসাদ দেওয়ার অছিলায় এন্ট্রি নেওয়া। তারপর ‘কোনো দরকার হলেই একটা ফোন’, ইত্যাদি খেজুর মারফত গেড়ে বসা। প্রথমে একা, পরে জিগরি দোস্ত কেষ্ট আর আজিজকে নিয়ে। মেয়েটাও ‘চিনুদা’, ‘চা খাবেন?’ বলে ভালো খেলছিল। তবে কখনো গায়ে হাতটাত দেবার চেষ্টা করলে ছিটকে সরে গিয়ে একটু পরে কোনো অজুহাতে ঝাঁপ ফেলে দিচ্ছিল।
সুতরাং আর খেলানো নয়, এবার সোজা অ্যাকশন। সেই বুঝে ছক কষে একদিন হানা দিল তিন মূর্তি। চিনু চড়াও হবার পর যথারীতি মেয়েটার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল, চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছিল। চিনু তাকে আশ্বস্ত করে বলেছিল, “খুকি, আমরা বাঘ-ভাল্লুক নই। একটু সহজ হও, দেখবে বরং আরাম লাগবে।” মেয়েটাও বোধহয় এরপর ভয়ে ভয়েই শান্ত হয়ে গিয়েছিল। তবে সাকরেদ দুজন প্রসাদ নেবার পর সে গোঙাচ্ছিল, বোধহয় একটু রক্তও পড়ছিল।
যাবার আগে চিনু দুটো পাঁচশোর নোট ছুঁড়ে দিয়ে বলে এসেছিল, “এমন কিছু লাগেনি, ডাক্তার দেখিয়ে চিকিচ্ছে করিয়ে নিও। আর দেখলে তো, কেষ্ট তোমার-আমার পিরিতের সীন ভিডিও করে রেখেছে। মুখ খুললেই এটা ওয়ার্লড ওয়াইড ওয়েবে ছড়িয়ে যাবে। আর হ্যাঁ, তোমার বাবা-মা'র ওপরও আমাদের নজর আছে।”
চিনু নিশ্চিন্ত ছিল, বরাবরের মতো এবারেও এই দাওয়াইয়ে কাজ হবে। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম হল। দুদিন পরে লালবাজার থেকে এক স্পেশাল স্কোয়াড এসে চিনুকে তুলে নিয়ে গেল। এম-পিকে ফোন করার হুমকিতে কোনো কাজ হল না। এক গোমড়ামুখো অফিসার বললেন, “অনেক ওপর থেকে নির্দেশ এসেছে। কিছু বলার থাকলে আপনি সি-পিকে বলতে পারেন।”
শিগগিরই চিনুর মালুম হল, কেসটা বোধহয় সেমসাইড হয়ে গেছে। মেয়েটার বাবা না দাদা এক প্রভাবশালী মন্ত্রীকে ধরেছে। খবরটা রটার পর পাবলিক ক্ষেপে গেছে, মিডিয়াও ব্যাপারটা রগরগে করে পরিবেশন করছে। বিরোধীরা আন্দোলনে নেমেছে, বিক্ষোভ মিছিল চলছে। আর সরকার বলছে, প্রশাসন পার্টিছাপ বিচার না করেই দুষ্কৃতিদের কঠোরতম শাস্তি সুনিশ্চিত করবে।
সীতুদা এড়িয়ে চলছে। এমন সময় একজন উকিল প্রণব মজুমদার চিনুর সঙ্গে দেখা করে বললেন, “আপনার গডফাদার আমাকে পাঠিয়েছেন। এখানে তাঁর নাম নেবেন না, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টাও করবেন না। আমি আপনার স্বার্থ দেখব।”
প্রণব উকিল এমন ভেজালে কেসে আগে জড়াননি। সরকারি দুষ্কৃতিদের তিনি সহজেই ছাড়িয়ে আনেন, কারণ পুলিশ-প্রশাসন বা সরকারি উকিল ইচ্ছাকৃতভাবে নিস্পৃহ থাকে। এক্ষেত্রে শ্রীধর মৈত্র, বোঝাই যায় ওপর মহলের নির্দেশে, জানপ্রাণ দিয়ে লড়ছেন অপরাধীদের কঠোর শাস্তির জন্য। বাইরেও গণরোষ অব্যাহত, অপরাধীদের উকিলের ওপর যেটা বাড়তি চাপ।
আর এই ছোঁড়াগুলোও এত বেপরোয়া যে সাক্ষ্যপ্রমাণ লোপাটের কোনো চেষ্টাই করেনি। আসলে একের পর এক অপরাধ করতে করতে এদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যায় যে দাদাদের হাত যখন মাথায় আছে, তাদের কেউ ছুঁতে পারবে না। কিন্তু এবার কেস অন্যরকম হয়ে গেছে। পুলিশ গিয়ে পাড়াপড়শিদের সাক্ষ্য নিয়েছে, যাবতীয় ফোরেন্সিক প্রমাণ জড়ো করেছে, তারপর থ্রি-ডি ভিডিও তৈরি করে আদালতে পেশ করেছে। আর আজিজ ছোঁড়া মোবাইলে ধর্ষণের যে ভিডিও তুলেছিল, সেটা সুদ্ধুই ধরা পড়েছে। এদের বাঁচানোর কোনো সহজ উপায় নেই।
অন্যদিকে, প্রণবের পেছনে শুধু একজন। তিনিও ধরি মাছ না ছুঁই পানি।
তবু প্রণব হাল ছাড়েননি। এটা ‘কনসেনসুয়াল সেক্স’ প্রমাণ করার চেষ্টায় সওয়াল করেছিলেন, “মী লর্ড, রিপোর্টে ‘ম’ বলে উল্লিখিত যে মেয়েটি ধর্ষিতা বলে অভিযোগ, তিনি বাড়ির একটা অংশে প্রায় একাই পিজিতে থাকতেন। অন্যদিকে, যারা অভিযুক্ত তারা নাকি এলাকার সুপরিচিত সমাজবিরোধী। অথচ, এই ‘সমাজবিরোধী’দের জন্য ‘ম’র দ্বার ছিল অবারিত। তিনি দিনের পর দিন অনেক রাত অবধি তাদের সঙ্গে আড্ডা মারতেন। এর থেকে কি অনুমান করা অসঙ্গত যে মেয়েটির সঙ্গে অভিযুক্তের একটা প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল আর তাঁরা কোনো এক আবেগের মুহূর্তে শারীরিকভাবে মিলিত হয়েছিলেন?”
“মী লর্ড,” শ্রীধর মৈত্র লাফিয়ে উঠে বললেন, “অভিযুক্তরা যে অপকর্মের ভিডিও তুলে রেখেছিল, তাতেই স্পষ্ট এটা ধর্ষণ আর তাদের হাতেনাতে না ধরলে তারা এই ভিডিও দেখিয়ে ‘ম’কে ব্ল্যাকমেইল করত। মেয়েটি একা। দুষ্কৃতিরা গায়ে পড়ে তার সঙ্গে আলাপ জমাবার চেষ্টা করলে সে তাদের মিষ্টি কথায় তুষ্ট রেখে বিপদ থেকে বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু পারল কই!”
প্রণব বললেন, “মানছি, ভিডিও তোলাটা আইনি ও নৈতিক দিক দিয়ে অসঙ্গত। কিন্তু পুরুষরা প্রায়ই এটা করতে বাধ্য হয়, যাতে মেয়েরা ইচ্ছুক সহবাসকে পরে লোকলজ্জার খাতিরে ধর্ষণ বলে চালাবার চেষ্টা না করতে পারে। মী লর্ড, ভিডিওটা দেখলে বুঝতে পারবেন মেয়েটি সহবাসে বিন্দুমাত্র বাধা দেয়নি।”
“মী লর্ড,” শ্রীধর বললেন, “মেয়েটি অভিযুক্তের প্রাণনাশের হুমকির ফলে বাধা দিতে পারেনি। ভিডিওয় তার মুখ ‘মাস্ক’ করা হয়েছে, আপনি চাইলে অরিজিনালটা দেখতে পারেন। তাহলে বুঝবেন ধর্ষক তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পর তার চোখেমুখে কেমন আতঙ্ক ফুটে উঠেছিল।”
প্রণব বাধা দিয়ে বললেন, “অভিযুক্তের আকস্মিক ‘অ্যাডভান্স'এ মেয়েটি হয়তো একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল। কিন্তু দেখুন, তারপরই সে সহজভাবে ব্যাপারটা মেনে নিয়েছে।”
“স্যার, অভিযুক্তের উকিল গায়ের জোরে রাতকে দিন করতে চাইছেন। ফোরেন্সিকে সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে, নিগৃহীতা গণধর্ষিতা। তার প্রাইভেট অর্গান এর ফলে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে।”
গবেটগুলো এটুকুই বাঁচিয়েছে যে সবক'টা রেপের ভিডিও তুলে রাখেনি! প্রণব তাই বাঁকা হেসে বললেন, “গণধর্ষণ, নাকি মহিলা সোহাগ করে অন্য দুজনকেও একে একে ডেকে নিয়েছিলেন, তা কি আমরা জানি? আমরা কি জোর করে বলতে পারি ‘ম’র স্বভাবচরিত্র কেমন? আর বাড়াবাড়ি করলে চোটজখম তো হতেই পারে।”
“ছিঃ, ছিঃ!” শ্রীধর গর্জে উঠলেন, “আপনি এতটা নিচে নামতে পারলেন! ক'জন ঘৃণ্য অপরাধীকে আড়াল করার চেষ্টায় একজন গণধর্ষিতার চরিত্রে কালি ছেটাবার অপচেষ্টা করলেন?”
জজ মিঃ বসুও এই সময় আপত্তি করে বললেন, “আপনি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন, মিঃ মজুমদার। সংযত হোন।”
মাথা নিচু করে বসে পড়লেন প্রণব উকিল।
প্রণবের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। যদিও ট্রায়াল ইন-ক্যামেরা চলছে, কিন্তু সওয়াল-জবাবের খবর মুহূর্তে বাইরে জড়ো হওয়া অজস্র মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। নিগৃহীতাকে চরিত্রহীন প্রমাণের চেষ্টাটা তারা আদৌ ভালোভাবে নেয়নি। ‘প্রণব উকিল মুর্দাবাদ’ আওয়াজ উঠছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর পরিবারের মহিলাদের সম্বন্ধে কুৎসিত ইচ্ছে প্রকাশ করা হচ্ছে।
তাদের শান্ত করার চেষ্টায় প্রণব বিবৃতি দিয়েছেন, গুরুতর অপরাধীদের পক্ষে কোনো উকিল না থাকলে বিচার হয় না। আর এভাবে দু’পক্ষের সওয়াল-জবাবের মধ্য দিয়েই প্রকৃত সত্যটা বেরিয়ে আসে। কিন্তু তাতে গণরোষ শান্ত হয়নি।
অন্যদিকে, চিনুও বেগড়বাই করছে। অনেক চেষ্টায় তিনি দু'সপ্তাহের মধ্যে ছোঁড়াগুলোকে পুলিশ হেফাজত থেকে জেলে পাঠাতে পেরেছিলেন। জেলে চিনুর সঙ্গে দেখা করলে সে গরম দেখিয়ে বলেছিল, “আপনি কী বালের উকিল, অ্যাদ্দিনে বেল করতে পারলেন না? এখানে তো আমাদের এমন ভিআইপি ট্রিটমেন্টে রেখেছে যে বোতল ছাড়ুন, পাত্তাই গলতে পারছে না। আপনাকে যে আবাল পাঠিয়েছে তাকে বলবেন, তার মৃত্যুবাণ আমার কাছে আছে। তাড়াতাড়ি আমার বেলের ব্যবস্থা করতে বলুন, নইলে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেব।”
শুনে সীতেশ বলেছিলেন, “ওকে বারবার বলেছিলাম মেয়ে কেসে না জড়াতে, শুনল? যা দাঁড়িয়েছে, বলুন কিছুদিন ধৈর্য ধরতে। পাবলিকের হিড়িক দু-তিন মাসের বেশি থাকে না, তারপর এক সময় টুক করে বের করে আনা যাবে। ইতিমধ্যে আপনিও চেষ্টা চালিয়ে যান।”
মাথা নেড়ে চলে এসেছিলেন প্রণব। তবে বুঝতে পারছিলেন, মিরাকল ছাড়া অন্তত মূল আসামী চিনুকে ছাড়াবার কোনো উপায় নেই।
এমন সময় সেই মিরাকল ঘটল। সেদিন সওয়াল সেরে বেরিয়েছেন, কোর্ট পিওন এসে বলল, “উকিলবাবু, একটা লোক আপনাকে এই খামটা দিতে বলল।”
দ্রুত হাতে খুলে দেখলেন প্রণব, এক ছোট্ট চিরকুট, “অনেক তো ছিঁড়লেন, ফল কাঁচকলা। এবার ২০২০ সালের ১০ই জানুয়ারি বোলপুর ক্রিমিনাল কোর্টে যে কেসগুলি উঠেছিল, সেগুলো একটু নেড়েচেড়ে দেখুন।”
প্রণব অনেকক্ষণ ভাবলেন। উড়ো কথায় কান দিয়ে বোলপুর ছুটবেন? শেষে তাঁর পেশাদারি অন্তর্দৃষ্টি বলল – দেখাই যাক না, বড়জোর পণ্ডশ্রম হবে। কিন্তু যদি লেগে যায়? হয়তো এটাই জ্যাকপট।
জজ মিঃ বসু তাঁর চেম্বারে দুই পক্ষের উকিল আর নিগৃহীতাকে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ডেকেছেন। নিগৃহীতা ও তাঁর উকিল উদ্বিগ্ন। শুধু প্রণব নির্বিকার, মুখে মৃদু হাসি।
“অভিযুক্তের উকিল আমার কাছে একটি নথি দিয়েছেন, যা এই কেসের প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২০ সালের ৯ই জানুয়ারি রাতে শান্তিনিকেতনের একটি হোটেলে অবৈধ দেহব্যবসা চলছে খবর পেয়ে পুলিশ রেইড করেছিল। সেখান থেকে তারা যাদের গ্রেফতার করেছিল, তার মধ্যে ছিল এক ব্যবসায়ী ও তার সঙ্গে এসকর্ট হিসেবে আসা একটি বাইশ বছরের তরুণী। তাদের পরদিন বোলপুর কোর্টে তোলা হয়েছিল। তরুণী কাকুতি-মিনতি করে বলেছিল এ ধরনের কাজে সে এই প্রথম, ছেড়ে দিলে আর করবে না। বিচারক তাকে ফাইন করে আর মুচলেকা লিখিয়ে নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন।
এখন, সেই তরুণীর নাম আর (নিগৃহীতার দিকে ফিরে) আপনার নাম কিন্তু হুবহু মিলে যাচ্ছে।”
নিগৃহীতার মুখ ফ্যাকাশে। কিন্তু শ্রীধর বললেন, “নামটা খুব কমন। দুজনের এই নাম হতেই পারে।”
“অবশ্যই।” জজ বললেন, “কিন্তু সেটা চেক করার উপায় আছে। মেয়েটির আধার নম্বর কেস ফাইলে নথিবদ্ধ আছে। তার সঙ্গে যদি –-”
“দরকার নেই, আমিই সে।” নিগৃহীতা হাউ হাউ করে কেঁদে বলল, “হঠাৎ হাতে অনেকগুলো টাকা পাওয়ার লোভে আমি ঐ অপকর্ম করে ফেলেছিলাম। কিন্তু তারপর আমি আর ঐ পথে পা বাড়াইনি। সৎভাবে পরিশ্রম করে নিজের পায়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করছি।”
প্রণব বাঁকা হেসে বললেন, “মী লর্ড, আমি যখন ‘ম’র চরিত্র সম্বন্ধে সংশয় প্রকাশ করেছিলাম, আপনারা আমাকে তিরস্কার করেছিলেন। কিন্তু এখন তো দেখছেন, এই বুড়োর নাক ঠিক গন্ধ পায়। উনি বলছেন উনি আর ঐ পথে যাননি, কিন্তু সে তো ওঁর মুখের কথা। সন্দেহটা থেকেই যাচ্ছে। তাই আমার আর্জি, এই সংশয়ের নিষ্পত্তি সাপেক্ষে আমার মক্কেলদের অন্তত বেল দেওয়া হোক। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টও তো বলেছেন, জেল নয়, বেলই হচ্ছে ‘নর্ম’।”
‘ম’র চোখ যেন ঝলসে উঠল। বলল, “ধর্মাবতার, ধরে নিন আমি দেহোপজীবিনী। তাহলেই কি কোনো নরপশুদের আমার দেহটাকে আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে ছিঁড়েখুঁড়ে খাওয়ার অধিকার জন্মায়?”
জজের মুখে কিছুক্ষণ কথা জোগাল না। হয়তো তাঁর ‘পিঙ্ক’এর দীপক শেহগলের সওয়াল মনে পড়ে গিয়েছিল, “নো মিনস নো।” একটু পরে তিনি বললেন, “তুমি আমার মেয়ের মতো। তাই বলছি – মা, এর জন্য বিচারের রায়ের একচুলও নড়চড় হবে না। তবে অনেক দিন তো হল। তারপর এই জটিলতা। সব মিলিয়ে, বেল বোধহয় দিতে হবে। কিন্তু আমি তোমায় কথা দিচ্ছি, তোমার ও তোমার পরিবারের সুরক্ষায় পুলিশ গার্ড থাকবে। অভিযুক্তরা যদি তোমাদের ওপর হাত ওঠাবার চেষ্টা করে তবে আইন-প্রশাসন কত কঠোর হতে পারে, তার পরিচয় ওরা পাবে। মিঃ মজুমদার, আপনার ক্লায়েন্টদের এটা ভালো করে বুঝিয়ে দেবেন। আপনি আগামি কোর্টের হিয়ারিংয়ে বেলের আবেদন করতে পারেন। তবে মনে রাখুন –”
প্রণব শঙ্কিত দৃষ্টিতে জজের মুখের দিকে তাকালেন। জজ বললেন, “আপনি যা জেনেছেন, সেটা আপনার ভেতরেই রাখুন। নইলে একজন ধর্ষিতার নাম প্রকাশ করার অপরাধে আপনি ক্রিমিনাল কেসে ফেঁসে যাবেন।”
প্রণব স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। আজ সকালে অজানা বন্ধুও তাঁকে দ্বিতীয় চিরকুটে জানিয়েছে, “যা জানলেন, সেটা দিয়ে ঐ মেয়েটির বাজারে বদনাম করর চেষ্টা করবেন না। করলে…”
সে কে, তিনি জানেন না। যা করেছে, সেটা বন্ধুরই কাজ। কিন্তু তার সংক্ষিপ্ত বার্তাগুলি যেন আশ্বাসের বদলে বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। তার কথা অমান্য করার সাহস প্রণবের নেই।
তাই তিনি বললেন, “মী লর্ড, জামিন হয়ে গেলেই আমি এই কেস ছেড়ে দেব। পাবলিক যা ক্ষেপে গেছে, চাপ আর নিতে পারছি না। ছাড়া পেলে চিন্ময় নিজেই আরো ভালো উকিল ঠিক করতে পারবে।”
গভীর রাত। প্রেন্সিডেন্সি জেলের দরজায় একটা ছোট্ট সিডান এসে দাঁড়াল। জেলের ভেতর থেকে কয়েকজন রক্ষীর পাহারায় বেরিয়ে এল চিন্ময় দাশ।
“নাম?” গাড়ির ড্রাইভারকে জিগ্যেস করল চিনু।
“লোকনাথ।”
“কোডওয়ার্ড?”
“দিল্লিগেট।”
চিনু নিশ্চিন্তে উঠে বসল, গাড়ি ছুটে চলল।
কাল বেলের নির্দেশ পাওয়ার পর থেকে চিনুর খুব ধকল গেছে। খবরটা চাউর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইরে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। আওয়াজ উঠেছিল, “আইন ধর্ষকদের শাস্তি না দিলে আমরাই দেব। ওদের আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হোক।” কোর্টের বাইরের ভিড় বাড়তে বাড়তে জনসমুদ্রের রূপ নিয়েছিল।
বেগতিক দেখে কোর্ট থেকে ঘোষণা করা হল, কিছু আইনি জটিলতা থাকায় অভিযুক্তরা এক্ষুনি মুক্তি পাচ্ছে না, তাদের আবার জেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বেল ফর্মালিটিগুলি সন্ধ্যার আগে কোনোমতে সারা হল। পরদিন সকালে চিনুদের মুক্তি পাওয়ার কথা। কিন্তু সীতেশ ব্যবস্থা করেছেন যাতে মাঝরাতে চিনুকে বের করে নেওয়া যায়। ঐ সময়টায় আন্দোলনকারীরা বিশ্রাম নেয়, তাই জেলগেটে বা শহরের কোথাও বাধা পাবার সম্ভাবনা কম। তবে এখন পাবলিকের হাতে ধরা পড়লে গণরোষে কী হবে বলা শক্ত।
সীতুদা উকিলের হাত দিয়ে একটা চিরকুটে গাড়ির ড্রাইভারের নাম আর কোডওয়ার্ড লিখে পাঠিয়েছে। বাকি যা করার, ড্রাইভারই করবে।
“স্যার পাঠিয়েছেন, আপনার ব্যবহারের জন্য।” লোকনাথ একটা মোবাইল চিনুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “পাসওয়ার্ড ৭৫৮৯, ইউজ করার আগে বদলে নেবেন। আর আপনি বরং পেছনের সিটে গিয়ে শুয়ে পড়ুন। রাত হয়েছে। তবু ছুঁচোগুলো অনেক এলাকায় রাতমিছিল করছে। আমি অবশ্য আপনাকে নিরাপদ রুট দিয়েই নিয়ে যাচ্ছি। তবে সাবধানের মার নেই।”
শুয়ে শুয়ে চিনু ঠিক বুঝতে পারছিল না কোথায় যাচ্ছে। অনুমানে মনে হল, দক্ষিণে। জিগ্যেস করল, “কোথায় চললে, বাবা লোকনাথ?”
“ক্যানিংয়ের কাছে, স্যারের একটা ডেরায়।”
জোর বৃষ্টি পড়ছে। চিনু বলল, “ক'দিন ধরে যা দুর্যোগ। পারবে তো ঠিক পথ চিনে যেতে?”
“হ্যাঁ, দাদা। স্যার অ্যাড্রেস বলে দিয়েছে, গুগল ম্যাপ লাগিয়ে ঠিক চলে যাব।”
সব ঠিকই আছে, তবু চিনুর পেশাদার নাক একটা অস্পষ্ট বদগন্ধ পাচ্ছে। সীতুদার নম্বরটা মুখস্থ ছিল, ফোন করল।
লোকটা জেগেই ছিল। ফোন তুলে বলল, “বল, সব ঠিকঠাক?”
“হ্যাঁ। তবে তোমার রামভক্ত হনুমান লোকনাথ আমায় কোন ভাগাড়ে নিয়ে চলল?”
“ঐ, একটু সাবধানতা। বুঝতেই পারছিস, পাবলিক কেমন তেতে আছে। দুটো দিন কষ্ট করে থাক, তোকে আমি নিরাপদে ঝাড়খণ্ড পাঠিয়ে দেব। তারপর হাওয়া একটু ঠাণ্ডা হলে পুলিশ প্রোটেকশনে ফিরবি।”
“দ্যাখো, কোনো রকম গাঁড়পেঁয়াজি যদি কত্তে যাও, আমার হাতে যে মাল আছে তাতে তোমার পিণ্ডি চটকে দেব। আমার কিছু ভালোমন্দ হলে সেসব দুদিনে যথাস্থানে পৌঁছে যাবে।”
“ছি ছি, এসব কী বলছিস! তোকে আমি ছেলের মতো দেখি। নিজের দোষে ঝামেলায় জড়িয়েছিস, তবু তো আমি গোড়ার থেকেই তোর হয়ে লড়ছি। কত কষ্ট করে বেল করালাম।”
“ঠিক আছে, যা বলেছি যেন মনে থাকে।”
এবার মণিকাকেও একবার জানিয়ে রাখা যাক। ওর নম্বরটাও মুখস্থ, কিন্তু এত রাতে তুলবে কী?
হ্যাঁ, শেষ অবধি মাগি তুলেছে। ঘুমজড়ানো গলায় বলল, “কে?”
চিনু ফিসফিসিয়ে বলল, “চিনুদা বলছি রে।”
“তু-মি, এত রাতে? জেল থেকে?”
‘’না রে, এই ছাড়া পেলাম। তা, যা বলছিলাম – কাগজগুলি ঠিকমতো রেখেছিস তো?”
“তা আর বলতে!”
“শোন, আমি তোকে রোজ একবার ফোন করব। যদি না করি অথবা যদি কোনো খারাপ খবর পাস –“
“ও কি অলুক্ষুণে কথা গো!”
“আমার এখন বাইরে শত্তুর, ঘরে শত্তুর। যাক, যদি আমি ফোন না করি তবে পরদিনই তুই কাগজগুলো দিল্লির যে ঠিকানাটা দিয়েছি, সেখানে স্পীডপোস্ট করে দিবি।”
“বুঝলাম। সাবধানে থেকো।”
নিশ্চিন্ত! এবার চিনুর নজরে পড়ল সিটের পেছনের খাপে রাখা বোতলটার দিকে। বিলাইতি – সীতুদার সব দিকে নজর আছে!
আঃ, কতদিন পর অমৃতের স্বাদ। এতক্ষণে চিনুর মৌজ এসেছে। বলল, “বাবা লোকনাথ, তোমায় তো আগে দেখিনি। কদ্দিন তুমি সীতুদার ড্রাইভার?”
“এই বছর দুয়েক। আমি পার্ট টাইমে। তবে স্যার আমাকে খুব বিশ্বাস করেন, এমন কোনো ভ্যাজালে অপারেশন থাকলে ডেকে পাঠান। তার বিনিময়ে দেনথোন ভালোই।”
“সীতুদার পার্ট টাইম। তা, বাকি টাইমে কোথায় কাজ কর, বাপু?”
“কোথাও নয়। অবিশ্যি আমার এট্টু পরোপকারের বাতিক আছে।”
“ওতে কিছু হয়?”
“কখনো হয়, কখনো হয় না।”
“না হলেও করো?”
“দায়ে পড়েও করতে হয়, দাদা। এই ধরুন, ক'দিন আগে একজনকে বেলে ছাড়াবার ব্যবস্থা করলাম।”
“সেটা কেমন?”
“তার গাধা উকিলটা বেল করাতে পারছিল না, তাই একটা টিপস দিয়ে দিলাম, ব্যস।”
“কিন্তু টিপস তুমি পেলে কোত্থেকে?”
“ওটাই আমার পেশা ছিল কিনা। আমি আগে প্রাইভেট গোয়েন্দা ছিলাম।”
“তা, অমন পেশা ছেড়ে পার্ট টাইম ড্রাইভারি?”
“জীবনের প্রতি ঘেন্নায়, দাদা। একটা মা মরা মেয়ে ছিল আমার জীবনের একমাত্র সম্বল। তা, সে হঠাৎ মরে গেল।”
“সে কী?”
“হ্যাঁ। কারা যেন তাকে রেপ করেছিল, তারপর নাকি সে আত্মঘাতী হয়েছে।”
“ওটাই হয়।” চিনু বিজ্ঞের ভঙ্গীতে ঘাড় নাড়ল, “রেপ ভিক্টিম তো জিন্দা লাশ। তার বাঁচাও যা, মরাও তা।”
“দাদা, আমার মেয়ে তেমন ছিল না। আমাকে বোঝাত – যে রেপ হয় তার ইজ্জত যায় না, যায় যে রেপ করে তার। ও সুইসাইড করেনি, খুন হয়েছে।”
“সে কী! তা, পুলিশ কিছু পেল না?”
“তাই কী পায়! তবে আমি পেয়েছিলাম – ঐ যে বলছিলাম না, আমি প্রাইভেট গোয়েন্দা ছিলাম। জেনেছিলাম রেপ-মার্ডার কে করেছিল আর কোন মুরুব্বি তাকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। কিন্তু তারা খুব উঁচু ডালের পাখি, আমার ছোট হাত অদ্দুর পৌঁছোয় না।”
“অমনটাই হয়।” চিনু সান্ত্বনা দিল, “ক্ষমতার জোরে শুয়োরগুলো ধরাকে সরা জ্ঞান করে। তোমার-আমার মতো মানুষ আর কী করতে পারে? তাই বলি, ওসব ভুলে যাও। দুঃখ করলে তো আর মেয়ে ফিরবে না। বরং তোমার দুঃখ মালে ডুবিয়ে দাও।”
“মালে দুঃখ ডোবে না বাবু, ভেসে ওঠে। আমার দুঃখটা ক'বছর ধরে বুকে চেপে রেখেছি শুধু একটা আশায় – বদলা! একদিন না একদিন সুযোগ আসবেই।”
“কিছু মনে কোরো না, আমি অনেক ঘাটের জল খাওয়া মাল, তাই বলছি – বদলা-টদলা ভুলে যাও। ওসব পোসেনজিতের পিকচারে হয়, লাইফে হয় না। শুধুমুধু গুম মেরে থেকে শরীর খারাপ করবে। তোমার আসলে একজন সঙ্গী দরকার। সীতুদাকে ধরে চাকরিটা ফুল টাইম করো, তারপর একটা মাগি রাখো। আর তোমার বয়স এমন কিছু না, বিয়েও করে নিতে পারো। দেখবে সব ভুলে গেছ।”
“ভেবে দেখব, দাদা।।”
কিন্তু একটু পরে চিনুর কী সন্দেহ হল। সে সিটে উঠে বসল। বাইরে আলো বিশেষ চোখে পড়ছে না। বৃষ্টি হচ্ছে। মেঘের ফাঁক দিয়ে চাঁদের সামান্য আলোয় মনে হল তারা একটা নদীর পাশ দিয়ে চলেছে।
“তুমি ঠিক পথে চলেছ? এটা –“
“মাতলা নদী। এই দেখুন না, গুগল ম্যাপ ধরে চলছি। বলছে বিজয়া গেস্ট হাউস আর পনেরো কিলোমিটার, আধঘণ্টার মতো লাগবে।”
চিনু তক্ষুণি সীতুদাকে ফোন করল। “কী রে, পৌঁছেছিস?” সীতুদার উৎকণ্ঠিত জিজ্ঞাসা।
“তোমার লোকনাথ ড্রাইভারটা যেন কেমন। তুমি কি ওকে বিজয়া গেস্ট হাউসে নিয়ে যেতে বলেছ? এখন মাতলা নদীর পার দিয়ে যাচ্ছে।”
“হ্যাঁ রে, তাহলে প্রায় পৌঁছে গেছিস। লোকনাথ খুব বিশ্বাসী আর ঠাণ্ডা মাথার লোক। পথ না চিনলেও জিপিএস, গুগল ম্যাপ দিয়ে ঠিক নিয়ে যাবে।”
“উঃ, আর আধ ঘণ্টা। ঘুম পাচ্ছে, কতক্ষণে যে তোমার বিজয়ায় গিয়ে বডিটা ফেলব!”
“বডি পড়তে অতক্ষণ লাগবে না, দাদা। আর মিনিট পাঁচ-দশ।”
“মানে?”
“আমার দোষ নেই, আমি গুগল ম্যাপ ধরে চালাচ্ছি। কিন্তু একটা খবর গুগল ম্যাপ বা স্যার এখনো জানে না – ক’দিনের টানা বর্ষায় দুরন্ত মাতলা ফুঁসে উঠেছে। ক'ঘণ্টা আগে ধস নামিয়ে এই রাস্তার একটা অংশ সে গিলে বসে আছে। এলাকার লোকজন ভয়ে পালিয়েছে।”
“কেউ জানে না তো তুমি জানলে কীভাবে?”
“ঐ যে বলেছি, খবর রাখা আমার পেশা।”
“সব্বোনাশ! তাহলে এক্ষুনি গাড়ি ঘোরাও।”
“ফেরার উপায় নেই, দাদা। গুগল ম্যাপ বলছে রাস্তাটা ওয়ান ওয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ি নদীর বাড়ানো হাতে তলিয়ে গেলেই আপনি ঘুমিয়ে পড়বেন। তারপর বডিটা পাওয়া যাক না যাক দু'দিনের মধ্যে আপনার রাখেল আপনার দেওয়া খামটা দিল্লিতে পাঠিয়ে দিলেই আপনার সীতুদারও দফারফা।”
“কে রে তুই পাগল! আমাদের সব্বোনাশ করে তোর কী লাভ? আরে উজবুক, তুইও তো মরবি।”
চিনুর আক্রমণ লৌহদৃঢ় বাহু দিয়ে প্রতিহত করে লোকনাথ বলল, “লম্বা চুলদাড়ি রেখেছি দেখে দাদা বোধহয় চিনতে পারেননি – আমি স্নিগ্ধার হতভাগা বাপ। মেয়ে জানত, রেপ ভিক্টিম জিন্দা লাশ হয় না। কিন্তু সে চলে গিয়ে বাপটাকে একটা জিন্দা লাশ করে রেখে গেছে। কাজ ফুরোল, এবার সেই লাশটা শান্তিতে ঘুমোবে। না দাদা, দরজা খোলার চেষ্টা করে লাভ নেই, চাইল্ড লক চালু করা আছে। ওয়ান ওয়ে স্ট্রিটে একবার ঢুকলে আর ফেরা যায় না। চলুন, দুজন একসঙ্গে নরকের তল অব্দি যাই।”
স্টিয়ারিং দখলের ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে দেখল চিনু গুণ্ডা, একটু দূরে রাস্তার ওপর নদী চিকচিক করছে আর গাড়ি দুরন্ত গতিতে সেদিকে ধেয়ে চলেছে।